হাবুল মল্লিকই গড়ের মাঠ চিনিয়েছিল। সে-ই বলেছিল একদিন খিদিরপুর যেতে হবে। যে ট্রাম যায়, সেই ট্রামেই ফিরব। কেন যেতে হবে? না সেই ট্রাম গড়ের মাঠ ভেদ করে বেহালা, খিদিরপুর যায়। ট্রামেই বসে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে কী সুন্দর না দেখায়। হাবুলদা দেখেছে কিন্তু আমাদেরও দেখাতে চায়। ঘোড়দৌড়ের মাঠের পাশ দিয়ে যাবে সেই ট্রাম। কপালে থাকলে রেসও দেখা যাবে বাইরে থেকে। পুজোর সময় কবিতীর্থর ঠাকুর দেখতে গড়ের মাঠের এক প্রান্ত থেকে ট্রামে চেপে সেই অবারিত প্রান্তর ভেদ করে খিদিরপুর গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার শহর। ভিক্টোরিয়ার মাথার উপরে অর্ধেক চাঁদ দেখেছিলাম ফেরার সময়। তখন ভিক্টোরিয়া এত আলোয় সাজেনি। কিন্তু অন্ধকারে তার গায়ের শ্বেত পাথর থেকে ঠিকরে আলো বেরিয়ে আসছিল। আশ্বিনের রাত। গড়ের মাঠ নির্জন। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। কত বড় মাঠ। অন্ধকারে নেমে গেলে দিকহারা হয়ে যাব। অবাক হয়ে অন্ধকার দেখেছিলাম। মনে আছে এখনো। কত বড় বড় গাছ। ভুষন্ডীর মাঠ হয়ে যায় রাত্রিকালে গড়ের মাঠ। আন্নাকালি তার আগের জন্মের স্বামীকে খুঁজে পেয়ে মুড়ো ঝ্যাঁটা নিয়ে তাড়া করে।
গড়ের মাঠ নামে সেই আমলে ট্যাবলয়েড সাইজের একটা খেলার পত্রিকা বের হতো। মনে হয় কলকাতার সবচেয়ে পুরোন খেলার পত্রিকা। তার ছবির গায়ে হাত পড়লে কালি উঠে ছবি ধ্যাবড়া হয়ে যেত। কিন্তু কী ডিম্যান্ড! পকেটে দু-চার আনা থাকলে তা দিয়ে গড়ের মাঠ কিনে ধর্মতলা থেকে হন্টন। ট্রাম লাইন ধরে বেলগেছে। রাস্তা ভুল হওয়ার চান্স নেই। খেলার মাঠ নামে আর এক পত্রিকাও পাওয়া যেত এই ময়দানে। পরে বের হয়েছিল অলিম্পিক। খেলার দিন দেদার বিকোত।
গড়ের মাঠে খেলার সেই আকর্ষণ এখন নেই। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান, মহামেডান… ভাল খেলা হয় যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। গড়ের মাঠ, ঘোড়সওয়ার পুলিশ, মানুষের দৌড়, র্যামপার্ট বাতাসে ভেসে আছে। মনে হয় গড়ের মাঠ নিঃসঙ্গ হয়েছে। কিন্তু গড় আছে আর তার মাঠ তো আছেই। ফি বছর এই মাঠে বই মেলা বসত। কিছু মানুষ পণ করে তা তুলেই দিল কোর্ট কাছারিতে গিয়ে। তবু গড়ের মাঠ আছে। সন্ধ্যায় নিঃসঙ্গ মানুষটি বসবে কোথায় চটি খুলে তার উপরে পাছা রেখে পা লম্বা করে গড়ের মাঠে। সমস্ত দিনের শেষে বিশ্রাম। সন্ধ্যায় ঘরে না ফিরে গড়ের মাঠে। বাড়িতে দুঃখ জমা আছে হে। দুঃখ বোঝো? ঘরে বাতাস নেই, দমচাপা। এখেনে গঙ্গার হাওয়া দেয়। দখিনা বাতাস। গা জুড়োয়। মাঝে মাঝে পাহারাওয়ালা লাঠি ঘুরিয়ে দেখে যায় কারা আছে। মেয়েমানুষ নিয়ে পুরুষমানুষ বসেছে কিনা। বসলে তাদের বয়স কত, দূরত্ব কত পরস্পরের। গিয়ে দেখুন অন্ধকারে কিংবা অল্প চাঁদের আলোয় এক মধ্যবয়সী মোবাইল ফোনে কথা বলেই যাচ্ছে। হয়ত পুরাতন প্রেম কিংবা নতুন সম্পর্ক। হয় তো বউ ছেড়ে গেছে তাকে। বউয়ের সঙ্গেই কথা হয়ে যাচ্ছে। ফিরে এস কুসুম। শহীদ মিনারের আশেপাশে কত মানুষ সন্ধ্যায়। চাওয়ালা চানাওয়ালা আইসক্রিমওয়ালা ঘুরছে। ঘুরছে পুলিশের খোচড়। মেয়েমানুষের দালাল। কানের কাছে এসে ফিসফিস, একদম ফিরেশ। এইট্টিন। ফ্যামিলি গার্ল। ফ্যামিলি থেকে আসা বউ। হুঁ, গড়ের মাঠ তো ভিক্টোরিয়া অবধি প্রসারিত। অনন্ত অন্ধাকার নিয়ে আধা ঘুমে পড়ে থাকে সন্ধ্যা থেকে। ঘুরছে কিশোরী কন্যারা। এতবড় ময়দান। রাস্তা থেকে অন্ধকারে নেমে গেলেই হলো। পাহারাওয়ালা নেবে কিছু। ভয় নেই স্যার আসুন। তখন ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়ির ভিতর থেকে নেমে আসা প্রেমিকার গলার মালা গড়ের কাছে পথের উপর লুটোয়। অশ্বমেধের ঘোড়া (দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) গল্পের সেই ফিটন গাড়ি নিয়ে ভিক্টোরিয়া স্মৃতি সৌধের পাশ দিয়ে ঘুরে গড়ের পাশ দিয়ে এগিয়ে রেড রোড ধরে গঙ্গার কাছে চলে যেতে পারেন আপনি। বাঁদিকের সবটাই গড়ের মাঠ। ডানদিকে ইডেন গার্ডেন। একবার আগুন লাগতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কনরাড হান্ট দুই দেশের পতাকা বাঁচাতে আগুনের দিকেই ছুটেছিলেন। চার্লি গ্রিফিথ মাঠের ভিতর দিয়ে ছুটে ছিলেন হেল্প হেল্প করতে করতে। গড়ের মাঠ জানে তা। তবে কিনা অনেক বছর তো হলো। স্মৃতি বিভ্রম ঘটতে পারে। পারেই। আরো আছে দুঃখের স্মৃতি। ঘেরা মাঠের গ্যালারি ভেঙে অনেক সমর্থকের মৃত্যু। গড়ের মাঠ দেখেছে তা।
গড়ের মাঠ দখল করে নিয়েছে নানা কিসিমের মানুষ। বাস টারমিনাস থেকে দীঘা শিলিগুড়ি বালুরঘাট কোচবিহারের বাস ছেড়েই যাচ্ছে সমস্তদিন ধরে। দুপুরে কাউয়া গোণার অপরাধে বিহারী ভোলেভালে লোকটিকে ফাইন করেছে মৌচ পাকানো লাঠি ঘুরানো পাহারাওয়ালা। অবারিত প্রান্তরে ঘুমিয়ে পড়েছে কতজন। এতখানি রোদ শীতকালে আর কোথায় পাবে? পারলে শীতের দেশে রপ্তানি করা যেত। গরমের দিনেও গাছতলায় ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্ত মানুষ। ওই দূরে প্যাটন ট্যাঙ্ক। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় তাকে রণাঙ্গন থেকে নিয়ে এসে রেখে দিয়েছে সেনাবাহিনী। যুদ্ধের স্মৃতি।
এইই তো কলকাতা শহরের ফুসফুস। প্রোমোটার আর রিয়েল এস্টেটের কারবারিরা যেতে যেতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, ইস, কত ফ্ল্যাট হতো। কলকাতার এই জায়গাটিই পড়ে আছে। ফেলে রাখার মানে কী? বসন্তদিনে গড়ের মাঠ ভেদ করে ছুটে যাওয়া রাজপথ কুসুম কুসুমে রঞ্জিত হয়ে থাকে। গাছে গাছে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া… লাল হলুদ। কী যে রূপ হয় তখন এই প্রান্তরের। আহা এ যেন সেই ধুলাউড়ির মাঠরে ভাই, ধুলাউড়ির মাঠ। লাল শাড়ি আঁচল উড়িয়ে কে পার হয়ে যাচ্ছে সেই মাঠ। ভোল কন্যা নয় তো? ভুলিয়ে ভুলিয়ে ঘুরিয়ে মারবে মাঠের ভিতর।
