তাজা বাতাস নিতে এই মাঠে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে গাড়ি নিয়ে প্রাতঃ ভ্রমণে আসেন বরিষ্ঠজন। সবুজ ঘাসের উপর পা ফেলে ফেলে আয়ু বাড়ান। লাইফের এক্সটেনশন চান ভগবান স্যারের কাছে। হুঁ। এমনই এক উষাকালে হয়তো হয়েছিল গড়ের মাঠে প্রথম রক্তপাত। মৃত্যু। যে প্রান্তরে যুদ্ধ হয়নি, রক্ত ঝরেনি এমন একটা সেনাবাহিনি সমেত গড় থাকতে, সেই প্রান্তরে ভয়ানক রক্তপাত, নিষ্ঠুর হত্যা দেখে ভয়ে আমাদের প্রিয় নায়ক অভিনেতা পালিয়ে গিয়েছিলেন মুম্বই। গুলির শব্দ। আর্তনাদ। আপনি কিছু দ্যাখেননি। কে লোকটা? লেখক বিপ্লবী সরোজ দত্ত। সেই ঘটনা রক্তাক্ত করেছিল গড়ের মাঠের বুক। সেই রক্তের দাগ এখনো শুকোয়নি। আমরা মুছে দিতে পারিনি।
নিরাপত্তাহীনতার জীবানু এবং নিরাপত্তার আনন্দধ্বনি
জাতি সঙ্ঘে একটি নিরাপত্তা পরিষদ আছে। যার স্থায়ী সদস্য চিন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। অস্থায়ী সদস্য দশ। এই পরিষদের কাজ বিশ্বে শান্তি রক্ষা করা। যুযুধান দুই পক্ষকে থামানো। অন্যায় যুদ্ধে বিপর্যস্ত দেশের হয়ে লড়াই করতে জাতি সঙ্ঘের সামরিক বাহিনী পাঠানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালের ২৪শে অক্টোবর নিরাপত্তা পরিষদ গঠন হয়। এর আগে আগেই জাপানে পরমানু বোমা পড়েছে ৬-ই আগস্ট এবং ৯-ই আগস্ট। বলছি নিরাপত্তা পরিষদ থাকতেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কি যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে? দুর্বলের উপর সবলের সামরিক অভিযান? গত শতাব্দীতেই তো হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। নিরাপত্তা পরিষদ কোনো রাষ্ট্র আর তার জনগণকে নিরাপত্তা দিতে পারে? ভিয়েতনামকে নিরাপত্তা দিতে পেরেছিল, তার জনগণকে? কোনো জনজাতিকে নিরাপত্তা দিতে পারে জাতিসঙ্ঘ? আদিবাসী জনজাতিকে মেরে তাদের অরণ্য পাহাড় দখল বন্ধ করতে পেরেছে নিরাপত্তা পরিষদ? আমেরিকার আদিম উপজাতিরা জাতি সঙ্ঘের কাছে আবেদন করেছিল, তাদের যা যা হরণ করা হয়েছে, বন-পাহাড়, নদী, সমুদ্রতট, প্রান্তর, আলো-বাতাস, শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকে সব ফিরিয়ে দিতে। নিরাপত্তা পরিষদ কি পেরেছে? নিরাপত্তা পরিষদ পারেনি ইরাকে হাসপাতালের উপর, বিদ্যালয়ের উপর বোমা বর্ষণ বন্ধ করতে? ইরাক যুদ্ধে নিরীহ ইরাকি বন্দীদের উপর মার্কিন সেনা বাহিনীর নৃশংসতা বন্ধ করতে, আবু গ্রাইব কারাগারের ভয়ঙ্কর নির্যাতনের বিপক্ষে কোনো প্রস্তাব নিতে? আফগানিস্তানে ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসন রুদ্ধ করতে? একটা দেশ তো তার মানুষকে নিয়েই হয়। জনগণ একটা দেশের সম্পদ। শুধু মরুভূমি কিংবা সমুদ্র, মহাসমুদ্র নিয়ে তো দেশ হয় না। রাষ্ট্র হয় না। মানুষ না থাকলে কী নিয়ে রাষ্ট্র হবে? পাহাড় আর বনভূমি আর বন্যজন্তু কিংবা সামুদ্রিক প্রাণী নিয়ে, মরুপ্রান্তরের শকুন আর হাড়-কঙ্কাল নিয়ে? মানুষই রাষ্ট্র গড়ে। রাষ্ট্রকে সম্পদশালিনী করে তোলে। দেশ প্রেমিক হয়। দেশদ্রোহী শিরোপা পায় ক্ষমতার হাতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বললে। রাষ্ট্রেই তার নাগরিক মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। মানুষ নানা আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকে। থাকে। কী করে থাকে?
খোঁজ নিয়ে দেখুন নিরাপত্তা পরিষদ যেমন জাতি সঙ্ঘে আছে, অন্য নামে নিরাপত্তা পরিষদ আপনার পাড়ায় আছে, পাড়া থেকে শহরে আছে, শহর থেকে রাজ্যে আছে, রাজ্য থেকে দেশে আছে। নাগরিক সমাজে আছে। সমাজ তো দেশের অংশ। আপনি ছা-পোষা গেরস্ত। আপনার কাছে অমুক সঙ্ঘ (জাতি সঙ্ঘ নয় নিশ্চয়) এসে দাবী করল গণেশ পুজায় হাজার টাকা, দুহাজার টাকা। আপনার বাড়ির সামনে ১০০ ডেসিবেল মাত্রায় লাউড স্পিকার, বাড়িতে অসুস্থ প্রবীণ, আপনি সঙ্ঘের কাছে অনুনয় করে বিচার না পাওয়ায় গেলেন নিরাপত্তা পরিষদে। তিনিই সব দেখেন। বাড়িতে স্বামী স্ত্রী, শাশুড়ি বউয়ের কলহ হলেও তিনি দেখেন, কলেজে ছাত্র ভর্তি হতে না পারলেও তিনি দেখেন। তিনি যদি সদয় হন তবে সমস্যার সুরাহা হতে পারে, না হলে আপনার জীবন হানি হতে পারে। লাউড স্পিকার বাজানো আর পটকা ফাটানোর প্রতিবাদ করতে গিয়ে হত হয়েছেন এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। অভাব নেই অ্যাসিড ছুঁড়ে আপনার কন্যা সন্তানের উপর শোধ নেওয়ার দৃষ্টান্তেরও। কন্যার অপরাধ, পাড়ার ছেনো কিংবা ধেনো, ইত্যাদি আপনজনের প্রস্তাবে সে ‘না’ করেছিল। তারাই নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য।
সেনা বাহিনী, আমার দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করে। সীমান্তে প্রহর জাগে। আবার বন্যা, ভূমি কম্প, পাহাড়ে ধ্বস নামলে সেনা বাহিনী ভরসা। বিপন্ন মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা এবং শৌর্য সেনা বাহিনীরই আছে। সব দেশেই তা হয়। আবার এই বাহিনীই তো বিদ্যালয়, হাসপাতালে বোমা ফেলে। অপরাধী সন্দেহে মানুষকে গাড়ির পিছনে বেঁধে গাড়ি চালিয়ে দেয়। সেনা জওয়ানের চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালকের ভূমিকা এখানে প্রধান। কর্তার ইচ্ছায় মানুষ বিপন্ন হয়। কর্তাই ঠিক করেন কে নিরাপত্তা পাবে, কে পাবে না।
রাষ্ট্র গড়েছে মানুষ। আবার সেই মানুষের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের হাতেও সব সময় মজবুত নয়। নয়। আমার বন আমার পাহাড় তুমি কেড়ে নেবে। নির্বিচারে গাছ কেটে মরুভূমি করে দেবে অপরূপ প্রকৃতি, আমি তার প্রতিরোধ করলে বিপদ। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরণ্যক উপন্যাসের শুরুতে যে বনভূমির কথা বলেছিলেন, নায়েব সব জমি বন্দোবস্ত দিয়ে ফেরার সময় অনুধাবন করেছিল, কাজটা ভালো হয়নি। বনভূমি ধ্বংসের সূত্রপাত ঘটেছিল জমি বন্দোবস্তে। আরণ্যকের সেই আদিবাসী গ্রাম, আদিবাসী রাজা, রাজকন্যা ভানুমতীর ধনঝরি পাহাড় ধ্বংসের প্রতিবাদে জোতদার রাসবিহারী সিঙেরা এখন গ্রাম পুড়িয়ে দেবে, জেলখানায় ভরে দেবে। রাসবিহারী সিং’এর হাতে যে ক্ষমতা, তাই-ই রাষ্ট্রের ক্ষমতা।
