আমি বললাম, মেঘনাদ ভট্টাচার্যর সঙ্গে আমার স্পষ্ট সম্পর্ক। খোলাখুলি কথা বলার সম্পর্ক। ভালবাসার এবং শ্রদ্ধার সম্পর্ক। তিনদিন বাদে মেঘনাদ আমাকে ফোনে জানিয়েছিলেন, আমার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভেবেছেন ক’দিন ধরে, বিরতির দৃশ্যটি নতুন করে ভেবেছেন। নাট্যকারের সঙ্গে কথা বলেছেন। বদলেছেন। বললেন, লেখকই তো কাহিনির স্রষ্টা, তাঁর মতামতের গুরুত্বই প্রধান। আমাদের দুজনের বন্ধুতা আর সম্পর্কের ভিতর পারস্পরিক শ্রদ্ধা অনেক। মেঘনাদ ভট্টাচার্য আমার লেখার পাঠক। এমন পাঠক অর্জন একজন লেখকের স্থায়ী অর্জন।
দামিনী হে নাটকের রিভিউ হয়েছিল এক সুখ্যাত পত্রিকায়। সেখানে কাহিনি- কারের ভূমিকাকে খুব খাটো করা হয়েছিল। নাটকের অসম্ভব সুখ্যাতিও হয়েছিল। সমালোচক জানতেন না, ‘আকাল’ গল্পের সঙ্গে অন্য কাহিনি যা মিশেছে, সবই এক লেখকের। সেই রিভিউ পড়ে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। মেঘনাদেরও মনে হয়েছিল লেখককে খামোকা ছোট করা হয়েছে। তবু ওঁর সঙ্গে আমার বাক্য বিনিময় সুশৃঙ্খলতায় হয়নি সেদিন। আমি বোধহয় বলেছিলাম, আমার আর দরকার নেই থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার। খামোকা নিন্দিত হতে যাব কেন? এবং কথাটি অসত্য তো নয়। নাটকের সমালোচনায় কাহিনিকারের গুরুত্ব ছোট করে দেখা হবে কেন? আমি আর থিয়েটারে আমার গল্প বা উপন্যাস দেব না। ঠাণ্ডা মাথার মেঘনাদ ভট্টাচার্য চুপ করে শুনেছিলেন। প্রত্যুত্তর দেননি। আমাকে ভালবাসেন আমার লেখাকে ভালবাসেন, তাই চুপ করে ছিলেন। তারপর অবশ্য সমালোচক একটি চিঠি দিয়েছিলেন ঐ পত্রিকায়। তা ছাপা হয়েছিল। এই ঘটনা ব্যতিক্রমী বলেই চিহ্নিত মনে হয়। ওখানেই ইতি হয়েছিল মতান্তরের। কিন্তু আরো পরে তাঁর সেই সমালোচনা তিনি ছেপেছিলেন এক সংকলনে, তাতে চিঠিটি ছিল না। আমার বিরক্ত লেগেছিল। অবশ্য এর পরে বহুল প্রচারিত একই সংবাদপত্রে ঐ নাটকের দুটি রিভিউ প্রকাশিত হয়, তার একটিতে সাহিত্যের এক প্রখ্যাত প্রাক্তন অধ্যাপক-সমালোচক গলপকারের নামই উচ্চারণ করেননি। আমি আর এই নিয়ে কথা বলিনি। মনে হয়েছিল ওঁর উচ্চারণ-অনুচ্চারণে কীই বা হতে পারে? প্রতি বিজ্ঞাপনে সায়ক আমার নাম ব্যবহার করে। সায়ক আমাকে প্রতি বিজ্ঞাপনেই যেন আমাকে সম্মানিত করে। প্রতি শো আরম্ভ হয় লেখক এবং নাট্যকারের নাম উচ্চারণ করে। এ খুব বড় পাওয়া। তবে একটা কথা উচ্চারণের প্রয়োজন, গল্পের নাট্যরূপ আর নাটক লেখা এক নয়। সমালোচক এই কথা কি জানেন না? জানেন নিশ্চয়। তবু কেন…? শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে ৮০-র দশকের প্রথমে একটি নাটক হয়েছিল, বিখ্যাত এক নাট্যদল প্রথম দুয়েকটি শো-এর পর আর তাঁর নাম উচ্চারণ করত না। অদ্য শেষ রজনী নাটক এর বিজ্ঞাপন তারই বিপরীত। শ্যামল সেখানে বারংবার উচ্চারিত, বিজ্ঞাপনে এবং নাট্যারম্ভে। ব্রাত্য বসু শ্যামলদার অসম্ভব অনুরাগী। তাই সেই তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগের সেই বিষাদের অবসান ঘটেছে। আমিও যে শ্যামলের অন্ধ অনুরাগী। তখন আমারও খুব খারাপ লেগেছিল। আমার একটি গল্প নিয়ে পরম শ্রদ্ধেয় এক নট ও নির্দেশক একটি নাটক করেছিলেন। ২৫-৩০টা শো হয়েছিল। এখন হয় কি না জানি না। রবীন্দ্র সদন মঞ্চে দেখতে গিয়েছিলাম এক আত্মজনকে নিয়ে। পোস্টার থেকে নাট্যারম্ভ-কোথাও আমার কথা বলা হয়নি। বিষণ্ণ হয়ে ফিরে এসেছিলাম। আমার আত্মজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কই তোমার নাম তো কোথাও নেই। কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রর অশ্বচরিত নাটকে আমি ছিলাম প্রতি শো আর বিজ্ঞাপনে উচ্চারিত। লেখকের প্রাপ্তি তো এইটুকু। মঞ্চে থাকেন অভিনেতা। লেখক পর্দার আড়ালের মানুষ, যেমন নির্দেশক, আলো ও মঞ্চ শিল্পী এবং নাটককার।
দামিনী হে নাটকে বহুদিন বাদে বাংলা থিয়েটারে নিম্নবর্গের মানুষের জীবন এসেছিল। অসম্ভব ভালো নাটক এবং প্রযোজনা। কোথাও কোথাও আমার ‘না’ ছিল বটে, কিন্তু গল্প উপন্যাস আর নাটক তো এক নয়। আলাদা মাধ্যম। সুতরাং অদল বদল হয়। শিল্পী সুবোধ দাশগুপ্তর পৌত্রী, সুরঞ্জনা-কন্যা কথাকলি দেব অভিনয় করেছিলেন মনে রাখার মতো। মেঘনাদ ভট্টাচার্য নিজে উঁচু দরের অভিনেতা। তিনি অভিনয় করিয়ে নিতেও জানেন। পিঙ্কি বুলির দুই কন্যা কিংবা দামিনী হে নাটকের দামিনী বা জাবালির অভিনয় আমার মনের ভিতরে স্থায়ী আসন পেতে আছে। মেঘনাদ এ পর্যন্ত আমার গল্প নিয়ে তিনটি নাটক নির্মাণ করেছেন। ভেবেছিলাম এখানেই থামবেন। গত বছর, ১৪২৩ বঙ্গাব্দের শারদীয় বর্তমান পত্রিকায় একটি উপন্যাস লিখেছিলাম ‘পুনরুত্থান’। পড়তে অনুরোধ করেছিলাম। পড়ে গভীর রাতে ফোন করেছিলেন। দিন পনের বাদে আবার ফোন, পুনরুত্থান নিয়ে ভাবছেন। নাটক হবে আবার। সেই নাটক লেখা হচ্ছে চন্দন সেন মহাশয়ের হাতে। হয়তো হবে। নাটক কোন ফর্মে হবে, দৃশ্য বিন্যস্ত হবে কীভাবে, তা একদিন ফোনে আমাকে শোনালেন মেঘনাদ। ৪০ মিনিট ফোন। এই নাটক যদি ঐ ফর্মে আসে মঞ্চে, মেঘনাদের হাতে তা অন্য মাত্রায় পৌঁছবে। আমার বিশ্বাস তাই। কিন্তু শেষ অবধি পুনরুত্থান নিয়ে আমি কিছু আপত্তি জানিয়েছিলাম। মেঘনাদ সেই কথায় মান্যতা দিয়েছেন। পুনরুত্থান, আমার চার কাহিনি মঞ্চে নিয়ে এসেছেন মেঘনাদ। বিরল সম্মান। এমন কি হয়েছে আগে কারোর? থিয়েটারের আমি ছিলাম শুধুই দর্শক, এখন তার অংশ হয়েছি এই ভাবে। মেঘনাদ ভট্টাচার্যর সঙ্গে আমার বন্ধুতা চিরজীবী হোক। সায়ক আমাকে শিশিরকুমার সম্মান দিয়েছে। নাট্য দলের কাছ থেকে একজন গল্প উপন্যাসের লেখক সম্মানিত হচ্ছেন, এও প্রায় বিরল ঘটনা। তবে সায়ক তা আগেও করেছে। বিমল কর এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে এই সম্মান দিয়েছিল। সাহিত্যের কাছেই সায়ক বারবার যায় নাটকের সন্ধানে। মেঘনাদ যান। কারণ তিনি সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক। নমস্কার মেঘনাদ। বড় নট, নির্দেশক আমার বন্ধু, এও এক দুর্লভ পাওয়া।
