.
সন্ধের পর কখনও কখনও চুপচাপ শুয়ে থাকতে খুব পছন্দ করে শাহিন। টিভি দেখে না, দিনের পুরনো খবরের কাগজ পড়ে না, এমন কি কিছু ভাবেও না।
আজও তেমন করে শুয়ে ছিল।
একসময় সুরমা এসে দাঁড়াল তার সামনে। সেতুর ভাইরা যে মাস্তান লাগিয়ে দিয়েছে শুভর পেছনে সে কথা বলল। শুনে ফ্যালফ্যাল করে স্ত্রীর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল শাহিন। তারপর উত্তেজিত ভঙ্গিতে বিছানায় উঠে বসল। বল কী?
সুরমা বলল, হ্যাঁ। সব মিলে বেশ বড় রকমের ঝামেলা লেগে গেছে।
তাইতো দেখছি।
শুভর বিয়ের কথা যেদিন তোমাকে বললাম, তোমার উচিত ছিল সেদিনই কথাটা মাকে জানিয়ে দেয়া এবং তাকে ম্যানেজ করা।
আমি ভাবলাম এত তাড়াহুড়োর কী আছে! সময় যাক, আস্তেধীরে মাকে বলব।
এখন তো দুটো দিক সামলাতে হবে। একদিকে মাস্তান, আরেকদিকে তোমার মা।
মাকে নিয়ে আমি ভাবছি না। যত রাগীই হোন, শুভ তো তার ছেলে।
তবু তুমি আগে তাঁকেই ম্যানেজ কর। তারপর পুলিশে জানাও।
পুলিশে?
হ্যাঁ। দুটো ম্যাচিউর ছেলেমেয়ে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করেছে, এটা আইনসম্মত। আইন আমাদেরকে সাহায্য করবে।
কিন্তু টাকার জোরে ওদের সঙ্গে আমরা পারব না।
সুরমা একটু বিরক্ত হল, এসব চিন্তা পরে করা যাবে। আগে মাকে ম্যানেজ কর। তিনি খুব টেনশনে আছেন।
সামান্য সময় কী ভাবল শাহিন, তারপর উঠল। চল।
সুরমা অবাক হল। কোথায়?
মার রুমে।
মায়ের রুমে মালাও ছিল। শাহিন কথা শুরু করল মালার দিকে তাকিয়ে। তুই কিছু শুনেছিস?
মা বলল, কী?
শুভর ব্যাপারে।
মালা একটা ঢোক গিলল।
সুরমা বলল, আমি জানি তুমি শুনেছ। বলে ফেল। এখন আর না বলে উপায় নেই।
মা সুরমার দিকে তাকালেন। কী হয়েছে?
সুরমা নয় শাহিন বলল, আমাদের উচিত ছিল আগেই তোমাকে জানানো। কিন্তু তোমার ভয়ে…
এত ভণিতার দরকার নেই। কী হয়েছে পরিষ্কার করে বল।
শুভ বিয়ে করেছে।
কথাটা যেন বুঝতে পারলেন না মা। থতমত খেলেন। কী? কী বললি? শুভ বিয়ে করেছে?
হ্যাঁ।
আমার ছেলে লুকিয়ে বিয়ে করেছে? আমার ছেলে?
মালা বলল, মেয়েটা খুব সুন্দর মা।
মালাকে প্রচণ্ড ধমক দিলেন মা। চুপ কর, সুন্দর অসুন্দর দিয়ে আমি কী করব? লোকে শুনলে বলবে কী? আমাদের মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিল সে!
সুরমা বলল, এতে মান-সম্মান নষ্টের কী হল? এরকম বিয়ে আজকাল অনেক হয়।
খরচোখে সুরমার দিকে তাকালেন মা। তুমি কথা বলবে না। আমার সামনে একদম কথা বলবে না তুমি। অতিরিক্ত লাই দিয়ে ছেলেটির মাথা তুমি নষ্ট করেছ।
শাহিন বলল, ওর সঙ্গে অযথা রাগ করছ তুমি। ও কি শুভকে বিয়ে করার কথা শিখিয়ে দিয়েছে?
কিন্তু আমার কাছে এসব কথা তোরা লুকিয়ে গেছিস কেন? বাড়ির সবাই জানে, আমি কেন জানি না?
মালা বলল, কথা বললেই যেমন করে ওঠ তুমি, কে যাবে তোমার সঙ্গে কথা বলতে!
মালার কথায় আরও রাগলেন মা, খুঁচিয়ে কথা বলবি না আমার সঙ্গে। আমার মেজাজ খুব খারাপ।
শাহিন শান্ত গলায় বলল, মেজাজ খারাপ করো না মা। বিয়ে করে শুভ না হয় অন্যায় করেছে কিন্তু এখন যে সে বড় রকমের একটা বিপদে পড়েছে তার কী করবে?
শুনে মা একেবারে নিভে গেলেন। কীসের বিপদ?
শুভর পেছনে ওরা মাস্তান লাগিয়ে দিয়েছে। শুভকে মেরে ফেলতে চাইছে।
শাহিনের কথা শুনে নিজের অজান্তেই যেন উঠে দাঁড়ালেন মা। দিশেহারা গলায় বললেন, সর্বনাশ! কোথায়, আমার ছেলে কোথায়?
আর কোনও দিকে তাকালেন না মা। পাগলের মতো শুভর রুমে এসে ঢুকলেন।
চিন্তিত ভঙ্গিতে বিছানায় বসেছিল শুভ। মা এসে অদূরে দাঁড়ালেন। এক পলক মাকে দেখেই চোখ নামিয়ে নিল শুভ।
অপলক চোখে শুভকে খানিক দেখলেন মা। তারপর আস্তেধীরে হেঁটে শুভর সামনে এসে দাঁড়ালেন। শুভর মাথায় হাত দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শিশুর ভঙ্গিতে দুহাতে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরল শুভ, মায়ের কোলের কাছে মুখ রেখে হুহু করে কেঁদে ফেলল। আমাকে তুমি মাফ করে দাও মা, আমাকে তুমি মাফ করে দাও।
কোন ফাঁকে যেন শুভর মাথাটা জড়িয়ে ধরেছেন মা। ছেলের কান্নায় তারও চোখ ফেটে কান্না এল।
শুভর রুমে মা এবং ছেলে দুজনেই যখন কাঁদছে ঠিক তখুনি লালুর মোটর সাইকেল এসে থামল এই বাড়ির সামনে। লাইটপোস্টের তলায় মোটর সাইকেল দাঁড় করাল লালু। সঙ্গে সঙ্গে দিলু নামল পেছন থেকে, কিন্তু মোটর সাইকেলের স্টার্ট বন্ধ করার পরও লালু নামল না। সিটে বসেই শুভদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
নিজের রুমের জানালা থেকে এই দৃশ্যটি দেখে ফেলল মালা। লোক দুটো যে মাস্তান বুঝে ফেলল। তাদের বাড়ির দিকেই যে তাকিয়ে আছে, বুঝে ফেলল, তারপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
এদিকে নিজেকে একসময় সামলেছে শুভ। শুকনো গলায় মাকে বলছে, মাস্তানদেরকে আমি ভয় পাচ্ছি না মা। ওরা আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি ভয়। পাচ্ছিলাম তোমাকে। এমনিতেই তুমি আমাকে দেখতে পার না, তার ওপর এমন একটা কাজ করে ফেললাম।
চোখের জল সামলে মা বললেন, তোকে আমি দেখতে পারি না, একথা কে বলেছে? আমার মেজাজটা একটু খিটখিটে, এজন্য তুই ভাবিস তোকে আমি কম আদর করি। আসলে ছোট সন্তানের জন্য মায়ের টান থাকে সবচাইতে বেশি, আর বাড়ির সবাই যে কথা জেনে যাবে আমি কেন সে কথা জানব না!
এ সময় হাঁপাতে হাঁপাতে মালা ঢুকল। মা, শুভ, আমাদের বাড়ির সামনে মোটর সাইকেল নিয়ে দুজন মাস্তান দাঁড়িয়ে আছে।
