দিলু খুশি হল। ঠিক আছে।
শোন, স্বপন সাহেব খুবই ভাল মোয়াক্কেল। কাজটা করে ফেলতে পারলে মালের কোনও অভাব হবে না।
তাহলে করছিস না কেন? এইসব মার্ডার তো আমাদের জন্য তেলপানি। বাড়ি চিনি, ছেমড়াটারেও চিনি। মার্ডারে অসুবিধা কী?
কোনও অসুবিধা নাই।
তবে?
কাজটা যখন হাতে নিয়েছি, করতে তো হবেই। করলে এক সঙ্গে মালও অনেক, কিন্তু কাজটা আমি ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে করতে চাই। কাজ যত ঝুলবে খুচরা ইনকাম ততো বাড়বে। দুই চারদিন পর পর স্বপন সাহেবের কাছে যাব, পাঁচ দশ হাজার নিয়ে আসব। মূল কনটাক্টের সঙ্গে এই টাকার কোনও সম্বন্ধ নাই। পলিসিটা বুঝেছিস?
দিলু বিগলিত গলায় বলল, একদম ক্লিয়ার। খুবই ভাল পলিসি।
সঙ্গে সঙ্গে লালু আবার গান ধরল। চাল সাইয়া সাইয়া সাইয়া…।
.
তুই যাসনি?
নাহিদ গম্ভীর গলায় বলল, তোর এই ধরনের পরিস্থিতি জেনে কী করে যাই।
শুভ বেশ বিরক্ত হল। আমার মা ভাইবোন ভাবী কারও সঙ্গে তোর কোনও ব্যবধান নেই। তোরা সবাই একই রকমের ভীতু।
কোনও কোনও পরিস্থিতিতে মানুষ ভীতু হতে বাধ্য হয়। দুচারজন মাস্তান তো আমিও চিনি, তোর বন্ধু বান্ধবের সার্কেল খুব ছোট নয়। ইচ্ছে করলেই সেতুর ভাইদের ভাড়াটিয়া মাস্তানদের দেখে নিতে পারি আমরা। কিন্তু এখন ওসব করা ঠিক হবে না।
কেন ঠিক হবে না?
সেতু যদি ঠিক থাকে, দুদিন আগে পরে ওর ভাইরা ব্যাপারটা মেনে নিতে বাধ্য হবেন। তখন এইসব অপকর্মের জন্য লজ্জা পেতে হবে।
লজ্জা আমি একা পাব কেন? ওরাও তো পাবে! আমার সবচে’ বড় ভয় ছিল আমার মা, মা সব মেনে নিয়েছেন। এখন আমার কোনও ভয় নেই। তার চে’ এক কাজ করি…
কী?
সরাসরি সেতুদের বাড়ি চলে যাই। সেতুকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি।
সেতু যদি এভাবে না আসে?
শুভ একটু থতমত খেল। তোর মনে হয় আসবে না?
নাহিদ চিন্তিত গলায় বলল, নাও আসতে পারে। আমার ধারণা ইচ্ছে করে সময় নিচ্ছে সেতু। ভাইদের রাগ কমে এলে সবাইকে ম্যানেজ করে তোর সংসারে আসবে সে। বেশির ভাগ মেয়ে কিন্তু তাই করে।
শুভ অস্থির গলায় বলল, তাহলে আমাকে তুই কী করতে বলিস?
তুই একটা কাজ কর, আমার সঙ্গে আমাদের গ্রামের বাড়িতে চল।
কী বললি?
আগে কথাটা শোন। যতদিন এদিককার পরিস্থিতি ঠিক না হয় ততদিন আমাদের ওখানে থাকলি। ঠিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলি?
শুভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, যেতে পারি কিন্তু তোদের বাড়ির কাউকে এসব কথা বলতে পারবি না।
নাহিদ হাসল। বলব না।
কিন্তু যাওয়ার আগে একটা কাজ করে যেতে চাই।
কী?
গভীর রাতে সেতুদের বাড়ির সামনে গিয়ে বিশাল করে ওদের দেয়ালে লিখে দিয়ে যাই, শুভ + সেতু।
নাহিদ হাসল। তুই একেবারে পাগল হয়ে গেছিস।
.
সব শুনে শাহিন বলল, আমি মনে করি এটাই সবচে ভাল সিদ্ধান্ত।
রাতেরবেলা শুভদের ড্রয়িংরুমে একত্রিত হয়েছে সবাই। মা শাহিন সুরমা মালা শুভ . এবং নাহিদ। সেই যে এসেছে নাহিদ, এখনও ফিরে যায়নি।
কথা শুরু করেছিল নাহিদই। তার কথার রেশ ধরেই কথা বলল শাহিন। তারপর মায়ের দিকে তাকাল। তুমি কী বল মা?
মা গম্ভীর গলায় বললেন, তোরা যা ভাল বুঝিস তাই কর।
সুরমা বলল, শুভ চলেই যাক।
মালা চিন্তিত গলায় বলল, এদিকে সেতুর যদি কোনও অসুবিধা হয়?
নাহিদ বলল, তা মনে হয় হবে না। শুভকে বাড়িতে রেখে আমি মাঝে মাঝে এসে খবর নেব।
শুভ কোনও কথা বলছিল না। মুখটা পাথরের মতো হয়ে আছে তার।
তারপর থেকে একটা রাত গেছে, একটা প্রায় পুরোদিন, মুখের ভাবটা বদলায়নি শুভর। ট্রেনে সারাক্ষণই চুপচাপ ছিল। নাহিদ টুকটাক কথা বলার চেষ্টা করেছে, সেসব কথার হু হ্যাঁ না ছাড়া তেমন কোনও জবাব দেয়নি।
নাহিদদের বাড়িতে পৌঁছেও চুপচাপই আছে শুভ।
যে ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছে তাকে সেই ঘরে খাটের এককোণে উদাস হয়ে বসে আছে এখন। পাশে ব্যাগটা। নাহিদ গেছে তার মা বাবার সঙ্গে দেখা করতে।
এসময় বর্ষা এসে দাঁড়াল দরজার সামনে।
বর্ষাকে দেখে গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই প্রথম পুরো একটা বাক্য বলল শুভ। কেমন আছ, বর্ষা?
বর্ষা কথা বলল না। অপলক চোখে শুভর দিকে তাকিয়ে রইল।
শুভ বলল, তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ?
বর্ষা কথা বলল না, মাথা দোলাল।
এবার একটু উফুল্ল হল শুভ। কী মনে করে বলল, তোমার কথা ভেবে তোমাদের এখানে চলে এলাম।
বর্ষা উদাস গলায় বলল, কেন?
শুভ একটু থতমত খেল। না মানে নাহিদ, আমি আমরা সবাই থাকলে তোমার মনটা হয়তো ভাল থাকবে।
তারপর একটু থেমে বলল, অনেকদিন থাকব তোমাদের এখানে।
একথায় মুখটা কেমন উজ্জ্বল হল বর্ষার। সত্যি?
সত্যি।
ধীর, শান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে বর্ষা তারপর শুভর সামনে এসে দাঁড়াল। সত্যি আপনি অনেকদিন থাকবেন আমাদের এখানে?
শুভ হাসল। তোমার সঙ্গে আমি মিথ্যে বলছি না। সত্যি অনেকদিন থাকব তোমাদের এখানে।
সঙ্গে সঙ্গে ডানহাতটা শুভর দিকে বাড়িয়ে দিল বর্ষা। শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য রকমের সরল গলায় বলল, আমাকে ছুঁয়ে বলুন।
শুভ একটু থতমত খেল। একটু দ্বিধাও হল তার।
বর্ষার হাতটা ধরল শুভ।
৮. বারবাড়ির দিক থেকে দ্রুত হেঁটে
বারবাড়ির দিক থেকে দ্রুত হেঁটে আসছিল পারু।
উঠোনের মাঝামাঝি আসতেই নিজের ঘরের বারান্দা থেকে বর্ষা তাকে ডাকল। পারু।
পারু থমকে দাঁড়াল।
বারান্দা থেকে নেমে পারুর সামনে এসে দাঁড়াল বর্ষা। তোকে না বলেছিলাম ফুল তুলে আনতে?
