পুনশ্চ: ক’বছর আগে একটি নাটক লিখেছিলাম ব্রাত্যজন নাট্যপত্রে। সেই নাটক মেঘনদ ভট্টাচার্যর পরামর্শে কতবার বদল করেছি যে তার হিসেব নেই। দৃশ্য ধরে তিনি আমাকে দিয়ে আবার লিখিয়েছেন। এই কাজটি বন্ধুতার স্মারক হয়ে থাকবে। নাটকের নাম “শেষ পাহাড় অশ্রুনদী”। নতুন করে দৃশ্য বিন্যাস সবই তাঁর পরামর্শে। ঐটিই আমার জীবনের প্রথম নাটক।
গড়ের মাঠ
গড় তো ফোর্ট উইলিয়ম। প্রাচ্যদেশে ব্রিটিশ রাজের সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় নিদর্শন। তার মাঠ আমাদের গড়ের মাঠ। গড় ফোর্ট উইলিয়ম ১৭৮০ নাগাদ আত্মপ্রকাশ করে গড়ের মাঠের পশ্চিমে গঙ্গার পূর্বকূলে। কিন্তু সেনাবাহিনীর সেই গড় তো আম আদমির কাছে অনেক দূরের, তার মাঠ আমাদের অনেক কাছের! শুনেছি একটি গড় আগে ছিল বিবাদী বাগের জিপিও যেখানে, সেখানে। ১৭৫৬ সালে সেই দুর্গ সিরাজের সেনাবাহিনী অধিকার করলে বোঝা গিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে যথেষ্ট নিরাপদ নয় তা। ১৭৫৭-য় পলাশীর যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জিতে গেলে বণিক হয়ে যেতে থাকে শাসক। শাসকের নিরাপত্তার জন্য এই নতুন গড়ের, এই নতুন দুর্গের পরিকল্পনা। গড় হলো, তার মাঠ হলো। এমনি এক মাঠ নয় তেপান্তর। তার এ মুড়ো থেকে ও মুড়ো দেখা যায় না। যদি সমুখ সমর হয়, এই মাঠেই তা হবে। মাঠ ছিল সেনাবাহিনীর অধিকারে। স্বাধীনতার পরও মাঠ সেনা বাহিনীর। কিন্তু তার অধিকার আমাদের। নগর কলকাতাবাসীর। কলকাতা কেন কলকাতায় আসা মফস্বলবাসীরও। ভবঘুরে, আশ্রয়হীন, নিঃসঙ্গ মানুষের আশ্রয় এই গড়ের মাঠেই। হ্যাঁ, এমনই গড় করেছিল ইংরেজ, যে গড় থেকে যুদ্ধের গোলাগুলি বারুদের ধোঁয়া বের হয়নি কোনোদিন। কোনো যুদ্ধ করেনি কোনো সেনাবাহিনী। এই গড় কোনো যুদ্ধের মুখোমুখি হয়নি কোনোদিন। হুঁ, লড়াই হয়েছে তার মাঠে, ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মহামেডান স্পোর্টিং, থেকে ইস্টার্ন রেল, উয়াড়ি, এরিয়ান্স কিংবা বালি প্রতিভার ভিতরে। গড়ের মাঠ আসলে খেলার মাঠ। যুদ্ধের মাঠ নয়। বছরে দুই দিন, ২৬শে জানুয়ারি আর পনেরই আগস্ট গড়ের সমুখের রাজপথে যুদ্ধের ভেরি বাজে, কামান নিয়ে ট্যাঙ্ক সেই পথে এগোয়, মহাযুদ্ধের ঘোড়ার টগবগ শোনা যায়, রাইফেল উঁচিয়ে সেনাবাহিনী প্যারেড করে বটে, সবই লোক দেখানো। যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই গড়ের মাঠের বাতাস তাই বলে। গড়ের মাঠে যুদ্ধ ছিল না, যুদ্ধ নেইও। গড়ের মাঠে বসে ভিন প্রদেশ থেকে ভাগ্যান্বেষণে আসা সরল মানুষ কাউয়া গুণতি করে। অক্টারলোনি মনুমেন্ট (শহীদ মিনারের পুরনো নাম) কত উঁচু তা আন্দাজ করে। যুদ্ধ নেই। শান্তি আছে। ছেলেবেলা থেকে জানি কুরুক্ষেত্রর মতো করে গড়ে তোলা গড়ের মাঠ রক্তারক্তির যুদ্ধ দ্যাখেনি। ইলিশ আর চিংড়ির লড়াই দেখেছে। এরিয়ান্স থেকে মোহনবাগানে খেলতে আসা অসীম মৌলিকের গোল দেখেছে। ছেলেবেলায়, কিশোর বেলায় টিকি উঁচানো ট্রামে চেপে গড়ের মাঠে যাওয়া ছিল সবচেয়ে আনন্দের। হুঁ, ডিপো থেকে ফার্স্ট ট্রাম ছাড়ত ভোর সাড়ে চারটেয়। আলো ফোটেনি তখনও, ঘুমন্ত উত্তর কলকাতা ভেদ করে ফুটবল নিয়ে গড়ের মাঠ যাত্রা করলাম আমরা একদল, স্বপ্ন দেখি চুনী, পিকে বলরাম হবোই হবো। অবারিত সবুজে ফুটবল পিটিয়ে ফেরা রোদ উঠে গেলে। গত শতকের ষাটের দশকের কথা বলছি। প্রাতের কলকাতা তখন আড়মোড়া ভাঙছে। গড়ের মাঠে ঘুরে ট্রামও ফিরত বেলগাছিয়া, আমরাও ফিরতাম। গড়ের মাঠে ঘেরা ফুটবলের মাঠ। ক্লাবের তাঁবু, ইডেন গার্ডেন, বড় লাটের বাড়ি (রাজ্যপালের কুঠী) থেকে শহীদ মিনার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ঘোড়দৌড়ের মাঠ… এত বিস্তীর্ণ প্রান্তর আমি আদিগন্ত বিস্তৃত শস্য ক্ষেত্র ছাড়া আর কোথাও দেখিনি। আমি কেন কেউ দেখেছে বলে জানি না। ছেলেবেলার গড়ের মাঠেই সেইসব ক্লাব, যেখানে চুনী, পিকে, বলরাম, অরুময় নৈগম থেকে মঙ্গল পুরকায়স্তকে ঢুকতে দেখা যায়। ওই যে ছফুটের বেশি লম্বা থঙ্গরাজের মাথা দেখা যায়। ক্লাব তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে হাফ প্যান্ট রোগা টিঙটিঙে কিশোর উঁকি মারছে, যদি দেখা যায়। গড়ের মাঠের খেলা তো টিকিট কেটে দেখতে হয়, টিকিটের টাকা কে দেবে? ট্রাম ভাড়াই বা পাব কোথায়, ট্রামের টিকিট ফাঁকি মেরে যদি বা গেলাম, খেলা দেখার উপায় কী? ঘোড়ায় চাপা পুলিশ ঘুরছে ব্যাটন উঁচিয়ে। ভয় তরাশে ছুটছে হাবুলদা, কাবুলদা। লাঠির ঘা পড়ল বুঝি পিঠে। ধুতি তুলে ছুটছে দর্জিপাড়ার নিমাইকাকু। খেলা আরম্ভ হয়ে যায় প্রায়। র্যামপার্টে দাঁড়িয়ে দেখছি তারকাঁটার ওপারে ফুটবল নিয়ে ছুটছে অরুময়। দেখতে পাচ্ছি না, লোকে অরুময় অরুময় বলে চিৎকার করছে তাতেই বুঝছি সেই দক্ষিণ ভারতীয়র বুটের ডগায় আঠার মতো লেগে আছে ফুটবল। হু, গড়ের মাঠে প্রথম খেলা দেখা আমার এই ভাবে। বিনি পয়সায়। কিছু দেখা হলো, কিছু দেখা হলো না। গ্যালারির চিৎকারে গলা মেলাচ্ছি গোওওল। কে দিল কে দিল, মঙ্গল না দীপু দাস? র্যামপার্টে শুধু গোলকিপারের পিঠ দেখা যায়। জার্সি চেনা যায়। তাই দিয়েই সব বুঝে নিতে হয়। তখন ফুটবল হতো গরমে আর বর্ষায়। আই.এফ.এ লিগ গেলে শিল্ড। ক্রিকেট শীতে। কলকাতায় তখন হকিও ছিল। ভি.পেজ, অশোককুমার, গুরুবক্স সিং, ইনামুর আর আনিসুর রহমান, দুই ভাই… গড়ের মাঠে এঁদের দেখা যেত। ফার্স্ট ডিভিশন ঘেরা মাঠে, সেকেন্ড বা থার্ড ডিভিশন খোলা মাঠে। কী অমোঘ আকর্ষণ ওই মাঠের। খেলা আরম্ভ হবে ঘেরা মাঠে, দলে দলে লোক যাচ্ছে দেখতে। ঠাণ্ডা লেবু জল দেদার বিকোচ্ছে। চানাওয়ালা ঘন্টা বাজিয়ে লোক ডাকছে। ফুচকাওয়ালাকে ঘিরে হেরো আর জেতা দলের সমর্থক উবু হয়ে বসে পড়েছে। হুইসিল মারছে পাগলা ফকির। সে ঘেরা মাঠের বাইরে রেফারিগিরি করে। ফাউল অফ-সাইড ধরে ফেলে। গড়ের মাঠের গড়ের ওপারে সূযার্স্ত হচ্ছে। ট্রামের জন্য হাঁটছি। খুব ভীড়। যে ট্রাম ধর্মতলায় ঢুকছে তার সেকেন্ড ক্লাসে উঠে গুনগুন করছে হাবুলদা, সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা…। তখন কলকাতা অন্যরকম ছিল। হাবুল মল্লিক ইস্কুল পাশ করতে পারেনি। খেলা ছাড়া আর কিছু জানত না। কোথায় হারিয়ে গেল জানি না। হয়তো গড়ের মাঠেই। তার তো আরম্ভ নেই শেষ নেই। মাঠে প্রবেশ করে আর বের হতে পারছে না।
