উত্তর কলকাতায়।
কলকাতার যেখেনে খুব থিয়েটার হয়, রংমহল হল কি কাছে?
হ্যাঁ, কেন?
আপনার ভাই, থিয়েটার পাগল, সে বলে আবার একবার গিয়ে হাতিবাগানে থিয়েটার দেখবে।
সেই ব্যক্তি আমারই বয়সী। অনেক বছর আগে কলকাতায় এসে একবার রংমহল থিয়েটারে কোনো একটি নাটক দেখেছিলেন। এখনো আশা করে আছেন কলকাতায় এসে দেখবেন জহর রায়, হরিধন বন্দ্যোপাধ্যায়, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়দের কমেডি।
আমাদের বাড়িতে অনেক নাট্যপত্র আসত। এপিক থিয়েটার, গন্ধর্ব, সুত্রধর, নাট্য পাক্ষিক, বিংশ শতাব্দী… আরো কী কী যেন। কোন একটা সময়ে আমি এপিক থিয়েটার শারদীয় সংখ্যায় পড়ি উৎপল দত্তের মানুষের অধিকারে। সে এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। নাট্যপত্রগুলি আমি পড়তাম। আমাদের বাড়িতে ছেলেবেলা থেকেই নাটকের লোক আসতেন। পার্থপ্রতিম চৌধুরীকে ছেলেবেলা থেকে দেখেছি। যখন কলেজে সেই সময়ে বোধ হয় ‘চাকভাঙা মধু’ লেখা হয়। একদিন পার্থদা এলেন। সমস্ত রাত তাঁরা হয়তো সেই নাটক পাঠ আর আলোচনা করেছিলেন। আমার প্রবেশাধিকার নেই। সেই নাটক এক্ষণ পত্রিকায় ছাপা হলে আমি পড়লাম। সঙ্গে হাসান আজিজুল হকের ‘জীবন ঘষে আগুন’। সেই নাটক করলেন থিয়েটার ওয়ার্কশপ, বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, মানিক রায়চৌধুরী, রাম মুখোপাধ্যায় এবং মায়া ঘোষ। মানিক রায় চৌধুরীর কথা খুব মনে পড়ে। খুব শক্তিমান অভিনেতা ছিলেন। অল্প বয়সে চলে গেছেন। ‘পাঁচু ও মাসি’ নাটকে মানিকদার অভিনয় এখনো মনে আছে। ‘চাকভাঙা মধু’তে জোতদার অঘোর ঘোষের ছেলে শঙ্করও অসামান্য। থিয়েটার ওয়ার্কশপ ‘চাকভাঙা মধু’র আগে করেছিল মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাজরক্ত’। ‘রাজরক্ত’ দেখা ছিল এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। মোহিত চট্টোপাধ্যায় আমার প্রিয় নাটককার। মৃত্যু সংবাদ, ক্যাপ্টেন হুররা তো পাঠ্য নাটক। নক্ষত্র করেছিল এই দুই নাটক। শ্যামল ঘোষ ছিলেন কারিগর। কত কম বয়সে মোহিতদার কিমিতিবাদী নাটক ‘গন্ধরাজের হাততালি’ দেখেছিলাম, ঋতায়ন করেছিল এক রবিবার সকালে রংমহলে। সত্তর দশক বিদ্রোহের দশক। নাটকের দশক। বিদ্রোহ ছিল সেই সব নাটকেও। চেতনার মারীচ সংবাদ, ও লু সুনের গল্প অবলম্বনে জগন্নাথ নাটক নিয়ে এসেছিল বাংলা নাটকে নতুন বাঁক, বিশেষত মারীচ সংবাদ। সাম্রাজ্য বাদের বিরুদ্ধে এই নাটক সেই সময়কে চিহ্নিত করেছিল। কী সমস্ত নাটক দেখেছি, পিপলস লিটল থিয়েটারের টিনের তলোয়ার, তীর, মধুসূদনের প্রহসনে উৎপল দত্ত, একেই কি বলে সভ্যতা, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ… অসিত বসু করেছিলেন ‘কলকাতার হ্যামলেট’ চাকভাঙা মধুও ছিল বাংলা নাটকের এক বাঁক। এর পর থিয়েটার ওয়ার্কশপ দুটি নাটক নরক গুলজার, অশ্বত্থামা…। আর নতুন হল রঙ্গনায় নান্দীকার চেকভ থেকে মঞ্জরী আমের মঞ্জরী, গ্রেট অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়… জমি বাগান কিনে নিতে নিতে উরুতে চড় মারতে মারতে উল্লাস প্রকাশ…। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দেখা এই জীবনের পরম সৌভাগ্য। শের আফগান, ভালো মানুষ, তিন পয়সার পালা, যখন একা, নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র, খড়ির গণ্ডী… তখন গোটা কলকাতা নান্দীকার এবং বিদেশী নাটকে ভেসে গিয়েছিল। দূর মফস্বল থেকেও মানুষ আসত নাটকে। চারদিকের ভয়ানক অবস্থায় নাটকের ভিতরেই যেন পরিত্রাণ খোঁজা। অজিতেশ, কেয়া চক্রবর্তী, রুদ্রপ্রসাদ…। তিন পয়সার পালা এবং ভালোমানুষ নাটকে কেয়া চক্রবর্তীর অভিনয় তো ভুলিনি। শান্তা এবং শান্তা প্রসাদ। নান্দীকারের হে সময় উত্তাল সময় কিন্তু তেমন সফলতা পায়নি, দেখেছিলাম। পরে অজিতেশ নান্দীমুখ নাট্যদল করে তলস্তয়কে মঞ্চে এনেছিলেন, পাপ পুণ্য। গ্রেটনেস বোঝা গিয়েছিল সেই নাটকেও। কেয়া চক্রবর্তীর অভিনয় সুষমার কথাও এখন মনে পড়ে। বছর ৪৫ আগের কথা সব। বিভাস’দা থিয়েটার ওয়ার্কশপ ছেড়ে অন্য থিয়েটার করলেন, মৈমনসিংহ গীতিকা নিয়ে মাধব মালঞ্চী কইন্যা করেছিলেন আটের দশকে।
আমি ‘মৃত্যুর চোখে জল’ নাটক দেখিনি, পড়েছি। নাটক পাঠ আমার পুরনো অভ্যাস। রক্তকরবী, ডাকঘর ও বিসর্জন আমি মাঝে মধ্যে পড়ি সাহিত্য পাঠের মতো করেই। আমার প্রিয় পাঠ চাঁদ বণিকের পালা। কতবার পড়েছি। পড়েছি এবং ইন্দ্রজিৎ, যা নেই ভারতে, অশ্বত্থামা, কিনু কাহারের থেটার, পরবাসও। মনোজ মিত্রের নাটকে সাহিত্যগুণ আছে। মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক পড়তে হয়। মধুসূদনের প্রহসন। দেবাশিস মজুমদারের ‘অসমাপ্ত’ দেখে মনে হয়েছিল একটি ছোটগল্প। ‘তখন বিকেল’ দেখে সেই উপলব্ধি হয়েছিল। কবিতা। নাটকের গল্প, ব্রাত্য বসুর সিনেমার মতো, মনে হয়েছিল উপন্যাস। ফিরে যাই সেই সত্তরে, আমি নাটক লিখব, অভিনয় করব, এইসব ভাবতে ভাবতে চাকরি নিয়ে দূর মফস্বলে চলে যাই। ধীরে ধীরে নাটক লেখার ইচ্ছে অস্তমিত হয় নিজের ভিতরে। গল্প লিখতে মন দিই। কিন্তু কলকাতায় এলে নাটক দেখা বন্ধ হয়নি। নাটক মূলত সংলাপ নির্ভর। কিন্তু মনে হয় সংলাপের ভিতরে কোথাও কি গভীর এক নীরবতাকে রক্ষা করা যায় না? সংলাপ যেন কথা কথা আর কথা না হয়। কথা যেন হল্লা না হয়ে ওঠে। নাটক লিখিনি, কিন্তু আমার গল্পে সংলাপ থাকে অনেক। সংলাপে সংলাপে আমি গল্প লিখেছি। সাতের দশকে সাজানো বাগান তো কিংবদন্তীর মতো হয়ে গেছে। এই সময়ে বালুরঘাটে বসে হরিমাধব মুখোপাধ্যায় করলেন অভিজিৎ সেনের গল্প নিয়ে নাটক দেবাংশী, মহাশ্বেতা দেবীর গল্প নিয়ে জল। আমি কোন নাটক ছেড়ে কোন নাটকের কথা বলব?নীলকন্ঠ সেনগুপ্ত করেছিলেন, প্রেমচাঁদের গল্প নিয়ে দানসাগর। দেবাশিস মজুমদারের নাটক। মনে আছে। শাঁওলি মিত্রর একক অভিনয়ে নাথবতী অনাথবত। মহাভারতের অসামান্য এক বিনির্মাণ ছিল তা। নয়ের দশকে দায়বদ্ধ, দুই হুজুরের গল্প চন্দন সেনের নাটক, বিভাস চক্রবর্তী করেছিলেন শ্বেতসন্ত্রাস… আসলে আমার নাটক দেখা সুখস্মৃতিতে পূর্ণ। মনে পড়ছে উইংকিল টুইংকিল, ব্রাত্যর নাটক, দেবেশের নির্দেশনা। ওই নাটক একটি বাঁক ছিল। স্থবির সময়ে আঘাত ছিল। ভাল নাটক দেখেছি অনেক। লিস্ট করতে গেলে দীর্ঘ হয়ে যাবে । আর সেই ভাল নাটকের দিন এখনো রয়েছে। সাম্প্রতিক নাটকের তালিকাও দীর্ঘ। আমি বলছি বিজয় তেন্ডুলকারের নাটক কন্যাদানের কথা। জীবনের এক আশ্চয ভাষ্য তা। অভিনয়ের শীর্ষে পৌঁছন এখানে ব্রাত্য, মেঘনাদ আর…। সাম্প্রতিক নাটকের ভিতরে শান্তিপুরের এক নাট্যদলের নাটক গন্ধজাল যেমন আছে, আছে মিনারভা রিপারটরির দেবী সরপমস্তা, আছে ফাগুন রাতের স্বপ্ন, সিনেমার মতো, বোমা, মুম্বই নাইটস, তুঘলক, রক্তপুষ্প…। ব্রাত্য, কৌশিক, দেবেশ, অর্পিতা, তরুণ প্রধান, দেবাশিস রায়, তাঁদের আগে কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের কিশোর সেনগুপ্ত…, রস নাটক করেছেন কৌশিক কর…, অর্পিতা আর সুজন মুখোপাধ্যায়কে দেখেছি, ‘আপাতত এইভাবে দুজনের দেখা হয়েছিল’। আলাদা নাটক। অনাটকীয় নাটক। এমনি বহুজন থিয়েটারকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। …কত অভিনেতা অভিনেত্রী, পরিচালক, গ্রিনরুমের ভিতরে থাকা নাট্যকর্মী, এইসব নিয়ে থিয়েটার। সদর এবং মফস্বল দুইই এখন সক্রিয়। বিলাসীবালা করেছেন আশিস দাস, কর্নেল’কে কেউ চিঠি লেখে না, আশিস চট্টোপাধ্যায়। এখানে আলস্যের কোনো জায়গা নেই। যিনি গল্প লেখেন, উপন্যাস লেখেন, তিনি আসলে অলস এক ব্যক্তি। তাঁর দ্বারা নাটক হয় না। কিন্তু নাটকে তাঁর আগ্রহ প্রবল, বাড়িতে তো নাটক ছাড়া কথা নেই, সেই মৃত্যুর চোখে জল থেকে। আমাদের ঠাকুরদা ওই নাটকের বঙ্কিম। আমি যে লিখিনি তা নয়। নিজের গল্প কুলছুমের হাত ও আসনবনি রেডিও নাটক করে দিয়েছিলাম। টিভির স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম কয়েকটি গল্পের। আমার উপন্যাস এবং গল্প নিয়ে নাটক হয়েছে। আমি এতে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছি। কেন না জীবনে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখে বসে আছি, কেউ নেননি, মানে হয়নি।
