ক্ষমতার বিরুদ্ধে গেলে আপনি বিপন্ন। সেখানে গণেশ পুজো করা অমুক সঙ্ঘও রাষ্ট্র। হ্যাঁ তাই। তার সঙ্ঘের মাথায় রয়েছে এলাকার নিরাপত্তা পরিষদের হাত। তাই সে বিরূপ হয়ে বোমা পিস্তল নিয়ে আপনার হাড় হিম করে দিতে পারে। এই ভাবেই সেই কাষ্ঠ ব্যবসায়ী, যে জঙ্গল সাফ করে মুনাফা তোলে, সেও রাষ্ট্র, কারণ তার পিছনেও রাজ্যের কিংবা মহকুমার, কিংবা জেলার অথবা পঞ্চায়েতের কর্তার হাত আছে। কেন না তার মুনাফায় কারোর কারোর ভাগ আছে। একের ক্ষমতা অন্যের নিরাপত্তা ধ্বংস করে, যেমন হিরোসিমা বা নাগাসাকিতে করেছিল আমেরিকা, যেমন সন্দেহ করা হয়, সেই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জন.এফ.কেনেডির জীবন নিয়েছিল অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। কেনেডি অস্ত্র সংবরণ করতে চেয়েছিলেন ভিয়েতনামে। কিউবার প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল। অস্ত্রই তো ক্ষমতা। জে.এফ.কে নামের একটি সিনেমায় এমন অনেক সন্দেহ স্পষ্ট করে তোলা হয়েছে। অস্ত্রই ক্ষমতা, এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিরোসিমা, নাগাসাকি। আমি কত বড়, আমি কতটা শক্তি ধরি তা দেখাতেই তোমার নিরাপত্তা শেষ করতেই হবে। ধ্বংস করতে হবে নাগরিক থেকে কীট-পতঙ্গ সমূহকে।
পৃথিবীর বয়স হলো ঢের। মানুষের জ্ঞানের সীমা পরিসীমাও কম নয়। প্রযুক্তি মানুষের কাছে এনে দিয়েছে জ্ঞানের অনন্য ভাণ্ডার। তা যেমন আশীর্বাদ হয়েছে, তেমনি অভিশাপ হয়ে মানুষের বিপন্নতা বাড়িয়েছে ক্রমাগত। গণতন্ত্র এলে, রাজা-রানির শাসন গেলে, রাষ্ট্র হয়েছিল জনকল্যাণের। তা সম্ভব হয়েছিল উনিশ শতকের সংগ্রামে। তার ফলে বিশ শতকে ছিল নিরাপত্তা অর্জন। কী অর্জন? না, নিরাপত্তার অধিকার। কত অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল মানুষ। ৮ ঘন্টা শ্রম, কাজের নিরাপত্তা, কর্মীর সমস্ত জীবনের নিরাপত্তা, সব। কিন্তু একুশ শতকে এসে সেই সব অধিকার হরণ করে নেওয়া হতে লাগল ক্রমশ। এর পিছনে সোভিয়েতের পতন একটা কারণ হতে পারে, কেউ কেউ তা বলেন, আমিও অনেকটা তা ভাবি, কিন্তু সেই দেশে সাইবেরিয়ার নির্বাসন, ক্ষমতার বিরোধীদের বিপন্ন করে তোলাও তো সত্য ছিল। ক্ষমতাই আসলে রাষ্ট্রের নির্মাতা। তাই ক্ষমতা অথবা রাষ্ট্র বলল, অত নিরাপত্তা দেব কেন? মানুষ নিজে তা খুঁজে নিক। রাষ্ট্র শাসন করবে। নিরাপত্তা দেবে না যা চায় জনগণ। তখন জনগণ বিশ্বাস হারাতে থাকে রাষ্ট্রের প্রতি। আর রাষ্ট্রও তার জনগণের প্রতি বিশ্বাস হারায়। তখন কত রকম সন্দেহ তার ভিতরে জন্ম নেয়। অমল বিমল কমল এবং ইন্দ্রজিত এদের জীবনের গোপনীয়তা না জানলে রাষ্ট্র ক্ষমতা কি অটুট থাকবে? বিদ্রোহ তো ক্ষমতার বিপক্ষে সব সময় জাগরূক। অমল কী ভাবে, বিমলই বা কী চিন্তা করে? তাদের একটা পরিচয় পত্র হলো। কিছু তথ্য রাষ্ট্রের হাতে গেল। তারপর হলো কম্পিউটারে হাতের ছাপ, মুখের টাটকা ছবি নেওয়া পরিচয় পত্র। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো দূরাভাষ নং। আপনাকে বেঁধে ফেলা হলো। বলা হলো, এই পরিচয় পত্র না থাকলে, আপনার নাগরিকতাই সন্দেহমুক্ত হবে না। ব্যাঙ্কে লাগবে, রেল ভ্রমণে লাগবে, পাসপোর্টে লাগবে, যে কোনো সময়ে আপনার পরিচয় জিজ্ঞেস করা হতে পারে, তখন এই কার্ড নম্বর লাগবে। না থাকলে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ, রেলের টিকিটের সংরক্ষণ বন্ধ, অনেক সুযোগ-সুবিধা রহিত হয়ে যাবে। মনে করুন এগুলি হারিয়ে গেছে, বন্যার জলে ভেসে গেছে (যা হয়েছে কেরলে) তখন? নতুন কোনো নিবন্ধন হবে না। সরকারি ঋণও নয়, ব্যাঙ্কের ঋণও নয়। ভয় হয়, এরপর না চাল চিনি কিনতে কার্ড প্রয়োজন হয়। না থাকলে নতুন কিছুই হবে না। এসব হলো রাষ্ট্রের খেয়াল। মানে ক্ষমতার খেয়াল। খেয়ালও নয়, সুচিন্তিত কৌশল। ক্ষমতা চায় মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে থাকুক, উদ্বেগ ভয়ের জন্ম দেয়। মানুষ ভয়ে থাকুক। তাহলে শাসনে সুবিধে অনেক। ফলে আমার আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বার বার ভিন্ন স্থানে চলে যায় অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা হয় বলে। সব ঠিক ঠাক আছে তো? এ হলো এক উদ্বেগ। ব্যাঙ্কের পাশ বই এক উদ্বেগ। এ টি এম কার্ড এক উদ্বেগ। অতি কষ্টে উপার্জন করা অর্থ লোপাট না হয়ে যায়। লোপাট হচ্ছে। ব্যাঙ্ক কি দায় নিচ্ছে? তাই আমাকে অদ্ভুত সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। জানি না কী করলে আমার অর্থের নিরাপত্তা শতকরা ১০০ ভাগ সুনিশ্চিত হবে। কিন্তু এ টি এম কার্ডে টাকা তুলতে পাঁচবার ভাবি। সরকার দায় নিচ্ছে না। মানুষ নিজেরটা নিজে বুঝে নিক।
আবার এক নতুন উদ্বেগ এসেছে আমার বন্ধু আর প্রতিবেশীর জন্য। আসামের কথা বলছি। সেখানে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী তৈরি করছেন দায়বদ্ধতা শূন্য সরকারি কর্মচারী। ফলে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলী আহমেদের পরিবার অনাগরিক বলে ঘোষিত হন। ৪০ লক্ষ মানুষের ঘুম গেছে। এবং সামাজিক নিরাপত্তা। ১৯৭১-সালের ২৬শে মার্চের আগে এই দেশে আপনি যে ছিলেন তার একটা প্রমাণ দিন। জমির দলিল, জন্মের শংসাপত্র, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট…ইত্যাদি ইত্যাদি। যিনি ইস্কুলের শেষ ধাপ অবধি যাননি, সেই কৃষক, ক্ষেত মজুর, শ্রমিক কী দেখাবেন? জমি কেনার দলিল। জমি না থাকলে? জমি আছে, কাগজ মানে পর্চা, দলিল নেই, তাঁর কী হবে? এমন তো হয় বেশি। জমি দখল করে তিন পুরুষের ভিটে। কিন্তু জমি হয় সরকারি খাস কিংবা অন্যের। কাগজ যা আছে, ভুল কাগজ। কেউ জানে না রেকর্ডে কার নাম। ফলে তিনি হয়ে গেলেন অনুপ্রবেশকারী। তাঁর জন্য অপেক্ষা শিবির হয়েছে। হায়, কী ভয়ানক আতঙ্ক। আতঙ্ক হয়তো কাটবে, হয়তো কাটবে না। ৯৮ বছরের বৃদ্ধ যিনি ১৯৪৭-এ উদ্বাস্তু হয়ে সীমান্ত পার হয়েছিলেন, তাঁর বৈধ কাগজপত্র থাকতেও নাম নেই নাগরিক পঞ্জীতে। হয় এই খাতায় না হয় চিত্রগুপ্তের খাতায়। সরকারের বেতনভূক কর্মচারী, ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা শাসক, নিরাপত্তার বলয়ে যাঁদের জীবন যাপন, তাঁরা তাঁর নিরাপত্তা হরণ করেছেন। দরিদ্র অতি সাধারণ যে নাগরিক, তাঁকে বিপন্ন করতে পারলে আর সকলে ভয়ে থাকবে। মাথা তুলে কথা বলবে না। মানুষের যে হয়রানি হলো, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
