যেই সব শেয়ালেরা জন্ম জন্ম শিকারের তরে
দিনের বিশ্রুত আলো নিভে গেলে পাহাড়ের বনের ভিতরে
নীরবে প্রবেশ করে-বার হয়—চেয়ে দ্যাখে বরফের রাশি…।
(সেই সব শেয়ালেরা )
যে জন্মায় শিকারের তরে তার হিংস্রতা বুঝলাম, কিন্তু মানুষ যখন শৃগালের স্বভাব অর্জন করে, তা হয়ে ওঠে সমাজের কাছে বিড়ম্বনাময়। আর তার ভিতর দিয়েই সমাজ-জীবন অতিবাহিত হয় সভ্যতার আদি থেকেই। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, মানুষের সঙ্গে তথাকথিত ইতর প্রাণীর তুলনায় বনের পশুকে ছোট করা হয়। কিন্তু আমাদের তা ছাড়া আর উপমেয় কিছু নেই, যা দিয়ে সহজ সত্যকে বোঝা যায়। বনের পশুর হিংস্রতা দেখায় সাঙ্ঘাতিক। তাই সে এমন ভাবে উপমিত হয়ে যায়। মানুষ যা তার মনের ভিতরে লুকিয়ে রাখে, সে আর কোন প্রাণী রাখতে পারে?
আকাশে জ্যোৎস্না—বনের পথে চিতা বাঘের গায়ের ঘ্রাণ
হৃদয় আমার হরিণ যেন;
রাত্রির এই নীরবতার ভিতরে কোনদিকে চলেছি?
জীবনানন্দকে আবার স্মরণ করতে হয়। নীরবতা নিশ্চয়। আমি চুপ করে আছি। আপনি চুপ করে আছেন। অথবা আপনি আমি বলছি, বলতে চাইছি। চতুর্দিকের অখন্ড নীরবতা তা গ্রাস করে নিচ্ছে। অথবা হা হা হা হাসি ঢেকে দিচ্ছে আপনার কন্ঠস্বর। কিন্তু আমাদের সেইসব কথা সমাজে, সাহিত্য-শিল্পে ছায়া তো ফেলবেই। গোপনে ফেলিতেছে ছায়া। একটা কথা ঠিক, এই পৃথিবী কখনো কোনো সময়ে কি সংকটমুক্ত হতে পেরেছে? আর একুশ শতকের দেড়টি দশক পার হয়ে গেলে আমরা দেখছি সংকট আরো ঘনীভূত। কী সেই সংকট? ক্ষমতাবানের লিপ্সা কিংবা ক্ষমতার বারান্দায় প্রবেশের নয়। এই অসুখ তো সভ্যতার জন্ম থেকে আছে। আলোর বিপরীতে অন্ধকার। এই একুশ শতক প্রযুক্তির শতক। প্রযুক্তির শীর্ষ বিন্দুতে আরোহন করছে মানুষ। নিত্য নতুন app’s, application-এর সফট ওয়্যার খুঁজে বের করছে বিশেষজ্ঞরা। তার ফলে মানুষের জীবনের গোপনীয়তা অন্তর্হিত হচ্ছে। টেকনোলজি এমন জায়গায় পৌছেছে যে কোনো কিছুই আর গোপন থাকছে না। এই ধরুন একটি app’s দিয়ে আপনি খুঁজে নিতে পারবেন, সে এখন কোথায়। কে? যে কেউ। তার গোপনীয়তা আর গোপন থাকবে না। সবই যদি হয়ে যায় প্রকাশ্য, জীবনের রহস্য থাকবে কী ভাবে? পৃথিবী এখন সেই দিকে যাচ্ছে, আপনার সমস্ত গোপনীয়তা রাষ্ট্রের কাছে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আপনি রাষ্ট্রের নজরবন্দী হয়ে যাচ্ছেন কম্পিউটারে ইন্টারনেট নিয়ে বসে। ফেসবুকের সমস্ত আদানপ্রদানের রেকর্ড থেকে যাচ্ছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে। মহাশক্তিধরের নিকটে আপনার যাপিত জীবন খুলে যাচ্ছে। এই টেকনোলজি হিংসা ছড়ানোর জন্য অতি উপযুক্ত এক মাধ্যম। আবার এই প্রযুক্তি দূর কে নিকট করেছে। বন্ধু দিয়েছে কত। অজানাকে জানার পথ খুলে দিয়েছে কত! ভুবনগ্রাম হয়ে গেছে এই পৃথিবী, বন্ধুতার হাত প্রসারিত করেছে, নারীর মুক্তির একটি জায়গা হয়েছে, নারী তার কন্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে এখানে। এই একুশ শতকে মানুষ যেমন তার মেধার শীর্ষে পৌঁছেছে, তেমনি মানুষ মনে মনে ফিরেছে মধ্যযুগীয় হিংসা আর সাম্প্রদায়িকতায়। আমাদের দেশ এ থেকে মুক্ত নয়। মুক্ত ছিল না কখনো। এখন সাম্প্রদায়িক হিংসা ক্রমশ তার দাঁত-নখ বের করছে। সমাজে তার ছায়া ঘনাইছে ক্রমশ।
সাহিত্যে এর ছায়া তো পড়বেই। টেকনোলজি যে ছায়া ফেলছে, তার ছায়া। সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, মধ্যযুগীয় নরহত্যা এখন নিত্য খবর। এই সংকট থেকে আমরা কি মুক্ত হতে পারব? উনিশ ও বিশ শতক ছিল স্বপ্নের শতক। স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ। মুক্তির স্বপ্ন। অর্জন করেছিল অনেক অধিকার। সবচেয়ে বড় অধিকার ছিল আট ঘন্টার কাজের অধিকার। কর্পোরেট শাসিত এই পৃথিবী থেকে শ্রমিকের আটঘন্টার কাজের অধিকার সুকৌশলে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ যে মুক্তির, তা ভঙ্গ হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি তার ক্ষমতা থেকে সরে গেছে মানুষের কন্ঠস্বর রুদ্ধ করতে যাওয়ার জন্য। আর সবকিছু দখল করার প্রবণতায়। অনেক অধিকার লুন্ঠিত হচ্ছে। হ্যাঁ, সেজ নামক দেশের ভিতরে বিদেশ নির্মাণে কমিউনিস্ট চিন তো সবার আগে। সেই দেশ কেমন রাখে শ্রমিকের অধিকার তা আমাদের অজানা নয়। আমি বলছি আমাদের বাল্যকাল, কৈশোর, যৌবন যে স্বপ্ন নিয়ে কেটেছে, তা ক্রমশ মুছে যেতে লেগেছে বিশ শতকের শেষ দশক আর এই শতকের প্রথম দুই দশকে। আমরা যখন লিখতে আসি, আমাদের ভিতরে ছিল আদর্শ। আমি মানিকে অনুপ্রাণিত হয়েছি। বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, চেখভ পড়েছি, প্রেমেন্দ্র মিত্র পড়েছি, তলস্তয় পড়েছি, দস্তয়েভস্কি পড়েছি, পুশকিন, গোগোল। রুশ সাহিত্য আমাকে শিখিয়েছে লিখতে। লিখতে শেখার সঙ্গে কী লিখতে হবে তাও শিখেছি। সেই শেখা সমস্তজীবন লালন করেছি। নিজ ধর্ম ত্যাগ করিনি। ধর্ম অর্থাৎ আদর্শ। কিন্তু সেই পৃথিবী তো নেই। আদর্শবাদ অলীক। ধীরে ধীরে সমস্ত মুক্তচিন্তার জায়গা ছোট হয়ে যাচ্ছে। আপনি ভেবে দেখুন আমাদের নদী, অরণ্য, পাহাড় দখল করে নিচ্ছে কর্পোরেট। আপনার দেশের উপর আপনার অধিকার হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
মনে করুন, সেই যে আরণ্যকের আদিবাসী রাজা দোবরু পান্না, রাজকন্যা ভানুমতী, তাদের ধনঝরি পাহাড়, তাদের বন… সমস্ত কিছু চলে গেছে রাসবিহারী সিং নামের রাজপুতের পৌত্রের দখলে। ঠিক তার নয়, সেই পাহাড়, অরণ্য লিজ নিয়েছে কর্পোরেট, রাসবিহারী সিং’এর নাতি তাদের এজেন্ট। আরণ্যক উপন্যাসে জঙ্গল মহলে নায়েব গিয়েছিল জমি বন্দোবস্ত দিতে। দরিদ্র ভারতবর্ষের এক চেহারা ফুটে উঠেছিল। কত অল্পতে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। বেঁচে থাকে। মানুষ কত প্রকৃতি মনস্ক। যুগলপ্রসাদ জঙ্গলে বৃক্ষ রোপণ করে। জমি বন্দোবস্ত দিয়ে ফিরে আসার সময় নায়েবের মনে হয়েছিল, সে নিজেই অরণ্য নিধনের সূত্রপাত ঘটিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু বহু বছর বাদে বিভূতিবাবুর দেশে কিন্তু সত্যই ধ্বংস যজ্ঞ আরম্ভ হয়েছে। আমি কী করতে পারি। আমার অসমর্থন রেখে যেতে পারি। কোথায়? আমার লেখায়। মনে করুন, সেই অরণ্যজীবী মানুষগুলিকে মেরে মাটিতে পুতে দিয়েছে রাসবিহারী সিং’এর নাতি। মনে করুন ভানুমতীর কন্যা রূপমতী (উপন্যাসে নেই)র স্বামী জেল থেকে মুক্তি পেল শুধু এই শর্তে, পরদিন তারা ছেড়ে যাবে ধনঝরি পাহাড়ের পাদদেশ। তাদের জন্য সিমেন্ট ফ্যাকটরির কুলি লাইনে ব্যবস্থা হয়েছে। আর ভানুমতীর নাতনি, রূপমতীর কন্যাটি বড় হয়েছে। তার জন্যই তাদের পাহাড় গোড়ায় রাসবিহারী সিং’এর নাতির মোটর সাইকেল বুকবুক করে। অরণ্য পাহাড় না ছাড়লে তাকে তুলে নিয়ে যাবে যে কোনোদিন। কী হয়েছিল তারপর? বহু বছর বাদে এক তৃণগুল্মহীন উষর ক্ষেত্রে চন্দ্রালোকিত রাত্রে একটি মানুষের ছায়া দেখা যায়। সে অনেক বছর আগে এসেছিল জঙ্গল মহলে জমি বন্দোবস্ত দিতে। তারপর কত বছর কেটে গেছে। জমি পড়ে আছে মরুভূমি হয়ে। কর্পোরেট নিয়েছিল। তার আগে জমি সাফ করা হয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম উচ্ছেদ করে। লতাপাতা, বৃক্ষাদি, পাখ-পাখালি, কীট পতঙ্গ সমস্ত কিছু শেষ করে মাটিতে পুতে দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে মানুষ। আদিবাসী রাজা দোবরু পান্নার বংশধরদের। মূল্যবান আকরিকের সন্ধান পেয়েই বহুজাতিক সংস্থা এসেছিল। কিন্তু জমি দখল করে যখন তারা আকরিক উত্তোলন করে, দ্যাখে উঠছে শুধু ক্যালসিয়াম কার্বনেট, মানুষের হাড় মাটির ভিতরে ওই চুনা পাথর হয়ে পড়ে আছে। ফিরে যায় বহুজাতিক। চন্দ্রালোকে অশ্রুপাত করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দেশের জন্য।
আমার নাটক দেখা, নাটকে জীবন দেখা
আমাদের আদি নিবাস, পূর্ববঙ্গের গ্রাম, সাতক্ষীরার কাছেই। ধূলিহর ধুরলের কথা তেমন মনে নেই। তবে বাড়ির একটা কামরায় নাটকের বা যাত্রার সিন থাকত গোটানো তা মনে আছে। সেই সময় নাটক বা যাত্রায় সিন থাকত। নদী, গ্রাম, শহর, তাজমহল, দুর্গ ইত্যাদি। যাত্রা কিংবা থিয়েটার হতো সমস্ত রাত ধরে। শেষ রাত বা মধ্যরাতে সকলে বাড়ি ফিরত। কাজকম্মো সেরে, গৃহবধূ সমেত পরিবার গিয়ে বসত থিয়েটার বা যাত্রার আসরে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে আমোদ। সেই গল্পে ভূমিহীন চাষাটি একদম পেছনে দাঁড়িয়ে, ডিঙি মেরে মেরে কী দেখল, কী দেখল না, সমস্ত রাত কাটিয়ে, বাজনা আবছা শুনে, ডায়ালগ একটু শুনে শুনে রাত পার করে দিল। দেখুক না দেখুক, আমোদ তো হলো। থিয়েটার শেষ হতে ভোর। সে চলল জমিতে। নিড়েন দেবে। সেই দেখা নিয়ে সে কতদিন বুঁদ হয়ে থাকবে। এই অল্পতে খুশি হওয়াই সাধারণের জীবন দর্শন। আর এও মনে হয়, থিয়েটারের দর্শনও তাই। থিয়েটারে মোটর রেসিং নেই, হেলিকপ্টারে করে খল নায়কের পালানো নেই, শতবার পোশাক বদলে নৃত্যগীত নেই, কিন্তু থিয়েটার হাউসফুল। হ্যাঁ, অনেক থিয়েটার দর্শক আনুকূল্য পায় না, সে তো বহু সিনেমাও লোকে দ্যাখে না। না, আমি সিনেমা থিয়েটারের তুলনামূলক আলোচনা করতে আসিনি। থিয়েটার সম্পর্কে আমার জ্ঞান তেমন নয়, সিনেমাও তেমন জানি না। দুটোই নিজের মতো করে দেখেছি অনেক। মনের টানে, নিজের প্রয়োজনে দেখেছি। দেখে ঋদ্ধ হয়েছি। আমার কাছে বই আর থিয়েটার, সিনেমা শ্রেষ্ঠ বিনোদন। বিনোদন শব্দে কোনো আপত্তি দেখি না। কেন না ভিন্ন ভিন্ন রুচির মানুষের কাছে বিনোদনের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। মারীচ সংবাদ, রাজরক্ত বা চাকভাঙা মধু আমাকে মোহিত করেছিল প্রায় বছর ৪৭-৪৮ আগে, প্রযোজনা অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছিল বলেই না বার বার দেখেছিলাম। আমার মনের অনেক চাহিদা আছে। সেই চাহিদা পূরণ করে থিয়েটার ও বই, এবং সিনেমাও। থিয়েটার হলো দৃশ্য কাব্য। আমি তার কথা বলতে চেষ্টা করব।
