মানুষের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করাই শাসকের প্রধান কাজ। দিল্লিতে শাসক যিনি, হটুগঞ্জে নিশ্চয় তিনি নন। কিন্তু আসলে তিনিই। ক্ষমতার শীর্ষ কোথায় জানা নেই, কিন্তু তা ভাগ হয়েছে সর্বত্র। তাতেই দেশ এগিয়ে চলে। এগিয়ে যে চলে, তা আমাদের দেশে ক্রমাগত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখন দেখার কথা এই এগোন আসলে পিছোন কি না। এখন ধর্মাধর্ম জুড়েছে নিরাপত্তা পরিষদের ক্ষমতার সঙ্গে। ভেবে দেখুন আপনি নাস্তিক হতে পারবেন না। হলে আপনার জীবনের ভার রাষ্ট্র নেবে না। প্রতিবেশী দেশে হয়েছে এমন। আমার দেশেও। ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনার নিরাপত্তা সরকার দেবে না। এদেশে ওদেশে, দুই দেশেই। আপনি স্রোতে গা ভাসিয়ে চলুন, ভালো থাকবেন। আপনি জঞ্জাল, শ্যাওলার মতো স্রোতের অনুকূলে ভেসে চলুন, আপনার নিরাপত্তা সংরক্ষিত। আপনি মাছের মতো স্রোতের বিপক্ষে ভেসে যান, আপনি অনিরাপদ। আলব্যের কামুর ‘আউটসাইডার’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্রটি, যার জবানীতে উপন্যাসের কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে, সেই প্রটাগনিস্টের অপরাধ কী ছিল? মায়ের মৃত্যুতে সে যথার্থ শোকার্ত হয়নি। মা থাকতেন বৃদ্ধাশ্রমে। সেখানে মা ভালো ছিলেন। বয়সজনিত কারণে মারা গেছেন। কিন্তু তুমি সন্তান হয়ে মৃত্যুর পরের দিন প্রেমিকার সঙ্গে জলক্রীড়া করেছ, হাসির ছবি দেখেছ, ইত্যাদি ইত্যাদি…। আরবদের হত্যা করেছিল সে, সেই অপরাধ প্রমাণ করতে মায়ের মৃত্যুর পর তার আচরণ কেমন ছিল তা বিবেচ্য হয়। তুমি স্রোতের বিপক্ষে গেলে নিরাপত্তা পাবে না পরিষদের কাছ থেকে। প্লেগ উপন্যাসে প্লেগে অবরুদ্ধ শহর রোগমুক্ত হয়েছে, জনগণ উৎসবে মেতেছে, দূর থেকে সেই উল্লাস শুনতে শুনতে ডাঃ রিও ভাবছে, মানুষের এই উল্লাস, আনন্দধ্বনি যে কোনোদিনই হয়তো আবার থেমে যাবে। নিয়ম তাই। প্লেগের জীবানু কখনোই সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয় না। থাকে। বছরের পর বছর ঘুমিয়ে থাকে আসবাবপত্র, জামা-কাপড়ের বাক্সের ভিতর, শোবার ঘরে, ভাঁড়ারে লুকিয়ে থাকে। তারপর আচমকা বেরিয়ে আসে মানুষের সর্বনাশ করতে। ইঁদুরের ভিতর ঢুকে পড়ে শহর রোগে প্লাবিত করে দেয়। নিরাপদ জীবন অবরুদ্ধ হয়, বিপন্ন হয়। মৃত্যুর সঙ্গে দেখা হয় অনবরত। মানুষের নিরাপত্তার ধরণ অমনিই। কাস্টমসের উচ্চপদস্থ অফিসার অভিজিৎ সিনহা ছিলেন শান্ত নির্বিরোধ মানুষ। তাঁর ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ল নিরাপত্তারক্ষীরা। সন্দেহ তিনি বিপজ্জনক ব্যক্তি। তাঁর ফোন নম্বর পেয়েছে তারা কোথায় কোন দেশদ্রোহীর ডায়েরিতে। জেরায় জেরায় ভীত মানুষটি আত্মহত্যা করেছিলেন। আমি নিরাপদ কতক্ষণ, যতক্ষণ নিরাপদ আছি। নিরাপত্তাহীনতার জীবানু, সেই প্লেগের জীবানু, কোথায় ঘুমিয়ে আছে আমি জানি না।
দেওয়ালের লিখন
ফেসবুক কেমন? ফেসবুকে প্রাপ্ত বাস্তবতা? এই যে আন্তর্জাল নির্ভর নতুন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের জীবনে কীভাবে প্রবেশ করেছে তা আসলে কী? ফেসবু্কে সময় কাটাই আমি, কিসে কেটে যায় সেই সময়? ফেসবুকের জনসমাজকে দেখি আমি, সে কেমন জনসমাজ? স্যোসাল নেটওয়ার্কিং সাইট। এই সামাজিক বাস্তবতায় বিশ্বাস করি আমি। কেমন সে বিশ্বাস? এ যেন ২৪০০ বছর আগে জন্মান গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর কথিত সেই অন্ধকার গুহার প্রতীক হয়ে উঠেছে দিনদিন। সমস্তটা নয় কিছুটা। শাদা আর কালোতেই তো সব কিছুর অস্তিত্ব।
এথেন্সের এই মহৎ দার্শনিক ছিলেন আর এক জ্ঞানী, দার্শনিক সক্রেটিসের শিষ্য। সক্রেটিস প্রশ্ন করতেন। প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতেন তর্ক বিতর্কে। লেখার চেয়ে তর্কে বিশ্বাস ছিল তাঁর বেশি। যা কিছু সত্য, তা তর্কে বিতর্কে অর্জন করতেন সক্রেটিস। সক্রেটিস লেখায় বিশ্বাস করতেন না। প্লেটো লিখেছিলেন সক্রেটিসের দর্শন ৩৬ খণ্ডে। কিন্তু প্লেটোর গুহার রূপক কাহিনি প্লেটোরই। প্লেটোর মনীষা সঞ্জাত। ফেসবুক কি ক্রমশ হয়ে যাচ্ছে প্লেটো বর্ণিত সেই অন্ধকার গুহা? সেই গুহার অন্ধকারে বন্দীরা আজীবন রয়েছে সমুখের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে। তাদের পিছনে জনসমাজ। জনসমাজের পিছনে আগুন। আগুনের জন্য জনসমাজের ছায়া এসে পড়েছে গুহার দেওয়ালে। ছায়াকেই সত্য মনে করত শৃঙ্খলিত বন্দীরা। প্লেটো বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীকে আমরা যেমন মনে করি, সেটি আসলে সে রকম নয়। আপাত দৃষ্টিতে আমাদের সামনে আমরা যা দেখি তা আসলে মূল বাস্তবতা থেকে অন্তরে অন্তরে ভিন্ন। আমরা বেশীর ভাগ মানুষই এই চেহারাকেই বাস্তবতা হিসাবে মনে করি। আমরা মনে করি আমরা সব বুঝতে পারছি কিন্তু আমরা আসলে পারছি না। উল্টে মনে করছি এইটি সত্য। আসলে তা সত্য নয়। বন্দীদের সমুখের দেওয়ালে ছায়া পড়ত পিছনে সঞ্চরণশীল জনসমাজের। প্লেটো বর্ণিত সেই কাল্পনিক গুহায় যে মানুষেরা গুহার দেয়ালের দিকে মুখ করে শৃঙ্খলিত হয়ে আছে, তারা শুধু দেখতে পারছে কম্পমান ছায়াগুলো। ছায়াদের চলমানতার শব্দ। ছায়াদের পরস্পরের কথা। কম্পমান ছায়াদের অস্তিত্বে তারা বিশ্বাস করছে। সত্য ভাবছে ছায়াদের। তারা ভাবতেই পারে না ছায়ার অবাস্তবতা। ছায়াই বাস্তব, মূল বাস্তবতাকে তারা কল্পনাও করতে পারে না। এই মানুষগুলো তাদের সারাটা জীবন অতিবাহিত করে দেয়ালের উপর প্রক্ষেপিত ছায়াগুলোকে বাস্তব পৃথিবী হিসাবে ভেবে। তারপর তাদের মধ্যে কোনো একজন তার শৃঙ্খল ভেঙ্গে পেছনে যখন ঘুরে আগুনের দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে সবকিছু প্রথমে ঝাপসা মনে হয়, তারপর সে দেখতে পারে আসলে সে কোথায় অবস্থান করছে। সে তখন হামাগুড়ি দিয়ে অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সূর্যের আলো দেখতে পায়। দেখতে পায় সত্যিকারের পৃথিবী। এই দেখার আনন্দময় অভিজ্ঞতা নিয়ে এরপর সে গুহায় আবার ফিরে আসে। গুহার বাইরের পৃথিবী সম্বন্ধে সে যা কিছু অন্যদের বলে তা কেউই বিশ্বাস করতে পারে না। যে মানুষটি তার শৃঙ্খলিত জীবন থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে-ই দার্শনিক। সাধারণ মানুষের খুব সামান্যই ধারণা আছে বাস্তবতা সম্বন্ধে, কারণ গভীরভাবে ভাবার বদলে তাদের সামনে যা আছে তা দেখেই তারা সন্তুষ্ট। ফেসবুক কি সেই অন্ধকার গুহা? ফেসবুক বাস্তবতার ছবি কিংবা ছবির বাস্তবতা, ফেসবুক আসলে কী? ফেসবুকে অভ্যাসের আয়ু দেখতে দেখতে বছর আট হয়ে গেল। আন্তর্জাল এবং ফেসবুক এই জীবনের নতুন বিস্ময়, তা সত্য। আবার বহু বিস্ময়ের সমাধিও যেন এখানে, তাও সত্য। সমাধি কেন, আন্তর্জাল যেন কল্পনার বিপ্রতীপ এক অবস্থান। কোন ছেলেবেলায় অন্নদাশংকর রায়ের পথে প্রবাসে থেকে একটি অংশ পেয়েছিলাম পাঠ্য তালিকায়। তার শিরোনাম ছিল বিলেত দেশটা মাটির। বালক নিজের কল্পনায় সেই দেশটিকে ভেবেছিল এক রকম। অন্নদাশংকর রায়ের লেখা পড়ে সে জেনেছিল যা তা যেমন জেনেছিল, তেমনি তার কল্পনার পৃথিবীও নতুন করে তৈরি করেছিল সে তার মনের ভিতর। আন্তর্জাল কল্পনাকে থামিয়ে দেয় আচমকা তা যেমন সত্য, আবার প্রশ্নের জন্মও দেয়, যদি আপনার প্রশ্ন করার অভ্যাস থাকে।
