ছেলেবেলা কেটেছে দণ্ডীরহাট নামের একটি গ্রামে বেশ কিছুদিন, পরে বেলগাছিয়া। দণ্ডীরহাট গ্রামটি ছিল থিয়েটার আর খেলা, দুয়েই পাগল। পাশে একটি বিল জমি পেরিয়ে ধলতিথা। বিভূতিবাবুর পথের পাঁচালী উপন্যাসে ধলতিথার কথা আছে। ধলতিথা পেরিয়ে পানিতরে তাঁর প্রথম বিবাহ। থাক, দণ্ডীরহাট গ্রামের থিয়েটারের কথা বলি। আমি তখন কত হবো, বছর সাত-আট, মা-কাকিমাদের সঙ্গে গিয়ে প্রথম অসামান্য এক থিয়েটার দেখি, ডি.এল.রায়ের শাজাহান। শাজাহানের ভূমিকায় ছিলেন আমাদের গ্রামের অতিমান্য এবং শ্রদ্ধেয়জন, সুধীর বসু। তিনি ওই গ্রামের পোস্টমাস্টার ছিলেন। তাঁর ভাই সূরথবাবু ছিলেন স্থানীয় স্কুলের হেড মাস্টার, থিয়েটার সাহিত্যে উৎসাহী। সেই শাজাহান নাটকে জাহানারার ভূমিকায় ছিলেন মমতা চট্টোপাধ্যায়, সেই আমলের এক বিখ্যাত অভিনেত্রী। দারার ভূমিকায় শ্যামল ঘোষ, দিলদার মনোজ মিত্র। মনোজ মিত্রই হয়তো এই আয়োজন করেছিলেন। মনে আছে শাজাহান এবং জাহানারার হাহাকারের কথা, দূরে তাজমহলের মাথায় পূর্ণচন্দ্র। সিন আর গ্লোব আলো দিয়ে তা ফোটানো হয়েছিল। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে কয়েকদিন কেটেছিল। যাঁকে নিত্য দেখি তিনি কীভাবে মঞ্চে শাজাহান হয়ে গেলেন। সেই প্রথম দেখা এখনো অবিকল মনে আছে। আমাদের ওই গ্রামে তরুণ ভট্টাচার্য নামে এক যুবক ছিলেন থিয়েটার আর বই পাগল। আমি ক্লাস সিক্স এবং সেভেন ওই গ্রামের ইস্কুলে পড়েছিলাম। তারপর পালিয়ে কলকাতা চলে আসায় কলকাতার বাসা বাড়ি বেলগাছিয়ায় ফিরে এলাম। কিন্তু ঐ দুবছরেই তরুণ’দা আমাকে থিয়েটার আর বই পড়ায় দীক্ষিত করেন। দণ্ডীরহাট গ্রামের বসু জমিদারদের রেখে যাওয়া বাড়িতে ছিল বড় এক পাঠাগার। সেই পাঠাগার ছিল তরুণ’দার দায়িত্বে। এ ব্যতীত তিনি ছিলেন পোস্ট অফিসের ডাক পিয়ন। চিঠি বিলি করতেন। সাব পোস্ট অফিসের অনেক কাজই করতেন। চিঠিতে সিল মারা, ডাকের থলেতে ভর্তি করা। হরকরার চিঠি রিসিভ করা… সব। আড়াইটে অবধি হয়তো এই কাজ, তারপর লাইব্রেরি। আমাকে হেমেন্দ্রকুমার রায় থেকে দীনেন্দ্রকুমার রায়ের রবার্ট ব্লেক, অনুবাদে অলিভার টুইস্ট, এ টেল অফ টু সিটিজ, হ্যাঞ্চব্যাক অফ নতরদম…। কত বই দিয়েছেন। তাঁর উচ্চাশা ছিল বড় অভিনেতা কিংবা থিয়েটার পরিচালক হবেন। গ্রামের বালকদের নিয়ে প্রায়ই তিনি থিয়েটারের আয়োজন করতেন। আমার প্রথম অভিনয় সুনির্মল বসুর কিপ্টে ঠাকুরদা নাটকে। ঠাকুরদা হয়েছিলেন তরুণদা।… … …। নিজেরাই স্টেজ বেঁধেছি হরিতলায়, হ্যাজাগ ভাড়া করা হয়েছে চাঁদা তুলে। রাত আটটায় অভিনয় আরম্ভ। মা-কাকিরা হেরিকেন নিয়ে থিয়েটার দেখতে হাজির। হঠাৎ হঠাৎ থিয়েটারের নেশা জাগত। পাঠ্য পুস্তক কিশলয় বা পাঠসঞ্চয়নের নাট্যাংশ নিয়ে নিজেরা রিহার্সাল আরম্ভ করতাম। অমল ও দইওয়ালা, হলদিঘাটের যুদ্ধ এসব আমরা বালকেরাই করতাম। দুটি পরপর অভিনয় হচ্ছে। এমন নাটক পাগল গ্রাম আর দেখিনি। আমি তো সমস্ত জীবনে কম গ্রাম ঘুরিনি। কোথাও দেখিনি। কিশোর বালকেরা থিয়েটার করছে, তা দেখতে রাতের বেলা গাঁ ভেঙে পড়ছে প্রায়, আশ্চর্য লাগে এখন। আমিও ছেলেবেলায় অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। প্রায়ই নেমে পড়তাম নাটক নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের প্রহসন ছাত্রের পরীক্ষায় ছাত্র হয়েছি, আরো কী কী যেন অভিনয় হয়েছিল। হ্যাঁ, তরুণদাকে নিয়ে আমি একটি উপন্যাস লিখেছিলাম, মালতী মাধব। ডাকপিয়ন তরুণদা ছিলেন সেখানে অলৌকিক হয়ে। বেনামে চিঠি লিখে ডাকপিয়ন ডাকঘরের সিল মেরে সেই চিঠি যাকে গোপনে ভালবাসতেন, তার কাছে পৌঁছে দিতেন।
কলকাতায় তখন রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ইস্কুলে পাড়ায় রবীন্দ্রনাটক করার রেওয়াজ ছিল। বাড়ির ছাদেও মঞ্চ বেঁধে অভিনয় হতো ছাত্রের পরীক্ষা, পেটেও পিঠে…। ইস্কুলে আমি মুকুট নাটকে হয়েছিলাম ধুরন্ধর। প্রাইজ পেতে পেতে পাইনি। রাজধর যে হয়েছিল, সে পেয়েছিল। পরিবারে দেখেছি অগ্রজ নাটক নিয়ে থাকেন। ঠাকুরদাকে নিয়ে মৃত্যুর চোখে জল নাটক লিখে তাঁর নাম হয়েছে। তখন ক্লাস ফাইব, আনন্দ- বাজারে নবনাট্য আন্দোলন নিয়ে লিখতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী। দাদাকে নিয়ে লিখেছিলেন তিনি। ছবি সমেত সেই লেখা বেরিয়েছিল, পরম বিস্ময়। সুতরাং আমি নাটক লিখব এবং অভিনেতাও হবো, এই ছিল সুপ্ত বাসনা। ক্লাস এইটে ঋতায়ন নাট্যদলের ‘নীলা’ নাটকে আমি বড় একটি রোল করেছিলাম। আনন্দ। আনন্দবাজার নাট্য সমালোচনায় লিখেছিল, ‘বাবুজি মিত্রের আনন্দ নিরানন্দ নয়। ‘বাবুজি’ আমার ডাক নাম। নীলার দুটি অভিনয়ে আমি ছিলাম, মিনার্ভা ও থিয়েটার সেন্টারে। মিনার্ভায় অভিনয় করতে গিয়ে দেখেছিলাম কল্লোল নাটকের জাহাজের সেট। এখন মনে পড়লে শিহরিত হই। আমি কল্লোল দেখিনি। কত নাটক দেখিনি, কত বই পড়িনি, এমন তো হয়েই থাকে। ক্লাস ইলেভেনে ‘বিনি পয়সার ভোজ’ – অক্ষয়বাবুর সেই স্বগত কথনে আমি চরিত্র বসিয়ে নাটক বানিয়ে মঞ্চায়িত করলাম বন্ধুদের নিয়ে। আমিই অক্ষয়বাবু। এরপর কলেজ। তখন গল্প লেখা চলছে আর নাটকও। পাড়ার একাঙ্ক নাট্য প্রতিযোগিতায় নাটক নিয়ে নামলাম, পার্থপ্রতিম চৌধুরীর একাঙ্ক। আমি অভিনেতা এবং নির্দেশক। কিছু হলো না। খেলনা পিস্তলকে রিভলবার বানাতে আলকাতরা দিয়ে কালো করেছিলাম। সিল্কের পাঞ্জাবির পকেটে সেই পিস্তল আটকে গিয়েছিল। লাইটম্যান মঞ্চটাকে ভুতুড়ে করে দিয়েছিল। চরিত্রদের দেখাই যাচ্ছিল না। কলেজ ছিল স্কটিশ চার্চ। নাটকে সাহিত্যে সেই কলেজের কত সুখ্যাতি। আমি কেমিস্ট্রি অনার্স। যে উদ্দেশে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, তা সফল হলো না। বার্ষিক অনুষ্ঠানে ঋত্বিক ঘটকের ‘জ্বালা’ অভিনয় হবে, গেলাম যদি একটা চান্স হয়। পেলাম না। গল্প দিলাম কলেজ ম্যাগাজিনে, নির্বাচিত হলো না। নাটক আর গল্প লেখার জন্য স্কটিশে ভর্তি হয়ে কোনোটাতেই সুবিধে হলো না। আর রেজাল্টও খারাপ হলো। স্কটিশ চার্চ কলেজে তখন কেয়া চক্রবর্তী পড়াতেন। দূর থেকে দেখতাম। কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল ও নিশীথ ভড়ের তখনই খুব নাম। এত অতি সাধারণ হয়ে কলেজ ত্যাগ করেছিলাম যে কলেজের শতবর্ষ উৎসবেও আমার ডাক আসেনি। কিন্তু আমার মাথায় নাটক আর সাহিত্যের ভূত হয় তো স্কটিশ চার্চ কলেজই দিয়েছিল। বাংলাদেশ নিয়ে তরুণ সান্যালের বক্তৃতা এখনো স্মৃতিতে অমলিন। কত ডিবেট, সাহিত্যের অধ্যাপক- দের সেমিনার, আমি রসায়নের ছাত্র, একাই শুনতাম। সত্তর দশক। নক্সাল আন্দোলন, জেলখানায় সহপাঠী বন্ধুরা, বাংলা নাটক তখন প্রতিবাদের মুখ। আমি তখন থেকে নাটকের পোকা। নাটক দেখছি সুযোগ পেলেই। মনে পড়ে এবং ইন্দ্রজিৎ দেখতে দুপুরে মুক্তাঙ্গনে গিয়ে টিকিট কেটেছি, সময়ে এলে যদি টিকিট না পাই। চারঘন্টা অপেক্ষা করেছি একা একা। তারপর নাটক দেখে ২ নম্বর ডাবল ডেকার বাসে চেপে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। তখন টিউশনি ভরসা। সেই সময়ে আমি নাট্যরূপ দিলাম চেকভের গল্প। মুখোস। সেই নাটক সূত্রে এক বন্ধু হলো, তার নাম গৌতম লাহিড়ী। পাইকপাড়ায়, দু’নম্বর বাস স্ট্যান্ডের কাছে থাকতেন, গণেশ মুখোপাধ্যায়ের নাট্যদল শ্রীমঞ্চে অভিনয় করতেন। গৌতম আমার ওই চেকভের গল্পের নাটক চেষ্টা করলেন মঞ্চে আনার। হলো না। কিন্তু সে ছিল থিয়েটার নাটকে নিবেদিত প্রাণ। তার সঙ্গে আমার নাটক দেখা শুরু হলো। সেই সময়, আমাদের বাংলা নাটকের স্বর্ণ যুগ। বহুরূপী, লিটল থিয়েটার গ্রুপ, শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্তর পরের প্রজন্ম প্রবেশ করেছেন, তাঁদের পরের প্রজন্মও। উত্তর কলকাতায় রঙ্গনা থিয়েটার হল হলো। আর পুরোন ব্যবসায়িক থিয়েটার তখনো রমরম করে চলছে। জনপ্রিয় সাহিত্যের নাট্যরূপ দিয়ে নাটক হতো বিশ্বরূপা, স্টার, রংমহল থিয়েটার হলে। এখানে চলচ্চিত্রের প্রবাদ প্রতিম অভিনেতারা অভিনয় করতেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, হরিধন মুখোপাধ্যায়, অজিত চট্টোপাধ্যায়দের আমি এখানেই দেখেছি অভিনয় করতে। উত্তমকুমারের শ্যামলী নাটকের কথা শুনেছি, তখন আমাদের খুব কম বয়স, দেখিনি। হাতিবাগানের থিয়েটার পাড়া ছিল আমাদের সত্যিকারের গর্ব। শুনুন এক কথোপকথন, বাংলাদেশের খুলনা জেলার এক গৃহবধূ আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। দীপালি মণ্ডল। তিনি একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, দাদা আপনার বাড়ি কোথায়?
