শুনে চমকে উঠলেন মা। সর্বনাশ!
শুভ উঠে দাঁড়ায়, ওরা যে মাস্তান তুই বুঝলি কী করে? চেহারা দেখে বোঝা যায়। আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে! চল তো দেখি।
সঙ্গে সঙ্গে শুভর হাত ধরলেন মা। না, তুই যেতে পারবি না। আমি তোকে ওদের সামনে যেতে দেব না।
শুভ অবাক হল। তোমরা এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমি একটু দেখি কোন মাস্তানরা আমার পেছনে লেগেছে।
না না দেখতে হবে না। যদি দেখতে হয় মালার রুমের জানালা থেকে দেখ।
কিন্তু শুভ মালার রুমে আসার আগেই লালু দিলু চলে গেছে।
রাস্তায় কাউকে না দেখে মালার দিকে তাকাল শুভ। বাইরে কোথায় কোন মাস্তান দেখলি আপা? রাস্তায় তো কেউ নেই।
মালা তার জানালা দিয়ে উঁকি দিল। ছিল। রাস্তার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ছিল। এখন নেই।
মা বললেন, মালাকে বোধহয় দেখে ফেলেছিল। এজন্য চলে গেছে।
শুভ হাসল। তোমরা সবাই এত বেশি নার্ভাস হয়েছ, কী বলব! আমি একটু বেরুই। চারপাশটা ঘুরে দেখে আসি।
না, একদম না। আজ রাতে বাড়ি থেকে তুই বেরুতেই পারবি না। চল শাহিনের সঙ্গে কথা বলি। ওর সঙ্গে পরামর্শ করে, যা করার করব।
শুভর সঙ্গে মা কোনও রাগারাগি করেনি দেখে সুরমা এবং শাহিন দুজনেই বেশ উৎফুল্ল। কিন্তু বাড়ির সামনে মাস্তান এসেছিল শুনে দুজনেই চিন্তিত হল।
মা বললেন, আমার খুব নার্ভাস লাগছে।
শাহিন বলল, তা তো লাগারই কথা। কীভাবে ব্যাপারটা সামাল দেব বুঝতে পারছি না।
সুরমা বলল, তুমি কি সেতুর ভাইদের সঙ্গে কথা বলবে?
মনে হয় না এই ধরনের পরিস্থিতিতে ওরা আমার সঙ্গে কথা বলবে। অযথা অপমান। হওয়ার দরকার আছে?
মা বললেন, তাহলে কী করবি?
ওয়েট করতে চাই। যতদিন যাবে ব্যাপারটা তত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
এদিকে মাস্তানরা যদি শুভর কোনও ক্ষতি করে?
ভাবছি থানায় একটা জিডি করে রাখব।
.
মালা তার বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে স্বামীকে চিঠি লিখছে, সামনে সেতুর সেই ছবিটা।
ছবিটার দিকে একবার তাকাচ্ছে তারপর আবার লিখছে।
এসময় শুভ এসে দাঁড়াল এই রুমের সামনে। আপা, আসব?
মালা উঠে বসল। আয়।
শুভ ভেতরে ঢুকল। বিছানায় সেতুর ছবি দেখে অবাক হল। এই ছবি দিয়ে কী করছিস?
মালা হাসল। ছবির দিকে তাকিয়ে সেতুর বর্ণনা লিখছিলাম।
বুঝতে পারলাম না। কীসের বর্ণনা?
তোর দুলাভাইকে চিঠি লিখছি। তোর আর সেতুর পুরো ঘটনা লিখে দিয়েছি। সেতু দেখতে কেমন চিঠিতে ওই বর্ণনাই লিখেছি।
আমার এদিকে জান বেরুচ্ছে আর তুই…
ভাইকে সান্ত্বনা দিল মালা। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই এত ভেঙে পড়িস না তো!
একটু থেমে অনুরোধের গলায় মালা বলল, শুভ, সেতুর এই ছবিটা আমি নিই?
কেন?
তোর দুলাভাইকে পাঠাব।
শুভ হাসল। বর্ণনা তো লিখেই দিয়েছিস, ছবি পাঠাবার আর দরকার কী?
বর্ণনা পড়ে হয়ত বুঝতে পারবে না আমার ছোটভাইর বউটি কী পরিমাণ সুন্দর।
তারপর অনুনয়ের গলায় বলল, ছবিটা নেব?
নে। ওর আরও ছবি আমার কাছে আছে।
মালা একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। খুব খুশি হলাম।
শুভ কথা বলল না। দরজার দিকে পা বাড়াল।
মালা ডাকল। শোন।
শুভ ঘুরে দাঁড়াল। কী?
আমার সামনে এসে একটু বস।
শুভ নিঃশব্দে মালার সামনে এসে বসল।
মন খারাপ করা সন্তানকে যেভাবে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করেন মা ঠিক সেইভাবে শুভর মাথায় পিঠে হাত বুলাতে লাগল মালা, মায়াবি গলায় বলল, তুই আমার চে’ খুব বেশি ছোট না। তবু ছেলেবেলায় মা তোকে বকলে, তুই যখন খুব মন খারাপ করতি, আমি তোকে কোলে নিতাম। তুই বেশ ভারি ছিলি। তোকে কোলে নিয়ে বেশি দূর হাঁটতে পারতাম না আমি। তবু নিতাম। আমি কোলে নিলেই মনটা তোর ভাল হয়ে যেত। আজ সেসব দিনের মতো তোকে কোলে নিতে ইচ্ছে করছে। আমি কোলে নিলে যদি তোর মনটা ভাল হয়।
মালার কথা শুনে চোখ ছলছল করে উঠল শুভর। এভাবে বলিস না আপা, এভাবে বলিস না। আমার খুব কান্না পাচ্ছে।
ততোক্ষণে সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলেছে শুভ। চোখ মুছতে মুছতে তারপর দ্রুত বেরিয়ে গেল সে।
ভাইর জন্য অনেকক্ষণ পর্যন্ত মনটা খারাপ হয়ে রইল মালার।
.
লালু চায়নিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে এবং একটা টেবিলে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে দেখে দিলু বলল, এখানে এলি কেন?
লালু নির্বিকার গলায় বলল, গান গাইতে!
তারপর সত্যি সত্যি গান গাইতে লাগল। চাল সাইয়া সাইয়া সাইয়া সাইয়া, চাল সাইয়া সাইয়া সাইয়া…
লালুর মুখোমুখি বসে দিলু বলল, তোর কায়দা কানুন আমি বুঝতেই পারি না।
গরুদের পক্ষে সব কিছু বোঝা সম্ভব না।
তারপরই ছোট্ট একখানা ধমক দিল। এই ব্যাটা রেস্টুরেন্টে লোকে কী করতে আসে?
দিলু সঙ্গে সঙ্গে বলল, খেতে।
আমিও সেই কাজেই আসছি। এখন দাপটের একখানা খাওয়া দেব। আমি রসিয়ে রসিয়ে খাব আর তুই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবি।
আবার সেই গান ধরল লালু। চাল সাইয়া সাইয়া…
একজন ওয়েটার এসে দাঁড়াল এই টেবিলের সামনে। অর্ডার দেবেন স্যার?
লালু নির্বিকার গলায় বলল, না।
জ্বি?
কোনও অর্ডার দেব না। তোমার যা মনে হয় নিয়ে আস।
ওয়েটার হাসল, সত্যি স্যার?
একদম সত্যি। যাও।
লোকটি সত্যি সত্যি চলে গেল।
দিলু গাল ফুলিয়ে বলল, তুই কিন্তু আমাকে খুব ইনসাল্ট করেছিস।
লালু অবাক হল। তাই নাকি?
হ্যাঁ।
তোর কথার ধরনে করেছি।
কী বলেছি আমি?
এত ভাল একটা রেস্টুরেন্টে খেতে এলাম, ঢুকে তুই জিজ্ঞেস করলি, এখানে এলি কেন? তোর সেই কথায় আমি মাইন্ড করেছি। এজন্যই গরু বললাম। ঠিক আছে এখন আর কোনও মাইন্ড নাই। ঠিক আছে?
