এক সাহিত্য সভায় এক তরুণ গল্প লেখক মন্তব্য করেছিলেন, বাণিজ্যিক এক পত্রিকা ব্যতীত ওই সব লিটল ম্যাগাজিনে যা ছাপা হয়, তা নাকি ভিজে ব্লটিং পেপারের মতো লাগে তাঁর কাছে। তিনি সাহিত্যের ইতিহাস জানেন না। গত তিরিশ বছরে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্পগুলির বড় অংশ ধারণ করে আছে লিটল ম্যাগাজিনই। সমরেশ বসু, মহাশ্বেতা দেবী, দেবেশ রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে অনেক বিখ্যাত লেখকের সেরা গল্পগুলি লিটল ম্যাগাজিনেই প্রকাশিত। তালিকা করে দেওয়া যায়। মহাশ্বেতার সেরা নভেল “অপারেশন বসাই টুডু” প্রকাশিত হয়েছিল কৃত্তিবাস পত্রিকায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় “মায়া কাননের ফুল” কৃত্তিবাসেই লেখেন। শ্যামল লেখেন, অগস্ত্যযাত্রা এবং “রূপোকুঠীর পরি” এই দুই উপন্যাস। নবারুণ ভট্টাচার্য’র হারবার্ট প্রকাশিত হয়েছিল প্রমা পত্রিকায়। বিমল কর শেষ জীবনে নিজে সারা দুপুর বসে প্রুফ দেখতেন তাঁর পত্রিকা গল্পপত্র-র। তিনিই সম্পাদক। ভুলতে পারি না সেইসব দিনগুলিকে। গল্পপত্র-এ কে না লিখেছেন, শ্যামল, দেবেশ, মহাশ্বেতা থেকে আমরা সবাই। এখন যাঁরা প্রবীণতার দিকে পা বাড়িয়েছেন, তাঁদের অনেকেই লিটল ম্যাগাজিনেই তাঁদের সেরা লেখাগুলি লিখেছেন যে তা তালিকা করে বলে দেওয়া যায়। তাই যে লেখক বলেন তিনি লিটল ম্যাগাজিনে লিখবেন না, বা লিটল ম্যাগাজিনে ভিজে ব্লটিং পেপারের মতো লেখা ছাপা হয়, তিনি সাহিত্যের ইতিহাস না জেনে কথা বলেন। আমি শুনে আহত হয়েছিলাম। আমি বিশ্বাস করি লিটল ম্যাগাজিনের বিস্ফোরক ক্ষমতায় সময়ের সংকট।
৫০ বছর আগে পাওয়া যেত না তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাস। আমি কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে একটি পুরনো বই পেয়েছিলাম। সেই আমার প্রথম তিতাস পড়া। এখন তিনি স্বমহিমায় জ্বলজ্বল করছেন। কত প্রকাশক ছেপেছেন তিতাস। সতীনাথ ভাদুড়ীর বইও তখন অমিল ছিল। সময় বাঁচিয়ে তুলেছে তাঁকে। তখন তাঁকে পড়ত না বাঙালি পাঠক, এখন তাঁকে না পড়লে সাহিত্য ও জীবনের অনন্য সৌন্দর্য অনুভব করা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। সময়ের এই সংকট থাকে। সময় অনেক সময় চিনতে পারে, অনেক সময় পারে না। যাঁকে পারে, তিনি ভাগ্যবান। যাঁকে পারে না, তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মহাযাত্রায় যান। কিন্তু এও পুরো সত্য নয়। মানিকের আলো চেনা গিয়েছিল। কিন্তু মানিককে বঙ্গবাসী বই কিনিয়ে পাঠককূল সেই ভাবে চেনেননি। জনতা পাঠকই বা চিনবেন কেন? মানিক যা লিখেছিলেন, তার পাঠক এবং রমা ও মোহনের পাঠক নিশ্চিত ভাবে এক নয়। সকলের জন্য নয়, তিনি লিখেছেন দীক্ষিত পাঠকের জন্য। সাহিত্য-শিল্প শুধু মাত্র বিনোদন নয়। কোনো শিল্প কর্মই তা নয়। আবার এখন বিনোদনের নানা মাধ্যম। তা সাহিত্যে থাবা মারছে। বইয়ের পাঠক কমছে। কিন্তু একটি কথা বলার থাকতে পারে টেলিভিশনের জন্য কি ভাল থিয়েটার সিনেমার দর্শক কমেছে? টিভি সিরিয়াল দেখা আর শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কুবেরের বিষয় আশয় পড়া এক ঘটনা নয়। এমনিতে পৃথিবী জুড়ে সিরিয়াস সাহিত্যের পাঠক কমেছে হয় তো। জনগণেশের সাহিত্য যাঁরা করেন, তাঁদের কন্ঠস্বর উচ্চ হয়েছে। চিরকাল তা উচ্চই ছিল, এখন আরো বেড়েছে।
সময়ের এই সংকট নিহিত আছে সমাজে। কোন সমাজ? যে সমাজ আমাদের লালন করছে। অথবা আমরা যে সমাজকে গড়ে তুলেছি আমাদের গ্রাম-শহরে। আমাদের প্রতিবেশি আমাদের স্বজন-পরিজন নিয়ে। সেই সমাজ অনুমোদন করে ক্ষমতাকে। ক্ষমতা কী ভাবে আসে? কী ভাবে ক্ষমতা গ্রাস করে সমস্ত কিছু তা অতি বিশদে বলার দরকার আছে কি?
এখন আমি বুঝে নিতে চাইছি, সময়ের সংকট আসলে কী? সমাজ ও সাহিত্যের সঙ্গে সে কী ভাবে অন্বিত হয়ে আছে। মনে হয় ক্ষমতার দিকে মানুষের অন্তহীন যাত্রাই সমস্ত সময়ের সংকট। সমাজ ও সাহিত্য এই ক্ষমতার দ্বারাই দূষিত হয়। ক্ষমতা কী করতে পারে? ক্ষমতা কাউকে লেখক করে দিতে পারে কিছুদিনের জন্য। তারপর আরেকজনকে ধরে। আরো এমন উঠে আসে। তার হয়ে বিদূষকরা চিৎকার করতে পারে। আমি আমার এই এতটা জীবনে তেমন দেখেছি কম নয়। ক্ষমতা কু-সাহিত্যকে সাহিত্য বলে চালিয়ে দিতে পারে। তার চাপে সৃজনশীল লেখক আড়ালে চলে যান। সতীনাথ ভাদুড়ী চিরজীবন অচেনা হয়েই থাকেন। কাহিনির পর কাহিনি, তার উপর যে গোদা কাহিনি তার ভার কম নয়। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর মতো লেখক অপ্রকাশিত হয়ে থাকেন দীর্ঘদিন। তাঁর শতবর্ষ চলে যায় নিঃশব্দে। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে, ক্ষমতার অধীশ্বরের ছায়ায় থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব হয়। না থাকলে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো নীরবে চলে যেতে হয়। হ্যাঁ, তরুণ লেখকরা তাঁকে ঘিরে ছিল সন্তানেরা যেমন থাকে পিতার প্রয়াণে। আমি মনে করি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে লেখকের সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। তিনি তো ক্ষমতার বিরুদ্ধেই লেখেন। শুধু একটি কথা বলতে হয়, ক্ষমতা নিরংকুশ হয় না। ক্ষমতা যেখান থেকে আসে তাকে মনে রাখতে হয় অবৈধ ক্ষমতাকে ধারণ করার জন্যই তার আত্মনিবেদন। ক্ষমতার অবৈধ অর্জন কী? যা চলতি কথায় ফোকটে পাওয়া। ফোকটে পাওয়া ব্যাপারটা কী? অনুপার্জিত ধন অর্জন করা। অনুপার্জিত টাকা। আমি আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে একটি উপন্যাস লিখেছিলাম, ভি-আই-পি রোড। সেই উপন্যাসে এক জমির দালাল ছিল। ফোকটে প্রচুর টাকা করেছিল সে। শুধু একটি রাস্তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থাগমের রাস্তা খুলে যায়। জমি কেনা-বেচা করে ক্রমশ ধনী হয়ে উঠতে থাকে সে। সেই টাকা তার অনুপারজিত অর্থ। আমাদের সমাজকে এই টাকাই শাসন করে। সমাজ শাসন করে অবৈধ ক্ষমতার অধিকারীরা। অবৈধ ক্ষমতা কী? যে ক্ষমতা আপনি অর্জন করেছেন ক্ষমতাধর হয়ে নন। কোনো না কোনো উপায়ে প্রভাব খাটিয়ে। আজকের পৃথিবী ‘সেই সব শেয়ালেরা’ শাসন করে।
