১.০১-০৫ শেষ হেমন্তের অপরাহ্ন বেলায়

১.০১

শেষ হেমন্তের অপরাহ্ন বেলায় উত্তরের হাওয়াটা একদিন বইতে শুরু করল।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘরের ছায়ায় বসেছে দবির গাছি, হাওয়াটা গায়ে লাগল। গা কাঁটা দিয়ে উঠল। পলকে দিশাহারা হল সে। বুকের ভিতর আনচান করে উঠল। যেন উত্তরের হাওয়া বুকের ভিতরও ঢুকে গেছে তার, ঢুকে তোলপাড় করে দিয়েছে সব।

খাওয়া দাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে তামাক খায় দবির। রান্নাচালায় বসে গুছিয়ে, সুন্দর করে তামাক সাজিয়ে দেয় নূরজাহান আর নয়তো তার মা। নূরজাহান এখন বাড়িতে নাই। ঢাকা থেকে অনেক উঁচু হয়ে একটা সড়ক আসছে বিক্রমপুরের দিকে। মেদিনীমণ্ডলের পাশ দিয়ে মাওয়া হয়ে সেই সড়ক চলে যাবে খুলনায়। মাওয়ার পর রাজকীয় নদী পদ্মা। সড়কের মাঝখানে নিজের মহিমা নিয়ে ঠিকই দাঁড়িয়ে থাকবে পদ্মা, তবু এই সড়কের নাম ঢাকা খুলনা মহাসড়ক। বিরাট একটা কারবার হচ্ছে দেশগ্রামে। কত নতুন নতুন চেহারা যে দেখা যাচ্ছে! নানান পদের মানুষে ভরে গেছে গ্রামগুলি। একটা মাত্র সড়ক রাতারাতি বদলে দিচ্ছে বিক্রমপুর অঞ্চল। শহরের হাওয়া লেগে গেছে গ্রামে। যেন গ্রাম এখন আর গ্রাম না, যেন গ্রাম হয়ে উঠছে শহর। হাজার হাজার মানুষ লেগে গেছে সড়কের কাজে। ফাঁক পেলেই সেই সড়ক দেখতে চলে যায় নূরজাহান।

আজও গেছে।

নাকেমুখে দুপুরের ভাত গুঁজে শিশুর মতো ছটফট করে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। মা বাবা কারও দিকে তাকিয়েও দেখেনি। এই ফাল্গুনে তেরো হবে নূরজাহানের। তাকে দেখায় বয়সের চেয়ে বড়। নূরজাহানের শরীর বাড়ন্ত। সীতারামপুরের হাতপাকা কারিগরদের বোনা ডুরেশাড়ি পরছে দুই বছর হল। শাড়ি পরলে বাড়ন্ত শরীরের কিশোরী চোখের পলকে যুবতী হয়ে যায়। তেমন যুবতী নূরজাহান হয়েছে দুই বছর আগে।

তবে মনের দিক দিয়ে, আচার আচরণ কথাবার্তা চালচলনে নূরজাহান শিশু। সারাক্ষণ মেতে আছে গভীর আনন্দে। গরিব গিরস্থ ঘরে জন্মে এত আনন্দ কোথায় যে পায় মানুষ!

বাড়ির উঠান পালান (আঙিনা) মাতিয়ে নূরজাহান যখন চলাফিরা করে মনে হয় না সে রক্ত মাংসের মানুষ। মনে হয় চঞ্চল পাখি।

কথায় কথায় খিলখিল করে হাসে নূরজাহান। নূরজাহানের হাসি হাসি মনে হয় না।

.

১.০২

বর্ষার মুখে পদ্মার ফুলে ওঠা পানি যখন খাল বেয়ে গ্রামে ঢোকে, এক পুকুর ভরে পানি যখন অন্য পুকুরে ঢোকার জন্য উঁকিঝুঁকি মারে, জোয়ারে মাছের লোভে দুই পুকুরের মাঝখানে যখন সরু নালা কেটে দেয় চতুর মানুষ, সেই নালা ধরে এক পুকুরের পানি যখন গিয়ে লাফিয়ে পড়ে অন্য পুকুরে, পানির সঙ্গে পানির মিলন, তখনকার যে শব্দ, নূরজাহানের হাসি তেমন। শস্যের চকমাঠ ভেঙে নূরজাহান যখন ছোটে, নূরজাহানের ছুটে যাওয়াও জোয়ারে মাছের মতো, চোখের পলকে আছে, চোখের পলকে নাই।

এই মেয়ের দিকে তাকিয়ে কখনও কখনও মন উদাস হয় দবিরের। দুইদিন পর বিয়াশাদি হবে মেয়ের, কোথাকার কোন সংসারে গিয়ে পড়বে! কেমন হবে সেই সংসারের মানুষ! হাত পায়ে শিকল বেঁধে মেয়েটাকে হয়তো তারা খাঁচার পাখি বানিয়ে ফেলবে। ইচ্ছা করলেও সেই শিকল ছিঁড়তে পারবে না নূরজাহান। আস্তে ধীরে এই মুক্ত জীবনের কথা ভুলে যাবে, অভ্যস্ত হবে বন্দি জীবনে।

এইসব ভেবে মেয়েকে কখনও শাসন করে না দবির। মেয়ের মাকেও কিছু বলতে দেয় না। ফলে নূরজাহান আছে নূরজাহানের মতো।

আজ দুপুরের পর, নূরজাহান বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘরের ছায়ায় বসে নূরজাহানের কথাই ভাবছিল দবির আর তামাকের অপেক্ষা করছিল। তখনই উত্তরের হাওয়াটা এল। সারাবছর এই হাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে দবির। এক শীত শেষ হলে শুরু হয় আরেক শীতের অপেক্ষা। কবে আসবে শীতকাল, কবে বইবে উত্তরের হাওয়া। কবে উত্তরের হাওয়ায় গা কাঁটা দিবে দবির গাছির, বুকের ভিতর তোলপাড় করবে। কবে উত্তরের হাওয়ায় কানের কাছে শন শন করবে খাজুরের অবোধ পাতা। দেশগ্রামের রসবতী খাজুরগাছ ডাক পাঠাবে।

আজ সেই ডাক পেল দবির, পেয়ে দিশাহারা হল। এত যে প্রিয় তামাক, খাওয়া দাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে তামাক না খেলে মনেই হয় না ভাত খাওয়া হয়েছে, খেয়ে পেট ভরেছে, সেই তামাকের কথা একদম ভুলে গেল। নিজের অজান্তে উঠে দাঁড়াল। খাজুরগাছ ঝুড়ার ঠুলই আছে ঘরের পশ্চিম দিককার খামের সঙ্গে ঝুলানো। তিনচার বছরের পুরানা জিনিস। তবু এখনও বেশ মজবুত। শীতকাল শেষ হওয়ার লগে লগে যত্ন করে খামের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে দবির। ঠুলইয়ের ভিতর থাকে ছ্যান কাটাইল আর কাঠের একটা আতুর (হাতুড়ি)। আতুর দেখবার দরকার হয় না। ছ্যান কাটাইল দেখতে হয়। বর্ষাকালে যখন নিঝুম হয়ে নামে বৃষ্টি, টানা দুইদিন তিনদিন যখন বৃষ্টি থামার নামগন্ধ থাকে না, তখন ছ্যান কাটাইলে জং ধরার সম্ভাবনা। দবির মাঝে মাঝেই তখন জিনিসগুলো বের করে। অলস ভঙ্গিতে বালিকাচায় ঘষে ঘষে ধার দিয়ে রাখে ছ্যান কাটাইলে।

বর্ষা শেষ হওয়ার পর তো আর কথাই নাই। কী শরৎ কী হেমন্ত দুইদিন একদিন পর পরই বালিকাচা নিয়ে বসে দবির। মন দিয়ে বালিকাচায় ঘষে যায় ছ্যান কাটাইল।

কাল বিকালেও কাজটা সে করেছে। তখন কে জানত একদিন পরই উত্তরের হাওয়ায় গিরস্তবাড়ির বাগান আঙিনা থেকে রসবতী খাজুরগাছেরা তাকে ডাক পাঠাবে!

ঘরে ঢুকে চঞ্চল হাতে ঠুলই নিল দবির। বাতার সঙ্গে গুঁজে রাখা মাজায় বান্ধার (কোমরে বাঁধার) মোটা কাছি নিল। আদ্যিকালের উঁচু চকির (চৌকির) তলায় যত্নে রাখা আছে রসের দশ বারোটা হাঁড়ি, হাঁড়ির সঙ্গে বাঁশের বাখারির ভার। আশ্চর্য এক নেশায় আচ্ছন্ন মানুষের মতো জিনিসগুলো বের করল দবির। লুঙ্গি কাছা মেরে মাজার পিছনে, ডানদিকে ঝুলাল ঠুলই। তারপর ভারের দুইদিকে হাড়িগুলি ঝুলিয়ে, কাছি মাফলারের মতো গলায় প্যাচিয়ে ঘর থেকে বের হল। খানিক আগে ঘরের ছায়ায় বসে থাকা মানুষটার সঙ্গে এখনকার এই মানুষটার কোনও মিল নাই।

ঘর থেকে বের হয়েই বাড়ির নামার দিকে হাঁটতে শুরু করেছে দবির। তার মেয়ের মা হামিদা তখন হুঁকা নিয়ে ছুটে আসছিল, এসে দেখে স্বামী গাছ ঝুড়তে যায়। তামাক খাওয়ার কথা তার মনে নাই। ফ্যাল ফ্যাল করে নামার দিকে হেঁটে যাওয়া মানুষটার দিকে তাকিয়েছে সে। ঠিক তখনই উত্তরের হাওয়া এসে মুখে ঝাঁপটা দিল। অদ্ভুত এক আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল হামিদার। রসের দিন আইয়া পড়ছে, সংসারে অহন আর কোনও অভাব থাকবো না।

.

১.০৩

ঢোল কলমির গাঢ় সবুজ পাতায় লাল রঙের লম্বা একটা ফড়িং বার বার বসছে, বার বার উড়াল দিচ্ছে। ফড়িংটার দিকে তাকিয়ে নূরজাহান বলল, ও কনটেকদার সাব আপনেগো রাস্তা শেষ অইব কবে?

লোকটার নাম আলী আমজাদ। সাব কন্ট্রাক্টে মাটি কাটার কাজ করছে। সড়কের দুইপাশ থেকে মাটি কেটে তুলছে তার শতখানেক মাটিয়াল। আলী আমজাদ লেবার কন্ট্রাক্টর। নিজের মাটিয়াল নিয়ে মূল কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে কাজ নিয়ে করছে। লাভ ভালই থাকে। কাজ শুরুর কয়দিন পরই ফিফটি সিসির সেকেন্ডহ্যান্ড একটা মোটর সাইকেল কিনে ফেলেছে। সেই মোটর সাইকেল নিয়ে সাইটে আসে। গলায় জড়ানো থাকে খয়েরি রঙের মাফলার। রোদে পোড়া কালা কুচকুচা গায়ের রঙ। ছেলেবেলায় বসন্ত হয়েছিল। গালে মুখে বসন্তের দাগ রয়ে গেছে। চোখ কুতকুতা আলী আমজাদের, শরীর দশাসই। টেটরনের নীলপ্যান্ট পরে থাকে আর সাদাশার্ট। সড়কের কাজ পাওয়ার পর হুঁড়ি বেড়েছে, পেটের কাছে শার্ট এমন টাইট হয়ে থাকে, দেখতে বিচ্ছিরি লাগে।

আলী আমজাদ ঘড়ি পরে ডানহাতে। কালা কুচকুচা লোমশ হাতে সাদা চেনের ঘড়ি বেশ ফুটে থাকে। আর তার সামনের পাটির একটা দাঁত সোনায় বাঁধানো। হাসলে মনে হয় অন্ধকার মুখের ভিতর কুপির আলো পড়েছে।

নূরজাহানের কথা শুনে হাসল আলী আমজাদ। তার হাসি দেখে আলী আমজাদকে কী জিজ্ঞাসা করেছিল ভুলে গেল নূরজাহান। আলী আমজাদের সোনায় বাঁধানো দাঁতের দিকে তাকিয়ে বলল, সোনা দিয়া দাঁত বান্দাইছেন ক্যা? হাসলে মনে অয় ব্যাটারি লাগাইয়া হাসতাছেন।

মেয়েদের কাছে এরকম কথা শুনলে লজ্জায় যে কোনও পুরুষের মুখ নিচু হয়ে যাবে। আলী আমজাদের হল না। প্রথমে হেসেছিল নিঃশব্দে, ঠোঁট ছড়িয়ে। এবার খে খে করে হাসল। দাঁত না থাকলে বান্দামু না?

কথার লগে মুখ থেকে বিচ্ছিরি গন্ধ এল। দিনের পর দিন দাঁত না মাজলে এরকম গন্ধ হয় মুখে।

আলী আমজাদের মুখের গন্ধে উকাল (বমি) এল নূরজাহানের। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থু করে ছ্যাপ (থুতু) ফেলল। আগের দুইটা প্রশ্নই ভুলে গেল। প্রচণ্ড ঘৃণায় নাক মুখ কুঁচকে বলল, ইস আপনের মুখে এমুন পচা গন্দ ক্যা? দাঁত মাজেন না?

একথায়ও লজ্জা পেল না আলী আমজাদ। আগের মতোই খে খে করে হাসল। তিনখান কথা জিগাইছো। কোনডার জব (জবাব) দিমু?

আলী আমজাদ কথা শুরু করার আগেই বেশ কয়েক পা সরে দাঁড়িয়েছে নূরজাহান। যেন তার মুখের গন্ধ নাকে এসে না লাগে। ব্যাপারটা বুঝল আলী আমজাদ। বুঝেও গা করল না। বলল, কইলা না?

কী কমু?

কোন কথার জব দিমু আগে?

আপনের যেইডা ইচ্ছা।

বুক পকেট থেকে ক্যাপস্টান সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল আলী আমজাদ, ম্যাচ বের করল। সিগ্রেট ধরিয়ে হাওয়ায় ধুমা (ধোঁয়া) ছেড়ে বলল, কনটেকদারের কাম অইলো লেবারগো লগে কথা কওয়া, ধমক দেওয়া, গাইল দেওয়া। গাইল না দিলে লেবাররা কোনওদিন ঠিক মতন কাম করে না। যেই কনটেকদার লেবারগো যত বেশি গাইল দিতে পারবো সে তত বড় কনটেকদার। আমি সকাল থিকা লেবারগো গাইল্লাইতে থাকি। গাইল্লাইতে গাইল্লাইতে মুখে দুরগন্দ (দুর্গন্ধ) অইয়া যায়।

আবার সিগ্রেটে টান দিল আলী আমজাদ। খে খে করে হাসল। তয় মাইনষের মুখের গন্দও কইলাম কোনও কোনও মাইনষে পছন্দ করে।

ভুরু কুঁচকে আলী আমজাদের মুখের দিকে তাকাল নূরজাহান। কী?

হ। আমার মুখের এই গন্দ তোমার ভাবীছাবে বহুত পছন্দ করে।

নূরজাহান আবার ছ্যাপ ফেলল। আপনের বউ তো তাইলে মানুষ না। পেতনি, পেতনি।

বুড়া মতন একজন মাটিয়াল মাথায় মাটির য়োড়া (ঝুড়ি) নিয়ে সড়কের উপর দিকে উঠছিল। বোঝা তার তুলনায় ভারী। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যখন তখন উপুড় হয়ে পড়বে। হলও তাই। আলী আমজাদ আর নূরজাহানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হুড়মুড় করে পড়ল। লগে লগে ডানপা উঠে গেল আলী আমজাদের। জোরে লোকটার কোকসায় একটা লাথথি মারল। অশ্লিল একটা বকা দিল। বোরা জন্তুর মতো ভয়ে সিটকে গেল লোকটা। কাচুমাচু ভঙ্গিতে য়োড়া তুলে নামার দিকে নেমে গেল। কয়েক পলকের মধ্যে ঘটল ঘটনা। নূরজাহান বোবা হয়ে গেল।

আলী আমজাদ নির্বিকার ভঙ্গিতে নূরজাহানের দিকে তাকাল। হাসল। কী বোজলা? এইডা আসলে ছোট্ট একখান নমুনা দেখলা। তুমি সামনে আছিলা দেইক্কা মাত্র একটা লাথি দিছি। তুমি না থাকলে লাইথথাইয়া নিচে হালাইয়া দিতাম শালারে। শালায় ইচ্ছা কইরা বোঝা হালাইছে। য্যান অর য়োড়ায় কম মাডি দেওয়া অয়। আরামে আরামে কাম করতে পারে। আমার লগে এই হগল চালাকি চলে না। এই পড়া আমি বহুত আগে পইড়া থুইছি।

ভিতরে ভিতরে রাগে তখন ফেটে যাচ্ছে নূরজাহান। বাপের বয়সী একটা লোককে এমন লাথি মারতে পারে কেউ!

দাঁত কটমট করে নূরজাহান বলল, আপনে একটা খবিস। আপনে মানুষ না।

আমার জাগায় তুমি অইলে তুমিও এমুন করতা।

না করতাম না। যাগো দিলে রহম আছে তারা এমুন কাম করে না।

আমার দিলে নাই। নিজের লেইগা সব করতে পারি আমি।

করেন আপনের যা ইচ্ছা। আমি যাই।

নূরজাহান চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। আলী আমজাদ বলল, কই যাইবা?

গেরামে ঘুইরা ঘাইরা বাইত্তে যামু।

গেরামে ঘোরনের কাম কী? এহেনেই থাকো, তোমার লগে গল্প করি।

আপনে মনে করছেন রোজ রোজ সড়কে আমি আপনের লগে গল্প করতে আহি?

আলী আমজাদ সিগ্রেটে টান দিয়ে বলল, তয় ক্যান আহো?

আহি সড়ক দেকতে। মানুষজন দেকতে। সড়ক কতাহানি (কতখানি) অইলো না অইলো দেইক্কা যাই। কাইল থিকা আপনের সামনে আর আমু না। অন্য দিকদা সড়ক দেইক্কা যামু গা। আপনে মানুষ ভাল না।

আলী আমজাদ আবার হাসল। এইডা ঠিক কথা কইছো। আমি মানুষ ভাল না। বহুত বদ মানুষ আমি। যা ভাবি সেইটা কইরা ছাড়ি। টেকা পয়সা জান পরান কোনও কিছুর মায়া তহন আর করি না।

আলী আমজাদের কথা শুনে এই প্রথম ভয়ে বুক কেঁপে উঠল নূরজাহানের। অকারণে শাড়ি বুকের কাছে টানল। জড়সড় হয়ে গেল।

ব্যাপারটা খেয়াল করল আলী আমজাদ। হাসল। হাতের সিগ্রেট শেষ হয়ে আসছে। সিগ্রেটে শেষটান দিল। তারপর টোকা মেরে ফেলে দিল। আড়চোখে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে চটপটা গলায় বলল, এতক্ষুণ ধইরা নানান পদের প্যাচাইল পাড়লাম তোমার লগে, এইবার ভালকথা কই। তুমি আমার দাঁতের কথা জিগাইছিলা। সামনের একখান দাঁত পোকে খাইয়া হালাইছিলো। তহন নিজে কনটেকদারি করি না, ঢাকার বড় এক কনটেকদারের ম্যানাজারি করি। সে কইলো দাঁতের ডাক্তরের কাছে যাও, দাঁত ঠিক কইরা আহো। ডাক্তরের কাছে গেলাম, পোকড়া দাঁত হালাইয়া এই দাঁত লাগাইয়া দিলো। চাইছিলো পাথথরের দাঁত লাগাইতে, কম খরচে অইয়া যায়। আমি কইলাম, না সোনা দিয়াই বান্দান। তহন সোনার দামও কম আছিলো। আইজ কাইল তো সোনার বহুত দাম। এই দাঁতটাও দামি অইয়া গেছে।

আলী আমজাদ হাসল। এই দাঁত অহন আমার সম্পদ। বিপদ আপদে পড়লে খুইল্লা বেইচ্চা হালাইলে ভাল টেকা পামু।

নূরজাহান ঠাট্টার গলায় বলল, বেচনের আগে ভাল কইরা মাইজ্জা লইয়েন। এই রকম পচা গন্দ থাকলে সোনারুরা দাঁত কিনবো না।

আলী আমজাদ আবার হাসল। টেকা আর সোনার পচা গন্দরে গন্দ মনে করে না মাইনষে। হাতে পাইলেঐ খুশি অয়। পচা গন্দরে মনে করে আতরের গন্দ।

বাদ দেন এই সব প্যাচাইল। আমি যাই।

আড়চোখে আবার নূরজাহানকে দেখল আলী আমজাদ। কথা অন্যদিকে ঘুরাল। সড়কের কাম কবে শেষ অইবো হুইন্না যাইবা না?

নূরজাহান উদগ্রীব হয়ে আলী আমজাদের মুখের দিকে তাকাল। কবে?

দুইতিন মাসের মইধ্যে।

তারবাদে এই রাস্তা দিয়া গাড়ি চলবো?

তয় চলবো না? না চললে রাস্তা বানানের কাম কী?

কী গাড়ি চলবো?

বাস টেরাক মিনিবাস বেবিটেসকি।

আমগো গেরাম থিকা ঢাকা যাইতে কতক্ষুণ লাগবো?

ঘণ্টাহানি।

কন কী?

হ। তুমি ইচ্ছা করলে দিনে দুইবার ঢাকা গিয়া দুইবার ফিরত আইতে পারবা। অহন তো বিয়ানে মাওয়ার ঘাট থিকা লঞ্চে উটলে ঢাকা যাইতে যাইতে বিয়াল অইয়া যায়! ছিন্নগর (শ্রীনগর) দিয়া গেলে আরও আগে যাওন যায়। তয় হাঁটতে অয় অনেক।

আলী আমজাদের শেষ দিককার কথা আর কানে গেল না নূরজাহানের। আনমনা হয়ে গেল সে। স্বপ্নমাখা গলায় বলল, রাস্তা অইয়া যাওনের পর বাসে চইড়া ঢাকা যামু আমি। ঢাকার টাউন দেখনের বহুত শখ আমার।

বিকালবেলার চমৎকার এক টুকরা আলো এসে পড়েছে নূরজাহানের মুখে। সেই আলোয় অপূর্ব লাগছে মেয়েটিকে। তার শ্যামলা মিষ্টি মুখখানি, ডাগর চোখ, নাকফুল আর স্বপ্নমাখা উদাসীনতা কী রকম অপার্থিব করে তুলেছে তাকে। কুতকুতা চোখে মুগ্ধ হয়ে নূরজাহানকে দেখছে আলী আমজাদ। দেখতে দেখতে কোন ফাঁকে যে ভিতরে তার জেগে উঠতে চাইছে এক অসুর, খানিক আগেও আলী আমজাদ উদিস (টের) পায়নি।

ঠিক তখনই হা হা করা উত্তরের হাওয়াটা এল। সেই হাওয়ায় আলী আমজাদের কিছু হল না, নূরজাহানের কিশোরী শরীর অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে ভরে গেল। কোনওদিকে না তাকিয়ে ছটফট করে সড়ক থেকে নামল সে। শস্যের চকমাঠ ভেঙে, ভ্রূণ থেকে মাত্র মাথা তুলেছে সবুজ ঘাসডগা, এমন ঘাসজমি ভেঙে জোয়ারে মাছের মতো ছুটতে লাগল।

.

১.০৪

মিয়াদের ছাড়া বাড়ির দক্ষিণের নামায় এলোমেলো ভাবে ছড়ানো আটখানা খাজুর গাছ। সব কয়টা গাছই নারীগাছ। পুরুষগাছ নাই একটাও। নারী গাছে খাজুর ধরে, পুরুষ গাছে ধরে না। দুইরকম গাছের রসও দুইরকম। পুরুষ গাছের রস হয় সাদা। তেমন মিঠা না। নারী গাছের রস হালকা লাল। ভারি মিঠা। ভরা বর্ষায় গাছগুলির মাজা পর্যন্ত ওঠে পানি। কোনও কোনও বর্ষায় মাজা ছাড়িয়ে বুক ছুঁই ছুঁই। এবারের বর্ষা তেমন ছিল না। গাছগুলির মাজা ছুঁয়েই নেমে গেছে। ফলে প্রায় প্রতিটা গাছেরই মাজার কাছে সচ্ছল গিরস্ত বউর বিছার মতো লেগে আছে পানির দাগ। বয়সের ভারে নৌকার মতো বেঁকা হয়েছে যে গাছটা, বর্ষার পানি তারও পিঠ ছুঁয়েছিল। সারাবর্ষা পিঠ ছুঁয়ে থাকা পানি ভারি সুন্দর একখানা দাগ ফেলে গেছে পিঠে। এই গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে গভীর আনন্দে শ্বাস ফেলল দবির। বহুকাল পর প্রিয় মানুষের মুখ দেখলে যেমন হয়, বুকের ভিতর তেমন অনুভূতি। ভারের দুইদিকে ঝুলছে দশ বারোটা হাঁড়ি। সাবধানে ভারটা গাছতলায় নামাল সে। তারপর শিশুর মতো উচ্ছল হয়ে গেল। একবার এই গাছের গায়ে পিঠে হাত বুলায়, আরেকবার ওই গাছের। পাগলের মতো বিড়বিড় করে বলে, মা মাগো, মা সগল, কেমুন আছো তোমরা? শইল ভাল ভো? কেঐর কোনও ব্যারাম আজাব নাই তো, বালা মসিবত নাই তো?

উত্তরের হাওয়ায় শন শন করে খাজুরডগা। সেই শব্দে দবির শোনে গাছেরা তার কথার পিঠে কথা বলছে। ভাল আছি বাজান, ভাল আছি। ব্যারাম আজাব নাই, বালা মসিবত নাই।

বর্ষাকাল শেষ হওয়ার লগে লগে খাজুরতলায় জন্মেছে টিয়াপাখি রঙের বাকসা ঘাস। কার্তিকের কোনও এক সময় সাতদিনের জন্য নামে যে বৃষ্টি, লোকে বলে কাইত্তানি, এবারের কাইত্তানির ধারায় রাতারাতি ডাঙ্গর (ডাগর) হয়েছে বাকসা ঘাস। এখন মানুষের গুড়মুড়া (গোড়ালি) ডুবে যাওয়ার মতন লম্বা। এই ঘাস ছেঁয়ে আছে মরা খাজুরডগায়। গাছের মাথায় মরে যাওয়ার পর আপনা আপনি খসে পড়েছে তলায়। পাতাগুলি খড়খড়া শুকনা কিন্তু কাঁটাগুলি শুকিয়ে যাওয়ার পরও কাঁটা। টেটার নালের মতো কটমট করে তাকিয়ে আছে। যেন তাদের আওতায় এলেই কারও আর রক্ষা নাই। খাজুরতলায় পা দিলেই সেই পা ফুটা করে শরীরে ঢুকবে, ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যাবে। বাড়ি ফিরে কাঁটাফোটা জায়গায় কাঁথা সিলাবার সুই দিয়ে যতই ঘাটাঘাটি করুক, খাজুরকাঁটার তীক্ষ্ণ ডগার হদিস মিলবে না। সে মিশে যাবে রক্তে। রগ ধরে সারা শরীর ঘুরে বেড়াবে। দেড় দুইমাস পর বুক পিঠ ফুটা করে বের হবার চেষ্টা করবে। প্রচণ্ড ব্যথায় মানুষের তখন মরণদশা। কেউ কেউ মরেও।

সীতারামপুরের পুষ্প ঠাইরেনের (ঠাকরুনের) একমাত্র ছেলে মরেছিল খাজুরকাটায়। দুরন্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। শীতের রাতে ইয়ার দোস্তদের নিয়া রস চুরি করতে গেছে কুমারভোগে। টর্চ মেরে মেরে এইগাছ থেকে হাড়ি নামায়, ওইগাছ থেকে নামায়। তারপর গাছতলায় দাঁড়িয়েই হাঁড়িতে চুমুক। কারও কিছু হল না, ফিরবার সময় ঠাইরেনের ছেলের ডানপায়ে ফুটল কাটা। এক দুইদিন ব্যথা হল পায়ে। ঠাইরেন নিজে সুই দিয়ে ঘাটাঘাটি করল ছেলের পা। কাঁটার দেখা পেল না। চার পাঁচদিনের মাথায় মা ছেলে দুইজনেই ভুলে গেল কাঁটার কথা। দেড়মাস পর এক সকালে পিঠের ব্যথায় চিৎকার শুরু করল ছেলে। কোন ফাঁকে শরীর অবশ হয়ে গেছে। না নড়তে পারে, না বিছানায় উঠে বসতে পারে। শবরীকলা রঙের মুখখানা সরপুটির পিত্তির মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ঠাইরেন কিছু বুঝতে পারে না, দিশাহারা হয়ে ডাক্তার কবিরাজ ডাকে, ফকির ফাকরা ডাকে। হোমিপ্যাথি এলাপ্যাথি, পানিপড়া, তাবিচ কবচ, হেকিমি আর কতপদের যে টোটকা, কিছুতেই কিছু হল না। পাঁচদিন ব্যথায় ছটফট করল ছেলে তারপর বিয়ানরাতের দিকে মারা গেল। পিঠের যেখানটায় ব্যথা হচ্ছিল সেই জায়গা থকথক করছে। দেখেই বোঝা যায় মাংসে পচন ধরেছে। লাশ নাড়াচাড়ার সময় চাপ পড়েছিল, চামড়া ফেটে গদ গদ করে বের হল রোয়াইল ফলের মতো রং, এমন পুঁজ। সেই পুঁজের ভিতর দেখা গেল মাথা উঁচু করে আছে একখানা খাজুরকাঁটা।

এটা অনেককাল আগের কথা। তারপর থেকে দেশগ্রামে আর রস চুরি হয় না। লোকে মনে করে খাজুরগাছ মা জননী। মা যেমন বুকের দুধ সন্তানের জন্য লুকিয়ে রাখে, খাজুরগাছ তেমন করে রস লুকিয়ে রাখে গাছির জন্য। গাছি ছাড়া অন্য কেউ এসে বুকে মুখ দিলে কাঁটার আঘাতে মা জননী তার এসপার ওসপার (এপার ওপার) করেন, জান নেন। নাহলে এই যে এতকালের পুরানা গাছি দবির, বয়স দুইকুড়ির কাছাকাছি, গাছ ঝুড়ছে পোলাপাইন্যা কাল (বালক বয়স) থেকে, কই তার পায়ে তো কখনও কাঁটা বিনলো (ফুটল) না! গাছ ঝুড়তে উঠে কাঁটার একটা খোঁচাও তো সে কখনও পায়নি!

এইসব ভেবে নৌকার মতো বেঁকা হয়ে থাকা গাছটার পায়ের কাছে বিনীত ভঙ্গিতে দুইহাত ছোঁয়াল দবির। তিনবার সালাম করল গাছটাকে। বহুকাল পর মায়ের কাছে ফিরে আসা আদুরে ছেলে যেমন করে ঠিক তেমন আকুলি বিকুলি ভঙ্গিতে গাছটাকে তারপর দুইহাতে জড়িয়ে ধরল। বিড়বিড় করে বলল, মা মাগো, আমার মিহি (দিকে) ইট্টু নজর রাইখো মা। গরিব পোলাডার মিহি নজর রাইখো। এই দুইন্নাইতে তোমরা ছাড়া আমার মিহি চাওনের আর আছে কে! তোমরা দয়া না করলে বাচুম কেমতে! আমি তো হারা বচ্ছর তোমগো আশায় থাকি। তোমগো দয়ায় দুই তিনটা মাস সুখে কাটে। আরবছর (আগের বছর) ভালই দয়া করছিলা। এইবারও তাই কইরো মা। মাইয়া লইয়া, মাইয়ার মারে লইয়া বছরডা য্যান খাইয়া পইরা কাটাইতে পারি।

.

১.০৫

ছনুবুড়ির স্বভাব হচ্ছে সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ানো আর টুকটাক চুরি করা, মিথ্যা বলা। কূটনামিতে তার কোনও জুড়ি নাই। বয়স কত হয়েছে কে জানে! শরীরটা কঞ্চির ছিপআলা বড়শিতে বড়মাছ ধরলে টেনে তোলার সময় যেমন বেঁকা হয়ে যায় তেমন বেঁকা হয়েছে। যেন এই শরীর তার নরম কঞ্চির ছিপ, মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা বয়স নামের মাছ ছিপের সঙ্গে শক্ত সুতায় ঝুলিয়ে দেওয়া বড়িশির আধার (টোপ) গিলে ভাল রকম বেকায়দায় পড়েছে। দিশাহারা হয়ে মাছ তাকে টানছে, টেনে বেঁকা করে ফেলছে। কোন ফাঁকে ভেঙে পড়বে ছিপ কেউ জানে না। টানাটানি চলছে। আর এই ফাঁকেই নিজের মতো করে জীবনটা চালিয়ে যাচ্ছে ছনুবুড়ি। এই গ্রাম সেই গ্রাম ঘুরছে, এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরছে, চুরি করছে, মিথ্যা বলছে। এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে, ছনুবুড়ি আছে ভাল। মাথায় পাটের আঁশের মতো চুল, মুখে একটাও দাঁত নাই, একেবারেই ফোকলা, শরীরের চামড়া খরায় শুকিয়ে যাওয়া ডোবানালার মাটির মতো, পরনে আঠাইল্লা (এঁটেল) মাটি রঙের থান, হাতে বাঁশের একখানা লাঠি আর দুইচোখে ছানি নিয়ে কেমন করে যে এইসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ছনুবুড়ি, ভাবলে তাজ্জব লাগে।

আজ দুপুরে সড়কের ওপাশে, পুব পাড়ার জাহিদ খাঁর বাড়ি গিয়েছিল ছনুবুড়ি। জাহিদ খাঁর ছেলের বউদের অনুনুয় করে দুপুরের ভাতটা সেই বাড়িতেই খেয়েছে। খেয়ে ফিরার সময় ছানিপড়া চোখেই দেখতে পেয়েছে বাড়ির পিছন দিককার তরিতরকারির বাগানে বাইগন (বেগুন) ধরেছে, টমাটু (টমেটো) ধরেছে। এখনও ডাঙ্গর হয়নি বাইগন, টমাটুগুলি ঘাসের মতো সবুজ, লাল হতে দিন দশবারো লাগবে। তবু চুরির লোভ সামলাতে পারেনি। বার দুই তিনেক এদিক ওদিক তাকিয়ে টুকটুক করে দুই তিনটা বাইগন ছিঁড়েছে, চার পাঁচটা টমাটু ছিঁড়েছে। তারপর কোনওদিকে না তাকিয়ে হাঁটা দিয়েছে।

সার্থকভাবে চুরি করবার পর মনে বেদম ফুর্তি থাকে ছনুবুড়ির। এমনিতেই দুপুরের খাওয়াটা হয়েছে ভাল, ঢেকিছাটা লক্ষ্মীদিঘা চাউলের ভাত আর খইলসা (খলিসা) মাছের সালুন (ঝোল), তার ওপর সার্থক চুরি, ছনুবুড়ির স্বভাব জেনেও বাড়ির কেউ উদিস পায়নি, পথে নেমে বুড়ি আহল্লাদে একেবারে আটখানা। বাইগন টমাটু টোপরে (কোচর) নিয়ে সন্তানের মতো আঁকড়ে ধরে রেখেছে বুকের কাছে আর হাঁটছে খুব দ্রুত। চুরি করে বের হয়ে আসার পর ছনুবুড়ি হাঁটে একেবারে ছেমড়ির (ছুঁড়ির) মতো। বয়স নামের জুয়ান মাছটা টেনে তখন তাকে কাবু করতে পারে না।

আজও পারেনি। দ্রুত হেঁটে প্রথমে ছনুবুড়ি গেছে হাজামবাড়ি। সেই বাড়িতে বসে অনেকক্ষণ ধরে তামাক খেয়েছে। টোপরের বাইগন টমাটু একহাতে আঁকড়ে ধরা বুকের কাছে, অন্যহাতে নারকেলের ছোট্ট হুঁকা। গুরগুর গুরগুর করে যখন তামাক টানছে, হাজাম বাড়ির মুরব্বি সংসার আলী হাজামের সাইজ্জা মেয়ে (সেজোমেয়ে) তছি বুকের কাছে আঁকড়ে ধরা টোপরটা দেখে ফেলল। তছি জন্মপাগল। মাথার ঠিক নাই, কথাবার্তার ঠিক নাই। যুবতী বয়স কিন্তু চালচলন শিশুর মতো। ফলে তছির নাম পড়েছে তছি পাগলনী।

ছনুবুড়ির টোপরের দিকে তাকিয়ে তছি পাগলনী বলল, ও মামানি, টুপরে কী তোমার?

সংসার আলী হাজামের ছেলেমেয়েরা ছনুবুড়িকে ডাকে বুজি, তছি পাগলনী ডাকে মামানি। এই ডাকটা শুনলে পিত্তি জ্বলে যায় বুড়ির। কোথায় বুজি কোথায় মামানি! আত্মীয় অনাত্মীয় যে কাউকে বুজি ডাকা যায়, মামানি ডাকা যায় না। মামানি ডাক শুনলেই মনে হয় হাজামরা বুড়ির আত্মীয়। হাজামরা ছোটজাত। তারা কেমন করে ছনুবুড়ির আত্মীয় হয়! গ্রামের লোকে শুনলে বলবে কী! ছনুবুড়ির শ্বশুরপক্ষকে হাজাম ভাববে না তো! আজকালকার লোকেও মানুষের অতীত নিয়ে কম ঘটায় না। যা না তাই খুঁচিয়ে বের করা স্বভাবের মানুষের কী আকাল আছে গ্রামে!

এসব ভেবে রেগে গেল বুড়ি। তছি যে জন্মপাগল ভুলে গেল। হুঁকা নামিয়ে ছ্যানছ্যান করে উঠল। ঐ ছেমড়ি, তুই আমারে মামানি কচ ক্যা লো? আমি তর কেমুন মামানি।

ছনুবুড়ির সামনে, মাটিতে শিশুর মতো ল্যাছড় প্যাছড় করে বসল তছি। মাথা ভর্তি উকুন, সারাক্ষণ মাথা চুলকাচ্ছে। এখনও চুলকাল। চুলকাতে চুলকাতে বলল, কেমুন মামানি কইতে পারি না। টুপরে কী কও? কই থিকা চুরি করলা?

একে মামানি ডাক তার উপর চুরির বদলাম (বদনাম), মাথা খারাপ হয়ে গেল বুড়ির। হাতের লাঠি নিয়ে তড়বড় করে উঠে দাঁড়াল। গলা তিন চারগুণ চড়িয়ে ফেলল। আমি চোর? আমি চুরি করি, আ! হাজামজাতের মুখে এতবড় কথা?

ছনুবুড়ির রাগ চিৎকার একদম পাত্তা দিল না তছি। বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে হি হি করে হাসল। মাথা চুলকাতে চুলকাতে নির্বিকার গলায় বলল, তুমি তো চোর। ঐ মেন্দাবাড়ির ঝাকা থিকা হেদিনও তো তোমারে কহি (চিচিঙ্গা, এক ধরনের সবজি) চুরি করতে দেখলাম। আইজ কী চুরি করছো? দেহি টুপরে কী?

এবার চুরির কথা পাত্তা দিল না বুড়ি, মামানি নিয়ে পড়ল। ইচ্ছা কইরা মামানি কও আমারে! আত্মীয় বানাইছো, হাজাম বানাইছো আমারে! ওই মাগি, আমি কি হাজামজাতের বউঝি যে আমারে তুই মামানি কচ!

তছির বড়ভাই গোবেচারা ধরনের আবদুল তার বউ আর তছির মা তিনজনেই তখন বুড়িকে থামাবার চেষ্টা করছে। অর কথায় চেইতেন না বুজি। ও তো পাগল, কী থুইয়া কী কয়!

কীয়ের পাগল, কীয়ের পাগল ও? ভ্যাক ধরছে। অরে আমি দেখছি না তারিক্কার লগে ইরফাইন্নার ছাড়ায় ঢুকতে। পাগল অইলে এই হগল বোজেনি?

এ কথায় তছির মা ভাই স্তব্ধ হয়ে গেল। ভাইর বউ মুচকি হেসে মাথায় ঘোমটা দিল তারপর পশ্চিমের ছাপড়ায় গিয়ে ঢুকল।

তছি ততক্ষণে বুঝে গেছে তার নামে বদকথা বলছে ছনুবুড়ি। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। পাগল বলে কথার পিঠে কথা বলতে শিখেনি সে, এক কথা শুনে অন্য কথা বলে। এখনও তাই করল। বিলাইয়ের (বিড়ালের মতন মুখ খিঁচিয়ে বলল, ঐ বুড়ি কূটনি, চুন্নিবুড়ি, মামানি ডাকলে শইল জ্বলে, না? হাজামরা মানুষ না! ছোডজাত? তয় এই ছোডজাতের বাইত্তে আহো ক্যা? তাগো বাইত্তে তামুক খাওনের সমায় মনে থাকে না তারা হাজাম! হাজামরা যেই উক্কায় তামুক খায় হেই উক্কায় মুখ দেও কেমতে? হাজামগো থালে বইয়া দেহি কতদিন ভাত খাইয়া গেছে! বাইর অও আমগো বাইত থন, বাইর অও। আর কুনোদিন যদি এই বাইত্তে তোমারে দেহি, টেংরি ভাইঙ্গা হালামু।

তছির মারমুখা ভঙ্গি দেখে ছনুবুড়ি থেমে গেছে। মুখে কথা আটকে গেছে তার। গো গো করতে করতে হাজামবাড়ি থেকে নেমেছে। দক্ষিণের চক ভেঙে হাঁটতে শুরু করছে। এখন শেষ বিকাল। এসময় বাড়ি ফিরা উচিত। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনালে হাঁটা চালায় অসুবিধা। ছানিপড়া চোখে এমনিতেই ঝাপসা লাগে দুনিয়া। তার উপর যদি হয় আন্ধার, পথ চলতে আছাড় উষ্ঠা খাবে ছনুবুড়ি। এই বয়সে আতুড় লুলা হয়ে বেঁচে থাকার অর্থ নাই। ঘরে বসে জীবন কাটাবার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল।

এসব ভেবে দ্রুত পা চালাচ্ছে বুড়ি, মিয়াদের ছাড়া বাড়ির দক্ষিণে এসেছে, বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে যে লম্বা টোসখোলা ঝোপ সেই ঝোপের এই পাশ থেকে হেলেপড়া খাজুর গাছটার পায়ের কাছে ছানিপড়া চোখে একটা লোককে বসে থাকতে দেখল। দেখে থমকে দাঁড়াল। গলা টানা দিয়ে কলল, কেডারে খাজুরতলায়?

খাজুরতলা থেকে সাড়া এল। আমি।

আমি কে?

মানুষটা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। হাসি মুখে আমোদর গলায় বলল, কও তো কেডা?

বয়সী মাথা কাঁপাল ছনুবুড়ি। গলাডা চিনা চিনা লাগে!

তারপরই উচ্ছল হল। চিনছি। দউবরা। ঐ দউবরা খাজুরতলায় কী করচ তুই? গাছ ঝুড়ছ?

না অহনও ঝুড়ি না। যন্ত্রপাতি লইয়া বাইর অইছি। আইজ ঘুইরা ঘাইরা গাছ দেকতাছি। কাইল পশশু ঝুড়ম। তুমি আইলা কই থিকা?

জাহিদ খাঁর বাইত্তে দাওত খাইতে গেছিলাম।

কেডা দাওত দিলো তোমারে?

জাহিদ খাঁর বড়পোলায়। পোলার বউডা এত ভাল, দুই একদিন পর পরঐ দাওত দিয়া খাওয়ায় আমারে। কয় আমারে বলে অর মার মতন লাগে।

ছনুবুড়ির কথা শুনে হাসল দবির। কী খাওয়াইল?

ভাত আর চাইর পাঁচপদের মাছ। ইলসা, টাটকিনি, গজার। বাইং মাছও আছিলো। আমি খাই নাই। শ্যাষমেষ দিল দুদ আর খাজুরা মিডাই (খেজুরে গুড়)।

অহন খাজুরা মিডাই পাইলো কই?

আরবছরের মুড়ির জেরে (টিনে) রাইক্কা দিছিলো।

তারপর দবিরকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, বউডা এত ভাল বুজলি দউবরা, গাছের বাইগন, বিলাতি বাইগন (টমেটো) অহনও ডাঙ্গর হয় নাই, হেইডিও কতডি ছিড়া আমার টুপরে দিয়া দিল। কইলো বাইত্তে লইয়া যান। হাজামবাড়ি গেছি তামুক খাইতে, আমার টুপুর দেইক্কা তছি পাগলনী কয় কি, কী চুরি করলা! ক আমি বলে চোর!

ছনুবুড়ির স্বভাব জানার পরও তছির উপর রাগল দবির। বলল, বাদ দেও পাগল ছাগলের কথা। অর কথায় কী যায় আহে!

ছনুবুড়ি খুশি হয়ে বলল, হ, অর কথায় কী যায় আহে। তুই একখান কাম করিচ বাজান, পয়লা দিনের রস আমারে ইট্টু খাওয়াইচ।

খাওয়ামুনে। দুই চাইরদিন দেরি অইবো।

ক্যা, দেরি অইবো ক্যা?

গাছ ঝুইড়া ঠিল্লা পাততে সময় লাগবো না! উততইরা বাতাসটা আইজ খালি ছাড়ছে। আইজ থিকা রস আইছে গাছে। বেবাক কিছু ভাও করতে দুই তিনদিন লাগবো। পয়লা দিনের রস খাওয়ামুনে তোমারে, চিন্তা কইরো না। অহন খালি দেহ উততইরা বাতাসটা কেমনে ছাড়ছে! এইবারের রস দেখবা কেমুন মিডা অয়!

বিকাল শেষের উত্তরের হাওয়ায় ছনুবুড়ির পাটের আঁশের মতো চুল তখন ফুর ফুর করে উড়ছে। এই হাওয়ায় মনে কোনও পাপ থাকে না মানুষের, কূটনামী থাকে না কিন্তু ছনুবুড়ির মনে সামান্য কূটবুদ্ধি খেলা করতে লাগল।

১.০৬-১০ রান্নাচালার সামনে

১.০৬

রান্নাচালার সামনে আমকাঠের সিঁড়ি পেতে বসেছে মজনু। সকাল বেলার রোদ পাকা ডালিমের মতো ফেটে পড়েছে চারদিকে। এই রোদের একটা টুকরা ছিটকে এসে পড়েছে মজনুর ছোটখালা মরনির মুখের একপাশে। মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেছে তার। মজনু অপলক চোখে তাকিয়ে আছে খালার মুখের দিকে। দুনিয়াতে এই একটা মাত্র মুখ যে মুখের দিকে তাকিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে সে। আর কিছুর দরকার হয় না।

মাটির খোলায় মরনি এখন চিতইপিঠা ভাজছে। চুলার ভিতর চুটপুট চুটপুট করে জ্বলছে নাড়ার আগুন। রোদ নাড়ার আগুন মিলেমিশে হেমন্ত সকালের শীতভাব বিদায় করে দিয়েছে। রান্নাচালার চারপাশে বেশ একটা আরামদায়ক ভাব। লগে আছে চিতইপিঠা ভাজার গন্ধ। সব মিলিয়ে ভারি সুন্দর পরিবেশ। এই পরিবেশের কিছুই উদিস পাচ্ছে না মজনু। সে তাকিয়ে আছে খালার মুখের দিকে।

খোলা থেকে লোহার চটায় যত্ন করে প্রথম পিঠাটা তুলল মরনি। হাতের কাছে রাখা ছোট্ট বেতের ডালায় পিঠা নিয়ে মজনুর দিকে এগিয়ে দিল। নে বাজান খা। চিতই। পিডা গরম গরম না খাইলে সাদ (স্বাদ) লাগে না।

কথা বলতে বলতে মজনুর দিকে তাকিয়েছে মরনি, তাকিয়ে দেখে মজনু একদৃষ্টে চোখে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। মরনি অবাক হল। কীরে, এমতে চাইয়া রইছস ক্যা?

মজনু চোখ নামাল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এমতেঐ। অনেকদিন তোমারে দেহি না তো, ইট্টু দেকলাম।

একথায় মরনির বুকের ভিতর উথাল দিয়ে ওঠে মায়ের আদর। সে যে মজনুর মা না, খালা একথা তার মনে থাকে না। ডানহাত বাড়িয়ে মা যেমন কখনও কখনও তার সন্তানকে আদর করে ঠিক সেই ভঙ্গিতে মজনুর গালে মুখে একটা হাত বুলাল। আমিও তো তরে দেহি না বাজান। আমিও তো তর মুখটা কতদিন দেহি না। তরে না দেইক্কা এতদিন আমি কোনওদিন থাকি নাই।

আমি থাকছি?

না তুইই বা থাকবি কই থিকা! তর মায় মইরা যাওনের পরঐত্তো তরে আমি কুলে কইরা লইয়াইলাম। তারপর থিকা তুই আমার পোলা। আইজ সতরো আঠরো বচ্ছর তরে আমি চোখখের আঐল (আড়াল) করি নাই।

একথায় অদ্ভুত এক অভিমানে বুক ভরে গেল মজনুর। মুখ গোমড়া করে বলল, তাইলে অহন করছো ক্যান? ক্যান আমারে খলিফা (দর্জি) কামে দিলা? ক্যান আমারে টাউনে পাডাইলা?

মরনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খাদা (মাটির যে পাত্র ভাতের ফ্যান ঢালার কাজে ব্যবহৃত হয়) থেকে পাতলা করে গোলানো চাউলবাটা নারকেলের আইচায় (মালা) তৈরি হাতায় পরিমাণ মতো তুলে যত্ন করে ঢালল গরম খোলায়। লগে লগে ফুলে ফেপে চিতইপিঠার আকার ধরল জিনিসটা। মজনুর মুখের দিকে আর তাকাল না মরনি। অসহায় গলায় বলল, না পাডাইয়া কী করুম ক! তুই বড় অইছস না? কাম কাইজ হিগবি না? নাইলে খাবি কী কইরা?

এতদিন খাইছি কী কইরা? তুমি কি আমারে কুনোদিন না খাওয়াইয়া রাখছো?

না রাখি নাই। নিজে না খাইয়া রইছি, তরে রাখি নাই। সংসারের অভাব তরে বোঝতে দেই নাই।

তারপরই মরনির খেয়াল হল ডালায় তোলা পিঠা ঠাণ্ডা হচ্ছে। মজনু এখনও মুখে দেয়নি। চঞ্চল হল সে। কীরে খাচ না? ঠাণ্ডা অইলে ভাল্লাগবো না। তাড়াতাড়ি খা। আরেকখান পিডা অইয়া গেল। কুনসুম (কোন সময়) খাবি?

ডালা থেকে পিঠা তুলে কামড় দিল মজনু। নিজে না খাইয়া থাইক্কা আমারে যে তুমি খাওয়াইতা এইডা কইলাম আমি জানতাম খালা।

মজনুর কথায় চমকে উঠল মরনি। কেমতে জানতি?

আমি দেকছি না। কোনও কোনওদিন দোফরে কোনও কোনওদিন রাইত্রে আমারে ভাত দিয়া তুমি সামনে বইয়া থাকতা। আমি জিগাইতাম, ও খালা তুমি খাইবা না? দোফর অইলে তুমি কইতা আমি অহনতরি (এখন পর্যন্ত) নাই (গোসল। স্নান) নাই। না নাইয়া ভাত খাওন যায়! তুই পোলাপান মানুষ, তর খিদা লাগছে না? তরে খাওয়াইয়া নাইতে যামু আমি, তারবাদে খামুনে। তুই খাইয়া ল। আমি কইলাম বোঝতাম, যেডু (যতটুকু) ভাত তুমি রানছো, অডু (অতটুকু) ভাতে আমগো দুইজনের অইবো না। নিজে না খাইয়া, আমি যেন রাইতে খাইতে পারি এর লেইগা দুইফইরা ভাত তুমি রাইক্কা দিতা।

মজনু আবার পিঠায় কামড় দিল। আরেকটা পিঠা তখনই খোলা থেকে নামাল মরনি। মজনু তা খেয়াল করল না। পিঠা মুখে বলে স্বর জড়িয়ে যাবে জেনেও বলল, রাইতে দেকতাম আমার ভাত শেষ তাও তুমি খাইতে বহো না। এইমিহি চাও, ঐমিহি চাও, টুকুর টাকুর কাম কর। আমি জিগাই, ও খালা ভাত খাও না ক্যা? তুমি কইতা, তুই খাইয়া হুইয়া পর। আমি খাইয়া দাইয়া থাল বাসন ধুইয়া হুমুনে। ঘুমা, তুই ঘুমা বাজান। আমি হুইয়া পরতাম তয় ঘুমাইতাম না। তুমি মনে করতা আমি ঘুমাইয়া গেছি। আমি কইলাম ঘুমাইতাম না। কুপির আলোয় তোমারে দেকতাম হইলদা রঙ্গের একখান মগে কইরা ঢুকুস ঢুকুস কইরা পানি খাও। তারবাদে কুপি নিবাইয়া আমার পাশে হুইয়া একখান নিয়াস (দীর্ঘশ্বাস) ছাড়তা। খালাগো, ঐ নিয়াসটা আমার বুকে আইয়া লাগতো। আমি বোজতাম হারাদিন তুমি না খাইয়া রইছো। দোফরে খাও নাই, রাইতে খাও নাই। ভাদ্দর আশ্বিন মাসে কয়দিন পর পরঐ ভাত খাওন লইয়া আমার লগে এমন চালাকি করতা তুমি।

খোলায় আবার পিঠা দিল মরনি। চালাকি না বাজান। আমি না খাইয়া রইছি দেকলে তুই খাইতে চাবি না, তর ভাত আমারে ভাগ কইরা দিবি। দোফরে ভাত খাইয়া পেড না ভরলে হারাডা বিয়াল তুই ছটফট ছটফট করবি, রাইতে পেড না ভরলে ঘুমাইতে পারবি না, এর লেইগা তরে বোজতে দিতাম না। ভাদ্দর আশ্বিন মাসে দেশ গেরামে আকাল লাগে। আমগো লাহান গরিব গিরস্ত ঘরের ধান চাউল ফুরাইয়া যায়। একটা দুইডা মাস বড় কষ্ট যায় গিরস্তের। কাতি আগন মাসে হেই কষ্ট আর থাকে না। তহন ধান কাডা লাগে। বাড়ির উডান কাডা ধানে ভইরা যায়, ডোল (গোলা) ভইরা যায়।

তারপরই মজনুকে আবার তাড়া দিল মরনি। কীরে এত আস্তে আস্তে খাইতাছস ক্যা? মাত্র একখান পিডা শেষ করছস!

মজনু বলল, এই পিডাডা তুমি খাও। পরেরডা আমি খামুনে।

আমি খামু না বাজান।

ক্যা?

পিডা অইবো সাত আষ্টখান। অহন যেই কয়ডা পারছ তুই খাবি, যেই কয়ডা থাকবো দোফরে খাবি।

দোফরে ভাত খামু না?

না। একখান কুকুরার ছাও (মুরগির বাচ্চা)বাইন্দা থুইছি। তর পিডা খাওয়া অইলে জব কইরা দিছ। ভাল কইরা কসাইয়া দিমু। গরম গরম কসাইন্না গোস্ত দিয়া চিতইপিডা তুই খুব পছন্দ করছ। তর আহনের কথা হুইন্না এই ছাওডা আমি ঠিক কইরা রাকছি। খা।

আগে কখনও এমন হত না। আগেও কোনও কোনওদিন এমন করেই কথা বলত মরনি। মজনু ছোট ছিল, সারাক্ষণ ছিল খালার আঁচলের তলায়, চোখের সামনে। খালা যে গভীর মমতার গলায় প্রতিটি কথা বলে মজনু কখনও তা খেয়াল করত না। চারমাস খালাকে ছেড়ে আছে। দূরে থাকার ফলে, এতদিন পর, কাল বিকালে ফিরে আসার পর খালার প্রতিটা কথায়, প্রতিটা আচরণে বুকের ভিতর কেমন করে উঠছে মজনুর, চোখ ছলছল করে উঠছে। এখনও উঠল। এই চোখ খালাকে সে দেখতে দিল না। অন্যদিকে মুখ ঘুরাল।

মরনি বলল, এই বচ্ছর ধানপান ভাল অয় নাই। যতদিন যাইতাছে খেতের ধান কমছে। তরে খলিফা কামে দিয়া ভালঐ করছি। নাইলে তিন ওক্ত (বেলা) তরে আমি কী খাওয়াইতাম? কেমনে বাচাইয়া রাখতাম তরে!

মজনু ভুলে গেল আগের দিনের মতো, ভাদ্র আশ্বিন মাসের অভাবী দিনের মতো আজ সকালেও নিজে না খেয়ে মজনু দুপুরে খাবে বলে চিতইপিঠা তুলে রাখছে খালা। পরের পিঠাটা খেতে খেতে সে বলল, ক্যা, নিজেগো জমিন নিজে চুইতাম (চাষ করতাম) আমি! বিলে চৌদ্দগণ্ডা জমিন আমগো। বর্গা না দিয়া নিজে চুইলে (চষলে) যেই ধান পাইতাম নিজেরা বচ্ছর খাইয়াও বেচতে পারতাম। হেই টেকায় তোমার একজোড়া কাপোড় অইতো। আর লুঙ্গি পিরন অইতো। মাছ তরকারির তো আকাল নাই দেশ গেরামে। খালে পুকঐরে ম্যালা মাছ। হেই মাছ ধরতাম আমি। খেতখোলা থিকা সেচিশাক, কলমিশাক টোকাইয়া আনতা তুমি। বাড়ির নামায় কদু কোমর বাইগন বিলাতিবাইগন (টমেটো) সব সময়ঐত্তো বোনো তুমি। ধান ওডনের পর সউষ্যা (সরিষা) বোনতাম যেতে। বচ্ছরের তেলডা অইয়া যাইতো। বাইত্তে চাইরখান খাজুরগাছ। গাছি মামায় গাছ ঝুইড়া যেই রস দেয়, বচ্ছরের মিডাই অইয়া যায়। কিননের মইদ্যে কিনতে অইতো খালি নুন। নুন বহুত হস্তা জিনিস। দুইজন মাইনষের কয় টেকার নুন লাগে বচ্ছরে?

মজনুর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল মরনি। গিরস্তালি করা বহুত কষ্টের বাজান। এত কষ্ট তুই করতে পারতি না।

ক্যান পারুম না? আমি বড় অইছি না?

কত বড় আর অইছস!

আঠরো বচ্ছর বয়স অইছে, কম মনে করোনি তুমি?

খোলা থেকে আরেকটা পিঠা নামাল মরনি। নীল রঙের ময়লা নোংরা শাড়ির আঁচলে মুখ মুছল। চুলার পারে বসলে শীতকালেও মুখে গলায় ঘাম জমে। সেই ঘাম মুছল মরনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ তর বয়স পুরা আঠরো বচ্ছর। কোন ফাঁকে যে দিন গেলগা উদিস পাইলাম না। আমার খালি মনে অয় এই তো হেদিনকার কথা। তর মার বিয়ার আষ্ট মাস পর আমার বিয়া অইলো। আমি খালি এই সংসারে আইছি, তর মার আহুজ পড়বো (বাচ্চা হবে)। তগো বাইত্তে গেলাম বুজির লগে থাকনের লেইগা। আহুজ পড়নের সমায় দেশ গেরামের বউঝিরা বাপের বাইত্তে আহে, মা বইনের কাছে থাকে। আমগো তো মা বাপ আছিলো না, ভাই আছিলো না। তিন বইন আমরা মামাগো সংসারে বড় অইছি। আমি যহন খুব ছোড তহন বড়বুজির বিয়া অইছে। জামাই থাকে ফরিদপুর। বড়বুজি ফরিদপুর গেল গা। পাঁচছয় বচ্ছরে একবার নাইওর আইতো। তর মায় মরণের আগে, আমার বিয়ার সমায় বড়বুজিরে শেষ দেখছি। তার বাদে হে আর আহে নাই। তর মার মরণের সমবাদ পাইয়াও আহে নাই।

কথা বলতে বলতে উদাস হয়ে গেল মরনি। খোলায় শেষ পিঠা বসিয়েছে। এখন পিঠার দিকেও খেয়াল নাই।

রান্নাচালার পিছনে ঝাপড়ানো একটা জামগাছ। সকালবেলার রোদে চকচক করছে জামপাতা। একটা টুনটুনি পাখি লাফাচ্ছে গাছের ডালে। এই ডাল থেকে ওই ডালে যায় টুনটুনি, ওই ডাল থেকে সেই ডালে। জামগাছটার দিকে তাকায় মরনি ঠিকই পাখিটা দেখেও দেখে না। মনের ভিতর অতীত দিনের স্মৃতি। চোখ জুড়ে অতীত দিনের প্রিয় মানুষের মুখ।

উদাসীন গলায় মরনি বলল, বড়বুজির চেহারাডাও অহন আর মনে নাই। তর মায় মইরা সইরা গেছে, বড়বুজি বাইচ্চা থাইক্কাও সইরা গেছে। হেয়ও অহন মরা। তিন বইন একলগে গলা প্যাচাপেচি কইরা বড় অইছিলাম, দিন গেল, তিনজন তিনমিহি সইরা গেলাম। একজন মইরা সরলো আর দুইজন বাইচ্চা। আতকা বড়বুজিরে দেকলে আমি মনে অয় হেরে অহন চিনতে পারুম না। হেয়ও চিনতে পারবো না আমারে। সমায় এমুন কইরা আপনা মাইনষেরে পর বানাইয়া দেয়, অচিন বানাইয়া দেয়!

তিনখান পিঠা খেয়ে টিনের গেলাসে ঢক ঢক করে এক গেলাস পানি খেল মজনু। শেষ পিঠাটা তখনই খোলা থেকে নামাল মরনি। দেখে মজনুর মনে পড়ল সকালবেলা এখনও কিছু মুখে দেয়নি খালা। পিঠা ভেজে তাকে খাওয়াচ্ছে আর ফাঁকে ফাঁকে গল্প করছে। তিনখান পিঠা খেয়ে তার পেট ঢোল আর খালা এখনও খালি পেটে। ব্যস্ত গলায় মজনু বলল, তুমি দিহি কিছু খাইলা না?

মরনি হাসল। বিয়ানে আমার কিছু খাইতে ইচ্ছা করে না। খিদা লাগে না।

আমার লগে মিছাকথা কইয়ো না খালা। বিয়ানে মাইনষের খিদা না লাইগ্যা পারে?

পারে বাজান, পারে। বহুদিন পর ঘরের পোলা ঘরে ফিরা আইলে মার পেড এমতেঐ ভইরা থাকে। বিয়ানে দোফরে রাইত্রে কিছু না খাইলেও খিদা লাগে না। এতদিন পর তুই যে আমার সামনে বইয়া খাইলি এইয়া দেইক্কাই আমার খাওয়া অইয়া গেছে। পেড ভইরা গেছে।

মরনির কথা শুনে আবার চোখ ছলছল করে উঠল মজনুর। আবার অন্যদিকে মুখ ফিরাল সে। এই ফাঁকে চুলার জ্বাল নিভিয়ে জিনিসপত্র গোছগাছ করতে লাগল মরনি। পিঠাগুলি মাটির বাসনে রাখতে রাখতে বলল, আফাজদ্দি খলিফা মানুষ কেমুন?

মজনু কথা বলল না। খালার দিকে তাকালও না। যেমন অন্যদিকে তাকিয়েছিল তাকিয়ে রইল।

মরনি অবাক হল। মজনুর কাঁধের কাছে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে বলল, কী অইলো বাজান, কথা কচ না ক্যা? ব্যাজার অইছস ক্যা?

এবার খালার দিকে মুখ ফিরাল মজনু। ছলছল চোখে অবুঝ গলায় বলল, অমু না? ব্যাজার অমু না? অহনও কি ভাদ্দর আশ্বিন মাস? অহনও কি আমি ছোডঃ?

হায়রে পাগল পোলা, আমারে তুই কী করতে কচ?

আমার সামনে বইয়া পিডা খাইবা তুমি। অহনে খাইবা, দোফরে খাইবা। রাইত্রে আমার লগে বইয়া ভাত খাইবা। আমি যতদিন দেশে থাকুম আমার লগে বইয়াঐ তিন ওক্ত খাওন লাগবো তোমার। যুদি না খাও আমিও খামু না। আমি ঢাকা যামু গা।

মরনি কথা বলে না। অদ্ভুত চোখ করে মজনুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

হাত বাড়িয়ে খালার একটা হাত ধরল মজনু। চাইর মাসে খলিফা কাম আমি ভালঐ হিগছি। হাতের কাম পুরাপুরি হিগছি, কাটিংও হিগছি কয়খান। ফিরা গিয়া মিশিনে বমু। আফাজ মামায় কইছিলো আর দুই মাস পর বাইত্তে যা, তহন তুই পুরা খলিফা অইয়া যাবি। অহন তো থাকন খাওন বাদ দিয়া দুইশো টেকা পাছ, দুই মাস বাদে পাবি চাইরশো। একবারে কিছু টেকা লইয়া খালার লগে দেহা করতে যাই। আমি কইলাম, না আমি অহন যামু। খালারে এতদিন না দেইক্কা আমি কোনওদিন থাকি নাই। মিশিনে বহনের আগে খালার মুখখানা ইট্টু দেইক্কাহি (দেখে আসি)।

মজনুর কথা শুনতে শুনতে শেষদিকে দিশাহারা হয়ে গেল মরনি। গভীর আনন্দের গলায় প্রায় চিৎকার করে উঠল। তর মায়না অইছে বাজান, অ্যা? দুইশো টেকা মায়না অইছে? কবে থিকা মায়না অইছে? কাইল বিয়ালে বাইত্তে আইলি, একটা রাইত গেল, তুই দিহি আমারে কিছু কইলি না?

মজনু নির্মল মুখ করে হাসল। তোমারে দেইক্কা আমার আর কিছু মনে আছিলো না খালা। সন্দা অইতে না অইতে ভাত খাইয়া তোমার কুলের কাছে হুইয়া ঘুমাইয়া গেলাম। হারা রাইত আর উদিস পাইলাম না। বিয়ানে উইট্টা মনে অইলো চাইর মাস বাদে ঘুমাইলাম। কাইল সন্দায় তোমার সামনে বইয়া ভাত খাইয়াও মনে অইলো চাইর মাস বাদে ভাত খাইলাম।

যে রকম আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়েছিল মরনির এখন ঠিক সেই ভঙ্গিতেই ম্লান হল। ক্যা রে বাজান? আফাজদ্দি খলিফা তরে হুইতে দেয় না, খাইতে দেয় না? এর লেইগা তুই এমন কাহিল হইয়া গেছচ, হুগাইয়া (শুকিয়ে) গেছচ!

কেডা কইলো আমি হুগাইছি! তোমার চোক্কে তো আমি সব সমায়ঐ হুগনা। হোনো, খলিফা কাম করতে অয় রাইত দোফর পইরযন্ত। রাইত দোফরে হুইয়া ওটতে অয় ফয়জরের আয়জানের লগে লগে। এক মাতারি (মহিলা) বাসা থিকা ভাত রাইন্দা আইন্না বেবাক কর্মচারিগো খাওয়ায়। গুড়াগাড়ি (ছোট ছোট) মাছ আর ডাইল। রান্দন যে মাইনষের এত খারাপ অইতে পারে, ইস কী কমু তোমারে! মুখে দেওন যায় না।

তাইলে ঐ মাতারির রান্দন খাচ ক্যা?

কী করুম, বেবাকতে খায়! আফাজ মামার ঠিক করা মাতারি, হে খাওনের টেকা দেয়, তার ইচ্ছায়ঐত্তো খাওন লাগবো! খলিফা কামে পয়লা পয়লা থাকন খাওন খারাপঐ অয়। ছোট্ট একখান ঘরে চিপাচিপি (গাদাগাদি) কইরা হুইতে অয় দশ বারোজন মাইনষের। ওমনে হুইলে ঘুম আহে, কও! তয় খলিফা অইতে পারলে আইজ কাইল লাব আছে। টাউনে বিরাট বিরাট গারমেন হইতাছে। তিন চাইর হাজার টেকা এহেকজন খলিফার মায়না। দুইয়েক বচ্ছর বাদে আমিও ঐরকম গারমেনে চাকরি লমু! তহন বড় খলিফা অইয়া যামু।

গারমেন কী রে বাজান?

জামা কাপোড়ের কারখানা। এইদেশ থিকা জামা কাপোড় বানাইয়া লন্ডন আমরিকায় পাড়ায়।

একটু থেমে মজনু বলল, গারমেনে চাকরি লইয়াঐ টাউনে একখান বাসা ভাড়া লমু। তোমারে লইয়া যামু। তহন তোমার আর এত কষ্ট করন লাগবো না। অহনও কোনও চিন্তা তুমি কইরো না। পয়লা তিনমাস পেডেভাতে কাম হিগছি। একমাস ধইরা দুইশো টেকা মায়না পাই। পনচাস টেকা আমার পকেট খরচার লেইগা রাইক্কা দেশশো টেকা কইরা মাসে তোমারে পাডামু। কহেক মাস বাদে যহন চাইরশো টেকা মায়না অইবো তহন পাডামু তিনশো কইরা। এইদিন থাকবো না খালা, দিন বদলাইবো।

কথা বলতে বলতে শার্টের বুক পকেট বরাবর একটা বোতাম খুলল মজনু, বুকে হাত দিল। মরনি অবাক হয়ে মজনুর দিকে তাকাল। কী অইলো বাজান, পিপড়ায় কামোড় দিছে?

মজনু হাসল। না, শাডের ভিতরে একখান জেব (পকেট) আছে। টেকা পয়সা হেই জেবে রাখি।

হাত বের করল মজনু। হাতে অনেকগুলি কড়কড়া দশ টাকার নোট। এত টাকা মজনুর হাতে দেখে অবাক হয়ে গেল মরনি। টাকার দিকে তাকিয়ে রইল।

মজনু বলল, আমার পয়লা মাসের মায়নার টেকা। লঞ্চ ভাড়া দিয়া একশো ষাইট টেকা আছে। নেও ধরো।

তখনও অবাক ভাব কাটেনি মরনির। ঘোর লাগা ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে টাকা নিল। কোন ফাঁকে চোখ ভরে গেছে পানিতে, টের পায়নি। গাল বেয়ে চোখের পানি নামল মরনির। তবু মুখখানা হাসিমাখা। একহাতে চোখের পানি মুছে টাকাটা সে একবার বুকে ছোঁয়ায়, একবার কপালে। মুখে কথা নাই।

খালার এই অবস্থা দেখে মুগ্ধ হল মজনু। বলল, চাইছিলাম শতেকখানি টেকা দিয়া তোমার লেইগা একখান কাপোড় কিন্না আনি। পরে মনে করলাম টেকাডাঐ আইন্না তোমার হাতে দেই। আমার পয়লা রুজি দেইক্কা খুশি অইবা তুমি। ও খালা, খুশি অও নাই, খুশি অও নাই তুমি?

আবার চোখ ভরে পানি এল মরনির। তবে মুখে আনন্দের হাসিখানা লেগেই আছে। ঠেলে ওঠা কান্না বুকে চেপে বলল, বহুত খুশি অইছি, বহুত খুশি অইছি বাজান। পোলার পয়লা রুজির টেকা হাতে লইছি, আমার থিকা সুখি মা আর কে আছে দুইন্নাইতে। এই টেকা থিকা পাচটেকার সিন্নি দিমু খাইগো বাড়ির মজজিদে (মসজিদ)। মুন্সি সাবরে দিয়া মলুদ শরিফ (মিলাদ) পড়ামু। আল্লায় যে আমার মনের আশা পূরণ করছে, আল্লার কাছে হাজার শুকরিয়া, লাক লাক শুকরিয়া।

একহাতে মজনুর মাথাটা বুকের কাছে টেনে আনল মরনি। তরে ছাইড়া থাকতে কেমুন কষ্ট যে আমার অয়, বাজানরে, আল্লা ছাড়া কেঐ জানে না। খাইতে বইলে মনে অয়, তুই ভাত খাইছসনি! ঘুমাইতে গেলে মনে হয়, তুই কেমতে হুইয়া রইছস, কেমতে ঘুমাইছস! আমার রাইত কাইট্টা যায় তর কথা চিন্তা কইরা। খালি মনে অয় আমার বুকের মানিক কই পইড়া রইছে আর আমি কই। তর কষ্টে আমার বুক ফাইট্টা যায় বাজান।

খালার বুকের কাছে মুখ রেখে মজনু বলল, আমারও তোমার মতনঐ অয় খালা। আমারও তোমার লেইগা মনডা কান্দে। তোমার মুকহান দেহনের লেইগা মন ছুইট্টা যায়।

তরে আমি খলিফা কামে ক্যান দিছি জানচ! ক্যান আমগো গেরামের আফাজদ্দি খলিফা দেশে আহনের পর তারে গিয়া কইছিলাম, আমার পোলাডারে আপনের কাছে লইয়া যান, অরে কাম হিগান, খলিফা বানান।

ক্যান কইছিলা খালা?

তর মায় মরণের পর থিকা তুই আমার কাছে। তরে আমি মাডিতে হোয়াই নাই পিপড়ার ডরে, মাথায় রাখি নাই উকুনের ডরে। তবে আমি রাখছি আমার বুকে। হেই বুকের ধন দূরে ঠেইল্লা দিলাম খালি একখান্ কথা চিন্তা কইরা। খেতখোলার কাম, গিরস্তালি তুই করতে পারবি না। তর শইল্লে কুলাইবো না। তুই এমুন একখান কাম হিগবি, জীবন ভইরা এমুন একখান কম করবি, যেই কাম সোন্দর কাম। হাত পায়ে প্যাককেদা লাগে না, কহর পড়ে না। যেই কাম ভাল কাপোড় জামা ফিন্দা করন যায়। যেই কাম অন্য মাইনষেরেও সোন্দর করে। অন্য মাইনষের শইল্লে বসন তুইল্লা দেয়। ঢাকা থিকা ভাল জামা কাপোড় ফিন্দা যে কোনও মানুষ ফিরত আইলে তারে দেইক্কা য্যান তর কথা মনে অয় আমার। য্যান মনে অয় এই জামা কাপোড় আমার মজনুর হাতে বানানো, আমার বাজানের হাতের পরশ আছে দেশের বেবাক সোন্দর সোন্দার জামা কাপোড়ে।

মজনু মুগ্ধ গলায় বলল, আমি তোমার মনের আশা পূরণ করুম খালা। দেইখো আমি ঠিকঐ বড় খলিফা অমু।

ডালা থেকে একটা পিঠা নিল মজনু। খালার মুখের সামনে ধরে বলল, অহন আমার হাত থিকা এই পিডাডা খাইবা। না খাইলে তোমার লগে আর কথা নাই। আইজ ঢাকা যামু গা।

টাকা হাতে ধরা মরনি অদ্ভুত চোখে মজনুর দিকে তাকাল, হাসিমুখে এক কামড় পিঠা খেল। তারপর ডানহাত বাড়িয়ে পিঠাটা নিল। দে বাজান, খাইতাছি।

মজনু বলল, খাইতে খাইতে আমার মার কথা কও খালা, বাপের কথা কও।

বাপের কথা কী হুনবি! মেউন্না (মেনিমুখো) পুরুষপোলা। তর মায় মরণের পর চল্লিশ দিনও গেল না, আরেকখান বিয়া করলো। তর মিহি (দিকে) ফিরাও চাইলো না।

কেমনে চাইবো, আমি তো তহন তোমার কাছে!

আমার কাছে থাকলেই কি পোলা দেকতে আহন যায় না?

আহে নাই?

না কোনওদিন আহে নাই। মাইনষের কাছে কইতো বউ মরছে, পোলাও মরছে। এর লেইগাঐত্তো তর বাপের মুখ তরে আমি কোনওদিন দেকতে দেই নাই। বাপ পোলা কেঐ কেঐরে চিনে না। নতুন সংসারে ম্যালা লোপান তার। আছে ভালঐ।

বাপের কথা বাদ দেও। মার কথা কও।

মরনি আরেক কামড় পিঠা খেল। তর মার আহুজ পড়বো, আমি গেছি বইনের কাছে থাকতে। তিনদিন আহুইজ্জা বেদনায় কষ্ট পাইলো বইনে। তারবাদে তুই অইলি। ভালয় ভালয়ই অইলি। মাত্র ছয়দিন, দোফর বেলা ছটফট করতে করতে মইরা গেল বইনে। আমার চোক্কের সামনে। আমি তরে কুলে লইয়া বইয়া রইছি, তুই বুজলিও না কারে তুই জীবনের তরে হারাইলি।

মজনু করুণ মুখে হাসল। আসলে হারাই নাই খালা। যে মরছে হে মরছে, আমি তো আমার মার কুলেই আছি। এই যে আমার মা।

বলেই খালার একটা হাত ছুঁয়ে দিল মজনু।

মরনি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক কইছস তর মা অমু দেইক্কাঐ আল্লায় আমারে পোলাপান দিলো না। তর রুজি খামু দেইকাঐ বস্বেরকালে (বয়সকাল) রাড়ি (বিধবা) অইলাম। বিলে চৌদ্দগণ্ডা জমিন, চাইর শরিকের বাড়িডার দক্ষিণ দিকে এডু জাগা, দুইখান ঘর, এই হগল রাইক্কা তর খালু মরলো। বাজানরে, দুইন্নাইতে তুই আর আমি ছাড়া আমগো কেঐ নাই।

জামগাছ থেকে টুনটুনিটা কখন উধাও হয়েছে, পাকা ডালিমের মতো রোদ কখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে, দুইজন মানুষের কেউ তা খেয়াল করে না। তারা স্তব্ধ হয়ে থাকে গভীর কোনও দুঃখ বেদনায়।

.

১.০৭

ঘরের খাড়া পিড়ার (পৈঠা) সঙ্গে ঢেলান (হেলান) দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে বালিকাচা। উঠানে বসে বালিকাচায় ঘষে ঘষে ছ্যানে ধার দিচ্ছে দবির। খালি গা, লুঙ্গি কাছা মারা দবিরের পিঠে এসে পড়েছে সকালবেলার রোদ। রোদেপোড়া পিঠ চকচক করছে।

দবিরের হাতের একপাশে পড়ে আছে ঠুলই অন্যপাশে মাটির মালশায় বালি। বালিটা ছাই রঙের। এটা মুড়ি ভাজার বালি। আরবছর (আগের বছর) শীতকালে মুড়ি ভাজার পর যত্ন করে বালিটা মাটির পুরানা ঠিলায় রেখে দিয়েছিল হামিদা।

হামিদার কাছে সংসারের ফেলনা জিনিসটাও দামি। কোনও কিছুই ফেলে না সে। যত্নে তুলে রাখে ঘরদুয়ারের কোথাও না কোথাও। কে জানে কখন দরকার পড়বে কোনটার। হাত বাড়িয়ে না পেলে জোগাড় করতে জান বের হয়ে যাবে। খাটনির খাটনি সময়ও নষ্ট।

মুড়ি ভাজার বালি জোগাড় করতে হয় পদ্মারপার থেকে। মাওয়া কুমারভোগ বরাবর পদ্মারতীরে এখন বিশাল বালিয়াড়ি। পদ্মা সরে যাচ্ছে দূরে। তীরে রেখে যাচ্ছে সাদাবালি। মুড়িভাজার জন্য গরিব গিরস্তরা এসব জায়গা থেকে বালি জোগাড় করে আনে।

কাঁচা বালিতে মুড়ি ভাল ভাজা হয় না। বালি আগুনে ভাজা ভাজা করে নিতে হয়। গরম হলে বালির তেজ বাড়ে। সামান্য নুন পানি মিশান চাউল খোলায় টেলে (সামান্য ভাজা অর্থে) যে হাঁড়িতে গরম করা হয় বালি সেই বালিতে চাউল ঢেলে দুইহাতের কায়দায় আড়াই তিন পাক ঘুরালেই চুরমুর চুরমুর করে ফুটে উঠবে শিউলি ফুলের মতো মুড়ি। ভাজা মুড়ির গন্ধে বিভোর হবে দশদিক।

একবার ব্যবহার করা বালি এজন্য রেখে দেয় গিরস্ত বউরা। হামিদাও রেখেছে। যদিও মুড়ি ভাজার চেয়ে দবির গাছির ছ্যানের ধার দেওয়ার জন্য বালিটা সংসারে বেশি দরকার। মুড়ি ভাজার বালিতে ধার বেশি হয়। পাঁচ আঙুলের একথাবা বালিকাচায় ছিটিয়ে ছ্যানের আগায় একহাত মাথায় একহাত, ঘষা দেওয়ার লগে লগে ঝকঝক করে উঠবে ছ্যান। পাঁচ সাত মিনিটের মাথায় এমন হবে ধার, খাজুরগাছের গলা বরাবর ছোঁয়ালেই কোন ফাঁকে উধাও হবে শক্ত বাকল, খাজুরের নরম অঙ্গ দেখা যাবে রসে চপচপ করছে। আস্তে করে কঞ্চির নল ছোঁয়ালে ঢুকে যাবে। টুপটুপ টুপটুপ করে রস এসে পড়বে হাঁড়িতে। রাত পোহাবার জাগেই হাঁড়ি ভরে যাবে রসে। গন্ধে ম ম করবে চারদিক।

ভারটা পড়ে আছে উঠানের মাঝ বরাবর। লগে ছয়সাতটা হাঁড়ি। হাঁড়িগুলি ছিল রান্নাচালার বাতার সঙ্গে ঝুলান। বড়ঘরের চৌকির তলারগুলি কাল বিকালে মিয়াদের ছাড়া বাড়িতে রেখে এসেছে দবির। আজ এইগুলি নামিয়েছে হালদার বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে। হাঁড়ি আরও কিছু লাগবে। মঙ্গলবার গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে কিনে আনবে। এইবছর হাওয়া যেমন ছাড়ছে, রস পড়বে জবরদস্ত। কষ্ট যতই হোক চারপাশের গ্রামের সবগুলি গাছই ধরার চেষ্টা করবে দবির। রস বেচে সংসারের চেহারা ঘুরাতে হবে। চাষের জমিন যেটুকু আছে, এক কানিও হবে না। নিজে চষেও বছরের ধান হয় না। গাছি না হলে তো, শীতকালে রসের কারবার করে আয় না করলে তো তিনজন মানুষের তিন ওক্তের খাওয়াই জুটত না। তার ওপর মেয়ে বড় হচ্ছে। দুইতিন বছরের মধ্যে বিয়াশাদি দিতে হবে। আজকাল মেয়ে বিয়া দেওয়ার অর্থ সর্বস্বান্ত হওয়া। জামাইরে এইটা দেও, ওইটা দেও। যৌতুক ছাড়া মেয়ের বিয়া দেওয়া যায় না। সোনাদানা তো আছেই, নগদ টাকাও দিতে হয়। দবির গাছির মতো মানুষ এসব পাবে কোথায়? এখন থেকে এসব বিষয়ে না ভাবলে মেয়ের বিয়ার সময় জমিন বিক্রি ছাড়া উপায় থাকবে না। ওইটুকু মাত্র জমিন মেয়ের পিছনে গেলে হামিদাকে নিয়ে খাবে কী! দুইজন মানুষের তো বাঁচতে হবে, নাকি!

ছ্যানে ধার দিতে দিতে এসব ভাবছে দবির। সময় যে অনেকটা কেটেছে খেয়াল করেনি। ছ্যান যে অতিরিক্ত ধার হয়েছে খেয়াল করেনি। ঘষেই যাচ্ছে, ঘষেই যাচ্ছে।

ব্যাপারটা খেয়াল করল নূরজাহান। রান্নাচালায় জলচৌকিতে বসার মতো করে বসেছে সে। টোপরে চাউলভাজা। রান্নাচালার ভিতর চুলার পারে বসে খানিক আগেই দুই খোলা মোটাচাউল ভেজেছে হামিদা। একখোলা দিয়েছে নূরজাহানকে, আরেক খোলার অর্ধেকটা নিজে নিয়েছে, অর্ধেকটা রেখেছে স্বামীর জন্য। কিন্তু স্বামীর দেখি ছ্যানে ধার দেওয়াই শেষ হয় না। কখন চাউলভাজা খাবে, কখন বাড়ি থেকে বের হবে!

একমুঠ চাউলভাজা মুখে দিয়ে স্বামীকে ডাকতে যাবে হামিদা তার আগেই নূরজাহান বলল, ও বাবা, কত ধার দেও? ছ্যান দেহি চকচক করছে!

নূরজাহানের কথায় বাস্তবে ফিরল দবির। আনমনা ভাব কেটে গেল। বালিকাচায় ছ্যান ঘষা বন্ধ করে আঙুলের ডগায় ধার দেখল। তারপর হাসিমুখে মেয়ের দিকে তাকাল। ইট্টু বেশি ধার দিলাম মা। ম্যালা গাছ ঝুড়ন লাগবো।

টোপর থেকে একমুঠ চাউলভাজা নিয়ে মুখে দিল নূরজাহান। জড়ান গলায় বলল, আইজ কোন বাড়ির গাছ ঝুড়বা?

হালদার বাড়ির।

হালদার বাইত্তে খাজুরগাছ কো?

আছে। মজনুগো সীমানায় চাইরখান খাজুরগাছ আছে।

মজনু নামটা শুনে ভারি একটা খুশির ভাব হল নূরজাহানের। উচ্ছল গলায় বলল, মজনু দাদায় বলে অহন টাউনে থাকে? আফাজদ্দি খলিফার কাছে খলিফাগিরি হিগে?

হ, আমিও হুনছি। তরে কইলো কে?

ডালায় করে চাউলভাজা এনে স্বামীর সামনে রাখল হামিদা। নূরজাহান কথা বলার আগেই বলল, অরে কি আর কোনও কিছু কওন লাগে! হারাদিন পাড়া বেড়ায়। এই বাইত্তে যায়, ওই বাইত্তে যায়, কোন বাইত্তে কী অইলো বেবাক অর জানা।

দবির তখন ছ্যান ভরেছে ঠুলইতে। ভারের দুই মাথায় ঝুলিয়েছে হাঁড়িগুলি। এখন ঠুলই মাজায় বেঁধে, কাঁধে কাছি ফেলে বাড়ি থেকে বের হলেই হয়। হামিদা যে তার সামনে চাউলভাজার ডালা রেখেছে সেদিকে খেয়ালই নাই।

ঘটনা বুঝে হামিদা বলল, খাওন লাগবো না?

দবির হাসিমুখে হামিদার দিকে তাকাল। রসের দিনে খাওন দাওনের কথা মনে থাকে না।

হামিদা বলল, মনে না থাকলেও খাওন লাগবো। নাইলে মরবা।

দবির ফুর্তির গলায় বলল, আরে না এত সকালে মরুম না। মাইয়ার বিয়া দেওন লাগবে না?

তারপর ডালা থেকে একমুঠ চাউলভাজা নিয়ে মুখে দিল।

নিজের বিয়ার কথা শুনে, বাবার ওই রকম ফুর্তির ভাব দেখে টোপর ভাল করে চেপে ধরে মা বাবার সামনে এগিয়ে এল নূরজাহান। চঞ্চল গলায় বলল, ভাল কথা কইছো বাবা। আমারে বিয়া দিয়া দেও।

মেয়ের কথা শুনে রেগে গেল হামিদা। নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে ধমক দিল। চুপ কর খাচ্চরনি। এত বড় মাইয়া মা বাপের মুখের সামনে বিয়ার কথা কয়!

দবির কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই নূরজাহান বলল, কইলে কী অয়? বিয়া তো আমারে তোমরা দিবাই!

আবার ধমক দিতে চাইল হামিদা, তার আগেই দবির বলল, এমুন কইরো না মাইয়ার লগে। কইছে কইছে। পোলাপান মানুষ এই হুগল বোজেনি।

হামিদা আগের মতোই রুক্ষ গলায় বলল, কীয়ের পোলাপান মানুষ! বস কম অইছেনি তোমার মাইয়ার? দামড়ি (যৌবনবতী গাভী অর্থে) অইয়া গেছে অহনতরি কথাবার্তির ঠিক নাই। এই মাইয়ারে তুমি হামলাও গাছি। নাইলে কইলাম বিপাকে পড়বা।

কী বিপাকে পড়ম?

যেমনে পাড়া চড়ে কুনসুম কী অইয়া যাইবো উদিস পাইবা না।

দবির আবার চাউলভাজা মুখে দিল। মাইয়া হামলানের কাম বাপের না, মার। তুমি হামলাও না ক্যা?

হামিদা ঘাড় বেঁকা করে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল। আমি কইলাম পারি।

পারলে হামলাও।

তুমি কিছু কইবা না তো?

আমি কী কমু! মাইয়া আমারও যেমুন তোমারও অমুন।

কথাখান য্যান মনে থাকে।

দবির হাসিমুখে বলল, থাকবো।

নূরজাহানের দিকে তাকাল হামিদা। কী কইছে তর বাপে হোনছস?

নূরজাহান নির্বিকার গলায় বলল, হুনছি।

তারপর আবার চাউলভাজা মুখে দিল।

দবির ততক্ষণে মুখভরে চাউলভাজা নিয়ে নিজের ভাগেরটা খেয়ে শেষ করেছে। এখন রান্নাচালার ঠিলা থেকে টিনের মগে পানি ঢেলে খাচ্ছে। মা মেয়ের কথার দিকে খেয়াল নাই।

পানি খাওয়া শেষ করে ঠুলই মাজায় বাঁধল দবির। কাছি ফেলল এক কাঁধে আরেক কাঁধে তুলল ভার। উঠান পালান ভেঙে বাড়ির নামার দিকে হেঁটে যেতে যেতে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে হাসল। আইজ থিকা আমি কইলাম কিছু জানি না। তর মায় যা কইবো হেইডা অইবো।

কথাটা বুঝল না নূরজাহান। বাবার চলে যাওয়া পথের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে মায়ের দিকে মুখ ফিরাল। আরেক মুঠ চাউলভাজা দিল মুখে। চাবাতে চাবাতে (চিবাতে চিবাতে) বলল, কী কইবা কও!

হামিদা বলল, পরে কমুনে।

না অহনেই কও। পরে হোননের সময় পামু না।

ক্যা কই যাবি তুই?

হালদার বাড়ি যামু মজনু দাদার খবর লইতে। মজনু দাদায় খলিফা অইছে কিনা জানন লাগবো।

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় হামিদা বলল, যাইতে পারবি না। আইজ থিকা ইচ্ছা মতন বাড়িত থন বাইর অইতে পারবি না। তুই ডাঙ্গর অইছস। আমার লগে থাইক্কা সংসারের কাম কাইজ হিগবি।

কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। অবাক চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

.

১.০৮

বাড়ি থেকে বের হবার সময় ছনুবুড়ি দেখতে পেল তার ছেলের বউ বানেছা এন্দাগেন্দা পোলাপান (ছোট ছোট ছেলেমেয়ে) নিয়ে ঘরের মেঝেতে বসে বউয়া (তেল পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাত। চাল ধুদ দুটো দিয়েই হয়) খাচ্ছে। বেশ খানিকটা বেলা হয়েছে, এসময় বউয়া খেলে-দুপুরের ভাত বিকালে খেলেও অসুবিধা নাই। আর বিকালে ভাত খাওয়া মানে রাতে না খেলেও চলবে। গিরস্ত বাড়িতে যখন অভাব দেখা দেয় তখন অসময়ে বউয়া জাউ এসব খায় সংসারের লোকে।

তাহলে কি ছনুবুড়ির ছেলের সংসারে অভাব লেগেছে!

অভাব লাগবার কথা না। বুড়ির একমাত্র ছেলে আজিজ গাওয়ালি (ফেরি করা) করে। ভারে বসিয়ে কাঁসা পিতলের থালাবাসন, জগ গেলাস, কলসি পানদান নিয়ে দেশগ্রাম চষে বেড়ায়। নতুন একখান কাঁসা পিতলের থালা বদনা, পানের ডাবর, পানদান গিরস্ত বাড়ির বউঝিদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিনিময়ে সেই বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে পুরানা কাঁসা পিতলের ভাঙাচোরা, বহুকাল ধরে ব্যবহার করা জিনিসপত্র। একখান নতুন জিনিসের বিনিময়ে আনবে দুই তিনখান পুরানা জিনিস। তারপর সপ্তাহে সপ্তাহে দিঘলী বাজারে গিয়ে ওজন দরে সেই সব জিনিস বিক্রি করে অর্ধেক টাকার জিনিস কিনবে অর্ধেক টাকা ধুতিতে (টাকা পয়সার থলে) ভরবে। ওই অর্ধেক টাকাই লাভ। তার উপর খেতখোলাও আছে আজিজের। ভালই আছে। আড়াই কানির মতো হবে। পুরা আড়াই কানিই পড়েছে ইরির চাষে। বর্গা দিয়েও ধান যা পাওয়া যায় বছর চলে আরামছে। যদিও আজিজের সংসার বড়। বিয়ার পরের বছর থেকে সেই যে পোলাপান হতে শুরু করেছে বউয়ের, এখনও থামেনি। বড় পোলার বয়স হয়েছে এগারো বারো বছর। এখনও পেট উঁচু হয়ে আছে বানেছার। সাতমাস চলছে। মাস। দুইয়েক পর একদিন ব্যথা উঠবে। আলার মা ধরণী এসে খালাস করে দিয়ে যাবে। পোলা না মাইয়া কী হল সেটা নিয়েও আগ্রহ থাকবে না সংসারের কারও। না আজিজের, না বানেছার। এমন কী পোলাপানগুলিও তাকিয়ে দেখবে না, ভাই হল তাদের, না বোন। যে যাকে নিয়ে আছে তারা।

আর ছনুবুড়ির তো কথাই নাই। সে এই সংসারে থেকেও নাই। বিয়া করে বানেছাকে যেদিন সংসারে আনল আজিজ তার পরদিন থেকেই সংসারের বাড়তি মানুষ ছনুবুড়ি। বাড়িতে বড়ঘর একটাই, সেই ঘর চলে গেল বউর দখলে। উত্তরের ভিটায় আছে মাথার ওপর টিনের দোচালা আর চারদিকে বুকার্বাশের (বাশ চিড়ে তার ভেতরকার সাদা নরম অংশ দিয়ে তৈরি) বেড়া, ঢেকিঘর। একপাশে বেলদারদের (নিচু ধরনের সম্প্রদায়) রোগা ঘোড়ার মতো তেঁতুল রঙের পুরানা ঢেঁকিটা ললাটে (ঢেকির মুখ যে গর্তে পড়ে) মুখ দিয়ে পড়ে আছে, আরেক পাশে ভুর (উই) দেওয়া আছে লাকড়ি খড়ি, এসবের মাঝখানে, লেপাপোছা একটুখানি জায়গা থাকার জন্য পেল ছনুবুড়ি। নিজের কথা বালিস নিয়ে তারপর থেকে ওখানেই শোয়।

দিন চলে যাচ্ছে।

ছেলের বউ হিসাবে বানেছা অতি খারাপ। সংসারে এসে ঢোকার পর থেকেই দুই চোখখে দেখতে পারে না হরিরে (শাশুড়িকে)। কী ভাল কথা কী মন্দ কথা, ছনুবুড়ির কথা শুনলেই ছনছন করে ওঠে। চোপা (মুখ) এত খারাপ, হরিরে কোন ভাষায় গালিগালাজ করা যায় তাও জানে না। মুখে যা আসে তাই বলে। সতীন পর্যন্ত।

প্রথম প্রথম এই নিয়ে ব্যাপক কাইজ্জাকিত্তন (ঝগড়াঝাটি) হয়েছে। বানেছা যেমন ছনুবুড়িও তেমন, হরি বউয়ের কাইজ্জাকিত্তনে পাড়ার মানুষ জড় হত। শেষদিকে যখন হাতও তুলতে শুরু করল বানেছা তখন উপায় না দেখে থেমে গেছে ছনুবুড়ি। হরি হয়ে বউর হাতে মার খাওয়া! ছি!

আর পেটের ছেলে আজিজ, সে এমন মেউন্না (মেনিমুখো), বউর উপর দিয়ে কথা বলার সাহস নাই। বউ অন্যায় করলেও দোষ সে মাকেই দেয়। এসব দেখে সংসার থেকে মন উঠে গেছে বুড়ির। তারপর থেকে সংসারে সে থেকেও নাই। বাড়িতে থাকলে নাতি নাতকুরদের হাত দিয়ে ভাত তরকারি পাঠায় বানেছা, ছনুবুড়ি খায়। কখনও যদি না পাঠায়, রাও (রা) করে না। পাড়া চড়ে ছোটখাট চুরি চামাড়ি করে, কৃটনামী করে টুকটাক খাদ্য যা জোগাড় করে তাতে নিজের পেট বুড়ির খালি থাকে না। সময় অসময়ের ক্ষুধাটা মিটাতে পারে।

তবে দেশ গ্রামের লোক ছনুবুড়ির আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে খুব হাসি মশকরা করে। এতবড় কূটনী হয়েও বউর কূটনামীর কাছে মার খেয়ে গেছে বুড়ি। কাইজ্জাকিত্তনে ছনুবুড়ির ছ্যানের মতন ধার, সেই ধার মার খেয়ে গেছে বানেছার কাছে। পারতিকে বউর সঙ্গে সে কথা বলে না। বউকে চোখের ওপর দেখেও না দেখার ভাব করে।

আজকের ব্যাপার অন্যরকম। আজ সকাল থেকেই পেটভর্তি ক্ষুধা বুড়ির। সকালবেলা মুখে দেওয়া যায় এমন কোনও খাদ্য নিজের সংগ্রহে ছিল না। কাল দুপুরে জাহিদ খাঁর বাড়িতে ভাত খেয়েছে তারপর থেকে একটা বিকাল গেছে, পুরা একটা রাত তারপর এতটা বেলা, মানুষ বুড়া হলে কী হবে পেট কখনও বুড়া হয় না, ক্ষুধাটা বেদম লেগেছে ছনুবুড়ির। আর এসময় বাড়ির বউ পোলাপান নিয়ে বউয়া খাচ্ছে! যদিও ছেলের সংসারের অভাবের কথাটাও মনে হয়েছে ছনুবুড়ির, অন্যদিকে বউয়ার গন্ধে নিজের পেটের ক্ষুধাও লাফ দিয়ে উঠেছে।

ছনুবুড়ি এখন কী করে?

বউর সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে মনে নাই। আজ ভাবল নাতি নাতকুরদের মাধ্যমে বউর সঙ্গে ভালভালাই দুই একখান কথা বলে সংসারের অভাবের কথাটা জেনে নেবে আর নিজের জন্য একথাল বউয়াও জোগাড় করবে। কৃটনামী একটু করে দেখুক কাজে লাগলেও লাগতে পারে।

বড়ঘরের পিড়ায় বসল ছনুবুড়ি। ঘরের ভিতর গলা বাড়িয়ে মাজারো (মেজো) নাতিকে ডাকল। ও হামেদ, হামেদ, কী করো ভাই? বউয়া খাও?

সংসারে একমাত্র হামেদেরই একটু টান দাদীর জন্য আছে। সে বলল, হ।

কীয়ের বউয়া?

খুদের। খুদের বউয়া পাও ক্যা, ঘরে চাউল নাই।

হামেদ কথা বলবার আগেই বানেছা কাইজ্জার সুরে বলল, চোক্কে বলে দেহে না? তয় ঘরে বইয়া যে আমি পোলাপান লইয়া বউয়া খাই হেইডা দেহে কেমতে?

খোঁচাটা হজম করল ছনুবুড়ি। যেন বউর সঙ্গেই কথা বলছে এমন স্বরে বলল, কে কইছে চোক্কে দেহি না! অল্পবিস্তর দেহি।

বানেছা বলল, আইজ যে অহনতরি বাইত্তে। আইজ যে অহনতরি পাড়া বেড়াইতে বাইর অয় নাই?

বাইর অইতাছিলাম।

তয়?

ছনুবুড়ি বুঝে গেল বানেছার আওয়াজটা ভাল না। এখনই কাইজ্জাকিত্তন লাগাবে। বুড়ি আর বানেছার উদ্দেশ্যে কথা বলল না। হামেদকে বলল, ও হামেদ, আমারে ইট্টু বউয়া দে। বিয়ানে আমারও তো খিদা লাগে!

হামেদ কথা বলবার আগেই বানেছা তেড়ে উঠল। ইস একদিন পোলাপান লইয়া ইট্টু বউয়া খাইতে বইছি তাও মাগির সইজ্জ অয় না। অরে দেওন লাগবো এক থাল! এই মাগি, বাইর অইলি বাইত থন!

বানেছার কথা শুনে ছনুবুড়িও তেড়ে উঠতে গিয়েছিল, কী ভেবে সামলাল নিজেকে। গলা নরম করে সরাসরি বানেছাকে বলল, এমুন কইরো না বউ। কয়দিন পর আহুজ পড়বো, এই সমায় ময়মুরব্বিগ বড়দোয়া (বদদোয়া) লইতে অয় না। একবার আহুজ পড়ন আর একবার মউতের মুক থিকা ফিরত আহন এক কথা।

একথায়ও বানেছার মন গলল না। আগের মতোই রুক্ষ গলায় বলল, এত আল্লাদ দেহানের কাম নাই। মউতের মুখে আমি পোত্যেক বচ্ছরঐ যাই, আবার ফিরতও আহি। তোমার বড়দোয়ায় আমার কিচ্ছু অইবো না। হকুনের দোয়ায় গরু মরে না। তাইলে দুইন্নাইতে আর গরু থাকতো না। খালি হকুনঐ থাকতো।

নয় দশ বছরের হামেদ তখন খাওয়া শেষ করেছে। ছেলেটা আমুদে স্বভাবের। এই বয়সেই বয়াতীদের গান শুনে সেই গান ভাল গাইতে পারে। কয়েকদিন আগে তালুকদার বাড়িতে গিয়ে খালেক না মালেক দেওয়ানের দেহতত্ত্বের গান শুনে আসছে। স্মরণশক্তি ভাল। একবার দুইবার শোনা গান একদম বয়াতীদের মতো করেই গায়। মা দাদীর কথা কাটাকাটির মধ্যেও গলা ছেড়ে গান শুরু করল সে।

মালো মা ঝিলো ঝি বইনলো বইন করলাম কী
রঙ্গে ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।

নাতির গান শুনে ক্ষুধার কষ্ট আর বউর করা অপমানে বহুকাল পর বুকের অনেক ভিতর থেকে ছনুবুড়ির ঠেলে উঠল গভীর কষ্টের এক কান্না। পিড়ায় বসে এখন যদি কাঁদে ছনুবুড়ি ওই নিয়েও কথা বলবে বানেছা। হয়তো আরও অপমান করবে। অপমানের ভয়ে চোখে পানি নিয়েই উঠে দাঁড়াল ছনুবুড়ি। বাড়ির নামার দিকে হাঁটতে লাগল। ঘরের ভিতর হামেদ তখন গাইছে,

নৌকার আগা করে টলমল
বাইন চুয়াইয়া ওঠে জল
কত ভরা তল হইলো এই গাঙ্গে
ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে।

.

১.০৯

শক্ত করে কুট্টির হাত ধরেছেন মিয়াবাড়ির কর্ত্রী রাজা মিয়ার মা। ধরে খুবই সাবধানে বড়ঘরের সিঁড়ি ভাঙছেন। একটা করে সিঁড়ি ভাঙছেন, একটু দাঁড়াচ্ছেন। দাঁড়িয়ে গাভীন গাইয়ের শ্বাস ফেলার মতো করে শ্বাস ফেলছেন। সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় মানুষ না হয় ক্লান্ত হয়, নামার সময়ও যে হয়, তাও মাত্র চার পাঁচটা সিঁড়ি, কুট্টি ভাবতেই পারে না। মোডা অইলে যহন এতই কষ্ট তাইলে মোড়া অওনের কাম কী! কে কইছে এত মোডা অইতে!

শেষ সিঁড়ি ভেঙে মাটিতে পা দিলেন রাজা মিয়ার মা, স্বস্তির শব্দ করলেন। যেন পুলসুরাত পেরিয়ে আসছেন এমন আরামদায়ক ভাব। তারপরই কুট্টির মুখের দিকে তাকালেন, বাজখাঁই গলায় বললেন, জলচকি দিছস?

কুট্টি বলল, দিছি বুজান। জলচকি না দিয়া আপনেরে ঘর থিকা বাইর করুমনি? আমি জানি না উডানে নাইম্মা খাড়ইতে পারেন না আপনে! লগে লগে বহন লাগে। এর লেইগা আগেঐ জলচকি দিছি, তারবাদে আপনেরে ঘর থিকা বাইর করছি।

ভাল করছস। তায় আমি তো আইজ উডানে বহুম না।

বলেই কুট্টির কাঁধে কলাগাছের মতো একখানা হাত রাখলেন। শরীরের ভার খানিকটা ছেড়ে দিলেন। সেই ভারে কুট্টি একটু কুঁজা হল। বিশ একুশ বছরের কাহিল মেয়ে কুট্টি, তার পক্ষে এরকম একখানা দেহের একটুখানি ভারও বহন করা মুশকিল।

কুট্টির ইচ্ছা হল কথাটা বুজানকে বলে। কিন্তু বলার উপায় নাই। রাজা মিয়ার মার দেহ মেজাজ দুইটাই এক রকম। রাগ করতে পারেন এমন কোনও কথা মুখের উপর, আড়ালে আবডালে বললে, সেই কথা যদি তার কানে যায় তাহলে আর কথা নাই। লগে লগে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। তার আগে যে গালিগালাজ করবেন সেই গালিগালাজ শুনে গর্তে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার পর যেমন ছটফটা ভঙ্গিতে বের হয় সাপ তুরখুলা (এক ধরনের বড় পোকা) ঠিক তেমন করে কবর থেকে বের হবে কুট্টির সব মরা আত্মীয়। তাতে অবশ্য কুট্টির কিছু আসবে যাবে না কিন্তু এই বাড়ির বান্ধা কাজ হারালে কুট্টির কোথাও দাঁড়াবার জায়গা থাকবে না। না খেয়ে মরণ। আর ক্ষুধার কষ্ট কী যেনতেন কষ্ট! সব কষ্ট সহ্য করা যায় ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করা যায় না। সেই কষ্টের চেয়ে এই ভার বহন করা হাজার গুণ ভাল।

কুঁজা শরীরেও মুখটা হাসি হাসি করল কুট্টি। বলল, আমি জানি আপনে আইজ কই বইবেন।

রাজা মিয়ার মাও হাসলেন। ক তো কো?

আমরুজ (জামরুল) তলায়।

হ ঠিকঐ কইছস।

এর লেইগা জলচকিডা আমরুজ তলায় দিছি।

এই বাড়ির রান্নাঘর উঠানের একেবারে মাঝখানে। দক্ষিণের ভিটায় দোতালা বিশাল একখানা টিনের ঘর। ঘরটার নিচের তলাও পাটাতন করা। দুইতলাতেই রেলিং দেওয়া বারান্দা। দূর থেকে গাছপালার মাথা ছাপিয়ে মিয়াবাড়ির দোতালা ঘর দেখা যায়।

বাড়ির পশ্চিম আর উত্তরের ভিটায় আছে আরও দুইখান পাটাতন ঘর। সারাবছর তালামারা থাকে ঘর দুইটা। এতদিন হল এই বাড়িতে আছে কুট্টি এক দুইবারের বেশি ঘর দুইটা খুলতে দেখে নাই। বন্ধই যদি থাকবো ঘর তাইলে রাখনের কাম কী?

তিনখান ঘরের প্রত্যেকটার থেকে পাঁচসাত কম করে জায়গা হবে বাদ দিয়ে পুবের ভিটায় রান্নাঘর। রান্নাঘর অবশ্য কায়দার। দেশ গ্রামের রান্নাঘরের লগে মিলে না। মাথার ওপর টিনের চালা নাই, টালির ছাদ দেওয়া।

এই রান্নাঘরের পিছনেই মাঝারি মাপের একটা জামরুল গাছ। বাড়ি এলে কোনও কোনও সময় জলচৌকি পেতে জামরুল তলায় বসে আরাম পান রাজা মিয়ার মা। শীতকাল, গরমকাল সব সময়ই দেহে তার গরম ভাব। দুই চারকদম হাঁটলেই ঘামে বজবজ করে শরীর। ভিতর থেকে ঠেলে বের হয় গরম। জামরুল তলায় বসলে গরম কমে। জায়গাটা সব সময়ই ঠান্ডা। জামরুলের পাতায় ঝিরিঝিরি হাওয়া সব সময়ই থাকে। আজ সকালে, বেশ খানিকটা বেলা হয়ে যাওয়ার পর কুট্টির কাঁধে ভর দিয়ে জামরুল তলার দিকেই যাচ্ছেন রাজা মিয়ার মা। গাভিন গাইয়ের মতন দেহ বলে তাঁর হাঁটাচলা খুবই ধীর। চোখের পলকে যাওয়া যায় এমন জায়গায় যেতেও সময় লাগে।

এখনও লাগছে।

তবে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছেন রাজা মিয়ার মা। গলার আওয়াজও তার দেহ মেজাজের মতোই। ভালমন্দ যে কোনও কথা বললেই কলিজা কাঁপে। অনেকদিন ধরে এই বাড়িতে থাকার পরও, এখনও কলিজা কাঁপছে কুট্টির। বুজান বাড়িতে এলে সারাক্ষণই আতঙ্কে থাকে সে। ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করে কবে বাড়ি থেকে যাবেন তিনি, কবে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে কুট্টি।

রাজা মিয়ার মা বাড়িতে না থাকলে বাড়ির মালিক কুট্টি। বড়বুজান আছেন, বাঁধা কামলা আছে আলফু। তাতে কিছু যায় আসে না। বড়বুজান বয়সের ভারে পঙ্গু। সারাক্ষণই শুয়ে আছেন বিছানায়। হাঁটাচলা করা তো দূরের কথা, বিছানায় উঠে বসতে পর্যন্ত পারেন না। কথা বলেন হাঁসের ছায়ের মতো চিঁচিঁ করে। আর আলফুকে তো মানুষই মনে হয় না কুট্টির। মনে হয় গাছপালা, মনে হয় ঝোপঝাড়, গিরস্ত বাড়ির সামনে নাড়ার পালা। জ্যাতা (জ্যান্ত) একজন মানুষকে যে কেন এমন মনে হয় কুট্টির! বোধহয় কথা আলফু বলে না বলে। বোধহয় ভালমন্দ সব ব্যাপারেই আলফু নির্বিকার বলে। মুখে ভাষা থাকার পরও আলফু বোবা বলে।

রাজা মিয়ার মা বললেন, বুদ্দিসুদ্দি তর ভালঐ কুট্টি, তারবাদেও সংসার করতে পারলি না ক্যা?

এমনিতেই বুজানের দেহের ভারে কুঁজা হয়ে গেছে কুট্টি, মনে মনে ভাবছে কখন ফুরাবে এইট্টুকু পথ, কখন বুজানকে জলচৌকিতে বসিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে সে, তার উপর আথকা এরকম একখানা কথা, তাও বাজখাঁই গলায়, কুট্টি ভড়কে গেল। কথাটা যেন বুঝতে পারল না এমন গলায় বলল, কী কইলেন বুজান?

এত কাছে থেকেও তার কথা কেন বুঝতে পারেনি কুট্টি এই ভেবে রাজা মিয়ার মা একটু রাগলেন। গলা চড়ল তাঁর। এই ছেমড়ি (ছুঁড়ি), কানে কম হোনচনি?

না।

তয়?

হুনছি ঠিকই।

কথার তাইলে জব দেচ না ক্যা?

ততক্ষণে জামরুল তলায় পৌঁছে গেছে তারা। জায়গা মত পেতে রাখা জলচৌকিতে রাজা মিয়ার মাকে ধরে বসাল কুট্টি। কুট্টির মতো তিন কুট্টি বসতে পারে যে চৌকিতে সেই চৌকিতে একা বসার পরও চৌকির চারদিক দিয়ে উপচে পড়লেন রাজা মিয়ার মা। ব্যাপারটা খেয়াল করল না কুট্টি। বুজানকে বসিয়ে দেওয়ার পরই ক্লান্তির শ্বাস ফেলল। হাসিমুখে বলল, এমতেই হতিনের সংসার তার মইদ্যে দেয় না ভাত। খিদার কষ্ট আমি সইজ্জ করতে পারি না বুজান।

বাড়ির নামার দিকে অনেকগুলি আমগাছ নিবিড় হয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে রাজা মিয়ার মা বললেন, বেডা করতো কী?

গিরস্তালী করতো। ছোড গিরস্ত। শিমইল্লা বাজারে মদিদোকানও আছিলো।

তয় তো অবস্তা ভাল। ভাত দিতে পারতো না ক্যা?

সংসারডা বড়। আগের ঘরের ছয়ডা পোলাপান। ভাই বেরাদর আছে চাইর পাঁচজন।

বেডার তো তাইলে বস (বয়স) অনেক।

কুট্টি হাসল। হ আমার বাপের বইস্যা।

এমুন বেডার লগে মা বাপে তরে বিয়া দিল ক্যা?

কী করবো! এতডি বইন আমরা! আমি বেবাকতের বড়। আমার বিয়া না অইলে অন্যডির বিয়া অয় না।

এর লেইগা হতিনের সংসারে মাইয়া দিবো?

কুট্টি কথা বলল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তারপর আনমনা হয়ে গেল।

রাজা মিয়ার মা বললেন, গরিব মাইনষের ঘরে মাইয়া না অওনঐ ভাল। তর অন্য বইনডির বিয়া অইছে?

দুইজনের অইছে।

আর আছে কয়জন?

অহনও দুইজন আছে।

তর বাপে করে কী?

শীতের দিনে লেপ তোশকের কাম করে। খরালিকালে কামলা খাডে।

এতে সংসার চলে?

না চলে না।

তয়?

খাইয়া না খাইয়া বাইচ্চা আছে মানুষটি।

এতডি মাইয়া না অইয়া দুই একটা পোলা অইলে কাম অইতো। জুয়ান পোলা থাকলে রুজি কইরা সংসার চালাইতো।

পোলার আশায়ই বলে এতডি মাইয়া জন্ম দিছে আমার মা বাপে। বুজছে পোলা অইবো, অইছে মাইয়া।

একটু থেমে রাজা মিয়ার মা বললেন, তুই তগো বাইত্তে যাচ না?

না।

ক্যা?

মা বাপে আমারে দেকতে পারে না। বাইত্তে গেলে ধুর ধুর কইরা খেদাইয়া দেয়।

কচ কী?

হ।

ক্যা, এমুন করে ক্যা?

ঐ যে জামাই বাইত থিকা পলাইয়া আইয়া পড়ছি, এর লেইগা।

খাইতে পরতে না দিলে আবি না?

খাইতেও দিবো না পরতেও দিবো না, তার উপরে হতিনের সংসার। ওহেনে মানুষ থাকে কেমতে! একখান কাপোড়ে আমি বচ্ছর কাডাইতে পারি বুজান, হতিনের গনজনা সইজ্জ করতে পারি, স্বামী আমার লাগে না, খালি একখান জিনিসের কষ্ট আমার। খিদা। খিদার কষ্ট আমি সইজ্জ করতে পারি না। পেড ভইরা খাওন পাইলে আমি আর কিছু চাই না। আমার মা বাপে এইডা বোজে না। হেরা মনে করে আমি তাগো মান ইজ্জত ধুলায় মিশাইয়া দিছি। কন তো বুজান, পেডে খিদা লইয়া মান ইজ্জত দেহন যায়নি!

কথা বলতে বলতে শেষ দিকে গলা বুজে এল কুট্টির। ঠিক তখনই ছনুবুড়িকে দেখা গেল মিয়াবাড়ির দিকে হেঁটে আসছে।

.

১.১০

মিয়াদের ভিটায় উঠেই জামরুল তলায় রাজা মিয়ার মাকে দেখতে পেল ছনুবুড়ি। দেখে মনের ভিতর অপূর্ব এক আনন্দ হল। নিজের বাড়িতে, নিজের বউর কাছে হওয়া খানিক আগের অপমান একদম ভুলে গেল। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে কুঁজা শরীর সোজা করবার চেষ্টা করল। তারপর দ্রুত হেঁটে জামরুল তলায় এল। ফোকলা মুখখানা হাসি হাসি করে বলল, আরে বুজানে বাইত্তে আইছে নি? কবে আইলেন? চোক্কে আইজকাইল একফোডাও দেহি না, তাও দূর থিকা আপনেরে দেকছি। আদতে আপনেরে দেহি নাই বুজান, দেকলাম আপনেগো বাড়ির আমরুজ তলাডা জোছনা রাইতের লাহান ফকফক করতাছে। দিনে দোফরে জোছনা উটবো কেমতে! বোজলাম এইডা তো জোছনা না, এইডা তো আমার বুজানে। বুজানের শইল্লের রঙখান জোছনার লাহান। আন্দার ঘরে বইয়া থাকলেও ফকফইকা অইয়া যায়। কবে আইছেন বুজান?

গলা যতটা নরম করা যায় করলেন রাজা মিয়ার মা। পশশু দিন আইছি।

মাওয়ার লনচে?

হ। মাওয়ার লনচ ছাড়া আমু কেমতে ক? ছিন্নগরের লনচে আইলে এতদূর থিকা আমারে বাইত্তে আনবো কেডা?

রাজা মিয়ার মায়ের অদূরের মাটিতে বসল ছনুবুড়ি। ক্যা আলফু গিয়া আনবো! আপনে তো আইবেন পালকিতে কইরা!

এতদূর থিকা পালকিতে আইলে খরচা অনেক। মাওয়া থিকা আহন ভাল। তয় দিনডা পুরা লাইগ্যা যায়। বিয়ান ছয়ডার লনচে উটলে বিয়াল অইয়া যায়। ছিন্নগর দিয়া আইলে দুইফইরা ভাত বাইত্তে আইয়া খাওন যায়।

ভাতের কথা শুনে পেটের ভিতর ক্ষুধাটা ছনুবুড়ির মোচড় দিয়ে উঠল। বহু বহু বছরের পুরানা নাকে ভেসে এল গরম ভাপ ওঠা ভাতের গন্ধ। অহন যুদি একথাল ভাত পাওয়া যাইতো! লগে সালুন না অইলেও চলতো। খালি ইট্ট নুন, খালি একহান কাঁচা মরিচ।

নিজের অজান্তেই জিভ নাড়ল ছনুবুড়ি, ঢোক গিলল। রাজা মিয়ার মা এসব খেয়াল করলেন না। খেয়াল করল কুট্টি। জিজ্ঞাসা করতে চাইল, এমুন কইরা ঢোক গিললা ক্যা বুজি? খিদা লাগছেনি? বেইল অইছে, অহনতরি কিছু খাও নাই!

তার আগেই রাজা মিয়ার মা বললেন, রাস্তাডা অইয়া গেলে এই হগল যনতন্না আর থাকবো না।

ক্ষুধার জ্বালায় আনমনা হয়েছিল ছনুবুড়ি। কথাটা বুঝতে পারল না। বলল, কীয়ের যনতন্না বুজান?

এই যে ঢাকা থিকা লনচে কইরা বাইত্তে আহন! আমি মোডা মানুষ, একলা চলাফিরা করতে পারি না। ঢাকা থিকা চাকর লইয়াহি। বহুত খরচা পইড়া যায়। রাস্তা অইয়া গেলে পোলার গাড়ি লইয়া ভো কইরা আইয়া পড়ুম। এক দেড়ঘণ্টা লাগবে বাইত্তে আইতে। দরকার অইলে যেইদিন আমু হেইদিনই ফিরত যাইতে পারুম। রাজা মিয়ায় কইছে বড় সড়ক অইয়া যাওনের পর সড়ক থিকা গাড়ি আইতে পারে এমন একখান আলট (ছোট সড়ক) বাইন্দা দিব বাড়ি তরি (পর্যন্ত)। নিজেগো গাড়ি লইয়া তাইলে বাড়ির উডানে, এই আমরুজ তলায় আইয়া পড়তে পারুম। কুট্টি খালি আমারে ধইরা গাড়ি থিকা নামাইবো। আর কোনও মানুষজন লাগবে না। বুজানে যতদিন বাইচ্চা আছে হেরে তো না দেইক্কা পারুম না! এই বাড়িঘর, জাগাজমিন, খেতখোলা, গাছগাছলা এই হগল তো না দেইক্কা পারুম না!

রাজা মিয়ার মায়ের এত কথার একটা কথা কান্র লাগল ছনুবুড়ির। গাছগাছলা। লগে লগে আগের দিনকার কূটবুদ্ধিটা মাথায় এল। দবির গাছির মুখ ভেসে উঠল ছানিপড়া চোখে। বুদ্ধি খাটায়া যদি ভাল মানুষ সাজা যায় বুজানের কাছে তাহলে দুপুরের ভাত এই বাড়িতে খাওয়া যাবে। কোনও না কোনওভাবে বুজানকে খুশি করতে না পারলে ভাত তো দূরের কথা এক গেলাস পানি চাইলেও বুজান বলবেন, তরে অহন পানি দিব কেডা? পুকঐরে গিয়া খাইয়া আয়।

এত টাকা পয়সা থাকলে কী হবে, এত জায়গাজমিন, খেতখোলা থাকলে কী হবে রাজা মিয়ার মা দুনিয়ার কিরপিন (কৃপণ)। স্বার্থ আদায় না হলে কারও মুখের দিকে তাকান না।

ছনুবুড়ি মনে মনে বলল, স্বার্থঐত্তো, বড় স্বার্থ। প্যাঁচখান লাগাইয়া দেহি। কাম না অইয়া পারবো না।

গলা খাকারি দিয়ে কথা মাত্র শুরু করবে ছনুবুড়ি তার আগেই দোতালা ঘর থেকে খুনখুনা গলায় কুট্টিকে ডাকতে লাগলেন বড়বুজান। কুট্টি ও কুট্টি, কই গেলি রে? আমি পেশাব করুম। আমারে উডা। ডহি (এক প্রকারের হাঁড়ি) বাইর কর।

রাজা মিয়ার মা কান খাড়া করে বললেন, ঐ কুট্টি, বুজানে ডাক পারে। তাড়াতাড়ি যা।

মাত্র পা বাড়িয়েছে কুট্টি, বললেন, হোন, বুজানরে পেশাব করাইয়া ভাত চড়া। সালুন রানবি কী?

মাছ আছে।

কী মাছ

কই আছে, মজগুর (মাগুর) আছে। আপনে আইবেন হুইন্না পুকঐর থিকা ধইরা রাখছে আলফু। কোনডা রান্দুম?

মজগুর রান।

আইচ্ছা।

দ্রুত হেঁটে দোতালা ঘরের দিকে চলে গেল কুট্টি।

এই বাইত্তে আইজ মজগুর মাছ রানবো (রান্না)। গরম ভাতের লগে মজগুর মাছের তেলতেলা সুরা (ঝোল) একটা দুইটা টুকরা আর একথাল ভাত যুদি খাওন যায়! শীতের দিন আইতাছে। এই দিনের জিয়াইন্না (জিয়ল) মাছ বহুত সাদের অয়। ওই রকম মাছ দিয়া একথাল ভাত যুদি খাওন যায়!

মুখের ভিতর জিভটা আবার নড়ল ছনুবুড়ির। আবার একটা ঢোক গিলল সে। তারপর খুবই সরল ভঙ্গিতে কথা শুরু করল। একটা কামলায় আপনেগো অয় বুজান?

কথাটা বুঝতে পারলেন না রাজা মিয়ার মা। ছনুবুড়ির মুখের দিকে তাকালেন। ক্যা অইবো না ক্যা? কাম কাইজ তো আলফু ভালঐ করে।

হ তা তো করেঐ। তয় একলা মানুষ কয়মিহি খ্যাল (খেয়াল) রাকবো! বাড়িঘরের কাম, খেতখোলার কাম, ছাড়া বাইত্তে এতডি গাছগাছলা!

বাড়িঘরের কাম কিছু আছে, খেতখোলায় কোনও কামঐ নাই। অহন তো আর আগের দিন নাই, আমন আউসের চাষ দেশগেরামে অয়ঐ না। অয় খালি ইরি। আমগো বেবাক খেতেই ইরি অয়। তাও বর্গা দেওয়া। বর্গাদাররা ধান উডাইয়া অরদেক (অর্ধেক) ভাগ কইরা দেয়। বছরের খাওনডা রাইখা বাকিডা রাজা মিয়া বেইচ্চা হালায়। খেতখোলার মিহি আলফুর চাইতে অয় না। তয় গাছগাছলার মিহি চায়। ছাড়াবাড়ির মিহি চায়।

হ দোষ তো আলফুর না, দোষ অইলো দউবরার।

রাজা মিয়ার মা ভুরু কুঁচকে বললেন, কোন দউবরা? কিয়ের দোষ?

বুজানের আগ্রহ দেখে ছনুবুড়ি বুঝে গেল, কাজ হবে। পেটের ক্ষুধা পেটে চেপে কথা বলার ভঙ্গি আরও সরল করে ফেলল সে। মুখখানা এমন নিষ্পাপ করল যেন এই মুখে কোনও কালেই পড়েনি পাপের ছায়া।

ছনুবুড়ি বলল, ওই দ্যাহো, কথাডা আপনেরে তো কইয়া হালাইলাম। এইডা মনে অয় ঠিক অইলো না। কূটনামি বহুত খারাপ জিনিস।

রাজা মিয়ার মা গম্ভীর গলায় বললেন, কী কবি তাড়াতাড়ি ক ছনু। কূটনামি তর করন লাগবো না। আসল কথা ক।

হ আসল কথাঐ কমু। আপনে আমার থিকা অনেক ছোড তাও আপনেরে আমি বুজান কই। আপনে আমারে কন তুই কইরা। এতে ভাল লাগে আমার। আমি আপনেরে বহুত মাইন্য করি। আপনেরে যহন বুজান কইরা ডাক দেই মনে অয় আপনে আমার বড় বইন। আমি আপনের ছোডঃ।

এবার ছনুবুড়িকে জোরে একটা ধমক দিলেন রাজা মিয়ার মা। এত আল্লাইন্দা প্যাচাইল পারিছ না। আসল কথা ক।

এই ধমক একদমই কাবু করতে পারল না ছনুবুড়িকে। সে যা চাইছে কাজ সেই মতোই হচ্ছে। রাজা মিয়ার মা যত বেশি রাগবেন তার তত লাভ। কথা শেষ করে ভাতের কথাটা তুললেই হবে।

ছনুবুড়ি উদাসীনতার ভান করল। দউবরারে চিনলেন না? দবির গাছি। গাছ ঝুড়ে। পাড়া বেরাইন্না একখান মাইয়া আছে, নূরজাহান। খালি এই বাইত্তে যায় ঐ বাইত্তে যায়। ডাঙ্গর মাইয়া, বিয়া দিলে বচ্ছরও ঘোরব না, আহুজ পড়বো। নূরজাহানরে অহন খালি বড় সড়কে দেহি। মাইট্টাইলগো কনটেকদার আছে আলী আমজত, খালি হেই বেডার লগে গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর। কোনদিন হোনবেন পেটপোট বাজাইয়া হালাইছে।

এবার গলা আরেকটু চড়ালেন রাজা মিয়ার মা। তর এই বেশি প্যাচাইল পাড়নের সবাবটা গেল না ছনু। এক কথা যে কত রকমভাবে ঘুরাইয়া প্যাচাইয়া কচ। দউবরা কী করছে, কীয়ের দোষ তাড়াতাড়ি ক আমারে।

আপনে তো বাইত্তে আইছেন পশশু দিন, দউবরা আপনের লগে দেহা করে নাই?

না।

কন কী?

আমি কি তর লগে মিছাকথা কইনি।

ছি ছি ছি ছি ছি আপনে মিছাকথা কইবেন ক্যা বুজান? আপনে কোনওদিন মিছা কথা কইছেন? তয় দউবরা আপনের লগে দেহা করলো না? এতবড় সাহস অর?

আরে কী করছে দউবরা?

কাইল বিয়ালে অবে দেখলাম আপনেগো ছাড়াবাইত্তে।

কচ কী! কী করে?

এ ছনুবুড়ি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আর কী করবো! অর যা কাম।

খাজুরগাছ ঝোড়ে?

হ।

আমার ছাড়াবাড়ির খাজুরগাছ?

হ।

আমার লগে দেহা না কইরা, আমার লগে কথা না কইয়া তো দউবরা কোনওদিন এমুন কাম করে না! জীবন ভইরা ও আমার গাছ ঝোড়ে! আমি বাইত্তে না থাকলে বুজানের লগে কথা কইয়া যায়। দউবরা তো ইবার আহে নাই! আইলে বুজানে আমারে কইতো!

না আহে নাই। দউবরা নিজ মুখে আমারে কইছে।

কী কইলো?

কইলো যেই কয়দিন পারি বুজানগো ইবার জানামু না। জানাইলেঐ অরদেক রস দেওন লাগবো। পয়লা কয়দিন রসের দাম যায় খুব। কয়ডা আলগা পয়সা কামাইয়া লই। তারবাদে জানামু।

রাজা মিয়ার মা আকাশের দিকে তাকালেন। শেষ হেমন্তের আকাশ প্রতিদিনকার মতো নতুন। দুপুরের মুখে মুখে দেশগ্রামের মাথার উপর রোদে ভেসে যাচ্ছে আকাশ। গাছগাছালির বন কাপিয়ে হাওয়া বইছে। রাজা মিয়ার মা সেই হাওয়া আঁচ করলেন। হাওয়ায় মৃদু শীতভাব। এসময় রস পড়বার কথা না। গাছেরা রসবতী হয়েছে ঠিকই তবে রস পড়বে আরও সাত আটদিন পর।

ছনুবুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় রাজা মিয়ার মা বললেন, অহনতরি রস পড়নের কথা না। শীত পড়ে নাই, রস পড়বো কেমতে?

লগে লগে পরনের মাইট্টা (মেটে) রঙের ছেঁড়া কাপড় গায়ে জড়াবার চেষ্টা করল ছুনবুড়ি। কন কি শীত পড়ে নাই? শীতে বলে আমি মইরা যাই! আপনে মোডা মানুষ, বড়লোক, শইল্লের গরম আর টেকার গরম মিল্লা শীত আপনে উদিস পাইবেন কেমতে? হোনেন বুজান, আপনের ছাড়া বাড়ির বেবাকটি খাজুরগাছ কাইল হারাদিন ধইরা ঝোড়ছে দউবরা। আইজ বিয়ানে দউবরারে আমি দেকলাম রসের ভার কান্দে লইয়া হালদার বাইত মিহি যায়। রস কইলাম পড়তাছে। দউবরা কইলাম আপনের বাড়ির রস বেইচ্চা আলগা পয়সা কামাইতাছে।

শীত পড়ল কী পড়ল না, রস সত্য সত্যই পড়ল কী পড়ল না এবার আর ওসব ভাবলেন না রাজা মিয়ার মা। বাজখাঁই গলায় চিৎকার করে উঠলেন। এতবড় সাহস গোলামের পোর! আমারে না জিগাইয়া আমার গাছ ঝোড়ে! ঐ কুট্টি, আলফুরে ডাক দে। ক যেহেন থিকা পারে দউবরারে বিচরাইয়া লইয়াইতে।

বড়বুজানের কাজ সেরে অনেকক্ষণ হল রান্নাঘরে এসে ঢুকেছে কুট্টি। ভাত চড়িয়ে মাগুর মাছ কুটেছে। মাগুর মাছ না ঘষে খান সা বুজানে। এখন সেই মাছ ধারাল থানইটের ওপর ফেলে অতিযত্নে ঘষছে কুট্টি। ঘষে ঘষে খয়েরি রঙ সাদা করে ফেলছে। এই ফাঁকে বুজান এবং ছনুবুড়ির সব কথাই শুনেছে। শুনে ছনুবুড়ির ওপর বেদম রাগ হয়েছে। পরিষ্কার বুঝেছে দবির গাছির নামে মিছাকথা বলছে ছনুবুড়ি। নিশ্চয় কোনও মতলব আছে।

তবু বুজান যখন বলেছেন আলফুকে না ডেকে উপায় নাই।

কোটা মাছ মালশায় রাখল কুট্টি। ভারী একখানা সরা দিয়ে ঢাকল। তারপরই বিলাইটার (বিড়াল) কথা মনে হল। চারদিন হল বিয়াইছে (বাচ্চা দিয়েছে)। ফুটফুটা পাঁচটা বাচ্চা। দোতালার এককোণে ফেলে রাখা ভাঙা চাঙারিতে গিয়ে বসেছিল বাচ্চা দিতে, সেখান থেকে আর নামেনি। মেন্দাবাড়ির হোলাটার (হুলো) হাত থেকে বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্য তাদের ছেড়ে নড়ছে না। পাহারা দিচ্ছে। পাহারা দিতে দিতে না খেয়ে কাহিল হয়ে গেছে। বিলাইদের নিয়ম নীতি আজব। হোলা বিলাইরা নাকি এই রকম। কচিছানা খেয়ে ফেলে। মা বিলাইরা এজন্য ছানা পাহারা দেয়।

বাচ্চা দেওয়ার আগে হোলাটা দিনরাত এই বাড়িতে পড়ে থাকত। দুইটাতে কী ভাব তখন! সময় অসময় নাই রঙ ঢঙ করে। এখন সেই কর্মের ফসল একজনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য না খেয়ে মরে যাচ্ছে আরেকজন। দুনিয়াতে মা জীবদেরই কষ্ট বেশি। পুরুষদের কষ্ট নাই।

এসব ভেবে ফেলে আসা সংসারের কথা মনে হল কুট্টির। স্বামী পুরুষটার কথা মনে হল। তারপরই চমকাল কুট্টি। হোলাটা চারদিন ধরে প্রায়ই আসছে এই বাড়িতে।

নিজের ঔরসজাতদের সামনে ভিড়তে পারছে না মা বিলাইয়ের ভয়ে। এখন বাড়িতে ঢুকে যদি মাছের গন্ধ পায়, যদি রান্নাঘরে কাউকে না দেখে তাহলে মাছ কোথায় আছে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। যে সরা দিয়ে মাছ ঢেকেছে কুট্টি ওই সরা থাবার ধাক্কায় ফেলে দিতে সময় লাগবে না তার। যদি মাছ সব হোলায় খেয়ে ফেলে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

সরার ওপর একটা থানইট চাপা দিল কুট্টি : সেই ফাঁকে শুনতে পেল জামরুল তলায় বসে মতলবের কথাটা বলছে ছনুবুড়ি। বুজান, এতদিন পর দেশে আইছেন আপনে, আপনেরে আমি বহুত মাইন্য করি, আইজ আপনে আমারে এক ওক্ত খাওয়ান। আপনেরা ধনী মানুষ, আমারে এক ওক্ত খাওয়াইলে আপনেগো ভাত কমবো না! আল্লায় দিলে আরও বাড়বে। খাইয়াইবেন বুজান?

১.১১-১৫ পশ্চিম উত্তরের ভিটার পাটাতন ঘর

১.১১

পশ্চিম উত্তরের ভিটার পাটাতন ঘর দুইটার মাঝখান দিয়ে পথ। সেই পথে খানিক দূর আগালে দুই তিনটা বাঁশঝাড়, তিন চারটা আম আর একটা কদমগাছ। সারাদিন আবছা মতন অন্ধকার জায়গাটা। পাটাতন ঘরের চালা আর গাছপালার মাথা ডিঙিয়ে রোদ এসে কখনও এখানকার মাটিতে পড়তে পারে না। যদিও বা পড়ে দুই এক টুকরা, বাঁশঝাড় তলায় জমে থাকা শুকনা বাঁশপাতার উপর রোদের টুকরাগুলিকে দেখা যায় মাটির নতুন হাঁড়ির ভাঙা চারার মতো। রাজা মিয়ার মা যেদিন বাড়িতে এলেন সেদিন থেকে এদিকটায় কাজ করছে আলফু।

বাঁশঝাড় ছাড়িয়ে দূরে, বাড়ির নামার দিকে পায়খানা ঘর। বিক্রমপুর অঞ্চলের বাড়িগুলি তৈরি হয় বাড়ির চারদিক থেকে মাটি তুলে উঁচু ভিটা তৈরি করে তার ওপর। এই ভিটার ওপর আবার ভিটা করে তৈরি হয় ঘর। যদি পাটাতন ঘর হয় তাহলে ভিটা করবার দরকার হয় না। বাড়ির যেদিকটা সবচাইতে দরকারি, বাড়ি থেকে বের হবার জন্য দরকার, সেদিকটাকে বলা হয় বারবাড়ি। বাড়ি তৈরির সময় বারবাড়ির দিক থেকে মাটি তোলার পরও বের হবার সময় খানিকটা নিচের দিকে নামতে হয়, ওঠার সময় ও উঠতে হয় কয়েক কদম। বর্ষাকালে চকমাঠ ভরে পানি যখন বাড়ির ভিটার সমান উঁচু হয়ে ওঠে তখন বাড়িগুলিকে দেখা যায় ছাড়া ছাড়া দ্বীপের মতন। এক বাড়ির লগে। আরেক বাড়ির যোগাযোগের উপায় ডিঙিনৌকা, কোষা নৌকা।

বনেদি বাড়িগুলির পায়খানা ঘর থাকে বাড়ির সবচাইতে কম দরকারি, জঙ্গলা মতন দিকটায়। ঘরদুয়ারের পিছনে, অনেকটা দূর এগিয়ে একেবারে নামার দিকে। গাছপালার আড়ালে এমনভাবে থাকবে ঘরখানা যেন দূর থেকে না দেখা যায়।

এই অঞ্চলের মানুষের রুচির পরীক্ষা হয় পায়খানা ঘর দেখে। মেয়ের বিয়ার সম্বন্ধ আসলে পাত্রপক্ষের কোনও না কোনও মুরব্বি কোনও না কোনও অছিলায় বাড়ির ওই ঘরখানা একবার ঘুরে আসবেন। ওই ঘর দেখে বাড়ির মানুষ আর মেয়ের রুচি বিচার করবেন। এইসব কারণে বড় গিরস্ত আর টাকা পয়সাআলা লোকের বাড়ির পায়খানা ঘরখানা হয় দেখবার মতন। ভাঙনের দিকে চারখানা শালকাঠের মোটা খাম (থাম) পুতে বাড়ির ভিটা বরাবর টংঘরের মতো করে তৈরি করা হবে ঘরখানা। কড়ুই কাঠ দিয়ে পাটাতন করা হবে। মাথার ওপর ঢেউটিনের দো কিংবা একচালা। চারদিকে ঢেউটিনের বেড়া। কখনও কখনও বেড়া চালা রং করা হয়। খামগুলি পোতবার আগে আলকাতরা, মাইট্টাতেলের (মেটেতেল) পোচ দেওয়া হয়। তাতে কাঠে সহজে ঘুণ ধরে না।

বাড়ির ভিটা থেকে পায়খানা ঘরে যাওয়ার জন্য থাকে লঞ্চ স্টিমারে চড়ার সিঁড়ির মতো সিঁড়ি। সিঁড়ির দুইপাশে, পুলের দুইপাশে যেমন থাকে রেলিং, তেমন রেলিং। বাড়ির বউঝিরা যেন পড়ে না যায়।

রাজা মিয়াদের বাড়ির পায়খানা ঘরখানা ঠিক এমন। বাঁশঝাড়তলা ছাড়িয়ে। এই জায়গাটা নিঝুম, ঝরাপাতায় ভর্তি। সারাদিন এই দিকটাতেই কাজ করছে আলফু। বাঁশঝাড় পরিষ্কার করছে, ঝরাপাতা ঝাড়ু দিয়ে এক জায়গায় ভুর দিচ্ছে। আগাছা ওপড়াচ্ছে। সাপখোপের বেদম ভয় রাজা মিয়ার মার। তার পায়খানায় যাওয়ার পথ পরিষ্কার না থাকলে মুশকিল। আলফু সেই পথ পরিষ্কার রাখছে।

কুট্টি এসব জানে। জানে বলেই সোজা এদিকটায় এল। এসে একটু অবাকই হল। আলফু নাই। পরিষ্কার বাঁশঝাড়তলা নিঝুম হয়ে আছে। থেকে থেকে উত্তরের হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় শন শন করছে বাঁশপাতা।

আলফু গেল কোথায়!

পশ্চিমের ঘরটার পিছন দিয়ে একটুখানি পথ আছে দক্ষিণ দিককার পুকুর ঘাটে যাওয়ার। সেই পথের মাঝ বরাবর পুরানা একটা চালতাগাছ। কুট্টি আনমনা ভঙ্গিতে সেই পথে পা বাড়াল। একটুখানি এগিয়েই আলফুকে দেখতে পেল উদাস হয়ে চালতাতলায় বসে আছে। হাতে বিড়ি জ্বলছে কিন্তু বিড়িতে টান দিচ্ছে না।

কুট্টি অবাক হল। রাজা মিয়ার মা আছেন বাড়িতে তারপরও কাজে ফাঁকি দিয়ে চালতাতলায় বসে আছে আলফু! এতবড় সাহস হল কী করে!

দূর থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলফুকে দেখতে লাগল কুট্টি।

জোঁকের মতো তেলতেলা শরীর আলফুর। মাথার ঘন চুল খাড়া খাড়া, কদমছাট দেওয়া। পিছন থেকে দেখছে বলে আলফুর মুখ কুট্টি দেখতে পাচ্ছে না। পিঠ দেখছে, ঘাড় দেখছে আর দেখছে মাজা। পরনে সবুজ রঙের লুঙ্গি। মাজার কাছে গামছা বাঁধা। গামছাটা এক সময় লাল ছিল, দিনে দিনে রঙ মুছে কালচে হয়ে গেছে।

চালতাপাতার ফাঁক দিয়ে আলফুর তেলতেলা পিঠে, ঘাড়ের কাছাকাছি এসে পড়েছে একটুকরা রোদ। সেই রোদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই শরীরের ভিতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা টের পেল কুট্টি। অদ্ভুত এক উত্তেজনায় ভরে গেল তার শরীর। মুহূর্তের জন্য মনে পড়ল ফেলে আসা স্বামী মানুষটার কথা। রাত, অন্ধকার ঘর, পুরুষ শরীর, শ্বাস প্রশ্বাসের গন্ধ, ভিতরে ভিতরে দিশাহারা হয়ে গেল কুট্টি। ভুলে গেল সে কেন এখানে আসছে, কী কাজে!

মানুষের পিছনে যত নিঃশব্দেই এসে দাঁড়াক মানুষ, কোনও না কোনও সময় নিজের অজান্তেই মানুষ তা টের পায়। বুঝি আলফুও টের পেল। বিড়িতে টান দিয়ে আনমনা ভঙ্গিতেই পিছনে তাকাল সে। তাকিয়ে কুট্টিকে দেখে অবাক হয়ে গেল। কুট্টির দিকে তাকিয়ে রইল।

কুট্টির তখন এমন অবস্থা কিছুতেই আলফুর মুখের দিকে তাকাতে পারছে না। চোখ মুখ নত হয়ে গেছে গভীর লজ্জায়। এক পায়ে আঁকড়ে ধরেছে আরেক পায়ের আঙুল।

ধীর গম্ভীর গলায় আলফু বলল, কী?

লগে লগে স্বাভাবিক হয়ে গেল কুট্টি। নিজেকে সামলাল। আলফুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, বুজানে কইলো দবির গাছিরে ডাইক্কা আনতে। মনে অয় হালদার বাইত্তে গেছে গাছ ঝোড়তে। যান তাড়াতাড়ি যান।

বিড়িতে শেষটান দিল আলফু তারপর উঠে দাঁড়াল। আর একবারও কুট্টির মুখের দিকে তাকাল না, একটাও কথা বলল না, বারবাড়ির দিকে চলে গেল।

তারপরও চালতাতলায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল কুট্টি।

.

১.১২

দোতলা ঘরের সামনের দিককার বারান্দায় খেতে বসেছে ছনুবুড়ি। টিনের খাউব্বা (গামলা মতন) থালায় ভাত তরকারি নুন সব এক সঙ্গে দিয়েছে কুট্টি। টিনের মগের একমগ পানি দিয়েছে। তারপর নিজে চলে গেছে মাঝের কামরায়।

মাঝের কামরার একপাশে কালো রঙের কারুকাজ করা উঁচু পালঙ্ক। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে সেই পালঙ্কে কাত হয়েছেন রাজা মিয়ার মা। কুট্টি তার পা টিপে দিচ্ছে। রাজা মিয়ার মা যতক্ষণ চোখ না বুজবেন, মুখ হাঁ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না ঙো ঙো করে শব্দ করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ছুষ্টি নাই কুট্টির। চোখ বুজে মুখ হাঁ করে ওরকম শব্দ করার মানে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি। বুজান ঘুমালে তবে খেতে যাবে কুট্টি। দুপুর বয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধায় পেট পুড়ে যাচ্ছে তার।

বুজানের পা টিপছে আর ভোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে ছনুবুড়ির খাওয়া দেখছে কুট্টি। কুঁজা হয়ে বসে ফোকলা মুখে হামহাম করে খাচ্ছে। একটার পর একটা লোকমা (নলা) দিচ্ছে মুখে। কোনওদিকে তাকাচ্ছে না।

এই বয়সেও এত খিদা থাকে মানুষের।

কুট্টির ইচ্ছা হল ছনুবুড়িকে জিজ্ঞাসা করে, ও বুজি আট্টু ভাত লইবানি? আট্টু ছালুন!

বুজানের ভয়ে জিজ্ঞাসা করা হয় না। এখনও ঘুমাননি বুজান। তার পা টিপা ফেলে ছনুবুড়ির খাওয়ার তদারকি করছে কুট্টি এটা তিনি কিছুতেই সহ্য করবেন না। পায়ের কাছে বসে থাকা কুট্টিকে লাথি মারবেন। ও রকম মোটা পায়ের একখানা লাথথি খেলে পাঁচদিন আর মাজা সোজা করে দাঁড়াতে হবে না কুট্টির।

তবে ছনুবুড়িকে একবারে যতটা ভাত দিয়েছে কুট্টি, তরকারি যতটা দিয়েছে তাতে পেট ভরেও কিছুটা ভাত থেকে যাওয়ার কথা। সেইটুকুও ফেলবে না বুড়ি। জোর করে খেয়ে নিবে।

তাহলে কুট্টির কেন ইচ্ছা হল ছনুবুড়িকে জিজ্ঞাসা করে, আটু ভাত লইবানি?

বোধহয় বুড়ির খাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে।

কিন্তু বুজান আজ ঘুমাচ্ছেন না কেন? মুখ হাঁ করে ঙো ঙো শব্দ করছেন না কেন? খিদায় তো পেট পুড়ে যাচ্ছে কুট্টির!

শরীরের সব শক্তি দিয়ে জোরে জোরে বুজানের পা টিপতে লাগল কুট্টি।

ঠিক তখনই দক্ষিণের বারান্দার দিকে কার গলা শোনা গেল। বুজান বলে বাইত্তে আইছেন? বুজান ও বুজান।

এই ডাকে মাত্র বুজে আসা চোখ চমকে খুললেন রাজা মিয়ার মা। মাথা তুলে বারান্দার দিকে তাকালেন। ক্যাডা?

আমি দবির, দবির গাছি।

হাছড় পাছড় করে বিছানায় উঠে বসলেন রাজা মিয়ার মা। দউবরা, খাড়ো।

তারপর কুট্টির কাঁধে ভর দিয়ে পালঙ্ক থেকে নামলেন। কুট্টির একটা হাত ধরে দক্ষিণের বারান্দার দিকে আগালেন। সেই ফাঁকে খেতে বসা ছনুবুড়ির দিকে একবার তাকাল কুট্টি। বুড়ির খাওয়ার গতি এখন আরও বেড়েছে। একটার পর একটা লোকমা যেন নাক মুখ দিয়ে খুঁজছে সে। কুট্টি বুঝে গেল দবির গাছির গলা শুনেই খবর হয়ে গেছে বুড়ির। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাত শেষ করে পালাবে। কূটনামি ধরা পড়ার আগেই চোখের আঐলে (আড়ালে) চলে যাবে।

দুইমুঠ ভাতের জন্য যে কেন এমন করে মানুষ!

দক্ষিণের বারান্দায় এসে রেলিং ধরে দাঁড়ালেন রাজা মিয়ার মা। কীরে গোলামের পো, এতবড় সাহস তর অইল কেমতে?

রাজা মিয়ার মাকে দেখে মুখটা হাসি হাসি হয়েছিল দবিরের। এখন তার কথায় সেই মুখ চুন হয়ে গেল। কিয়ের সাহস বুজান?

জানচ না কিয়ের সাহস?

সত্যঐ জানি না বুজান। খোলসা কইরা কন।

আমারে না জিগাইয়া আমার বাড়ির গাছ ঝোড়ছস ক্যা? আমার বাড়ির রস আইজ থিকা বেচতে বাইর অইছস!

বুজানের কথা শুনে দবির আকাশ থেকে পড়ল। আপনে এই হগল কী কইতাছেন বুজান! আপনেরে না কইয়া আপনের বাড়ির গাছ ঝুড়ুম আমি! আপনে বাইত্তে না থাকলে বড়বুজানরে কমু না? আর রস বেচুম কেমতে? রস তো অহনতরি পড়েঐ নাই! পড়বো কেমতে, শীত পড়ছেনি? এই হগল কথা আপনেরে কেডা কইলো?

দবিরের কথায় থতমত খেলেন রাজা মিয়ার মা। তবু গলার জোর কমল না তার। আগের মতোই জোর গলায় বললেন, যেই কউক, কথা সত্য কী না ক?

দবির বুঝে গেল এটা ছনুবুড়ির কাজ। কাল বিকালে মিয়াদের ছাড়া বাড়ির খাজুরতলায় তাকে বসে থাকতে দেখেছে বুড়ি।

দবির বলল, আমি কইলাম বুজছি কথাডা আপনেরে কেডা কইছে। তয় আমার কথা আপনে হোনেন বুজান, দশবারো বছর ধইরা আপনের বাড়ির গাছ ঝুড়ি আমি, কোনওদিন আপনের লগে কথা না কইয়া আপনের গাছে উডি নাই। আপনে বাইত্তে না থাকলে বড়বুজানরে কইয়া যাই। কাইল থিকা উততইরা বাতাসটা ছাড়ছে। লগে লগে ছ্যান লইয়া, ভার লইয়া বাইত থিকা বাইর অইছি আমি। আপনের ছাড়া বাড়ির খাজুরতলায় আইছি। আটখান হাড়ি রাখছি খাজুরতলায়। রাইক্কা বাইত্তে গেছি গা। আইজ বিয়ানে উইট্টা গেছি হালদার বাড়ি। হেই বাইত্তে আছে চাইরখান গাছ। চাইরখান হাড়ি রাইক্কাইছি গাছতলায়। মরনি বুজির লগে বন্দবস্ত কইরাইছি। তারবাদে আইলাম আপনের কাছে। আপনের লগে কথা কইয়া বাইতে গিয়া ভাত খামু তারবাদে যামু আমিনদ্দি সারেঙের বাড়ি। উত্তর মেদিনমন্ডল, দক্ষিণ মেদিনমন্ডল, মাওয়া কালিরখিল এই কয়ড়া জাগার যেই কয়ডা বাড়ির গাছ ঝুড়তে পারি ঝুড়ুম। যাগো লগে বন্দবস্ত অইবো তাগো গাছতলায় হাড়ি রাইক্কামু, যাতে গাছতলায় হাড়ি দেইক্কা অন্য গাছিরা ঐ মিহি আর না যায়। আপনের ছাড়া বাইত্তে হাড়ি রাইক্কা গেছি আমি, গাছে অহনতরি উডি নাই, ছানের একখান পোচও দেই নাই। আইজ আপনের লগে কথা কইয়া কাইল থিকা ঝুড়ুম। যুদি আমার কথা বিশ্বাস না অয় আলফুরে পাডান ছাড়া বাইত্তে গিয়া দেইক্কাহুক। যুদি আমি মিছাকথা কইয়া থাকি তাইলে আপনের জুতা আমার গাল।

রাজা মিয়ার মা কথা বলবার আগেই কুট্টি বলল, আলফুর লগে আপনের দেহা অয় নাই?

দবির অবাক গলায় বলল, না।

বুজানে তো আলফুরে পাডাইছে আপনেরে ডাইক্কানতে!

আলফুর লগে আমার দেহা অয় নাই।

রাজা মিয়ার মা বললেন, তাইলে তুই আইলি কেমতে?

আমি তো নিজ থিকাই আইছি আপনের লগে বন্দবস্ত করতে! বুজান, আলফু যহন বাইত নাই তয় কুট্টিরে পাডান। এক দৌড় দিয়া দেইক্কাহুক আমি মিছাকথা কইছি কিনা!

রাজা মিয়ার মা মাথা দুলিয়ে বললেন, না তুই মিছাকথা কচ নাই। যা বোজনের আমি বুঝছি।

কুট্টির দিকে তাকালেন তিনি। ঐ কুট্টি দেকতো কূটনি মাগি আছেনি না ভাত খাইয়া গেছে গা?

কুট্টি গলা বাড়িয়ে সামনের দিককার বারান্দার দিকে তাকাল। তাকিয়ে দেখতে পেল ভয় পাওয়া শিশুর মতো টলোমলো পায়ে যত দ্রুত সম্ভব সিঁড়ি ভেঙে উঠানে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করছে ছনুবুড়ি। বারান্দায় পড়ে আছে তার শূন্য থালা। সেখানে ঘুর ঘুর করছে হোলাটা।

পালিয়ে যাওয়া ছনুবুড়ির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক মায়ায় মন ভরে গেল কুট্টির। দুইমুঠ ভাতের জন্য এক মানুষের নামে আরেক মানুষের কাছে মিথ্যা কথা বলে বেড়াচ্ছে, অপমানিত হচ্ছে, গালাগাল খাচ্ছে। হায়রে পোড়া পেট, হায়রে পেটের খিদা!

ছুনুবুড়িকে বাঁচাবার জন্য ছনুবুড়ির মতো করে ঠাইট না ঠাইট (জলজ্যান্ত) একটা মিথ্যা বলল কুট্টি। না, ছনুবুড়ি নাই বুজান। খাইয়া দাইয়া গেছে গা।

তবু ছনুবুড়িকে বাঁচাতে পারল না কুট্টি। নিজের বাজখাঁই গলা দশগুণ চড়িয়ে গালিগালাজ শুরু করলেন রাজা মিয়ার মা। ঐ রাড়ি মাগি, ঐ কৃটনির বাচ্চা, এমনু ভাত তর গলা দিয়া নামলো কেমতে? গলায় ভাত আইটকা তুই মরলি না ক্যা? আয় গলায় পাড়াদা তর ভাত বাইর করি।

কুঁজা শরীর যতটা সম্ভব সোজা করে, দ্রুত পা চালিয়ে মিয়াবাড়ি থেকে নেমে যেতে যেতে বুজানের গালিগালাজ পরিষ্কার শুনতে পেল ছনুবুড়ি। ওসব একটুও গায়ে লাগল না তার। একটুও মন খারাপ হল না। এইসবে কী ক্ষতি হবে ছনুবুড়ির! ভাতটা তো ভরপেট খেয়ে নিয়েছে! পেট ভরা থাকলে গালিগালাজ গায়ে লাগে না।

.

১.১৩

নূরজাহান মুখ ঝামটা দিয়ে ফেলল, আইজ তুমি আমারে বাইন্দাও রাকতে পারবা না। আইজ আমি বাইর অমুঐ। দুই দিন ধইরা বাইত থনে বাইর অই না। এমুন বন্দি অইয়া মানুষ থাকতে পারে?

দুপুরের খাওয়া সেরে নূরজাহানকে নিয়ে ঘরের ছনছায় (দাওয়া) বসেছে হামিদা। নিজে বসেছে একটা জলচৌকিতে, জলচৌকির সামনে পিঁড়ি পেতে বসিয়েছে নূরজাহানকে। হাতের কাছে ছোট্ট বাটিতে একটুখানি নারকেল তেল, কোলে পুরানা, খানে খানে দাঁত ভাঙা কালো রঙের একখানা কাঁকুই আর লাল রঙের দুইখানা ফিতা। চুলের গোড়ায় গোড়ায় নারকেল তেল ঘষে অনেকক্ষণ ধরে বিলি দিয়ে, আঁচড়ে হামিদা এখন মেয়ের মাথার উকুন মারবে। তারপর লাল ফিতা জড়িয়ে দুইখানা বেণী বেঁধে দেবে। মাসে দুই তিনবার এই কাজটা করে সে। মেয়ে বড় হয়েছে, এই ধরনের যত্ন তার করতে হয়। তাছাড়া নূরজাহান হয়েছে পাড়া বেড়ান, চঞ্চল ধরনের দুরন্ত মেয়ে। সারাদিন এই বাড়ি ওই বাড়ি, সড়ক চকমাঠ ঘুরে যখন বাড়ি ফিরে চেহারায় তার রোদের কালিমা, হাত পায়ে কাদামাটি, মাথার ঘন কালো চুল ধুলায় ধূসর। কয়দিন পর পর এই মেয়েকে বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট পুকুরে নিয়ে পুকুরের পানি আর ডাঙ্গার মাঝামাঝি আড়াআড়ি করে ফেলে রাখা মরা খাজুরগাছ দিয়ে তৈরি ঘাটলায় বসিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করায় হামিদা। ধুন্দুলের ছোবায় (ছোবড়া) বাংলা সাবান মাখিয়ে বিলবাওড়ে চড়ে বেড়ানো গরু বাছুরকে যেমন খাল বিলের পানিতে নামিয়ে ঘষে ঘষে গোসল করায় রাখালরা ঠিক তেমন করে নূরজাহানকে গোসল করায় হামিদা। অতিযত্নে মায়া মমতায়ই করে কাজটা, তবে করার সময় বকাবাজির তুবড়ি ফোটায় মুখে। নূরজাহানের কিশোরী শরীরে যেমন দ্রুত চলে তার সাবান মাখা ধুন্দুলের ছোবা ঠিক তেমন দ্রুত চলে মুখ। এমুন মাইয়া আল্লার দুইন্নাইতে দেহি নাই। এমুন আজাজিল (আজরাইল) আমার পেডে অইছে! বুইড়া মাগি অইয়া গেছে তাও সবাব (স্বভাব) বদলায় না। ঐ গোলামের ঝি, তুই কী ব্যাডা যে সব জাগায় তর যাওন লাগবো! মাইয়া ছেইলাগো যে অনেক কিছু মাইন্না চলতে অয় এই প্যাচাইল তর লগে কী হারাজীবন পারতে অইবো আমার? আমি মইরা গেলে করবি কী তুই, আ?

আজও নূরজাহানকে গোসল করাবার সময় এই ধরনের কথাই বলেছে হামিদা। যখন অবিরাম কথা বলতে থাকে সে তখন মুখে টু শব্দ থাকে না নূরজাহানের। মুখ ব্যাজার করে সব শোনে। কখনও কখনও রাগের মাথায় এত জোড়ে ধুন্দুলের ছোবা নূরজাহানের বুকে পিঠে ঘষতে থাকে হামিদা, শরীর লাল হয়ে যায় নূরজাহানের, ব্যথা পায়, তবু কথা বলে না।

দুই দিন ধরে বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না বলে মন মেজাজ তার খারাপ এজন্য ঘাটলায় বসে হামিদার মুখে মুখে দুই একটা কথা আজ সে বলেছে। হামিদা যখন বলল, আমি মইরা গেলে করবি কী তুই? লগে লগে উৎসাহের গলায় নূরজাহান বলল, কবে মরবা তুমি?

নিজের কথার তালে ছিল বলে মেয়ের কথাটা প্রথমে বুঝতে পারেনি হামিদা। বলল, কী কইলি?

নূরজাহান নির্বিকার গলায় বলল, আমারে নাওয়াইতে (গোসল) বহাইয়া, খাওয়াইতে বহাইয়া তুমি যে সব সময় খালি কও মইরা যাইবা, কবে মরবা?

নূরজাহানের কথায় গা জ্বলে গেল হামিদার। ডানহাতে নূরজাহানের থুতনি বরাবর একটা ঠোকনা (ঠোনা) মারল সে। ক্যা আমি মইরা গেলে তুমি সরাজ (স্বরাজ) পাও! যা ইচ্ছা তাই কইরা বেড়াইতে পারো।

হামিদার ঠোকনায় ব্যথা পেয়েছে নূরজাহান। ব্যথাটা সহ্য করল, করে বলল, হ সরাজ পাই, যেহেনে ইচ্ছা যাইতে পারি। তোমার লাহান বাইত্তে আমারে কে আটকাইয়া রাখবো না। দিনরাইত নিজের ইচ্ছা সাদিন (স্বাধীন) ঘুইরা বেড়ামু। কে কিছু কইবো না।

তরে বিয়া না দিয়া আমি মরুম না। বিয়ার আগে আমার বাইত্তে তরে আটকাইয়া রাখুম, আর বিয়া দিলে জামাই বাইত্তে এমতেঐ তুই আইটকা থাকবি। হেরা তরে ঘর থিকা বাইর অইতে দিব না।

নূরজাহান মুখ ভেংচে বলল, ইহ বাইর অইতে দিব না। আমি তাইলে বিয়াই বমু না।

তারপরও বেশ অনেক কথা হয়েছে মা মেয়ের। শেষ পর্যন্ত বাংলা সাবান দিয়ে মাথার চুল পর্যন্ত ধুয়ে দিয়ে নূরজাহানকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে হামিদা। ধোয়া লাল পাড়ের সবুজ একখানা শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। শাড়ি পরাবার সময় আজ প্রথম খেয়াল করেছে নূরজাহানকে ব্লাউজ পরানো উচিত, মেয়ে বড় হয়ে গেছে।

ফুল তোলা টিনের বাক্সে নাইওর যাওয়ার শাড়ি ব্লাউজ তোলা আছে হামিদার। বছর দুইবছরের বর্ষাকালে কেরায়া নৌকা করে স্বামী কন্যা নিয়ে বাপের বাড়ির দেশে যায় হামিদা। লৌহজং ছাড়িয়ে আড়াই তিন মাইল পুবে পয়সা গ্রাম, সেই গ্রামে বাপের বাড়ি হামিদার। বাপ মা কেউ আর এখন বেঁচে নাই। আছে একমাত্র ভাই আউয়াল। গিরস্তালি করে। অবস্থা ভালই। নাইওর গেলে বোন বোনজামাই আর ভাগ্নিকে ভালই খাওয়ায়।

আজ দুপুরে মেয়ের জন্য নিজের নাইওর যাওয়ার লাল ব্লাউজখানা বের করেছে হামিদা। মেয়েকে পরিয়ে দিয়েছে। বেশ টাইট হয়ে ব্লাউজ গায়ে লেগেছে নূরজাহানের। সবুজ রঙের লাল পেড়ে শাড়ি আর ব্লাউজে হঠাৎ করেই রূপ যেন তারপর খুলে গেছে নূরজাহানের। এতক্ষণ ধরে বকাবাজি করা মেয়েটাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে হামিদা। সাবান দিয়ে গোসল করাবার ফলে, আসন্ন শীতকাল, মানুষের ত্বকে এমনিতেই লেগে গেছে হাওয়ার টান, নূরজাহানের হাত পা মুখ গলা খসখসা দেখাচ্ছিল। কোথাও কোথাও খড়ি ওঠা। মাথার চুল সাবান ঘষার ফলে উড়াউড়া। বেশ অন্যরকম লাগছে মেয়েটিকে দেখতে।

হামিদা তারপর হাতে পায়ে মুখে গলায় সউষ্যার (সরষার) তেল মেখে দিয়েছে নূরজাহানের। চুলে হাত দেয়নি। বলেছে ভাত খেয়ে উকুন মেরে দেবে, চুল আঁচড়ে বেণী করে দেবে। এখন সেই কাজেই বসেছে।

তবে নূরজাহানকে গোসল করার সময় মেজাজ যেমন তিরিক্ষি হয়েছিল এখন আর সেটা নাই। ভাত খাওয়ার ফলে মুখে মেজাজে প্রশান্তির ভাব আসছে। বাটি থেকে আঙুলের ডগায় তেল নিয়ে নূরজাহানের চুলের গোড়ায় গোড়ায় লাগিয়ে দিচ্ছে। সেই ফাঁকে দুই একটা উকুন ধরে এক বুড়া আঙুলের নখের ওপর রেখে অন্য বুড়া আঙুলের নখে চেপে পুটুস করে মারছে। মাঝে মাঝে নূরজাহানকেও মারতে দিচ্ছে একটা দুইটা।

একবার একটা বড় কালো উকুন মারতে মারতে নূরজাহান বলল, ও মা, উকুনের এই হগল নাম দিছে কেডা? বড় উকুনডিরে কয় ‘বুইড়া’ মাজরোডিরে (মেজ) কয় ‘পুজাই’ ছোডডিরে কয় ‘লিক’।

হামিদা বলল, কইতে পারি না। মনে অয় আগিলা (আগের) দিনের ময়মুরব্বিরা দিয়া গেছে।

আগিলা দিনেও উকুন আছিল?

আছিল না! মাইনষের মাথা যতদিন ধইরা আছে উকুনও হেতদিন ধইরা আছে।

তারপর উকুন নিয়ে আর একটা প্রশ্ন করল নূরজাহান। ও মা, চাইম্মা উকুন কারে কয়?

ততক্ষণে মেয়ের মাথায় তেল দেওয়া শেষ করেছে হামিদা। এখন দাঁতভাঙা কাঁকুই দিয়ে যত্ন করে মাথা আঁচড়ে দিচ্ছে। এই অবস্থায় বলল, কোনও কোনও মাইনষের শইল্লের চামড়ায় এক পদের উকুন অয়। লালটা লালটা (লালচে)। হেইডিরে কয় চাই উকুন। চামড়ার লগে থাকে দেইক্কা এমুন নাম। তয় চাইম্মা উকুন অওন ভাল না। ময়মুরব্বিরা কয় চাইম্মা উকুন অয় বালা মসিবত দেইক্কা। যাগো শইল্লে অয় তাগো কপালে খারাপি থাকে।

আমার শইল্লে মনে অয় চাইম্মা উকুন অইছে।

হামিদা আঁতকে উঠল। নিজের অজান্তে হাত থেমে গেল তার। নূরজাহানের মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে আর্তগলায় বলল, কী কইলি? চাইম্মা উকুন অইছে?

নূরজাহান মজার মুখ করে হাসল। মনে অয়।

কেমতে মনে অয়, দেকছসনি?

না দেহি নাই।

তয়?

কইলাম যে মনে অয়।

নূরজাহানের মুখ আবার আগের দিকে ঘুরিয়ে দিল হামিদা। জোরে টেনে টেনে বেণী বাঁধতে লাগল। নূরজাহান একবার উহ করে শব্দ করল তারপর বলল, এত জোরে বেণী বান্দ ক্যা? দুক্কু পাই না?

হামিদা তবু নিজেকে সংযত করল না। আগের মতোই শক্ত হাতে বেণী বাঁধতে বাঁধতে বলল, আমার লগে অলঐক্কা (অলক্ষুণে) কথা কইলে এমুনঐ করুম।

তুমি যুদি আমারে বাইত থনে আইজ না বাইর অইতে দেও তাইলে আরও বহুত কথা কমু দেইক্কোনে।

যত যাই কচ বাইর অইতে দিমু না।

তখনই মুখ ঝামটা দিয়ে ওই কথাটা বলল নূরজাহান। আইজ তুমি আমারে বাইন্দাও রাকতে পারবা না। আইজ আমি বাইর অমুঐ। দুই দিন ধইরা বাইত থনে বাইর অই না। এমনু বন্দি অইয়া মানুষ থাকতে পারে?

হামিদাও নূরজাহানের মতো মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, পারবো না ক্যা? আমরা পারি কেমতে?

তুমি আর আমি কি এক অইলাম?

একঐ। আমি মা তুই মাইয়া। দুইজনেঐ মাইয়ালোক।

ততক্ষণে লাল ফিতা দিয়ে চমৎকার দুইটা বেণী বেঁধে ফেলেছে হামিদা। এখন তেলের বাটি আর কাঁকুই হাতে উঠে দাঁড়াল। শাসনের গলায় মেয়েকে বলল, বাড়ির বাইরে একহান পাও তুই দিতে পারবি না। তর বাপে হেদিন আমারে কইছে আমি যেমতে তরে চালামু অমতেঐ তর চলন লাগবো।

হামিদা উঠে দাঁড়াবার পরও মুখ ব্যাজার করে বসেছিল নূরজাহান। এবার ঘেরজালে আটকা পড়া নলা মাছের মতো লাফ দিয়ে উঠল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, না আমি চলুম না, তোমার ইচ্ছায় আমি চলুম না, আমি আমার ইচ্ছায় চলুম।

এ কথা শুনে মাথায় রক্ত লাফিয়ে উঠল হামিদার। হাতে ধরা কাঁকুই তেলের বাটি ছুঁড়ে ফেলে থাবা দিয়ে নূরজাহানের একটা বেণী ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তর ইচ্ছা মতন তরে আমি চলাইতাছি, বাইত থনে তরে আমি বাইর করতাছি, খাড়া।

বেনী ধরে টানতে টানতে নূরজাহানকে রান্নাচালার সামনে নিয়ে এল। রান্নাচালার মাথার কাছে সব সময় থাকে একগাছা দড়ি। একহাতে নূরজাহানের একটা বেণী ধরে রেখেই অন্যহাতে দড়িটা টেনে নামাল সে। সেই দড়ি দিয়ে কষে হাত দুইখানা বাঁধল নূরজাহানের। দড়ির অন্যমাথা বাঁধল রান্নাচালার একটা খুঁটির সঙ্গে। তারপর ধাক্কা দিয়ে নূরজাহানকে বসিয়ে দলি মাটিতে। পারলে অহন বাইর অ বাইত থন, দেহি কেমতে বাইর অছ!

রাগে দুঃখে নূরজাহানের তখন চোখ ফেটে যাচ্ছে। হাত দুইটা বাধা, পা ছড়িয়ে রান্নাচালার মাটিতে বসা নূরজাহান তারপর ঙো ঙো করে কাঁদতে লাগল।

.

১.১৪

দবির গাছি বাড়ি ফিরল বিকালবেলা। শেষ হেমন্তের রোদ তখন গেন্দা (গাঁদা) ফুলের পাপড়ির মতন ছড়িয়েছে চারদিকে। চকমাঠ গাছপালা আকাশ ঝকঝক করছে। থেকে থেকে বইছে উত্তরের হাওয়া। এই হাওয়ায় মনের ভিতর অপূর্ব এক অনুভূতি হচ্ছে দবিরের। গভীর আনন্দে ভরে আছে মন মৌশুমের প্রথম গাছ ঝুড়ল আজ। খুব সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেছে মিয়াদের ছাড়াবাড়িতে। তারপর থেকে একটানা গাছ ঝুড়েছে। নাওয়া খাওয়ার কথা মনে ছিল না। আটখানা গাছ ঝুড়তে বিকাল হয়ে গেছে। তারপর প্রতিটা গাছে হাঁড়ি ঝুলিয়ে এইমাত্র বাঁশের বাখারির শূন্য ভার কাঁধে বাড়ি ফিরল। হাতের কাজ শেষ হওয়ার পর পরই পেটের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠেছে ক্ষুধা। সেই ক্ষুধা এখন আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে মনের আনন্দ অন্যদিকে ক্ষুধা সব মিলিয়ে আশ্চর্য এক অনুভূতি এখন। বাড়িতে উঠে সারেনি চিৎকার করে হামিদাকে ডাকল। ও নূরজাহানের মা, তাড়াতাড়ি ভাত বাড়ো। খিদায় জান বাইর অইয়া গেল।

ঘরের সামনে সেই জলচৌকিতে বসে পুরানা ছেঁড়া মোটা একখানা কাঁথায় তালি দিচ্ছে হামিদা। কাঁথা কোলের ওপর রেখে অতিযত্নে কাজটা করছে আর রান্নাচালার দিকে তাকাচ্ছে। সেখানে দুইহাত বাঁধা নূরজাহান মাটিতে শুয়ে আছে করুণ ভঙ্গিতে। বাঁধা হাত দুইটা রেখেছে বুকের কাছে। অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে খানিক আগে থেমেছে। এখন চোখ বোজা। যে কেউ দেখে ভাববে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। কিন্তু হামিদা জানে ঘুমায়নি নূরজাহান। চোখ বুজে পড়ে আছে।

মেয়েকে এভাবে মাটিতে শুয়ে থাকতে দেখে এখন মায়া লাগছে হামিদার। ইচ্ছা করছে হাতের বাঁধন খুলে ছোট্ট শিশুর মতো টেনে কোলে নেয় মেয়েকে। দুইহাতে বুকে চেপে আদর করে।

কিন্তু এই কাজ করতে গেলেই লাই পেয়ে যাবে নূরজাহান। মাকে পটিয়ে পাটিয়ে এখনই ছুটে বের হবে বাড়ি থেকে। কোথায় চলে যাবে কে জানে! তারচেয়ে এই ভাল, শাসনের সময় শাসন, আদরের সময় আদর।

তবে বাড়ির উঠানে এসে রান্নাচালায় হাত বাঁধা নূরজাহানকে শুয়ে থাকতে দেখে দবির একেবারে থতমত খেয়ে গেল। একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল তারপর তাকাল হামিদার দিকে। ক্ষুধার কথা ভুলে বলল, কী অইছে? মাইয়াডারে বাইন্দা থুইছো ক্যা?

কথাটা ঘরের ভিতর রেখে এসে হামিদা বলল, তয় কী করুম! তোমার মাইয়ায় কথা হোনে না। জোর কইরা বাড়িতথন বাইর অইয়া যাইতে চায়।

এর লেইগা বাইন্দা থুইবা? আমার মাইয়ায় কি গরু বরকি (ছাগল)? হায় হায় করছে কী!

শূন্য ভার কাঁধ থেকে নামিয়ে ছুটে নূরজাহানের কাছে গেল দবির। চটপটা হাতে বাঁধন খুলে দিল। নূরজাহান যেই কে সেই। যেমন শুয়েছিল তেমনই শুয়ে রইল। এমন কী বাঁধা হাত যেভাবে ছিল সেভাবেই রইল, একটুও নড়াল না। যেন গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে সে, অচেতন হয়ে আছে, এই অবস্থায় হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে, উদিসই পায়নি। দেখে হামিদা বলল, ইস কুয়ারা (ঢং) দেইক্কা মইরা যাই। এই ছেমড়ি ওট, অইছে।

দবির বলল, এমুন করতাছ ক্যা মাইয়াডার লগে? মাইয়াডা তো ঘুমাইয়া গেছে।

হ কইছে তোমারে! কিয়ের ঘুম, ও তো জাগনা।

নূরজাহানের দুইহাতে দড়ির মতো ফুটে উঠেছে দড়ির দাগ। সেই দাগ দেখে হায় হায় করে উঠল দবির। হায় হায়রে হাত দুইখান শেষ কইরা হালাইছে মাইয়াডার।

তারপর হাছড় পাছড় করে টেনে কোলে তুলল নূরজাহানকে। ওট মা ওট। আমি দেখতাছি কী অইছে!

নূরজাহান সত্যি সত্যি ঘুমায়নি। বাপের আদরে বুকের ভিতর উথাল দিয়ে উঠল তার অভিমানের কান্না। নাক টেনে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে লাগল সে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, হারাদিন বাইত্তে বইয়া থাকতে ভাল্লাগেনি মাইনষের? বাইর অইলে কী হয়? আমি কি ডাঙ্গর অইয়া গেছিনি, আমার কি বিয়া অইয়া গেছেনি যে বাইত থনে বাইর অইতে পারুম না!

হামিদা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, না ডাঙ্গর অন নাই আপনে, আপনে অহনতরি নাননা (ছোট) বাচ্চা।

এবার হামিদাকে ধমক দিল দবির। এই চুপ করো তুমি। হারাদিন খালি মাইয়াডার লগে লাইগগা রইছে!

তারপর কোল থেকে নামাল নূরজাহানকে। এই আমি তরে ছাইড়া দিলাম মা। যা যেহেনে ইচ্ছা ঘুইরা আয়, দেহি কেডা তরে আটকাইয়া রাখে?

আঁচলে ডলে ডলে চোখ মুছল নূরজাহান। একবার মায়ের দিকে আর একবার বাবার দিকে তাকাল তারপর হি হি করে হেসে বাড়ির নামার দিকে ছুটতে লাগল। চোখের পলকে হিজল ডুমুরে জঙ্গল হয়ে থাকা টেকের ওদিক দিয়ে শস্যের মাঠে চলে গেল। দবির মুগ্ধ চোখে ছুটতে থাকা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

উত্তরের হাওয়ায় শাড়ির আঁচল উড়ছে নূরজাহানের, পিঠে দুলছে বেণী, পায়ের তলায় সবুজ শস্যের মাঠ, মাথার ওপর হলুদ রোদে ভেসে যাওয়া বিশাল আকাশ, এই রকম পরিবেশে হরিণীর মতো ছুটতে থাকা নূরজাহানকে বাস্তবের কোনও মানুষ মনে হয় না, মনে হয় স্বপ্নের মানুষ।

এই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ক্ষুধার কথা ভুলে গেল দবির। আজ প্রথম গাছ ঝুড়েছে, ভুলে গেল। হামিদার দিকে তাকিয়ে বলল, দেহে, চাইয়া দেহো কত সোন্দর দেহা যাইতাছে মাইয়াডারে। এর থিকা সোন্দর কিছু আল্লার দুইন্নাইতে আছে, কও? বনের পাখিরে কোনওদিন খাঁচায় আটকাইয়া রাকতে অয় না, পাখি যেমতে উইড়া বেড়ায়, বেড়াউক।

হামিদা গম্ভীর গলায় বলল, তোমার আল্লাদে যে কোন ক্ষতিডা একদিন অইবো মাইয়ার, বোজবা। তহন কাইন্দাও কূল পাইবা না।

.

১.১৫

দেশগ্রামের যে কোনও বাড়িতে ঢোকার আগে নিজেকে একটু পরিপাটি করেন মান্নান মাওলানা। মাথার গোল টুপিখানা খুলে টাক পড়া মাথায় একবার দুইবার হাত বুলান তারপর টুপিখানায় দুই তিনটা ফুঁ দিয়ে মাথায় পরেন। নাদুসনুদুস দেহ তাঁর ঢাকা থাকে হাঁটু ছাড়িয়ে বিঘতখানেক নেমেছে এমন লম্বা পানজাবিতে। লুঙ্গি পরেন গুড়মুড়ার ওপরে। লম্বা পানজাবিতে ঢাকা পড়ে থাকার ফলে পায়ের কাছে লুঙ্গির অল্প দেখা যায়। পানজাবি পরেন ঢোলাঢালাই, হলে হবে কী, দিন যত যাচ্ছে, বয়স যত বাড়ছে ভূড়িখানাও ততই বাড়ছে তার। নাভির কাছে গিট দিয়ে পরেন লুঙ্গি। এমনিতেই অতিকায় ভুড়ি তার ওপর লুঙ্গির গিট, পেটের কাছে এসে ঢোলা পানজাবিতেও বেড় পায় না তাঁর দেহ। টাইট হয়ে অনেকটা গেঞ্জির কায়দায় ভুঁড়িতে সেটে থাকে।

মুখখানা মান্নান মাওলানার মাঝারি মাপের চালকুমড়ার মতন। ছোট্ট খাড়া নাকখানার তলা নিখুঁত করে কামানো। দুই পাশের জুলপি থেকে ঘন হয়ে নেমেছে চাপদাঁড়ি। থুতনির কাছে এসে সেই দাঁড়ি যোগ হয়ে নেমেছে বুক বরাবর। বেশ অনেককাল আগেই পাক ধরেছে দাঁড়িতে। তখন থেকেই নিয়মিত মেন্দি (মেহেদি) লাগাচ্ছেন। ফলে পাকা দাঁড়িগুলিতে লাল রঙ ধরেছে, কাঁচাগুলি হয়েছে গভীর কালো।

চোখ দুইটা মান্নান মাওলানার ষাড়ের মতন, যেদিকে তাকান তাকিয়েই থাকেন, সহজে পলক পড়ে না চোখে। যেন কথা বলবার দরকার নাই, হাত পা ব্যবহার করবার দরকার নাই, দৃষ্টিতেই ভস্ম করে ফেলবেন শত্রুপক্ষ। এইজন্য মান্নান মাওলানার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না কেউ। ভুল করে অচেনা কেউ তাকালেও দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে পলকেই সরিয়ে নেয় চোখ।

আজ বিকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন মান্নান মাওলানা। চক বরাবর হাঁটতে শুরু করেছেন, শোনেন খাইগো (খানদের) বাড়ির মসজিদে আছরের আজান হচ্ছে। এই মসজিদের আজান শুনলেই বুকের ভিতর মৃদু একটা ক্রোধ টের পান তিনি। খানেরা কী যেন কী কারণে মান্নান মাওলানাকে একদমই দেখতে পারেন না। বাড়ির লাগোয়া লাখ লাখ টাকা খরচা করে মসজিদ করলেন। চারখানা মাইক লাগালেন মিনারের চারদিকে। দেশগ্রামে বিদ্যুৎ নাই, ব্যাটারিতে চলে মাইক, ব্যাপক খরচ। সেই খরচের তোয়াক্কা করেন না তারা। অবশ্য চারমুখি চারখানা মাইক দেওয়াতে আজানের ললিত সুর হাওয়ার টানে পলকে পৌঁছে যায় চারপাশের গ্রামে। এক মসজিদের আজানে কাজ হচ্ছে অনেক গ্রামের। এ এক বিরাট ছোয়াবের কাজ।

কিন্তু মসজিদ করতে গিয়ে কেন যে নিজ গ্রামের লোকের দিকে তাকালেন না তারা, কেন যে মান্নান মাওলানাকে মসজিদের ইমাম না করে ইমাম আনালেন নোয়াখালী থেকে, এই রহস্য মাথায় ঢোকে না মান্নান মাওলানার। মসজিদ তৈরি হওয়ার সময় সারাদিন ঘুরঘুর করেছেন খান বাড়িতে। মন দিয়ে তদারক করেছেন মসজিদের কাজের, আজানের সময় আজান দিয়েছেন, মসজিদের কাজ করছে যেসব ওস্তাগার জোগালু সেই সব ওস্তাগার জোগালুদের নিয়ে নামাজ পড়েছেন, ইমামতি করেছেন। কিন্তু মসজিদ হয়ে যাওয়ার পর তাঁর আর ডাক পড়ল না। ক্রোধটা সেই থেকে তৈরি হয়ে আছে মান্নান মাওলানার বুকে। যদিও তিনি বোঝেন ইমাম সাহেবের কোনও দোষ নাই, তাঁকে আনা হয়েছে বলেই এসেছেন, চাকরিও করছেন ধর্মের কাজও করছেন, তার জায়গায় মান্নান মাওলানা হলেও একই কাজই করতেন, তবু ক্রোধটা হয়। পাঁচ ওয়াক্তের আজানে পাঁচবার মনে পড়ে তার ইমামতি আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছেন খান বাড়ির কর্তারা। তার ক্ষমতা চলে গেছে আরেকজনের হাতে। তবু আজান আজানই, যেই দেউক, আজান হলেই নামাজ পড়তে হরে, ধর্মের বিধান।

মান্নান মাওলানা নামাজ পড়তে বসলেন। চকের কয়েকটা খেতে কলুই (মটর) বোনা হয়েছে, সরিষা বোনা হয়েছে, কোনও কোনও খেত ফাঁকা, আগাছা পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে শস্য দেওয়ার জন্য। কোনও কোনওটায় গজিয়েছে গাঢ় সবুজ দূর্বাঘাস। এরকম এক দূর্বাঘাসের জমিতে নামাজ পড়তে বসেছেন তিনি। হু হু করে বইছে উত্তরের হাওয়া। হাওয়ায় শীত শীত ভাব। তবে হেমন্তের রোদ কম তেজাল না, রোদে বসে নামাজ পড়ছেন বলে শীতভাব টের পেলেন না মান্নান মাওলানা। মোনাজাত শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে পড়ল মেন্দাবাড়ির বড়সারেঙের বড়মেয়ের বড়ছেলে এনামুল ঢাকার টাউনে থান কাপড়ের ব্যবসা করে, কন্ট্রাক্টরি করে অঢেল টাকা পয়সার মালিক হয়েছে। ধর্মপ্রাণ নরম স্বভাবের যুবক। মান্নান মাওলানা কয়েকবার তাকে দেখেছেন। বিধবা খালা দেলোয়ারা থাকে বাড়িতে। তাকে দেখতে আসে। খালার জন্য বেদম টান। এনামুলের। খালার কথায় ওঠে বসে।

আছরের নামাজ শেষ করার পর মান্নান মাওলানার আজ মনে হল দেলোয়ারার কাছে গেলে কেমন হয়! তাকে যদি বলা যায়, বাড়ির লগে একখান ছাড়াবাড়ি পইড়া রইছে তোমগো, কোনও ভাই বেরাদর নাই, দুই বইন তোমরা, বড় বইন থাকে টাউনে তুমি থাক দ্যাশে, বইনপোর (বোনের ছেলে) এতবড় অবস্থা, তারে কও ছাড়া বাইত্তে একখান মজজিদ (মসজিদ) কইরা দিতে। আল্লার কাম তো অইবোঐ, দ্যাশ গেরামে নামও অইব। ইমাম লইয়া চিন্তা করতে অইবো না, আমি ইমামতি করুম। টেকা পয়সা বেশি লাগবে না।

এসব কথা ভেবে মনের ভিতর বেশ একটা আনন্দ টের পেলেন মান্নান মাওলানা। দ্রুত হেঁটে মেন্দাবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিজেকে যেভাবে পরিপাটি করার করলেন, সব শেষে পানজাবির পকেট থেকে বের করলেন গোলাপি রঙের ছোট্ট একখানা চিরুনি। চিরুনির দাঁতের ফাঁকে কালো তেলতেলে ময়লা জমে পুর (পুরু) হয়ে আছে। এক হাতে ফরফর করে চিরুনি পরিষ্কার করলেন তারপর মন দিয়ে দাঁড়ি আঁচড়াতে লাগলেন।

১.১৬-২০ মান্নান মাওলানা

১.১৬

হঠাৎ করেই মান্নান মাওলানাকে দেখতে পেল নূরজাহান। দুই দিন পর ছাড়া পেয়ে পাগলের মতো ছুটছিল সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ভেবেছে সড়কে যাবে, দেখবে কত উঁচু হল সড়ক, কত দূর আগাল। তারপরই সেই চিন্তা বাতিল করে দিয়েছে। এক দুইদিনে এতবড় সড়ক উঁচু একটু হতে পারে, আগাবে আর কতটুকু! অল্প একটু যা আগায় খেয়াল করে না দেখলে বোঝা যায় না। তারচেয়ে সড়ক দেখতে যাওয়া উচিত কয়েকদিন পর পর, ওইভাবে দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় কতটা আগালো।

মাঠ ভেঙে ছুটতে ছুটতে এই ভেবে আজ সড়কের দিকে যায়নি নূরজাহান। তার মনে পড়েছে মজনুর কথা। চারমাস হল মজনু চলে গেছে টাউনে। সেখানে খলিফাগিরি শিখছে। তিন চারদিন হল বাড়িতে আসছে। হয়তো দুই একদিনের মধ্যে আবার চলে যাবে। আজ হালদার বাড়িতেই যাবে সে, মজনুকে দেখে আসবে। চারমাসে কতটা বদলেছে মজনু, কেমন হয়েছে দেখতে।

টাউনে থাকলে চেহারা অন্যরকম হয়ে যায় মানুষের। মজনুর কেমন হয়েছে!

মেন্দাবাড়ির সামনে দিয়ে ছুটে যেতে যেতে মজনুর চেহারা কল্পনা করছিল নূরজাহান এজন্য মান্নান মাওলানাকে প্রথমে দেখতে পায়নি। দেখল একেবারে কাছাকাছি এসে, আথকা। দেখে চমকাল সে, নিজের অজান্তে থেমে গেল পা। তবে পলকের জন্য, তারপরই আবার ছুটতে যাবে, মান্নান মাওলানা গম্ভীর গলায় বললেন, ঐ ছেমড়ি, খাড়ো।

নূরজাহান দাঁড়াল, মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল।

দাঁড়ি আঁচড়ানো শেষ করে মান্নান মাওলানা তখন চিরুনি পরিষ্কার করছেন। সেই ফাঁকে নূরজাহানের চোখের দিকে তাকালেন। দউবরার মাইয়া না তুই?

দবিরকে কেউ দউবরা বললে রাগে গা জ্বলে যায় নূরজাহানের, সে যেই হোক। এখনও তেমন হল। মান্নান মাওলানার চোখের দিকে ভয়ে কখনও তাকায় না নূরজাহান। তাকালে বুকের ভিতর ভয়ার্ত অনুভূতি হয়। এখন আর তেমন হল না। চোখ তুলে মান্নান মাওলানার চোখের দিকে তাকাল। চাপা রাগি গলায় বলল, আমার বাপের নাম দউবরা না, দবির, দবির গাছি।

চিরুনি পকেটে রাখলেন মান্নান মাওলানা কিন্তু নূরজাহানের চোখ থেকে চোখ সরালেন না। গলা আরেকটু গম্ভীর করে বললেন, কচ কী!

ঠিকঐ কই। আমার বাপরে কোনওদিন দউবরা কইবেন না।

কইলে কী অইবো?

নূরজাহানের প্রায় মুখে এসে গিয়েছিল, কইলে দাঁড়ি টাইন্না ছিড়া হালামু। কী ভেবে কথাটা সে চেপে রাখল। তবে গলার ঝাঁঝ কমাল না, বলল, আমারে খাড়ঐতে কইলেন ক্যা?

আগের মতোই নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে মান্নান মাওলানা বললেন, কথার কাম আছে।

কী কথা?

এতবড় মাইয়া এত ফরফর কইরা ঘোরচ ক্যা? যেহেনে যাই ওহেনেঐ দেহি তরে।

দেকছেন কী অইছে? আমার ইচ্ছা আমি যাই।

আর যাইতে পারবি না।

লগে লগে ঠোঁট বাঁকাল নূরজাহান। তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, ইহ্ যাইতে পারবো না। আপনে আমার বাপ লাগেন যে আপনের কথা হোনন লাগবো?

নূরজাহানের কথায় রক্ত মাথায় লাফিয়ে উঠল মান্নান মাওলানার। রাগে দিশাহারা হয়ে গেলেন। চিৎকার করে বললেন, কচ কী, আরে কচ কী তুই! আমার মুখের উপরে এতবড় কথা! তরে তো আমি জবেহ কইরা ফালামু। তরে তো কেঐ বাচাইতে পারবো না। মজজিদের ইমাম অইলে অহনঐ সাল্লিশ (সালিশ) ডাকাইতাম আমি, ল্যাংটা কইরা তর পাছায় দোররা মারতাম। বেপরদা বেহাইইয়া মাইয়াছেইলা, মাওলানা ছাহেবের মুখে মুখে কথা কয়! খাড়ো মজজিদখান বানাইয়া লই, এই গেরামের বিচার সাল্লিশ বেবাক করুম আমি। শরিয়ত মোতাবেক করুম, তর লাহান মাইয়ারা বরকা (বোরখা) না ফিনদা বাইতথন বাইর অইতে পারবো না। চুদুরবুদুর (এদিক ওদিক, ইতরামো ফাজলামো অর্থে) করলে গদে (গর্তে) ভইরা একশো একহান পাথথর ফিক্কা (ছুঁড়ে) মারুম।

ডানহাতের বুড়া আঙুল মান্নান মাওলানার দিকে উঁচিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নূরজাহান বলল, আপনে আমার এইডা করবেন। পচা মলবি, কিচ্ছু জানে না খালি বড় বড় কথা! জানলে তো খাইগোরা (খানেরা) আপনেরেঐ ইমাম বানাইতো, অন্যদেশ থিকা ইমাম আনেনি! মাওলানা কারে কয়, ইমাম কারে কয় খাইগো বাড়ি মজজিদের হুজুররে দেখলে বোজবেন। দেখলেঐ ছেলাম করতে ইচ্ছা করে। ফেরেশতার লাহান মানুষ। আর আপনে, আপনেরে দেখলে মনে অয় খাডাস (খাটাস), রাজাকার।

রাজাকার কথাটা আথকা মুখে এসে গেল নূরজাহানের। কথাটা সে কোথায়, কার কাছে শুনেছে মনে নাই, অর্থ কী তাও জানে না, তবু বলল। বলে আরাম পেল।

তারপর মান্নান মাওলানার সামনে আর দাঁড়াল না নূরজাহান। হালদার বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে মনে হল বাপকে দউবরা বলার শোধটা ভালই নিয়েছে। ময়মুরব্বির মুখে মুখে কথা বলা, তাঁদের সঙ্গে বেয়াদবি করার পর মনের ভিতর এক ধরনের অপরাধবোধ হয়, হয়তো মা বাবার কাছ বিচার যাবে, হয়তো মারধোর করবে মা বাবা সেই ভয়ে ধুগযুগ ধুগযুগ করে বুক, কিন্তু নূরজাহানের তেমন কিছুই হল না। উৎফুল্ল মনে ছুটতে লাগল সে।

.

১.১৭

নিমতলার চুলায় ভাত চড়িয়েছে রাবি। নাড়ার আগুনে তেজ বেশি বলে চুলায় হাঁড়ি বসাতে না বসাতেই বলক ওঠে ভাতে। রাবির হাঁড়িতেও উঠেছে। সেদিকে খেয়াল নাই রাবির। সারাদিন বাড়া বানছে বেপারিবাড়িতে, খানিক আগে বাড়ি ফিরেই নিমতলায় বসেছে, একহাতে ভাত চড়িয়েছে চুলায় অন্যহাতে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেছে দশ বছরের ছেলে বাদলাকে। এখন ভাতের দিকে মন নাই, মন বাদলার দিকে। এতবড় হয়েছে ছেলে তবু বুকের দুধ ছাড়তে পারেনি। মাকে দেখলেই নেশাটা বাদলার চেপে বসে। দুইতিন বছর বয়সী শিশুর মতো ভঙ্গি করে মায়ের কোলে প্রথমে মুখ গোঁজে তারপর নিজ হাতে কাপড় সরিয়ে বুকে মুখ দেয়। রাবি একটুও বিরক্ত হয় না। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। মেদিনীমণ্ডল, কুমারভোগ, মাওয়া, দোগাছি যে গ্রামের যে বাড়িতে ডাক পড়ে, বিয়াইন্না রাইত্রে (ভোর রাতে) উঠে কাজ করতে চলে যায়। ধান বানে, ধান সিদ্দ করে। যে বাড়িতে কাজ করে সকাল দুপুর দুইবেলা খাবার পায় সেই বাড়িতে, ফিরার সময় পায় দেড় দুইসের চাউল। সেই চাউল টোপরে করে বাড়ি ফিরার পরই অন্যমানুষ হয়ে যায় সে। তখন আর রাবি কাজের মানুষ না, তখন রাবি মা। বাদলাকে বুকে চেপে উদাস হয়ে বসে থাকে। বাদলা দুধ খায়, রাবি নির্বিকার।

আজ বিকালে নির্বিকার ছিল না রাবি। রাগে ক্রোধে রোদে পোড়া পরিশ্রমী মুখ তার ফেটে পড়ছে। রাবির স্বভাব হচ্ছে নিচু স্বরে কথা বলা, রাগ করুক আর যাই করুক গলা রাবির কখনও চড়ে না।

এখনও চড়েনি। বুকে মুখ দেওয়া বাদলার মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে চাপা রাগি স্বরে বলল, কুনসুম মারছে?

মায়ের বুক থেকে মুখ সরাল না বাদলা, ঠোঁট আলগা করে জড়ানো গলায় বলল, দুইফরে।

কীর লেইগা মারলো?

এমতেঐ।

এমতেঐ কেঐ কাঐরে মারে না। তুই কী করছস ক!

কিছু করি নাই।

তরে হেয় পাইলো কই?

আমি তাগ ঐমিহি গেছিলাম।

কীর লেইগা গেছিলি?

কইতর (কবুতর) দেকতে।

কইতর কোনওদিন দেহচ নাই! আইজ নতুন কইরা দেহনের কী অইলো?

একথায় মায়ের বুক থেকে মুখ আলগা করে ফেলল বাদলা। তবে কোল থেকে মুখ সরাল না। যেন এখান থেকে মুখ সরালেই তার সম্পদ ছিনিয়ে নিবে অন্য কেউ, তার খাদ্যে ভাগ বসাবে অন্য কেউ। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বাদলা বলল, এই কইতর দেহি নাই মা। তুমিও দেহো নাই। আইজ গোয়ালিমান্দ্রার হাট থিকা কিন্না আনছে। লোটন (নোটন) কইতর। দুধের লাহান ফকফইক্কা। পাখ (পাখনা) দুইডা আর ঠ্যাং দুইডা এক হাতদা ধইরা, ঠোঁট দুইডা ইট্টু টান দিয়া কতক্ষুণ ঝাইক্কা (ঝাঁকুনি দিয়ে) মাডিতে ছাইড়া দিলে জব (জবাই) করা মুরগির লাহান দাপড়াইতে থাকে। খুব সোন্দর লাগে দেকতে।

রাবি বলল, কী দিয়া মারছে।

বাদলা কথা বলল না। খানিক থেমে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে এখন সেই সময় আর এই সময়ের খাদ্যটা একবারে উসিল (উসুল) করে নিচ্ছে।

রাবি বলল, ঐ ছেমড়া কথা কচ না ক্যা?

পলকের জন্য ঠোঁট আলগা করল বাদলা। খাড়ও কইতাছি।

তাড়াতাড়ি ক।

ক্যা?

আমার কাম আছে।

কী কাম?

বুজিরে কমু না?

কী কইবা?

মোতালেইব্বা যে তরে মারছে।

কইয়া কাম অইবো না। মোতালেব কাকায় কইছে আমি কেরে ডরাই না। এই বাড়ি আমার। আমার উপরেদা কেঐ কথা কইলে তারা এই বাইত্তে থাকতে পারবো না। দেলরা বুজিরেই থাকতে দিমু না, আর তরা তো চউরা, দেলরা বুজির ঘরে থাকচ।

একথা শোনার লগে লগে বাদলাকে ঠেলা দিয়ে কোল থেকে তুলে দিল রাবি। ওট, ম্যালা খাইছস। লাগলে ইট্টু পরে আবার খাইচ। অহন ল আমার লগে।

বাদলা হরতরাইস্যা (হকচকানো) ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। কই যামু?

বুজির কাছে।

বাদলা হি হি করে হাসল। বুজির কাছে যাইবা কী, ঐ যে বুজি।

বাড়ির দক্ষিণ দিককার পালানে (বাগানে) আনমনা ভঙ্গিতে পায়চারি করছেন দেলোয়ারা। কোনও কোনও বিকালে কী যেন কী কারণে উদাস হয়ে যান তিনি। বিশাল পালানে নরম পায়ে পায়চারি করেন, আকাশের দিকে তাকান আর ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। দেখে যে কেউ ভাববে গভীর কোনও দুঃখ বেদনায় যেন ডুবে আছেন মানুষটা।

দেলোয়ারা সব সময় সাদা থান পরেন। মাথার চুলও বেশিরভাগই পরনের থানের মতো। মোটাগাটা শরীর, গোলগাল ধপধপা মুখ, চোখে চশমা, পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল, সব মিলিয়ে দেলোয়ারা যে দীর্ঘকাল ধরে বিধবা এটা বোঝা যায়। কোনও কোনও বিকালের বিষণ্ণ আলোয় পালানে পায়চারি করা মানুষটাকে দেখে বুকের ভিতর অব্যক্ত এক কষ্ট মোচড় দিয়ে ওঠে রাবির। দেলোয়ারা তার কেউ না, তারা এই অঞ্চলের মানুষই না, পদ্মাচরের মানুষ। চরে কাজকাম নাই, দুইবেলার ভাত জোটে না। এজন্য চরের অন্যান্য মানুষের মতো রাবিও স্বামী সন্তান নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে এপারে এসেছে। এপারে বিক্রমপুর, যুগ যুগ ধরে ধনী অঞ্চল। পদ্মা চরের মানুষেরা, চউরারা চিরকাল এপারেরটা খেয়ে পরে বাঁচে। রাবিও বাঁচছে। স্বামী সন্তান নিয়ে বাঁচছে।

এই অঞ্চলের পয়সাঅলা লোক বেশিরভাগই থাকে ঢাকায়। গ্রামে বড় বড় বাড়ি খালি পড়ে থাকে। ছোট সংসারের চউরা পরিবার পেলে বাড়িতে আশ্রয় দেয়। কাজ কাম দিয়ে সাহায্য করে, টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করে। দিনে দিনে অদ্ভুত এক আত্মীয়তা গড়ে ওঠে।

রাবিরও তেমন এক আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে দেলোয়ারার সঙ্গে। বোধহয় দেলোয়ারার উদাসীনতা দেখে বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে এজন্যই।

এই বাড়ির হদিস রাবিদেরকে দিয়েছিল মিয়াবাড়ির বাঁধা কামলা আলফু। একই চরের মানুষ তারা। দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে যাতায়াত আলফুর। এলাকার প্রায় সবাইকে চিনে, সবাই তাকে চিনে। আলফুর কথায় এই বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছে তারা।

বাড়িটা তিন শরিকের। দেলোয়ারা বড় শরিকের মেয়ে। অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন বলে শ্বশুরবাড়ি আর যাননি। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছিলেন। মা বাবা গত হয়েছেন বহুকাল আগে। কোনও ভাই নাই, দুইটি মাত্র বোন তাঁরা। বড়বোনের বড় অবস্থা। ঢাকায় বাড়ি গাড়ি সবই আছে। ছেলেরা ব্যবসাবাণিজ্য করে কেউ, কেউ বিদেশে থাকে। দেলোয়ারার মেয়েটাও ছিল ঢাকায়, খালার কাছে। পড়াশুনা শিখিয়ে, ম্যালা টাকা পয়সা খরচা করে সেই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে দেলোয়ারার বোনপোরা। জামাই কাপড়ের ব্যবসা করে। অবস্থা ভাল। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখের সংসার।

মেয়ে জামাই কিছুতেই চায় না গ্রামে পড়ে থাকেন দেলোয়ারা। তাদের কাছে গিয়ে থাকেন। যান দেলোয়ারা, তবে দুইচার দিনের জন্য। বেড়াতে। টাউনে বেশিদিন মন টিকে না বলে চলে আসেন। বাপের বাড়ির সম্পত্তি দেলোয়ারা না থাকলে গিলে খাবে লোকে। রাবিদের নিয়ে বাড়ি আলগান (আগলান) তিনি, ঘর দুয়ার জায়গা সম্পত্তি আলগান। এই করতে করতে অদ্ভুত এক মায়া পড়ে গেছে সবকিছুর ওপর। দুইচার দিনের জন্য ফেলে গেলেও মন খুঁত খুঁত করে।

বাড়ির অন্য দুই শরিকের ঘরে ম্যালা ছেলেমেয়ে। কর্তারা কেউ বেঁচে নাই, তাদের ছেলেমেয়েরা আছে। মেয়েদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেরা যে যার মতো সংসার করছে কেউ ঢাকায়, কেউ গ্রামে। কেউ আবার দুই জায়গায়ই। বউ ছেলেমেয়ে গ্রামে, নিজে থাকছে ঢাকায়। শুধু ছোট শরিকের চার নম্বর ছেলে মোতালেব থাকে বাড়িতে। গৃহস্থালী করে আর গ্রামে মাতাব্বরি সর্দারি করার চেষ্টা করে। দেশ গ্রামে তার দুই পয়সার দাম নাই। লোভী আর হ্যাঁচড়া ধরনের লোক বলে মোতালেবকে কেউ পাত্তা দেয় না। গ্রামের কোথাও তার কথা টিকে না বলে নিজের ক্ষমতা সে দেখায় বাড়িতে। বাড়িরও সবার সঙ্গে না, দেলোয়ারাদের ঘরে আশ্রিত রাবি, রাবির ছেলে বাদলা স্বামী মতলেব হচ্ছে তার ক্ষমতা দেখাবার জায়গা। সুযোগ পেলেই নানা রকমভাবে এদেরকে সে উৎপীড়ন করে। আজ যেমন মেরেছে বাদলাকে।

নিজে দুই চারটা খারাপ কথা শুনতে রাজি আছে রাবি, স্বামীকেও কেউ ছোটখাট অপমান করলে রাও করে না কিন্তু ছেলের গায়ে হাত দিলে তাকে রাবি কিছুতেই ছাড়বে না, সে যেই হোক।

মোতালেবকেও রাবি আজ ছাড়বে না। প্রথমে দেলোয়ারা বুজিকে সব বলবে, বুজি যদি বিচার না করে সে নিজে গিয়েই দাঁড়াবে মোতালেবের সামনে। মুখে যা আসে তাই বলে বকাবাজি করবে। বউ পোলাপানের সামনে যতদূর অপমান করার করবে। মোতালেব তো আর মারতে পারবে না তাকে! অন্যের বউঝির গায়ে হাত তোলা এত সোজা না। দেশ গ্রামে বিচার সালিস আছে।

ছেলের হাত ধরে দেলোয়ারার সামনে গিয়ে দাঁড়াল রাবি। বুজি, ও বুজি।

দেলোয়ারা তাকিয়েছিলেন আকাশের দিকে। রাবির ডাকে তার দিকে মুখ ফিরালেন। কী রে?

আপনের লগে কথার কাম আছে।

ক।

এই বিচার আপনের আইজঐ করন লাগবো, অহনঐ করন লাগব। না করলে এই বাইত্তে আমি থাকুম না। এই বাইত থিকা যামু গা।

চোখ থেকে মোটা কাঁচের চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে মুছতে লাগলেন দেলোয়ারা। শান্ত গলায় বললেন, কী অইছে ক।

আমার পোলারে মারছে।

কে?

আপনের ভাইয়ে।

কোন ভাইয়ে?

এই বাইত্তে আর কোন ভাই আছে আপনের! মোতালেব।

কীর লেইগা মারছে।

কইতর দেকতে গেছিলো।

বাদলার দিকে তাকাল রাবি। ঐ ছেমড়া কী দিয়া মারছে তরে, ক, বুজিরে ক।

বাদলা বলল, কিছু দিয়া মারে নাই। ঠাস কইরা পিডে একটা থাবর দিছে। তারবাদে গলা ধইরা ধাক্কা দিয়া খেদাইয়া দিছে।

কাঁচ মোছা শেষ করে চশমাটা আবার চোখে পরলেন দেলোয়ারা। নির্বিকার গলায় বললেন, আইচ্ছা, মোতালেবরে আমি কমুনে।

দেলোয়ারার এই আচরণ ভাল লাগল না রাবির। সে যে ধরনের মন নিয়ে বিচার দিতে এল তার ধারকাছ দিয়েও গেলেন না দেলোয়ারা। ছেলেটাকে মেরেছে এটা যেন পাত্তাই দিলেন না।

ভিতরে ভিতরে রেগে গেল রাবি। চাপা গলায় বলল, আপনের কাছে আইলাম বিচার দিতে আর আপনে কথাডা গায় লাগাইলেন না, এইডা ঠিক করলেন না বুজি!

রাবির মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন দেলোয়ারা। তুই তাইলে কী করতে কচ? আমি গিয়া বইক্কামু (বকে আসব) মোতালেইব্বারে, না মাইরামু (মেরে আসব)।

হেইডা আপনে পারবেন না। হেই ক্ষমতা আপনের নাই। মোতালেইব্বা তো কইছে অর লগে কাইজ্জা করলে আপনেরে সুদ্দা বাড়িত থন বাইর কইরা দিবো।

কথাটা দেলোয়ারার খুবই গায়ে লাগল। ভুরু কোঁচকালেন তিনি। কী কইলি?

হ। বিশ্বাস না অইলে বাদলারে জিগান।

ছেলের দিকে তাকাল রাবি। কীরে বাদলা,কয় নাই?

বাদলা বলল, হ কইছে।

কো মোতালেইব্বা কো? ল তো আমার লগে।

তিন বয়সী তিনজন মানুষ যখন পা বাড়িয়েছে মান্নান মাওলানা এসে দাঁড়ালেন পালানে। বইন আছোনি বাইত্তে?

মান্নান মাওলানাকে দেখে বেতিব্যস্ত হল তিনজন মানুষ। দেলোয়ারা রাবি মাথায়। ঘোমটা দিল।

দেলোয়ারা কথা বলবার আগেই রাবি বলল, এহেনেঐ বইবেন না ঘরে যাইবেন হুজুর?

মান্নান মাওলানা রাবির দিকে তাকালেন না। দেলোয়ারার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ঘরে বহি, কী কও বইন! তোমার লগে কথার কাম আছে।

দেলোয়ারা বললেন, লন তাইলে ঘরে লন।

দেলোয়ারা আর মান্নান মাওলানা ঘরে ঢোকার আগেই প্রায় ছুটে এসে বড়ঘরে ঢুকল রাবি। উত্তরমুখি কামরায় রাখা হাতলআলা চেয়ারগুলির একটা আঁচলে মুছে পরিষ্কার করল। দেলোয়ারার সঙ্গে মান্নান মাওলানা এসে এই কামরায় ঢোকার লগে লগে বলল, বহেন হুজুর। বহেন।

মান্নান মাওলানা তবু রাবির দিকে তাকালেন না। দাঁড়ি হাতাতে হাতাতে তাকালেন দেলোয়ারার দিকে। বহো বইন।

মাথায় ঘোমটা দেওয়া দেলোয়ারাকে এখন অন্যরকম দেখাচ্ছে। বয়সের তুলনায় বেশি বয়স্ক, বেশি ভারিক্কি। গুছিয়ে নরম ভঙ্গিতে একটা চেয়ারে বসলেন তিনি। চশমার ভিতর থেকে মান্নান মাওলানার দিকে তাকালেন। তিনি কথা বলবার আগেই রাবি বলল,

চা বানামু বুজি?

এবার রাবির দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। বানাও, ভাল কইরা চা বানাও। দুদ দিবা না। লাল চা। আদা তেজপাতা দিবা। গলাডা দুইদিন ধইরা খুসখুস করতাছে।

রাবি দেলোয়ারার দিকে তাকাল। আপনেরেও দিমু বুজি?

দেলোয়ারা বললেন, না। চা আমার ভাল্লাগে না।

রাবি যতক্ষণ বাড়িতে থাকে বাদলা আছে তার লগে লগে। মায়ের আঁচলটা ধরেই থাকে। এখনও আছে। চায়ের কথা শুনে রাবির আঁচল ধরে একটা টান দিল। রাবি বিরক্ত হয়ে ছেলের দিকে তাকাল। কী রে, এমন করচ ক্যা?

বাদলা ফিসফিস করে বলল, আমারেও ই চা দিও মা। বাডিতে কইরা দিও। ফুঁ দিয়া দিয়া খামুনে। চা খাইতে বহুত মজা।

দেলোয়ারা বললেন, ওই ছেমড়া কী কচ হাকিহুকি (ফিসফিস) কইরা?

রাবি হাসিমুখে বলল, না কিছু না। অন্যকথা।

তারপর ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে গেল।

দেলোয়ারা বললেন, কন মাওলানা সাব, কী কথা, হুনি।

মান্নান মাওলানা একটু গলা খাঁকারি দিনে। মুখখানা অমায়িক করে বললেন, তোমার বইনপো বাইত্তে আইবো না?

কে এনামুল?

হ।

আইবো।

কবে?

সঠিক কইতে পারি না। তয় তাড়াতাড়িঐ আইবো। বহুতদিন বাইত্তে আহে না।

এইবার আইলে আমারে ইট্টু খবর দিও। তার লগে কথার কাম আছে।

আইচ্ছা দিমুনে।

মান্নান মাওলানা হাসলেন। কী কথার কাম জিগাইলা না?

দেলোয়ারাও হাসলেন। যেই কথা এনামুলরে কইবেন হেই কথা আমার কাছে কইবেন কিনা জানি না তো!

কওনের কিছু নাই।

তাইলে কন।

তোমার বইনপোর তো টেকা পয়সার আকাল নাই! আল্লায় দিলে বহুত টেকা পয়সার মালিক হইছে। এখন তার উচিত আল্লার কাম করা।

সেইটা এনামুল করে মাওলানা সাব। আটরশি হুজুরের মুরিদ অইছে। কয়দিন পর পরঐ হুজুরের লগে দেহা করতে যায়। জাকাত ফেতরা ঠিক মতন দেয়, গেরামের গরিব মিসকিনগো কাপোড় লুঙ্গি দেয়, টেকা পয়সা দিয়া সাহাইয্য করে। কথায় কথায় মিলাদ শরিফ পড়ায়, মাদ্রাসার ছাত্রগো দিয়া কোরআন খতম দেওয়ায়। রোজার মাসে রোজঐ চাইর পাঁচজন কইরা রোজদাররে ইসতারি (ইফতার) করায়। আল্লার কাম অনেক করে এনামুল।

দেলোয়ারার কথা শুনে খুবই খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ভাল কথা, খুব ভাল কথা। আল্লার কাম করলে আল্লায়ও তাগো দেয়। তোমার বইনপোরেও আল্লায় দিছে এর লেগাই। তয় অহন আরেকখান বড়কাম এনামুলের করন উচিত।

কী কাম?

তোমগো এই পাড়ায় কোনও মজজিদ নাই। পুব পাড়ায় আমিন মুন্সির বাড়ির লগে ছোড একখান মজজিদ আছে। খাইগো বাইত্তে আছে বিরাট মজজিদ। তোমগো এই পাড়ায়ও একখান মজজিদ থাকন দরকার। এনামুলরে কও একখান মজজিদ কইরা দিতে। তুমি কইলে তোমার কথা হেয় না রাইক্কা পারবো না।

একটুখানি চুপ করে থেকে দেলোয়ারা বললেন, কথাডা মন্দ কন নাই। দেশে একখান মজজিদ কইরা দিলে নাম অইবো। বেবাকতে কইবো দেলরার বইনপোয় মজজিদ কইরা দিছে।

নামও অইবো আল্লার কামও অইবো। মচজিদ করন যে কত বড় ছোঁয়াবের কাম হেইডা কেঐরে কইয়া বুজান যাইবো না। আল্লায় কইছে, হে মমিন মোসলমান, হে আমার পেয়ারে বান্দা, রসুলের উম্মত, তোমাদের মইদ্যে যাহাদিগকে আমি ব্যাপক ধন সম্পদ দান করিয়াছি সেই ধন সম্পদের কিয়দাংশ তোমরা আমার কাজে ব্যয় করো। বলো সোবহানআল্লাহ।

দেলোয়ারা বিড়বিড় করে বললেন, সোবহানআল্লাহ।

মান্নান মাওলানার জন্য আদা চা বানিয়ে, পুরানা আমলের বড় একটা কাপে করে নিয়া আসছে রাবি। দরজার কাছে এসে শোনে ওয়াজ করছেন তিনি। ভয়ে তাঁকে আর ডাকেনি সে। ওয়াজরত মাওলানার মনোযোগ নষ্ট করলে আল্লাহ ব্যাজার হবেন। তবে ওয়াজ শেষ হওয়ার লগে লগে অত্যন্ত বিনীতভাবে চায়ের কাপটা সে মান্নান মাওলানার হাতে দিল। নেন হুজুর। মুখেদা দেহেন ঠিক আছেনি!

মান্নান মাওলানা চায়ে চুমুক দিলেন। বেশ গরম চা তবে সেই গরম চা তার ঠোঁট জিভে তেমন কোনও আলোড়ন তুলতে পারল না। শব্দ করে চা পান তিনি। চুমুকে চুমুকে লুইপস লুইপস করে শব্দ হতে লাগল। এই ধরনের শব্দ দেলোয়ারা অপছন্দ করেন। বনেদী বংশের মেয়ে। জন্মের পর থেকেই নানাবিধ সহবত তাদের শিখানো হয়েছে। সেইসব সহবতের একটা হচ্ছে পানি, দুধ চা যাই খাবে ঠোঁটে গলায় শব্দ হবে না। দুধভাত ডালভাত যাই খাবে, প্লেটে চুমুক দিয়ে খাবে ঠিকই শব্দ হবে না। ফলে ছোটবেলা থেকেই এই ধরনের শব্দ শুনলে গা রি রি করে দেলোয়ারার।

এখনও করছিল। অন্য কেউ হলে বেশ একটা ধমক তাকে দিতেন দেলোয়ারা। মান্নান মাওলানা মরুব্বি মানুষ, তাকে তো আর ধমক দেওয়া যায় না!

বিরক্তি চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলেন দেলোয়ারা।

রাবির হয়েছে অন্য অবস্থা। গভীর আগ্রহ নিয়ে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে সে। চা ঠিক হয়েছে কী না বুঝতে পারছে না। ঠিক না হলে মাওলানা সাহেবের অদিশাপ (অভিশাপ) এসে লাগবে তার ওপর। জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে।

চা শেষ করে কাপটা রাবির হাতে ফিরত দিলেন মান্নান মাওলানা।

রাবি ভয়ে ভয়ে বলল, কিছু দিহি কইলেন না?

মান্নান মাওলানা রাবির দিকে তাকিয়ে হাসলেন। কী কমু?

চা কেমুন অইছে? খাইয়া আরাম পাইছেননি?

ভাল অইছে। আরাম পাইছি।

লগে লগে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল রাবির। তাইলে আমার পোলাডারে একটা ফুঁ দিয়া দেন।

কী অইছে তোমার পোলার?

হারাদিন খালি বানরামি (বাদড়ামো) করে।

কো?

চুলারপাড় বইয়া চা খাইতাছে।

ভুরু কুঁচকে রাবির দিকে তাকালেন দেলোয়ারা। চা খাইতাছে।

হ। বাডিতে কইরা এই এতডু চা লইছে, লইয়া ফুঁ দিয়া ফুঁ দিয়া খাইতাছে।

পোলাপানের চা খাওন ভাল না। শইল কইষা (কষে) যাইবো। আদা চা শইল কষাইয়া হালায়।

রাবি একথা পাত্তা দিল না। পিছনের দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ছেলেকে ডাকল। ঐ বাদলা হবিরে (তাড়াতাড়ি) আয়। হবিরে।

চোখের পলকে ছুটে এল বাদলা। কীর লেইগা বোলাও (ডাক)!

আয়।

বাদলার হাত ধরে মান্নান মাওলানার সামনে এনে দাঁড় করাল রাবি। দেন, ফুঁ দেন। ও যেন আর কইতর দেকতে যাইতে না পারে, মোতালেইব্বা যেন অরে আর না মারতে পারে আর চা যেন ও আর কোনওদিন না খাইতে চায়।

রাবির কথা শুনে বেদম হাসি পাচ্ছিল দেলোয়ারার। অন্যদিকে তাকিয়ে হাসি চাপছিলেন তিনি। তবে মান্নান মাওলানা নির্বিকার। বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছেন। পড়ে ফুস ফুস করে তিনটা ফুঁ দিলেন বাদলার মাথায়। যা।

রাবির দিকে তাকিয়ে বললেন, কোনও অসুবিদা অইলে আমার বাইত্তে লইয়া যাইয়ো। ফুঁ দিয়া দিমুনে। লাগলে পানি পড়াও দিমুনে।

আইচ্ছা।

রাবি গদগদ হয়ে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে গেল।

রাবি বেরিয়ে যাওয়ার পর মান্নান মাওলানা বললেন, বইনপোরে তুমি খবর দেও বইন, আমি নিজে হের লগে কথা কই। তুমি তো কইবা, লগে যুদি আমিও কই, কথাডায় জোর অইবো।

দেলোয়ারা বললেন, আইচ্ছা খবর পাডামুনে।

কাম কাইজ শুরু করনের পর হের কোনও চিন্তা ভাবনা করন লাগবো না। মজজিদের বেবাক কাম আমি কইরা দিমু। দিনরাইত খাইট্টা মজজিদ বানাই দিমু। ইমামতিও করুম। বইনপোর কোনও ব্যাপারে চিন্তা করন লাগবে না।

মজজিদটা করবেন কই?

ক্যা তোমগো ছাড়ায়!

ঐ ডা তো আমার বাপের জাগা।

বাপের জাগা অইছে কী অইছে। অহন মালিক তুমি আর তোমার বইনে।

হ।

বেরাদারি হক (যে লোকের ছেলে সন্তান না থাকে, শুধু মেয়ে থাকে তার জায়গা সম্পত্তির সামান্য একটি অংশ ওই লোকের ভাই বোনরা পায়। এই ব্যাপারটিকে বোঝানো হচ্ছে) তো তোমার চাচা ফুবুগো কাছ থিকা তোমরা কিন্না লইছো!

হ অনেক আগেঐ লইছি।

তাইলে আর কোনও ঝামেলা নাই। তোমগো কাছ থনে তোমার বইনপোয় ঐ বাড়ি কিন্না লইবো।

এইডা ঠিক অইব না। যেই বইনপোরডা খাইয়া বাচতাছি তার কাছে কেমতে কমু আমগো ছাড়াবাড়ি কিন্না মজজিদ বানা।

তাইলে বইনপোর নামে বাড়িডা লেইক্কা দেও। আর নাইলে মজজিদের নামে ওয়াকফা কইরা দেও।

ঠিক আছে। এনামুলরে খবর দেই, আহুক, তারবাদে যা করনের করুম।

তয় আমি মনে করি মজজিদটা তোমগো করন উচিত।

আপনে চিন্তা কইরেন না। করুম।

এ কথায় আনন্দে একেবারে দিশাহারা হয়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। কাঁচাপাকা দাঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখ হাসিতে ভরে গেল। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। আমি জানতাম তুমি আমার কথা না হুইন্না পারবা না। বড় ঘরের মাইয়া তোমরা, বড়। বংশের মাইয়া, তোমগো আদব লেহাজঐ অন্যরকম। ময়মুরুব্বিগ মানতে শিখছো। আল্লায় তোমার বইনপোরে আরও বড় করুক।

একটু থেমে বললেন, তাইলে আমি অহন যাই বইন। বইনপোয় আইলে খবর দিও।

দেলোয়ারাও তখন উঠে দাঁড়িয়েছেন। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, আইচ্ছা।

মান্নান মাওলানা বেরিয়ে যাওয়ার পর উঠানে মোতালেবকে দেখতে পেলেন দেলোয়ারা। হাতে ছালার একটা ব্যাগ। ব্যাগের পেট বেশ ফোলা।

ঘর থেকে বেরিয়ে মোতালেবকে ডাকলেন দেলোয়ারা। এই মোতালেব, হোন।

হাতের ব্যাগ ঘরের পিড়ার কাছে রাখল মোতালেব। বেশ একটা ভাব ধরে দেলোয়ারার দিকে এগিয়ে এল। কিন্তু দেলোয়ারার দিকে তাকাল না। পশ্চিমের ভিটিতে মোতালেবদের বাংলাঘর। সেই ঘরের সামনে ঝাপড়ানো একটা হাসনাহেনার ঝড়। হাসনাহেনা ঝাড়ের পাশ দিয়ে বাংলাঘরের সামনের দিককার দুইপাশ বেয়ে উঠেছে কুঞ্জলতা, উঠে চালের (চালার) উপর গিয়ে ছড়িয়েছে। ঘরের পিছনে বিশাল একখানা তেঁতুল গাছ। তেঁতুলের ঝাঁপড়ানো ডালা এসে নত হয়েছে চালের ওপর। বিকালবেলার রোদ যত্ন করে আটকে দেয় এই ডালখানা। ফলে বিকালের মুখে মুখে মোতালেবদের বাংলাঘরের চালে বেশ একটা ছায়া ছায়া ভাব। শীতকাল এসে গেল বলে, উত্তরের হাওয়া বইতে শুরু করেছে বলে আজ এসময় বেশ একটা শীত শীত ভাব। এজন্যই কী না কে জানে, বাংলাঘরের চালের ওপর তেঁতুলের ডালার দিকে তাকিয়ে রইল মোতালেব। সেই অবস্থায় দেলোয়ারার লগে কথা বলতে লাগল। কী?

মোতালেব তার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে না দেখে বিরক্ত হলেন দেলোয়ারা। গলা একটু রুক্ষ হল তাঁর। বললেন, বাদলারে তুই মারছস ক্যা?

মোতালেব তবু দেলোয়ারার দিকে তাকাল না। আগের মতোই তেঁতুলের ডালার দিকে তাকিয়ে বলল, মারছি কী অইছে।

কী কইলি?

এবার তেঁতুলের ডালা থেকে চোখ ফিরাল মোতালেব। দেলোয়ারার দিকে তাকাল। নির্বিকার গলায় বলল, কইলাম, মারছি কী অইছে।

মোতালেবের কথার ভঙ্গিতে পিত্তি জ্বলে গেল দেলোয়ারার। কপালে তিনটা ভাঁজ পড়ল। গলা আরেকটু রুক্ষ হল। পরের পোলারে কীর লেইগা মারবি তুই?

শয়তানি করছে দেইক্কা মারছি।

কী শয়তানি করছে তর লগে?

কী করছে হেইডা আপনেরে কওন লাগবনি?

কওন লাগবো। বাদলারা আমগো ঘরে থাকে। আমগো মানুষ।

আপনেগো সব সমায় ছোডজাতের লগে খাতির। আগে আছিলো হাজামগো লগে, অহন অইছে চউরাগো লগে।

ঘাড় বাঁকা করে দেলোয়ারা বললেন, দেখ মোতালেইব্বা কথাবার্তা ঠিক মতন ক। ডাক দিলেই হাজামগো আমরা পাইতাম। অগো দিয়া আমগো কাম অইতো। অহন হেই কাম চউরাগো দিয়া করাই। এই হগল লইয়া কোনও রকমের বাড়াবাড়ি তুই করিস না।

বাড়াবাড়ি করলে কী অইবো? কী করবেন আপনে?

দেখবি কী করুম?

হ দেহুম।

কাউলকাঐ (কালই) ঢাকায় খবর পাডামু। এনামুলরে বাইত্তে আইতে কমু।

একথা শুনে মোতালেব নাক ফুলিয়ে বলল, এনামুলের ডর দেহাননি আমারে? এনামুলরে জমাখরচ দিয়া চলি আমি, এ্যা?

জমাখরচ দিয়া চলছ না? ভাত না জোটলেঐত্তো ঢাকায় এনামুলগো বাসায় গিয়া উডছ। আমার বইনের পায়ে ধইরা, এনামুলের পায়ে ধইরা টেকা পয়সা সাহাইয্য আইন্না খাচ। সাহাইয্য চাওনের সমায় এত বড় বড় কথা কই থাকে? এনামুল বাইত্তে আইলে তো দেহি চাকরের লাহান তার পিছে পিছে ঘোরছ। বড়খেত বরগা লওনের লেইগা মামু মামু কইরা পাগল অইয়া যাচ। বাইত্তে মাডি উডাইবো এনামুল, হেই কামও তো তুই করছ। আমগো বাড়ির কামের উপরে দিয়া টেকা কামাছ, তারবাদেও আমগো লগে বড় বড় কথা! জীবনভর তগো অইত্যাচার সইজ্জ করছি। আমগো কোনও আপনা ভাই বেরাদর আছিলো না দেইক্কা জীবনভর তরা আমগো অইত্যাচার করছস। তারবাদেও জীবনভর তগো আমরা উপকার করছি। কইলকাত্তা থিকা আইয়া পড়নের পর, জাহাজের চাকরি শেষ অইয়া যাওনের পর তর বাপে ঢাকা গিয়া আমার দুলাভাইয়ের হাত প্যাচাইয়া ধরলো। এতডি পোলাপান লইয়া না খাইয়া মইরা যামু জামাই, আপনে আমার একটা বেবস্থা কইরা দেন। দুলাভাই তারে মিনসিপালটিতে (মিউনিসিপ্যালিটিতে) কনটেকটারি কামে লাগাইয়া দিলো। তর মাজারো ভাইরে কাপড়ের দোকানের কামে লাগাইয়া দিলো। তরে দিলো জুতার দোকানের কামে। দুলাভাই মইরা যাওনের পর বুজির কাছ থিকা ছয় হাজার টেকা নিছস, হেই টেকার এক পয়সাও শোদ করছ নাই। মাইরা খাইছস। তারবাদেও আমগো লগে এত বড় কথা? নরম পাইছস আমগো? হেইদিন আর নাই। অহন বেশি বাড়াবাড়ি করবি খারাপ অইয়া যাইবো। আহুক এনামুল। ও যুদি তর বিচার না করে তাইলে আমি আমার মাজারো বইনপোরে খবর দিমু। অরে তো চিনস না, আইয়া রে কোনও কথা জিগাইবো না। বাড়ির উডানে হালাইয়া বউ পোলাপানের সামনে তর গলায় পাড়া দিয়া ধরবো। এতবড় সাহস তর, বাদলারে তুই কচ, লাগলে আমারেও এই বাইত থিকা বাইর কইরা দিবি। বাড়িডা তর বাপের?

বেশি রেগে গেলে কথা দ্রুত বলেন দেলোয়ারা। এখনও সেভাবেই বলছিলেন। ফলে মোতালেব আর কথা বলবার সুযোগ পাচ্ছিল না। এদিকে দেলোয়ারার গলা শুনে বাড়ির প্রতিটা ঘর থেকে লোকজন বের হয়ে উঠানে ভিড় করেছে। রাবি আর বাদলা এসে দাঁড়িয়েছে দেলোয়ারার পিছনে কিন্তু কথা বলছে না। মোতালেবকে কেউ শায়েস্তা করলে বাড়ির অন্যান্য লোকজন খুশি হয়। সেই খুশির ছাপ লেগেছে কাইজ্জা শুনতে আসা প্রতিটি মানুষের মুখে।

মোতালেবের বউ দাঁড়িয়ে ছিল কবুতরের খোঁয়াড়ের সামনে। কাইজ্জায় স্বামী সুবিধা করতে পারছে না দেখে, কথা বলবারই সুযোগ পাচ্ছে না দেখে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে মোতালেবের হাত ধরল সে। বাদ দেও এই হগল। ঘরে আইসা পড়।

লগে লগে দেলোয়ারার ওপরকার রাগ বউর ওপর ঝেড়ে দিল মোতালেব। জোরে হাত ঝটকা মারল। কাহিল বউটা প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল দূরে। মোতালেব চিৎকার করে বলল, তুই আমারে থামাইতে আহচ ক্যা মাগী? আমি কি কেঐরে ডরাই? কেঐরডা খাই ফিন্দি?

মোতালেবের বউ কথা বলল না। উঠে কাপড় থেকে ধুলা ঝাড়তে লাগল। স্বামীর এই ধরনের ঠেলাধাক্কা প্রায়ই খায় সে। যে কোনও কাজের ব্যর্থতার ঝাল মোতালেব তার বউর ওপর ঝাড়ে। বউটা এই সব ব্যাপারে অভ্যস্ত। বাড়ির লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে তার উড়ে গিয়ে পড়াটা দেখল তবু সে কিছুই মনে করল না। আবার এসে স্বামীর সামনে দাঁড়াল।

দেলোয়ারা তখন বলছে, কথা কইতে কইতে গলা বইল্লা (বড় হয়ে) গেছে, না? যার তার শইল্লে হাত তোলতে তোলতে হাত বইল্লা গেছে। এর লেইগাইত্তো মন্না দাদার পোলায় ধইরা খালে চুবাইয়া দিছিলো। এইবার আর চুবান না, বেশি বাড়াবাড়ি করবি জেল খাডাইয়া ছাড়ুম। মনে নাই? ভুইল্লা গেছস বেবাক কথা? মাজারো কাকার পোলারা আর তরা মিল্লা যে বড়খেতের ধান কাইট্টা নিছিলি, তারবাদে যহন দরগা পুলিশ আইয়া গুষ্টিসুদ্দা বানছিলো, রাইত দুইফরে ছালাভরা ধান মাথায় কইরা আমগো ঘরে দিয়াইছিলি। গুষ্টিসুদ্দা কাইন্দা কুল পাছ নাই। বেবাকতে মিল্লা আমার দুলাভাইয়ের পাও প্যাচাইয়া ধরছিলি। ভুইল্লা গেছস? দুলাভাই মইরা গেছে কী অইছে। তার পোলারা নাই? এনামুল না পারলে মাজরো বইনপোরে খবর দিমু আমি। আইয়া কইলজা (কলিজা) গালাইয়া হালাইবো তর।

এবারও মোতালেব কোনও কথা বলতে পারল না। তার আগেই মন অন্যদিকে চলে গেল তার। বউ এসে আবার হাত ধরেছে। অন্যদিকে দেলোয়ারার হাত ধরেছে তার মেজো চাচার আগের পক্ষের ছেলে হাফেজের বউ। বাদ দেন বুজি। অনেক অইছে। লন। ঘরে লন।

হাত ধরে টানতে টানতে দেলোয়ারাকে ঘরে নিয়ে গেল হাফেজের বউ। তখনও রাগ কমেনি দেলোয়ারার। আগের মতোই রাগে গো গো করছেন তিনি। ওদিকে মোতালেবের তখন সব রাগ গিয়ে পড়েছে বউর উপর। প্রথমে গলা ধরে প্রচণ্ড জোরে বউকে একটা ধাক্কা দিল সে। তারপর গুমগুম করে তিন চারটা কিল মারল পিঠে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, চুতমারানী মাগী খালি আমার লগে লাইগ্যা থাকে। অর লেইগা মাইনষের লগে কাইজ্জাও করতে পারি না।

বউ কোনও প্রতিবাদ করল না, কাঁদল না। দুঃখি মুখ করে স্বামীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

মোতালেবের মেয়ে ময়না ছিল ঘরের ভিতর। ছয় সাত বছর বয়স মেয়ের। ডানপা খোঁড়া। হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত শুধুই হাড়। হাড়ের ওপর লেগে আছে টিকটিকির চামড়ার মতো ফ্যাকাশে চামড়া। এক ছটাক মাংস নাই। এই পা নিয়ে দাঁড়াতে পারে না মেয়েটা, হাঁটতে পারে না। সারাক্ষণ বসে থাকে, কোথাও যেতে হলে হেউচড়াইয়া (ছেছড়ে) যায়।

ঘরের ভিতর থেকে মাকে মার খেতে দেখে হাচড় পাছড় করে বের হল ময়না। হেউচড়াইয়া হেউচড়াইয়া মার কাছে গেল। দুইহাতে মার শাড়ি খামছে ধরে বলতে লাগল, দুঃকু পাইছ মা? দুঃকু পাইছ! বহো আমি তোমারে আদর কইরা দেই। আমি আদর করলে দুঃকু তোমার থাকবে না।

এতক্ষণ কিচ্ছু হয়নি বউর, মেয়ের কথা শুনে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। চোখের পানি গাল বেয়ে দরদর করে নামল।

মার মুখের দিকে তাকিয়ে ময়না বলল, কাইন্দো না মা, কাইন্দো না। বহো, আমি তোমারে আদর কইরা দেই।

এক পলক বউকে দেখল মোতালেব, মেয়েকে দেখল। তারপর বড়ঘরের পিড়ায় গিয়ে বসল। ছালার ব্যাগ থেকে একমুঠ গম নিয়ে উঠানে ছিটিয়ে দিল। ঘরের চাল থেকে, গাছের ডাল ধোয়াড় থেকে উঠানে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল অনেকগুলি কবুতর। গম খেতে লাগল।

হাফেজের বউ তখন দেলোয়ারাকে একটা চেয়ারে বসিয়েছে। চেয়ারে বসে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছেন দেলোয়ারা। একটানা এতক্ষণ চিৎকার করে কথা বলার ফলে ক্লান্ত হয়েছেন। দেলোয়ারার স্বভাব হল কোথাও বসলে প্রথমেই চশমা খোলেন, খুলে শাড়ির আঁচলে যত্ন করে কাঁচ মোছেন। যেন রাজ্যের সব ধুলাবালি জমে আছে কাঁচে। এখনও তাই করতে গেলেন। চোখ থেকে মাত্র চশমাটা খুলবেন, চোখ গেল উঠানের দিকে। উঠানে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে মোতালেবের বউ, ময়না তার শাড়ি খামছে ধরে টানছে। অদূরে পিড়ার ওপর বসে নির্বিকার মুখে কবুতরদের গম খাওয়াচ্ছে মোতালেব। সব দেখে বউটার ওপর অদ্ভুত এক মমতায় মন ভরে গেল দেলোয়ারার। আহা তার জন্য মাঝখান থেকে মার খেল নিরীহ বউটা।

দেলোয়ারার তারপর ইচ্ছা হল আবার উঠে গিয়ে মোতালেবের সামনে দাঁড়ান। আগে কী বকাবাজি করেছেন তার দ্বিগুণ করেন এখন। মরদামি (মরদগিরি) দেহাচ ঘরের বউর লগে? মন্নাফ দাদার অতডু (অত ছোট) পোলায় যে ধইরা চুবাইয়া দিলো, তারে তো কিছু কইতে পারলি না। সাহস থাকলে যা, তারে মাইরা আয়, দেহি!

ইচ্ছা ইচ্ছাই, সব ইচ্ছা কাজে লাগে না।

উঠানে দাঁড়ানো মোতালেবের বউর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন দেলোয়ারা। চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে কাঁচ মুছতে লাগলেন।

.

১.১৮

এই অঞ্চলের বাড়ি থেকে নামার সময় গতি বেড়ে যায় মানুষের। উঁচু ভিটা থেকে নেমে আসতে হয় সমতল চকেমাঠে। ফলে নামার দিকে পা ফেলা অর্থ হচ্ছে পা দুইটা আপনা আপনি দৌড়াতে থাকবে, যার পা সে টের পাবে না।

আজ বিকালে মজনুরও এই অবস্থা হল। বাড়ির উত্তর পশ্চিম কোণ দিয়ে নামতে গেছে, একটু আনমনা ছিল, ফলে পা এত জোরে দৌড়াল, নিচে নেমে একজন মানুষের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

মানুষটা তখন দুইহাতে জড়িয়ে ধরেছে মজনুকে। আস্তে আস্তে। আছাড় খাইবেন তো!

লজ্জা পেয়ে নিজেকে সামলাল মজনু। মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। নূরজাহান দাঁড়িয়ে আছে তাকে ধরে। নাকে নথ পরা মিষ্টি মুখখানা উজ্জ্বল হাসিতে ঝকঝক করছে।

মজনুকে এভাবে তাকাতে দেখে জীবনে এই প্রথম শরীরের খুব ভিতরে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ হল নূরজাহানের। অদ্ভুত এক লজ্জায় চোখ মুখ নত হয়ে গেল। চট করে মজনুকে ছেড়ে দিল সে। চোখ তুলে কিছুতেই আর মজনুর দিকে তাকাতে পারল না।

মজনু তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নূরজাহানকে দেখছে। চারমাসে যেন অনেক বড় হয়ে গেছে নূরজাহান। মুখটা ঢলঢল করছে অপূর্ব এক লাবণ্যে। চোখে আশ্চর্য এক লাজুকতা। পিঠের ওপর ফেলে রাখা বেণী দুইখানা যেন হঠাৎ করেই তার চপলতা হরণ করেছে।

নূরজাহান তো এমন ছিল না! কোন ফাঁকে এমন হয়ে গেছে!

মজনুর ইচ্ছা হল নূরজাহানকে জিজ্ঞাসা করে, কীরে নূরজাহান তুই দিহি বিয়ার লাইক (লায়েক) অইয়া গেছস! চাইর মাসে এতবড় অইলি কেমতে?

কী ভেবে কথাটা মজনু বলল না। বলল অন্যকথা। কই যাইতাছিলি নূরজাহান?

নূরজাহান মুখ তুলে মজনুর দিকে তাকাল। হাসল। আপনেগ বাইত্তে।

ক্যা?

একথায় রাগল নূরজাহান। ক্যা আবার, এমতেঐ। মাইনষের বাইত্তে মাইনষে যায় ক্যা?

নূরজাহানের এই রাগি ভাব সব সময়ই ভাল লাগে মজনুর। এখনও লাগল। ইচ্ছা হল রাগটা আরেকটু বাড়িয়ে দেয় তার। কিন্তু বাড়াল না। বলল, এতদিন বাদে আমগো বাইত্তে আহনের কথা মনে অইলো তর?

এতদিন বাদে কো? কয়দিন আগেও তে আইয়া গেলাম!

তয় আমি দিহি (দেখি) তরে দেকলাম না!

নূরজাহান অপূর্ব মুখভঙ্গি করে হাসল। আপনে দেকবেন কেমতে! আপনে তহন বাইত্তে আছিলেননি?

এবার মজনুও হাসল। আমি বাইত্তে আইছি পাঁচদিন অইল।

তার আগে আইছি আমি।

তাইলে তো আমার কথা ঠিকঐ আছে।

মজনুর কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। সরল মুখ করে মজনুর দিকে তাকাল। কী ঠিক আছে?

ওই যে কইলাম এতদিন বাদে আমগো বাইত্তে আইনের কথা মনে অইলো তর। পাঁচদিন কী কম দিন? আগে তো রোজঐ আমগো বাইত্তে আইতি!

নূরজাহানের ইচ্ছা হল বলে, আগে যে আপনে বাইত্তে আছিলেন এর লেইগা রোজঐ আইতাম। অহন তো আর আপনে নাই, কীর লেইগা আমু! আপনের খালার লগে প্যাচাইল পাড়তে আমার ভাল্লাগে না। বুড়া মাইনষের লগে কথা কইয়া জুইত (জুত) পাই না।

কথাটা বলল না নূরজাহান। জীবনে এই প্রথম মুখে আসা কথা আটকে রাখল। কী রকম লজ্জা হল।

মজনু বলল, আমগো কথা তর মনে অয় অহন আর মনে থাকে না।

নূরজাহান বলল, কে কেইছে?

কে আবার কইবো! আমি কই।

আপনে কইলেঐ অইবোনি? মনে না থাকলে আইজ আইলাম ক্যা?

মনে হয় এই মিহি কোনও কাম আছিলো, কাম সাইরা এক ফাঁকে মনে অইছে আমগো বাইত ঘুইরা যাবি, এর লেইগা আইলি!

নূরজাহান আবার হাসল। টাউনে থাইক্কা দিহি বহুত ঘুরাইন্না প্যাচাইন্না কথা হিগছেন আপনে! আগে এমুন আছিলেন না!

আগে তুইও এমুন আছিলি না।

তয় কেমন আছিলাম আমি?

অন্যরকম।

কেমুন হেইডা কইতে পারেন না?

এত সোন্দর আছিলি না। পচা আছিলি।

ঠোঁট বাঁকিয়ে মজাদার ভঙ্গি করল নূরজাহান। ইস পচা আছিলো! আমি কোনদিনও পচা আছিলাম না। পচা আছিলেন আপনে।

নূরজাহানের দিকে সামান্য ঝুঁকে ঠোঁট টিপে হাসল মজনু। আর অহন?

অহনও পচা। তয় আগের থিকা ইট্টু কম।

একথায় মজনু থতমত খেল। তারপরই ঠিক হয়ে গেল। নূরজাহান তো এরকমই। যা মুখে আসে ঠাস ঠাস বলে ফেলে। কে কী ভাবল ভেবে দেখে না।

তবে নূরজাহান চোরাচোখে তখন মজনুকে দেখছে।

মজনু পরে আছে আকাশি রঙের ফুলহাতা শার্ট। হাতা বেশ সুন্দর করে ভঁজ দিয়ে গোটান। লুঙ্গি পরে আছে বেগুনি চেকের। মাথার চুলে বুঝি আজই সাবান দিয়েছে। রুক্ষ উড়ু উড়ু চুল। মুখটা চারমাস আগের তুলনায় অনেক ফর্সা, অনেক সুন্দর হয়েছে।

এখন পরিপূর্ণ বিকাল। আসন্ন শীতের রোদ আদুরে ভঙ্গিতে ছড়িয়ে আছে চারদিকে। গাছপালা আর মানুষের বাড়িঘর যেন উচ্ছাস আনন্দে ভরা। এরকম বিকালে মজনু যা না তারচেয়ে যেন অনেক বেশি সুন্দর।

নূরজাহান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখতে থাকে।

মজনুদের বাড়ির পশ্চিম দিকে সরু একখানা হাট। এই হালটের দক্ষিণে কালিরখিল, মাওয়া। উত্তরে খানবাড়ি হাতের বাঁদিকে রেখে হালট ঘুরে গেছে সীতারামপুরের দিকে। গিয়েই মাঝপথে থেমে গেছে। এই হালট মুছে ফেলে তার উপর দিয়ে উত্তরে দক্ষিণে ধা ধা করে আসছে সেই মহাসড়ক। সড়কের কাজে ওদিকটায় দিনরাত লেগে আছে লোকজনের চিল্লাচিল্লি কিন্তু মজনুদের বাড়ির দিকটা একেবারেই নির্জন। হালটের ওপাশ থেকে শুরু হয়েছে বিল। পশ্চিমে মাইল দেড়েক, উত্তরে দুই আড়াই মাইল, দক্ষিণে অল্প, তারপরই গ্রাম, নয়াকান্দা। পশ্চিমে কান্দিপাড়া, জশিলদিয়া। উত্তরে কবুতরখোলা, কোলাপাড়া, রাড়িখাল। এই বিশাল বিলের মাঝখানে খুব কাছাকাছি সামনে পিছনে দুইটা বাড়ি। একটা বাড়িতে গোরস্থান। কয়েকটা বাঁশঝাড় আর মানুষের কবর ছাড়া আর কিছু নাই। পিছনের বাড়িটার নাম বিলেরবাড়ি। বিশাল একটা শিমুল গাছ আছে বাড়িতে, দূর থেকে এই গাছ দেখে দিক চিনে নেয় পথিকেরা।

এই বিলে এক সময় আমন আউশের ব্যাপক চাষ হতো। বর্ষার পানিতে প্রান্তরব্যাপী মাথা তুলে থাকত ধানডগা। ঋতুর সঙ্গে বদলাত বিলের চেহারা, রঙ। এই সময়, শেষ হেমন্তের বিকালে বিল ঝকমক ঝকমক করত ছড়ার ভারে নত হওয়া সোনালি ধানে। ধানকাটা শুরু হতো। ভোরবেলা, সূর্য ওঠার আগে কিষাণরা কাচি (কাস্তে) হাতে নামত বিলে। দিনভর ধানকাটা চলত। বিকালে দেখা যেত কাটা ধানের বোঝা বাঁধছে কিষাণরা। এখন ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরার সময়। বাড়ির উঠানে নিয়ে ভুর (টাল) দিয়ে রাখবে ধান। বিয়ানরাতে উঠে পাড়াতে (মলন দেয়া। বিক্রমপুর অঞ্চলে সাধারণত গরু দিয়ে ধান মলন দেওয়া হয় না। কিষাণরা পা দিয়ে ডলে ডলে ডগা থেকে ধান ছাড়ায়। এই ব্যাপারটাকে বলে ‘ধান পাড়ানো’) শুরু করবে। গতদিনের কাটাধান সূর্য ওঠার আগে আগে পাড়িয়ে শেষ করে কাচি হাতে আবার যাবে বিলে। আবার ধান কাটবে। দেশ গ্রাম ম ম করবে ধানের গন্ধে। চারদিকে ভা র একটা উৎসব আনন্দের ভাব।

বেশ কয়েক বছর হল এই চেহারাটা আর নাই বিলের। সেই দিনও আর নাই দেশ গ্রামের। এখন বিক্রমপুরে শুধু ইরির চাষ। কোথাও কোথাও বোরো হয়, তবে এই দিকটায় না। শ্রীনগর থেকে ষোলঘর হয়ে আলমপুর যাওয়ার পথে পড়ে আড়িয়ল বিল। বোরোর চাষটা আড়িয়ল বিলে ভাল হয়। এই বিলে শুধু ইরি। শীতকালে বোনা শুরু হয়। বর্ষার আগে আগে, বৃষ্টি বাদলার আগে আগে ধান উঠে যায়। তারপর সারাবর্ষা ফাঁকা বিল। অঞ্চলটা নিচু বলে বর্ষায় এই বিলে পানি হয় অগাধ। দশ বারো হাতি (হাত) লজ্ঞিও ঠাই (থই) পায় না ভরাবর্ষায়। এখন ধান নাই বিলে, পুরা বিল বর্ষার পানিতে টইটুম্বর, মজনুদের বাড়ি থেকে বিলের দিকে তাকালে মনে হয় এটা বোনও বিল না, এটা আরেক পদ্মা, এপার ওপার দেখা যায় না তার। অথবা এ এক অচেনা অকূল দরিয়া। ‘অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে’।

আজ বিকালে নূরজাহানের সামনা সামনি দাঁড়িয়ে কোন ফাঁকে যেন মজনুর চোখ চলে গেছে বিলের দিকে। ফাঁকা বিলে এখন হা হা করছে উত্তরের হাওয়া আর ডুবতে বসা সূর্যের বিপন্ন রোদ। দূরে, বিলেরবাড়ির শিমুল গাছ বরাবর উড়ে যাচ্ছে সারধরা তিনটা পাখি। সেই পাখির দিকে তাকিয়ে গভীর এক আনন্দে মন ভরে গেল মজনুর। এতক্ষণ নূরজাহানের সঙ্গে কী কথা বলছিল ভুলে গেল। নূরজাহান যে চোরাচোখে তাকে দেখছে একবারও সে তা দেখতে পেল না। আনন্দভরা গলায় বলল, ঐ যে তিনডা পইখ উইড়া যাইতাছে, দেক নূরজাহান, কী সোন্দর!

খুবই তাচ্ছিল্যের চোখে বিলেরবাড়ির দিকে তাকাল নূরজাহান। যেন দয়া করে পাখি তিনটা দেখল কিন্তু একদমই পাত্তা দিল না। বলল, এই হগল জিনিস আপনে দেহেন। থাকেন টাউনে, এই হগল টাউনে পাইবেন কই, দেকবেন কই থিকা!

মজনু মুগ্ধ গলায় বলল, টাউন থিকা গেরাম অনেক সোন্দর রে!

তাইলে টাউনে থাকেন ক্যা?

থাকি ঠেইক্কা। গেরামে থাকলে খামু কী! আর আমার খালায় চায় না আমি গেরামে থাকি।

আমিও চাই না।

কথাটা বলেই লজ্জা পেয়ে গেল নূরজাহান। লগে লগে অন্যদিকে ঘুরাল কথা। পুরুষপোলারা গেরামে পইড়া থাকব কী করতে? গেরামে কোনও ভাল কাম আছেনি! মাইয়া না অইলে কবে আমি টাউনে যাইতাম গা! এহেনে থাকতামনি? সড়কটা অউক, বাস চালু অউক, পলাইয়া অইলেও একদিন টাউনে যামু গা।

তারপরই ছটফট করে উঠল নূরজাহান। যাইগা, হাজ অইয়াইলো।

মজনু খুবই অবাক হল। কীয়ের হাজ অইয়াইলো! আমগো বাইত্তে বলে যাবি? ল।

না, আইজ আর যামু না।

ক্যা?

আপনেরে দেহনের লেইগা যাইতে চাইছিলাম। দেহা তো আপনের লগে অইলো। ও মজনু দাদা, কয়দিন বাইত্তে থাকবেন আপনে?

আছি আর দুই তিনদিন।

তাইলে যাওনের আগে আর একদিন আমুনে।

চোখ সরু করে নূরজাহানের দিকে তাকাল মজনু। অহন কি তুই সত্যঐ বাইত্তে যাইতাছস?

নূরজাহান হাসল। কী মনে অয় আপনের?

আমার মনে হয় না। মনে অয় অন্য কোনহানে যাবি তুই।

হ সড়কে যামু। দেইক্কাহি কতাহানি আউজ্ঞাইলো সড়ক। আপনে যাইতাছেন কই?

খাইগো বাড়ির মাডে যামু। মাডে বলে আইজ ফুডবল নামবো। পিডাইয়াহি (পিটিয়ে আসি)।

কাম নাই ঐ মিহি যাওনের। আমার লগে লন, সড়ক দেইক্কাহি।

ল তাইলে।

ওরা দুইজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে ফাঁকে আনমনা হয়ে গেল নূরজাহান। ভুলেই গেল লগে মজনু আছে।

ব্যাপারটা খেয়াল করল মজনু। করে পিছন থেকে নূরজাহানের বেণী ধরে টান দিল। কীরে নূরজাহান, কী অইলো?

চমকে মজনুর দিকে তাকাল নূরজাহান। ডর করতাছে আমার।

কীয়ের ডর?

মন্নান মাওলানারে বকছি।

কুনসুম?

আইজঐ। আপনেগো বাইত্তে আহনের আগে।

ক্যা?

আমার বাপেরে কয় দউবরা। আমার বাপের নাম কি দউবরা কন? ক্যা, দবির কইতে পারে না? কইছি আরেকদিন দউবরা কইলে দাঁড়ি টাইনা ছিড়া হালামু। আপনে একটা পচা মলবি। আপনে একটা রাজাকার।

মজনু চিন্তিত গলায় বলল, ভাল করচ নাই। মন্নান মাওলানা বহুত খারাপ মানুষ। এইডা লইয়া দেকবি তর বাপের কাছে বিচার দিব। মাইর খাওয়াইবো তরে।

নূরজাহান ঝাঁঝাল গলায় বলল, খাওয়াইলে খাওয়াইবো। আমার বাপের নাম পচা কইরা কইবো, আমি তারে ছাইড়া দিমুনি? আপনের বাপের নাম কেঐ অমুন কইরা কইলে আপনে তারে ছাইড়া দিবেন?

বাপের কথায় মন খারাপ হয়ে গেল মজনুর। বাপ বলতে কোনও মানুষের কথা মনেই পড়ে না তার। কেমন দেখতে মানুষটা, সে যখন জন্মায় তখন কেমন ছিল দেখতে, এই এতকাল পর আজ কেমন হয়েছে এসব কিছুই সে জানে না। বেঁচে যে আছে তা জানে। নামও যে একটা আছে, তা জানে। আদিলদ্দি।

মনে মনে আদিলদ্দি শব্দটা উচ্চারণ করেই লজ্জা পেল মজনু। নাম তো আদিলদ্দি না, আদিলউদ্দিন। সে কেন আদিলদ্দি বলল! লোকমুখে এই নাম শুনে আসছে বলে! নাকি মা মারা যাওয়ায় বাপ তার দেখভাল করে নাই, ভরণপোষণ করে নাই, এই রাগে! যদি সে বাপের সংসারে থাকত তাহলে কি কখনও বিকৃত করে বাপের নাম বলত! অন্য কেউ বিকৃত করে বললে কি সেও নূরজাহানের মত রেগে যেত না!

তারপর মজনু ভাবল, বাপ বাপই। ভরণপোষণ করুক না করুক, ছেলেকে চিনুক না চিনুক, জন্ম যে দিয়েছে এটাই কম কী? বাপ না থাকলে কি এ সুন্দর দুনিয়া তার কখনও দেখা হতো! খালার এমন আদর স্নেহ ভালবাসা কোথায় পেত সে? এই যে এইরকম এক বিকালে নূরজাহানের সঙ্গে হাঁটছে, মন ভরে আছে গভীর আনন্দে, এই আনন্দ তাকে কে দিত!

বাপ ব্যাপারটা বোঝার পর থেকেই বাপের ওপর ভারি একটা রাগ মজনুর। তার মা মারা যাওয়ার পর পরই আরেকটা বিয়া করছে। আগের বউর কথা ভুলে সংসার করতে শুরু করছে। নিজের সন্তান চলে গেছে আরেকজনের কোলে, ফিরেও সেদিকে তাকায়নি। এই যে এতগুলি বছর কেটে গেছে একবারও ছেলের খোঁজ নিতে আসে নাই। অন্য ছেলেমেয়ের মুখ দেখে প্রথমটার কথা ভুলে গেছে। যদি এমন সে না করত। যদি বউ মারা যাওয়ার পর ওই অতটুকু মজনুকে রেখে দিত তার সংসারে তাহলে কি জীবন এরকম হতো মজনুর! হতো না। সৎমা কিছুতেই মেনে নিতে না মজনুকে। জীবন ছাড়খাড় করে ফেলত মজনুর। বাপের সংসারে থেকেও মজনু হয়ে যেত অসহায়। শহরে খলিফাগিরি করতে যাওয়া হতো না, নাবালক বয়সেই গিরস্ত বাড়িতে কামলা দিতে হতো।

এই হিসাবে বাপ তো মজনুর সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ভালই করেছে! মজনুর জীবন সুন্দর করে দিয়েছে!

আজ বিকালে এই সব ভেবে বাপের ওপর জমে থাকা রাগ হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল মজনুর। কোনও কারণ ছাড়াই নূরজাহানকে সে বলল, আমার বাপের নাম জানচ নূরজাহান, আদিলউদ্দিন।

.

১.১৯

ছাপড়া ঘরের সামনে খয়েরি চাদর পরা মানুষটা জবুথুবু হয়ে বসে আছে। আলী আমজাদ তার দিকে তাকাল না। মাওয়ার বাজার থেকে আনা পাউরুটি আর ছোট সাইজের কয়েকটা কবরি কলা এই মাত্র খেয়েছে। এখন ম্যাচের কাঠির মাথা চোখা করে দাঁত খিলাল করতাছে। সড়কের পাশে একটু নামার দিকে জাহিদ খাঁর বাড়ির সঙ্গে একটা ছাপড়া ঘর কয়দিন হল তুলেছে সে। মাথার ওপর ছয়খান জংধরা টিন ফেলে, চারদিকে বুকাবাঁশের বেডা, ছাপড়া ঘরটা সে করেছে নিজের আরামের জন্য। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা দুইখান ধরে যায়। কখনও কখনও জাহিদ খাঁর বাড়ি থেকে গোবদা মতো হাতলআলা চেয়ার এনে বসে। সড়কের পাশের হিজল গাছটার তলায় সারাক্ষণই ঝিরিঝিরি হাওয়া। চেয়ার নিয়ে বসলেই ঘুমে চোখ ভেঙে আসে। শরীরের অজান্তেই ছেড়ে দেয় শরীর। এই সব কারণেই ছাপড়া ঘরখান করেছে আলী আমজাদ। নিজের একটু আরাম হল, দরকারী জিনিসপত্র কিছু রাখাও গেল ঘরটায়, এক কাজে দুই কাজ।

ঘর করার জন্য পুরানা ঢেউ টিনগুলি যেমন বাড়ি থেকে এনেছে আলী আমজাদ তেমন এনেছে পুরানা একখান চকি। গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে নতুন একখান পাটি কিনে এনে বিছিয়েছে চকির উপর। আর আছে দুইখান ল্যাড়ল্যাড়া বালিশ। অল্প কিছু পয়সা এই কাজে খরচা হয়েছে আলী আমজাদের তবে সেই খরচা গায়ে লাগছে না। ঘর তোলার পর থেকে নিজের লক্কর ঝক্কর মোটর সাইকেল এই ঘরের সামনে দাঁড় করিয়ে মাটিয়ালদের কাজের তদারক করে। তবে সেটা পাঁচ দশমিনিট। তারপরই ছটফট করে ছাপড়া ঘরে গিয়ে ঢুকে। ঘর তোলার পর থেকে রোদ জিনিসটা যেন আর সহ্যই করতে পারে না আলী আমজাদ। পাঁচ দশ মিনিট দাঁড়ালে এ রকম শীতের মুখে মুখেও ঘামে ভিজে জ্যাবজ্যাবা হয়ে যায়। ডাঙায় তোলা বড় সাইজের কাতলা মাছের মতো হাঁ করে খাস টানতে থাকে, মোটকা শরীর নিয়ে হাসফাস করতে থাকে। সড়ক যত আগাচ্ছে ততই মোটা হচ্ছে সে, শরীরে, টাকায়। শরীর এবং টাকা যে কারও কারও একটা আরেকটার লগে পাল্লা দিয়া বাড়ে আলী আমজাদকে দেখলে তা বোঝা যায়। ফলে আগের আলী আমজাদ আর নাই। আগে যেমন সারাদিন খাড়া রোদে দাঁড়িয়ে মাটিয়ালদের কাজ দেখত, ভাল একখান ছাতি (ছাতা) পর্যন্ত ছিল না, যেটা ছিল সেটা ছেঁড়া, তালিমারা, খুলতে গেলে বেজায় হাঙ্গামা, বন্ধ করতে গেলে ছাতির কালা কাপড় ফুটা করে শিক (শলাকা) বেরিয়ে যেত এদিক ওদিক। বিরক্ত হয়ে ছাতিটা আলী আমজাদ ব্যবহারই করত না, রোদেই দাঁড়িয়ে থাকত। কোনও মাটিয়ালের গোড়ায় মাটি কম দেখলে কাজে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে ভেবে মুখে বকাবাজির তুবড়ি ছোটাত, সেই মাটিয়ালের সাতপুরুষ কবর থেকে টেনে তুলত। সাতপুরুষের পুরুষগুলি দৈহিক কারণে রেহাই পেত কিন্তু মহিলাদের গতি ছিল না। যত রকমভাবে উৎপীড়ন তাদের করা যায় মুখে মুখে তা করে ফেলত আলী আমজাদ। কোনও মাটিয়ালের গোড়া উপচে হয়তো এক চাকা (ঢেলা) মাটি পড়ে গেল নিচে, ছুটে গিয়ে আলী আমজাদ তা তুলে দিত। কেটে তোলা মাটি সব সময়ই একটু ভিজা ভিজা হয়। চাপড়ে চাপড়ে পরে যাওয়া চাকাটা গোড়ার অন্য মাটির সঙ্গে বসিয়ে মোড়া তুলে পর্যন্ত দিত। সেই আলী আমজাদ এখন মাটিয়ালদের কাজের তদারক করার জন্য একজন সরদার রেখেছে। লোকটার নাম হেকমত। পাটাভোগের লোক। কাজে লাগবার লগে লগেই শ্রীনগর বাজার থেকে নতুন একখান শরীফ ছাতি কিনেছে হেকমত। আলী আমজাদের মোটর সাইকেলের শব্দ পেলেই মাটিয়ালদের ফেলে সেই শব্দের দিকে মন দেয়। মাথায় দেওয়া ছাতি বন্ধ করে ফেলে। আলী আমজাদ সাইটে আসার লগে লগে বন্ধ ছাতি হাতে ছুটে যায় তার কাছে। অতি যত্নে ছাতিখান আলী আমজাদের মাথার উপর মেলে ধরে। আলী আমজাদ যেদিকে যায় হেকমতও যায় লগে লগে। এই সব কারণে হেকমতকে পছন্দ করেছে আলী আমজাদ। টাকা পয়সা হয়ে গেলে, বড় মানুষদের দুই চারটা ট্যাণ্ডল (চামচা অর্থে) লাগে। উত্তর দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল মিলিয়ে চারটা ট্যাণ্ডল এখানে কাজ পাওয়ার লগে লগে বানিয়ে ফেলেছে আলী আমজাদ। তারা নাম করা লোকের পোলাপান। একজন আছে আতাহার, মান্নান মাওলানার মেজোছেলে। আর তিনজনের একজন মেন্দাবাড়ির আলমগির, হালদার বাড়ির সুরুজ, গোঁসাই বাড়ির নিখিল। এরা আছে বলে এলাকায় কাজ করতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না আলী আমজাদের। ওয়াজের চান্দা, ধরাছি (হাডুডু) খেলার চান্দা চাইতে কেউ আসে না আলী আমজাদের কাছে। যারা আসবে তারা জানে তাদের খাদ্য চার ট্যাণ্ডলে অনেকদিন ধরেই খাচ্ছে। নতুন করে তারা আর কী খাবে!

তবে ট্যাণ্ডল আতাহাররা হলেও ট্যাণ্ডলের মতো আচরণ তাদের লগে করে না আলী আমজাদ। করে বন্ধুর মতন আচরণ। বয়সে অনেক ছোট হওয়ার পরও আতাহররা এখন আলী আমজাদের ইয়ার দোস্ত। আলী আমজাদ যতবার সিগ্রেট খায় লগে থাকলে ততবারই তাদেরকেও সিগ্রেট দেয়। এমন কী ম্যাচ জ্বেলে আঙ্গাইয়া তরি (ধরিয়ে পর্যন্ত) দেয়। প্রথম প্রথম আতাহারদের বাড়িতে তাদের বাংলাঘরে বসে লৌহজং থেকে আনা কে কোম্পানীর মাল চালাত। ছাপড়া ঘর তোলার পর থেকে সেই বাড়িতে আর যেতে হয় না। এই ঘরে বসেই চালায়। দিনে দোফরে, সন্ধ্যার পর। কোনও কোনওদিন রাত গম্ভীর হয়ে গেলে আলী আমজাদ আর বাড়িই ফিরে না। মাওয়ার বাজার থেকে তিন চারটা কুকরা কিনে পাঠিয়ে দেয় নিখিলদের বাড়ি। নিখিলের বিধবা বোন ফুলমতি সেই কুকরা কষিয়ে দেয়। ইয়ার দোস্তদের নিয়ে কুকরার গোস্ত আর কেৰু কোম্পানী মাল কোৎ কোৎ করে চালিয়ে যায় আলী আমজাদ। ট্যাগুল হওয়ার পরও প্রকৃত ট্যাণ্ডলের স্বাদ আতাহারদের কাছ থেকে পায়নি আলী আমজাদ। হেকমতকে রাখার পর তার কাছ থেকে পাচ্ছে। ফলে সাইটে আসার লগে লগে হেকমত যখন ছাতি খুলে দিশাহারা ভঙ্গিতে তার কাছে ছুটে আসে তখন অকারণেই আলী আমজাদ একটু গম্ভীর হয়ে যায়। চালচলন রাশভারি হয়ে যায় তার, গলার স্বর মোটা হয়ে যায়। অর্থাৎ বেশ একটা বড় দরের কনটাক্টর কন্ট্রাক্টর ভাব আসে। ভিতরে ভিতরে ব্যাপারটা উপভোগ করে সে। কথা খুব কম বলে। বেশির ভাগই হুঁ হাঁ না ইত্যাদি। আর কোনও মাটিয়ালের তো নাইই, হেকমতের মুখের দিকে পর্যন্ত তাকায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে, গ্রামের গাছপালা বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। যেন এই সবই তার দেখার ব্যাপার, মাটিয়ালরা না, সড়কের কাজ না। তারপরই ছাপড়া ঘরটায় গিয়ে ঢোকে। ঢুকে ল্যাড়ল্যাড়া বালিশ দুইখান মাথার নিচে দিয়ে চকিতে গা এলিয়ে দেয়।

আজ সাইটে এসেছে আলী আমজাদ দুপুরের ভাত খেয়ে। এসেই দেখে ছাপড়া ঘরের সামনে খয়েরি চাদর পরা একটা লোক বসে আছে। ভাঙাচোরা মুখখানা দাঁড়িমোচে একাকার। দাঁড়িমোচ যেমন কাঁচাপাকা মাথার চুলও তেমন। বুড়া না, মাঝ বয়সী। তবে শরীরের ওপর দিয়ে যে ম্যালা ধকল অনাহার গেছে, যে কেউ দেখে বুঝে যাবে।

লোকটাকে দেখে হেকমতকে আলী আমজাদ জিজ্ঞাসা করেছে, এইডা কে?

হেকমত লগে লগে বলেছে, কেঐ না।

কী চায়?

কাম।

শইল্লের দশা তো ভাল না। মাইট্টালগিরি করতে পারবো?

কয় তো পারবো।

তাইলে লাগায় দেও।

হেকমত বিনীত গলায় বলল, আপনের লেইগা লাগাই নাই। বহায় থুইছি। কইছি সাবে আহুক। তার লগে কথা কইয়া লই।

আলী আমজাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কামের নিয়ম কানন (কানুন), রোজ কত, এই হগল কইছো?

না।

ক্যা?

আপনের লেইগা। এহেনকার সরদার অওনের পর কোনও নতুন মাইট্টাল কামে লই নাই। আপনের পারমিশন ছাড়া লই কেমতে! এই যে অহন আপনে কইলেন, দেহেন অহন আমি কথা ফাইনাল কইরা হালাইতাছি। কাইল বিয়ান থিকাঐ কামে লাগাইয়া দিমু।

কী ভেবে আলী আমজাদ বলল, থাউক তোমার কথা কওনের কাম নাই। বইয়া থাউক, আমিঐ কথা কমুনে। হাদাইয়া (ক্লান্ত হওয়া) গেছি। ইট্টু জিরাইয়া লই। তয় কথা কওনের সমায় তুমি সামনে থাইক্কো। নতুন মাইট্টাল কামে লওনের সমায় কী কী কথা তাগো লগে কইতে অয় হিগগা যাইবা। তারবাদে আমারে আর লাগবে না, তুমি নিজেই কথা কইয়া বেবাক ঠিক করতে পারবা। তয় মাইট্টাল কইলাম আমার আরও লাগবো। কাম তাড়াতাড়ি শেষ করন লাগবো। এরশাদ সাবে অডার দিছে দুই তিনমাসের মইদ্যে রাস্তার কাম শেষ করন লাগবো। দুই তিনমাসের মইদ্যে এই রাস্তা দিয়া বাস টেরাক চলবো।

তারপর প্রায় সন্ধ্যা হতে চলল, লোকটা বসেই আছে, তার লগে কথা বলা তো দূরের কথা তাকিয়েও দেখছে না আলী আমজাদ। দুপুরের পর পরই ঘণ্টা দেড়েকের একটা ঘুম দিয়েছে। সে যখন ঘুমে তখন আতাহাররা চারজন এসেছে, এসে ডেকে তুলেছে। কত ঘুমান মিয়া? বিয়াল অইয়া গেল। এই দিনে দোফরে ঘুমাইলে শইল ম্যাজ ম্যাজ করে। ওডেন।

উঠেছে আলী আমজাদ। উঠে অল্প বয়সী মাটিয়াল বদরকে মাওয়ার বাজারে পাঠিয়েছে পাউরুটি কলা আনতে। সিলবরের (এলুমিনিয়ামের) একটা কেতলি আছে ঘরে, সেই কেতলি দিয়েছে চা আনতে। পাউরুটি কলা খাওয়া শেষ। এখন মরাপাতা জ্বেলে তার উপর কেতলি বসিয়ে চা গরম করতাছে বদর। কোনাকানি ভাঙ্গা তিন চারটা কাপ আছে। গরম চা সেই কাপে করে আতাহারদের নিয়ে এখনই খাবে আলী আমজাদ, তার আগে দাঁতটা খিলাল করে নিচ্ছে। পাউরুটি কলা দুইটাই ভেজাইল্লা জিনিস। খেতে আরাম কিন্তু ফাঁকআলা পোকে খাওয়া দাঁত থাকলে সেই দাঁতের গর্তে এমন করে ঢোকে, খিলাল না করলে বের হতে চায় না। সেই কাজটাই আলী আমজাদ এখন করতাছে। এক পায়ের ওপর আরেক পা ভাজ করে বসেছে চকির উপর, দুয়ারটা মুখ বরাবর, ফলে সামনে বসা লোকটাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। তবে দেখছে না। ঘরে বসেই দেখছে নীল রঙের আলোকিত আকাশ, দূরের ছায়া ছায়া গাছপালা, বাড়িঘর।

এইসময় কাপে করে চা নিয়ে এল বদর।

কাপ হাতে নিয়ে আলী আমজাদ বলল, আতাহরগো দে।

বদর হাসিমাখা গলায় বলল, দিতাছি। কাপ তো চারইখান। এক লগে চা দিলে একজন বাদ থাকবো।

সে তাইলে আমারে পরে দে।

আতাহার বলল, না না আপনে খান। নিখিলা পরে খাইবো নে।

আলী আমজাদ কথা বলল না। ঠোঁটে সরু একখানা হাসি ফুঠে উঠল তার।

নিজেদের দলের মানুষ হওয়ার পরও, ছেলেবেলা থেকে একলগে বড় হওয়ার পরও, গভীর বন্ধুত্ব থাকার পরও আতাহাররা তিনজন নিখিলকে একটু অবজ্ঞা করে। লগে রাখে ঠিকই, সঠিক মর্যাদাটা দেয় না। কখনও কখনও চাকর বাকরের মতো খাটায়। হিন্দু বলে এই অবজ্ঞাটা যে নিখিলকে ওরা করতাছে পরিচয়ের পর পরই আলী আমজাদ তা বুঝে গেছে। তবে মুখে কখনও এই সব নিয়া কথা বলে নাই। নিখিলকে খেয়াল করে দেখেছে আতাহারদের অবজ্ঞা টের পায় সে। মুখটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।

এখনও হল। সামান্য আনমনা দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল নিখিল।

আড়চোখে নিখিলকে একবার দেখল আলী আমজাদ। চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে। বুক পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে নিজে প্রথমে ধরাল তারপর প্যাকেটটা ফেলে রাখল সামনে, ইচ্ছা হলে যে কেউ যেন ধরাতে পারে। কিন্তু নিখিল ছাড়া কেউ সিগ্রেট ধরাল না।

নিখিলের সিগ্রেট ধরান দেখে আলী আমজাদ বুঝে গেল মুখের বিষণ্ণতা কাটাবার জন্য সিগ্রেটটা এখন ধরিয়েছে সে। না হলে বন্ধুদের মতো চা খাওয়ার পরই ধরাত।

চায়ে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ঠোঁটে সরু হাসিটা আরেকবার ফুটল আলী আমজাদের। নিখিলকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে সে বলল, মালাউন আইছস ক্যা বেডা? মোসলমান অইতে পারলি না? এইডা মোসলমানগো দ্যাশ। অহনতরি (এখন পর্যন্ত) যে তগো থাকতে দিছি এইডাঐত্তো বেশি। আবার যদি একখান রায়ট লাগে, যেই কয়জন মালাউন অহনতরি এই দ্যাশে আছে বেবাকটির গলা কাইট্টা হালামু। মাইয়াডিরে করুম গণধর্ষণ আর পুরুষডিরে কচু কাডা। মালাউনের জাত ফিনিশ। এই দ্যাশ মোসলমানগো দ্যাশ, এই দ্যাশে কোনও মালাউন রাখুম না। আমার লাহান ম্যালা মোসলমান আছে যারা হিন্দুগো দুই চোক্ষে দেকতে পারে না। উপরে উপরে খাতির দেহায় ঠিকঐ ভিতরে ভিতরে হিন্দুগো উপরে মহাখাপ্পা (ক্ষেপে থাকা)। চানস পাইলেঐ ফিনিশ কইরা দিব।

আলী আমজাদ অনেকক্ষণ চুপচাপ আছে দেখে আতাহার বলল, কী চিন্তা করেন কনটেকদার সাব?

চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে সামনে কেতলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বদরের হাতে কাপটা দিল আলী আমজাদ। নিখিলরে চা দে।

নিখিল বলল, আমি চা খামু না দাদা।

আলী আমজাদ কথা বলবার আগেই সুরুজ বলল, ক্যা?

এমতেঐ। সিগরেট ধরাই হালাইছি। অহন আর চা খাইতে ইচ্ছা করতাছে না।

আলমগির ছেলেটা ফুর্তিবাজ ধরনের। সারাক্ষণই গভীর আনন্দে আছে। তার কোনও দুঃখ বেদনা নাই। এই দলের মধ্যে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর। গায়ের রঙ পাকা গয়ার (পেয়ারা) মতো। খাড়া নাক, টানা চোখ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। সুন্দর গলা গানের। একটা শিল্পী শিল্পী ভাব আছে। কাজির পাগলা হাইস্কুলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে।

নিখিল চা খাচ্ছে না দেখে সে বলল, খা বেডা। সিগরেডের লগে চা বহুত মজা।

নিখিল তবু চা নিল না।

আলী আমজাদ বলল, আরে খাও মিয়া। কীর লেইগা খাইতে চাইতাছো না বুঝি তো!

আতাহার তীক্ষ্ণচোখে আলী আমজাদের দিকে তাকাল। কীর লেইগা কন তো!

ঐযে তুমি কইলা নিখিলা পরে খাইবো।

কইছি কী অইছে? সব সময়ঐত্তো কই!

না তেমন কিছু অয় নাই। নিখিল মনে করতাছে ও হিন্দু দেইক্কা অরে তুমি সব সময় পিছে রাখো। আলমগির সুরুজ অগো লাহান দাম দেও না।

একথা শুনে হা হা করে উঠল নিখিল। ধুর দাদা কী কন? এই হগল ফালতু কথা আমি ভাবি না। অরা আমার ছোডকালের দোস্ত।

ভাবো ভাবো। আতাহার না বোজলে কী অইবো? আমি বুজি।

সুরুজ একটু থলথলা শরীরের। দেহে কথায় বোকা বোকা একটা ভাব আছে। আলী আমজাদের কথা শুনে সরল গলায় বলল, আতাহার বোজবো না এমুন জিনিস দুইন্নাইতে নাই। পলেটিকস করা পোলা। সিরাজ সিকদার পারটি করতো। বহুত রক্ষিবাহিনী মারছে।

আতাহার সম্পর্কে এই কথাটা একেবারেই নতুন শুনল আলী আমজাদ। অবাক হয়ে আতাহারের দিকে তাকাল। মুখটা দুইকান পর্যন্ত ছড়িয়ে হাসল। নিকি (তাই নাকি অর্থে)? ভাইয়ে তাইলে পলটিনেসিয়ান (পলিটিসিয়ান)? বা বা বা। জানতাম না তো!

আতাহার লাজুক গলায় বলল, আরে ধুর। কবে ছাইড়া দিছি ঐসব। তয় আমি যহন সর্বহারা পারটি করতাম তহন বিক্রমপুরে আমার বস্বের (বয়সের) ম্যালা পোলাপান ঐ পারটি করতো। শেক মজিবের মাথা আমরা খারাপ কইরা হালাইছিলাম। হাজার হাজার রক্ষিবাহিনী দিছিল বিক্রমপুরে। অরা তো আর আমগো ধরতে পারতো না, ধরতো দেশ গেরামের নিরীহ মানুষটিরে। ম্যালা অইত্যাচার রক্ষিবাহিনী বিক্রমপুরে করতাছে। তয় আমরাও ছাড়ি নাই। রক্ষিবাহিনী মাইরা বাজারের বটগাছের লগে উপরের দিকে ঠ্যাং দিয়া ঝুলাইয়া রাকছি। আপনেরা যাঐ কন, শেক মজিবররে আমি দেকতে পারি না। তার একটা হিন্দু হিন্দু ভাব আছিলো।

আলমগির সাধারণত রাগে না। রাগলে মুখ লাল হয়ে যায়, আর যার ওপর রাগে প্রথমে বেশ খানিকক্ষণ কটোমটো চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর রাগ ঝারে। আতাহারের কথা শুনে বেদম রাগল সে। মুখ লাল করে কটোমটো চোখে মাত্র আতাহারের দিকে তাকিয়েছে, আতাহার বলল, চক্কু গোরাচ (রাঙান) ক্যা বেডা? শেক মজিবের নামে মিছাকথা কইছিনি?

 আতাহারের কথা শেষ হওয়ার লগে লগে বেশ জোরে তাকে একটা ধমক দিল আলমগির। নাম ঠিক মতন ক ব্যাডা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হিন্দু হিন্দু ভাব আছিল তার, না? বেবাক ভুইল্লা গেছ? স্বাধীনতা যুইদ্ধের সময় মেলেটারিগো ঠেলা খাইয়া যহন ইণ্ডিয়ায় গেছেলা তহন এই হিন্দুরাই তোমগো জাগা দিছে। খাওয়াইয়া বাঁচাইছে। ইণ্ডিয়ার মোসলমানরা তোমগো জাগা দেয় নাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হউক ইণ্ডিয়ান মোসলমানরা ওইডা চায় সাই। অরা চাইছে এইডা পূর্ব পাকিস্তান আছে পূর্ব পাকিস্তানই থাকুক। আর যেই মুক্তিযুইদ্ধ অইছে, মুক্তিযোদ্ধাগো টেরনিং অইছে কই রে বেডা? ইণ্ডিয়ায় অয় নাই? ইণ্ডিয়ান আর্মি হেলপ না করলে খালি আমগো মুক্তিযোদ্ধারা মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন করতে পারতো? বহুত সময় লাগতো স্বাধীন অইতে। আর বঙ্গবন্ধুর কাছে তো তগো লাহান মাইনষেরঐ বেশি রিনি (ঋণী) থাকনের কথা।

কথাটা বুঝতে পারল না আতাহার। বলল, ক্যা?

বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা না করলে তর বাপে বাইচ্চা থাকে না। রাজাকাররা বাইচ্চা থাকে না। মুক্তিযোদ্ধারা বেবাকটিরে ঢওয়াইয়া (ধ্বংস করা অর্থে) হালাইতো।

আলমগিরের কথা শুনে হাসল আতাহার। ওই অর্থে ধরলে তো জিয়াউর রহমানের কাছেও রিনি আমরা। বঙ্গবন্ধু রাজাকারগো বাঁচাইয়া দিছে, জিয়াউর রহমান রাজনীতি করবার পারমিশন দিছে। আর এরশাদ আইয়া রাজাকারগো খালি মিনিস্টার বানাইছে, খালি মিনিস্টার বানাইছে।

সুরুজ মুখ বিকৃত করে বলল, এই হগল প্যাচাইল বাদ দে তো। আমার ভাল্লাগে না। পলেটিসক বহুত খারাপ জিনিস।

আলী আমজাদ তাকিয়েছিল আলমগিরের দিকে। সুরুজের কথা শেষ হওয়ার পর বলল, ভাইয়ে মনে অয় আওয়ামী লীগ করে!

আলমগির লাজুক হাসল। আরে না মিয়া, আমি কোনও লীগঐ করি না। তয় বঙ্গবন্ধুর খুব ভক্ত আমি। বঙ্গবন্ধুর নামে কেঐ কোনও খারাপ কথা কইলে সইজ্জ করতে পারি না। মিজাজ খারাপ অইয়া যায়।

আতাহার বলল, ও আসলে আওয়ামী লীগঐ করে। ইলেকশনের টাইমে দেকবেন আওয়ামী লীগের লাইগা কেমুন ফালান ফালায় (লাফানো অর্থে)। আলইম্মারে তহন হারিকেন দিয়া বিচড়াইয়াও (খুঁজে) পাইবেন না।

আর তুমি যে ফালাইবা বিএনপির লেইগা!

আমি বিএনপি সাপোট করি এইডা বেবাকতে জানে। বিএনপির লেইগা তো ফালামু। সাপোটাররা না ফালাইলে কারা ফালাইবো!

আলী আমজাদ বলল, এরশাদ সাবের তো তাইলে খুব খারাপ দশা দেকতাছি। এহেনে আওয়ামী লীগ আছে, বিএনপি আছে, জাতীয় পারটি তো দেকতাছি না! জাতীয় পারটি অহন ক্ষমতায়। বিক্রমপুরের দুই বাঘা নেতা আছে জাতীয় পারটিতে। কোরবান আলী, শাহ মোয়াজ্জেম। আর তোমগো মইদ্যে কোনও জাতীয় পারটি নাই।

সুরুজ কেলানো একখানা হাসি দিয়ে বলল, কে কইলো নাই? আমি আছি। আমি জাতীয় পারটি। এরশাদ সাব জিন্দাবাদ!

সাব্বাস। তাইলে নিখিল কী?

আতাহার বলল, হিন্দু তো, সিউর আওয়ামী লীগ।

বাদ রইল খালি জামাতটা। ঠিক আছে আমি জামাত অইয়া যামুনে। তাইলে এই ঘরে যহন আমরা পাঁচজন একলগে বহুম ঘরডা ছোট্ট একখান বাংলাদেশ অইয়া যাইবো।

জামাত করতে অইলে আমার বাপের লগে দুস্তি করেন। ঐ লাইনের লোক।

আলী আমজাদ চিন্তিত গলায় বলল, এই এলাকায় আর কে কে রাজাকার আছিলো?

সুরুজ এবার বেশ বিরক্ত হল। আরে এই প্যাচাইলডা বাদ দিতাছেন না ক্যা? কইলাম যে ভাল্লাগে না।

আইচ্ছা বাদ দিলাম। অহন অন্যকথা কই।

আলমগির চোখ সরু করে আলী আমজাদের দিকে তাকাল। আপনে কইলাম মহা ত্যান্দর মানুষ ভাই। শইল মোডা অইলে কী অইবো, বুদ্ধি বহুত চিকন আপনের। আমি আপনেরে বুইজ্জা হালাইছি। নিখিলারে পরে চা দেওনের কথা থিকা আপনে বাইর করলেন ও হিন্দু দেইখা অরে আমরা আমগো লাহান দাম দেই না। ছোড কইরা রাখি। এইডা কইলাম আমগো মাথায় আছিলো না। আমরা কোনওদিন এই লাইনে চিন্তা করি নাই। আইজ থিকা দুস্তির মইদ্যেও হিন্দু মুসলমানের প্যাঁচখান আপনে লাগাইয়া দিলেন। এই ফাঁকে আমরা কে কেমুন হেইডাও ইট্টু বাজাইয়া দেকলেন। বহুত চালাক মানুষ ভাই আপনে। তয় সোজা একখান কথা আপনেরে আমি কইয়া রাখি, আমরা কেঐ আওয়ামী লীগ সাপোট করি কেঐ বিএনপি নাইলে জাতীয় পারটি কিন্তু দোস্ত যে এইডা ভুইলা যাওন ঠিক অইবো না। একজনরে খোঁচা দিয়া দেহেন বেবাকতে মিল্লা আপনেরে খাইয়া হালাইবো।

তারপর মুচকি হেসে আলমগির বলল, আপনে তো জামাতী। জামাতীরা বেবাকতেরঐ শত্রু।

আলী আমজাদ মনে মনে বলল, দেহা যাইবনে। টাইম আহুক। দুস্তি কেমতে ভাইঙ্গা দিতে অয় হেইডা আমি জানি। মুখে বলল, এই হগল প্যাচাইল বাদ। অন্য প্যাচাইল পাড়ি। এই দিকে ‘ইউ টু’ পাওয়া যায় না?

শব্দটা জীবনে শোনেনি আতাহাররা। চারজন একলগে আলী আমজাদের মুখের দিকে তাকাল।

নিখিল বলল, ইউ টু কী?

ইউ টু অইলো ‘উধাবা ঠুল্লি’।

আতাহার বলল, অর্থ কী?

আলী আমজাদ হাসল। তারপর সিগ্রেট ধরিয়ে মুখভর্তি করে ধুমা ছাড়ল। উধাবা ঠুল্লি কথাটার অর্থ কইতে পারুম না, জিনিসটা কী হেইডা বুজাইয়া দিতাছি। পাকিস্তান আমলে ঢাকার নিউ মার্কেটে থান কাপোড়ের দোকানের কর্মচারি আছিলাম আমি। ঐ টাইমে নিউ মার্কেটে এক ধরনের মাইয়াছেইলা ঘুইরা বেড়াইতো। হাতে ভ্যানেটি ব্যাগ, চোক্কে কালো গগস (গগলস)। পরনে রঙচঙা শাড়ি। কিছু কিনতো না খালি ঘুইরা বেডাইতে। তারবাদে যার তার লগে রিকশায় উইট্টা যাইতো গা। পয়লা পরথম ঘটনা কী বোঝতে পারতাম না। পরে অন্য কর্মচারিরা বুজাইয়া দিল। অগো নাম উধাবা ঠুল্লি। এই নাম কে দিছে, ক্যা দিছে জানতাম না। সংক্ষেপে আমরা বানাইয়া লইছিলাম ইউ টু। পরে কত ইউ টু নিজেগো মেসে লইয়াইছি আমরা!

আতাহার হেসে বলল, বুজছি।

তারপর সামনে ফেলে রাখা সিগ্রেটের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট ধরাল। আতাহারের দেখাদেখি প্রত্যেকেই সিগ্রেট ধরাল।

বাইরে খয়েরি চাদর পরা লোকটা তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে। একবার লোকটার দিকে তাকাল আতাহার। বলল, আমগো এইদিকে ঐসব জিনিস নাই। চউরাণী মউরাণী দুই একখান পাওয়া যায়। জিনিস ভাল না।

আলী আমজাদ কিছু একটা বলতে যাবে, কী ভেবে বাইরে তাকিয়েছে, দূরে সড়কের পশ্চিমপাড় থেকে সড়কে উঠতে দেখল একজোড়া ছেলেমেয়েকে। মেয়েটা ভাঙন থেকে আগে উঠল, উঠে ছেলেটাকে হাত ধরে টেনে তুলল। এতদূর থেকেও আলী আমজাদ বুঝতে পারল দুইজনেই পাখির মতো ছটছট করতাছে।

খানিক তাকিয়ে থেকেই মেয়েটাকে সে চিনতে পারল। নূরজাহান।

কিন্তু ছেলেটি কে আগে কখনও দেখেনি তো!

আলী আমজাদ আর আশপাশে তাকাল না, নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার মুখে মুখে এই এতটা দূর থেকেও অপূর্ব লাগছে মেয়েটাকে।

আলমগির বলল, কী দেকতাছেন কনটেকদার সাব?

আলী আমজাদ আগের মতোই নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু দেহি না। চিন্তা করতাছি।

কী চিন্তা করেন?

টেকা পয়সা অইছে অহন আরেকখান বিয়া করন দরকার। একটা বউ দিয়া চলে না। ধ্যারধ্যারা অইয়া গেছে। লগে হুইয়া থাকলে মনে অয় ভিজা কেথার (কাঁথার) লগে হুইয়া রইছি।

আলী আমজাদের কথা শুনে আতাহাররা চারজনই হেসে উঠল।

হাঁটতে হাঁটতে নূরজাহান আর সেই ছেলেটা তখন আলী আমজাদের ঘর বরাবর সড়কে এসে দাঁড়িয়েছে। কী কথায় নূরজাহান শিশুর মতো দুলে দুলে হাসছে। আলী আমজাদ মুগ্ধ হয়ে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে রইল।

সুরুজ ঠাট্টার গলায় বলল, মনে যহন চাইছে, বিয়া তাইলে আর একখান কইরা হালান। অসুবিদা নাই। মোসলমানরা চাইরখান বিয়া করতে পারে।

আতাহার বলল, কারে করবেন চিন্তা করছেন?

আলী আমজাদ আঙুল তুলে নূরজাহানকে দেখাল। ঐ অরে।

আতাহাররা সড়কের দিকে তাকাল।

আলমগির ভুরু কুঁচকে বলল, নূরজাহানরে! কন কী? ও তো আপনের মাইয়ার লাহান।

আলী আমজাদ নিঃশব্দে হাসল। দুই নম্বর বউ মাইয়ার লাহান অওনঐ ভাল।

তারপর চিন্তিত গলায় বলল, নূরজাহানের লগে ছেমড়াডা কে?

নিখিল বলল, হালদার বাড়ির মজনু। ঢাকায় থাকে। খলিফাগিরি হিগতাছে।

আলী আমজাদ তারপর চকি থেকে নামল। তোমরা বহ, আমি ইট্টু ঘুইরাহি।

.

১.২০

বন্ধ ছাতি হাতে সড়কের মুখে দাঁড়িয়ে আছে হেকমত। শখানেক মাটিয়ালের কেউ কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কোদালের আগায় তুলে কায়দা করে ভরে দিচ্ছে মোড়ায়। তারপর হুমহাম শব্দে সেই মোড়া তুলে দিচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, লুঙ্গি কাছা মারা, মাজা বরাবর শক্ত গিটটু (গিট) দিয়ে বান্ধা গামছা, মাথায় নাড়ার তৈরি বিড়া, বিড়াখানার দুই দিকে আছে সরু শক্ত দড়ি, সেই দড়ি দুই কানের পাশ দিয়ে বান্ধা যাতে হাঁটাচলা করার সময়, মাটি ভর্তি যোড়া মাথায় তোলার সময় বিড়াখান সরে না যায়, পড়ে না। যায়, এমন মাটিয়ালের মাথায়। কেউ কেউ মাটি ভর্তি যোড়া মাথায় সড়কের নামা থেকে উঠছে উপরে, জায়গা মতো গোড়া উপুড় করে মাটি ফেলছে কেউ, কেউ খালি মোড়া নিয়ে নেমে আসছে নামার দিকে। সব মিলিয়ে এলাহি কারবার। হেকমতকে রাখা হয়েছে এই সবের তদারক করতে। কিন্তু আলী আমজাদ যতক্ষণ এখানে এসে থাকে ততক্ষণ হেকমত কিছুতেই কাজে মন দিতে পারে না। মিলেমিশে দাঁড়িয়ে থাকে মাটিয়ালদের মাঝখানে, নজর থাকে ছাপড়া ঘরটার দিকে। কখন আলী আমজাদ বের হবে, কখন ছাতি খোলার সুযোগ পাবে সে।

এখনও তেমন একটা ভাবের মধ্যেই ছিল হেকমত। মাটিয়ালদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থেকেও তাদের কাজকর্ম কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। চঞ্চল চোখে বার বার তাকাচ্ছিল ছাপড়া ঘরটার দিকে। ফলে আলী আমজাদকে বের হতে দেখে ব্যাকুল হয়ে গেল সে, ফটাস করে ছাতি মেলল, দিশাহারা ভঙ্গিতে ছুটে এল আলী আমজাদের সামনে। দুই হাতে অতিশয় বিনয়ে খোলা ছাতি ধরল তার মাথার উপর।

এখন প্রায় সন্ধ্যা। পশ্চিমে, বহুদূরের গ্রামপ্রান্তে সিন্দুইরা (সিঁদুরে) আমের মতো বোঁটা আলগা হতে শুরু করেছে সূর্যখানার। যে কোনও সময় টুপ করে বসে যাবে। তার আগে কোন ফাঁকে যেন বাড়ির আঙিনায় শুকাতে দেওয়া শাড়ি যেমন তুলে নেয় গিরস্থ। বউ তেমন করে তুলে নিয়েছে দিনভর ফেলে রাখা রোদ। ছায়া ছায়া মায়াবি একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারদিকে। উত্তরের হাওয়া আরও জোরে বইছে। বেপারি বাড়ির আথালে (গোহালে) হাম্বা স্বরে ডাকছে একটা আবাল (তরুণ ষাড়)। সারাদিন ইচ্ছা স্বাধীন চড়েছে চকেমাঠে। এখন বাড়ি ফিরে আথালের পরাধীনতা মানতে চাইছে না। পদ্মার নির্জন চরে শস্যদানা খুঁটতে গিয়েছিল যেসব পাখি এখন তাদের ফিরার পালা। মাথার অনেক উপর দিয়ে সাং সাং শব্দে উড়ে যাচ্ছে সেই সব দিনশেষের পাখি। ঠাকুর চদরি বাড়ির দেবদারু তেঁতুলের অন্ধকার থেকে, বাঁশঝাড়ের ডগা থেকে পা খসাতে শুরু করেছে বাদুড়েরা। আকাশ কালো করে এখনই ওড়াউড়ি শুরু করবে তারা। আর এসময় কী না রোদ আড়াল করবার জন্য একজন মানুষ ছাতি মেলে ধরেছে আরেকজনের মাথায়!

দৃশ্যটা দেখে খিলখিল করে হাসতে লাগল নূরজাহান।

নূরজাহানের পাশাপাশি ধীর পায়ে হাঁটছে মজনু। সড়কে এসে ওঠার পর থেকেই সে কেমন আনমনা। কোনও কারণ নাই তবু মন উদাস উদাস লাগছে। এই এক অদ্ভুত জিনিস মানুষের দেহে ঢুকিয়ে দিয়েছেন আল্লাহপাক, মন। কখন খারাপ হবে তা, কখন ভাল, কখন না ভাল না খারাপ, কখন উদাস বিষণ্ণ অনেক সময়ই মানুষ তা বুঝতে পারে না। এখন যেমন পারছে না মজনু।

নূরজাহানের বাবার কথায় নিজের বাবার কথা মনে পড়েছিল বলেই কী মন এমন খারাপ হয়েছে তার!

কে জানে!

নূরজাহানকে হাসতে দেখে তার মুখের দিকে তাকাল মজনু। কী অইছে রে? এমতে হাসছ ক্যা?

নূরজাহানের স্বভাব হচ্ছে তার হাসির সময় সেই বিষয় নিয়ে কেউ কথা বললে হাসি আরও বেড়ে যায়। এত জোরে হাসতে শুরু করে সে, হাসির চোটে চোখে পানি আসে।

এখনও তেমন হল। হাসতে হাসতে চোখ পানিতে ভরে গেল। হাসির চোটে ফেটে যেতে যেতে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছল।

মজনু আবার বলল, কী অইছে? হাসতে হাসতে মইরা যাইতাছস দিহি!

হাসির চোটে তখনও কথা বলতে পারছে না নূরজাহান। আঙুল তুলে ছাপড়া ঘরের ওদিকটা দেখাল। মজনু তাকাল ঠিকই কিছুই বুঝতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বলল, ওই মিহি কী দেহাচ? ওহেনে হাসনের কী দেকলি?

খয়েরি চাদর পরা লোকটা তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে আগের জায়গায়। মজনু ভাবল ওই লোকটাকে দেখে বুঝি হাসছে নূরজাহান। এমন করে বসে থাকা একটা লোককে দেখে হাসার কী হল! যে ভঙ্গিতে বসে আছে, দেখেই বোঝা যায় অসহায় মানুষ। একে দেখে হাসি পাওয়ার কথা না, মায়া লাগার কথা।

নূরজাহানকে ধমক দেওয়ার জন্য তৈরি হল মজনু। ঠিক তখনই নূরজাহান বলল, আপনে অহনতরি বোজেন নাই আমি কীর লেইগা হাসতাছি।

মজনু গম্ভীর গলায় বলল, না।

কনটেকদারের মিহি চান।

মজনু আবার তাকাল, এবারও কিছু বুঝতে পারল না।

নূরজাহান বলল, অহনও বোঝেন নাই?

না।

ধুরো আপনে একখান বলদ (বোকা অর্থে), দেকতাছেন না কনটেকদারের মাথার উপরে ছাতি মেইল্লা (মেলে) ধরছে এক বেডায়।

হ দেকতাছি।

অহন কি রইদ আছে না ম্যাগ অইতাছে যে ছাতি লাগবো!

এবার ব্যাপারটা বুঝল মজনু। বুঝে হাসল। ও এর লেইগা হাসতাছস?

হাসুম না? এইডা তো হাসনেরঐ জিনিস।

আর আমি মনে করছি ঐ যে চাইদ্দর গায়দা (গায়ে দিয়ে) বইয়া রইছে ঐ বেডারে দেইক্কা হাসতাছস।

ভুরুর অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে মজনুর দিকে তাকাল নূরজাহান। ঐ বেডারে দেইক্কা হাসুম ক্যা? ঐ বেডা কি হাসনের জিনিস! দেকলে তো মায়া লাগে!

মজনু আনমনা গলায় বলল, হ।

লন ঐ ঘরডার সামনে যাই, ঐ বেডারে দেইক্কাহি আর হাজের সমায় ছাতি মাথায় দেওয়া কনটেকদাররে ইট্টু খোঁচাইয়াহি (খুঁচিয়ে আসি)।

মজনু গম্ভীর গলায় বলল, না।

নূরজাহানের উৎসাহে ভাটা পড়ল। ক্যা?

চিনাজানা নাই এমুন মাইনষের লগে খোঁচাখুচি করতে যাওন ঠিক না। কাইজ্জা কিত্তন লাইয়া যাইবো। এমতেঐ আউজকা মান্নান মাওলানারে চেতাইয়া দিছস। অহন আবার লাগাইতে চাইতাছস আরেক ভেজাল। আমি যামু না।

নূরজাহান হাসল। কনটেকদার সাবরে আমি চিনি। বহুত খাতির আমার লগে। হের লগে কত ফাইজলামি করি। হেয়ও করে। মুখের ভিতরে সোনায় বানদাইন্না দাঁত আছে হের। একদিন হাসতে দেইক্কা কইছিলাম আপনে যহন হাসেন মনে অয় ব্যাটারি লাগাইয়া হাসতাছেন।

বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল নূরজাহান। মুখের ভিতরে কেউ চান্দা ব্যাটারি লাগাইতে পারে, কন?

এবার মজনুও হাসল। ইস তুই যে কী মাইয়ারে!

লগে লগে নূরজাহান বলল, তয় অহন লন।

মজনু অবাক হল, কই?

কনটেকদারের ঘরের ওহেনে।

তারপর মজনুকে আর কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে তার হাত ধরে হঠাৎ করেই নামার দিকে দৌড় দিল নূরজাহান। এমন আচমকা দৌড়, তাল সামলাতে না পেরে মজনুও দৌড় দিল। খাড়া ঢাল বেয়ে চলে এল ছাপড়াঘরটার সামনে। তবে তাল সামলাতে খুব একটা বেগ পেতে হল না। যেমন আচমকা মজনুর হাত ধরে দৌড় দিয়েছিল নূরজাহান ঠিক তেমন আচমকাই দৌড় থামিয়ে স্থির হল। কী করে যে পারল, কে জানে। বোধহয় এরকম দৌড়াদৌড়ির অভ্যাস তার অনেক দিনের। অভ্যাসে সব হয়।

নূরজাহানকে দেখবার জন্যই, নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলবার জন্যই ছাপড়াঘর থেকে বেরিয়েছে আলী আমজাদ। বেরিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেছে। সেই বেকায়দার নাম হেকমত। এমন ভঙ্গিতে আলী আমজাদের মাথার উপর ছাতি মেলে আছে, এমন উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের মুখের দিকে একটা কথাও পড়তে দেবে না তার আগেই কথা মতো কাজটা করে ফেলবে। ট্যান্ডলরা যে বিরক্তির কারণও হয় এই প্রথম আলী আমজাদ তা বুঝতে পারল। বুঝেও তার এখন কিছু করার নাই। অকারণে গম্ভীর হয়ে থাকতে হল। আড়চোখে নূরজাহান এবং মজনুর দিকে একবার তাকিয়ে জবুথুবু হয়ে বসে থাকা লোকটার সামনে এসে দাঁড়াল। পেটের অনেক ভিতর থেকে শব্দ করে করে বলল, বাড়ি কবে?

প্রশ্নটা যে তাকে করা হয়েছে লোকটা প্রথমে বুঝতে পারল না। পেটের অনেক ভিতর থেকে শব্দ বের করেছে বলে আলী আমজাদের স্বর হয়ে গেছে জলদগম্ভীর। একে ওরকম শব্দ তার ওপর কোথায়কে বলছে কবে, আলী আমজাদের কায়দা কানুনের সঙ্গে যারা পরিচিত না, কথাবার্তার সঙ্গে যারা পরিচিত না তাদের পক্ষে এসব বোঝা মুশকিল। তবে কন্ট্রাক্টর সাহেবকে নিজের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে লোকটা ভড়কে গেছে। চোখে মুখে বেশ একটা চাঞ্চল্য। দিশাহারা গলায় বলল, আমারে জিগাইলেন?

আলী আমজাদ কথা বলবার আগেই হেকমত বলল, তয় আবার কারে? এহেনে তুমি ছাড়া আর আছে কে?

লোকটা কাঁচুমাচু গলায় বলল, কথাডা বোজতে পারি নাই। কী জানি জিগাইলেন?

ঠিক আগের মতো করেই আলী আমজাদ বলল, বাড়ি কবে?

লগে লগে হেকমত বলল, বাড়ি কই?

জ্বে কামারগাও সাহেব।

হেকমত ধমকের গলায় বলল, কামারগাওর মানুষরা কি আদব লেহাজ (কায়দা) জানে না? সাবের সামনে যে বইয়া বইয়া কথা কইতাছো? উডো, উইট্টা খাড়ও।

লোকটা জড়সড় হয়ে উঠে দাঁড়াল। ভুল হইয়া গেছে সাব, মাফ কইরা দিয়েন।

লোকটার দিকে আর তাকাল না আলী আমজাদ তাকাল নূরজাহান এবং মজনুর দিকে। মুখে বেশ একটা প্রশান্তির ভাব। লোকটার ওপর হেকমতের হামতাম (হম্বিতম্বি) বেশ পছন্দ করেছে সে। ট্যাণ্ডলদের এরকমই হওয়া উচিত। সাহেবরা যা ভাববেই না। আগ বাড়িয়ে সেই ধরনের কিছু একটা করে সাহেবদের মন জিততে না পারলে সে আবার কিসের ট্যাণ্ডল! লোকটাকে আদব কায়দা শিখিয়ে ঠিক এই কাজই করেছে। হেকমত। তবে আলী আমজাদ যখন নূরজাহানের দিকে মন দিয়েছে, মাত্র কথা শুরু করবে, হেকমত বলল, সাব, কথাডা কন।

ভিতরে ভিতরে খুবই বিরক্ত হল আলী আমজাদ কিন্তু প্রকাশ করল না। নির্বিকার চোখে তাকাল হেকমতের দিকে। কোন কথা?

নতুন মাইট্টাল কামে লওনের কথা।

ও।

তারপর আবার লোকটার দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল, মাইট্টাল অইবা?

জ্বে সাহেব। এর লেইগাঐ বইয়া রইছি।

য়োড়া আছে?

না।

তয়?

য়োড়া যোগার কইরা লমুনে

কেমতে? য়োড়া আনতে আবার কামারগাও যাইবা?

না। এই গেরামে আততিয় (আত্মীয়) বাড়ি আছে। তাগো কাছ থিকা আনুম।

থাকবা কই?

থাকনের বেবস্তা অইবনে। কইয়া বুইল্লা (বলে কয়ে) ঐ আততিয় বাইতঐ থাকতে পারুম। নাইলে ভিনদেশি মাইট্টাইলরা যেমতে থাকে, তাগো লগে থাকুম। ছাড়া বাইত্তে, ইসকুলে।

এবার আসল কথাটা বলল আলী আমজাদ। আমার কামের রোজ জানো?

না সাহেব, তয় অন্যরে যা দেন আমারেও তাই দিয়েন।

হেইডা দিমু না।

ক্যা?

আমার এহেনকার এহেক মাইট্টালের এহেক রকম রোজ। কেঐর পনচাইশ কেঐর চল্লিশ। সইত্তর আশিও আছে। মাইট্টাল বুইজ্জা রোজ। শইল বুইজ্জা রোজ। তোমার যা শইল, চল্লিশ টেকার বেশি পাইবা না। করলে কাইল বিয়ানে য়োড়া লইয়া আইয়ো। ফয়জরের আয়জানের লগে লগে কামে লাগবা, দুইফরে আধাঘণ্টা টিবিন (টিফিন) তারবাদে মাগরিবের আয়জান পইরযন্ত কাম। সপতায় একদিন টেকা পাইবা। শুক্কুরবার।

কথাগুলি বলে লোকটার দিকে আর তাকাল না আলী আমজাদ, তাকাল হেকমতের দিকে। কেমতে কথা কইলাম খ্যাল করছো?

হেকমত বিগলিত ভঙ্গিতে হাসল। করছি সাব। এরবাদে আমিই পারুম। আপনেরে আর লাগবো না।

লোকটা তখন কাতর চোখে তাকিয়ে আছে আলী আমজাদের দিকে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে যখন দেখল আলী আমজাদ আর তার দিকে তাকাচ্ছেই না বাধ্য হয়ে বলল, আমার একখান কথা আছিলো সাহেব।

তবু লোকটার দিকে তাকাল না আলী আমজাদ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি কও। কাম আছে।

পয়লা সপতাডা রোজকার পয়সা রোজ দেওন লাগবো।

ক্যা?

আমার কাছে একখান পয়সাও নাই। রোজ না পাইলে খামু কী? তয় পয়লা সপতার পর আর কোনওদিন লাগবো না।

আলী আমজাদ হেকমতের দিকে তাকাল। হেকমত, কইয়া দেও, অইবো না, নিয়ম নাই।

তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথার ওপর মেলে ধরা ছাতি একহাত দিয়ে সরিয়ে দিল। অদূরে দাঁড়ান নূরজাহান খিলখিল করে হেসে উঠল। কয়েক পা হেঁটে আলী আমজাদ এসে নূরজাহানের সামনে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, হাসো ক্যা?

নূরজাহান হাসতে হাসতে বলল, আপনেরে ছাতি মাথায় দেইক্কা। রইদ নাই ম্যাগ নাই মাথায় ছাতি দিয়া আছেন ক্যা?

আমি দেই নাই। মাথার উপরে ছাতি ধরছে আমার ম্যানাজারে। অগো কামঐ এমুন। রইদ ম্যাগ বোজে না। মালিক দেখলেই তার মাথায় ছাতি মেইল্লা ধরে।

ঐ বেডায় আপনের ম্যানাজার?

হ। বড় কনটেকদার অইলে একজন ম্যানাজার লাগে। আমি অহন বড় কনটেকদার। ম্যানজার রাখছি।

মজনু দাঁড়িয়ে আছে নূরজাহানের পাশে কিন্তু আলী আমজাদ একবারও তাকাচ্ছে তার দিকে। নূরজাহানকেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। চোখের দৃষ্টি ভাল না লোকটার। খানিক আলী আমজাদকে দেখেই বিরক্ত হয়ে গেল মজনু। সেই বিরক্তি কাটাবার জন্য নূরজাহানকে কিছু না বলে হেকমত আর চাদরপরা লোকটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। হেকমত কী বলছে, লোকটা মন দিয়ে শুনছে। মজনু গিয়ে সামনে দাঁড়াবার পর হেকমতকে যেন ভুলে গেল সে, হেকমতকে যেন আর চিনতেই পারল না। ঘোরলাগা চোখে মজনুর দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রথমে দুই একবার চোখ সরিয়ে নিল মজনু তারপর সেও কেমন তাকিয়ে রইল। চোখ সরাতে পারল না।

ওদিকে নূরজাহান তখন আলী আমজাদকে বলছে, অনেকক্ষণ ধইরা খাড়ইয়া রইছি ছাতির কথাডা আপনেরে কমু, এমুন প্যাচাইল আপনে ঐ বেডার লগে আরম্ব করলেন আর শেষঐ অয় না। কথাও কইতে পারি না যাইতেও পারি না।

নূরজাহানের কথা শুনে আলী আমজাদ যেন আকাশ থেকে পড়ল। কও কী? তুমি আমার লগে কথা কওনের লেইগা খাড়ইয়া রইছো? হায় হায় আমি তো বুঝি নাই। লও ঘরে লও। ঘরে বইয়া কথা কই। আমারও কথা আছে তোমার লগে।

ঘরে যে আতাহাররা বসে আছে সেই কথা যেন মনেই রইল না আলী আমজাদের, একদম ভুলে গেল।

কিন্তু আলী আমজাদের কথা পাত্তা দিল না নূরজাহান। বলল, ধুরো, ঐ ঘরে মানুষ যায়নি। রাইত অইয়াইলো। আমি অহন বাইত যামু।

মজনুকে ডাকল নূরজাহান। ও মজনু দাদা, তাড়াতাড়ি আহেন। রাইত অইয়াইলো। বাইত্তে যামু না?

নূরজাহানের ডাকে চমক ভাঙল মজনুর। লোকটার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে দ্রুত নূরজাহানের দিকে পা বাড়াবে, লোকটা বলল, খাড়াও বাজান। তোমার নাম মজনু?

হ।

এই গেরামেঐ বাড়ি?

হ।

কোন বাড়ি?

হালদার বাড়ি।

লোকটা আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাবে তার আগেই নূরজাহান রাগি ভঙ্গিতে এসে হাত ধরল মজনুর। কানে বাতাস যায় না? কইলাম যে রাইত হইয়া যাইতাছে। লন।

মজনুর হাত ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে সড়কে উঠল নূরজাহান। পিছন দিকে আর ফিরেও তাকাল না।

কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে মজনু বার বারই পেছন ফিরে তাকাচ্ছিল। লোকটাকে দেখছিল। সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে দূর থেকে লোকটার চোখ দেখা যায় না, পরিষ্কার দেখা যায় না মুখ। তবে সে যে তখনও ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আছে মজনুর দিকে এটা বোঝা যায়।

কে, লোকটা কে?

এই সড়কে যে মাটিয়ালের কাজ করতে এসেছে এটা আলী আমজাদ হেকমত এবং লোকটার কথা শুনে বুঝেছে মজনু। কিন্তু সে গিয়ে সামনে দাঁড়াবার পর সব ভুলে এমন করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল কেন? চলে আসার সময় নাম ধামই বা জিজ্ঞাসা করল কেন? এখন এই যে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে মজনু এসময় কেন তার বার বার ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করতাছে লোকটার দিকে।

মজনু মনে মনে বলল, আপনে কে?

১.২১-২৫ মাটির গাছাটা (কুপিদানি)

১.২১

মাটির গাছাটা (কুপিদানি) কতকালের পুরানা কে জানে! জন্মের পর থেকে এই একটা মাত্র গাছাই দেখে আসছে মজনু। এক সময় বিলাতিগাবের মতো রঙ ছিল। দিনে দিনে সেই রঙ মুছে গেছে। এখন চুলার ভিতরকার পোড়ামাটির মত রঙ। মাটির তৈরি

একখান জিনিস কী করে এতকাল টিকে থাকে? তাও প্রতিদিন ব্যবহার করার পর!

আসলে গরিব মানুষের সংসারের কোনও জিনিসই সহজে নষ্ট হয় না। অভাবের সংসারে প্রতিটি জিনিসই দামি। যত্নে ব্যবহার করার ফলে ভঙ্গুর জিনিসও বছরের পর বছর টিকে থাকে। মজনুদের সংসারে যেমন করে টিকে আছে গাছাটা।

সেই গাছার ওপর এখন জ্বলছে পিতলের কুপি। কুপির বয়স গাছার চেয়েও বেশি। প্রায়ই ছাই দিয়ে মেজে পরিষ্কার করে মরনি, ফলে এখনও ঝকঝক করে। পুরানা মনে হয় না।

চকিতে শুয়ে আনমনা চোখে কুপির দিকে তাকিয়ে আছে মজনু। মাঝারি ধরনের পাটাতন ঘরের পুরাটা আলোকিত হয়নি একখান কুপির আলোয়। অর্ধেকের কিছু বেশি হয়েছে। বাকিটা আবছা মতন অন্ধকার। সেই অন্ধকারে পা ছড়িয়ে বসে পান চাবাচ্ছে মরনি। খানিক আগে মজনুকে খাইয়ে নিজেও খেয়েছে রাতের ভাত, তারপর টুকটাক কাজ সেরে পান মুখে দিয়ে বসেছে। এখন কিছুটা সময় উদাস হয়ে বসে পান চাবাবে। গত চারমাসে চুপচাপ বসে পান খাওয়ার এই অভ্যাসটা হয়েছে তার। পান সে আগেও খেত তবে চুপচাপ থাকত না। মজনু ছিল, সারাদিনের জমে থাকা সবকথা খালা বোনপোয় এসময় বলত। চারমাস ধরে মজনু বাড়িতে নাই, কথা সে কার সঙ্গে বলবে! তবে মজনু বাড়িতে আসার পর এসময় চুপচাপ থাকা হয় না তার। আজ হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেই মজনু আনমনা হয়ে আছে। ভাত খাওয়ার সময় তেমন কোনও কথা বলল না। খেয়েই চকিতে শুয়ে পড়ল। এখন উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে কুপির দিকে।

পান চাবাতে চাবাতে মজনুর দিকে তাকাল মরনি। ঘুমাইছস নি বাজান?

মজনু নরম গলায় বলল, না।

তয় চুপ কইরা রইছস ক্যা? কথাবার্তি ক।

সড়কের সেই লোকটার কথা মনে পড়ল মজনুর। সে একটু উত্তেজিত হল। চঞ্চল ভঙ্গিতে উঠে বসল। আরে তোমারে তো একখানা কথা কই নাই খালা। নূরজাহানের লগে সড়ক দেকতে গেছিলাম। ওহেনে কনটেকদারের ছাপড়া ঘরের সামনে একজন মাইনষের লগে দেহা অইলো।

মরনি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কার লগে?

চিনি না।

তয়?

ঘটনাডা হোনো। বলেই লোকটা কেমন করে তার দিকে তাকিয়েছিল, কী কী কথা জিজ্ঞাসা করল সব বলল মজনু। চলে আসার সময়ও যে তাকে যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়েছিল লোকটা, মজনুর বুকের ভিতর কেমন করছিল এবং সেও যে বার বার ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিল, সব বলল। শুনে পান চাবাতে ভুলে গেল মরনি। চিন্তিত গলায় বলল, বাড়ি কই?

কামারগাও।

কামারগাও শুনে বুকটা ধ্বক করে উঠল মরনির। দিশাহারা গলায় বলল, কামারগাও?

হ অমুনঐত্তো হোনলাম।

তর লগে কথা কইলো আর তুই ঠিক মতন হুনলি না?

আমার লগে কয় নাই। কনটেকদারের লগে কইতাছিল, আমি দূর থিকা হুনছি।

তয় তর লগে বলে কথা কইলো? তুই জিগাচ নাই বাড়ি কই?

না।

নাম জিগাইছস? নাম কী?

আমি তারে কিছুই জিগাই নাই। সে আমারে দুইখান কথা জিগাইছে। রাইত অইয়া যায় দেইক্কা নূরজাহান আমারে টাইন্না লইয়াছে।

দেখতে কেমুন?

ভাল না! কাহিল।

বয়স কত?

গাছি মামার লাহান। মোখে দাঁড়িমোচ আছে। চুল আর দাঁড়িমোচে পাকনও ধরছে। খয়রি রঙ্গের চাইর গায়দা রইছে। মুখহান দেইক্কা আমার কেমুন জানি মায়া লাগলো।

মরনি চিন্তিত গলায় বলল, এহেনে আইছে কীর লেইগা?

মাডি কাটতে।

লগে লগে বুক হালকা হয়ে গেল মরনির। যা অনুমান করেছিল তা না। সেই মানুষের মাটি কাটতে আসবার কথা না। অবস্থা ভাল তার। সচ্ছল গিরস্থ। সে কেন আসবে মাটিয়াল হতে! এটা অন্য কেউ।

প্রশান্ত মুখে আবার পান চাবাতে লাগল মরনি।

মজনু বলল, মানুষটা কে অইতে পারে কও তো খালা? এমুন কইরা চাইয়া রইলো আমার মিহি!

মরনি নির্বিকার গলায় বলল, কী জানি?

আমগো আততিয় স্বজন না তো?

কেমতে কমু? না মনে অয়। আমগো অমুন আততিয় নাই।

তারপরই চিন্তিত গলায় মজনু বলল, ও খালা, আমগ বাড়ি কামারগাও না?

কথাটা যেন বুঝতে পারল না মরনি। থতমত খেয়ে বলল, কী কইলি?

কইলাম আমার বাপ চাচারা থাকে না কামারগাওয়ে?

মরনি গম্ভীর গলায় বলল, হ থাকে। তয় তর বাড়ি কামারগাও না। তর বাড়ি এইডা। তর ঘর এইডা। তরে যে জন্ম দিছে তার বাড়ি কামারগাও।

তারপর মন খারাপ করা গলায় বলল, মাইনষের নিয়মঐ এইডা, জন্মদাতারে বহুত বড় মনে করে তারা। যেই বাপে আহুজ ঘর থিকা ঠ্যাং ধইরা ফিক্কা হালায় দেয় পোলারে, জীবনে পোলার মিহি ফিরা চায় না, পোলার খবর লয় না, চিনে না, পোলার খাওন পরন দেয় না, একদিন হেই পোলায়ঐ বাপ বাপ কইরা পাগল অইয়া যায়।

খালার কথার ভিতরকার অর্থটা বুঝল মজনু। বুঝে হাসল। আমি কইলাম বাপ বাপ কইরা পাগল অই না। আমার কাছে জন্মদাতা বড় না, বড় তুমি, যে আমারে বাচাইয়া রাখছে, পাইল্লা বড় করতাছে। আমি বাপ বুঝি না, বুঝি তোমারে।

কথা শেষ করার পর কেন যে আবার সেই লোকটার কথা মনে পড়ল মজনুর! কেন যে সেই লোকটার মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে! আর বুকের ভিতর কেন যে হল আশ্চর্য এক অনুভূতি, মজনু বুঝতে পারল না।

.

১.২২

শিশুর মতো শুয়ে আছে নূরজাহান। শাড়ি উঠে আছে ডানপায়ের গুড়মুরা ছাড়িয়ে একটুখানি উপরে। বিকালের বেণী করা চুল ঘুমাবার আগে আলগা করে দিয়েছে। খোলা চুল তেল চিটচিটা বালিশের পিছন দিকে লুটাচ্ছে। গভীর ঘুমে ডুবে থাকার ফলে শ্বাস পড়ছে ভারী হয়ে। মা বাবা কেউ তা খেয়াল করতাছে না। তারা আছে যে যার কাজে।

ঘরে জ্বলছে হারিকেন। চিমনির মাজার কাছটায় চিকন সাদা সুতার মতন ফাটল। রঙ চটে যাওয়া কাটার একপাশে ‘বায়েজিদ’ ছাপ মারা। বহুদিনের পুরানা হওয়ার পরও কোম্পানির ছাপ গা থেকে মুছে যায়নি হারিকেনের।

সন্ধ্যাবেলা হারিকেন আজ খুবই যত্নে পরিষ্কার করেছিল হামিদা। ফাটা কাঁচ সাবধানে মুছে, কেরোসিন ঢালার মুখে ছোট্ট চোঙা বসিয়ে, বোতল থেকে পরিমাণ মতো কেরোসিন ঢেলে হারিকেন যখন জ্বেলেছে, লগে লগে উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল তাদের গরিব ঘর। নূরজাহান তখনও ফিরেনি। দবির ফিরেছিল। ফিরে হামিদাকে হারিকেন জ্বালাতে দেখে অবাক হয়েছিল।

এই বাড়িতে বিশেষ কোনও দরকার না হলে হারিকেন জ্বালান হয় না। অন্ধকারে জ্বলে শুধু কুপি। বাড়িতে মেজবান মেহমান (অতিথি) এলে রাতের বেলায় সেই মেজবানরা যদি থাকে, মেজবানদের সামনে তো আর টিন পিতলের কুপি দেওয়া যায় না! গরিব হলেই বা কী, মানইজ্জ কি গরিব মানুষদের থাকবে না! তাও না হয় বাড়িতে যদি হারিকেন না থাকত! না থাকা ভিন্নকথা। থাকবার পরও মেজবানের সামনে দিবে না এত কিরপিন (কৃপণ) কি কোনও গিরস্ত হতে পারে! নাকি হওয়া উচিত। তবে বান তুফানের (ঝড় বাদলার) রাতে, বৈশাখ যষ্ঠি মাসে, আষাঢ় শাওন মাসে হারিকেন জিনিসটা দরকারী। দমকা হাওয়ায় টিকতে পারে না কুপি। সলতা (সলিতা) যতই বাড়ানো থাকুক সো সো করা বাতাস ছাড়লে লগে লগে ঘরবাড়ি আন্ধার। দবির গাছির তুলনায় গরিব গিরস্ত ঘরেও তখন জ্বলতে দেখা যায় হারিকেন। একবেলা ভাত না খেয়ে থাকতে পারে মানুষ বান তুফানের রাতে আন্ধারে থাকতে পারে না। ভয় পায়। মনে হয় আন্ধারে যখন তখন সামনে এসে দাঁড়াবে মৃত্যু। মানুষ দেখতে পাবে না কিন্তু তার ঢের (টুটি) টিপে ধরবে আজরাইল। জান কবচ করবে।

সন্ধ্যাবেলা হামিদাকে আজ হারিকেন জ্বালাতে দেখে দবির অবাক হয়ে ভেবেছিল, বাড়িতে কোনও মেজবান আসেনি, দিনও বান তুফানের না তাহলে হারিকেনের দরকার কী!

হামিদা বলেছিল, কাম আছে। কী কাম তা বলেনি। দবির জানতে চায়নি। খাওয়া দাওয়ার পর, নূরজাহান শুয়ে পড়ার পর, তামাক সাজিয়ে স্বামীর হাতে হুঁকা ধরিয়ে দেওয়ার পর হামিদা তার কাম নিয়ে বসেছে। ঘরের মেঝেতে হোগলা একখান বিছানোই থাকে। এই হোগলায় বসে খাওয়া দাওয়া করে তিনজন মানুষ। রাতেরবেলা তিনজন মানুষের দুইজন, মা মেয়ে উঠে যায় চকিতে আর দবির একখান বালিশ মাথায় দিয়া এই হোগলায়ই টান টান।

আজকের ব্যাপারটা হয়েছে অন্যরকম। রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে মেয়ে একা উঠে গেছে চকিতে আর পুরানা মোটা একখান কথা বের করে, সুই সুতা নিয়া, হাতের কাছে হারিকেন, হামিদা বসেছে কাঁথা সিলাই করতে, তালি দিতে। হুঁকা হাতে দবির গিয়ে বসেছে দুয়ারের সামনে। বসে হুঁকায় প্রথম টান দিয়েই বলল, ও তাইলে এই কাম! এই কামের লেইগা হারিকেন আঙ্গান (জ্বালান) লাগে!

পুরানা, ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা হয়ে গেছে এমন সুতি শাড়ির পাইড় (পাড়) থেকে টেনে টেনে বের করা সুতা ফেলে দেওয়া ম্যাচের বাক্সে সযতনে প্যাচিয়ে রাখে গিরস্ত বাড়ির বউঝিরা। কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করে এই সুতা দিয়ে। সে কাঁথা ছেলে বুড়া যারই হোক না কেন। হামিদাও তেমন করে কাঠিম (ম্যাচ বাক্সে সুতা প্যাচিয়ে রাখার পদ্ধতি) বানিয়ে রেখেছ হলুদ রঙের সুতা। এখন সুতা দুই ঠোঁটের ভিতর কায়দা করে নিয়ে, ঠোঁটে লেগে থাকা আঠাল ছাপে শক্ত করে কাঁথা সিলাবার জংধরা একখান সুইয়ের পিছনে ঢুকাবার চেষ্টা করতাছে। জ্যোতি কমে আসা চোখে এই কাজ করা কঠিন। সুতা ঢুকলো কী ঢুকলো না বুঝাই যায় না। আসল জায়গায় না ঢুকে পাশ দিয়ে চলে যায় সুতা। লোকে মনে করে ঠিক জায়গায়ই ঢুকেছে। খুশি মনে সুতার আগায় টান দিতে গিয়ে বেকুব হয়ে যায়। হামিদাও দুই তিনবার হল। ফলে মেজাজটা খারাপ, ঠিক তখনই দবিরের কথা।

রুক্ষ গলায় হামিদা বলল, হারিকেন না আঙ্গাইয়া কেতা সিলাইতে বহন যায়নি!

দবির অবাক হল। ক্যা, বহন যাইবো না ক্যা?

জায়গা মতন সুতার অগা ঠিক তখনই ঢুকাল হামিদা। কাজটা করতে পেরে মেজাজ ভাল হল। কাঠিম থেকে অনেকখানি সুতা বের করে দাঁতে সেই সুতা কেটে হারিকেনের পাশে কাঁথা ফেলে মন দিয়ে তালি দিতে লাগল। স্বামীর দিকে তাকাল না। সরল গলায় বলল, কুপি আঙ্গাইয়া কেতা সিলাইতে বইলে কুনসুম না কুনসুম কেতায় আগুন লাইগ্যা যায়। কেতা সিলানের সময় অন্যমিহি খ্যাল থাকে না মাইনষের।

তামাক টানতে টানতে মাথা নাড়ল দবির। হ ঠিক কথা।

তারপরই যেন চকিতে শোয়া মেয়েটার কথা মনে পড়ল দবিরের। শুয়ে পড়ার পর থেকেই সাড়া নাই। এত তাড়াতাড়ি ঘুমাইয়া গেল!

গলা উঁচু করে নূরজাহানের দিকে একবার তাকাল দবির। তাকিয়েই বুঝে গেল ঘুমে কাদা হয়ে গেছে মেয়ে। দুনিয়াদারির খবর নাই।

দবিরের গলা উঁচু করাটা হঠাৎ করেই দেখতে পেল হামিদা। কথায় আর একটা ফোর (উঁচ ঢুকিয়ে টেনে বের করা) দিতে গেছে, না দিয়ে বলল, কী দেখলা?

নূরজাহানরে দেখলাম। হোয়নের লগে লগে ঘুমাইয়া গেছে!

ঘুমাইবো না! যেই দৌড়াদৌড়ি করে হারাদিন! মাইয়াডা যত ডাঙ্গর অইতাছে হেত বেবাইন্না (বেয়াড়া) অইতাছে। এই মাইয়ার কপালে দুক্কু আছে।

দবির একটু রাগল। রোজ রোজ এক প্যাচাইল পাইড়ো না তো! দুক্কু কপালে থাকলে কেঐ খনডাইতে পারবো না।

চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাল হামিদা। মাইয়া লইয়া কোনও কথা কইলে এমুন ছ্যাত কইরা ওডো ক্যা?

উড়ুম না? একটা মাত্র মাইয়া আমার!

এক মাইয়া যার বারো ভেজাল তার। ডাকের (প্রচলিত) কথা।

থোও তোমার ডাকের কথা। ভেজাল অইলে অইবো। আমার মাইয়া আমি বুজুম।

তারপর কেউ কোনও কথা বলে না। হামিদা কাঁথা সেলাই করে, তালি দেয় আর দবির তামাক টানতে টানতে উদাস হয়ে তাকায় বাইরের দিকে।

দুয়ার বরাবর, বাড়ির পুবদিকে, রান্নাচালা আর ছাপড়া ঘরটার পিছনে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের মাথায় কখন উঠেছে কুমড়ার ফালির মতন চাঁদ। আসি আসি করা শীতের কুয়াশা শেষ বিকাল থেকেই নাড়ার ধুমার মতো জমেছিল চারদিকে। সন্ধ্যার অন্ধকারে অনেকক্ষণ দেখা যায় নাই সেই কুয়াশা। এখন চাঁদের মৃদু আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। শিউলি ফুলের পাপড়ির মতো কোমল জ্যোৎস্না আর মাকড়শার জালের মতো মোলায়েম কুয়াশার মিশেলে তৈরি হয়েছে অপার্থিব এক আলো। এই আলো ছুঁয়ে বইছে উত্তরের হাওয়া। গভীর দুঃখ বেদনায় দীর্ণ হওয়া মায়ের নিঃশব্দ কান্নার মতো প্রকৃতির গাল চুঁইয়ে পড়ছে শিশির।

হাওয়া মৃদু হলেও বাঁশের পাতা এবং ডগায় শন শন শব্দ হচ্ছিল। সেই শব্দ কেন যে শুনতে পায় না দবির! তামাক টানতে টানতে বাইরে তাকিয়ে হঠাৎ করেই তার মনে হল এই সুন্দর নিঝুম প্রকৃতিকে বিরক্ত করতাছে তার হুঁকার শব্দ। প্রকৃতির মাধুর্য নষ্ট করে দিচ্ছে। ভেঙে খান খান করতাছে মূল্যবান নৈশব্দ। লগে লগে হুঁকা থেকে মুখ সরাল দবির। এক হাতে হুঁকা ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল বাঁশঝাড়ের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনের ভিতরটা কেমন যেন হয়ে গেল তার, কানের ভিতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। বাঁশঝাড়ের মাথা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া উত্তরের হাওয়ায় দবির গাছি শুনতে পেল। ঝোড়া খাজুরগাছের মাথা বরাবর তার পেতে আসা হাঁড়িতে টুপ টুপ করে ঝরছে প্রকৃতির অন্তর থেকে টেনে তোলা রস।

এই রস কি খাজুরের নাকি প্রকৃতির বুক নিংড়ানো অলৌকিক কোনও তৃষ্ণার! এই রস কি খাজুরের নাকি দূর নক্ষত্রলোক থেকে পৃথিবীর মতো বিশাল, উন্মুখ একখানা হাঁড়িতে এসে পড়ছে সৃষ্টিকর্তার মহান করুণাধারা! সেই ধারায় চিরকালের তরে তৃষ্ণা মিটছে এই পৃথিবীর তৃষ্ণার্ত, অভাজন মানুষের।

দবির গাছি কোন রস পতনের শব্দ পায়!

অনেকক্ষণ নিঝুম হয়ে আছে দবির, তার হুঁকার শব্দ পাওয়া যায় না দেখে কাঁথা সিলাতে সিলাতে স্বামীর দিকে তাকাল হামিদা। তাকিয়ে অবাক হল। একহাতে হুঁকা ধরে এমন করে বাইরের দিকে তাকিয়ে কী দেখছে দবির!

হামিদা বলল, ও নূরজাহানের বাপ কী দেহো বাইরে?

থতমত খেয়ে হামিদার দিকে মুখ ফিরাল দবির। ফ্যাল ফ্যাল করে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথা বলল না।

হামিদার ভুরু কুঁচকে গেল। কী অইছে?

এবার যেন কথা কানে গেল দবিরের। বলল, কী কও?

তুমি হোনো নাই কী কইছি?

না।

ক্যা?

কইতে পারি না!

কইতে পারবা না ক্যা? কী অইছে তোমার? এত কাছে বইয়াও আমার কথা হোনতাছো না! কী দেখতাছিলা বাইরে?

কিছু না।

তয়?

ঝোড়া খাজুরের রস ঝরছে হাঁড়িতে, তার টুপ টুপ শব্দ, সেই শব্দের সূত্র ধরে দূর কোনও অচিনলোকের ইঙ্গিত, এসব হামিদাকে খুলে বলল দবির। শুনে দিশাহারা হয়ে গেল হামিদা। কাঁথা সেলাই শেষ না করেই উঠল। দাঁতে সুতা কেটে কাঁথা থেকে সরিয়ে আনল সুই। কথায় বেশ একটা ঝাড়া দিয়ে সেই কথা যত্নে মেলে দিল ঘুমন্ত নূরজাহানের গায়ে। দবিরের দিকে তাকিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি দুয়ার দেও। রাইত অইছে। হুইয়া পড়ো।

দরজার একপাশে হুঁকা রেখে দরজা বন্ধ করল দবির, হোগলায় এসে বসল।

চকি থেকে নামিয়ে দবিরের বালিশ হোগলায় রেখেছে হামিদা। একখান কাঁথাও রেখেছে। রাতে একটু একটু শীত পড়ছে দুইদিন ধরে। কাঁথা না হলে চলে না।

কিন্তু দবির এমন চুপচাপ হয়ে আছে কেন? কথা বলছে না, শুয়ে পড়ছে না! কেমন বিহ্বল হয়ে বসে আছে! ব্যাপার কী?

হামিদার কী রকম ভয় ভয় করতে লাগল। হারিকেন নিভিয়ে নূরজাহানের পাশে শুয়ে পড়ল সে। শুয়েই বলল, নূরজাহানের বাপ হুইছো?

অন্ধকার মেঝে থেকে দবির বলল, না।

ক্যা?

ঘুম আহে না। খালি খাজুরগাছের কথা মনে অয়, রসের কথা মনে অয়। কানে হোনতাছি খালি রস পড়নের আওজ। টুপ টুপ, টুপ টুপ।

শীতের দিন আইলে এমুন অয় তোমার। এইডা কইলাম ভাল না। খাজুরগাছ, রস এই হগল কইলাম জোয়াইরা বোয়ালের লাহান। রাইত দুইফরে লোভ দেহাইয়া ডাইক্কা বিলে লইয়া যায় মাইনষেরে। পাইনতে ডুবাইয়া মারে। হেই মাছের ডাক মনের ভিতরে থিকা হোনে যেই মাইনষে হেয় কইলাম রাইত দোফরে ঘর থিকা বাইর অইয়া দেহে বিয়ান অইয়া গেছে। আসলে মাইট্টা জোচনায় রাইত দোফররে বিয়ান মনে অয়। তোমার নমুনা কইলাম অমুন দেকতাছি। রসের আশায় রাইত দুইফরে কইলাম ঘর থিকা বাইর অইয়া যাইয়ো না! ফয়জরের আয়জান অইবো, আমারে ডাক দিবা তারবাদে ঘর থিকা বাইর অইবা। মিয়ার ছাড়া কইলাম ভাল না। গলায় টিবিদা (টিপ দিয়ে) মাইরা খাজুর গাছের আগায় উডাইয়া রাখবো। সাবদান।

হামিদার কথা কিছুই কানে যাচ্ছে না দবিরের। অন্ধকার ঘরে তখনও হোগলায় বসে আছে সে। মেয়ের পাশে শুয়ে কথা বলে যাচ্ছে হামিদা আর দবির গাছি শুনছে টুপ টুপ শব্দে চারপাশের গ্রামের প্রতিটি খাজুরগাছ থেকে মাটির হাড়িতে ঝরছে রস। ঝরে ঝরে পূর্ণ করে তুলছে হাড়ি। ভোরবেলার একলা তৃষ্ণার্ত শালিখ পাখি হাড়ির মুখে বসে ঠোঁট ডুবাচ্ছে রসে। তৃষ্ণা নিবারণ করতাছে।

.

১.২৩

ছনুবুড়ির ঘুম ভাঙল রাত দুপুরে।

চাঁদ তখন ম্লান হতে শুরু করেছে। গ্রামের গাছপালা চকমাঠ খাল পুকুর আর মানুষের বসতভিটায় অলস ভঙ্গিতে পড়েছে দুধের সরের মতো কুয়াশা। জ্যোৎস্নার রঙ হয়েছে টাটকিনি মাছের মতো, কুয়াশার রঙ যেন বহুদিন থানবন্দি থাকা কাফনের কাপড়। রাত দুপুরের নির্জন প্রকৃতি, মেদিনীমণ্ডল গ্রামখানি ধরেছে অলৌকিক এক রূপ। শীত রাত্রির বুকপিঠ ছুঁয়ে হু হু, হু হু করে বইছে উত্তরের হাওয়া। উত্তরের কোন অচিনলোকে জন্ম এই হাওয়ার, মানুষের কল্যাণে কে পাঠায় হাওয়াখানি মানুষ তা জানে না।

রাত দুপুরের এই হাওয়ায় ছনুবুড়ির গা কাঁটা দিল না, প্রবল শীতে শরীরের অজান্তে কুঁকড়ে এল না শরীর। বুকটা কেমন আইঢাই করে উঠল, তৃষ্ণায় ফেটে যেতে চাইল গলা।

এরকম শীতের রাতে কার পায় এমন তৃষ্ণা! ঘুম ভাঙার পর কার বুক করে এমন আইঢাই!

ছনুবুড়ি বুঝতে পারল না এমন লাগছে কেন তার। ছানিপড়া ঘোলা চোখে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক তাকাতে লাগল।

ঘরের ভিতর গাঢ় হতে পারেনি অন্ধকার। চারদিকে আছে বাঁশের বেড়া। ঘর তোলার পর ছইয়াল (বাঁশের কাজ করে যারা) ডেকে কখনও সারাই করা হয়নি। বৃষ্টি বাদলায় খেয়েছে যা, গোপনে সময় নামের খাদক খেয়েছে তারচেয়ে বেশি। ফলে বেড়াগুলি এত জীর্ণ, এত নড়বড়া, না রোদ জ্যোৎস্না আটকাতে পারে, না বৃষ্টি বাতাস।

আজ রাতে জ্যোৎস্না ঢুকেছে চারদিক দিয়ে আর হাওয়া ঢুকছে শুধু উত্তর দিক দিয়ে। ছনুবুড়ি শুয়েছে উত্তরের বেডা বরাবর মুখ করে। হাওয়ার ঝাপটা সরাসরি এসে লাগছে তার মুখে।

ছনুবুড়ির পিঠের তলায়, মাটিতে পাতলা করে বিছানো আছে ডাটি। (ধানের ছড়া কেটে নেওয়ার পর দুটো অংশ হয় খড়ের। আকাশ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে যে অংশ তাকে বলে ডাটি। ডগা অর্থে। আর কাদা মাটিতে লেপটে থাকে যে অংশ তা হচ্ছে নাড়া। নাড়া ব্যবহার করা হয় রান্নার কাজে। ডাটি দিয়ে গরিব গৃহস্ত ঘর গোহালের বেডা তৈরি করে। শীতকালে পিঠের তলায় বিছিয়ে শোয়) তার উপর পুরানা ছেঁড়া একখানা হোগলা। হোগলার উপর মোটা ভারী, বেশ বড় একটা কাঁথা। কত জায়গায় যে ছিঁড়ে ঝুল বেরিয়েছে কাঁথার, ইয়ত্তা নাই। এই কথাখানা দুইভাগে ভাঁজ করে শোয়ার সময় ভিতরে ঢুকে যায় ছনুবুড়ি। এক কাজে দুইকাজ হয়। যে কাঁথা গায়ে সেই কথাই বিছানায়। তাতেই কী শীত মানে (নিবারণ)? মানে না। ডাটি হোগলা কাঁথা এই তিন শত্রু কাবু করে পাতাল থেকে ঠেলে ওঠে অদ্ভুত এক হিমভাব। উঠে সুঁচ ফুটাবার মতো ফুটা করে রোমকূপ। শরীরের ভিতর দখল নেয়। এদিকে শূন্যে আছে উত্তরের হাওয়া, কুয়াশা শিশির। সব মিলিয়ে শীতকালটা বড় কষ্টের। যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয়। বয়সের ভারে নত হওয়া মানুষ কত পারে যুদ্ধ করতে! ফলে মৃত্যুটা তাদের শীতকালেই হয় বেশি। শীতের মুখে মুখে গ্রামাঞ্চলের বুড়ারা তাই প্রমাদ গোনে। এই শীতটা পার করতে পারলে আর একটা বছর বেঁচে থাকা যাবে। বুড়াদের জন্য শীত যেন এক মৃত্যুদূত। আজরাইল ফেরেশতা। ঘাড়ের ওপর এসে দাঁড়িয়েই থাকে। এদিক ওদিক হলেই জান কবচ করবে, উদিস পাওয়া যাবে না।

ছনুবুড়ির হচ্ছে উল্টা। না মাটির হিমভার না উত্তরের হাওয়া, আজকের এই রাত দুপুরে কোনওটাই গায়ে লাগল না তার বুকের ভিতর অচেনা অনুভূতি তো আছেই, কলিজা আর কণ্ঠনালী ফেটে যাচ্ছে প্রবল তৃষ্ণায়। তার ওপর হচ্ছে ভয়াবহ এক উষ্ণভাব। যেন পাতাল থেকে উঠে তার দীর্ঘকাল অতিক্রম করে আসা দেহে রোমকূপ ফুটা করে ঢুকছে অচেনা এক তুসের আগুন। উত্তরের হাওয়ায় একটুও নাই শীতভাব। খালিকালের কোনও কোনও দুপুরে দূর প্রান্তর অতিক্রম করে আসে এক ধরনের উষ্ণ হাওয়া, সেই হাওয়ায় গায়ের কাপড় ফেলে দিতে ইচ্ছা করে মানুষের, লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে পুকুরের পানিতে, উত্তরের হাওয়াটা এখন তেমন লাগছে ছনুবুড়ির। মাটির গর্তে বদনার নল দিয়ে গরম পানি ঢেলে দেওয়ার পর যেমন ছটফট করে বেরিয়ে আসে তুরখোলা ঠিক তেমন করে কাঁথা থেকে বের হল সে। কাঁথার সঙ্গে শরীর থেকে যে খসে গেছে চামড়ার মতো লেগে থাকা মাটি রঙের থান, ছনুবুড়ি তা টের পেল না। শরীরে এমন এক উষ্ণভাব, ছনুবুড়ির ইচ্ছা করে শীতন্দ্রিা থেকে বেরিয়ে আসার পর সাপ যেমন করে তার ছুলুম (খোলস) বদলায় তেমন করে শরীর থেকে খুলে ফেলে বহু বর্ষা বসন্তের সাক্ষী ঝুলঝুলা চামড়া। শরীর শীতল করে। আর একটা আশ্চর্য কাণ্ড আজকের এই রাত দুপুরে নিজের অজান্তেই করে ফেলে ছনুবুড়ি। শিরদাঁড়া সোজা করে যৌবনবতী কন্যার। মতো মাথা তুলে দাঁড়ায়। কতকাল আগে দেহ তার বেঁকে গিয়েছিল মাটির দিকে, সেই দেহ আর সোজা হয়নি। দেহ হয়েছিল নরমকঞ্চির ছিপ। সেই ছিপের অদৃশ্য বড়শিতে গাঁথা পড়েছিল মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা বিরাট এক মাছ। বহুকাল ধরে সেই মাছ ছনুবুড়িকে টেনে রেখেছিল মাটির দিকে। সোজা হতে দেয়নি। আজ বুঝি মাছ গেছে আনমনা হয়ে গেছে। সেই ফাঁকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে ছনুবুড়ি। দাঁড়াবার পর বহুকালের চেনা এই ঘর হঠাৎ করেই অচেনা লাগে তার চোখে। ছানিপড়া চোখে পরিস্কার দেখা যায় না সবকিছু। ছনুবুড়ির চারপাশে ছড়ানো আছে গিরস্থের কত না দীনহীন স্থাবর, দরকারে অদরকারে এই ঘরে এসে জড় হয়েছে কত না হাঁড়িকুড়ি, কত ঘটিবাটি। একপাশে লোটে মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছনুবুড়ির বয়সের কাছাকাছি বয়সের ঢেঁকি। ঢেঁকির পায়ের কাছে দুইজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পাড় দিতে পারে এমন একটা ভিত। ভিতের ঠিক উপরে বাতার সঙ্গে ঝুলছে মোটা দড়ির আংটা। ধানবানার সময় এই আংটা ধরে দাঁড়ায় বাড়ির বউঝিরা। তালে তালে ধান বানে, মনের সুখে গান গায় ‘ও ধান বানি রে, ঢেঁকিতে পাহার দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া’।

ঢেঁকির দিকে তাকিয়ে ঘরের ভিতরকার এই একটা মাত্র জিনিস পরিষ্কার চিনতে পারল ছনুবুড়ি। আশ্চর্য এক অনুভূতি হল। ছনুবুড়ি টের পেল তার দেহ আর মানুষের দেহ নাই, দেহ তার মরা কাঠের ঢেঁকি হয়ে গেছে। কারা যেন দুইজন অদৃশ্যে থেকে তার দেহঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে। ধুপ ধুপ, ধুপ ধুপ। পাড়ে পাড়ে ললাটে মুখ থুবড়ে পড়ছে সে। সেই ললাটে ধানের মতো খোলসমুক্ত হচ্ছে ছনুবুড়ির জীবন।

তারপর আবার সেই কলিজাফাটা তৃষ্ণা টের পেল ছনুবুড়ি। মনে হল কোনও পুকুরে নেমে উবু হয়ে, আঁজলা ভরে পানি তুলে জীবন ভর খেলেও এই তৃষ্ণা মিটবে না। পানি খেতে হবে পুকুরে মুখ ডুবিয়ে। এমন চুমুক দিবে পানিতে, এক চুমুকে পুকুর হবে পানিশূন্য তবু তৃষ্ণা মিটবে না ছনুবুড়ির।

ছনুবুড়ি তারপর পাগলের মতো হাঁড়ি মালসা হাতাতে লাগল, ঘটিবাটি হাতাতে লাগল। একটু পানি, একটু পানি কি নাই, কোথাও! ভুল করেও কি কেউ একটু পানি রাখে নাই কোনও হাঁড়িতে!

ছনুবুড়ির ইচ্ছা হল গলার সবটুকু জোর একত্র করে চিৎকারে চিৎকারে দুনিয়াদারি কাঁপিয়ে তোলে, পানি দেও, আমারে ইট্টু পানি দেও। আমার বড় তিয়াস লাগছে।

এক সময় একটা হাড়িতে সামান্য একটু পানি ছনুবুড়ি পেল। দুইহাতে সেই হাঁড়ি তুলে মুখে উপুড় করল সে! দিকপাশ ভাবল না।

কিন্তু এ কেমন পানি? এ কোন দুনিয়ার পানি পানি কি এমন হয়! গলা দিয়ে যে নামতেই চায় না! এ কেমন পানি!

ঠিক তখনই মাটির তলায় লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য আনমনা মাছ মনস্ক হয়। প্রবল বেগে দিকবিদিক ছুটতে শুরু করে। ফলে আচমকা এমন টান লাগলো ছনুবুড়ির দেহে, বহুকাল মাটিমুখি ঝুঁকে থাকা দেহ তার কঞ্চির ছিপের মতো ভেঙে যায়।

ছনুবুড়ি মুখ থুবড়ে পড়ে।

আকাশের চাঁদ তখন মাত্র হাঁটতে শিখেছে এমন শিশুর মতো অতিক্রম করেছে কয়েক পা, জ্যোৎস্না হয়েছে আরেকটু স্নান। কুয়াশা যেন মুর্দারের কাফন। থান খুলে সেই কাফনে কে যেন ঢেকে দিয়েছে দুনিয়া, ছনুবুড়ির পর্ণকুট্টির। এই কাফন পেরিয়ে বয়ে যাওয়ার সাধ্য নাই হাওয়ার। ফলে হাওয়া হয়েছে স্তব্ধ।

গাছের পাতায় পাতায়, লতাগুল্ম এবং ঘাসের ডগায় ডগায় তখন ঝরছিল নিশিবেলার অবোধ শিশির। গ্রাম গিরস্থের খাজুরগাছ হাঁড়ি পূর্ণ করছিল বুক নিংড়ানো মধুর রসে।

.

১.২৪

মিয়াদের ছাড়াবাড়ির কাচির (কাস্তে) মতো বেঁকা খেজুরগাছটার গলার কাছে তাবিচের মতো বাঁধা হাঁড়ির মুখে বসে একটা বুলবুলি পাখি ঠোঁট ডুবাচ্ছে রসে। শীত সকালের সূর্য পুব আকাশ উজ্জ্বল করেছে খানিক আগে। এখন গাছপালার বনে, শস্যের চকমাঠ আর খাল পুকুরে, ঘাসের ডগায় আর মানুষের উঠান পালানে ছড়িয়ে যাচ্ছে রোদ। কুয়াশা উধাও হয়েছে কোন ফাঁকে। প্রকৃতির নিঃশব্দ কান্নার মতো ঝরেছে যে শিশির, সেই শিশির এখনও সিক্ত করে রেখেছে চারদিক। সারারাত আশ্চর্য এক শীতলতা উঠেছে মাটি থেকে, ঘাসবন আর গাছপালা থেকে, খাল পুকুর আর মানুষের ঘরবাড়ি থেকে। পাখির ডানার তলায় লুকিয়ে থাকার মতো রোদের উষ্ণতা এখনও ছড়াতে পারেনি চারদিকে। তবে শিশিরসিক্ত গ্রামখানি রোদে আলোয় ঝকমক ঝকমক করতাছে। যেন বা এই মাত্র স্বামীর সংসার থেকে পালকি চড়ে বাপের বাড়ি আসছে কোনও গৃহস্থ বউ, পালকি থেকে নেমে বহুকাল পর মা-বাবা ভাই বোনকে দেখে গভীর আনন্দে হাসছে, তার সেই হাসির দ্যুতি মোহময় এক আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে।

ভার কাঁধে দবির গাছি বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ফজরের আজানের পর। ভারের দুই দিকে দুইটা দুইটা করে চারটা মাটির ঠিলা। এক ঠিলার মুখে এলুমিনিয়ামের বড় একটা মগ। যে যে বাড়িতে গাছ ঝুড়েছে দবির সেই সেই বাড়িতে গিয়ে গাছের গলা থেকে খুলবে হাঁড়ি। হাঁড়ির অর্ধেক রস দিবে গিরস্তকে বাকি অর্ধেক ঢালবে নিজের ঠিলায়। এই ভাবে এক সময় কানায় কানায় ভরবে চারটা ঠিলা, দবির রস বেচতে বের হবে।

আজ প্রথম দিন। বাড়ি থেকে বেরিয়েই দবির গেছে হালদার বাড়িতে। মজনুদের চারটা গাছ ঝুড়েছে, সেই সব গাছের রস নামিয়েছে। রস তেমন পড়ে নাই। কোনও হাঁড়িরই বুক ছাড়িয়ে ওঠেনি। তবু সেই রস নিয়ে মজনুর খালা মরনির কী আগ্রহ। দবির পৌঁছাবার আগেই ঘুম থেকে উঠে বালতি হাতে খাজুরতলায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভাগের রস বুঝে নেওয়ার পর ডাকাডাকি করে তুলেছে মজনুকে। ও মজনু মজনু, ওট বাজান, রস খা। দেখ কেমুন রস পড়ছে! কেমুন মিড়া রস!

নিজে তখনও মুখে দেয়নি রস তবু বলছে মিষ্টি রস। শুনে হেসেছে দবির। ঠাট্টার গলায় বলেছে, ও মরনি বুজি, তুমি তো অহনরি রস মুখে দেও নাই, মুখে না দিয়া কেমতে কইতাছো মিডা রস?

দবিরের দিকে তাকিয়ে মরনিও হেসেছে। আমগো গাছের রস মিডাই অয় গাছি। আমি জানি।

সব বচ্ছর রস কইলাম এক রকম মিডা অয় না। এহেক বচ্ছর এহেক রকম অয়। এইডা অইলো মাডির খেইল। মাড়ি যেই বচ্ছর আমোদে থাকে, খাজুরের রস, আউখের রস হেই বচ্ছর খুব মিডা অয়। আর মাডি যদি ব্যাজার থাকে তাইলে রস অয় চুকা (টক)।

একটু থেমে হাতের কাজ করতে করতেই দবির বলেছে, তুমি ইট্টু মুখেদা দেহ না বুজি রস এই বচ্ছর কেমুন মিডা!

মরনি লাজুক হেসে বলল, না। পোলা আছে বাইত্তে, অরে আগে না খাওয়াইয়া গাছের রস আমি মুখে দিতে পারি না।

শুনে এত মুগ্ধ হল দবির, কয়েক পলক মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাসিমুখে প্রত্যেকটা গাছের গলায় হাঁড়ি ঝুলাল, যত্ন করে ভার তুলল কাঁধে। যাই বুজি, বিয়ালে তো দেহা অইবোঐ।

মরনি বলল, যাওন নাই। তয় আমার বাড়ির রস আপনে ইট্টু মুখে দিলে পারতেন। রসটা কেমুন পড়ল বোজতাম।

ঠিক তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে এল মজনু। চোখে ঘুম লেগে আছে। এক হাতে চোখ ডলছে। মজনুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে দবির বলল, ঐ যে তোমার বইনপো উটছে। অরে খাওয়াও। আমি একজন মাইনষেরে কথা দিছি, তারে রস না খাওয়াইয়া নিজে মুখে দিমু না।

কারে কথা দিছেন? মাইয়ারে?

না গো বুজি, আছে আরেকজন। বিয়ালে কমুনে তোমারে।

ভার কাঁধে দ্রুত হেঁটে দবির তারপর চকে নেমেছে। এই সময় হাঁটার গতি এত বাড়ে দবির গাছির, যেন হাঁটে না,সে দৌড়ায়। কাঁধে রসের ভার থাকার ফলে পালকির বেহারাদের মতো মুখ দিয়ে তার হুমহাম শব্দ বের হয়। তীব্র শীতের সকালেও গায়ে থাকে না সুতার তেনাটি (জামা অর্থে)। গা ভিজা থাকে জ্যাবজ্যাবা ঘামে। এই বছরের শীতের প্রথম দিন আজ। রসের প্রথম দিন। পরিশ্রমটা আজ বেশিই যাবে দবির গাছির। কয়েক দিন গেলে এই পরিশ্রম আর গায়ে লাগবো না। সয়ে যাবে। শরীরের নাম মহাশয়, যাহা সহাবেন তাহাই সয়।

ভোরবেলার দেশ গ্রাম তখনও জেগে ওঠেনি। চারদিক ডুবে আছে কুয়াশায়। খোলা চকমাঠ, ছাড়াবাড়ির গাছপালার আড়াল আর গিরস্তবাড়ির কোণাকানছিতে (আনাচ কানাচে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার একটু একটু করে সরছে। পায়ের তলার মাটি আড়মোড় ভাঙছে। এই মাটির ওপর দিয়ে ভার কাঁধে ছুটে যায় এক মাটির সন্তান। এইবাড়ি যায় ওইবাড়ি যায়, রসের নেশায় মাতাল হয়ে খাজুরগাছে চড়ে, হাঁড়ি নামায়। দুনিয়ার আর কোনওদিকে খেয়াল থাকে না তার।

মিয়াদের ছাড়াবাড়ির কাছাকাছি আসতেই রোদ উঠে গেল। রোদের আলোয় দূর থেকে বেঁকা গাছটার হাঁড়িতে বুলবুলি পাখিটাকে রসে ঠোঁট ডুবাতে দেখল দবির। দেখে গভীর আনন্দে বুক ভরে গেল। পয়লা দিনই এত রস পড়ছে! গলা তরি ভরছে ঠিল্লা! এই গাছের পা ছুঁয়ে যে দয়া চেয়েছিল দবির গাছ তা হলে সেই দয়া করেছে।

বুক ভরে শ্বাস নিল দবির। গাছটাকে বলল, মা মাগো, আল্লায় তোমারে বাচাইয়া রাখুক মা। রোজ কিয়ামতের আগতরি বাইচ্চা থাকো তুমি।

দ্রুত হেঁটে খাজুরতলায় এল দবির। এসেই আলফুকে দেখতে পেল খাজুরতলায়। বসে বিড়ি টানহে। পায়ের কাছে কাত হয়ে পড়ে আছে পিতলের বড় কলসি। দবিরকে দেখে হাসল। এত দেরি করলা ক্যা গাছি?

কাঁধের ভার নামিয়ে দবির বলল, বেবাক কাম সাইরা তার বাদে আইলাম। তুই আইছস কুনসুম?

আর কইয়ো না, বিয়াইন্না রাইত্রে কুট্টিরে দিয়া ডাক পারন শুরু করতাছে বুজানে। রসের চিন্তায় রাইত্রে মনে অয় ঘুমাইতে পারে নাই।

বুজান অহনতরি ঢাকা যায় নাই?

না। রস না খাইয়া যাইবো নি?

এত রস কাঁচা খাইবো?

পাগল অইছো! দুনিয়ার কিরপিন মানুষ। নিজে একলা আদা (আধা) গেলাস খাইয়া বেবাক রস কুট্টিরে দিয়া জ্বাল দেওয়াইবো। তোয়াক (গুড় করার আগের অবস্থাটিকে বলা হয়। আসলে তরল গুড়) কইরা রাখবো। পয়লা পয়লা কহেক বতল তোয়াক বানাইবো তার বাদে বানাইবো খালি মিডাই। শীতের দিনে কুট্টির খালি এই কাম। আর আমার আইয়া কলস লইয়া বইয়া থাকতে অইবো খাজুরতলায়।

দবির আর কথা বলল না। বেঁকা গাছটার পায়ের কাছে হাত দিয়ে সালাম করল তারপর তড়তড় করে উঠে গেল গাছে। বুলবুলি পাখিটা তখন আর নাই। কোন ফাঁকে উড়ে গেছে।

এই বাড়ির কাজ সারতে সারতে বেলা আরও খানিকটা বাড়ল। প্রথম দিন হিসাবে রস ভালই পড়েছে। আলফুর কলসি প্রায় ভরে গেছে। দবিরের চারখান ঠিলা পুরা ভরেনি। তবু মন প্রফুল্ল তার। মনে মনে গাছগুলিকে শুকরিয়া জানিয়ে ভার কাঁধে তুলল।

আলফু বেশ কায়দা করে নিজের কলসিটা কাঁধে নিয়েছে। বাড়িমুখি হাঁটতে হাঁটতে বলল, কই যাইবা গাছি?

দবির বলল, যামু এক জাগায়। পয়লা দিনের রস একজন মানুষরে খাওয়ান লাগবো।

.

১.২৫

বড় ঘরের সামনে, মাটিতে হাত পা ছড়িয়ে বসে বিলাপ করতাছে বানেছা। এভাবে ছড়িয়ে বসার ফলে তার সাত সোয়াসাত মাসের পেট ডিমআলা বোয়াল মাছের পেটের মতো বেঢপ হয়ে আছে। থেকে থেকে বুক চাপড়াচ্ছে সে, মাটি চাপড়াচ্ছে। প্রায়ই তার বুক থেকে, পেট থেকে সরে যাচ্ছে শাড়ি। ইচ্ছা করেই যেন তা খেয়াল করতাছে না সে। বিলাপ করে কাঁদছে ঠিকই তবে চোখে একফোঁটা পানি নাই।

অদূরে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আজিজ, চোখে নিঃশব্দ কান্না। তার হাতের কাছে রাখা আছে তামা পিতলের ভার। ভার কাঁধে সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়েছিল, রোজকার মতো গাওয়ালে যাবে, যাওয়া হয়নি। তার আগেই হামেদ দৌড়ে এসে বলল, বাবা ও বাবা, দাদী দিহি ল্যাংটা অইয়া পইড়া রইছে।

শুনে চমকে উঠেছে আজিজ। কোনহানে?

ঐ ঘরে, মুখের সামনে কাইত অইয়া রইছে মাইট্টা তেলের হাড়ি।

কচ কী?

হ।

ল তো দেহি।

উঠানের কোণে ভার নামিয়ে ঢেঁকিঘরে গিয়ে ঢুকেছে আজিজ। ঢুকে দেখে মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে ছনুবুড়ি। গায়ে কাপড় নাই। একপাশে পড়ে আছে তার বিছানা আর ছেঁড়াকাঁথা। ছনুবুড়ির মুখের কাছে কাত হয়ে পড়ে আছে মাইট্টাতেলের হাঁড়িটা। একফোটা তেলও নাই হাঁড়িতে। বড় ঘরের পশ্চিম উত্তর কোণার খাম ঘুণে ধরছে। একদিন গাওয়ালে না গিয়া খামে মাইট্টাতেল লাগারে আজিজ এই ভেবে কোলাপাড়া বাজার থেকে দুই তিনদিন আগে তেলটা কিনে এনেছিল। সেই তেল ফেলে দিয়েছে ছনুবুড়ি ভেবে প্রথমে খুব রেগে গেল আজিজ। রেগে গেলে দাঁতে কটমট শব্দ হয় তার। সেই শব্দ করে চাপা গলায় বলল, ওমা, কেন ঘুমান ঘুমাও? শইল্লে কাপোড় থাকে না, পোলাপানে আইয়া ল্যাংটা দেহে, শরম করে না তোমার! তেলের হাড়িডা হালায় দিছো! পাশসিকার (পাঁচসিকা) মাইট্টাতেল কিন্না আনলাম পশশু, বেবাকটি হালায় দিলা! কেমুন ঘুমান ঘুমাও!

ছনুবুড়ি কথা বলে না। নড়ে না।

আজিজের এতকথা শুনেও কথা বলছে না ছনুবুড়ি এরচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা হতে পারে না। আজিজ খুবই অবাক হল। এই প্রথম মনের ভিতর কামড়টা দিল তার। হাঁটু ভেঙে ছনুবুড়ির সামনে বসল। মায়ের খোলা পিঠে হাত ছোঁয়াল। ছুঁইয়ে চমকে উঠল। যেন শীতকালের কচুরিভরা পুকুরের পানিতে হাত দিয়েছে।

ছনুবুড়ির ঘরের সামনে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে বানেছা। কোলে লেপটে আছে ছোট বাচ্চাটা। দুইহাত দিয়ে ধরে মায়ের বাদিককার বুক চুষছে। অন্য ছেলেমেয়েগুলি আছে তার দুইপাশে।

ছনুবুড়িকে ছুঁয়ে দিয়েই ফ্যাল ফ্যাল করে বানেছার মুখের দিকে তাকাল আজিজ। বানেছা খসখসা গলায় বলল, কী অইছে?

শইলডা মাছের লাহান ঠাণ্ডা!

শীত পড়ছে, হুইয়া রইছে ল্যাংটা অইয়া, শইল তো ঠাণ্ডা অইবোই। ডাক দেও।

ছনুবুড়িকে তারপর ধাক্কাতে লাগল আজিজ। মা ওমা, মা। ওড ওড, বেইল উইট্টা গেছে।

বুড়ির কোনও সাড়া নাই।

এবার গলা একটু চড়াল বানেছা। শইলডা আগে কাপোড় দিয়া ঢাইক্কা দেও। ল্যাংটা মার সামনে বইয়া রইছো শরম করে না তোমার?

শুনে আজিজের বাচ্চাকাচ্চারা হি হি করে হাসতে লাগল। দিশাহারা ভঙ্গিতে কাথার তলা থেকে ছনুবুড়ির কাপড় বের করে তার শরীর ঢেকে দিল আজিজ। বানেছার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বলল, আমার কেমুন জানি ডর করতাছে।

এবার বানেছাও ভুরু কুঁচকাল। মইরা গেছেনি?

হেমুনঐত্তো লাগে।

নাকি ভ্যাক ধরছে।

একথায় মেউন্না আজিজও একটু রাগল। ছোটখাট একটা ধমক দিল বানেছাকে। কী কও তুমি! ভ্যাক ধরব ক্যা! ভ্যাক ধরনের কী অইছে! শীতের দিনে খালি গায়ে হুইয়া কেঐ ভ্যাক ধরে!

আবার ছনুবুড়িকে ধাক্কাতে লাগল আজিজ। মা ওমা, মা।

স্বামীর কাণ্ড দেখে খুবই বিরক্ত হল বানেছা। আগের চেয়েও গলা চড়াল। এমুন শুরু করলা ক্যা তুমি! টাইন্না উডাও না ক্যা!

এবার দুইহাতে ছনুবুড়িকে টেনে তুলতে গেল আজিজ। তুলতে গিয়ে ছেলেবেলার একটা কথা মনে পড়ল। ছেলেবেলায় আজিজের স্বভাব ছিল উপুড় হয়ে শোয়া। সকালবেলা উপুড় হয়ে শোয়া ছেলের দুই হাতের তলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মা তাকে চিৎ করত। আদরের গলায় বলত, ওট বাজান, ওট। বেইল উইট্টা গেছে। আর কত ঘুমাবি! আজ সেই কাজটা করতাছে আজিজ। আজ যেন সে মা আর মা হয়ে গেছে ছেলেবেলার আজিজ।

ছনুবুড়ির মুখখানা নিজের দিকে ঘুরিয়েই আঁতকে উঠল আজিজ। মুখ মাখামাখি হয়ে আছে মাইট্টাতেলে। মুখের ভিতর মাইট্টাতেল, কষ বেয়ে নেমেছে মাইট্টাতেল।

দৃশ্যটা বানেছাও দেখল। দেখে চোখ সরু করে বলল, মাইট্টাতেল খাইছেনি। পানি মনে কইরা মাইট্টাতেল খাইছে? হায় হায় করতাছে কী? মাইট্টাতেল খাইলে তো মানুষ বাঁচে না!

মাইট্টাতেলে মাখামাখি মুখখানা বিকৃত হয়ে আছে ছনুবুড়ির। ছানি পড়া ঘোলা চোখ কোটর থেকে ঠিকরে বের হতে গিয়েও বের হতে পারেনি, তার আগেই থেমে গেছে। এই চোখের দিকে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে গেল আজিজ। প্রথম চিৎকারটা তারপর আজিজই দিল। হায় হায় আমার মায় তো নাই, আমার মায় তো মইরা গেছে!

স্বামীর চিৎকার শুনে খানিক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বানেছা। তারপর নিজেও বিলাপ শুরু করল। এইডা কেমতে অইলো গো, আল্লাগো আমার! কোন ফাঁকে গেল গো, আল্লা গো আমার।

বাড়িতে এই ধরনের কাণ্ড প্রথম। বাড়ির শিশুরা কোনও মৃত্যু দেখেনি। মা বাবার মিলিত বিলাপ শুনে তারা বেশ মজা পেল। হি হি হি হি করে হাসতে লাগল। বানেছার কোলের বাচ্চাটা দুধ খাওয়া ভুলে ড্যাব ড্যাব করে তাকাতে লাগল। হামেদ ভাবল দাদীর কায়কারবার দেখে তার মা বাবা কি একলগে কোনও গান ধরল! দাদীর মতো গভীর ঘুমে ডুবে থাকা মানুষকে কি গান গেয়ে জাগাতে হয়? কয়দিন আগে গোঁসাই বাড়িতে হয়ে যাওয়া বেহুলা লখিন্দর পালায় ঘুমিয়ে থাকা লখিন্দরকে কাঁদতে কাঁদতে গান গেয়ে যেমন করে জাগাতে চেয়েছিল বেহুলা, ব্যাপারটা কি তেমন কিছু! এসব ভেবে মা বাবার সঙ্গে সেও প্রায় গলা মিলাতে গিয়েছিল, বড়বোন পরি চোখ গোরাইয়া (পাকিয়ে) তার দিকে তাকাল। হামেদের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, দাদী মইরা গেছে। এর লেইগা মায় আর বাবার এমুন করতাছে। এইডা গান না, কান্দন।

হামেদ নাকমুখ কুঁচকে বলল, দাদী মইরা গেছে, মার কী? মায় কান্দে ক্যা? মায় তো দাদীরে দুই চোক্কে দেখতে পারে না। হেদিন বউয়া খাইতে চাইছিল, দেয় নাই। দাদী মরছে মার তো তাইলে আমদ। মায় কান্দে ক্যা?

আজিজের বড়ছেলের নাম নাদের। সে বলল, মায় কান্দে আল্লাদে। দেহচ না চোক্কে পানি নাই। মাইনষেরে দেহানের লেইগা কান্দে।

শুনে বিলাপ ভুলে দুই ছেলেকে একলগে ধমক দিল বানেছা। চুপ কর। প্যাচাইল পাড়লে কিলাইয়া সিদা কইরা হালামু। মাইনষেরে দেহানের লেইগা কান্দি আমি, না?

তারপর পরির দিকে তাকিয়েছে বানেছা। আইজ রান্দন বাড়ন যাইবো না। জের থিকা মুড়ি মিডাই বাইর কইরা বেবাক ভাই বইনে মিলা খা গা। যা।

শুনে আনন্দে নেচে উঠেছে শিশুরা। যে যেমন করে পারে পরির পিছন পিছন গেছে বড়ঘরে। ওদিকে ছেলেমেয়েদের লগে কথা শেষ করে আবার বিলাপ শুরু করেছে বানেছা। মাকে জড়িয়ে ধরে আজিজের বিলাপ তো ছিলই, শীত সকালের এই বিলাপ দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছিল চারদিকে। শুনে চারপাশের বাড়িঘর থেকে গিরস্থালি ফেলে একজন দুইজন করে মানুষ আসতে লাগল এই বাড়িতে। মিয়াবাড়ি মেন্দাবাড়ি হালদারবাড়ি হাজামবাড়ি জাহিদ খাঁর বাড়ি বেপারীবাড়ি, আস্তে ধীরে প্রতিটি বাড়ির লোক এল। আজিজের বাড়ির উঠান ভরে গেল।

মেন্দাবাড়ির মোতালেবের স্বভাব হচ্ছে গ্রামের যে কোনও বাড়ির যে কোনও কাজে মাতাব্বরিটা সে তার হাতে রাখতে চায়। আজও তাই চাইল। প্রথমেই মুর্দার যে ঘরে আছে সেই ঘরে ঢুকে গেল। বিলাপ করতে থাকা আজিজকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বাইরে নিয়ে এল। কাইন্দো না কাইন্দো না! মা বাপ কেঐর চিরদিন বাইচ্চা থাকে না। আল্লার মাল আল্লায় নিছে। কাইন্দা কী আর তারে ফিরাইয়া আনতে পারবা?

উঠানে এনে তামা পিতলের ভারের সামনে আজিজকে বসিয়ে দিয়েছে মোতালেব। আবার বলেছে, কাইন্দো না কাইন্দো না। আল্লার মাল আল্লায় নিছে। অহন টেকা পয়সা দেও কোলাপাড়া বাজারে যাইগা। কাফোনের কাপোড় লইয়াহি।

রাবির জামাই মতলেবের দিকে তাকাল মোতালেব। ঐ মতলা, তুই চদরি বাড়ি যা। বাঁশ কাইট্টা আন।

ভিড়ের মধ্যে বাদলাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাবি। মানুষজন দেখে বাদলা গেছে আল্লাইন্দা (আদি) হয়ে। মায়ের কোলে চড়ে বসেছে। যেদিকের কোলে চড়েছে সেদিকটা রাবির বেঁকে গেছে। ব্যাপারটা বিন্দুমাত্র পাত্তা দিচ্ছে না রাবি। মোতালেবের দিকে তাকিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, হেয় যাইতে পারবো না, হের কাম আছে।

মোতালেব একটু থতমত খেল। তারপর নিজেকে সামাল দিয়ে বলল, মানুষ মইরা গেছে হেরে মাডি দেওনডাই অহন বড়কাম। মতলা, তুই যা তো! বাঁশ কাইট্টা দিয়া তার বাদে কামে যাইচ।

এসময় হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে এল তছি পাগলনী। মামানী বলে মইরা গেছে? কেমতে মরল, এ্যা? কেমতে মরল! হায় হায় সব্বনাশ অইছে তো!

কুট্টি বলল, মাইট্টাতেল খাইয়া মরছে।

দৌড়ে ছনুবুড়ির ঘরে ঢুকল তছি। হাউমাউ করে খানিক কাদল তারপর বড়ঘরের সামনে বসা বানেছার সামনে এসে দাঁড়াল। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল, মাইট্টা তেল তো ইচ্ছা কইরা খায় নাই, পানির পিয়াস লাগছিল, পানি মনে কইরা মাইট্টাতেল খাইছে। মরনের সমায় বহুত পিয়াস লাগে মাইনষের। আহা রে মরনের সমায় ইট্টু পানিও মুখে দিতে পারলো না!

তছির কথা শেষ হওয়ার লগে লগে দুইহাতে বুক চাপড়ে বিলাপ করে উঠল বানেছা। ইট্টু পানিও মুখেদা মরতে পারলো না গো, আল্লা গো আমার।

বানেছার বিলাপ শুনে কান্না ভুলে তছি একেবারে তেড়ে উঠল। অহন এত বিলাপ করচ ক্যা মাগী, বাইচ্চা থাকতে তো একওক্ত খাওন দেচ নাই। দূর দূর কইরা খেদাই দিছচ। তোর অইত্যাচারে চোর অইয়া গেছিলো মামানী। মাইনষের বাড়ি বাড়ি গিয়া ঘোরছে খাওনের লেইগা। অহন আল্লাদ দেহাইয়া কান্দচ তুই, না? চুপ কর, চুপ কর তুই। তোর কান্দন হোনলে শইল জ্বলে।

তছির কথা শুনে বানেছা আর লোকজন যারা এসেছে তারা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। কুট্টি মুখে আঁচল চেপে হাসতে লাগল। এখনই বানেছা আর তছির চুলাচুলি লেগে যাবে ভেবে এইদিকে একটা ধমক দিল মোতালেব। ঐ তছি চুপ কর। এত প্যাচাইল পারিচ না।

তছির দুইভাই মজিদ আর হাফিজদ্দির দিকে তাকাল মোতালেব। বলল, তরা দুইজন আলফুরে লইয়া গোরস্তানে যা। কবর খোদ। মজনু যাইয়া মান্নান মাওলানারে লইয়াহুক। আলার মারে ক নাওয়াইতে (গোসল)। কাফোন খলফা আমি লইয়াইতাছি। দুইফরের আগেঐ দাফন কইরা হালামুনে। যা, দেরি করিস না।

আজিজের দিকে তাকাল মোতালেব। দেও আজিজ, টেকা পয়সা দেও। কাপোড় খলফা লইয়াহি।

দুইহাতে চোখ মুছে আজিজ বলল, তুমি কষ্ট করবা ক্যা, আমি যাই।

শুনে মোতালেব একেবারে হা হা করে উঠল। আরে না মিয়া, তুমি যাইবা ক্যা? মা মরছে তোমার আর তুমিই যাইবা তার কাফোনের কাপোড় কিনতে, মাইনষে কইবো কী! আমরা কি মইরা গেছিনি? আমরা কি নাই? দেও টেকা দেও।

কাফনের কাপড় কিনার ব্যাপারে মোতালেবের আগ্রহ দেখে অনেকেই মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, ঠোঁট টিপে হাসল। রবার বাপ অখিলদ্দি তার পাশে দাঁড়ানো ইদ্রিসকে ফিসফিস করে বলল, কাফোনের কাপোড় থিকাও চুরি করনের তাল করতাছে মোতালেইব্বা। মানুষ এমুন অয় কেমতে? একটা মানুষ মইরা গেছে আর তার উপরে দিয়া চুরির তাল!

ইদ্রিসও অখিলদ্দির মতোই নিচু গলায় বলল, চোরের সবাব কোনওদিন বদলায় না। সুযুগ পাইলে মার নাকের ফুলও চুরি করে চোরে।

মোতালেবের উদ্দেশ্যটা যে আজিজও না বুঝেছে, তা না। এজন্যই দোনোমোনোটা সে করতাছে। কিন্তু মোতালেব নাছোরবান্দা। আতুড় (লুলা অর্থে) মেয়েটা কোলে নিয়ে তার বউও যে এসেছে এই বাড়িতে, স্বামীর স্বভাব নিয়ে লোকের কানাকানি সেও যে শুনছে, লজ্জায় মুখখানা যে অনেক আগেই নত করে রেখেছে, সেদিকে একদমই খেয়াল নাই মোতালেবের। একটা মৃত্যুর সুযোগে তার পকেটে যে আসবে কয়েকটা টাকা সেই স্বপ্নেই বিভোর হয়ে আছে সে। বারবারই তাগিদ দিচ্ছে আজিজকে। দেরি কইরো না মিয়া। বেইল অইতাছে। কোলাপাড়া যাইতে আইতে সময় লাগবো।

শেষ পর্যন্ত না পেরে অসহায়ের মতো মোতালেবের দিকে তাকাল আজিজ। কত লাগবো?

দেড় দুইশো টেকা দেও। কাপোড় খলফা গোলাপ পানি আগরবাত্তি, এমুনঐ লাগবো। বাচলে তো হেই টেকা তোমারে ফিরত দিমু। এত চিন্তা করতাছো ক্যা?

আজিজ কাতর গলায় বলল, এত টেকা লাগবো!

তয় লাগবো না? মুদ্দারের খরচা কী কম?

অখিলদ্দি বিরক্ত হয়ে বলল, দিয়া দেও আজিজ। অরে বিদায় করো।

অখিলদ্দির খোঁচাটা বুঝল মোতালেব, গায়ে মাখল না। এই সব খোঁচা গায়ে মাখলে পকেটে পয়সা আসবে কেমনে!

লজ্জা যা পাওয়ার পেল মোতালেবের বউ। মেয়েকে এককোল থেকে আরেক কোলে এনে কোনওদিকে না তাকিয়ে, কেউ যেন দেখতে না পায় এমন ভঙ্গিতে বাড়ির নামার দিকে চলে গেল। রসের ভার কাঁধে ঠিক তখনই দবির এসে উঠছিল এই বাড়িতে। গাছিকে দেখে মায়ের কোলে বসা মেয়েটা বলল, রস খামু মা।

শুনে স্বামীর ওপরকার রাগ মেয়ের ওপর ঝাড়ল মোতালেবের বউ। তীক্ষ্ণ গলায় ধমক দিল মেয়েকে। চুপ কর চোরের ঝি। রস খাইবো!

কথাটা শুনে হা হা করে উঠল দবির। ধমকায়েন না, ধমকায়েন না। রস দেকলে পোলাপান মানুষ তো খাইতে চাইব।

তারপর মেয়েটার দিকে তাকাল সে। তুমি বাইত্তে যাও মা। আমি তোমগো বাইত্তে আইতাছি। রস খাওয়ামুনে তোমারে। অহনঐ খাওয়াইতাম, ইট্টু অসুবিধা আছে দেইক্কা খাওয়াইতে পারলাম না। তুমি যাও, আমি আইতাছি।

দবির প্রায় দৌড়ে উঠল আজিজদের বাড়িতে। উচ্ছল গলায় বলল, কো ছনুবুজি কো? ও বুজি, এই যে দেহো পয়লা দিনের রস তোমারে খাওয়াইতে লইয়াইছি। তোমারে না খাওয়াইয়া একফোডা রসও আমি বেচুম না। এই রসের লেইগা মিয়াবাড়ির বুজির কাছে তুমি আমারে চোর বানাইছিলা, হেই কথা আমি মনে রাখি নাই।

তারপরই উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের দিকে চোখ পড়ল দবির গাছির, উঠানের মাটিতে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা বানেছা, আজিজের দিকে চোখ পড়ল। দবির হতভম্ব হয়ে গেল। কী অইছে, আ, কী অইছে? বাইত্তে এত মানুষ ক্যা? ছনুবুজি কো?

দবিরের কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল তছি। মামানী তো নাই, মামানী তো মইরা গেছে। তোমার রস হেয় কেমতে খাইবো গাছিদাদা! মইরা যাওনের সমায় একফোডা পানিও খাইতে পারে নাই। পানি মনে কইরা খাইছে মাইট্টাতেল।

যে উজ্জ্বল মুখ নিয়ে এই বাড়িতে ঢুকেছিল দবির সেই মুখ ম্লান হয়ে গেল তার। গভীর দুঃখে বুকটা যেন ভেঙে গেল। নিজের অজান্তে কাঁধ থেকে রসের ভার নামাল। বিড়বিড় করে বলল, মইরা গেছে, ছনুবুজি মইরা গেছে! আমারে যে কইছিলো পয়লা দিনের রস যেন তারে খাওয়াই, আমি যে তারে কথা দিছিলাম খাওয়ামু, অহন, অহন আমি কেমতে আমার কথা রাখুম!

দৌড় দিয়া ছনুবুড়ির ঘরে ঢুকল দবির। নিজের কাপড়ে গলা পর্যন্ত ঢাকা ছনুবুড়ি শুয়ে আছে চিৎ হয়ে। মুখ এখনও মাখামাখি হয়ে আছে মাইট্টাতেলে, চোখ ঠিকরে বের হতে চাইছে কোটর থেকে। মনে করে মুখটা কেউ মোছাইয়া (মুছিয়ে) দেয় নাই, মনে করে চোখ দুইটা কেউ বন্ধ করে দেয় নাই।

ছনুবুড়ির সামনে মাটিতে বসল দবির। মাজায় বান্ধা গামছা খুলে গভীর মমতায় তার মুখখানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, বুজি ও বুজি, আর একটা দিন বাইচ্চা থাকতে পারলা না তুমি! আমি যে তোমারে কথা দিছিলাম পয়লা দিনের রস তোমারে না খাওয়াইয়া কেরে খাওয়ামু না, তুমি তো আমারে আমার কথা রাখতে দিলা না। এই রস আমি অহনে কারে খাওয়ামু!

কথা বলতে বলতে চোখ ভরে পানি এল দবির গাছির। আস্তে করে হাত বুলিয়ে ছনুবুড়ির-খোলা চোখ বন্ধ করে দিল। তারপর যে গামছায় ছনুবুড়ির মুখ মুছিয়েছিল সেই গামছায় চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

উঠানে তখন পুরুষপোলা তেমন নাই। আজিজের কাছ থেকে টাকা নিয়া মোতালেব চলে গেছে কোলাপাড়া বাজারে। মতলেব গেছে বাঁশ কাটতে। আলফু মজিদ আর হাফিজদ্দি গোরস্থানে গেছে কবর খুঁড়তে। মজনু গেছে মান্নান মাওলানাকে খবর দিতে। জানাজা তিনিই পড়াবেন।

‘উঠানে নেমে আর কোনওদিকে তাকাল না দবির। ভার কাঁধে দুঃখি পায়ে বাড়ির নামার দিকে চলে গেল। সেখানে একটা বউন্না গাছে পা ঝুলিয়ে বসে তখন চিৎকার করে গান গাইছে হামেদ। আবদুল আলিমের গান। কাঁচা বাঁশের পালকি করে মাগো আমারে নিয়ো।’

গানের কথা কানে লাগে দবির গাছির। কাঁচা বাঁশের পালকি করেই তো গোরস্থানে নেওয়া হবে ছনুবুজিকে। চদরি বাড়িতে বাঁশ কাটতে গেছে মতলেব। এই এতদূর থেকেও তার বাঁশ কাটার টুক টুক আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আজকের পর ছনুবুড়ির সঙ্গে আর কারও দেখা হবে না কোনওদিন। কাঁচা বাঁশের পালকি চড়ে এমন এক দেশে চলে যাবে সে, মানুষের সাধ্য নাই সেই দেশ থেকে ফিরত আসার।

১.২৬-৩০ রান্নাচালার পিছন দিককার গয়াগাছ

১.২৬

রান্নাচালার পিছন দিককার গয়াগাছ থেকে চি চি স্বরের করুণ একখান ডাক ভেসে এল। দুইবারের বার ডাকটা খেয়াল করল মরনি। চঞ্চল হল। কীয়ে ডাকে এমুন কইরা। সাপে ব্যাঙ ধরলো নি! এই বাড়িতে সাপ একখান আছে, শানকি। সাপের রাজা হল এই শানকি। গয়না (যাত্রীবাহী বড় নৌকা), গস্তিনাও (মালবাহী নৌকা) বাঁধবার কাছির মতন মোটা। পাঁচ ছয়হাত তরি লম্বা হয়। ধূসর বর্ণের দেহে গাঢ় কালো রঙের ডোরা। দেখতে রাজকীয়। এই সাপের মুখ দুইখান। মাথার কাছে আসল মুখখানা তো আছেই, লেজের। কাছে আছে ছোট্ট আরেকখান মুখ। দুইমুখ একত্র করে যদি কামড় দেয় কাউকে, সে যেই হোক, হাতি নাইলে মানুষ, ভবলীলা সাঙ্গ হতে সময় লাগবো না। তবে এই সাপ সাধারণত কামড়ায় না, গিরস্তের ক্ষতি করে না। যেটুকু করে সেটা ভাল কাজ। দয়া করে যে বাড়িতে বাস গাড়ে (বসবাস করা অর্থে) সেই বাড়ির ত্রিসীমানায় কোনও বিষধর সাপ থাকতে পারে না। যদি থাকে কখনও না কখনও শানকির সামনে তাকে পড়তেই হবে। আর পড়ছে তো মরছে। বিষধর সাপ দেখেই বড় মুখখানা হাঁ করবে শানকি। যদি তখন বিড়া বান্ধা (বৃত্তাকারে শরীর প্যাঁচিয়ে রাখা) থাকে, বিড়া খুলে টানটান করবে দেহখান আর বিষধর সাপ আপনা থেকেই নিজের লেজখান এনে ঢুকিয়ে দিবে শানকির হাঁ করা মুখে। শানকি আস্তে আস্তে গিলতে থাকবে। গিলতে গিলতে যখন মাথা তার মুখের কাছে আসবে তখন কট করে বিষধরে মাথাটা কেটে ফেলে দেবে।

শানকির চলাচলও রাজকীয়। ধীর স্থির। দিন দুপুরে বাড়ির উঠান পালানে চলে আসে কখনও, কখনও ঘরের খামের লগে প্যাঁচ দিয়া থাকে, গাছপালা ঝোপঝাড়ের ছায়ায় বিড়া বেন্ধে থাকে। মানুষজনের সামনে দিয়েই হয়তো মন্থর গতিতে চলতে শুরু করল। বাচবে কী মরবে তোয়াক্কা করল না। শানকি সাপ ভুলেও কোনও গিরস্তে কখনও মারবে না। তাতে দোষ (অকল্যাণ) হয়। বিষধর সাপে দংশে বিনাশ করবে চৌদ্দগোষ্ঠী। এসব জানে বলেই বোধহয় শানকির চরিত্র এমন। গৃহপালিত জীবের মতো আয়েশি ভঙ্গিতে বসবাস করে গিরস্ত বাড়িতে। যখন যেভাবে ইচ্ছা চলাচল করে।

কিন্তু শীত পড়ে গেছে এসময় তো গর্তের ওম, ছাই আর তুষ কুড়ার হাঁড়ি থেকে বের হবার কথা না শানকির! শীতকালটা সে অন্ধকার নির্জনে গভীর উষ্ণতায় কাটাবে। বের হয়ে আসবে ধরালিকালে। তারপর ছুলুম বদলে নতুন করে শুরু করবে জীবন। তাহলে এসময় কোন সাপে ধরল ব্যাঙ!

মরনি চিন্তিত হল।

সে বসে আছে পাটাতন ঘরের সামনে যে দুইখান বাড়তি তক্তা দেওয়া সেই তক্তায়। গিরস্তের আয়েশের জন্য পাটাতন ঘরের সামনে এরকম এক দুইখান তক্তা দেওয়া থাকে। সংসারকর্মের ফাঁকে কয়েক দণ্ডের জন্যে এই তক্তায় বসে বাড়ির লোক। পান তামাক খায়। বাড়িতে হঠাৎ করে কোনও অতিথি এলেও এই তক্তাতেই বসে। কিন্তু মরনি আজ বসে আছে তার মনটা ভাল নাই বলে। ঘণ্টাখানিক আগে খবর পেয়েছে ছনুবুড়ি মারা গেছে। কাঁচা রসে মুড়ি ভিজিয়ে মাত্র সকালের নাস্তা তখন শেষ করেছে। মজনু, মরনি কিছু মুখেই দেয় নাই, পাশের বাড়ির ইন্নত এসে বলল, চাচী ও চাচী হোনছনি, চুন্নিবুড়ি বলে মইরা গেছে। এমতে মরে নাই, মাইট্টাতেল খাইয়া মরছে।

বলেই খিট খিট করে হাসল। ইন্নতের সেই হাসিতে গা জ্বলে গেল মরনির। একজন মানুষ মইরা গেছে ওইটা লইয়াও ঠাট্টা! আল্লার দুনিয়াতে যে কত পদের মানুষ আছে!

এই কথাটা ইন্নতকে সে বলেনি। বলেছে অন্যকথা। তুই হুনলি কই?

ইন্নত বলল, মরনের খবর এমতেঐ ভাইসসাহে। এক বাড়ির মানুষ মরলে তাগো চিইক্কর বাইক্কঐর হুইন্না বোজে লগের বাড়ির মাইনষে। তাগো কাছ থিকা হোনে আরেক বাড়ির মাইনষে, আবার তাগো কাছ থিকা হোনে আরেক বাড়ির মাইনষে, এমতে দেহা যায় পাঁচ মিনিটের মইদ্যে পুরা গেরাম হুইন্নালাইছে।

মজনুর দিকে তাকাল ইন্নত। ঐ মউজনা, যাবিনি? ল যাই, চুন্নিবুড়িরে শেষ দেহা দেইক্কাহি।

এবার আর ইন্নতের কথা সহ্য হল না মরমির। বেশ রাগল সে। ঝাঁঝাল গলায় বলল, চুন্নি চুন্নি করতাছস ক্যা? তগো কিছু কোনওদিন চুরি করতাছে? বাইচ্চা থাকতে যাঐ থাকুক মইরা যাওনের পর মানুষ আর চোর ধাউর থাকে না।

শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ইন্নত। মাথা দুলিয়ে বলল, দামী কথা কইছো চাচী, বহুত দামী কথা কইছো।

শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে মজনু তখন ঘর থেকে বেরিয়েছে। ইন্নত বলল, ল যাই।

তারপর থেকে ঘরের সামনের তক্তপায় বসেই আছে মরনি। একটুও লড়েচড়ে নাই। শুধুই মনে হয়েছে মৃত্যুর কথা। কত মানুষজন ছিল এক সময় চারপাশে, মৃত্যু কোথায় নিয়ে গেছে তাদের মৃত্যু এমন এক নিয়তি, মানুষের সাধ্য নাই তাকে ঠেকিয়ে রাখে। কত চেষ্টা কত রকমভাবে করে মানুষ, তবু ঠেকাতে পারে না মৃত্যু।

একে একে মরনির তারপর মা বাবার কথা মনে হয়েছে, বোনদের কথা মনে। হয়েছে, শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে এই বাড়ির সেই মানুষটার কথা। একজন আরেকজনকে জড়িয়ে বেঁচেছিল এক সময়, মৃত্যু কেমন করে আলাদা করে দিয়েছে তাদের! ছনুবুড়ির মৃত্যুর কথা শুনে আজ সকালে সেই মানুষটার কথা তারপর থেকে মনে পড়ছে মরনির। কত সুখ দুঃখের স্মৃতি, কত আনন্দ বেদনার স্মৃতি রয়ে গেছে সেই মানুষ ঘিরে। যেন মরনির মন একখান কচি কলাপাতা, সেই কলাপাতায় ইরল চিরল দাগে লেখা ছিল প্রিয়তম সেই মানুষের কত কথা, বহু শীত বসন্তের হাওয়া দূর দূরান্ত থেকে বয়ে এনে সেই কলাপাতার ওপর ফেলে গেছে ধুলার ধূসর আস্তরণ, নিজে কিছুই টের পায়নি মরনি, স্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সেই মানুষ। আজ অন্য এক মৃত্যু সংবাদ এল, যেন অনেকদিন পরে চারদিক থেকে ঝেপে এল বৃষ্টি। বৃষ্টি ধারায় কচি কলাপাতা ধুলামুক্ত হল, জেগে উঠল স্মৃতিলেখা। মরনি মগ্ন হয়েছিল সেই লেখায়। তখনই এক সময় রান্নাচালার পিছন দিককার গয়াগাছের কাছে ওই চি চি শব্দ। মগ্নতা ভেঙে গেল। মরনির। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তক্তা থেকে নামল। দ্রুত পায়ে হেঁটে গেল রান্নাচালার পিছনে, গয়াগাছ তলায়।

কই গাছতলায় তো কিছু নাই! সাদা মাটির গাছতলা খা খা করতাছে।

দিশাহারা ভঙ্গিতে মরনি তারপর গাছটার দিকে তাকিয়েছে, তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে। গয়ার ডালে একটা দাঁড়কাক বসে আছে। দুইপায়ে খামছে ধরা একটা কুকরার ছাও (ছানা)। বড়সড় ছাও। দুইচারটা ঠোকর ছাওটাকে দিয়েছে দাঁড়কাক, তবে সুবিধা করতে পারছে না। ছাওটা তার ছোট্ট ডানা, মাথা ও পা দাপড়িয়ে চি চি ডাকে দিশাহারা করে তুলেছে দাঁড়কাকটাকে। কাকটা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। জোর ঠোকরে ছাওটাকে কাবু করতে যেন সাহস পাচ্ছে না।

কয়েক পলক এই দৃশ্য দেখে বুক তোলপাড় করে উঠল মরনির। নিশ্চয় মা ভাই বোনদের লগে গিরস্তর উঠান পাথালে চড়তে বেরিয়েছিল ছাওটা। গাছের ডালে আততায়ী দাঁড়কাক ছিল ঘাপটি মেরে, সুযোগ বুঝে ছো মেরে তুলে এনেছে। চোখের পলকে চিরকালের তরে আলাদা করে দিয়েছে আপনজনদের থেকে। এও তো এক রকমের মৃত্যু। দাঁড়কাক নিয়েছে আজরাইলের ভূমিকা।

আর কিছু না ভেবে পায়ের কাছ থেকে চাকা (মাটির ঢেলা) তুলে কাকটার দিকে ছুঁড়ে মেরেছে মরনি। ধুর কাওয়া ধুর, যা যা।

শিকার নিয়ে এমনিতেই বিব্রত ছিল কাক তার ওপর এই আক্রমণ, ভয়ে শিকার ফেলে কা কা রবে আকাশ পাথালে উড়াল দিয়েছে দাঁড়কাক আর মুরগির ছাওটা ধপ করে পড়েছে গাছতলায়। পড়ে উঠে যে দৌড় দিবে সেই ক্ষমতা ছিল না। ঠোকরে ঠোকরে বুকের কাছটায় বেশ একটা গর্ত করে দিয়েছে দাঁড়কাক। দুইহাতে ছাওটাকে তুলে উঠানে নিয়া আসছে মরনি। হলুদ বাটার সঙ্গে চুন মিশিয়ে অতি যত্নে যখন ছাওটার ক্ষতের ওপর লাগাচ্ছে, খয়েরি চাদর পরা একজন মানুষ এসে দাঁড়াল অদূরে। মানুষটাকে মরনি খেয়াল করল না। ছাওটার যত্ন শেষ করে, পলোতে আটকে উদাস হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। কেন যে তার তখন মজনুর কথা মনে পড়ল! কেন যে বুকটা হা হা করতে লাগল!

আস্তে করে গলা খাকারি দিল লোকটা। চমকে লোকটার মুখের দিকে তাকাল মরনি। কেডা, কেডা আপনে?

লোকটা কাঁচুমাচু গলায় বলল, এইডা নুরু হালদারের বাড়ি না?

মানুষটার যে নাম ছিল নুরু হালদার সেকথা যেন মনেই ছিল না মরনির। আজ অচেনা একজন মানুষের কথায় মনে পড়ল। বুকটা আবার তোলপাড় করে উঠল। বলল, হ। আপনে কে?

মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। আমারে কি তুমি আর অহন চিনবা! তয় তোমারে আমি দেইক্কাঐ চিনছি। কোনও কোনও মানুষ থাকে চেহারা তাগো সহজে বদলায় না। তোমার চেহারা অমুন। আঠরো উনিশ বচ্ছরেও বদলায় নাই। আগের লাহানঐ আছে।

লোকটাকে তবু চিনতে পারল না মরনি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বলল, ভাল আছ বইন?

এবার বিব্রত হল মরনি। আছি ভালঐ তয় আপনেরে তো চিনতে পারি না।

দাঁড়িমোচে ভরা ভাঙাচোরা মুখে হাসল সে। কেমতে চিনবা! এতদিন বাদে দেখলা! আমার নাম আদিলউদ্দিন। বাড়ি কামাড়গাও।

হঠাৎ হঠাৎ কত যে আশ্চর্য ঘটনা ঘটে মানুষের জীবনে! সময়ের চাপে কাছের মানুষ যায় পর হয়ে, বহুদূর পথ ঘুরে একদার আপনজন ফিরে আসে আপনজনের কাছে। তবে সময় অতিক্রম করে যত কাছেই আসুক তারা, সেই সময়ের দূরত্বটা অতিক্রম করতে পারে না। আদিলউদ্দিনকে চিনার পরও মরনি তা পারছিল না, আগের মতোই তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।

আদিলউদ্দিন বলল, অহনও চিনো নাই বইন? আমি তোমার বইনজামাই। মজনুর বাপ।

মজনুর বাপ কথাটা শুনে কেঁপে উঠল মরনি। মনে হল এ কোনও মানুষ না, এ যেন এক আততায়ী দাঁড়কাক। হালদার বাড়ির আঙিনায় এসে ঘাপটি মেরে বসেছে, মা কুকরার মতো মজনুকে নিয়ে যখন ঘর থেকে বের হবে মরনি তখনই সাঁ করে এসে দুই পায়ের ধারাল নখে খামছে ধরবে মজনুকে। আকাশ পাথালে উড়াল দিয়ে মজনুকে নিয়ে চলে যাবে দূর অজানায়।

মুখখানা হাসি হাসি করে আদিলউদ্দিন বলল, তোমার বইনের নাম আছিল অজুফা, মজনুর জন্মের কয়দিন বাদেই চইলা গেল। মজনুরে কুলে লইয়া বইয়া রইছিলা তুমি। এই হগল তোমার মনে নাই বইন? ভুইল্লা গেছ?

ঝাঁঝাল গলায় মরনি বলল, বেবাক মনে আছে, কোনও কিছু ভুলি নাই। আপনের মনে না থাকতে পারে, আমার আছে।

পলোয় আটকানো ছাওটার দিকে তাকিয়ে রইল মরনি। এখনও কাত হয়ে পড়ে আছে। চোখ ঢুলু ঢুলু। ঘাড়টা জোর করে সোজা রাখতে চাইছে, পারছে না। প্রায়ই মাটিতে ঠেকে যাচ্ছে ঠোঁট। হলুদ চুন কতটা কাজ করতাছে কে জানে! বাঁচিয়ে রাখা যাবে তো ছাটাকে!

মরনির রাগি মুখ দেখে, ঝাঁঝাল গলা শুনে আদিলউদ্দিন একটু দমে গেছে। হাসি হাসি মুখ ম্লান হয়েছে। মরনি সেসব পাত্তা দিল না। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, আপনের লগেঐ তাইলে মজনুর কাইল দেহা অইছিলো?

হ। তুমি বোজলা কেমতে?

মজনু আমারে কইছে।

কী কইছে?

মজনুরে দেইক্কা কেমুন করতাছেন আপনে, এই হগল।

চাদরটা ভাল করে গায়ে জড়াল আদিলউদ্দিন। উৎসাহি গলায় বলল, আর, আর কী কইলো? আমি যে অর বাপ এইডা তো আমি অরে কই নাই!

না, ওইডা জানে না।

তয়?

তয় আবার কী! আমারে কইলো এমুন এমুন ঘটনা। আপনেগো বাড়ি কামাড়গোও এইডা হুইন্না আমার ইট্টু চিন্তা লাগছিল। তয় বিশ্বাস অয় নাই। আপনে মাইট্টাল অইবেন ক্যা? আপনে তো ভাল গিরস্ত আছিলেন!

আদিলউদ্দিন আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ আছিলাম। অহনও আছি।

তয় মাইট্টাল অইতে আইছেন ক্যা?

কপালে টাইন্না আনছে।

কেমতে?

পরের ঘরে তিনডা পোলা আমার। মার লাহান অইছে তিনজনে। সাই (মহা) পাজি। বড়ডার বয়স ষোল্ল সতরো। জাগা জমিন খেতখোলা বেবাক বুইজ্জা লইছে। তিন ভাইয়ে মিল্লা চোয় (চষে)। আমারে কামলার লাহান খাডায়। কথা কইলে পোলাপানের মায় ওডে পিছা (ঝাড়) লইয়া। তিন পোলায় গরুর লাডি দিয়া বাইড়ায়। মাইর ধইর খাইয়াও রইছিলাম। যামু কই! শেষতরি আর পারলাম না। তিন চাইরদিন আগে এমুন বাইড়ান বাইড়াইলো, এই চাইদ্দরডা গায় আছিলো, এই লুঙ্গিডা ফিন্দন, ঘেড়ি ধাক্কাইতে ধাক্কাইতে তিন পোলায় বাইতথন বাইর কইরা দিল।

কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা ধরে এল আদিলউদ্দিনের। তবে এসব পাত্তা দিল না মরনি। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, তহন আরেক পোলার কথা মনে অইছে, না? তহন বাইর হইছেন আরেক পোলা বিচড়াইতে (খুঁজতে)!

মরনির কথায় একেবারেই কাতর হয়ে গেল আদিলউদ্দিন। চোখ ছলছল করে উঠল। না না পোলা বিচড়াইতে বাইর অই নাই। এই গেরামে আইছি মাইট্টাল অইতে। শইল্লে খাইটা যেই কয়দিন পারুম বাইচ্চা থাকুম। নিজের গেরামে, নিজের বাইত্তে, ঐ সংসারে আর ফিরত যামু না।

কথা বলতে বলতে পানিতে চোখ ভরে গেল মানুষটার। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চাদরের খুঁটে চোখ মুছল সে। মুছতে মুছতে বলল, সত্য কথাডা তোমারে আমি কই বইন। এই গেরামে আহনের আগে তোমগো কথা আমার মনেই অয় নাই। মনে অইছে এহেনে আইয়া। কাইল বিয়ালে। মজনুর লগে কথা আমি ঠিক কইছি, তারে চিনছি, চিন্না বুকটা আমার ভাইঙ্গা গেছে, ইচ্ছা করলে তারে আমি বেবাক কথা কইতে পারতাম, নিজের পরিচয় দিতে পারতাম, দেই নাই। ক্যান দেই নাই জানো? পোলাপানের উপরে মন উইঠা গেছে আমার। খালি মনে অয় আমার কোনও পোলাপান নাই।

চোখের পানি দরদর করে গাল বেয়ে পড়তে লাগল আদিলউদ্দিনের। কাঁদতে কাঁদতে গায়ের চাদর ফেলে দিল সে। বলল, দেহো বইন দেহো, পোলারা যদি এমতে পিডায়….।

কথা শেষ করতে পারল না আদিলউদ্দিন, বুক ঠেলে ওঠা কান্না ঠেকাবার জন্য ছটফট করতে লাগল।

লাঠির বাড়িতে তার সারা শরীরে দড়ির মতন দাগ পড়েছে। সেই দাগ দেখে বুকটা হু হু করে উঠল মরনির। এই মানুষটার ওপর সতেরো আঠারো বছর ধরে যে রাগ জমেছিল সেই রাগ উধাও হয়ে গেল। গভীর আবেগে দুইহাতে মানুষটাকে সে জড়িয়ে ধরল। আহেন আপনে, আহেন। বহেন। বইয়া কথা কন।

ধরে ধরে আদিলউদ্দিনকে এনে পাটাতন ঘরের সামনের তক্তায় বসিয়ে দিল মরনি। পোলা অইয়া বাপরে মারে, কেমুন পোলা জন্ম দিছেন?

আদিলউদ্দিন কোনও কথা বলল না। চাদরের খুঁটে চোখ মুছতে লাগল।

মরনি বলল, একই বাপের পোলা একজন অয় ডাকাইত একজন অয় ফেরেস্তা। মজনুরে দেখলে, তার লগে কথা কইলে আপনে এইডা বুজবেন।

আদিলউদ্দিন বলল, এইডা আমি বুজছি বইন।

লগে লগে বুকটা ধ্বক করে উঠল মরনির। তবে কী মজনুর উপর দখল নিতে, সব খোঁজ খবর নিয়ে এই বাড়িতে এসেছে আদিলউদ্দিন! শুনেছে মজনু খলিফা হয়েছে। ভবিষ্যতে ভাল টাকা পয়সা রোজগার করবে। নিজের সংসারে আর ফিরতে পারবে না আদিলউদ্দিন, মজনুই হবে তার একমাত্র ভরসা, এই রকম চিন্তা! মজনুর কাঁধে চড়ে শেষ জীবনটা সে কাটিয়ে দিবে।

এই সব ভেবে ভিতরে ভিতরে খুবই রাগ হল মরনির। খানিক আগের মায়া মমতা হাওয়া হয়ে গেল। আহুজঘর থেকে যে ছেলেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, মরনি যাকে বুকে তুলে নিয়ে এসেছিল, এতগুলি বছর কেটে গেছে যে ছেলের কোনও খোঁজ নেয়নি বাপ, আজ তার অবস্থা ভাল দেখে তার কাঁধে এসে সওয়ার হবে, মরনি বেঁচে থাকতে কিছুতেই তা হতে দেবে না।

এই সব নিয়ে কথা বলবার জন্য তৈরি হল মরনি। লোকটাকে এখনই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য তৈরি হল। তার আগেই আদিলউদ্দিন বলল, তুমি আমারে কী বোজতাছো কে জানে, তয় আমি কইলাম মজনুর লেইগা এই বাইত্তে আহি নাই। অর লেইগা আমি কোনওদিন কিছু করি নাই। বাপ অইয়াও বাপের দায়িত্ব পালন করি নাই। পোলায় জানেই না তার বাপ বাইচ্চা আছে না মইরা গেছে। এতকাল পর অমুন পোলার সামনে আইয়া খাড়ন যায় না। পোলাগো কাছ থিকা বহুত অপমান জিন্দেগিতে অইছি, আর অইতে চাই না। আমার একটা পোলা অন্তত থাউক যার কাছ থিকা আমি কোনওদিন অপমান অমু না। দরকার অইলে সারাজীবন তারে বাপের পরিচয় দিমু না, তাও ভাল।

এ কথায় আগের রাগ ক্রোধ ভুলে গেল মরনি। মজনুকে নিয়ে অন্যরকম একটা অহংকার হল। গলায় জোর নিয়ে বলল, বাপেরে পিড়ান তো দূরের কথা, তারে অপমান কইরা কথা কওনের মতন পোলা মরনি বানায় নাই। বাপ যত ইচ্ছা খারাপ অইবো, পোলা খারাপ বানামু ক্যা!

একটু থেমে মরনি বলল, মজনুর লেইগা যহন আহেন নাই তাইলে এই বাইত্তে আহনের কাম আছিলো কী?

মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় আদিলউদ্দিন বলল, আমি আইছি। একখান য়োড়ার লেইগা।

য়োড়ার লেইগা?

হ। য়োড়া ছাড়া মাইট্টাল অওন যাইবো না। য়োড়া কিননের পয়সা আমার কাছে নাই। একখান য়োড়া যদি দেও বইন, বড় উপকার অয়।

য়োড়া আপনেরে দিমুনে। কাম করবেন সড়কে, থাকবেন কই?

কইতে পারি না।

শীতের দিন যেহেনে ওহেনে তো পইড়াও থাকতে পারবেন না। কেতা (কাঁথা) কাপোড় আছেনি?

না, কিছু নাই।

তয়?

আদিলউদ্দিন কথা বলল না।

মরনি বলল, মজনু বাইত্তে থাকে না। ইচ্ছা করলে আমগো বাইত্তে আপনে থাকতে পারেন। তয় একখান কথা মানন লাগব। আপনে যে মজনুর বাপ এইডা মজনুরে কোনওদিন কইতে পারবেন না।

একথা শুনে মরনির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল আদিলউদ্দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কমু না, কোনওদিনও মজনুরে কমু না, বাজান রে, আমি তর বাপ।

পলোর ভিতর মুরগির ছাওটা তখন কোনও রকমে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতাছে। উঠে এক সময় দাঁড়াবে ঠিকই, বেঁচেও যাবে কিন্তু তার চারপাশে থাকবে পলোর বেড়া। পলো তুলে নেওয়ার পর বেড়া একটু বড় হবে। এই বাড়ির উঠান পালানই হবে তখন আর একটা পলো। সেই পলোর বৃত্ত ভেঙে একমাত্র মৃত্যুই পারবে তাকে মুক্তি দিতে।

.

১.২৭

বারবাড়ির সামনে বিশাল একখান নাড়ার পালা। যে লম্বা বাঁশের চারপাশ ঘিরে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে পালা দেওয়া হয়েছে সেই বাঁশের মাথায় ঘোর কালো বর্ণের। একখান হাড়ি বসান। হাড়ির সামনের দিকে খড়িমাটি দিয়ে আঁকা হয়েছে দুইখান চোখ। ফলে দূর থেকে নাড়ার পালাটাকে দেখায় পেটমোটা কাকতাড়ুয়ার মতো। কাক চিল, ইঁদুর বাদুর না, এই কাকতাড়ুয়াটি যেন মানুষকেই ভয় দেখায়। ম্যাটম্যাটা জ্যোৎস্না রাতে অচেনা পথিক যখন এই বাড়ির সামনে দিয়া যায়, হঠাৎ করে নাড়ার পালার দিকে তাকিয়ে কলিজা কেঁপে ওঠে তাদের। মনে হয় এটা নাড়ার পালা না, এটা তেনাদের একজন। পরহেজগার মানুষের বাড়ি দেখে বাড়ির ভিতর ঢুকতে পারছে না। বারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে ভিতর বাড়ির দিকে। যেন বাড়ালেই সেই পা বেঁধে ফেলবে মান্নান মাওলানার বাড়ি বন্ধের দোয়া। সেই বন্ধন মুক্ত করবার সাধ্য তেনাদের নাই।

নাড়ার পালার পুর দক্ষিণ কোণে গরুর আধাল (গোয়ালঘর)। লম্বা মতন এক চালাটায় দামড়া দামড়ি (এঁড়ে বকনা) নিয়ে এগারোটা গরু। এই বাড়ির অনেকদিনের বাসিন্দা তারা, বাড়ির খুঁটিনাটি সবই জানে, তবু কোনও কোনও রাতে আধাল থেকে গলা বাড়িয়ে কেউ কেউ নাড়ার পালার দিকে তাকায়। তাকিয়ে লেজ খাড়া করে তারপর হাম্বা রবে গিরস্তকে সাবধান করে। যে রূপেই থাকে গৃহপালিত পশুরা নাকি এক পলক। দেখেই তেনাদের চিনতে পারে। চিনতে পারার লগে লগে ভয়ে লেজ খাড়া হয়ে যায় তাদের। হাম্বা রবে দশদিক মুখরিত করে। তেনাদের চিনতে যে গরুরাও ভুল করে মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনের নাড়ার পালা তার প্রমাণ।

আজ সকালে এই নাড়ার পালার তলায় উদাস হয়ে বসে আছে আতাহার। পরনে লুঙ্গি, গায়ে গেরুয়া রঙের চাদর। এমন জবুথুবু হয়ে বসেছে, দেখে মনে হয় শীতে মরে যাচ্ছে, এখানে বসেছে রোদ পোহাবার জন্য। খানিক আগে ঘুম থেকে উঠেই এখানে। চলে এসেছে। চোখ দুইটা লাল টকটকা হয়ে আছে, যেন চোখ উঠেছে আতাহারের। বাড়ির গোমস্তা কাশেম টুকটাক কাজ করতাছে আথালে। ফুর্তিবাজ মানুষ কাশেম। কাজ করবার সময় মাঝারি স্বরে গান গাওয়ার অভ্যাস আছে। এখনও গান গাইছে সে।

আগে জানি না রে দয়াল
তর পিরিতে এ পরান যাবে

কাশেমের গান শুনে চোখ তুলে আথালের দিকে তাকাল আতাহার। খ্যারাখ্যারা গলায় ডাকল, ঐ কাইশ্যা।

গান থামিয়ে সাড়া দিল কাশেম। কন।

এমিহি আয়।

কাজ ফেলে একদৌড়ে নাড়ার পালার সামনে এসে দাঁড়াল কাশেম। ছেঁড়া লুঙ্গি হাঁটুর কাছ পর্যন্ত তুলে পরা। লুঙ্গির ওপর মাজায় গিঁট দিয়ে বান্ধা গামছা। ডান বাহুতে কালো কাইতানের (এক ধরনের মোটা সুতা) লগে বান্ধা রূপার বড় একখান মাদলি। এছাড়া শরীরে আর কিছু নাই কাশেমের। খালি গায়ের কাশেম দেখতে অদ্ভুত। গায়ের রঙ বাইল্লা (বেলে) মাছের মতো ফ্যাকাশে। বুকে পিঠে কোথাও একখান পশম নাই। ভাঙা মুখে, নাকের তলায় আছে গলাছিলা করার গর্দানের কাছে ভুল করে গজানো দুইচারটা পশমের মতন দুইচারটা মোচ, থুতনির কাছে আছে মোচের মতন কয়েকখান দাঁড়ি। দাঁড়িমোচের রঙ কাশেমের মাথার চুল মোচ ভুরু আর চোখের পাপড়ির মতোই লালচে ধরনের। এই দাঁড়িমোচ কাজির পাগলা বাজারে গিয়ে প্রায়ই কামিয়ে আসে সে। গায়ে পশম নাই, মুখে দাঁড়িমোচ নাই দেখে দুষ্টু লোকেরা কাশেমের নাম দিয়েছে মাকুন্দা কাশেম। এই নাম শুনে প্রথম প্রথম খুব ক্ষেপত কাশেম, আজকাল আর ক্ষেপে না। সয়ে গেছে।

আরেকখানা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার মুখের হাঁ বেশ বড়। হাসলে দুইকান তরি ছড়িয়ে যায় হাসি এবং প্রত্যেক কথায় হাসে কাশেম।

এই যেমন এখন, নাড়ার পালার তলায় বসা আতাহারের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।

লালচোখ তুলে কাশেমের দিকে তাকাল আতাহার। নাক ফুলিয়ে বলল, হাসছ ক্যা?

কাশেম লগে লগে বলল, কো, হাসি না তো!

বলেও হাঁ করা মুখ হাসি হাসি করে রাখল।

আতাহার বলল, মুক বন্দ কর।

প্রথমে একটা ঢোক গিলল কাশেম তারপর মুখ বন্ধ করল। দেখে খুশি হল আতাহার। গম্ভীর গলায় বলল, বাবায় কো?

পুবের ঘরে।

কী করে?

মউলকা (চাপটি। চল, খুদ সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে, সকালবেলা বেটে, পানি মিশিয়ে তরল করে মাটির খোলায় রুটির আকারে লেপটে দিতে হয়। ভাজা হলে খেতে বেশ স্বাদ) খায়।

মায় আইজ মউলকা বানাইছেনি? কীয়ের মউলকা?

খুদের।

কচ কী! কনটেকদার সাবে আছে বাইত্তে, বিয়ানে তারে খুদের মউলকা খাওয়ামুনি?

তয় কী খাওয়াইবেন?

হেইডাই চিন্তা করতাছি।

খানিক চুপ করে কী ভাবল আতাহার তারপর বলল, তর কামকাইজ শেষ?

নিজের অজান্তেই হাসল কাশেম। আসল কাম শেষ। রইদ ওডনের আগেই বেবাকটি গাই চকে নিয়া গোছর (হাতখানেক লম্বা খুঁটিতে দড়ি বেঁধে, সেই দড়ির আরেক প্রান্ত গরুর পা, গলায় বেঁধে খুঁটিটা মাঠে পুতে দেওয়া। এই খুটি ওপড়ান বেশ কঠিন। দড়ি যতটা লম্বা সেই অনুযায়ি খুঁটির চারপাশ ঘুরে ঘুরে ঘাস খেতে হয় গরু ছাগলের) দিয়াইছি। অহন আধাল সাফ করতাছি।

শেষ অইছে?

না। তয় পরে করলেও অইবো। আপনের কী কাম কন, কইরা দেই।

কনটেকদার সাবে অহনতরি ঘুমাইতাছে। উইট্টা হাতমুখ ধুইবো, পায়খানায় যাইবো। তুই এক কাম কর, এক বালতি পানি আইন্না রাখ বাংলাঘরের সামনে আর পিতলের বড় বদনাডা। একহান তোয়াইল্লা রাকিছু জানলার লগে, সাবান রাকিছ। মেজবানের লেইগা যা যা করন লাগে আর কি, বুজলি না!

হ বুজছি।

তারপরই যেন আতাহারের চোখ দুইটা দেখতে পেল কাশেম। দেখে আঁতকে উঠল। ও মিয়াবাই চোক্কে কী অইছে আপনের চকু উদাইছেনি (উঠেছে কিনা)?

আতাহার গম্ভীর গলায় বলল, না।

তয় চক্কু দিহি পানিকাউর (পানকৌড়ির) চকুর লাহান অইয়া রইছে।

হারা রাইত অরঘুমা (নির্ঘুম) আছিলাম।

ক্যা?

মদ খাইছি।

কাশেম থতমত খেয়ে বলল, তোবা, তোবা।

লগে লগে খেঁকিয়ে উঠল আতাহার। ঐ বেডা তোবা তোবা করচ ক্যা? আমি যে মদ খাই তুই জানস না? আইজ থিকা খাইনি খাই তো ছোডকাল থিকা।

ধমক পেয়ে হাসল কাশেম। বিনীত গলায় বলল, হেইডা তো খানই।

তয়?

খাইলেও এই হগল কথা কইতে অয় না। আপনে একজন আলেমের পোলা।

আতাহার হাসল। আলেমের ঘরে জালেম অয়।

তোবা তোবা, এই হগল কী কইতাছেন মিয়াবাই। হুজুরে হোনলে জব কইরা হালাইবো।

থো ডো, জব কইরা হালাইবো! আমার বাপে আমার থিকাও বড় জালেম। তুই বুজবি না, আমি বুজি। অহন যা, যা যা কইলাম কইরা আয়। তারবাদে আমার মাথাডা ইট্টু বানাই দিবি। বেদনা করতাছে। মদ খাইয়া অরঘুমা আছিলাম তো, এর লেইগা।

আপনে অরঘুমা আছিলেন আর আপনের লগে বইয়া খাইলো কনটেকদার সাবে হেয় দিহি ঘুমাইতাছে?

হেয় আর আমি এক না। আমি ইট্টু বেশি খাই। কেঐ মদ খায় ঘুমানের লেইগা কেঐ খায় জাইগগা থাকনের লেইগা, প্যাচাইল পারনের লেইগা। আমি খাইয়া দাইয়া ইট্টু জাইগগা থাকি, ইট্টু প্যাচাইল পোচাইল পারি।

নিঃশব্দে হাসল আতাহার।

তাকে হাসতে দেখে কাশেমও হাসল। হ এইডা আইজ বোজলাম। এত প্যাচাইল আমার লগে কোনওদিন পারেন নাই আপনে। অহনতরি মনে অয় নিশা কাডে নাই আপনের।

আতাহার কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই হন হন করে হেঁটে মজনু এসে উঠল বাড়িতে। আতাহারের সামনে এসে দাঁড়াল। হুজুর বাইত্তে আছে না?

চোখ ঢুলু ঢুলু করে মজনুর দিকে তাকাল আতাহার। হুজুরডা জানি কেডা?

মজনু থতমত খেল তারপর হেসে ফেলল। ফাইজলামি কইরেন না দাদা। আছেনি কন, বহুত দরকার।

আছে।

কো?

নিজেকে দেখিয়ে আতাহার বলল, এই যে!

মজনু কথা বলবার আগেই কাশেম বলল, কী শুরু করলেন মিয়াবাই! মাইনষে কইবো কী!

কাশেমের দিকে তাকিয়ে মজনু বলল, হুজুর যুদি বাইত্তে থাকে তারে আপনে ইট্টু খবর দেন। কন ছনুবুড়ি মইরা গেছে তার জানাজা পড়তে যাওন লাগবো। আমি তারে নিতে আইছি।

হঠাৎ করে মৃত্যু সংবাদ আশা করেনি কেউ। কাশেম এবং আতাহার দুজনেই থতমত খেয়ে গেল। আতাহার তাকিয়ে রইল মজনুর মুখের দিকে আর কাশেম দিশাহারা গলায় বলল, কও কী! কুনসুম মরলো?

মজনু কথা বলবার আগেই খরমে চটর পটর শব্দ তুলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন মান্নান মাওলানা। বিনীতভাবে তাকে সালাম দিল মজনু। আসোলামালাইকুম।

সালামের জবাব দিলেন না তিনি। গম্ভীর গলায় বললেন, কেডা মরছে?

ছনুবুড়ি।

মান্নান মাওলানা ভুরু কুঁচকালেন। ঐ চুন্নি! ভাল অইছে। একটা খারাপ জিনিস গেছে।

এতক্ষণ ধরে বসে থাকা আতাহার উঠে দাঁড়িয়েছে কিন্তু মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না। যেন তাকালেই তার লালচোখ দেখে যা বোঝার বুঝে যাবেন বাবা। কথা বললে মুখের গন্ধে উদিস পেয়ে যাবেন তার নেশার কথা। কায়দা করে মুখ লুকিয়ে বাংলাঘরের দিকে চলে গেল আতাহার। যাওয়ার আগে ইশারা করে গেল কাশেমকে। সেই ইশারা পাত্তা দিল না কাশেম। হঠাৎ করেই বাড়ির নামার দিকে দৌড় দিল। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, ছনুবুজি মইরা গেছে, যাই তারে ইউ শেষ দেহা দেইক্কাহি।

কাশেমের দৌড় দেখে রাগে গা জ্বলে গেল আতাহারের। ঘরে মেজবান আছে, এখনই ঘুম ভাঙবে তার। তারপর কত কাজ, এসব এখন কে করবে!

দাঁতে দাঁত চেপে কাশেমকে একটা বকা দিল আতাহার। বাইত আহো বউয়ার পো, শেষ দেহা তোমারে দেহামু নে।

কিন্তু কাশেম আতাহার কারও দিকেই তখন মন নাই মান্নান মাওলানার। মজনুর দিকেও তাকালেন না তিনি। কোন ফাঁকে পানজাবির জেল থেকে ছোট্ট কাঁকুই বের করেছেন। এখন কাঁকুই দিয়ে দাঁড়ি আঁচড়াচ্ছেন। চোখে বদদৃষ্টি। সেই দৃষ্টি নাড়ার পালার দিকে ফেলে বললেন, কেমতে মরলো?

মজনু বিনীত গলায় ঘটনা বলল। শুনে শিয়ালের মতো খ্যাক করে উঠলেন তিনি। কী আত্মহত্যা করতাছে? মাইট্টাতেল খাইছে

মজনু বলল, মনে অয় ইচ্ছা কইরা খায় নাই। তিয়াস লাগছিল, পানি মনে কইরা খাইছে।

যেমতেই খাউক, খাইছে তো! এইডা আত্মহত্যাঐ। ঐ বাইত্তে আমি যামু না। একে চোর দুইয়ে আত্মহত্যা, এই রকম মুদ্দারের জানাজা অয় না।

কথাটা বুঝতে পারল না মজনু। অবাক হয়ে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল। তয়?

তয় আবার কী? জানাজা অইবো না।

জানাজা না অইলে মাডি দিবো কেমতে

মাডি দিবো না।

কন কী!

হ।

মুদ্দার লইয়া তইলে কী করবো?

কাথা কাপড়ে প্যাচাইয়া মড়কখোলায় (গৃহপালিত মৃত জীব যে স্থানে ফেলে) হালাইয়া দিবো! গরু বরকি (ছাগল) মরলে যেমতে হালায়! কাউয়া চিলে ঠোকরাইয়া ঠোকরাইয়া খাইবো, হকুনে খাইবো, শিয়াল কুত্তায়ও খাইতে পারে। আর নাইলে গাঙ্গে হালায় দিবো। মাছে খাইবো, কাউট্টা কাছিমে খাইবো। এই মুদ্দার মাডিতে লইবো না। গোড় দিলে হায় হায় রব করবো মাডি। যেই মাওলানা জানাজা পড়বো তার গুণা অইবো। সইত্তর হাজার বচ্ছর জ্বলন লাগবো দোজকের আশুনে। জাইন্না হুইন্না এই কাম আমি করতে পারুম না।

কোনও মুর্দারের যে মাটি হয় না, জানাজা হয় না একথা জীবনে প্রথম শুনল মজনু। আগামাথা কিছুই বুঝল না, আগের মতোই অবাক হয়ে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আড়চোখে মজনুকে একবার দেখে দাঁড়ি আঁচড়ানোর কাঁকুই জেবে রেখে অন্য জেব থেকে জামরুল রঙের তসবি বের করলেন মান্নান মাওলানা, তসবি জপতে জপতে কেরাতের সুরে বললেন, আল্লাপাক বলেছেন, হে আমার পেয়ারে বান্দা, হে মোমিন মোসলমান, তোমরা চুরি করিও না, জেনা করিও না। যুদি করো আমার কোনও মুসল্লি, কোনও পরহেজগার বান্দা তোমার জানাজা পড়াইবে না, জানাজায় শরিক হইবে না। আমার দুইন্নাইতে তোমার জইন্য কোনও কবর নাই আমার মাডি তোমারে জাগা দিবো না। ক সোবানাল্লা, সোবানাল্লা।

সোবাহানআল্লাহ বলল না মজনু। চিন্তিত গলায় বলল, মোতালেব কাকায় যে তাইলে কাফোন আনতে গেল, মতলা গেল বাঁশ কাটতে, আলফু গেল কবর খোদতে। হেরা কি এই হগল জানে না ?

না জানে না। নাদান, নাদান। আর মোতালেইব্বা তো দৌড়াইতাছে চুরি চামারি করনের লেইগা। কাফোনের কাপোড় থিকাও চুরি করবো।

একটু থেমে বললেন, আমি যা যা কইলাম তুই গিয়া আইজ্জারে এইডি ক। সাফ কথা অইলো অর মায় চোর আছিলো, চোরের জানাজা অইবো না, কবর অইবো না। লাশ মড়কখোলায় হালাইয়া দিতে ক, নাইলে গাঙ্গে। যা।

মজনু আর কথা বলল না। শুকনা, চিন্তিত মুখে মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে নেমে এল। আনমনা ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হল যেসব কথা বলেছেন মান্নান মাওলানা এইগুলি ঠিক তো! নাকি কথার মধ্যে আছে অন্যরকমের চালাকি! ছনুবুড়িকে অপছন্দ করে বলে ইচ্ছা করেই কি তার জানাজা পড়াতে চাইছেন না মান্নান মাওলানা! কোনও দিনকার কোনও অপমানের শোধ কি এই ভাবে নিচ্ছেন ছনুবুড়ির ওপর! মুর্দারের ওপর কি শোধ নেওয়া যায়! মান্নান মাওলানা তো তাহলে মানুষ না। সাপ, কালজাইত সাপ। উড়ে এসে গায়ে পড়লে শুকনা পাতাকেও যে ছাড়ে না, ছোবল দেয়।

কিছু না ভেবে মজনু তারপর খান বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। খান বাড়ির মসজিদের হুজুরকে গিয়ে খুলে বলবে সব। মান্নান মাওলানা যা যা বলেছেন ওসব ঠিক কিনা জানতে চাইবে। যদি ঠিক না হয় তাহলে কি তিনি পড়াবেন ছনুবুড়ির জানাজা!

.

১.২৮

নূরজাহান মধুর স্বরে ডাকল, মা হামিদা, ও মা হামিদা।

রান্নাচালায় বসে কাজিরভাত (বিক্রমপুর অঞ্চলের গৃহস্থ বাড়ির রান্নাঘরে চুলার পাড়ে মাটির একখানা হাড়ি রাখা থাকে। যখনই ভাত রান্না হয় তখনই সদ্য চুলায় বসান ভাতের হাঁড়ি থেকে হাতায় করে একহাতা চালপানি তুলে ওই হাঁড়িটায় রাখা হয়। এই ভাবে দিনে দিনে ভরে ওঠে হাঁড়ি। চালপানি পচে টক টক একটা গন্ধ বে য়। এই চালপানি দিয়ে যে ভাত রান্না করা হয় তাকে বলে কাজিরভাত। চালটাকে বলা হয় কাজিরচাল। এই চাল দিয়ে যাই তৈরি করা হয় তার সঙ্গে কাজি শব্দটা থাকে। যেমন কাজিরজাউ, কাজিরবউয়া, কাজিরপিঠা ইত্যাদি) রাঁধছে হামিদা। মাটির হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে, লগে তিন চারটা গোলালু, শিংমাছের মতো রঙের একখান সরা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। এখনও বলক ওঠেনি ভাতে, চোকলা (খোসা) পার করে তাপ পৌঁছায়নি গোললালুতে। নাড়ার আগুনে মাত্র লাড়াচাড়া পড়েছে হাঁড়ির চাউলপানিতে। সেদিকে একেবারেই মন নাই হামিদার। সে জানে ভাত উতরালে (বলক দিয়ে ফেনা ওঠা) শো শো শব্দ হবে। হাঁড়ির ভিতর থেকে সরা ধাক্কাতে শুরু করবে ফুটন্তু চাউলপানি। হামিদা তাই ব্যস্ত হয়ে আছে পাটা পুতা (শিল নাড়া) নিয়ে। তার হাতের কাছে, চুলার মুখে রাখা আছে একপাঁজা নাড়া, চুলার দিকে না তাকিয়েই মাঝে মাঝে চুলার মুখে সেই নাড়া গুঁজে দিচ্ছে সে। পাটার এক পাশে দুই তিনটা ছোট্ট টিনের পট, টিন এলুমিনিয়ামের দুই তিনটা বাটি, মাটির দুইখান খোড়া। ভাত চড়াবার আগে কয়েকটা শুকনা মরিচ মাটির খোলায় টেলে একটা খোঁড়ায় রেখেছে। অন্য খোঁড়ায় একটু পানি। এখন একটা পট থেকে একমুঠ কালিজিরা নিয়ে পাটার ওপর রেখে, বড় একখান টালা মরিচ নিয়ে, মাটির গোড়া থেকে আঙুলের ডগায় করে কয়েক ফোঁটা পানি তুলে কালিজিরা আর মরিচের সঙ্গে মিশিয়ে তা দিয়ে বেটে মাত্র ভর্তা বানাতে যাবে, অদূরে বসা নূরজাহান তখনই এই ভাবে ডাকল। শুনে কাজ ভুলে ভুরু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকাল হামিদা। এইডা আবার কেমুন ডাক, আ?

নূরজাহান গম্ভীর মুখ করে বলল, ক্যা তোমার নাম হামিদা না?

হ ভাল নাম হামিদা। ডাক নাম হামি।

তয়?

তয় কী? মাইয়া অইয়া নাম ধইরা ডাকবিনি মারে?

নাম ধইরা ডাকি নাই তো!

তয় কী ধইরা ডাকছস?

তুমি হোন নাই কী ধইরা ডাকছি?

হুনছি হুনছি। মা হামিদা।

মিষ্টি মুখখানা হাসিতে আরও মিষ্টি করে তুলল নূরজাহান। নামের আগে তো মা কইছি!

মেয়ের এরকম হাসিমুখ দেখে আশ্চর্য এক অনুভূতি হল হামিদার। চোখ নরম করে নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দুইহাতে পুতা ধরে কালিজিরা পিষতে লাগল। কালিজিরা আর টালা মরিচের ধকধকে গন্ধ উঠে ছড়িয়ে গেল চারদিকে। সেই গন্ধে আকুল হল নূরজাহান। মধুর গলায় আবার ডাকল, মা হামিদা।

এবার আর মেয়ের মুখের দিকে তাকাল না হামিদা। কালিজিরা ভর্তা বানাতে বানাতে বলল, আথকা (হঠাৎ) এমুন আল্লাদ অইলো ক্যা! কী চাস?

কিচ্ছু না।

তয়?

তোমারে এমতে ডাকতে বহুত ভাল লাগতাছে।

তুই একখান পাগল। এত ডাঙ্গর অইছস অহনতরি পোলাপাইন্নামি (ছেলেমানুষি, মেয়েমানুষি) গেল না। কবে যে যাইবো!

কোনওদিনও যাইবো না। আমি হারাজীবন এমুন থাকুম।

হারাজীবন এমুন থাকন যায় না মা।

ক্যা যায় না?

অহন বুজবি না। বিয়াশাদি অইলে বুজবি।

না আমি অহনঐ বুজতে চাই। তুমি আমারে বুজাও।

এবার একটু বিরক্ত হল হামিদা। জ্বালাইতাছস ক্যা? দেহচ না কত কাম আমার!

শিশুর মতো অবুঝ গলায় নূরজাহান বলল, কী কাম?

হামিদার ইচ্ছা হল ধমক দেয় মেয়েকে। ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়, না হলে উঠিয়ে দেয় এখান থেকে। তারপরই ভাবল সেটা ঠিক হবে না। ধমক খেলে রেগে যাবে নূরজাহান পাড়া বেডাতে বের হবে। দুপুরের আগে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না তাকে। সারাটা বিয়ান না খেয়ে থাকবে। রসের প্রথম দিনে কেন অযথা কষ্ট দিবে মেয়েটাকে! তাছাড়া এত আদরের গলায় যখন ডাকছে, টুকটাক কথা বলে সময়টা ভালই কাটান যাবে। কাজের কাজও হবে মেয়েকেও আটকে রাখা যাবে বাড়িতে।

চোখ তুলে একবার নূরজাহানের দিকে তাকাল হামিদা। তারপর কালিজিরা বাটতে বাটতে বলল, শীতের পয়লা দিন আইজ। তর বাপে গেছে রস বেচতে। বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা গেছে। ফিরা আইতে আইতে বেইল উইট্টা যাইবো। বাঘের লাহান খিদা লাগবো আইজ। হের লেইগা কাজিরভাত রানতাছি।

বাবায় কাজিরভাত রানতে কইয়া গেছে।

না কয় নাই। আমি নিজে থিকাঐ রানতাছি।

ক্যা?

তর বাপে কাজিরভাত পছন্দ করে। নানান পদের ভর্তা দিয়া কাজিরভাত খাইতে পারলে মন ভাল থাকে তার। আইজ পয়লা দিন তো, বহুত খাটনি যাইবো কামে। বাইত্তে আইয়া কাজিরভাত দেকলে খুশি অইবো। খাটনির কথা ভুইল্লা যাইবো।

কয় পদের ভর্তা বানাইবা?

তিন চাইর পদের।

কী কী?

চুলার হাড়িতে তখন বলক এসেছে। উতড়াতে শুরু করেছে ভাত। শো শো শব্দে নাচছে সরা। কালিজিরা ভর্তাটাও ততক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে। হাত দিয়ে কেচে পাটা থেকে ভর্তা তুলল হামিদা। টিনের একটা বাটিতে রাখল। লুছনি (যে ন্যাকড়া দিয়ে গরম হাড়ি কড়াই ধরতে হয়) দিয়ে ধরে সরা সরিয়ে নারকেলের আইচা দিয়ে তৈরি হাতায় হাঁড়ির ভাত দুই তিনবার উলট পালট করে দিল। একটা দুইটা ভাত দুই আঙুলের ডগায় নিয়ে টিপে দেখল ফুটেছে কি না। তারপর হাঁড়ির মুখে আবার সরার ঢাকনা দিয়ে বলল, এই যে কালিজিরা ভর্তা বানাইলাম, একপদ তো অইয়াই গেলো। ভাতের লগে গোলালু সিদ্দ দিছি। টালা মরিচ আর সউষ্যার (সরিষার) তেল দিয়া মইত্তা (মথে) আলুভর্তা বানামু। শেষমেষ বানামু চ্যাবা সুটকির (পুঁটি মাছের বিশেষ এক প্রকার সুটকি) ভর্তা।

এই তিনপদঐ?

হ।

ইলশা মাছের কানসা, ছোবা (ইলিশ মাছের কানকোর ভেতর যে লালচে জিনিসটা থাকে) এই হগলের ভর্তা বানাইবা না?

হামিদা হাসল। পামু কই?

নূরজাহান ঠোঁট উল্টে বলল, কাজিরভাতের লগে ইলশা মাছের কিছু একখান না থাকলে খাইয়া সাদ নাই। হয় কানসা ছোবার ভর্তা, নাইলে কড়কড়া ইলশা মাছ ভাজা, ইলশা মাছের আণ্ডা ভাজা, লুকা (নাড়িভুঁড়ি) ভাজা। ধ্যুৎ আউজকা কাজিরভাত খাইয়া সাদ পামু না।

হামিদা বুঝে গেল মেয়ের ইলিশ মাছ খাওয়ার সাধ হয়েছে। মাওয়ার বাজারে গেলেই পদ্মার তাজা ইলিশ, চকচকে সাদা রঙের উপর নীলচে আভা। গাছিকে বলতে হবে কাজিরভাত খেয়েই যেন বাজারে যায়। প্রথম দিনের রস বেচা পয়সায় যেন একখান ইলিশ মাছ কিনে আনে। মেয়ের সাধটা যেন পূরণ করে।

নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে হামিদা বলল, তর বাপে আহুক, তারে আমি কমুনে।

নূরজাহান অবাক হল। কী কইবা?

তুই যে ইলশা মাছ খাইতে চাইছস হেইডা। আইজ বাজারে পাডামুনে। আইজ ইলশা মাছ আইন্না খাওয়ামুনে তরে।

শুনে আবার মিষ্টি করে হাসল নূরজাহান। তুমি যে আমারে এত আদর করো এইডা কইলাম অনেক সময় বুজি না আমি।

ক্যা?

আদরের থিকা রাগ যে বেশি করো! কোনওহানে যাইতে দিতে চাও না। যাইতে চাইলে গাইল দেও, মারো। একদিন তো বাইন্দাও থুইছিলা। বাবায় আইয়া ছাড়ছে। তুমি আমার লগে এমুন করো ক্যা মা?

সরা সরিয়ে ভাতের হাঁড়িতে হাতা ঢুকাল হামিদা। আন্দাজ করে করে ভাতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিদ্দ গোলআলু তুলতে লাগল : তুলে একটা খোড়ায় রাখতে রাখতে বলল, কেন যে করি হেইডা তুই বুজবি না।

নূরজাহান মুখ ঝামটাল। সব সময় এককথা কইবা না। বুজুম না ক্যা, আমি কি পোলাপান?

নূরজাহানের মুখ ঝামটা শুনে পলকের জন্য তার দিকে তাকাল হামিদা। তারপর দুইহাতে দুইটা লুছনি নিয়ে হাঁড়ির কানা ধরে নামিয়ে চুলার ওপাশে রাখা ছাই রঙের খাদায় ভাত ঠিকনা দিল। দিয়ে ধীর নরম গলায় বলল, তুই যে একখান মাইয়া, তুই যে ডাঙ্গর অইছস এইডা তুই বোজ?

বুজি।

ডাঙ্গর মাইয়াগো কী কী নিয়ম মাইন্না চলতে অয় বোজছ?

বুজি।

এবার মুখ ঘুরিয়ে নূরজাহানের চোখের দিকে তাকাল হামিদা। না বোজচ না।

কে কইছে বুজি না! তুমি আমারে বেবাক বুজাইছো না?

বেবাক না খালি একখান জিনিস বুজাইছি। মাইয়া মাইনষের শইল বড় ভেজাইল্লা জিনিস। নানান পদের ভেজাল আছে এই শইল্লে। হেই হগল ভেজালের একখান তরে বুজাইছি। যেইদিন বুজাইছি ঐদিন তুই ডাঙ্গর অইলি। আর ঐদিন থিকাঐ বিপদটা তর শুরু অইছে। 

কথাটার আগামাথা কিছুই বুঝল না নূরজাহান। বলল, কিয়ের বিপদ?

চুলায় মাটির খোলা বসাল হামিদা। টিনের ছোট্ট একখান পট থেকে চারটা চ্যাপা সুটকি বের করে তপ্ত খোলায় টালতে টলতে বলল, বিপদটার নাম অইলো পুরুষপোলা। একখান মাইয়া যহন ডাঙ্গর অয় আপনা বাপ ভাই ছাড়া দুইন্নাইর বেবাক পুরুষপোলাঐ তহন হেই মাইয়াডার মিহি কুদিষ্টি দিয়া চায়। নানান উছিলায় আতালি পাতালি কথা কইয়া, লোভ দেহাইয়া, ডর দেহাইয়া নাইলে জোর কইরা মাইয়াডার শইলডারে নষ্ট করতে চায়। আর মাইয়া মাইনষের শইল এমুন, একবার নষ্ট অইলো তো সব্বনাশ, বেবাক গেল। হেই শইল আর স্বামীরে দেওন যায় না। দিলে গুনা অয়, জনম ভইরা দোযকের আগুনে জ্বলতে অয়। হিন্দুরা যহন পূজা করে, দেবদেবীরে পূজা দেয়, তহন ফুল লাগে। তাজা ভাল ফুল। বাসি পচা ফুল অইলে পূজা অয় না। দেবতায় অদিশাপ দেয়। মাইয়ামানুষ অইল পূজার ফুলের লাহান। একবার বাসি অইয়া গেলে হেই ফুলে স্বামী দেবতার পূজা অয় না। ডাঙ্গর অওনের লগে লগে এর লেইগাঐ সাবদান অইতে অয় মাইয়ামাইনষের। আলায় বালায় (যত্রতত্র) ঘুইরা বেড়ান যায় না। কুনসুম কোন বিপদে পড়বো কে জানে!

মায়ের কথা শুনতে শুনতে চোখের উপর দুইজন মানুষের মুখ ভেসে উঠতে দেখল নূরজাহান, একজন আলী আমজাদ আরেকজন মজনু। আলী আমজাদের মুখ দেখে ভয়ে শরীরের খুব ভিতরে কেমন একটা কাঁপন লাগল আর মজনুর কথা ভেবে আশ্চর্য এক শিহরণে, আশ্চর্য এক লজ্জায় ডালিম ফুলের আভার মতো মুখখানা তার আলোকিত হল। হামিদা এসবের কিছুই খেয়াল করল না, আগের কথার রেশ ধরে বলল, এর লেইগাঐ তর লগে আমি অমুন করি। একলা একলা কোনওহানে যাইতে দিতে চাই না। তুই তো আমার কথা হোনচ না, এই না হোননের লেইগা একদিন বহুত কানবি। তয় কাইন্দাও হেদিন কোনও লাব অইবো না। যা খোয়াবি তা আর ফিরত পাবি না।

মজনুর কথা ভেবে অন্যরকম হয়ে যাওয়া মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নূরজাহান বলল, আইজ তোমার কথা আমি পুরাপুরি বোজলাম মা। এমুন কইরা তো তুমি আমারে কোনওদিন কও নাই, তাও কমবেশি এই হগল কইলাম আমি বুজি। বেডাগো মুখেরমিহি চাইলে বোজতে পারি, চকের মিহি চাইলে বোজতে পারি। তুমি আমারে এক্কেরে (একেবারে) পোলাপান মনে কইরো না।

বোজলে ভাল না বোজলে মরণ। আইজ তরে আমি বেবাক কথা খুইল্লা কইলাম। অহন তুই বাচবি না মরবি এইডা তর চিন্তা। মাইয়া ডাঙ্গর অইয়া গেলে বাপ মায় যত পাহারা দেউক, ঘরে আটকাইয়া রাখুক, পায়ে ছিকল বাইন্দা রাখুক, মাইয়ায় যুদি নিজে না চায় তাইলে হেয় ভাল থাকতে পারবো না। ভাল থাকনা নিজের কাছে।

একটু থেমে হামিদা বলল, তয় আমার শেষ কথাডা তুই মনে রাখিচ। স্বামীর ঘরে একদিন যাইতে অইবো, শইলডা বাচায় রাখিচ। নষ্ট শইল স্বামীরে দেওনের থিকা বড় গুনা এই দুইন্নাইতে নাই। ঐ গুনাডা কোনওদিন করিচ না।

ঠিক তখনই দবিরকে দেখা গেল খুবই ক্লান্ত ভঙ্গিতে ভার কাঁধে বাড়ির দিকে আসছে। ভার কাঁধে থাকলে দবিরের হাঁটাচলা হয় পালকি কাঁধে থাকা বেহারাদের মতো। যেন হাঁটে না সে, দৌড়ায়। কিন্তু এখন তার হাঁটা একেবারেই ধীর, নরম। কী রকম এক বিষণ্ণতা যেন পা দুইটাকে তার চলতে দিতে চাইছে না। এতটা দূর থেকে তার মুখ চোখ পরিষ্কার দেয়া যায় না তবে বোঝা যায় মুখ ম্লান হয়ে আছে বিষণ্ণতায়, চোখ উদাস হয়ে আছে উদাসীনতায়।

দবিরকে প্রথম দেখল নূরজাহান। দেখে উৎফুল্ল গলায় বলল, মা ওমা, ঐত্তো বাবায় আইয়া পড়ছে।

হাতের কাজ ফেলে হামিদাও তাকাল মানুষটার দিকে। অবাক গলায় বলল, এত তাড়াতাড়ি আইলো কেমতে? যতড়ি গাছে হাড়ি পাতছে ঐড়ি নামাইয়া উড়াইয়া, গিরস্তের রস গিরস্তরে বুজাইয়া দিয়া নিজের ভাগের রস বেইচ্চা বাইত্তে আইতে তো আরও বেইল (বেলা) অওনের কথা!

নূরজাহান তখন তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। তাকিয়ে তার অবস্থাটা বুঝে গেল। মায়ের দিকে মুখ ফিরাল নূরজাহান। চিন্তিত গলায় বলল, দেহো মা, বাবারে জানি কেমুন দেহা যাইতাছে। মরার লাহান আটতাছে, চাইয়া রইছে অন্যমিহি। রসের ঠিল্লা দেইক্কা বুজা যায় ঠিল্লা খালি অয় নাই। রস না বেইচ্চা বাইত্তে আইলো ক্যা বাবায়?

নূরজাহানের কথা শুনে চিন্তিত হল হামিদা। চারপাশে ছড়ান ছিটান কাজের কথা ভুলে, খোলায় পুড়ছে চ্যাপা শুঁটকি, সেই সুটকির গন্ধ ভাসছে সারাবাড়িতে, সেসব ভুলে দূর থেকে হেঁটে আসা গাছির দিকে তাকিয়ে রইল সে।

নূরজাহান বলল, লও তো আউগগাইয়া গিয়া দেহি কী অইছে বাবার!

লগে লগে উঠে দাঁড়াল হামিদা। ল।

দুইজন মানুষ তারপর বাড়িতে ওঠা নামার মুখে এসে দাঁড়াল। কাছাকাছি আসতেই দৌড়ে গিয়ে দবিরের একটা হাত ধরল নূরজাহান। ও বাবা, বাবা কী অইছে তোমার? কী অইছে? এত তাড়াতাড়ি ফিরত আইলা?

দবির কোনও কথা বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উঠানে এসে কাঁধের ভার নামাল বড়ঘরের ছনছায়। (চৌচালা দোচালা একচালা টিনের ঘরের চালা, ঘরের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে যেটুকু বেড়ে থাকে, ঘরের বাইরে যেটুকু জায়গার রোদ বৃষ্টি আটকে রাখে সেই জায়গাটাকে বলা হয় ছনছা। শব্দটা বোধহয় সানশেড থেকে এসেছে)। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসল পিড়ায়।

একটা রসের ঠিলার মুখ থেকে ঢাকনা সরিয়ে ঠিলার ভিতর উঁকি দিল নূরজাহান। ঠিলায় অর্ধেক পরিমান রস। দেখে চমকে উঠল সে। দবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, রস বেচো নাই বাবা?

দবির উদাস গলায় বলল, না।

শুনে আঁতকে উঠল হামিদা। ক্যা?

পরে কমুনে। আগে মাইয়াডারে কও ইট্টু রস খাইতে, তুমিও ইট্টু খাও।

দুইতিন পলক বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে গিয়ে রান্নাচালা থেকে টিনের একটা মগ নিয়ে এল নূরজাহান। নিজেই রস ঢালল মগে। মাত্র চুমুক দিতে যাবে, দবির মন খারাপ করা গলায় বলল, ছনুবুজিরে কইছিলাম বচ্ছরের পয়লা রসটা তারে খাওয়ামু। তারে না খাওয়াইয়া রস বেচুম না। গেছি খাওয়াইতে, গিয়া দেহি ছনুবুজি নাই। মইরা গেছে। মরণের সময় পানির তিয়াস লাগছিল। পানি মনে কইরা মাইট্টাতেল খাইয়া হালাইছে।

বাবার কথা শুনে দিশাহারা হয়ে গেল নূরজাহান। মুখের সামনে থেকে রসভর্তি মগ উঠানে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর কোনওদিকে না তাকিয়ে পাগলের মতো বাড়ির নামার দিকে ছুটে গেল।

.

১.২৯

হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রাদিআল্লাহুআনহু হইতে বর্ণিত আছে, একদা হযরত রাসুলুল্লাহু আলায়হেওয়াসাল্লাম গাধায় আরোহণ করিয়া বনু নাজ্জারের একটি উদ্যানের নিকট দিয়া গমন করিতেছিলেন। আমরাও তাঁহার সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ গাধাটি ভীত হইয়া তাহাকে ফেলিয়া দিবার উপক্রম করিল। সেই স্থানে পাঁচ ছয়টি কবর ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, এই কবরের অধিবাসীদের সম্বন্ধে তোমরা কেহ কিছু জান কি না? একজন বলিল, আমি জানি। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কী অবস্থায় তাহাদের মৃত্যু হইয়াছে? সে বলিল, শিরকীর মধ্যে। তিনি বলিলেন, ইহাদের কবরে ভীষণ আযাব হইতেছে। তোমরা সহ্য করতে পারিবে না বলিয়া আশংকা থাকিলে আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করিতাম যে, আমি যেমন তাহাদের কবরের আযাব শুনিতে পাইতেছি তোমরা যেন সেইরূপ শুনিতে পাও।

খান বাড়ির মসজিদের বারান্দার এককোণে, দেওয়ালে ঢেলান (হেলান দিয়ে বসে আছেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। অল্প দূরত্ব রেখে তার মুখোমুখি বসে আছে বড় মেন্দাবাড়ির লম্বা সোনা মিয়া। মাথায় সাদা টুপি সোনা মিয়ার, গায়ে গেরুয়া রঙের ধোয়া পানজাবি। বুক থেকে গলা তরি চারখান বোম পানজাবির। একটা বোম খসে গেছে। বাকি তিনটা যত্নে লাগান। পরনের লুঙ্গি বেগুনি রঙের। পানজাবিটা পুরানা হয়ে গেছে, দুই এক জায়গায় গেছে ফেঁসে। তবে পানজাবি লম্বা বলে লুঙ্গি পানজাবির আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে। পায়ে স্পঞ্জের একজোড়া স্যান্ডেল ছিল সোনা মিয়ার। স্যান্ডেল দুইটা খুলে একটার গায়ে আরেকটা লাগিয়ে বাঁ দিককার উরুর তলায় রেখেছে। জুতা স্যান্ডেল সবচেয়ে বেশি চুরি হয় মসজিদে। নামাজ পড়তে এসেও তাই নামাজের চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে কেউ কেউ জুতা স্যান্ডেল নিয়ে। মসজিদে ঢোকার আগে বগলে চেপে যেখানে নামাজ পড়ে তার পাশেই রেখে দেয়। সালাম ফিরাবার সময় আড়চোখে দেখে নেয় জায়গা মতন আছে কি না জিনিস দুইটা, নাকি সেজদা দেওয়ার ফাঁকে চুরি হয়ে গেছে।

আল্লাহর ঘরে এসেও চুরি করে কোনও কোনও মানুষ। ছি!

তবে এখন চুরির ভয় নাই। এই সকালবেলা মসজিদের ধারে কাছে আসবে না কেউ। তবু সাবধানের মার নাই বলে স্যান্ডেল দুইটা ওইভাবে রেখেছে সোনা মিয়া, নয়তো মন দিয়ে মাওলানা সাহেবের কথা শোনা যেত না। মন পড়ে থাকত স্যান্ডেলের দিকে। বরাবরই মুখ নিখুঁত করে কামানোর অভ্যাস সোনা মিয়ার। কিছুদিন হল সেই অভ্যাস বাদ দিয়েছে। হঠাৎ করেই মন তার ধর্মের দিকে ঝুঁকেছে। মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব এই মসজিদের ইমাম হয়ে আসার পর, তাঁকে দেখে, তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর মনটা কী রকম যেন হয়ে গেছে। জীবনে আল্লাহ খোদার নাম নেয় নাই, মসজিদে ঢুকে নামাজ পড়ে নাই, সবাই পড়ে বলে ঈদের নামাজটা পড়েছে, তাও সব সময় না, বিশেষ করে কোরবানি ঈদের নামাজ। বাড়িতে গরু বরকি কোরবানি হবে বলে কোরবানি ঈদের সকাল থেকে গরু বরকি নিয়াই ব্যস্ত থাকত। সেই মানুষ হঠাৎ করে বদলে গেল! একজন মানুষ যে কত সহজে আরেকজন মানুষকে নিয়া আসতে পারে ধর্মের দিকে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আর সোনা মিয়া তার প্রমাণ। যে সোনা মিয়া মেতে থাকত গান বাজনা নিয়ে, গ্রামের মাতব্বরি সর্দারি, আমোদফুর্তি আর খেলাধুলা নিয়া, সেই সোনা মিয়া এখন সময়ে অসময়ে এসে মসজিদে বসে থাকে। ইমাম সাহেবের কাছ থেকে ধর্মের কথা শোনে। মুখ কামানো ছেড়ে দিয়েছে। নিখুঁত করে কামানো মুখ আর নাই। এখন শুধু মোচটা কামায়, গাল থুতনি কামায় না। সেখানে কাঁচাপাকা দাঁড়ি দিনকে দিন লম্বা হচ্ছে।

এই বয়সে দাঁড়ি পাকবার কথা না সোনা মিয়ার। কিন্তু বেশ কিছু পেকেছে। দাঁড়ি মোচ ঠিক মতো গজাবার আগ থেকেই ক্ষুর ব্লেড লাগিয়েছিল গালে, অতিরিক্ত চাছাচাছি করেছে, ফলে জাগ দিয়ে বিচ্চাকলা (বিচিকলা) পাকাবার মতো নিজেই নিজের দাঁড়ি মোচ পাকিয়ে ফেলেছে। তবে ওই নিয়া সোনা মিয়ার কোনও মাথাব্যথা নাই। সে এখন অন্যমানুষ। এই যে সকালবেলা ইমাম সাহেব কবর আযাবের কথা বলছেন সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে। শীত পড়ে গেছে। গায়ে পাতলা পানজাবি তবু শীত লাগছে। না। অবশ্য মসজিদের বারান্দা পুবদিকে বলে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে সোনা মিয়ার পিঠে। সেই রোদে বেশ উষ্ণতা। শীত না টের পাওয়ার এটাও একটা কারণ।

মসজিদের বারান্দা ছাড়িয়ে খানিকটা খোলা জায়গা তারপর দুই পাশে ইট রঙের বেঞ্চ দেওয়া বাঁধান ঘাটলা। ঘাটলার অনেকগুলি সিঁড়ি নেমে গেছে পানির দিকে। পানির উপরেরগুলির খবর আছে, গনা যায়, তলারগুলির খবর নাই। পুকুরটা বেশ গভীর। পুকুরের দক্ষিণে মাঠ, এই মাঠের নাম খাইগো বাড়ির মাঠ। পশ্চিম দিকে মসজিদ, মসজিদের উত্তরে ঝাঁপড়ানো আমগাছের তলায় দোচালা লম্বা টিনের ঘরে প্রাইমারি স্কুল। খাইগো বাড়ির স্কুল। স্কুল ঘরটার সামনে সবুজ ঘাসের অনেকখানি খোলা জায়গা। তারপর ভিতরবাড়ি। দালান আছে, বড় বড় টিনের ঘর আছে। এলাকার সবচেয়ে বড় বাড়ি, সবচেয়ে বনেদী বাড়ি। বংশ পরম্পরায় চেয়ারম্যান হচ্ছে এই বাড়ির লোক। যে কোনও সরকারের আমলেই মন্ত্রী এমপি হচ্ছে। সারা বিক্রমপুরে এই বাড়ির নাম, সম্মান।

বাঁধান ঘাটলার পুবে আর উত্তরে আছে আরও দুইখান ঘাটলা। সেই ঘাটলা কাঠের। বাড়ির মেয়েরা ব্যবহার করে বলে ওই দুইটা ঘাটলার তিনপাশে পানিতে খুঁটি পুতে সুন্দর করে বেড়া দেওয়া হয়েছে। এই বেড়া দেখেও বাড়ির আভিজাত্য টের পাওয়া যায়।

আর আছে গাছপালা। বিশেষ করে পুকুরের পুবপারে বড় বড় আমগাছ, জাম বকুলগাছ। সকালবেলার রোদ বেশ খানিকক্ষণ আটকে রাখে এই সব গাছপালা।

আজও রেখেছিল। তবে বেলা হওয়ার পর আর পারেনি। ফলে সোনা মিয়ার পিঠে এসে পড়েছে রোদ, মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের পায়ের কাছে এসে পড়েছে। দেওয়ালে ঢেলান দিয়ে আছেন বলে তার পবিত্র শরীরের অন্যত্র পৌঁছাতে পারেনি রোদ।

প্রাইমারি স্কুল বন্ধ বলে কোথাও কোনও শব্দ নাই। আমগাছের পাতার আড়ালে বসে ডাকছে একটা কাক। দুইটা ভাত শালিক চরছে বাঁধান ঘাটলার কাছে। শীত সকালের রোদে ঝকমক ঝকমক করতাছে চারদিক। এরকম পরিবেশে মসজিদের বারান্দায়, দেওয়ালে ঢেলান দিয়ে বসা মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবকে ফেরেশতার মতো লাগে। এতক্ষণ কথা বলছিলেন তিনি, এখন চুপচাপ হয়ে আছেন। পরনে সাদা চেকলুঙ্গি আর পানজাবি, মাথায় সাদাটুপি, বুক পর্যন্ত নেমেছে শুভ্রদাঁড়ি। মুখখানাও মাওলানা সাহেবের ধবধবে ফর্সা। ছিটাফোঁটা চর্বিও যেন নাই গায়ে, একহারা গড়ন। কথা বলেন ধীর, নরম স্বরে। সেই স্বর শুনে মনেই হয় না এ কোনও মানুষের স্বর, মনে হয় সরাসরি আল্লাহতালার দরবার থেকে আসছে মানুষের জন্য কোনও বাণী।

এরকম মানুষকে কে না শ্রদ্ধা করবে! কে না চাইবে তার কথা শুনতে!

কিন্তু তিনি এমন চুপচাপ হয়ে আছেন কেন? তিনি কেন কথা বলছেন না! সোনা মিয়া তো আসেই তার কথা শুনতে!

সোনা মিয়া আস্তে করে ডাকল, হুজুর।

মাওলানা সাহেব ধীর গলায় সাড়া দিলেন।

সোনা মিয়া অতিরিক্ত বিনয়ের গলায় বলল, অনেকদিন ধইরা ভাবতাছি আপনেরে দুই একখান কথা জিগামু। সাহস পাইতাছি না।

মাওলানা সাহেব নড়েচড়ে বসলেন। পবিত্র মুখ উজ্জ্বল করে হাসলেন। কোনও অসুবিধা নেই। বলুন।

আপনে তো নোয়াখালীর লোক, এত সোন্দর কইরা কথা কন কেমতে?

মাওলানা সাহেব আবার হাসলেন। শিখে নিয়েছি। আমি যদি নোয়াখালীর ভাষায় কথা বলতাম আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারতেন?

জ্বে না হুজুর।

আমার কাজ হচ্ছে ইমামতি করা। মানুষকে আল্লাহ রাসুলের কথা বলা। আমার ভাষাই যদি লোকে বুঝতে না পারে তাহলে সেই কাজ আমি সুন্দরভাবে করব কী করে? আমি যখন নোয়াখালীতে ছিলাম, সেখানকার মসজিদে ইমামতি করেছি, তখন সেই অঞ্চলের ভাষায় কথা বলেছি। নোয়াখালীর বাইরে আসার পর থেকে এখন আপনার সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলছি এই ভাষায়ই কথা বলি। কারণ বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের ভাষা তো আমি জানি না। শুদ্ধ ভাষাটা জানি, এ ভাষায় কথা বললে সব লোকই তা বুঝবে।

সোনা মিয়া গদগদ গলায় বলল, ঠিক কইছেন হুজুর। আরেকখান কথা, আপনে যখন কোরান হাদিসের কথা কন তহন দেহি বইয়ে যেমুন লেখা থাকে অমুন কইরা কন, এইডার অর্থ কী?

ওভাবে বলতে আমার ভাল লাগে। মনে হয় যারা শুনছে তাদেরও শুনতে ভাল লাগছে।

সোনা মিয়া মাথা নাড়ল। জ্বে জ্বে। হোনতে ভাল্লাগে। কন, কবর আযাবের কথা আর কিছু কন হুজুর।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আবার নড়েচড়ে বসলেন। অপার্থিব গলায় বলতে লাগলেন, তিরমিযী শরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহুআনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, মৃতকে কবরস্থ করিবার পর দুইজন কৃষ্ণকায় নীলচক্ষু বিশিষ্ট ফেরেশতা তাহার নিকট আগমন করেন। তাহাদের একজনের নাম মুনকির ও অন্যজনের নাম নাকীর। তাহারা জিজ্ঞাসা করিবেন, এই ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কী বল? মৃতব্যক্তি বলিবে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনও মাবুদ নাই এবং মুহাম্মদ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম তাঁহার বান্দা ও রাসুল। ফেরেশতারা বলিবে, আমরা জানিতাম তুমি এই কথাই বলিবে। অতঃপর তাহার কবরকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে সত্তরগজ প্রশস্ত করিয়া দেওয়া হইবে। পরে তাহার কবরকে আলোকিত করিয়া দিয়া বলা হইবে এবার ঘুমাও। মৃত লোকটি বলিবে, আমার পরিবারের নিকট যাইয়া আমি তাহাদিগকে আমার বর্তমান অবস্থা জানাইতে চাই। ফেরশতাদ্বয় বলিবে, বাসর রাত্রির ন্যায় শয্যা গ্রহণ কর, যেখানে প্রিয়তম ছাড়া অন্যকেহ নিদ্রাভঙ্গ করিতে পারে না। রাসুলুল্লাহ বলেন, এই কবর হইতেই কিয়ামত দিবসে আল্লাহতাআলা তাহাকে উঠাইবেন। আর যদি মৃতব্যক্তি মুনাফিক হয়, সে ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তরে বলিবে, লোকেরা যাহা বলিত তাহা শুনিয়া আমিও তাহাদের ন্যায় বলিতাম, আমি জানি না ইনি কে। ফেরেশতাদ্বয় বলিবে, তুমি যে ইহা বলিবে তাহা আমরা পূর্বেই জানিতাম। অতঃপর কবরকে বলা হইবে, সংকুচিত হও। ফলে তাহা এমনভাবে সংকুচিত হইবে যে মৃতের মেরুদণ্ড চূর্ণ বিচূর্ণ হইয়া যাইবে। এই কবর হইতে কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাহাকে উখিত না করা পর্যন্ত সে এইভাবে আযাব পাইতে। থাকিব।

মাওলানা সাহেবের কথা শেষ হওয়ার বারান্দার অদূরে এসে দাঁড়াল মজনু। মসজিদের বারান্দায় মাওলানা সাহেবকে বসে থাকতে দেখবে ভাবেনি। সে একটু থতমত খেল, ব্ৰিত হল। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এ বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল ঠিকই, মাওলানা সাহেবকে কী কী কথা বলবে তাও ভেবে রেখেছিল, এখন হঠাৎ করেই সবকিছু গুলিয়ে গেল। মাওলানা সাহেবকে যে সালাম দিতে হবে সেকথা পর্যন্ত মন হল না। ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মাওলানা সাহেবের সামনে যে আরেকজন মানুষ বসে আছে, মানুষটা যে মজনুর পরিচিত সেকথাও মনে হল না।

একপলক মজনুকে দেখেই মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তাকে সালাম দিলেন। আসোলামোআলাইকুম। কী চান বাবা?

মাওলানা সাহেব কাকে সালাম দিচ্ছেন দেখবার জন্যে পিছন দিকে মুখ ফিরাল সোনা মিয়া। মজনুকে দেখে খ্যাক খ্যাক করে উঠল। কী রে বেডা, এত বেদ্দপ অইছস ক্যা? হুজুরের সামনে আইয়া খাড়াইছস ছেলামালাইকুম দিলি না? উল্টা হুজুর তরে দিল!

মাওলানা সাহেব হাসিমুখে বললেন, তাতে কোনও অন্যায় হয়নি। সালাম যে কেউ যে কাউকে দিতে পারে, আগে পরের কোনও ব্যাপার নেই।

সোনা মিয়া রাগে গো গো করতে করতে বলল, না হুজর, এইডা ও ঠিক করে নাই। ঐ মউজনা, মাপ চা হুজরের কাছে। পাও ধইরা ক আমার ভুল অইয়া গেছে, আমারে আপনে মাপ কইরা দেন। তাড়াতাড়ি।

মজনুর ততক্ষণে গলা শুকিয়ে গেছে। মুখ গেছে ফ্যাকাশে হয়ে। বুকও দুরদুর করে কাঁপছে। এ কেমন ভুল সে করল আজ! এই ধরনের ভুল তো সে কখনও করেনি! আজ কেন এমন হল!

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তখন তীক্ষ্ণচোখে মজনুকে দেখছেন। সোনা মিয়াও দেখছে। তবে দুইজনের চোখ দুইরকম। একজন দেখছেন মজনুর মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া অন্যজন দেখছে বেয়াদবি। সে বলার পরও হুজুরের পা ধরে কেন মাফ চাইছে না মজনু!

সোনা মিয়া ভাবল বড় রকমের একটা ধমক দিবে মজনুকে। তার আগে মাওলানা সাহেব তাঁর মনোমুগ্ধকর কণ্ঠে বললেন, কী হয়েছে বাবা? আপনাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমার সামনে এসে বসুন। বলুন কী হয়েছে?

এবার মজনু একটু নড়েচড়ে উঠল। ঢোক গিলে কাতর গলায় বলল, একজন মানুষ ইন্তিকাল করছে হুজুর।

ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। তার দেখাদেখি সোনা মিয়াও বিড়বিড় করে পড়ল দোয়াটা। তবে খুবই দ্রুত পড়ল, পড়েই মজনুর দিকে তাকাল। কেডা ইন্তিকাল করতাছে।

ছনুবুড়ি।

আইজ্জার মায়?

হ।

কুনসুম?

রাইত্রে।

সকালবেলা মৃত্যু সংবাদ শুনে যতটা কাতর হওয়ার কথা সোনা মিয়ার ততটা সে হল না। নির্বিকার মুখে হুজুরের দিকে তাকাল।

ব্যাপারটা খেয়াল করেও সোনা মিয়াকে কিছু বললেন না মাওলানা সাহেব। মজনুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার কাছে আপনি কী মনে করে আসছেন বাবা?

মৃত্যু সংবাদ দিয়ে ফেলার পর ভিতরে ভিতরে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে মজনু। মাওলানা সাহেবকে সালাম না দিয়ে যে বেয়াদবি করেছে সেকথা না ভেবে বলল, জানাজাডা যদি আপনে পড়াইতেন।

মওলানা সাহেব কথা বলবার আগেই সোনা মিয়া বলল, ক্যা মন্নান মাওলানারে পাইলি না? হেয় বাইত্তে নাই?

আছে।

তয়?

ছনুবুড়ির জানাজা হেয় পড়াইবো না।

ক্যা?

আপনে তো বেবাকঐ জানেন। আমারে আর জিগান ক্যা?

প্রথমে সোনা মিয়ার দিকে তারপর মজনুর দিকে তাকিয়ে মাওলানা সাহেব অবাক গলায় বললো, কেন, জানাজা তিনি পড়াবেন না কেন?

সোনা মিয়া বলল, যেয় ইন্তিকাল করতাছে সেয় মানুষ ভাল আছিল না হুজুর। কেমন মানুষ ছিল? খারাপ।

কী রকম খারাপ?

মজনুর দিকে তাকিয়ে সোনা মিয়া বলল, ঐ মউজনা তুই ক। তুই আমার থিকা ভাল জানচ। ছনুবুড়ির বাড়ি তগো বাড়ি থিকা কাছে।

মজনু বলল, টুকটাক চুরি করতে হুজুর। তয় বেবাকঐ খাওনের জিনিস। মাইনষের ঝাকার কদু, কোমড়ডা। গাছের আমড়া, গয়াডা। পোলার সংসারে থাকতো, পোলারবউ খাওন দিতো না। এর লেইগাঐ অমুন করতো। আর দুই একওক্ত খাওনের লেইগা একজনের বদলাম আরেকজনের কাছে কইতো। বানাইয়া বানাইয়া কইতো, মিছাকথা কইতো। বহুত কুটনা আছিলো।

মাওলানা সাহেব বললেন, মান্নান মাওলানা সাহেব তাকে চিনতেন?

জ্বে হ চিনতো হুজুর। বহুত ভাল কইরা চিনতো।

সোনা মিয়া বলল, ছনুবুড়িরে দুই মেদিনমোন্ডলের বেবাকতেঐ চিনে।

কিন্তু মান্নান মাওলানা সাহেব তার জানাজা পড়াবেন না কেন? কী বললেন তিনি?

কইলো ছনুবুড়ি চোর আছিলো, চোগলখুরি করতাছে, চোর আর চোগলখোরের জানাজা অয় না। মাডি তারে নিবো না। এই রকম মুদ্দাররে গাঙ্গে ভাসাইয়া দিতে অয় যাতে কাউট্টা (কচ্ছপ) কাছিমে খাইতে পারে, নাইলে মড়কখোলায় হালাইয়া দিতে অয়, কাউয়া চিলে খাইবো, হিয়াল হকুনে খাইবো, কুত্তায় খাইবো।

মাওলানা সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ম্লান মুখে হাসলেন। কথাগুলো তিনি ঠিক বলেননি। নামাজে জানাজা পড়া ফরজে কেফায়াহ। অর্থাৎ কেহ জানাজার নামাজ আদায় না করিলে যাহারা মৃত্যুর সংবাদ পাইয়াছে সকলেই গোনাহগার হইবে। যে কোনও একজন জানাজার নামাজ পড়িলেই ফরজে কেফায়াহ আদায় হইয়া যাইবে। কোনও জানাজার নামাজের জন্য জামায়াত শর্ত বা ওয়াজিব নহে। লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া, কাক শকুনের খাওয়ার জন্য মড়কখোলায় ফেলে দেওয়ার কথা কোনও মুসলমান বলতে পারেন না। মাটি কোনও মানুষকে গ্রহণ করবে না, এ হয় না। এ ভুল কথা। মৃত্যুর পর মানুষের যাবতীয় বিচারের ভার আল্লাহপাকের ওপর। পবিত্র কোরআন শরীফে আছে আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক নন? আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায় বিচারের মানদণ্ড দাঁড় করাইব। সুতরাং কাহারও ওপর কোনও অবিচার করা হইবে না, আর যদি তিল পরিমাণ ওজনেরও কাজ হয় তবু তাহা আমি উপস্থিত করিব; হিসাব গ্রহণ করিতে আমিই যথেষ্ট।

মাওলানা সাহেবের কোনও কোনও কথার অর্থ বুঝল না মজনু, সোনা মিয়াও পুরাপুরি বুঝল বলে মনে হল না, তবে তারা দুইজনেই মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মাওলানা সাহেব বললেন, তিরমিযী শরীফে আছে তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের সৎ কার্যগুলির কথা উল্লেখ কর এবং তাহাদের দুষ্কর্মগুলির কথা উল্লেখ করিও না।

মজনু এবং সোনা মিয়া দুইজনের দিকেই মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। মৃতব্যক্তি সম্পর্কে এই সব কথা আপনারা মনে রাখবেন। আরও দশজনকে বলবেন। তাহলে ভুল ফতোয়াদানকারীরা ফতোয়া দিতে সাহস পাবে না। আরও দুতিনটে হাদিস বলে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলব আমি। তার আগে, বাবা মজনু, আপনি আমাকে বলুন মৃতের গোসল দেওয়া হয়েছে, কাফন দেওয়া হয়েছে?

মজনু বলল, অহনও অয় নাই। তয় ব্যবস্তা অইতাছে।

তাহলে ঠিক আছে। কারণ জানাজা বিলম্ব করা মাকরূহ। যদি জুমআর দিন কাহারও ইন্তেকাল হয় তবে সম্ভব হইলে জুমআ’র পূর্বেই নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করিবে। জুমআ’র সময় লোক সমাগম বেশি হইবে এই উদ্দেশ্যে জানাজা বিলম্ব করা মাকরূহ।

মাওলানা সাহেব একটু থামলেন, আকাশের দিকে তাকালেন, গাছপালা, পুকুরের পানি আর রোদের দিকে তাকালেন। যেন দুনিয়ার মালিক মহান আল্লাহপাককে চোখের দৃষ্টিতে অনুভব করলেন তিনি। তারপর যে কোনও মানুষ মুগ্ধ হতে পারে, আকৃষ্ট হতে পারে এমন গলায় বলতে লাগলেন, বুখারী শরীফে হযরত জাবির রাদিআল্লাহু আনহু হইতে বর্ণিত আছে, একবার আমাদের নিকট দিয়া একটি জানাজা অতিক্রম করিল। তাহা দেখিয়া হয়রত রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তাহার সহিত আমরাও দাঁড়াইলাম। আমরা তাহাকে বলিলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ্! ইহা তো ইহুদীর লাশ। তিনি বলিলেন যখনই কোনও লাশ দেখিবে, উঠিয়া দাঁড়াইবে। কেন রাসুলুল্লাহ এমন করেছিলেন বলুন তো?

মজনু এবং সোনা মিয়া মুখ চাওয়া চাওয়ি করল, কেউ কোনও জবাব দিতে পারল না।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব হাসিমুখে বললেন, অর্থাৎ মৃতব্যক্তি যেই হোক সে তো মানুষ! মানুষের লাশকে সম্মান দেখাতে হবে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে একজন লোক মসজিদে অবস্থান করিতেছিল। একদিনু রাসুলুল্লাহ তাহাকে না দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, সে কোথায়? সকলে উত্তর করিলেন, সে মারা গিয়াছে। তিনি বলিলেন, তোমরা আমাকে উহা জানাইলে না কেন? তাঁহারা বলিলেন, আমরা এটাকে সামান্য ব্যাপার বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, তোমরা আমাকে কবরের নিকট লইয়া চল। অতঃপর তিনি সেখানে যাইয়া জানাজার নামাজ পড়িলেন। তিরমিযী শরীফে আছে, সেই শিশুর কোনও জানাজা নাই যে পর্যন্ত সে শ্বাস প্রশ্বাস না ফেলে এবং চিৎকার না করে এবং সে কাহারও উত্তরাধিকারী নহে এবং কেহ তাহার ওয়ারিশ নহে। এছাড়া প্রত্যেকের জানাজা হবে। মান্নান মাওলানা সাহেব ঠিক বলেননি। বুঝলাম যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি চোর ছিলেন। কী চুরি করতেন? খাদ্যদ্রব্য। পেটের দায়ে একজন অসহায় বয়স্কমানুষ এটা ওটা চুরি করে জীবনধারণ করতাছেন। আপনাদের কথা শুনে বোঝা গেল এলাকার কেউ তাঁকে দুচোখে দেখতে পারত না, শুধুমাত্র এই অপরাধের জন্য। তিনি মিথ্যা বলতেন, কূটনামো করতেন, সবকিছুর মূলে কিন্তু ওই এক সমস্যা। ক্ষুধা, বেঁচে থাকা। যে সমাজ এই ধরনের একজন অসহায় মানুষকে খেতে দিতে পারে না সেই সমাজের কোনও অধিকার নেই তার বিচার করার। তারপরও মৃত ব্যক্তির বিচার করার ক্ষমতা কোনও মানুষের নেই। মৃত্যুর পর যাবতীয় বিচারের ভার। আল্লাহতায়ালার ওপর।

একটু থেমে মাওলানা সাহেব বললেন, যদিও ইসলামী আইনে চুরির সর্বোচ্চ শাস্তি হাতকাটা, কিন্তু তা কখন কার্যকর হবে? এ প্রসঙ্গে বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে হযরত আয়শা রাদিআল্লাহুআনহু হতে বর্ণিত, একদা কোরায়েশ গোত্রের প্রসিদ্ধ মাখজুমী বংশের একজন মহিলা ফাতিমা বিনতে আসাদ ঘটনাচক্রে চুরি করিয়াছিল এবং তাহার মোকদ্দমা রাসুলুল্লার কাছে পেশ হইয়াছিল। এই অভিজাত বংশের মহিলাটির চুরির দায়ে হাতকাটা হইবে এই কথা ভাবিয়া তাহার স্বগোত্রের লোকেরা খুবই বিচলিত হইয়া পড়িল। ফলে তাহারা তাহার শাস্তি রহিত করিবার জন্যে রাসুলুল্লার প্রিয় ব্যক্তি হযরত উসামা রাদিআল্লাহুআনহুর দ্বারা সুপারিশ করাইলেন। এতে রাসলুল্লাহ খুবই অসন্তুষ্ট হইলেন এবং উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে একখানা ভাষণ দিলেন। বলিলেন, শরীয়তের শাস্তি কার্যকরী করিবার ব্যাপারে এই ধরনের সুপারিশ বড়ই গর্হিত। ফাতিমা বিনতে আসাদ কেন যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও এই কাজটি করিত তাহা হইলে অবশ্যই আমি তাহার হাত কাটিয়া দিতাম। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন নয়, একেবারেই অন্যরকম। তাছাড়া যিনি চুরি করে জীবন ধারণ করেছিলেন তিনি মৃত।

মাওলানা সাহেব সোনা মিয়ার দিকে তাকালেন। চলুন বাবা, জানাজা পড়ে আসি।

মজনু বলল, আরেকখান কথা আছে হুজুর। না কইলে অন্যায় হইবো। মরণের আগে মাইট্টাতেল খাইছিলো ছনুবুড়ি।

মাওলানা সাহেব আর সোনা মিয়া দুজনেই চমকে উঠলেন।

সোনা মিয়া বলল, কচ কী!

মাওলানা সাহেব বললেন, আত্মহত্যা করেছে?

মজনু বলল, হেইডা আমি কেমতে কমু! তয় মাইনষে কইতাছে পানির তিয়াস লাগছিলো দেইখা পানি মনে কইরা খাইয়া হালাইছে।

ঘটনা বলল মজনু। শুনে মাওলানা সাহেব বললেন, হয়তো ভুল করেই মেটেতেল তিনি খেয়েছেন। আত্মহত্যা কি না আমরা কেউ তা জানি না। যদি আত্মহত্যা হয়ও, বিধান আছে যদি কেহ আত্মহত্যা করিয়া থাকে তবে তাহার গোসল ও নামাজে জানাজা উভয়ই আদায় করা হইবে। তবে রোজ কিয়ামতের দিন আত্মহত্যার শাস্তি বড় ভয়ংকর। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে, ‘আত্মহত্যাকারী যেভাবে নিজের জীবন সংহার করে, কিয়ামতের দিন তাহাকে সেইভাবেই আযাব দেওয়া হইবে। যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক পাহাড়ের ওপর হইতে পতিত হইয়া আত্মহত্যা করে, তাহাকে দোযখের মধ্যে পাহাড়ের উপর হইতে পতিত করিয়া আযাব দেওয়া হইবে। যে ব্যক্তি বিষপান করিয়া আত্মহত্যা করে, দোযখের মধ্যে তাহাকে অনবরত বিষপান করাইয়া শাস্তি দেওয়া হইবে। যে ব্যক্তি অস্ত্রের সাহায্যে আত্মহত্যা করে, দোযখের মধ্যে তাহাকে পুনঃপুনঃ অন্ত্রের দ্বারা আঘাত করা হইবে।’ বুখারী শরীফে আরও আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহুআলায়হেওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, এক ব্যক্তি স্বাভাবিক মৃত্যুর পূর্বে আত্মহত্যা করে। অতঃপর আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে এরশাদ হইল, হে বান্দা! তুমি নিজের প্রাণ নিজে বিনাশ করিতে অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়াছিলে। অতএব আমি তোমার জন্য বেহেশত হারাম করিয়া দিলাম।

কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। চলুন যাই।

ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত এক ভাল লাগায় তখন মন ভরে গেছে মজনুর। মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বুদ্ধি করে এখানে এসেছিল বলে এতকিছু জানা হল। ছনুবুড়ির জানাজা, দাফন এখন ঠিকঠাক মতোই হবে। আর নয়তো ভুল ধারণায় অবহেলা করা হত মানুষের লাশ।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব আর সোনা মিয়ার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে চারদিকে তাকাচ্ছিল মজনু। সূর্যের আলোয় শীতের আকাশ ভেসে যাচ্ছে, আল্লাহপাকের দুনিয়া ঝকমক ঝকমক করতাছে। গাছপালার বনে ঝিরিঝিরি হাওয়া, শূন্যে উড়ে যায় পাখি। পানির তলা থেকে শ্বাস ফেলতে ভেসে ওঠে মাছ, বিল বাওড়ের উর্বর মাটিতে অংকুরিত হয় শস্যের বীজ, নিরবধিকাল বয়ে যায়, বয়ে যায়। এই সুন্দর দুনিয়া ফেলে কেন যে মরে যায় মানুষ! কেন যে আল্লাহ জীবন দিয়ে পাঠান, কেন যে জীবন ফিরিয়ে নেন, সেই গভীর রহস্যের কথা মানুষ জানে না।

.

১.৩০

আথালের বাইরে মাটির ভুরার (ডিবি) ওপর চারটা গামলা বসান। একেক ভুরাতে একেকটা। ভুরার চারকোণায় চারটা মাঝারি ধরনের মোটা বাঁশের খুঁটি পোতা। খুঁটিগুলি গামলার মাথা ছাড়িয়ে বেশ খানিকদূর উঠেছে। মান্নান মাওলানার বাড়ি তিন শরিকের বড় গিরস্তবাড়ি। পুবে পশ্চিমে লম্বা বাড়ির পশ্চিমের অংশ মান্নান মাওলানার। এই দিকটা সড়কমুখি পড়েছে বলে মান্নান মাওলানার অংশর গুরুত্ব বেশি। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় পুরা বাড়িটাই বুঝি মাওলানা সাহেবের। পিছন দিকে যে আরও দুই শরিকের ঘরদুয়ার বড়সড় উঠান পালান আছে, যারা না জানে তারা কেউ তা অনুমানও করে না। তবে সেই দুই শরিকের যার যার সীমানায় বাড়িতে ওঠা নামার রাস্তা আছে বলে মান্নান মাওলানার সীমানায় তাদের কাউকে প্রায় দেখাই যায় না। নিজেদের অংশে, নিজেদের ঘরদুয়ারে থেকেও তারা থাকে চোরের মতো। মান্নান মাওলানা আর তার ছেলে আতাহারের দাপটে টুশব্দ করে না। যেন বাড়িটা তাদের না, যেন মান্নান মাওলানার বাড়িতে আশ্রিত তারা। মান্নান মাওলানার চাকর বাকর। পান থেকে চুন খসলে তাদের কারও আর রক্ষা নাই।

ওই দুই শরিকের কেউ গ্রাম গিরস্থি করে না। একজনের দুইছেলে জাপানে থাকে। জাপানে এখন অঢেল পয়সা। মাসে এক দেড়লাখ টাকা রোজগার করে একেকজন। দেশে নিয়মিত টাকা পাঠায়। সেই টাকায় পায়ের ওপর পা তুলে খাচ্ছে তাদের মা বাবা ভাইবোন। কিছুদিন ধরে শোনা যাচ্ছে দেশগ্রামে তারা থাকবেই না। বাড়িঘর যেভাবে আছে পড়ে থাকবে, গরিব আত্মীয়স্বজন কেউ এসে থাকবে, তারা চলে যাবে ঢাকায়। সেখানে যাত্রাবাড়ির ওদিকে জাপানি টাকায় জমি কেনা হয়েছে। সেই জমিতে বাড়িও নাকি উঠছে। বাড়ির কর্তা গনি মিয়া প্রায়ই ঢাকায় গিয়ে সেই বাড়ির তদারক করতাছে। এই তারা গ্রাম ছাড়ল বলে।

অন্য শরিকের নাম মন্তাজ। মন্তাজউদ্দিন। বাড়িতে সে থাকে না। ঢাকায় থেকে সদরঘাটে পুরানা কাপড়ের ব্যবসা করে। স্বাধীনতার আগে এক পাকিস্তানি পুরানা কাপড়ের ব্যবসায়ীর কর্মচারি ছিল। খুব বিশ্বাসী ছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও হাতের তালুতে জান নিয়ে মালিকের কাজ করে গেছে। দেশ যখন স্বাধীন হয় হয়, পাকিস্তানিরা যখন বেদম লাথুথি খাওয়া কুত্তার মতো লেজ গুটিয়ে কেঁউ কেঁউ করে পালাচ্ছে তখন মন্তাজের মালিক দোকান আর গুদামের চাবি মন্তাজের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। তুম হামারা বহুত পুরানা আদমি মন্তাজ, সামহালকে রাখখো।

সামলে মন্তাজ ঠিকই রেখেছিল, তবে মালিক হয়ে। সেই গুদামে একশো চল্লিশ গাইট (গাট) মাল ছিল। আর এতবড় দোকান। বছর ঘুরতে না ঘুরতে কোটিপতি হয়ে গেল মন্তাজ। ঢাকায় এখন দুইখান বাড়ি তার। একটা গেন্ডারিয়ায় আর একটা। ওয়ারিতে। একটা ছয়তালা, একটা চারতলা। পাঁচ ছয়টা নাকি গাড়ি। একেক ছেলেমেয়ের একেকটা। নিজের একটা, বউর একটা।

দেশগ্রামে মন্তাজ তেমন আসে না। সত্তর আশি বছর বয়সের বুড়া মা থাকে বাড়িতে। তার দেখাশোনা করে কোথাকার কোনও দূর সম্পর্কীয় অনাথ আত্মীয়া ফিরোজা। মোল সতের বছরের যুবতী মেয়ে।

মাকে মন্তাজ ঢাকায় নেয় না বউর ডরে। মন্তাজের বউ দুই চোখখে তার শাশুড়িকে দেখতে পারে না। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বার তিনেক ঘোরতর অসুখ হয়েছে মন্তাজের মায়ের। চিকিৎসার জন্য মাকে ঢাকায় নিয়ে গেছে ঠিকই মন্তাজ কিন্তু নিজের বাড়িতে রাখেনি, হাসপাতালে রেখে অসুখ সরিয়ে আবার বাড়িতে দিয়ে গেছে।

নিজে না এলেও মায়ের জন্যে কর্তব্য কাজ যা করার সবই করে মন্তাজ। দোকানের কর্মচারি পাঠিয়ে মায়ের খোঁজ খবর নেয়, টাকা পয়সা, অষুধ বিষুধ পাঠায়। ফল পাকুড় পাঠায়। পাটাতন ঘরের কেবিনের জানালার সামনে সারাদিন শুয়ে থাকে মন্তাজের মা আর বকর বকর করে। কী কথা যে বলে, কেন যে বলে কেউ তা জানে না! সংসার সামলায় ফিরোজা। বুড়ি বকর বকর করে আর ফিরোজা নিঃশব্দে কাজ করে।

দুই শরিকের কারোই গ্রাম গিরস্থি নাই বলে, খেতখোলার ঝামেলা নাই, গাই গরুর ঝামেলা নাই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিমছাম উঠান পালান। গেরস্থি যা করার করেন মান্নান। মাওলানা। এত খেতখোলা তার, এতগুলি গাইগরু। বাড়িতে ভাত তরকারি যা রান্না হয় সেই ভাতের ফ্যানে, সেই সব তরকারির ছাল বাকলায় এতগুলি গাইগরুর জাবনা হয় না। তিনবেলা ভাত রান্না হয় বাড়িতে তবু চারটা গামলার দুইটাও পুরাপুরি ভরে না। এই একটা কারণে দুই শরিকের লগে একটু খাতির রাখতে হয়েছে মান্নান মাওলানার। গনি মিয়া আর মন্তাজের মায়ের সংসারে বলা আছে ফ্যান আর তরিতরকারির ছালবাকল। যেন বাড়ির বাইরে ফেলে না দেয় তারা। যেন মান্নান মাওলানার আথালের সামনে যে গামলাগুলি আছে সেই গামলায় ফেলে যায়। গাইগরুগুলো তাহলে ভাল খাওয়া দাওয়া করে রাতের ঘুমটা ভাল দিতে পারবে। ভাল খাওয়া, ভাল ঘুম হলে দুধেরগুলি দেদারসে দুধ দিবে সকালবেলা।

চলছেও সেইভাবেই। তিন শরিকের তিনবেলার দ্রব্যে প্রায় ভরে ওঠে চারখান জাবনার গামলা।

সন্ধ্যার আগে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরে গরুগুলি প্রথমে আথালে বাঁধে মাকুন্দা কাশেম। তারপর মাঝারি কণ্ঠে গান গাইতে গাইতে রান্নাঘরে ঢুকে দুইতিন ঠিলা পানি গরম করে। খৈল ভুষি এসব থাকে রান্নাঘরের এক কোণায়, বিশাল দুইখান হাড়িতে। পানি গরম হলে বালতিতে গরম পানি নিয়ে খৈল ভুষি মিশিয়ে দুইটা করে বালতি দুইহাতে ধরে জাবনার গামলায় এনে ঢেলে দেয়।

দিনভর জমা তরিতরকারির ছালবাকল আর ভাতের সাদাফ্যান মিলেমিশে গামলায় তখন অদ্ভুত একটা গন্ধ। গন্ধটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। খৈল ভুষি মিশানো গরম পানি বালতি বালতি পড়ার লগে লগে বদলে যায় সেই গন্ধ। গাইগরুদের ক্ষুধার উদ্রেক করে এমন একটা গন্ধ বেরয় তখন। গন্ধে গরুগুলি হঠাৎ করে যায় দিশাহারা হয়ে। আথালে বান্ধা গলার সামনে তাদের মোটা শক্ত একখান বাঁশ। আথালের এইমাথা থেকে ওইমাথা পর্যন্ত লম্বা। এই একটা বাঁশেই সার ধরে বান্ধা থাকে গরুগুলি। আথাল থেকে গলা বাড়িয়ে দুইটা করে গরু মুখ দিতে পারে একেকটা গামলায়, গামলাগুলি এভাবে রাখা হয়েছে। খৈল ভুষি মিশান গরমপানি গামলায় পড়বার লগে লগে গরুগুলি যায় পাগল হয়ে। দিশাহারা ভঙ্গিতে গামলায় মুখ দেয়, দিয়েই ছটফটা ভঙ্গিতে মুখ সরিয়ে নেয়। হঠাৎ করে গরম পানিতে মুখ দিলে তো এমন হবেই!

প্রতিদিন একই ভুল করে গরুগুলি। দেখে মাকু কাশেম খুব হাসে। বেশ একটা মজা পায়। মন মেজাজ ভাল থাকলে ঠাট্টা মশকরাও করে গরুদের লগে। হালার গরু কি আর এমতেই গৰু অইছে! রোজঐ মুক পোড়ে, রোজঐ মুক দেয়। মাইনষের লগে গরুর তাফাত অইলো এইডাঐ। মাইনষে এক ভুল বারবারে করে না। গরুরা করে।

আর মেজাজ খারাপ থাকলে মুখে যা আসে তাই বলে গরুদের সে বকাবাজি করে। তবে গরুরা ওসব পাত্তা দেয় না। তারা ব্যস্ত থাকে জাবনা নিয়া। কখন মুখ দেওয়ার মতন ঠাণ্ডা হবে জাবনা, কখন খাওয়া যাবে।

আজও তেমন ভঙ্গিতেই অপেক্ষা করতাছে গরুরা। কাশেমও তার কাজ নিয়ম মতনই করে যাচ্ছে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় কাশেম আজ অন্যরকম। না গান গাইছে না গরুদের লগে ঠাট্টা মশকরা করতাছে, না বাবাজি করতাছে। চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। মান্নান মাওলানা ছিলেন বারবাড়ির দিকে। শীত বিকালের পশ্চিম আকাশে তাকিয়ে সূর্য ডোবার সময়টা দেখতে চাইছিলেন তিনি। খানিক আগে অজু করেছেন। এখনই আজান দেবেন। তারপর বাংলাঘরের চকির উপর, কান্দিপাড়ার ওদিককার কোনও এক মুরিদের সৌদি আরব থেকে এনে দেওয়া পবিত্র কাবা শরীফের চিত্র আঁকা লাল আর সবুজ রঙের। মিশেলে তৈরি মখমলের জায়নামাজে নামাজ পড়তে বসবেন। এ সময় মাথায় সাদা গোলটুপি থাকে তার, হাতে থাকে তসবি। আজান না দিয়ে এ সময় তিনি ভিতর বাড়ির দিকে আসেন না। আজ এলেন। কারণ বারবাড়ির সামনে, নাড়ারপালার সামনে দাঁড়ালেও আথালের দিকে মাকুন্দা কাশেমের সাড়া পান। হয় গান গায় কাশেম না হয় গরুদের লগে কথা বলে। আজ তার কিছুই হচ্ছে না দেখে অবাক হয়ে আথালের সামনে এলেন। পায়ে টায়ারের দোয়াল (বেল্ট) দেওয়া কাঠের খরম। হাঁটলে চটর পটর শব্দ হয়। এখনও হচ্ছিল। সেই শব্দ শুনেও গা করল না কাশেম, নিঃশব্দে নিজের কাজ করতে লাগল। জাবনা দেওয়া হয়ে গেছে, গরম পানির তেজও গেছে কমে। গরুরা মনের আনন্দে খচরমচর শব্দে খেয়ে যাচ্ছে। আথালের অদূরে বসে বড় একখান আইল্লায় (মাটির মালশা) নারিকেল ছোবড়ার আগুন ফুঁ দিয়ে দিয়ে জ্বালাচ্ছে কাশেম। ছোবড়া পুড়ে যখন লাল দগদগে হবে তখন ছিটিয়ে দিবে ধুপ। সাদা ধুমায় আচ্ছন্ন হবে চারদিক, সুন্দর গন্ধ উঠবে, সারাবাড়ি ভরে যাবে সেই গন্ধে।

তবে ধুপটা কাশেম গন্ধের জন্য জ্বালায় না। বহুত মশা হয়েছে বাড়িতে। বাড়ির লোকজনকে তো পায় না, তারা শোয় মশারির ভিতর, মশারা খায় কী! তারা সব এসে পড়ে গুরুগুলির উপর। অবলাজীব, রাতেরবেলা আর ঘুমাতে পারে না। লেজ ঝাপটা দিয়া শুধু মশা খেদায়। এজন্য ধুপ দেয় কাশেম। মোটা লুছনি দিয়ে আইল্লা ধরে আথালে ঢুকে একবার এই মাথায় যায় আরেকবার ওই মাথায়। সাদা ঘন ধুমায় চোখ একেবারেই অন্ধ হয়ে যায় তার। নিজেকেও তখন দেখতে পায় না কাশেম, গরুদেরও দেখতে পায় না। আন্দাজ করে করে হাঁটে। আর ধুপের ধুমায় বেদম আনন্দে ঝোপঝাড় আর কচুরিপানার অন্ধকার থেকে মাত্র বেরিয়ে আসা মশারা তখন গান না ধরে বেদিশা হয়ে পালায়। খুব সহজে এইমুখি আর হয় না। যে বাড়ির আথালে গরু আছে ঠিকই মাকুন্দা কাশেম নাই, ধুপ নাই, তারা তখন সেইমুখি হয়।

কাশেমের অদূরে দাঁড়িয়ে আজ সন্ধ্যায় কাশেমকে খেয়াল করলেন মান্নান মাওলানা। তারপর গলা খাকারি দিয়ে বললেন, ঐ বেডা কী অইছে তর?

আইল্লায় ফুঁ দিতে দিতে কাশেম বলল, কী অইবো! কিছু অয় নাই।

তাইলে যে এত চুপচাপ!

মন ভাল না।

শুনে মান্নান মাওলানা খিক করে হাসলেন। তর আবার মনও আছেনি?

মুখ বন্ধ করে মাওলানা সাহেবের দিকে তাকাল কাশেম। করুণ মুখ করে বলল, হ ঠিক কইছেন। গরিব মাইনষের আবার মন থাকেনি! চাকর বাকরগো আবার মন থাকেনি!

কচ কী! আরে কচ কী তুই! এই পদের কথা কই হিগলি? এক্কেরে বাইসকোপের লাহান কথা!

আবার আইল্লায় ফুঁ দিতে লাগল কাশেম। ফুঁ দিতে দিতে বলল, আপনের আয়জানের সমায় অইয়া গেছে হুজুর। যান আয়জান দেন গা, নমজ পড়েন গা।

মান্নান মাওলানা খ্যাক খ্যাক করে উঠলেন। আমি কী করুম না করুম হেইডা তর চিন্তা করনের কাম নাই। তর কী অইছে ক।

ছনুবুড়ির লাশ দেহনের পর থিকা মন ভাল না। খালি মউতের কথা মনে অয়।

ছনু নামটা শোনার লগে লগে একত্রে অনেকগুলি প্রশ্ন মনে উদয় হল মান্নান মাওলানার। সকালবেলা ছনুবুড়ির মৃত্যুর কথা শোনার পর হলদিয়া চলে গিয়েছিলেন। হলদিয়া বাজারের পুবদিকের এক বাড়িতে বড়মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সেই মেয়ের ঘরের মাজারো নাতির ফ্যারা (হাম) উঠছে। কাজির পাগলা বাজার থেকে নাতির জন্য গান্ধী ঘোষের রসগোল্লা নিয়ে গিয়েছিলেন। আথকা বাপকে দেখে মেয়ে আর জামাই দুইজনেই গেছে দিশাহারা হয়ে। ছেলের অসুখ ভুলে বাপ নিয়ে ব্যস্ত হয়েছে একজন, শশুর নিয়ে ব্যস্ত হয়েছে একজন। মোরগ জবাই করে, চিনিগুড়া চাউলের পোলাও, ঘন দুধ, গান্ধী ঘোষের রসগোল্লা, বেদম একখান খাওয়া হয়েছে। সেই খাওয়া খেয়ে, দুপুরে ঘুম দিয়ে খানিক আগে বাড়ি ফিরেছেন মান্নান মাওলানা। ছনুবুড়ির লাশের কী হল সেসব আর জানা হয়নি। মজনুকে বলে দিয়েছিলেন ছনুবুড়ির জানাজা হবে না, মাটি হবে না। লাশটা ওরা কোথায় ফেলল!

মান্নান মাওলানা বললেন, ঐ কাইশ্যা, চুন্নির লাচ কী করতাছে রে? পদ্মায় নিয়া হালাইছে না মড়কখোলায়?

কাশেম যেন আকাশ থেকে পড়ল। গাঙ্গে হালাইবো ক্যা, মড়কখোলায় হালাইবো ক্যা?

তয় কী করতাছে?

গোড় দিছে।

কই?

গোরস্থানে।

কচ কী?

হ।

জানাজা ছাড়াঐ গোড় দিছে?

জানাজা ছাড়া দিবো ক্যা? মানুষ মরণের পর যা যা করে ছনুবুড়িরেও তা তা কইরা গোড় দিছে।

জানাজা পড়াইলো কে?

খাইগো বাড়ির হুজুরে। মজনু গিয়া তারে ডাইক্কা লইয়াইছে। হুজুর নিজে বইয়া থাইক্কা বেবাক নিয়ম কানন কইয়া দিল। হুজুরের কথা মতন আলার মা বুজানে আরও দুই তিনজন মাইয়ালোক লইয়া ছনুবুড়িরে নাওয়াইলো, কাফোন ফিন্দাইলো। বাড়ির নামায় লাচ রাইক্কা জানাজা পরলো হুজুরে। তারবাদে নিজে লাচ কান্দেও লইলো। বড় মেন্দাবাড়ির লাম্বা সোনা মিয়ায় আছিলো তার লগে। ভাল মানুষ অইছিলো জানাজায়। আমিও গেছিলাম।

এমনিতেই তাঁর কথা অমান্য করে খান বাড়ির মসজিদের ইমামকে এনে জানাজা পড়ান হয়েছে ছনুবুড়ির, ইমাম সাহেব নিজে গেছেন গোরস্থানে, লাশ কাঁধে নিয়েছেন শুনে রাগে ভিতরে ভিতরে ফেটে যাচ্ছিলেন মান্নান মাওলানা। তার ওপর তার বাড়ির গোমস্তা গেছে সেই জানাজায়, এটা তিনি আর সহ্য করতে পারলেন না। হঠাৎ করেই কাশেমের কোকসা বরাবর জোরে একটা লাথথি মারলেন। আচমকা এমন লাথথি, হুড়মুড় করে আইল্লার ওপর পড়ল কাশেম। নিজের ফুঁ দিয়ে জ্বালানো আগুন মুখের একটা দিকে লাগল তার। লগে লগে বাবাগো বলে লাফিয়ে উঠল কাশেম। তার পা হাতে লেগে আইল্লার আগুন ছড়িয়ে পড়ল আধালের সামনের মাটিতে। মান্নান মাওলানা সেসব পাত্তা দিলেন না। পা থেকে পরম খুলে শরীরের সব শক্তি দিয়ে পিটাতে লাগলেন কাশেমকে। অবলা জীবের মতন মার খেতে খেতে, ঙো ঙো করে কাঁদতে কাঁদতে কাশেম তখন একটা কথাই বলছে, আমারে মারেন ক্যা, আমি কী করছি! ওরে বাবারে, ওরে বাবারে। মাইরা হালাইলোরে, আমারে মাইরা হালাইলো!

কাশেমকে সমানে পিটাচ্ছেন বলে কোন ফাঁকে মান্নান মাওলানার মাথার টুপি খুলে পড়ে গেছে মাটিতে, হাতের তসবি পড়ে গেছে সেসবের কোনও দিকেই তার খেয়াল নাই। কাশেমকে পিটাতে পিটাতে দাঁতে দাঁত চেপে তিনি তখন বলছেন, চুতমারানির পো, কাম করো আমার বাইত্তে, খাও আমারডা, জানাজা পড়তে যাও আমার কথা ছাড়া! যেই জানাজা অইব না, যেই জানাজায় আমি যাই নাই ঐ জানাজায় আমার বাড়ির চাকর যায় কেমতে! তুই আমার বাইত থিকা বাইর অ শুয়োরেরবাচ্চা। তর লাহান বেঈমান আমি রাখুম না।

পিটাতে পিটাতে কাশেমকে তখন বারবাড়ির দিকে নিয়া আসছেন মান্নান মাওলানা। বাড়ির নামার দিককার রাস্তার মুখে এনে এমন একখান লাথি মারলেন, সেই লাথথিতে কাশেম গড়িয়ে পড়ল বাড়ির নামায়। তখনও গোঙাচ্ছে। নাকমুখ দিয়ে দরদর করে পড়ছে রক্ত। রক্তে কান্নায় মাকুন্দা মুখটা গেছে বীভৎস হয়ে। এই মুখের দিকে একবারও তাকালেন না মান্নান মাওলানা। আগের মতোই দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগলেন, আমার বাইত্তে তর আর জাগা নাই। এই তরে বাইর করলাম, আমার বাইত্তে তুই আর ঢুকবি না। আমি সব দেকতে পারি, বেঈমান দেকতে পারি না।

খান বাড়ির মসজিদ থেকে তখন ভেসে আসছিল মাগরিবের আজান। সেই পবিত্র সুরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল একজন অসহায় মানুষের কান্না। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিল দিনশেষের অন্ধকার। দুনিয়াদারি মৌন হচ্ছিল গভীর বেদনায়।

১.৩১-৩৫ দবির নরম গলায় ডাকল

দবির নরম গলায় ডাকল, নূরজাহান।

চকির ওপর পাশাপাশি শুয়েছে হামিদা আর নূরজাহান। মেঝেতে নিজের বিছানায় বসে ঘুমাবার আগের তামাকটা খেয়ে নিচ্ছে দবির। অদূরে গাছার ওপর জ্বলছে কুপি। জানলা দুয়ার বন্ধ ঘরের ভিতর ওইট্টুকু আলো বেশ চোখে লাগছে। চারদিকে অন্ধকার, শুধু এক জায়গায় সামান্য আলো। ফলে পরিবেশ থমথমা। এই থমথমা ভাব ভেঙে যাচ্ছিল দবির গাছির তামাক টানার শব্দে।

নূরজাহান দুই তিনবার এপাশ ওপাশ করেছে, দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। তবে হামিদার লড়াচড়া নাই, সাড়াশব্দ নাই। আজ সারাদিন বেশ একটা ধকল গেছে তার। যে ধকল শীতের মাঝামাঝি থেকে কোনও কোনওদিন যাওয়ার কথা সেই ধকল শীতের প্রথম দিনেই হামিদার উপর দিয়ে একবার গেল। প্রথম দিনকার রস বিক্রি না করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল দবির। দিনভর সেই রস জ্বাল দিয়ে তোয়াক করেছে হামিদা। তার ওপর সংসারের অন্যান্য কাজকাম তো ছিলই। নূরজাহান বাড়িতে থাকলে সেও হাত লাগাতে মায়ের লগে। একা সবদিক সামলাতে হতো না হামিদাকে। কিন্তু নূরজাহান বাড়িতে ছিল না। সকালবেলা সেই যে মুখের রস ফেলে ছুটে গিয়েছিল ছনুবুড়িকে শেষ দেখা দেখতে, মুর্দারের খাট কাঁধে পুরুষ মানুষরা গোরস্থানের দিকে রওনা দেওয়ার অনেক পর বাড়ি ফিরেছে। তখন পুরাপুরি বিকাল। সারাদিন পেটে কিছু পড়ে নাই তার উপর কানছে (কেঁদেছে), চোখ দুইটা ফুলা ফুলা, লাল, মুখটা শুকাইয়া ছোট হয়ে গেছে। দবির যাচ্ছিল হাঁড়ি পাততে, নূরজাহানকে দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল তার। যেন মা বাবার মতোই কোনও আপনজন ছেড়ে গেছে নূরজাহানকে। মানুষের জন্য এত মায়া মেয়েটার!

নূরজাহান আবার পাশ ফিরল, আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

আগেরবার ডেকে মেয়ের কোনও সাড়া পায় নাই দবির। আবার ডাকল, নূরজাহান।

নূরজাহান ধীর গলায় সাড়া দিল। উ।

কী গো মা, ঘুম আহে না?

না বাবা।

ক্যা গো মা?

কইতে পারি না। মনডা জানি কেমুন লাগ্র।

আমার কাছে আইয়া হুইবা?

হ।

আহো।

চকি থেকে নামল নূরজাহান। দবিরের কোলের কাছে এসে বসল।

হুঁকা রেখে একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল দবির। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ছনুবুজি মইরা গেছে দেইক্কা এমুন লাগতাছে তোমার, না মা?

হ বাবা।

বাপ যখন জড়িয়ে ধরে নূরজাহানকে বয়স কমে যায় তার, শিশু হয়ে যায়। এখনও হল। বাপের বুকের লগে মিশে গেল নূরজাহান।

গভীর মমতায় মেয়ের মাথায় পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে দবির বলল, বেবাক মাইনষেরঐ একদিন না একদিন মরণ লাগবো মা, এইডাঐ দুইন্নাইর নিয়ম।

নূরজাহান কাতর গলায় বলল, এমুন নিয়ম ক্যা দুইন্নাইর?

দুইন্নাইডা যে বানাইছে এইডা তার নীলাখেলা মা। জীবন দিবোও হে, নিবোও হে।

তাইলে মাইনষের মনের মইদ্যে এত মায়া মহব্বত দেওনের কাম আছিলো কী? কাইল বিয়ালেও যেই মানুষটা আছিল আইজ বিয়ানে হেয় নাই। এই কষ্ট অন্য মাইনষে সয় কেমতে!

দবির কথা বলল না, কুপির আলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

নূরজাহান বলল, ছনুফুলুর লগে আমার আর কোনওদিন দেহা অইবো না, দেশ গেরামে ঘোরতে ঘোরতে কোনওদিন আর দেহুম না মাডির মিহি বেকা অইয়া রাস্তা দিয়া আইট্টা যাইতাছে ফুবু। এর কথা অরে কইতাছে, কাইজ্জাকীত্তন লাগায় দিতাছে। একদিন দেহি মেন্দাবাড়ির ঝাকা থিকা পটপট কইরা কয়ডা ঢেরস ছিঁড়ল। এইমিহি চায়, ওইমিহি চায় আর ছিঁড়ে। আমি দৌড়াইয়া উটতাছি বাইত্তে, আমারে দেইক্কা এমুন শরম পাইলো! পয়লা মুখখানা গেল কালা অইয়া, তারবাদে হাসলো। কেঐরে কইচ না মা! খিদা লাগছে তো এর লেইগা ছিড়লাম। কাঁচা ঢেরস চাবাইয়া খাওন যায়। খাইতে সাদ, পেডও ভরে। কী করুম ক! পোলারবউ ভাত দেয় না। ঢেরস কোছরে গুইজ্জা হাজামবাড়ি মিহি গেল গা ফুবু। বাবা, আইজ হারাদিন আমার খালি এই কথাডা মনে অইছে। ফুবু আমারে দেইক্কা শরম পাইছিল, কইছিলো কতাডা আমি যেন কেঐরে না কই। আমি কই নাই বাবা, কোনওদিন কেঐরে কই নাই। আইজ পয়লা তোমারে কইলাম। ফুবু মইরা গেছে দেইক্কা কইলাম।

ফোপাইয়া ফোপাইয়া (ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে) কাঁদতে লাগল নূরজাহান। জড়ানো গলায় বলতে লাগল, আল্লায় মাইনষের পেডে এত খিদা দিছে ক্যা বাবা? ক্যা দিছে এত খিদা! জীবন দিছে, মরণ দিছে, খিদাডা দেওনের কাম আছিলো কী!

.

১.৩২

মিয়াদের পুকুরপারের পুরানা হিজল গাছটার তলায় খালি গায়ে বসে আছে মাকুন্দা কাশেম। গায়ের রঙ বাইল্লামাছের মতো বলে হিজলের ছায়ায় ফুটে আছে সে।

ঝাঁকিজাল হাতে আলফু যাচ্ছিল পুকুরের পুব দক্ষিণ কোণে। সেখানে পুকুরপার ভরা কাশের জঙ্গল আর পুকুরের পানিতে ঠাসাঠাসি কচুরি। কচুরি আর কাশের রঙ প্রায় একরকম। শুধু ফুল ফুটেছে দুই রঙের। কাশফুল মানুষের মাথার পাকা চুলের মতো আর কচুরিফুল গ্রাম রমণীর হাতের চুড়ির মতো, নীল বেগুনীতে মিশানো। পানির তলায় ডুবে থাকা কচুরির ছোবা (ছোবড়া) দেখতে মান্নান মাওলানার দাঁড়ির মতো। মান্নান মাওলানার দাঁড়ির ভিতর যেমন লুকিয়ে থাকে নানারকম শয়তানি এই পুকুরের কচুরির ছোবার ভিতর তেমন করে লুকিয়ে থাকে কই রয়না খলিসা ফলি। সুযোগ পেলেই মান্নান মাওলানা যেমন কাঁকুই দিয়ে দাঁড়ি আঁচড়ান প্রায় তেমন করেই কোনও কোনওদিন ঝাঁকিজাল দিয়ে কচুরির চাক বেড় দেয় আলফু। কচুরির ছোবার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জিয়ল মাছ ধরে ঘোপায় (মাছ জিয়াবার মাটির হাঁড়ি) রাখে।

দাঁড়ির ভিতর লুকিয়ে থাকা শয়তানিও কি প্রায় এই কায়দাই মনের ভিতর জিইয়ে রাখেন মান্নান মাওলানা!

আজ সকালে ঝাঁকিজাল কাঁধে, হাতে পোড়ামাটির বড় একটা ঘোপা, পুকুরের দিকে যেতে যেতে এই কথাটা মনে হল আলফুর। মান্নান মাওলানা যে এত বদ, ছনুবুড়ির মৃত্যুর দিন আলফু তা টের পেয়েছে। মজনুর মুখে সব শুনে আলফুর মতো লোকও বুঝে গিয়েছিল সব মিথ্যা, সব শয়তানি মান্নান মাওলানার। ভুল ফতোয়া দিয়েছে সে। মানুষের মৃত্যু নিয়েও এমন করতে পারে মানুষ! তাও যার নামের শেষে আছে মাওলানা! মাথায় টুপি, মুখে দাঁড়ি, হাতে তসবি। কথায় কথায় আল্লাহর নাম নিচ্ছে কিন্তু করতাছে সব বদকাজ! মানুষ এমন হয় কী করে!

পাশাপাশি মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের কথাও মনে পড়ল আলফুর। ফেরেশতার মতো পবিত্র মানুষ। আচার আচরণ কথাবার্তা সব মিলিয়ে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব হচ্ছেন যথার্থ পরহেজগার, সৎ ধার্মিক মানুষ। কী যত্নে কী মমতায় ছনুবুড়ির জানাজা পড়লেন, লাশ কাঁধে নিয়ে গেলেন গোরস্থানে।

এসব ভেবে মনে মনে মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবকে সালাম দিল আলফু আর মান্নান মাওলানাকে দিল খুব খারাপ দুই তিনটা বকা। বিড়বিড় করে বলল, মুখে খালি দাঁড়ি থাকলেঐ অয় না, মাথায় খালি টুপি থাকলেঐ অয় না, দিল সাফ থাকতে অয়, মাইনষের লেইগা মহব্বত থাকতে অয়, কোরান হাদিস ঠিক মতন জানতে অয়, নাইলে মাওলানা অওন যায় না।

ঠিক তখনই হিজলতলায় বসে থাকা মাকুন্দা কাশেমকে দেখতে পেল আলফু। কাশেমের মুখ দেখতে পেল না, পেল পেছন দিকটা। তবু কাশেমকে চিনতে অসুবিধা হল না। এরকম গায়ের রঙ এই গ্রামে আর কারও নাই।

তবে কাশেমকে দেখে অন্যরকমের একটা অনুভূতি হল আলফুর। মাত্র মান্নান মাওলানার কথা ভেবেছে, মান্নান মাওলানাকে বকাবাজি করেছে ঠিক তখনই কি না তার বাড়ির গোমস্তাকে বসে থাকতে দেখল মিয়া বাড়ির হিজলতলায়! অবাক কাণ্ড! এর মধ্যে আল্লাহ্পাকের কোনও ইশারা নাই তো! নাকি মান্নান মাওলানা কোনও অলৌকিক ক্ষমতায় আলফুর মনে মনে দেওয়া গালি শুনতে পেয়েছেন? বাড়ির গোমস্তাকে সেজন্য পাঠিয়েছেন এখানে!

মুখে কথা কম বলা হয় বলে মনে মনে সারাক্ষণই কথা বলে আলফু। এখনও তেমনই বলতে লাগল। আমি হুনছি বদ মাওলানারা কুফরি কালাম জানে। কুফরি কালামের জোরে কি মাকুন্দা কাশেমরে পাডাইছে এহেনে!

ততক্ষণে হিজলতলায় এসে পড়েছে আলফু। তার পায়ের শব্দ পেল না কাশেম। যেমন বসেছিল বসে রইল। পিছন ফিরে তাকাল না।

কিন্তু পিঠে এমুন দাগ ক্যান কাইশ্যার! কী অইছে? পিঠে আর ঘেটিতে ফ্যারা উঠলে যেমুন অয় তেমুন বিনবিনা গোটা।

এই সব দেখে খানিক আগের ভাবনা চিন্তা মন থেকে হাওয়া হয়ে গেল আলফুর। অবাক গলায় কাশেমকে ডাকল সে। ঐ কাইশ্যা।

আলফুর দিকে মুখ ফিরাল কাশেম। কাতর চোখে আলফুর দিকে তাকিয়ে রইল।

তার দিকে মুখ ফিরাবার পর কাশেমের মুখ দেখে চমকে উঠল আলফু। মুখটা বীভৎস হয়ে আছে। নিচের ঠোঁটের মাঝ বরাবর কেটে ঝুলে পড়েছে ঠোঁট। ডানদিকের চোখের কোণ এমন করে ফুলছে, চোখটাই ঢাকা পড়ছে। গাল কপাল ভরা দাগ, থ্যাতলানো, ফুলা ফুলা। মুখ আর মানুষের মুখ মনে হয় না।

দিশাহারা গলায় আলফু বলল, কী অইছেরে তর? মুখহান এমুন ক্যা?

আলফুর কথার জবাব দিতে পারল না কাশেম। পানিতে চোখ ভরে এল। কাঁদতে লাগল সে।

কাঁধের ঝাঁকিজাল মাটিতে রেখে কাশেমের পাশে বসল আলফু। একটা হাত রাখল তার কাঁধে। গভীর সহানুভূতির গলায় বলল, কী অইছে তর, আমারে ক। কে মারছে?

অতিরিক্ত কষ্ট পাওয়া মানুষ যখন কাঁদে, যত নিঃশব্দেই কাঁদতে থাকে তারা, বুক ঠেলে বেরয় তাদের অদ্ভুত কষ্টের এক শব্দ। কাশেমের কান্নার লগেও মিশে যাচ্ছিল তেমন শব্দ। সেই শব্দে বুক তোলপাড় করতে লাগল আলফুর। কাশেমের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ক আমারে, ক, কে মারছে তরে?

কাশেম জড়ান গলায় বলল, হুজুরে।

ক্যা? কী অন্যায় করছস তুই?

ছনুবুজির জানাজা পড়ছি এইডা আমার অন্যায়।

কচ কী!

হ।

দুই হাঁটুর মাঝ বরাবর মুখ নামিয়ে লুঙ্গির খুঁটে চেপে চেপে চোখ মুছতে লাগল কাশেম। কান্না তবু কমল না। জড়ানো গলায় বলল, খালি মাইরাঐ ছাইড়া দেয় নাই, বাইত থিকাও বাইর কইরা দিছে। কইছে ওই বাইত্তে আমার আর জাগা নাই। ঐ বাইত্তে উটলে আমারে হেয় জব কইরা হালাইবো। জন্মের পর থিকা ওই বাইত্তে থাকি আমি। অন্য কোনওহানে গেলে ঘুম আহে না। লাতথি দিয়া হুজুরে আমারে বাড়ির নামায় হালায় দিছে। তাও রাইত দোফরে, বাড়ির বেবাক মানুষ ঘুমাইয়া যাওনের পর বাড়ির সামনের নাড়ার পালাডায় গিয়া হুইয়া রইছি। এক পলকের লেইগাও ঘুমাইতে পারি নাই। মাশায় আমারে খাইয়া হালাইছে। দেহ শইলডা কী করতাছে! এতেও আমার কোনও দুঃখ নাই। মাশায় আমারে যত ইচ্ছা খাউক, আমি খাই কী! দুইদিন ধইরা না খাইয়া রইছি। আলফু ভাই, সব কষ্ট সইজ্জ করন যায়, খিদার কষ্ট সইজ্জ করন যায় না। এত মাইর মারলো হুজুরে, এত বেদনা শইল্লে, খিদার কষ্টে হেই বেদনা আমি উদিস পাই না। আমার মা বাপ নাই, ভাই বইন নাই, কার কাছে যামু আমি! কে আমারে একওক্ত খাওন দিব?

হাঁটুতে মুখ গুঁজে আবার কাঁদতে লাগল মাকুন্দা কাশেম।

.

১.৩৩

দোতালা ঘরের খাটাল থেকে খুনখুনা গলায় ডাকতে লাগলেন বড়বুজান। কুট্টি রে, ও কুট্টি, এইমিহি ইট্টু আয়। তাড়াতাড়ি আয় বইন।

রান্নাঘরের সামনে বসে মাছ কুটছিল কুট্টি। দুইটা শোলটাকি (ছোট শোল। বাচ্চা অর্থে) কুটে ছাই আর মাছের আঁশ নিয়েছে ভাঙা কুলায়, পোড়ামাটির খাদায় নিয়েছে কোটা মাছ। মাছ ধুতে ঘাটে যাওয়ার আগে মাছের আঁশ আর ছাই ফেলে যাবে চালতাতলায়, খাদা কুলা হাতে মাত্র উঠে দাঁড়িয়েছে তখনই ওই ডাক। তবে ডাকের লগে বইন কথাটা খুব কানে লাগল কুট্টির। এই বাড়ির মানুষ খুব সহজে আদরের ডাক ডাকে না কাউকে। বিপদে পড়লে ডাকে আর নয়তো কাউকে দিয়ে কোনও বাড়তি কাজ আদায় করতে হলে। বড় বুজানের কী এমন কাজ পড়ল! সকালবেলার সব কাজ সারিয়ে, কুট্টি বের হয়েছে সংসারের অন্যকাজে। সেটা তো বেশিক্ষণ হয় নাই।

রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিল কুট্টি, সাড়া দেওয়ার কথা মনে ছিল না। বড় বুজান আবার ডাকলেন। কুট্টিরে, ও বইন, হোন না?

এবার সাড়া দিল কুট্টি। কী কন?

এইমিহি ইট্টু আয়।

ক্যা?

কাম আছে।

আমি অহন আইতে পারুম না। মাউচ্ছা হাত (মাছের গন্ধ আঁশ ইত্যাদি লেগে থাকা হাত)।

মাউচ্ছা হাতে কিছু অইবো না। আয় বইন।

বুজানের কাতর অনুনয়ে যেমন বিরক্ত হচ্ছিল কুট্টি তেমন মায়াও লাগছিল। নিশ্চয় কোনও ঝামেলা হয়েছে নয়তো এসময় এমন করে ডাকতো না।

কুলা মাছের খাদা একপাশে নামিয়ে রেখে রান্ধনঘরের সামনে রাখা ঠিলা কাত করে খলবল করে হাত দুইটা ধুয়ে নিল কুট্টি। শাড়ির আঁচলে হাত মুছে মাছের খাদা নিয়ে দোতালা ঘরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। কুলা পরে পরিষ্কার করলেও হবে। এখন বড় বুজানকে দেখে উত্তর দিকের বারান্দা টপকে ঘাটে গিয়ে মাছটা ধুয়ে আনলেই হবে। তাছাড়া মাছ এভাবে ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না। কাউয়া চিলের ভয় আছে, বিলাইয়ের ভয় আছে। বাচ্চা দেওয়া বিলাইটা সারাক্ষণ কাতর হয়ে আছে ক্ষুধায়। খেয়ে না খেয়ে পাঁচটা বাচ্চা পাহারা দিচ্ছে ঘরে বসে। চারদিন হল জায়গা বদল করেছে। ঘেটি (ঘাড়) কামড়ে ধরে একটা একটা করে বাচ্চা এনে রেখেছে বড় বুজানের পালঙ্কের তলায়। যতবার খেতে বসে ততবারই টিনের চলটা ওঠা বাটিটায় করে মাছের কাটাকোটা, নিজের পাতের মাখা ভাত কিছুটা পালঙ্কের তলায় রেখে আসে কুট্টি। তবু ক্ষুধা বিলাইটার কমে না। সুযোগ পেলেই এইটা ওইটা নিয়া দৌড় দেয়।

খাটালের পালঙ্কের সামনে এসে কুট্টি বলল, কী অইছে বুজান?

পালঙ্কের কাঁথা কাপড়ের ভুরের ভিতর জেগে আছে বড় বুজানের মাথা। শীত পড়তে না পড়তেই শীতে বেদম কাতর হয়েছেন তিনি। হাত পা আর মুখের কুঁচকানো চামড়ায় খড়ি উঠেছে। মাথায় চুল বলে কিছু নাই, সব উঠে গেছে। পাকা বেলের মতো মাথায় লেগে আছে একেবারেই সাদা দুই একটা চুল। মুখ শুকাইয়া এতটুকু হয়ে গেছে। শীতের সকালে পুকুর থেকে ডাঙায় উঠে কাউট্টা যেমন শক্ত খোলসের ভিতর থেকে মাথা বের করে রোদ পোহায়, কাঁথা কাপড়ের ভিতর থেকে বের হয়ে থাকা বড় বুজানের মুখ মাথা এখন তেমন দেখাচ্ছে।

কুট্টির কথা শুনে ফোকলা মুখে হাসবার চেষ্টা করলেন তিনি। বয়স আর শরীরের চাপে এমন হয়েছে চেহারা, হাসি কান্নার ভাব একই রকম। কুট্টি বুঝতেই পারে না কোনটা হাসি কোনটা কান্না।

এখনও পারল না। মনে হল বুজান কাঁদছেন। বলল, কী অইছে? কান্দেন ক্যা?

বুজান খিক করে হাসির শব্দ করলেন। কান্দি না, হাসি।

ক্যা? হাসনের কী অইছে?

অইছে একটা কাম।

তাড়াতাড়ি কন। ঘাডে যামু। কোডা মাছ লইয়া ঘরে আইছি। বেইল উইট্টা গেছে। ভাত চড়ামু।

আমি বইন একখান খারাপ কাম কইরা হালাইছি।

কী?

কইতে শরম করতাছে।

ইস আমার কাছে আবার শরম! মার কাছে ল্যাংটা পোলার শরম আছেনি!

বুজান কাঁচুমাচু গলায় বললেন, পেশাব কইরা দিছি।

শুনে কুট্টি খ্যাক খ্যাক করে উঠল। ক্যা আমারে ডাক দিতে পারলেন না? আমি মইরা গেছিনি?

কুনসুম করছি, উদিস পাই নাই।

এমতে দিহি পান। এমতে দিহি চিল্লাইয়া গলার রগ ছিড়া হালান। ও কুট্টি ডহি বাইর কর, আমি পেশাব করুম। অহন চিল্লাইতে পারলেন না? খালি আমার কাম বাড়ায়! বেবাক কেথা কাপোড় অহন রইদ্দে দেওন লাগবো। পশশু দিন নাওয়াইয়া দিছি আইজ আবার নাওয়ান লাগবো। নাওয়াইতে যে জানডা বাইর অইয়া যায় আমার হেইডা কেঐ বোজে? পানি গরম করো, পোলাপানের লাহান কুলে কইরা ফিরিতে (পিঁড়িতে) নিয়া বহাও। ইস জানডা শেষ কইরা হালাইলো আমার! মাজরো বুজানে ঢাকা যাওনের পর বুজছিলাম অহন কয়ডা দিন আরামে থাকুম, কাম ইট্টু কমবো, কীয়ের কী, আরও দিহি বাড়তাছে!

মাছের খাদা পায়ের কাছে নামিয়ে রাখল কুট্টি। আগের মতোই গজ গজ করে বলল, পেশাব করনের সমায় মাইনষে আবার উদিস না পায় কেমতে!

বুজান অপরাধীর গলায় বললেন, এমুন তো কোনওদিন অয় নাই। আইজঐ পয়লা। তিন চাইর বচ্ছর ধইরা বিচনায় পড়ছি কোনওদিন এমুন অয় নাই। শীতের দিনে মাইনষের ইট্টু ঘন ঘন পেশাব অয়। হের লেইগা বিচনায় পেশাব করুম, এমনু। কোনওদিন অয় নাই। এই শীতটা টিকুম তো! নাকি এইবারের শীতে উড়াইয়া নিবো আল্লায়! মরণের আগে বলে এমুন অয় মাইনষের। কী করে না করে উদিস পায় না!

মৃত্যুর কথা শুনে ভিতরে ভিতরে দমে গেল কুট্টি। শীতের শুরুতেই ছনুবুড়ি গেল, আবার যদি বড়বুজানও যায়!

মৃত্যুর কথা ভাবলে বুকের ভিতর কেমন করে কুট্টির। মনে হয় দেশ গ্রামের একেকজন মানুষ একেকটা গাছ, বাড়ির একখান ঘর। সেই ঘর ভেঙে নিলে সেই গাছটা কেটে ফেললে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায়, শূন্য হয়ে যায়। সেই শূন্যতার দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে। বড়বুজান যদি না থাকে, বড়বুজান যদি মরে যায় তাহলে এই পালঙ্কটা খালি হয়ে যাবে। হঠাৎ করে খাটালে ঢুকলে বুকটা ছ্যাত করে উঠবে কুট্টির। একজন মানুষের শূন্যতা কেমন করে সয় অন্য মানুষ! ছনুবুড়ির শূন্যতা কেমন করে সইছে তাদের বাড়ির লোক!

বড়বুজান বলল, তুই চেতিচ না বইন। আমারে ইট্টু উডা। বিচনাডা বদলাইয়া দে। ভিজা জাগায় হুইয়া থাকতে ভাল্লাগে না।

কুট্টি নরম গলায় বলল, আর ইট্টু থাকেন। ঘাডে গিয়া মাছ ধুইয়াহি আমি, তারবাদে চুলায় পানি গরম দিয়া আইয়া বেবাক কেথা কাপোড় রইদ্দে দিমুনে। আপনেরেও নাওয়াইয়া দিমুনে। ইট্টু সবুর করেন।

বড়বুজান বিগলিত গলায় ললেন, আইচ্ছা বইন, আইচ্ছা।

পায়ের কাছ থেকে কোটা মাছের খাদা ভোলার জন্য উপুড় হল কুট্টি ঠিক তখনই খাদা থেকে মুখ তুলে চঞ্চল ভঙ্গিতে পালঙ্কের তলার অন্ধকারে ছুটে গেল বিলাইটা। মুখে কামড় দিয়ে ধরা দুই টুকরা মাছ। কুট্টিকে বড়বুজানের লগে কথা বলায় ব্যস্ত দেখে, মাছের গন্ধে পালঙ্কের তলা থেকে বেরিয়ে আসছিল সে। একদিকে বড়বুজান কাজ বাড়িয়েছে অন্যদিকে বিলাইতে লইয়া যায় কোটা মাছ, অন্য সময় হলে এইসব নিয়া গলা চড়াত কুট্টি। খানিক আগে যেটুকু চড়িয়েছিল তারচেয়ে শতগুণ চড়াত। কিন্তু এখন তেমন কিছুই করল না। বিলাইটার জন্যও অদ্ভুত এক মায়া হল তার। খাউক, দুই টুকরা মাছই তো! না খাইতে পাইয়া বিলাইডা যুদি মইরা যায়, এই যে ঘরের ভিতরে টুকটাক ঘুইরা বেড়ায়, খাইতে বইলে পাতের সামনে ঘুরঘুর করে, ম্যাও ম্যাও করে আর নাইলে আল্লাদ দেহায় এই হগল কুট্টি পাইবো কই! ঘর খালি খালি মনে অইবো না!

.

১.৩৪

ঘন কচুড়ির তলার পানি এমন ঠাণ্ডা হয়, খরালিকালে ডুব দিয়ে কচুরির তলায় গেলে শরীর জুড়ায় আর শীতকালে গেলে শরীর হিম। প্রথমে কাঁটা দেয় শরীরে তারপর শক্ত হতে থাকে। এজন্য শীতকালে কচুরির তলায় যেতে হলে কেউ কেউ খুব জুত করে সউষ্যার তেল মাখে গায়ে। তেল মাখার সময় হাত দুইটা শরীরের এইদিক ওইদিক ঘুরপাক খায় বলে শরীরে এমনিতেই তৈরি হয় এক ধরনের উষ্ণতা, তার ওপর আছে তেলের উষ্ণতা। দুয়ে মিলে কচুরির তলার পানিকে কাবু করা যায়। তবে কচুরি তোলা আর চাক বেড় দিয়ে মাছ ধরার ব্যাপার থাকলে পানিতে নামার লগে লগে পানির ঠাণ্ডায় ধরতে না ধরতেই কাজের চাপে গরম হয় শরীর, পানির ঠাণ্ডা তো উদিস পাওয়া যায়ই না, একটু পর লাগে গরম। ঘাড় গলা, বুক পিঠ ঘামতে শুরু করে।

এই এখন যেমন হচ্ছে আলফুর।

মাকুন্দা কাশেমকে নিয়ে একটু আগে পুকুরের পুব দক্ষিণ কোণে আসছে সে। পুকুরপারে কাশঝোপের কাছে কাশেমকে বসিয়ে লুঙ্গি কাছা মেরে ঝাঁকিজাল নিয়ে নিজে নেমে গেছে কচুরি ভর্তি পুকুরে। পুকুরের একদিকটায় এখনও হাত পড়েনি। এমনিতেই ঘন কচুরি এখানটায় তার ওপর পারে আছে কাশ, কাশের শিকড় বাকড় তো আছেই, কোনও কোনও নুয়ে পড়া কাশও এসে লেপটে পড়েছে পানিতে, কচুরির ওপর, ফলে জংলা মতন জায়গটাকে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে পুকুরের বাছা বাছা মাছগুলি নিশ্চয় এখানে এসে থান গাড়ছে। আলফু আজ সেই মাছ ধরবে। একটানা বেশ কয়েকদিন বাড়িতে থেকে আজ তিনদিন হল বাড়ির কর্তী চলে গেছেন ঢাকায়। যে কয়দিন বাড়ি ছিলেন তিনি আলাম (আস্ত) একটা মাছও পড়েনি আলফুর পাতে। এত মাছ ধরে জিইয়ে রাখে ঘোপায়, হলে হবে কী কোনও কোনও ওক্তে মাছের চেহারাই দেখে নাই। কর্ত্রী বেজায় কৃপণ মানুষ। নিজে খেয়ে শেষ করে গেছেন ঘোপার সব মাছ।

আলফু ভেবেছিল কর্ত্রী চলে যাওয়ার পরদিনই পুকুরে নামবে। বাছা বাছা কিছু মাছ ধরে কুট্টিকে বলবে বেশি করে তেল মশলা দিয়ে রান্না করতে। তারপর দুইটা তিনটা করে আলাম মাছ দিয়া ভাত খাবে একেকবেলা। যে কদিন মাছ খেতে পারে নাই সেই কয়দিনেরটা উসিল করবে। কিন্তু দুইটা দিন কেটে গেছে পুকুরে আলফু নামতে পারেনি। একটা দিন গেল ছনুবুড়ির মৃত্যু নিয়ে আরেক দিন সকাল থেকেই আলস্য লাগল। এই সব কারণে আজ আর কোনও কিছু ভাবে নাই আলফু, কোনওদিকে তাকায় নাই, পুকুরে এসে নামছে।

আলফু যখন পুকুরে নামছে মাকুন্দা কাশেম কাতর গলায় বলল, আমিও তোমার লগে নামুম মিয়াবাই?

আলফু বলল, না। তুই বইয়া থাক। খালি একখান চাক উডামু। ঘণ্টাহানির কাম। একলা পারুম। তারবাদে বাইত যামু। কুট্টি ততক্ষুণে রান্দন বাড়ন সাইরা হালাইবো। তরে আমার লগে বহাইয়া খাওয়ামুনে। দুইডা দিন কষ্ট করছস, আর ইট্টু কষ্ট কর।

হেইডা পারুম। তয় আজাইরা থাকলে খিদা বেশি লাগে মিয়াবাই। আমি তোমার লগে নামি?

আলফু হেসে বলল, লুঙ্গি তো ভিজ্জা যাইবো!

যাউক।

ভিজা লুঙ্গি ফিন্দা দিন কাডাবি?

ক্যা আমার আরেকখান লুঙ্গি আছে না।

কো?

কাশেমের মনে পড়ল লুঙ্গিটা মান্নান মাওলানার বাড়িতে রয়ে গেছে। লুঙ্গি কেন তার নিজের ব্যবহারের কোনও জিনিসই সে ওই বাড়ি থেকে আনতে পারিনি।

মার খাওয়া মুখটা আবার বিষণ্ণ হয়ে গেল কাশেমের। চোখ দুইটা ছলছল করে উঠল। লুঙ্গিহান বাইত্তে রইয়া গেছে মিয়াবাই। আমারে যে বাইত থিকা বাইর কইরা দিছে, আমি যে ঐ বাইত্তে আর যাইতে পারুম না এই কথাডা আমার মনে থাকে না। ভুইল্লা যাই।

চোখের পানি সামলাতে অন্যদিকে তাকাল কাশেম।

আলফু বলল, এই হগল চিন্তা কইরা অহন আর মন খারাপ করি না। তুই পুরুষপোলা না, কী রে বেডা, পুরুষপোলাগো এমুন মুলাম (মোলায়েম) মন অইলে কাম অয়নি? বাইত থিকা বাইর কইরা দিছে দেইক্কা কী অইছে! শইল্লে জোরবল নাই তর? অন্য বাইত্তে গিয়া কাম লবি। আর যেই বাড়ির মাইনষে তরে বিনা দোষে এমুন মাইর মারছে হেই বাইত্তে তো তর এমতেঐ যাওন উচিত না। হেই বাইত্তে ফিরা যাওনের আশা ছাইড়া দে। অন্য বাড়ি দেক। অন্য বাইত্তে কাম ল।

হাত দিয়ে ডলে ডলে চোখ মুছল কাশেম। হুজুরের বাড়ির গোমস্তারে এই গেরামের কোনও বাইত্তে কামে রাখবো না।

আলফু অবাক হল। ক্যা?

হুজুরের ডরে। গেরামের বেবাক মাইনষেঐ হুজুররে ডরায়। হের পোলা আতাহাররে ডরায়। আমারে কামে রাইক্কা হেগো শতরু অইবো কেডা?

তাইলে কনটেকদার সাবের কাছে যা, মাইট্টাল অ। দিন গেলে নগদ টেকা পাবি।

ওহেনেও ভেজাল আছে। আতাহারে অইলো কনটেকদার সাবের দোস্ত।

আলফু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তুই তো তাইলে এই গেরামেই থাকতে পারবি না। অন্য গেরামে গিয়া কাম কাইজ কইরা খাইতে অইবো তর।

হেইডা আমি পারুম না মিয়াবাই।

ক্যা?

আমি কোনওদিন এই গেরাম ছাইড়া কোনওহানে যাই নাই, কোনওহানে গিয়া থাকি নাই। একদিন এই গেরামে আমগো বাড়িঘর আছিলো, বাপ দাদারা আছিলো, চাচারা আছিল, অহন আর কেঐ নাই। কে গেছে মইরা, কেঐ গেছে দেশ গেরাম ছাইড়া। রক্তের আততিয় স্বজন কে কোনহানে আছে কইতে পারি না। এই গেরামডারেঐ মনে। অয় আমার আততিয়। আমার বাপ দাদা, ভাই বেরাদর, চাচা ফুবু, বেবাক মনে হয় এই গেরামডারে। এই গেরাম ছাইড়া আমি কোনওহানে যামু না। মইরা গেলেও যামু না।

কাশেমের কথা শুনে অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়েছিল আলফু। তারপর পানিতে নামছে। ঝকিজালটা হাতেই ছিল। শক্ত, মোটা সুতার জাল। ঘন করে কাঠি দেওয়া। একটু লম্বা ধরনের লোহার কাঠি। গাবের কষে প্রায়ই ভিজিয়ে রাখা হয় বলে কড়কড়া শুকনা বেগুনির কাছাকাছি রঙের শক্ত জাল। পাঁচ সাত কেজি ওজনের রুই বোয়ালেরও সাধ্য নাই এই জাল ছিঁড়ে বের হয়। ঘন করে কাঠি দেওয়া বলে জালের ওজনও বেশ। পানির তলায় গিয়ে এমন করে ছড়ায় জাল, ওজনদার বলে কাঠিগুলি গেঁথে যায় কাদায়। কাদার ভিতর লুকিয়ে থাকা শাল গজার তরি কাদা ভেঙে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। জালে আটকা পড়তেই হয়। তবে আলফুর মতো দশাসই জুয়ান ছাড়া এই জাল বাওয়া কঠিন। ছুঁড়ে জায়গা মতো ফেলা তো দূরের কথা, এক হাতে রশি ধরে অন্যহাতে বারোহাতি জাল কায়দা করতেই জান বের হয়ে যাবে।

এই জালে আজ চাক বের দিবে বলে জালের বারো চৌদ্দ হাত লম্বা রশিন গুটিয়ে গরুর মুখের ঠুলির মতো গোল করেছে আলফু। এমন করে গিটঠু দিয়েছে যাতে রশিটা খুলতে না পারে। চাক বেড় দেওয়ার সময় রশি খুলে যদি পানির তলায় ছড়িয়ে যায়, পানির তলায় লুকিয়ে থাকা কোনও বঁটাখাঁটির লগে যদি প্যাঁচায়া যায় তাহলে লাগবো আরেক ভেজাল। অতিকষ্টে কচুরির তলা দিয়ে টেনে নিয়ে চারদিক থেকে কচুরির দশ বারোহাতি চাক বেড় দিয়ে যখন কচুরি তুলে ফেলতে ফেলতে গুটিয়ে আনা হবে জাল, হয়তো তখনই পানির তলায় জড়িয়ে যাওয়া রশির টানে কচুরির তলা থেকে সরে যাবে জাল। পালাবার তক্কে থাকা মাছগুলি পালিয়ে যাবে। সামান্য ভুলের জন্য পরিশ্রমটাই মাটি। এজন্য আগেভাগেই কাজটা সেরে রাখছে আলফু।

নিঃশব্দে কচুরির জঙ্গল ফাঁক করে আলফু যখন পানির গভীরে আগাচ্ছে তখনই ঘাটলায় মাছ ধুতে এসে তাকে দেখতে পেল কুট্টি। দেখে আনমনা হল। সেই যে একদিন চালতাতলায় আলফুর ঘাড়ের কাছে একটুখানি রোদ পড়ে থাকতে দেখে শরীরের খুব ভিতরে অন্যরকমের একটা অনুভূতি হয়েছিল, এতদূর থেকে আলফুকে দেখে আজও ঠিক তেমন অনুভূতিই হল। সব ভুলে আলফুর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। পুকুরপারে যে তারেকজন মানুষ আছে কুট্টি তাকে দেখতেই পেল না।

.

১.৩৫

হাঁটাচলা করতে পারে না এমন পোলাপানকে যেমন করে ঘরে আনেন মা, নাওয়াইয়া ধোয়াইয়া (গোসল টোসল) পাথালি কুলে (পাঁজাকোল) নেন, ঠিক তেমন করে বড়বুজানকে ঘরে নিয়ে এল কুট্টি। পেশাবে দুর্গন্ধ হওয়া কথা কাপড় আগেই রোদে দিয়েছিল। খাটালের পালঙ্কে এখন অন্য তোষক বিছানো। তোষকের উপর অন্য কাঁথা, সাদা গিলাপ লাগান অন্য বালিশ, শীতকালের জন্য তুলে রাখা লেপও বের করা হয়েছে। কটকটা লাল রঙের লেপখান ঢোকান হয়েছে ঠিক সাদা না সাদার কাছাকাছি রঙের ওসারে (ওয়ার)। এসবই ভোলা ছিল ছোটখাট ঘরের সমান টিনের আলমারিতে। দীর্ঘদিন আলমারি বন্দি থাকার ফলে লেপ তোষকে ঘুম ঘুম গন্ধ হয়। বড়বুজানের পালঙ্কে এখন সেই গন্ধ। খুব সহজ প্যাঁচে বড়বুজানকে যখন সাদা কাপড় পরিয়ে পালঙ্কের ওপর বসিয়েছে কুট্টি, মানুষটার মুখে তখন গভীর প্রশান্তির হাসি। খুনখুনা গলায় বললেন, বহুত আরাম লাগতাছে রে বইন।

শুনে কপট রাগের গলায় কুট্টি বলল, আরাম তো লাগবোঐ! আরামের কাম কইরা দিলাম যে! আপনের আরামের লেইগা আমার যে কী খাটনিডা গেল হেইডা তো একবারও চিন্তা করলেন না!

কে কইছে চিন্তা করি নাই? করছি। তয় চিন্তা কইরা কী করুম ক? আমি আতুর লুলা মানুষ, আমার কিছু করনের আছে!

বড়বুজান কাত হয়ে শুয়ে পড়তে চাইলেন। দুইহাতে তাকে ধরল কুট্টি। ইট্টু পরে হোন।

ক্যা?

শইল্লে ইট্টু তেল দিয়া দেই।

শরীরে তেল ডলে দেওয়ার কথা শুনে খুশি হলেন তিনি। ফোকলা মুখ হাসিতে ভরে গেল। এটা যে কান্না না, এটা যে আনন্দের হাসি বুজানের মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারল কুট্টি। তার মুখেও হাসি ফুটল। ইস তেল দেওনের কথা হুইন্না দিহি আল্লাদে আর বাচে না! হাসে কী!

আমার হাসন তুই বোজছ! তুই দিহি কচ আমি হাসি না কান্দি বুজা যায় না। অহনকার বোজলাম।

খাটালের ছোট্ট আলমারির মাথার উপর রাখা সউষ্যার তেলের শিশি নিয়ে এল কুট্টি। এক হাতের তালুতে একটু তেল ঢেলে দুইহাতে সেই তেল ঘষে প্রথমে বুজানের মাথায়, তারপর হাতে পিঠে বুকে ডলতে লাগল। ডলায় ডলায় শিশুর মতো দোল খেতে লাগলেন বড়বুজান। শীতের দিনে সউষ্যার তেল শইল্লে দিলে শইল গরম থাকে। শীত লাগে কম।

কুট্টি বলল, তয় একখান কামও বাড়ে।

কী কাম?

শইল্লের বেবাক তেল লাইগ্যা যায় বিচনায়। বিচনা নষ্ট হয়।

বুজান একটু চমকালেন। ঘোলা চোখে কুট্টির মুখের দিকে তাকালেন। হ এইডা তো ঠিক কথা কইছস! আইজঐ নতুন লেপ তোষক বাইর করলি আইজই হেইডি নষ্ট অইবো! তাইলে আমারে তেল দেওলের কাম আছিলো কী!

তেল ডলতে ডলতে কুট্টি বলল, এত কষ্ট কইরা এত কাম আপনের লেইগা আইজ করলাম, এডু আর বাকি রাখুম ক্যা! বিচনা নষ্ট অইলে আমার কাম বাড়বো! আপনের কী?

তুই খুব ভালরে বইন, খুব ভাল।

কেডা কইছে আমি ভাল! আমি দিহি খালি আপনের লগে রাগ দেহাই, কাইজ্জা করি! ভাল অইলাম কেমতে!

কো কাইজ্জা করচ!

করি না?

যা করচ ওইডা কাইজ্জা না।

তয় কী?

ঐডা তর সবাব। যে কোনও কামে পয়লা ইট্টু চিল্লাচিল্লি করচ, তারবাদে হেই কামডাঐ খুব ভাল কইরা করচ। এই হগল মাইনষের ভিতর খুব ভাল অয়।

কুট্টি একটু উদাস হল। ভিতর ভাল অইলে কী অইবো? ভিতর তো মাইনষে দেহে না!

যারা মাইনষের ভিতর দেহে না তারা মানুষ না। তারা আমানুষ।

দুইন্নাইতে আমানুষঐ বেশি। জন্মের পর থিকা মা বাপরে দেকলাম, তাগো পেড়ে জন্মাইলাম, তাগো কুলে বড় অইলাম, তারা কেঐ আমার ভিতরডা দেকলো না। হাত পাও বাইন্দা হতিনের ঘরে ঘর করতে পাডাইলো। হতিন তো হতিনঐ, হেয় আমারে কী বুজবো! যার লগে বিয়া অইলো হেই মানুষটাঐ কিছু বোজলো না! পেডের কষ্ট তো আছে, মনের কষ্টও আছে। যে কোনও একখান কষ্ট মাইনষে সইজ্জ করতে পারে দুইখান করে কেমতে! খাইতেও দিবো না মনও বুজবো না হেই মাইনষের ঘর কেমতে করে মাইনষে!

তেল ডলা শেষ করে বড়বুজানকে শোয়াইয়া দিল কুট্টি। গলা তরি লেপ টেনে দিল। বড়বুজান তখন ঘোলা চোখ দুইখান মায়াবি করে তাকিয়ে আছেন কুট্টির দিকে।

কুট্টি বলল, চাইয়া রইলেন ক্যা?

তরে দেকতাছি।

আমারে আবার দেহনের কী অইলো! এমুন পচামুখ মাইনষে দেহে

আমি তর মুখ দেহি না, আমি তর ভিতরডা দেহি। তর লাহান একখান মাইয়া যুদি আমার থাকতো, এই দুইন্নাইতে আমার তাইলে কোনও দুঃকু থাকতো না।

আর আমার মা বাপে আমারে বাইত্তে যাইতে দেয় না। আমার মুখ দেহে না।

তর মা বাপে মানুষ না। আমানুষ।

তয় তাগোও আমি দোষ দেই না। দোষ দেই আমার কপালের। বিয়ার বস (বয়স) অওনের পর থিকা জামাই লইয়া, জামাইবাড়ি লইয়া কতপদের চিন্তা করছি। কত খোয়াব দেকছি। চিন্তা করছি এক, খোয়াব দেকছি এক, অইছে আরেক।

কুট্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বড়বুজান বললেন, আমার যুদি একখান পোলা থাকতো, হেই পোলার যদি তর লাহান একখান বউ থাকতো, আহা রে, কত খুশি অইতাম আমি।

দখিনা দুয়ার দিয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে কুট্টি বলল, বিয়ার আগে চিন্তা করছি জামাই বাইত্তে গিয়া আমার হরির (শাশুড়ি) বেবাক কাম কইরা দিমু আমি। হৌরের বেবাক কাম কইরা দিমু। গিয়া দেহি হৌরও নাই হরিও নাই। আছে একখান হতিন, তার এলাগেন্দা পোলাপান।

বিয়ার আগে তুই হোনচ নাই হতিনের ঘর?

না।

কচ কী!

হ। আমারে কেঐ কয় নাই। বুজান, আপনের কাম কাইজ যহন কইরা দেই, আপনেরে নাওয়াই থোয়াই, খাওয়াই ঘুম লওয়াই তহন আপনেরে আর দেহি না আমি। দেহি বিয়ার আগে খোয়াবে দেহা আমার হরিরে। দেহি আমার জামাই বাড়িডা। যেন আমি আমার হরির কাম কাইজ করতাছি। যেন আমি আমার জামাই বাইত্তেঐ আছি। আমি তহন আর আউজকার আমি থাকি না। আমি অইয়া যাই কহেক বচ্ছর আগের আমি।

কুট্টির কথা শুনে বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ল বড়বুজানের। গভীর দুঃখের গলায় বললেন, বহুত ছোডকালে বিয়া অইছিলো আমার। ছয় সাতমাস জামাইর ঘর করছিলাম। তারবাদে জামাই মরলো। আগের দিনে ভাল বংশের মাইয়ারা রাড়ি (বিধবা) অইলে হারা জনম রাড়ি থাকতো। তাগো আর বিয়া অইতো না। আমারও আর বিয়া অয় নাই। বাপের অবস্তা ভাল আছিলো দেইক্কা বাপে আমারে আর জামাই বাইত্তে রাখে নাই। বাপের বাইত্তে লইয়া আইছিল। একভাই দুইবইন আছিলাম আমরা। ভাইডা বেবাকতের ছোড়। ঘোড অইলে কী অইবো হেয়ঐ গেল বেবাকতের আগে। অহন আছি খালি রাজা মিয়ার মায় আর আমি। দুই বইনে খুব খাতির আছিলো আমগো, অহনও আছে,এর লেইগা জনম ভর বইনে আমারে টানলো। বইনের সংসারে জীবনডা কাইট্টা গেল আমার। স্বামী সংসার বোজনের আগে বিয়া অইছিলো, বোজনের আগে রাড়ি অইলাম। জীবনের সাদ আল্লাদ কিছুই বোজলাম না। স্বামী সংসার, পোলা মাইয়া, পোলার বউ, মাইয়ার জামাই, নাতি নাতকুর সব মিলাইয়া মাইয়াছেইলাগো যেইডা জীবন হেই জীবন আমি কোনওদিন চোক্কে দেকলাম না। একটা জীবন জীবন না অইয়া কাইট্টা গেল। কুট্টিরে, তর জীবনডাও দেকতাছি আমার লাহান। দিনে দিনে দিন চইলা যাইবো, একদিন দেকবি আমার লাহান বিচনায় পড়ছস, আর উইট্টা খাড়ঐত পারবি না। তহন খালি মনে অইবো জন্মাইছিলাম ক্যা! মাইনষের আসল যেই জীবন হেই জীবনঐ যদি না পাইলাম তয় জন্মাইছিলাম ক্যা!

বড়বুজানের কথা শুনে কখন যে কাঁদতে শুরু করেছে কুট্টি, কখন যে চোখের পানিতে গাল ভাসতে শুরু করেছে, কুট্টি তা টের পায়নি।

পালঙ্কের তলায় বিলাইয়ের বাচ্চাগুলি তখন কুঁইকুই করতাছে। বোধহয় ক্ষুধা লেগেছে তাদের, বোধহয় মায়ের সঙ্গে আল্লাদ করতাছে।

১.৩৬-৪০ ভোলে কইরা ভাত দেও

১.৩৬

আলফু বলল, ভোলে কইরা ভাত দেও।

কুট্টির চোখ দুইটা ফুলা ফুলা, সেই চোখে আনমনা চাউনি। মুখ থমথম, দুঃখি। তবু আলফুর কথা শুনে অবাক হল। ক্যা?

কুট্টির মুখের দিকে তাকাল না আলফু। বলল, এমতেঐ। ভাত সালুন যা দেওনের একবারে ভোলের মইদ্যে দিয়া দেও আমি রান্দনঘরের ওহেনে বইয়া খামু।

আলফু ভাত খায় দোতলা ঘরের সামনের বারান্দায় বসে। রান্না হয়ে যাওয়ার পর ভাত তরকারি সব দোতালা ঘরের বারান্দায় নিয়ে আসে কুট্টি। এই ঘরের ভিতর দিককার বারান্দাটা খোলা না। খাটালের মতোই আরেকটা অংশ। বাইরের দিককার দরজা বন্ধ করে দিলে বারান্দা ঢুকে যায় ঘরের ভিতর। বারান্দার পশ্চিম কোণে ভাত সালুনের হাঁড়ি কড়াই, থাল বাসন এসব রাখার ব্যবস্থা। সেই জায়গায় বসে মাত্র ভাত বাড়বে কুট্টি তখনই এই কথা বলল আলফু। কথা প্রায় বলেই না সে। ভাত বাড়া হলে কুট্টি ডাকে। নিঃশব্দে বারান্দায় এসে বসে। যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে, কোনওদিকে না তাকিয়ে চলে যায়। সেই আলফু আজ কুট্টি না ডাকতেই ঘরে এসে ঢুকেছে। তারপর ওই কথা। অন্যসময় হলে যতটা অবাক হত কুট্টি, বড়বুজানের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে আছে বলে অত অবাক সে হয়নি। টিনের মাঝারি গামলায় ভাত বাড়তে বাড়তে আনমনা গলায় বলল, সালুন আইজ ভাল না। শোলটাকি কুটছিলাম, দুই টুকরা খাইয়া হালাইছে বিলাইতে। রানও মনে অয় ভাল অয় নাই। বড়বুজানরে লইয়া কাম পইড়া গেছিল।

কুট্টি যখন এই ধরনের কথা বলে আলফু চুপ করে থাকে। আজ চুপ করে রইল না। কথা বলল। ঘোপায় মাছ আছিল না। রানবা কই থিকা! তয় ম্যালা মাছ ধরছি আইজ। ষোল্লডা এত বড় বড় কই। রয়না খইলসা ফলি, শোল টাকি, গজার টাকি। তিন ঘোপা ভইরা হালাইছি। রাইত্রে ভাল কইরা রাইন্দো।

আলফুর কথা শুনে খারাপ হয়ে থাকা মন কেন যেন একটু হালকা হয়ে উঠল কুট্টির। যেন আরও কথা বললে আরও হালকা হবে মন। এক সময় পুরাপুরি ভাল হয়ে যাবে।

আলফুর চোখের দিকে তাকিয়ে কুট্টি বলল, রান্ধনঘরের সামনে বইয়া খাওনের কাম কী! এহেনেঐ বহেন।

আলফু অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, না থাউক।

ক্যা? রোজ তো এহেনেঐ বহেন।

আইজ বমুনা।

একথায় কুট্টি একটু ঠাট্টা করল। ক্যা আমার বোগলে (সামনে) বইয়া খাইতে শরম করে! আমার চেহারা খারাপ হেইডা আমি জানি। এই চেহারার সামনে বইয়াঐ তো আগে খাইতেন। আইজ আথকা কী অইলো! চেহারা কি বেশি খারাপ অইয়া গেছে আমার!

কুট্টির কথা শুনে পলকের জন্য তার দিকে তাকাল আলফু। বলল, এই হগল কথা কইয়ো না। যে তোমার চেহারা খারাপ কয় মাইনষের চেহারা হে বোজে না।

এ কথায় কুট্টির ভিতরটা কেমন করে উঠল! আলফুর দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। আশ্চর্য এক লজ্জায় গা কাঁটা দিয়ে উঠল। সেই যে সেদিন চালতাতলায় আলফুকে দেখে যেমন হয়েছিল, আজ ঘাটে দাঁড়িয়ে যেমন হয়েছিল ঠিক তেমন এক অনুভূতি শরীরের খুব ভিতরে এখনও হল। কিছুতেই আলফুর দিকে আর তাকাতে পারল না সে। দ্রুত হাতে ভাত সালুন বেড়ে, থাল দিয়ে গামলার মুখ ঢেকে আলফুর হাতে দিল। এলুমিনিয়ামের জগের একজগ পানি দিল, একটা মগ দিল। সেসব নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল আলফু।

আলফু চলে যাওয়ার পর নিজের জন্য ভাত বাড়বে কুট্টি, বাড়তে ইচ্ছা করল না। ক্ষুধা যেন নাই তার, ক্ষুধা যেন মরে গেছে। কেন যে আলফুর মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছা করতাছে, কেন যে ইচ্ছা করতাছে রান্ধনঘরের সামনে বসে কেমন করে ভাত খাচ্ছে আলফু একটু দেখে আসে। ভাত কম হল কিনা তার, তরকারি কম হয় কিনা দেখে আসে।

কিছু না ভেবে বাইরে এল কুট্টি। এসেই থতমত খেল! খান্দনঘরের সামনে আলফু নাই। ভাত পানি নিয়া কোথায় গেল! কোথায় বসে খাচ্ছে। এই বাড়ির অন্যকোনও ঘরও তো খোলা নাই যে সেই ঘরে বসে খাবে। ব্যাপার কী!

আলফুকে খুঁজতে আমরুজতলায় এল কুট্টি। না সেখানে কেউ নাই। ভর দুপুরের নির্জনতায় খা খা করতাছে আমরুজতলা। একটা শালিক টুকটুক করে লাফাচ্ছে সাদা মাটিতে। শালিকটা চোখে পড়ল না কুট্টির। তার মনে তখন একটাই চিন্তা। ভাত পানি নিয়া কোথায় উধাও হয়ে গেল একজন মানুষ!

পশ্চিম দক্ষিণের ঘর দুইটার মাঝখানকার চিকন রাস্তায় কুট্টি তারপর চালতাতলায় এল। এসেই থতমত খেল। চালতাতলায় সামনা সামনি বসে ভাত খাচ্ছে আলফু আর মাকুন্দা কাশেম। আলফু খাচ্ছে গামলায় করে, থাল দিয়েছে কাশেমকে। কোনওদিকে না তাকিয়ে গপাগপ গপাগপ খেয়ে যাচ্ছে কাশেম।

কিন্তু কাশেমের মুখটা এমন কেন? এমন হয়েছে কী করে!

কুট্টি যখন এসব ভাবছে তখন হঠাৎ করেই পিছন ফিরে তাকাল আলফু, তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেল। খাওয়া ভুলে কুট্টির দিকে তাকিয়ে রইল।

.

***

১.৩৮

শীতের বিকাল দ্রুত পড়ে যায়। বিকালেই হয়ে যায় সন্ধ্যা। আজকের সন্ধ্যা যেন আরও তাড়াতাড়ি হয়েছে। কখন বিকাল হল কখন ফুরাল কুট্টি তা টেরই পেল না। দুপুরবেলা চালতাতলায় বসে ওইভাবে দুইজন মানুষকে ভাত খেতে দেখার পর মনটা কেমন হয়ে আছে। নিজের ভাগের ভাত আরেকজন মানুষের লগে ভাগ করে খেতে হবে দেখে কুট্টির লগে খুব ছোট্ট একখান চালাকি করল আলফু। কেন করল! কুট্টিকে তো বললেই পারত, ভাত সালুন ইট্টু বেশি কইরা দিও। আমার লগে আরেকজন মানুষ খাইবো।

যে মানুষটার জন্য চালাকি আলফু করল, মাকুন্দা কাশেম, তাকে কুট্টি জন্মের পর থেকেই চিনে। একই গ্রামের মানুষ। তার কথা শুনলে কি ভাত একটু বেশি করে দিত না কুট্টি, সালন দিত না! না হয় নিজে একটু কম খেত। একবেলা একটু কম খেলে কী হয়। প্রথমে বাপের ঘরে, পরে স্বামীর ঘরে কতদিন আধাপেট খেয়ে থেকেছে! কতদিন না খেয়ে থেকেছে। দুইদিন তিনদিন কেটে গেছে অনাহারে, একমুঠ ভাত জোটে নাই। কথাটা আলফু কেন বলল না কুট্টিকে! দিনভর যে রকম পরিশ্রম করে, ওইরকম পরিশ্রমের পর আধাপেট খেয়ে দিনটা তার কাটছে কী করে! তার ওপর একলা একটা চাক তুলেছে পুকুর থেকে। চাক তোলা যে কী পরিশ্রমের কাজ, যে না তুলেছে সে তা কখনও বুঝবে না। মাকুন্দা কাশেমের কথা যদি কুট্টিকে আলফু বলত তাহলে নিজের ভাগ থেকেও কিছুটা ভাত তাকে দিতে পারত কুট্টি। একজনের ভাগেরটা দুইজনে না খেয়ে দুইজনের ভাগেরটা খেতে পারত তিনজনে। তাতে পেট প্রায় ভরে যেত। কষ্টটা আলফুকে একা করতে হত না।

তবে মনের দিক দিয়ে আলফু যে খুব ভাল, মানুষের জন্য যে গভীর মায়া মমতা আছে তার আজ ওই দৃশ্যটা দেখার পরই কুট্টি তা টের পেয়েছে। মাকুন্দা কাশেম মেদিনীমণ্ডলের লোক আর আলফু পদ্মার মাঝখানে জেগে ওঠা কোথাকার কোন মাতবরের চরের লোক। দুইজন দুইবাড়ির গোমস্তা কিন্তু একজনের জন্যে কী টান আরেকজনের। মানুষের জন্যে মানুষের এই টানের নাম কী! এই টান থাকলে কি একজন আরেকজনের লগে ভাতের মতো ভাগ করে নিতে পারে জীবনের সবকিছু! সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না!

এইসব ভেবে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা তরি সময়টা যেন চোখের পলকে কেটে গেছে কুট্টির। চালতাতলা থেকে ফিরে এসে নিজে ভাত নিয়ে বসেছে ঠিকই খেতে ইচ্ছা করে নাই। বারবার মনে হয়েছে আরও কিছুটা ভাত সালুন দিয়ে আসে দুইজনকে। কিন্তু দিতে সে যায়নি। ভাত খেতে খেতে আলফু যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছিল, চোখে যে ধরা পড়ে যাওয়া অপরাধী দৃষ্টি ছিল সেই দৃষ্টির সামনে আর যেতে ইচ্ছা করে নাই। শরম পাওয়া মানুষকে যে আবার শরম দেয় সে কোনও মানুষ না।

তবে শরমটা আলফু একটু বেশিই পেয়েছিল। খাওয়া দাওয়া শেষ করে থাল গেলাস গামলা সে আর কুট্টির কাচ্ছে ফিরায়া দিয়া যায় নাই, রান্ধনঘরের ছেমায় (সামনে) রেখে মাকুন্দা কাশেমকে নিয়ে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল।

একটা কথা কিছুতেই কুট্টির মাথায় ঢুকছে না, মাকুন্দা কাশেম হঠাৎ করে আলফুর লগে এসে খেতে বসল কেন! মুখ চোখই বা অমন দেখাচ্ছিল কেন তার! কী হয়েছে! মান্নান মাওলানা কি মারধোর করেছে, বাড়ি থেকে খেদাইয়া দিছে!

ইচ্ছা করলে দুপুরবেলাই এই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেত কুট্টি, যদি আরেকটুক্ষণ চালতাতলায় দাঁড়াত, যদি আলফু আর নয়তো মাকুন্দা কাশেমের লগে কথা বলত। কিন্তু আলফুর শরম পাওয়া দেখে ওখানে আর দাঁড়াতে ইচ্ছা করে নাই। ঘরে ফিরে এসেছিল। তারপর থেকে সময় কেটেছে ঘোরের মধ্যে।

আসলে একই দিনে দুই দুইটা ঘটনা আজ ঘটে গেছে কুট্টির জীবনে। দুপুরের মুখে মুখে চাক তুলতে নামা আলফুকে দেখে দ্বিতীয়বারের মতো শরীরের খুব ভিতরে হয়েছে এক অনুভূতি আর চালতাতলায় বসে মাকুন্দা কাশেমকে নিয়ে ভাত খেতে দেখে হয়েছে। মনের মধ্যে এক অনুভূতি। একই দিনে শরীর আর মনের অনুভব একজন মানুষকে তো বদলে দিবেই! আর যে অনুভব মানুষটার জীবনে এই প্রথম। কিছুকাল হলেও স্বামীর ঘর সে করেছে, খানিকটা হলেও পুরুষদেহ বুঝেছে। মন বোঝেনি একটুও। না নিজের পুরুষটার। সংসারের অভাব অনটন, সতীন, সতীনের এন্দাগেন্দা পোলাপান কুট্টিকে জীবনের স্বাদ পেতে দেয়নি। স্বামীর দেহ মন কোনওটাই সে ঠিকঠাক আবিষ্কার করতে পারে নাই। আবিষ্কার করবার সুযোগই পায় নাই। আজ পারল। তবে যারটা পারল সে স্বামী না, সে এক পরপুরুষ। সেই মানুষ উদিসই পাইলো না কুট্টি তার মনের কতখানি দেখে ফেলছে, কতখানি বুঝে ফেলছে।

অন্যদিকে কুট্টি যেন আজ নিজেকেও আবিষ্কার করল। নিজের দেহ মন আবিষ্কার করল। প্রথমে মিলতে হবে নারী পুরুষের মন। একজনের মন হবে আরেকজনের। মনের টানে একাকার হবে মন, তারপর দেহ। এই না হলে মানুষের জীবন জীবন হয়ে ওঠে না। নারীজন্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকে যে পুরুষ আজ যেন সেই পুরুষটাকেই পেয়ে গেছে কুট্টি। বিহ্বল তো সে হবেই, সময় তো সে বুঝতেই পারবে না!

ঘরগুলির কোণাকানছিতে কালো ধুমার মতো জমতে শুরু করেছে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে গলা খুলছে রাতপোকারা। ফলে সন্ধ্যাবেলাই শুরু হয়ে গেছে রাতের শব্দ। গাছপালার মাথার ওপর যে স্বচ্ছ নীল আকাশখান, কখন সেই আকাশ চারদিকে ঢেলেছে সাদা মশারির মতো কুয়াশা! হিমশীতল উত্তরের হাওয়াখান বইছে। ঠিক এ সময় দোতালা ঘরের খাটাল থেকে বড়বুজান ডাকলেন, কুট্টি লো ও কুট্টি কই গেলি তুই!

কুট্টি দাঁড়িয়েছিল দক্ষিণের দরজায় ঢেলান দিয়ে। বড়বুজানের ডাকে নড়ে উঠল। ধীর পায়ে খাটালে, বড়বুজানের পালঙ্কের সামনে এসে দাঁড়াল। কী অইছে?

চাইরমিহি এমুন আন্দার আন্দার লাগে ক্যা?

হাজ হইয়া গেছে।

কুপি বাত্তি আঙ্গাচ নাই?

না।

ক্যা?

অহন আঙ্গামু।

তারপর অন্যরকম একটা প্রশ্ন করলেন বড়বুজান। আমার মুখের সামনে এমুন পিরপির করে কী লো?

কুট্টি আনমনা গলায় বলল, মোশা।

মোশা খালি মুখের সামনেই পিরপিরায়নি? শইল দেহে না!

কেমতে দেকব! শইল তো আপনের লেপের ভিতরে।

একথায় বড়বুজান একটু শরম পেলেন। হ। লেপের ভিতরে মোশা হানবো (ঢাকা) কেমতে!

একথার কোনও জবাব দিল না কুট্টি।

বড়বুজান অবাক গলায় বললেন, ও কুট্টি মোশা তো খালি পিরপিরায়ঐ না, কামড়ও তো দেয়, আমি তাইলে উদিস পাইনা ক্যা?

কুট্টি নির্বিকার গলায় বলল, আপনের চামড়ায় জান নাই।

বড়বুজান চমকালেন। কী?

হ। শইল্লের য়োদবোধ (বোধ অর্থে) গেছে গা আপনের।

কচ কী তুই! তাইলে তো এই শীতটা আমি টিকুম না।

কুট্টি কোনও কথা বলল না।

বড়বুজান কথা বললে তার প্রায় প্রতিটি কথার পিঠেই কথা বলে কুট্টি। কারণ এই বাড়িতে আর কথা বলবার মানুষ নাই। কথা না বলে, সারাদিন বোবা হয়ে কি মানুষ থাকতে পারে। ফলে কথা যেটুকু হয় কুট্টির সেটা এই বড়বুজানের লগেই।

কিন্তু এখন কুট্টি তেমন কথা বলছে না কেন? কী হয়েছে?

লেপের ভিতর থেকে কাউট্টার মতন বেরিয়ে থাকা মাথাটা কাত করে কুট্টির দিকে তাকালেন বড়বুজান। চোখে কিছুই প্রায় দেখেন না তবু কুট্টির মুখটা দেখবার চেষ্টা করলেন। মায়াবি গলায় বললেন, কী অইছে লো তর?

এই কথায় কুট্টির বুকটা মোচড় দিয়া উঠল। মনে হল বহুকালের জমে থাকা গভীর গোপন একটা কান্না যেন এখনই বুক ঠেলে বের হবে। বুক ফেটে যাবে তার, চোখ ফেটে যাবে।

এরকম কান্নার অনুভূতি আজকের আগে কখনও হয় নাই তার। জীবনে কত দুঃখ কষ্ট পেয়েছে, কথায় কথায় কত মেরেছে স্বামী, কত অপমান করেছে, স্বামী সংসার ছেড়ে আসার পর বাড়িতে আশ্রয় দেয় নাই মা বা, কুত্তা বিলাইয়ের মতন দূর দূর করে খেদাইয়া দিছে তবু আজকের মত এমন কান্না কখনও পায় নাই কুট্টির। এ যেন সম্পূর্ণ অচেনা এক কষ্টের কান্না। এ যেন জীবনের কোনও কিছুকে না পাওয়ার কান্না, এ যেন জীবনের সবকিছু পেয়ে যাওয়ার কান্না।

কান্নাটা কুট্টি কাঁদতে পারল না। সেই উথাল দিয়ে ওঠা গভীর কান্না বুকে চেপে জড়ান গলায় বলল, কী অইব আমার! কিচ্ছু অয় নাই।

তয় এমুন চুপ কইরা রইছস ক্যা?

কথা কইতে ইচ্ছা করে না।

ক্যা?

এমতেঐ।

না লো ছেমড়ি কিছু একখান অইছে তর। তুই এমুন নুলাম গলায় কথা কওনের মানুষ না। মনডা ভাল তর, তয় কথা কচ চডর চডর কইরা। আইজ পয়লা দেকতাছি অন্য সুর। কী অইছে?

কুট্টি এবার গলা চড়াল। কইলাম যে কিছু অয় নাই।

মা বাপের কথা মনে অইছে, জামাইর কথা মনে অইছে?

না।

এবার স্বভাবে ফিরল কুট্টি। আপনে অহন চুপ করেন তো। এত প্যাচাইল পাইরেন না। আমার কাম আছে।

বড়বুজান দমলেন না। কী কাম?

কুপি বাত্তি আঙ্গামু না? মুশরি (মশারি) টাঙ্গামু না?

কুপি বাত্তি আঙ্গা। মুশরি না টাঙ্গাইলেও অইবো।

ক্যা? মুশরি না টাঙ্গাইলে মোশায় খাইবো না আপনেরে?

খাইলেঐ কী! উদিস তো পাই না।

উদিস না পান দেইক্কা মোশার আতে আপনেরে আমি ছাইড়া দিমু!

কুট্টি আর কোনও কথা বলল না। ম্যাচ জ্বেলে একই লগে দুইটা পিতলের কুপি জ্বালল। একটা খাটালের গাছার ওপর রেখে অন্যটা হাতে নিয়ে দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে বসল। বারান্দার এককোণে রাখা আছে দুইটা হারিকেন। কেরাসিনের বোতল থেকে টিনের ছোট্ট চোঙা দিয়ে কেরাসিন ভরল হারিকেনে। তারপর চিমনি মুছতে লাগল।

এই বাড়িতে একখান হারিকেন সারারাত জ্বলে। সেটা থাকে খাটালের কোণায়। রাতে কখন কী অসুবিধা হয় বড়বুজানের! অন্ধকারে কে তখন ম্যাচ কুপি খুঁজবে। তারচেয় হারিকেন একখান জ্বালিয়ে রাখা ভাল।

এটা অবশ্য রাজা মিয়ার মায়েরই আদেশ। তাঁর আদেশ ছাড়া এই বাড়ির কোনও কাজ হয় না। সংসারের সব কিছুর নিখুঁত হিসাব আছে তাঁর কাছে। মাসে কতখানি কেরাসিন লাগে তিনি তা জানেন। একখান হারিকেন সারারাত নিভু নিভু করে জ্বললে তেল কতটা পুড়বে, সা সা করে জ্বললে পুড়বে কতটা, তার তা মুখস্ত। সুতরাং এই সংসারের কোনও কিছু এদিক ওদিক করা অসম্ভব।

তবে সন্ধ্যার মুখে মুখে হারিকেন জ্বালাতে হয় দুইটা। একটা খাটালে রেখে অন্যটা দিয়ে সংসারের টুকটাক কাজ চালাতে হয়। হারিকেন জ্বালাবার পর কুপি দুইটা রাখতে হয় নিভিয়ে। আজও সেই কাজগুলি করল কুট্টি। করুল আনমনা ভঙ্গিতে। কোনওদিকে খেয়াল নাই, যেন মৃতের মতো কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু মনের ভিতর কুট্টির তখন একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা। মানুষটার মুখ দেখবার জন্যে অপেক্ষা। কই গেছেগা হেয়? হাজ আইয়া গেছে অহনতরি বাইরে আহে না ক্যা?

হারিকেন হাতে নিয়া খাটালের দিকে যাবে কুট্টি, দোতালা ঘরের সিঁড়ির সামনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল আলফু।

চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল কুট্টি। বুকের অনেক ভিতর থেকে গভীর আবেগের গলায় বলল, আপনে আমারে কইলেন না ক্যা?

পলকের জন্য আলফুও তাকাল কুট্টির দিকে। মাথা নিচু করে বলল, কইলে তুমি আবার কী মনে করো এইডা মনে কইরা কই নাই।

আমি কী মনে করুম! আমি কি সংসারের মালিক?

মালিক অইলে কইতাম।

আলফুর কথাটা বুঝতে পারল না কুট্টি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী কইলেন বোজলাম না।

আলফু মৃদু হাসল। এই সংসারে তোমার আর আমার দুইজনের দশা একরকম। বাড়ির চাকরবাকর আমরা। একজন আরেকজনরে কেমতে কই আমার একজন মেজবান আছে! দোফরে তারে খাওয়ান লাগবো!

কুট্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আপনে চিন্তা করতাছেন এক আমি করছি আরেক।

কেমুন?

সংসারের মালিক না অইতে পারি, আপনের ভাত থিকা যেমতে আপনে কাশেমরে ভাত দিলেন হেই ভাতের লগে আমার ভাগ থিকাও ইট্টু দিতে পারতাম।

তাইলে তোমার খাওনে টান পড়তো!

অহন যে আপনেরডায় টান পড়লো! টান যহন পড়ছিল দুইজনেরডায় পড়তো।

কুট্টির কথা শুনে ভিতরে ভিতরে কেমন একটা অনুভূতি হল আলফুর। কথা বলতে যেন ভুলে গেল সে। কুট্টির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কুট্টি বলল, কাশেমের অইছে কী? মুখটা জানি কেমুন দেকলাম!

কেমতে দেকলা! তুমি তো ওহেনে খাড়ওঐ নাই!

যেডু খাড়ইছি হেতে দেকছি।

হুজুরে বেদম মাইর মারছে কাইশ্যারে। মাইরা বাইত থিকা বাইর কইরা দিছে।

ক্যা, ক্যা মারছে?

ঘটনাটা বলল আলফু। শুনে কুট্টি আকাশ থেকে পড়ল। মরা মাইনষের জানাজা পড়তে আইছে, মাডি দিতে গেছে, হের লেইগা মাইনষে মাইনষেরে মারবো! তাও মাওলানা সাবের লাহান মাইনষে!

হ। ছনুবুড়িরে দুই চোক্কে দেখতে পারতো না হুজুরে। কইছিলো চুন্নিবুড়ির জানাজা অইবো না, গোড় অইবো না। এর লেইগাঐত্তো খাইগো বাড়ির হুজুরে আইয়া বেবাক কিছু করলো।

হারিকেন হাতে কুট্টি তখন চিন্তিত হয়ে আছে।

ঘরের ভিতর অনেক দূর পর্যন্ত হারিকেনের আলো, বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে আলফু বলল, বড়বুজানে কিছু উদিস পাইছে?

আনমনা হয়েছিল বলে কথাটা বুঝতে পারলনা কুট্টি। বলল, কী উদিস পাইবো?

কাইশ্যা যে এই বাইত্তে দুইফরে ভাত খাইছে!

কেমতে উদিস পাইবো! হেয় কি বিচনা ছাইড়া উঠতে পারেনি! চোক্কে দেহেনি!

আমি কইতে চাইলাম তুমি বড়বুজানরে কিছু কও নাই তো!

আলফুর চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল কুট্টি। যা দেইক্কা আমি নিজে শরম পাইয়া চাউলতাতলা থিকা আইয়া পড়লাম, খাড়ইলাম না, হেই কথা আমি বড়বুজানরে কমু!

একথার বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল আলফুর। আনন্দের একটা শব্দ করল সে। সিঁড়িতে বসল।

খাটাল থেকে ভেসে এল বড়বুজানের গলা, ও লো কুট্টি, কই গেলি?

আলফুর অদূরে দাঁড়ান কুট্টি মুখ ঘুরিয়ে খাটালের দিকে তাকাল, এইত্তো আমি।

কো?

বারিন্দায়। হারিকল আঙ্গাই।

অয় নাই অহনতরি?

অইছে।

তয়?

একথার জবাব দিল না কুট্টি।

বড়বুজান বললো, কার জানি হাকিহুকি (ফিসফাস) হুনি! কেডা আইছে? কার লগে কথা কচ?

কুড়ি বিরক্ত হল। নতুন মানুষ কে আইবো? কার লগে কথা কমু? আপনে জানেন আপনে আর আমি ছাড়া এই বাইত্তে আর কে থাকে!

হ জানি! আলফু।

তয়?

আলফুর লগে কথা কচ?

হ।

কী কথা?

কুট্টি রাগি গলায় বলল, হেইডা আপনেরে কওন লাগবোনি!

বড়বুজান কাঁচুমাচু গলায় বললেন, চেতচ ক্যা! চেতিচ না বইন। আলফু জুয়ান মরদো বেডা। তুই যুবতী মাইয়া। তগো মইদ্যে এত কথা কওন ভাল না।

একথা শুনে ভারি একটা লজ্জা পেল কুট্টি। আলফুর দিকে আর তাকাতে পারল না। লাজুক মুখে খাটালের দিকে পা বাড়াল।

আলফু বলল, বুজানের লগে কথা কইয়া আবার আহো। কথার কাম আছে।

.

১.৩৯

অন্ধকার চালতাতলায় বসে আছে কাশেম। বিকাল হতে না হতেই গভীর অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল জায়গাটা। যখন চকেমাঠে, গিরস্ত বাড়ির উঠান আর গাছপালার মাথায় দিনের শেষ আলো ফুরাতে বসেছে তার অনেক আগেই মাথার ওপরকার ডালপালা ছড়ান প্রাচীন চালতাগাছের চওড়া গাঢ় সবুজ পাতার আড়াল থেকে তলায় বসা কাশেমের চারপাশে নিঃশব্দে নামতে শুরু করেছিল অন্ধকার। প্রথমে অন্ধকারের রং ছিল সবুজ। চালতাপাতা থেকে ঠিকরে নামছিল বলে এমন রং। তারপর সময় যত গেল রং বদলাতে শুরু করল। এখন অন্ধকারের রং পাকা পুঁইগোটার মতো। একহাত দূরে চোখ চলে না, এমন।

সন্ধ্যা হতে না হতেই ঠাকুর বাড়ির পুব উত্তর কোণের জঙ্গল পুকুর অতিক্রম করে মিয়াবাড়িতে এসে উঠেছে একটি কোক্কা। এই পাখিটা দেখতে চিলের মতো, গাঢ় খয়েরি রঙের। ক ক করে ডাকে। দিনেরবেলা দেখা যায় না। কোথায় কোন জঙ্গলের আন্ধারে পলাইয়া থাকে কে জানে। বের হয় সন্ধ্যার মুখে মুখে। তারপর সারারাত চড়ে গিরস্ত বাড়ির ছাইছে (ঘরের পিছনে)। ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই আবার গিয়ে ঢেকে জঙ্গলে। আন্ধারের জীব কোক্কা। এই পাখির মাংস খেলে লোকে নাকি পাগল হয়ে যায়। কাশেম শুনেছে। দেশগ্রামে কত গল্প গাথা থাকে, কত কুসংস্কার, কত প্রচলিত বিশ্বাস। কোক্কার মাংস খেয়ে পাগল হওয়াটা হয়তো তেমন কোনও বিশ্বাস। কেউ খেয়ে দেখেছে কি না কে জানে! তবে এত কাছ থেকে এই পাখিটা আজকের আগে কখনও দেখে নাই কাশেম। নির্ভয়ে তার চারপাশে চড়ে বেডালো। এদিক গেল ওদিক গেল। মাটি থেকে খুঁটে খেল আধার। বার কয়েক ক ক করে ডাকল। একবার তো কাশেমের একেবারে গা ঘেঁষেই হেঁটে গেল। এমন নির্ভয়ে গেল, মানুষ দেখে পোষা পাখি ছাড়া কোনও পাখির এমন করার কথা না।

কাশেম বুঝেছিল পাখিটা তাকে মানুষ মনে করে নাই। মনে করেছে ঝোপঝাড় গাছপালা। লোকালয়ে থাকা পাখিরা মানুষের স্বভাব জানে। শীতকালের সন্ধ্যায় গিরস্ত বাড়ির ছাইছে অন্ধকার চালতাতলায় কোনও মানুষের বসে থাকবার কথা না।

পাখিটা তারপর ছোট্ট এক উড়ালে চলে গিয়েছিল সমেদ খার বাড়ির দিকে। তখন বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়েছিল কাশেমের। পাখিটা তাকে মানুষ মনে করে নাই। আসলেই তো, সে কি মানুষ! মানুষ হলে মানুষের হাতে এমন মার খায়! মানুষ হলে মানুষের বাড়ির ছাইছে এমন করে বসে থাকে! একজনের ভাত ভাগ করে খায় দুইজনে! তাও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে! কখন ধরা পড়ে, কখন দেখে ফেলে বাড়ির লোক! কখন খাওয়ার খোটা দেয়, কখন করে অপমান!

এইসব ভেবে কাশেমের বুক ঠেলে উঠেছিল কষ্টের পর কান্না। কান্নাটা তখন কাঁদতে পারে নাই। অন্ধকার গাঢ় হওয়ার পর চারপাশ থেকে ঝাক দিয়ে বেরিয়েছে অন্ধকার রঙের মশা। বিনবিন শব্দে হেঁকে ধরেছে কাশেমকে। হাত পা নেড়ে, চড় চাপড় মেরে মশা তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেছে সে। তবে এই কাজটাও কাশেমকে করতে হয়েছে শব্দ বাঁচিয়ে। মশা মারার শব্দে বাড়ির লোক যেন টের না পায়, এখনও চালতাতলায় বসে আছে মাকুন্দা কাশেম, এখনও এ বাড়ি ছেড়ে যায় নাই। যদিও দুপুরবেলা কুট্টি তাকে দেখে ফেলেছে। আলফু অভয় দিয়েছে, ভয়ের কিছু নাই, কুট্টিকে যা বুঝাবার বুঝাবে সে। তবু ভয়টা কাশেমের রয়ে গেছে।

কিন্তু মশা মারতে মারতে অন্য একটা কথা ভেবে আনমনা হয়ে গিয়েছিল কাশেম। সন্ধ্যার এই সময়টায় গরু নিয়ে বাড়ি ফিরে সে। গরু আথালে বাইন্ধা জাবনা দেয়। গরুরা খাদ্য নিয়া ব্যস্ত হয় আর সে ব্যস্ত হয় ধুপ নিয়া। ধুপের ধুমায় পালিয়ে বাঁচে মশা। দুইদিন হল বাড়িতে নাই কাশেম, ধুপটা কি ঠিক মতন দিচ্ছে কেউ! মশায় খেয়ে শেষ করতাছে না তো গরুগুলিকে! ধুপ না দিলে সারারাত জেগে থাকতে হবে গরুগুলির। লেজ। নেড়ে, গায়ের চামড়া কাঁপিয়ে মশা তাড়াতে হবে। আহা অবলা জীব! মুখ ফুটে বলতে পারবে না কিচ্ছু, মনে মনে শুধু কাশেমকে খুঁজবে।

তারপর থেকে শুধুই গরুগুলির কথা ভেবেছে কাশেম। সকালবেলা কে তাদের মাঠে নেয়, দিনের শেষে কে ফিরিয়ে আনে ঘরে! কে দুধ দোয়ায় (দোয়), কে দেয় জাবনা! গরম ফ্যানে মুখ পুড়ে গেলে কে দেয় আদরের গাল! সকালবেলা মাঠে যাওয়ার সময় কি গরুগুলি কাশেমকে খোঁজে না! ফিরে এসে বাড়ির চারদিক তাকিয়ে খোঁজে না! কান খাড়া করে রাখে না কাশেমের সেই গানটি শোনার জন্য।

গুরু উপায় বলো না
জনম দুখি কপাল পোড়া গুরু
আমি একজনা।

আসলেই জনম দুখি এক মানুষ কাশেম। দুনিয়াতে আপন বলতে কেউ নাই। আছে কয়েকটা গরু, আছে এই গ্রাম। দুইদিন হল গরুদের ছেড়ে আছে সে। কোনদিন যেন গ্রাম ছেড়েও চলে যেতে হয়!

এসব ভেবে অন্ধকার চালতাতলায় বসে গভীর দুঃখ বেদনায় কাঁদতে লাগল কাশেম। চারপাশে মশা বিনবিন করে, উদাম শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে শুষে নেয় রক্ত, কাশেম টের পায় না।

.

১.৪০

আলফু বলল, এতক্ষুণ কী করলা?

বলল এমনভাবে যেন বিরাট এক অধিকার আছে তার কুট্টির ওপর। সেই অধিকারের জোরেই যেন বলল। অন্তত কুট্টি তাই বুঝল। বুঝে বুকের ভিতর দুপুরবেলার মতন অনুভূতিটা আবার হল তার। এক পলক আলফুর দিকে তাকিয়ে নিজের পায়ের পাতার দিকে তাকিয়ে বলল, মুশরি (মশারি) টানাইলাম।

হাজ অইতে না অইতেই মুশরি টাঙ্গান লাগে?

লাগে। বড়বুজান অচল মানুষ, তার মোশায় খুব কামড়ায়।

এই বাড়িতে মোশা ইট্টু বেশি।

হ জঙলা বাড়ি তো! চাইরমিহি পুকঐর। পুকঐ ভরা কচুরি। কচুরিবনে মোশা তো থাকবই।

একটু থেমে কুট্টি বলল, কী কইবেন কন?

কোন ফাঁকে কোচড় থেকে বিড়ি বের করে ধরিয়েছে আলফু। কুট্টির কথায় বিড়িতে টান দিল। কেমতে যে কমু হেইডাঐ চিন্তা করতাছি।

আমার কাছে কথা কইতে এত চিন্তা কী আপনের!

আমার লেইগা তোমার যদি কোনও অসুবিদা অয়?

কী অসুবিদা অইব?

এই বাড়ির মানুষরা তো ভাল না। ধরো কাম থিকা ছাড়াইয়া দিলো তোমারে!

কে ছাড়াইয়া দিবো! অহন তো মাজারো বুজানে নাই।

বড়বুজানে তো আছে! হারাদিন বিচনায় পইড়া থাকলে কী অইবো বেবাক মিহি খ্যাল রাখে।

আমি যদি কিছু করি হেয় খ্যাল রাইক্কা কী করবো। বোজবঐত্তো না কিছু।

বোজবো। দেকলা না কইলো আলফু জুয়ান মরদো বেডা, তার লগে এত কী কথা!

একথা শুনে কুট্টি খুব লজ্জা পেল। এক পলক আলফুর দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। ব্যাপারটা খেয়াল করল না আলফু। বলল, আমারে আইজ অন্যমানুষ মনে অইতাছে না তোমার?

কথাটা বুঝতে পারল না কুট্টি। বলল, ক্যা অন্যমানুষ মনে অইবো ক্যা?

এই যে এত কথা কইতাছি তোমার লগে!

হেতে কী অইছে?

এত কথা কওনের মানুষ তো আমি না! আমি কথা কই কম।

ক্যা কম কন ক্যা?

কথা কম কওনঐ ভাল।

আপনে যত কম কন অত কম কওন ভাল না। এই যে অহন যেমুন কথা কইতাছেন, ভাল লাগতাছে।

তাইলে অহন থিকা এমুন কথাঐ কমু তোমার লগে।

কইয়েন। বাইত্তে মানুষ অইলাম তিনজন। তার মইদ্যে একজন অচল, বুড়া। তার লগে কত প্যাচাইল পাড়ন যায়! আপনে ইট্টু কথাবার্তা কইলে ভাল্লাগে।

কথাটা বলেই আবার লজ্জা পেল কুট্টি।

আলফু তখন কেমন চোখ করে তাকিয়ে আছে কুট্টির দিকে। হাতে বিড়ি জ্বলছে সেদিকে যেন খেয়াল নাই তার। নিঃশব্দে খানিকটা সময় কাটল। তারপর বিড়িতে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিল আলফু। বলল, একখান কাম করতে পারবা?

কুট্টি চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল। কী কাম?

উত্তর নাইলে পশ্চিম কোনও ভিটির ঘরের চাবি দিতে পারবা?

কুট্টি অবাক হল। চাবি দিয়া কী করবেন?

ঘর খুলুম। আইজ রাইতটা কাইশ্যা আমার লগে থাকবো।

থাউক। হের লেইগা ঘর খোলতে অইবো ক্যা?

কুট্টির গলা বোধহয় সামান্য উঁচু হয়ে গিয়েছিল। আলফু সাবধানী গলায় বলল, আস্তে কথা কও। বড়বুজানে হোনবো।

কুট্টি হেসে বলল, হোনবো না। ঘুমাইয়া গেছে।

হাজ অইয়া সারলো না, ঘুমাইয়া গেল?

মুশরি টাঙ্গানের পর বুজানে অনেকক্ষুণ ঘুমায়।

একথা শুনে আলফু একটু নড়েচেড়ে বসল। স্বস্তির হাঁপ ছাড়ল। তাইলে ঠিক আছে। বুজানের বিচনার নিচে হাত দিয়া চাবিডা লইয়াহো।

কুট্টি আবার সেই প্রশ্নটা করল। কাইশ্যা থাকবো দেইক্কা ঘর খোলতে অইবো ক্যা?

শীতের দিন না অইলে খোলন লাগতো না। দুইজনে মিল্লা রান্দনঘরে হুইয়া থাকতাম।

অহন আপনে যেহেনে হোন কাইশ্যারেও ওহেনে হোয়ান। আমি তো হুই তুমি যেই বারিন্দায় খাড়ইয়া রইছো এই বারিন্দায়। এহেনে দুইজন হোয়ন যায় না? যায়।

তয়?

দুইজন মানুষ একলগে হুইলে কত সুখ দুঃখের কথা কয়, বড়বুজানে আমগো কথার আওজ পাইলে ঝামেলা অইবো।

হোনবো কেমতে! বারিন্দা আর খাটালের মইদ্যের দুয়ার বন্ধ থাকবো না! দরকার অইলে আস্তে কথা কইবেন আপনেরা।

ধুর অত ইসাব কইরা কথা কওন যায়নি!

কুট্টি খানিক কী ভাবল তারপর বলল, চাবি আপনেরে আমি আইন্না দিতে পারি, বড়বুজানে উদিস পাইবো না, তয় আপনে অন্যঘরে থাকলে ডরে হারা রাইত ঘুমাইতে পারুম না আমি।

আলফু খুবই অবাক হল। ক্যা?

দেশ গেরামে আইজকাইল ডাকাতি অয়। ডাকাইতরা করে কী, বড় গিরস্ত বাড়িতে ঢুইক্কা ঢেকিঘর থিকা ঢেকি উড়াইয়া আইন্না ঢেকি দিয়া পাড়াইয়া দুয়ার ভাইঙ্গা ঘরে ঢোকে।

হেইডা আমি এই ঘরে থাকলেও ঢোকতে পারে?

তাও পুরুষপোলা ঘরে থাকলে সাহস থাকে।

আমি থাকি বারিন্দায়। মইদ্যের দুয়ার বন্দ। খাটালের পালঙ্কে থাকে বড়বুজানে, নিচে থাকো তুমি। এমতে থাকন আর অন্যঘরে থাকন একঐ কথা!

কুট্টি মাথা নিচু করে বলল, না এক কথা না।

তাইলে তুমি অহন কী করতে কও?

কাইশ্যারে লইয়া এই ঘরের বারিন্দায়ঐ থাকেন।

আইচ্ছা।

কাইশ্যা অহন কো?

চাউলতাতলায় বইয়া রইছে।

ডাইক্কা লইয়াহেন। বুজানে ঘুমাইছে এই ফাঁকে খাওন দাওন সাইরা হালান।

রাইত্রে আমি আইজ খামু না। খালি কাইশ্যারে খাওয়াও।

ক্যা?

এমতেঐ।

এমতেঐ না। আমি বুজছি। আপনে মনে করতাছেন একজন বাড়তি মানুষ খাইলে ভাতে টান পড়বো। পড়বো না। কাইশ্যার ভাত আমি রানছি।

কও কী?

হ। আমি বুজছিলাম কাইশ্যা আইজ রাইত্রে এই বাইত্তে থাকবো।

কেমতে বোজলা?

হেইডা আপনেরে কইতে পারুম না। যান কাইশ্যারে ডাইক্কা লইয়াহেন।

কয়েক পলক কুট্টির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল আলফু। তারপর উঠল। পশ্চিম দক্ষিণের ভিটার ঘরের কোণায় এসে ডাকল, কাইশ্যা, ঐ কাইশ্যা, এইমিহি আয়।

দুইবার তিনবার ডাকল আলফু। কিন্তু চালতাতলা থেকে কেউ সাড়া দিল না।

 ১.৪১-৪৫ গভীর রাতে মান্নান মাওলানার বাড়িতে

১.৪১

গভীর রাতে মান্নান মাওলানার বাড়িতে এসে উঠল কাশেম। সন্ধ্যাবেলা মিয়াবাড়ির চালতাতলায় বসে অন্ধকার শীত আর মশার কামড় ভুলে গরুগুলির কথা ভেবে আকুল হয়ে কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল বাড়ি থেকে তাকে বের করে দিয়েছেন মান্নান মাওলানা। বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখলে কঠিন মাইর আছে কপালে। নিজের অজান্তেই চালতাতলা থেকে তারপর উঠেছিল কাশেম। তখনও চোখ ভেসে যাচ্ছে কাশেমের, গাল ভেসে যাচ্ছে। এক ফাঁকে হাঁটু তরি মুখ নামিয়ে লুঙ্গি দিয়ে চোখ মুছেছে। তারপর বাড়ির পিছন দিক দিয়া গিয়া উঠছে মেন্দাবাড়িতে। সেই বাড়ির উপর দিয়া গিয়া নামছে উত্তরের চকে। চক তখন থই থই করতাছে অন্ধকারে। চারদিকের ছড়ান ছিটান গিরস্ত বাড়ির ঘর দুয়ারে জ্বলছে কুপিবাতি। রান্ধনঘর, উঠানের কাজ শেষ করে রাতের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন চলছে কোনও কোনও বাড়িতে। যে বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়ে তারা কুপি, হারিকেনের আলোয় পড়তে বসেছে। কোনও কোনও আয়েশি গিরস্ত ঘরের ছেমায় বসে তামাক খাচ্ছে। গল্পগুজব করতাছে কেউ কেউ। সড়কের দিকে মাটিয়ালদের চিল্লাচিল্লির আওয়াজ পাওয়া যায়। দিন কয়েক হল তোড়জোড় বেড়ে গেছে কাজের। প্রেসিডেন্ট এরশাদ নাকি বলেছেন, তিন চার মাসের মধ্যে মাওয়ার ঘাট পর্যন্ত রাস্তা হতেই হবে। শুনে কন্ট্রাক্টরদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। নাওয়া খাওয়া ভুলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। একদিকে মাটির কাজ হচ্ছে, আরেক দিকে হচ্ছে ইট বিছানোর কাজ, আরেক দিকে হচ্ছে পিচ, পাথরের কাজ। শ্রীনগর পর্যন্ত পাকা হয়ে গেছে রাস্তা। কোলাপাড়া পর্যন্ত ইট বিছানো শেষ। এসব দেখে আলী আমজাদের গেছে মাথা খারাপ হয়ে। হ্যাঁজাক জ্বালিয়ে সারারাত কাজ করাচ্ছে সে। দিনের পর দিন বাড়িতে যায় না। ছাপড়া ঘরে থাকে। নাওয়া খাওয়া এখানেই। যদিও ম্যানেজার হেকমত আছে তবু নিজেও দেখাশোনাটা সে করতাছে। মাঝে একটু ঢিলা দিয়েছিল কাজে, এখন আর সেই ঢিলামি নাই। জাহিদ খাঁর বাড়ি ছাড়িয়ে বেশ অনেকদূর আগিয়েছে সড়ক কিন্তু ঘর আগায় নাই। যেখানে ছিল সেখানেই আছে। এইসব ঘর। সাধারণত কন্ট্রাক্টরদের কাজের লগে লগে আগায়। বেডা, চাল দরজা জানালা এমন কি খুটাখুটিও আলগা থাকে। আট দশজন মানুষ হলে যখন তখন সরিয়ে নেওয়া যায় পুরা ঘর। দিনে দিনেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে উঠে যায়। ব্যাপারটি এত সহজ হওয়ার পরও আলী আমজাদ যে কেন সরায় নাই ঘরটা! নিজে কষ্ট করতাছে, বেশ খানিকদূর আগিয়ে যাওয়া সড়ক ধরে হেঁটে আর নয়তো মোটর সাইকেলে চড়ে ফিরে ফিরে আসছে এই ঘরে! কেন, কোন গোপন টানে, কে জানে!

অন্ধকারে ডুবা উত্তরের চক থেকে হাজামবাড়ির দিকে একবার তাকিয়েছিল কাশেম। তাকিয়ে গাছপালা, ঘর দুয়ারের ফাঁক ফোকর দিয়ে সড়কের ওদিকটা দেখতে পেয়েছিল। হ্যাঁজাকের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে। মাটি ভর্তি ছোঁড়া মাথায় ভাঙন থেকে সার ধরে সড়কে উঠছে মাটিয়ালরা, মোড়া খালি করে সার ধরে নেমে যাচ্ছে। ঠিক তখনই হু হু করে আসছিল উত্তরের হাওয়া। সেই হাওয়ায় তীব্র শীতে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল কাশেমের উদাম গা। মনে পড়েছিল সবকথা। আলফুকে বলা আসা হল না। কী ভাববে সে! যে মানুষটা চুরি করে নিজের ভাগ থেকে এমন করে ভাত খাওয়াল, দুইদিনের অনাহারী পেট ভরল যার ভাতে, কুট্টির কাছে ধরা পড়েও যে একদমই ঘাবড়াতে দিল না কাশেমকে, বলল কথা শুনতে হলে সে শুনবে, কাশেমের কী, সে কেন পেট ভরে খাচ্ছে না, সে কেন ভয় পায়! সেই মানুষকে না বলে এমন করে কেন পালিয়ে এল কাশেম! যে মানুষ গেল তার জন্য রাতের ভাত জোগাড় করতে, আরামছে ঘুমাবার ব্যবস্থা করতে সেই মানুষকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে কাশেম কি না পলালো!

চকের চষা অচষা জমি থেকে, বড়কলুই ছোটকলুই (মটুরশুঁটি। দুই ধরনের হয়। বড় এবং ছোট। বড়গুলোকে বলে বড়কলুই ছোটগুলোকে ছোটকলুই। শুকিয়ে যাঁতায় ভাঙিয়ে ডাল করা হয়। বিক্রমপুর অঞ্চলে বলে কলুইয়ের ডাইল। কলুই শাক বেশ আগ্রহ করে খায় লোকে। গরু ছাগলের খাদ্য হিসেবেও কাজে লাগে) আর সউষ্যার সদ্য গজান চারায় তখন অন্ধকারে ঝরছিল শিশির। উত্তরের হাওয়ার লগে পাল্লা দিয়া শস্যচারা আর ঘাসের আড়াল সরিয়ে মাটি থেকে উঠছিল আশ্চর্য এক শীতলতা। গ্রাম প্রান্তরের উপর পড়েছে কুয়াশা। আকাশ জুড়ে আছে ঝিকিমিকি তারার মেলা। তারার ক্ষীণ আলোয় অন্ধকারেও আবছা মতন চোখে পড়ে কুয়াশা। এরকম পরিবেশে আলফুর কথা ভেবে পা থেমে গিয়েছিল কাশেমের। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সে। মনে মনে আলফুর উদ্দেশ্যে বলেছিল, দুনিয়াদারির চক্কর আমি বুজি না ভাই। আমি বলদা (বলদ, বোকা অর্থে) মানুষ। মানুষ থুইয়া গরুর লেইগা বেশি টান। তুমি আমারে মাপ কইরা দিও।

হন হন করে হেঁটে মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল কাশেম। বাড়ির ঘর দুয়ারে তখন কুপিবাতি জ্বলছে, এইঘর ওইঘর করতাছে লোকজন, এই অবস্থায় কিছুতেই বাড়িতে ওঠার সাহস হয় নাই কাশেমের। সে গিয়ে বসেছিল পথপাশের কাশবনে।

জায়গাটা বেপারীদের পুকুরপারে। পার জুড়ে ঘন কাশ জন্মেছে। পাশ দিয়ে চলে গেছে সরু একটা পথ। কয়দিন হল এমন সাদা হয়েছে কাশফুল, অন্ধকারেও ফকফক করে। জায়গাটায় শীত যেন আরও বেশি। জবুথুবু হয়ে বসেই হি হি করে কাঁপতে লাগল কাশেম। লুঙ্গি খুলে কান পর্যন্ত শরীর ঢুকিয়ে দিল লুঙ্গির ভিতর, দিয়ে তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে রইল মান্নান মাওলানার বাড়ির দিকে। কখন ঘরের দুয়ার বন্ধ হবে বাড়ির, কখন নিভবে কুপিবাতি, কখন কাশেম গিয়ে উঠবে বাড়িতে, কখন অন্ধকারে হাত রাখবে গরুগুলির গায়ে। তার স্পর্শে, গায়ের গন্ধে গরুরা টের পাবে তাদের প্রিয়তম জীবটি তাদের টানে ফিরে এসেছে।

সেই যে দুপুরবেলা খেয়েছিল তারপর পেটে আর কিছু পড়ে নাই কাশেমের, তবু ক্ষুধা বলতে কিছু টের পাচ্ছিল না সে। মন জুড়ে শুধু গরুদের কথা, কখন ছুঁয়ে দেখবে গরুদের, শরীর জুড়ে শুধু সেই উত্তেজনা। উত্তেজনায় উত্তেজনায় সময় কেটে গেছে। রাত হয়েছে গভীর। কাশবন থেকে বেরিয়েছে কাশেম। দ্রুত হেঁটে বাড়িতে উঠেছে। নাড়ার পালার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। তিনদিন হল বাড়ি ছাড়া সে, মনে হল তিনদিন না যেন বহু বহুদিন পর বাড়ি ফিরল সে, বহু বহুদিন পর নাড়ার পালাটা দেখতে পেল। বহুদিন পর দেখা হলে আপনজনকে যেমন করে ছোঁয় মানুষ ঠিক তেমন করে, গভীর মায়াবি হাতে নাড়ার পালাটা একটু ছুঁয়ে দিল কাশেম। তারপর আথালের সামনে এসে দাঁড়াল।

রাবের মতন অন্ধকারে ডুবে আছে চারদিক। তারার আলোয়ই যেটুকু যা চোখে পড়ে। আর মানুষের চোখের আছে এক আশ্চর্য ক্ষমতা। দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকলে, অন্ধকারে চোখ সয়ে গেলে আবছা মতন হলেও কিছু না কিছু সেই চোখ দেখতে পায়। কাশেমও পাচ্ছিল। আথালের সামনে দাঁড়িয়ে যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল গরুগুলির কোনওটা দাঁড়িয়ে কোনওটা বসে। কোনওটা জাবর কাটছে, কোনওটা ঝিমাচ্ছে, কোনওটা বা গভীর ঘুমে। লেজ পিটিয়ে মশা তাড়াচ্ছে কোনও কোনওটা। আহা রে, মশায় বুঝি খেয়ে শেষ করতাছে গরুগুলিকে! ওই তো ধূলিটাকে আবছা মতন দেখা যায় অবিরাম লেজ পিটাচ্ছে নিজের পেটে পিঠে। এই গরুটা একটু বেশি আরামপ্রিয়। মশার একটি কামড়ও সহ্য করতে পারে না। সারারাত দাঁড়িয়ে থাকে, সারারাত ছটফট করে।

ধলির দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই লুঙ্গি কাছা মারল কাশেম। যেন এখনই ধুপ জ্বালবে, আথালের চারদিকে ধুপদানী হাতে চক্কর দিবে। ধুপের ধুমায় বেদিশা হয়ে যে দিকে পারে চম্পট দিবে মশারদল।

কিন্তু এই রাত দুপুরে ধুপ কাশেম কোথায় পাবে! সন্ধ্যার পর থেকে বারবার সে কেন ভুলে যাচ্ছে সে এখন আর এই বাড়ির কেউ না। তার জায়গায় নিশ্চয় অন্য গোমস্তা এসেছে বাড়িতে। গরুগুলি এখন সেই গোমস্তার অধীনে। তার সঙ্গে মাঠে যায়, তার সঙ্গে ফিরে আসে। মাঠে যাওয়ার সময়, ফিরার সময় এমন কি বাড়িতে এসেও গুরুগুলি হয়তো কাশেমকে খোঁজে। মুখে ভাষা নাই বলে কথা বলতে পারে না। অবলা চোখে চারদিক তাকিয়ে খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে কাশেমের কথা একদিন ভুলে যাবে তারা। নুতন গোমস্তাকে ভালবাসতে শুরু করবে। দুনিয়ার নিয়মই তো এই, চোখের আড়াল থেকে মনের আড়াল। মানুষই মানুষকে মনে রাখে না আর এ তো গরু!

এসব ভেবে চোখ ভরে পানি এল কাশেমের। ধীর পায়ে হেঁটে আথালে ঢুকল সে। লগে লগে বসে থাকা গরুগুলি উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে থাকাগুলি কান লটরপটর করে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল। দুইটা ছাড়া বাছুরের একটা গিয়ে মায়ের পেট ঘেঁষে দাঁড়াল। মা গাইটা লেজ সামান্য উঁচু করে চন চন শব্দে চনাতে লাগল (পেশাব করা)। কাশেম বুঝল অন্ধকারে গরুগুলি তাকে চিনতে পারেনি। গরুচোর ভেবে সচেতন হয়েছে।

দুইহাত দুইটা গরুর পিঠে রাখল কাশেম। গভীর মায়াবি গলায় ফিসফিস করে বলল, আমারে তোমরা চিনতে পার নাই? আমি কাশেম। মাকুন্দা কাশেম।

কাশেমের এই হাকিকি যেন পরিষ্কার বুঝতে পারল গরুগুলি। কী রকম একটা আনন্দের সাড়া পড়ে গেল তাদের মধ্যে। কান লতপত করে, লেজ নেড়ে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। মায়ের পেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ান বাছুরটা হঠাৎই তিড়িং করে একটা লাফ দিল, তারপর কাশেমের কাছে ছুটে এল। কাশেমের পেট বরাবর মাথা ঘষতে লাগল। যেন বা মায়ের মতোই আপন আরেকজনকে পেয়েছে সে। বাছুরটার আচরণে জীবনে এই প্রথম কাশেমের মনে হল বাছুরটা গরুর না, এ আসলে এক মানব সন্তান। যেন বা কাশেমের ঔরসেই জন্মেছে। বহুকাল দেখেনি পিতাকে। আজ কাছে পেয়ে আল্লাদে আটখানা হয়েছে।

দুইহাতে বাছুরটার গলা জড়িয়ে ধরে আথালের ভিতর বসে পড়ল কাশেম। আথালের মাটি মাখামাখি হয়ে আছে চনায়, গোবরে। চারদিকে বিন বিন করতাছে মশা। মানুষের উদাম শরীর পেয়ে গরুদের ছেড়ে মানুষটার ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা। যে যেদিক দিয়ে পারে রক্ত চুষছে। কিন্তু কাশেমের কোনওদিকে খেয়াল নাই। আপন সন্তানের মতো বাছুরটিকে বুকে জড়িয়ে বসেছে সে। চারদিকে দাঁড়ান গরুরা সরে গিয়ে তার বসার জায়গা করে দিয়েছে। কাশেমের পেটে বুকে যেমন আল্লাদে মুখমাথা ঘষছে বাছুরটা ঠিক তেমন করেই বাছুরটার মাথায় মুখ ঘষতে লাগল কাশেম। ফিসফিস করে বলতে লাগল, ওরে আমার সোনারে, ওরে আমার মানিকরে, এত রাইত অইছে ঘুম আহে না তোমার! ক্যান ঘুম আহে না বাজান! ঘুমাও, আমার কুলে হুইয়া তুমি ঘুমাও। আমি তোমার মাথা দোয়াইয়া (হাত বুলিয়ে দেয়া) দিমুনে, পিঠ দোয়াইয়া দিমুনে। একটা মোশায়ও তোমারে কামড় দিতে পারব না। বেবাক মশা আমি খেদাইয়া দিমু নে।

.

১.৪২

সাদা থানের মতো কুয়াশার ভিতর থেকে বের হয়ে আসে একজন মানুষ। কাঁধে একেক পাশে দুইটা করে মাঝারি মাপের ঠিলা বসান ভার। ঠিলাগুলি যে রসে ভরা মানুষটার বেঁকে যাওয়া শরীর দেখে তা বোঝা যায়। গায়ে খয়েরি রঙের হাফহাতা সোয়েটার। বহুকালের পুরানা সোয়েটার। দুইতিন জায়গায় বড় বড় ফুটা। সেই ফুটা দিয়া দেখা যায় সোয়েটারের তলায় আর কিছু পরে নাই সে।

শীতে কাঁপতে কাঁপতে খানিক আগে মান্নান মাওলানার আথাল থেকে বের হয়েছে কাশেম। রাত কেটেছে গরুদের সঙ্গে, সেই বাছুরটাকে কোলে জড়িয়ে। চারদিকে গৰুদের গায়ের উষ্ণতা, কোলের কাছে বাছুরটার উষ্ণতা, রাতেরবেলা শীত একদমই উদিস পায়নি কাশেম। ঘুমিয়েছে কী ঘুমায়নি তাও উদিস পায়নি। রাত কেটে গেছে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে। ভোররাতে, মোরগে বাগ দেওয়ার লগে লগে নড়েচড়ে উঠেছে কাশেম। রাত শেষ হয়ে এল। এখনই ঘরের দুয়ার খুলবেন মান্নান মাওলানা, উঠানে নামবেন। তারপর আথালের দিকে আসবেন। গরুগুলি ঠিকঠাক আছে কিনা দেখবেন। সেই ফাঁকে কাজের ঝি রহিমা রান্নাঘরে ঢুকে পানি গরম করবে। বালতি ভরে গরম পানি এনে রাখবে বারবাড়ির একপাশে অনেকদিন ধরে ফেলে রাখা চাইর কোনাইচ্চা (চৌকো) পাথরটার সামনে। পিতলের একখান বদনাও রাখবে। পাথরের ওপর বসে বদনা ভরে বালতি থেকে গরম পানি তুলে অজু করবেন মান্নান মাওলানা। শীতকালে গরম পানি ছাড়া অজু করেন না তিনি।

অজু শেষ করে সেই পাথরের ওপর দাঁড়িয়েই পশ্চিমমুখি হবেন। সারাটা শীতকাল গায়ে থাকে তার ফ্লানেল কাপড়ের মোটা পানজাবি। পানজাবির ওপর হাতে বোনা নীল হাফহাতা সোয়েটার। সোয়েটারের ওপর ঘিয়া রঙের আলোয়ান। সেই আলোয়ানে টুপির মতো করে মাথা ঢেকে আজান দিবেন। পায়ে থাকবে মোটা মোজা, কালো রাবারের পাম্পসু। এতসব ভেদ করে শীতের বাবার সাধ্য নাই মাওলানাকে কাবু করে।

এই মানুষটার ভয়েই, মানুষটা দুয়ার খুলবার আগেই আথাল থেকে বের হয়েছিল কাশেম। বের হবার আগে কোলে আদুরে মানব সন্তানের মতো লেপটে থাকা বাছুরটাকে ঠেলে তুলেছে। হাকিহুকি করে বলেছে, ওডো বাজান, ওডো। এলা (এখন) মার কাছে যাও। আমার তো যাওনের সময় অইলো।

ঘুমে চোখ জড়ান শিশুর মতো টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বাছুরটা। কাশেম তাকে ঠেলে দিয়েছে মা গরুটার পেটের কাছে। মার কাছে যাও বাজান।

যেন রাতভর পিতার গলা জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটাকে ভোরবেলা মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিচ্ছে পিতা, ভঙ্গিটা তেমন ছিল কাশেমের। কাশেম তারপর আথালের প্রতিটা গরুর দিকে তাকিয়েছে, প্রতিটা গরুর গায়ে হাত দিয়েছে। আমি তাইলে যাই অহন। বিয়ান অইয়া গেছে। আবার রাইতে আমুনে। দিনে তোমগো লগে আর থাকতে পারুম না আমি। তয় রাইতে আইয়া থাকুম। বেবাকতে ঘুমাইয়া গেলে, চুপ্পে চুপ্পে আমু। তোমগো কাছ থিকা কেঐ সরাইয়া রাকতে পারবো না আমারে।

আথাল থেকে বেরিয়েই বেদম শীত টের পেয়েছিল কাশেম। তার উদাম শরীরের চামড়া যেন ফাটিয়ে দিচ্ছিল শীত। কাশেমের ইচ্ছা করছিল আবার ছুটে যায় আথালে। গরুদের ওমে শীত কাটায়। কিন্তু উপায় নাই। এখনই তার ঘরের দুয়ার খুলবেন মান্নান মাওলানা।

উঠানের মাটি ছিল পুকুরের তলার পানির মতন ঠাণ্ডা। রাতভর ওস (শিশির) শুষে ঠাণ্ডা হয়েছে। কিন্তু এই ঠান্ডা গায়ে লাগল না কাশেমের। লুঙ্গি খুলে কোনও রকমে কান পর্যন্ত ঢাকল সে। দ্রুত হেঁটে বাড়ি থেকে নামল।

বাড়ির লগের রাস্তা সবুজ দূর্বাঘাসে ভরা। ওস পড়ে বৃষ্টিতে ভিজার মতো ভিজেছে ঘাসড়গা। সেই ঘাসে পা ফেলার লগে লগে পায়ের তলার শীতটাও টের পেল কাশেম। হি হি করে কাঁপতে লাগল, দাঁতে দাঁত লেগে খটখট করে শব্দ হতে লাগল তার।

এই শীত থেকে কেমন করে এখন নিজেকে বাঁচাবে কাশেম! লুঙ্গি কাছা মেরে চক পাথালে দৌড় শুরু করবে নাকি। দৌড়ালে শীত বলে কিছু থাকবে না।

নাকি যেভাবে আছে সেভাবে থেকেই যত জোরে সম্ভব হাঁটতে শুরু করবে। জোরে হাঁটলেও শীত কমে।

কাশেম তারপর হাঁটতে শুরু করেছিল।

হাঁটতে হাঁটতে এক সময় মনে হয়েছে গরুগুলি কে নিয়া যায় চকে, একটু দেখা দরকার। নুতন গোমস্তা রেখেছেন নাকি মান্নান মাওলানা! নাকি নিজেরাই নিয়া যাচ্ছেন! নিজেরা নিয়া গেলে কে নিয়া যায়! মাওলানা সাহেব নিজে নাকি আতাহার! কিন্তু আতাহারের যা স্বভাব চরিত্র, শীতের দিনে বেলা অনেকখানি না উঠলে ঘুমই ভাঙে না তার। আর গরু নিয়ে চকে মরে গেলেও সে যাবে না!

তাহলে কি মাওলানা সাহেব নিজেই নিয়া যাচ্ছেন? গোমস্তা রাখলে কাকে রেখেছেন। মেদিনীমণ্ডলের কাউকে নাকি অন্য গ্রামের অচেনা কোনও লোককে

এসব ভেবে মান্নান মাওলানার বাড়ির সামনে থেকে ফকির বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যাচ্ছিল কাশেম আর ফিরে আসছিল। এই ফাঁকে শীতটাও এক সময় কজা হয়েছে, সময়টাও কেটেছে। খান বাড়ির মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এসেছে, মান্নান মাওলানার বাড়িতে জেগে উঠেছে মানুষজন। মান্নান মাওলানা যখন আজান দিচ্ছেন তখন বেপারি বাড়ির সামনে ছিল কাশেম। দ্রুত হেঁটে কাশবনের দিকে যাচ্ছিল তখনই কুয়াশা ভেঙে বের হয়ে এল ভার কাঁধে মানুষটা। পলকেই তাকে চিনতে পারল কাশেম। দবির গাছি।

দবিরও ততক্ষণে চিনে ফেলেছে কাশেমকে বেশ খানিকদূর হাঁটার পর এমনিতেই কোথাও না কোথাও ভার নামাতে হয় তাকে, জিরাতে হয়। কাশেমকে দেখে এই সুযোগটা নিল সে। অতিযত্নে রাস্তার মাঝখানে নামাল কাঁধের ভার। এই শীতেও ঘেমে গেছে সে। উপুড় হয়ে লুঙ্গির খুঁটে মুখ মুছে কাশেমের দিকে তাকিয়ে হাসল, কী রে কাশেম, কই যাচ এত বিয়ানে?

তারপরই কাশেমের মার খাওয়া বীভৎস মুখটা দেখতে পেল। দেখে আঁতকে উঠল। কী রে, কী অইছে তর?

লুঙ্গির ভিতরে জবুথুব করে রাখা শরীর টানা দিয়ে দাঁড়াল কাশেম। নাভির কাছে লুঙ্গি বেঁধে বলল, হুজুরে মারছে।

ক্যা?

পরে কমুনে।

অহন কইতে অসুবিদা কী!

কাশেমের গায়ে যে কিছু নাই তারপরই তা দেখতে পেল দবির। দেখে এতই অবাক হল, কাশেমকে যে নির্মমভাবে মেরেছেন মান্নান মাওলানা, মুখচোখ ফাটিয়ে ফেলেছেন, ভুলে গেল। গভীর বিস্ময়ে বলল, খালি গায় ক্যা তুই? এমুন শীতে খালি গায় থাকতে পারেনি মাইনষে! মইরা যাবি তো বেডা!

কাশেম অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, কী করুম। কাপড় চোপড় বেবাকঐ হুজুরের বাইত্তে রইয়া গেছে। আনতে পারি নাই। হুজুরে আমারে মাইরা ধইরা খেদাইয়া দিছে।

অবাক হয়ে কাশেমের মুখের দিকে তাকিয়েছে দবির। জিজ্ঞাসা করেনি কিছু তবু ঘটনা তাকে খুলে বলেছে কাশেম। শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে দবির। দুঃখে মাথা নেড়েছে। আহা রে! কী কমু ক, আমরা গরিব গরবা মানুষ। তারা বড় গিরস্ত, পরহেজগার বান্দা, তারা যুদি এমুন করে, আমগো লাহান মানুষ যায় কই! তুই একখান কাম কর, আমার সুইয়াটারড়া নে। আমি তো বোজা কান্দে দৌড়াই, শীত লাগে না, লাগে গরম। এই দেক ঘাইম্মা গেছি।

ছেঁড়া সোয়েটারখান খুলে কাশেমের হাতে দিয়েছে দবির। এইডা গায় দে। দিয়া আমগো বাইত্তে যা। আমি রস বেইচ্চা আহি তারবাদে কথা কমুনে।

সোয়েটার হাতে কাশেম তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে দবিরের দিকে। পানিতে চোখ ভরে গেছে তার। সেই চোখের দিকে চোখ পড়ল না দবিরের। বলল, কী অইলো খাড়ই রইলি ক্যা? সুইয়াটার গায়ে দে, যা।

তবু সোয়েটারটা পরল না কাশেম। চোখের পানি সামলে ধরা গলায় বলল, তোমরা আমারে এত মহব্বত করো ক্যান, ক্যান এত মহব্বত করো! তোমগো মহব্বতের টানে, গরুডির মহব্বতের টানে, এই গেরামের গাছগাছলা, ঘরদুয়ার, আসমানের পাখি পুকুরের মাছ, চকের ফসল, রইদ বাতাস, ক্যান বেবাকতে তোমরা আমারে এত মহব্বত করো? তোমগ মহব্বতের টানেঐত্তো গেরাম ছাইড়া যাইতে পারি না আমি। নাইলে কে আছে আমার এই গেরামে, কও! মা বাপ নাই, ভাই বেরাদর নাই, আততিয় স্বজন নাই। ক্যান এই গেরামে পইরা রইছি আমি।

শেষদিকে কান্না আর ধরে রাখতে পারল না কাশেম। অন্যদিকে তাকিয়ে শব্দ করে কাঁদতে লাগল।

গভীর মমতায় কাশেমের কাঁধে একটা হাত রাখল দবির। এই বলদা, কাঁচ ক্যা? যা আমার বাইত্তে যা। নূরজাহানের মারে কইচ মুড়ি দিবোনে। খা গিয়া। আমি মাওলানা সাবের বাইত্তে যাইতাছি। বেবাক রস বলে আইজ হের লাগবো। দিয়া আইতাছি।

দবিরের দিকে মুখ ফিরাল কাশেম। চোখ মুছতে ভুলে গেল। ভয়ার্ত গলায় বলল, আমার কথা কিছু কইয়ো না হুজুররে। আমার লগে যে তোমার দেহা অইছিলো, আমারে যে তুমি সুয়াটার দিছো, কিচ্ছু কইয়ো না।

দবির কী বুঝল কে জানে, কাশেমের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আইচ্ছা কমু না।

.

১.৪৩

মান্নান মাওলানার বাড়ির উঠানে বসে রস মাপছে দবির। ভার নামিয়ে হাতের কাছে রেখেছে রসের ঠিলা। সামনে বড় সাইজের তিনটা বালতি আর একটা এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি।

দবির এই বাড়িতে এসে ওঠার পর বালতি হাঁড়ি এনে তার সামনে রেখেছে রহিমা। হাঁটু ভেঙে বসে বাপায়ের কাছে রসভর্তি ঠিলা রেখে, বাঁহাতে কায়দা করে ঠিলার কানা ধরে পা এবং হাতের ভরে ঠিলাখান কাত করে ডানহাতের একসেরি মাপের টিনের মগে রস ঢালছে। মগ ভর্তি হওয়ার লগে লগে রস ঢেলে দিচ্ছে বালতিতে। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মান্নান মাওলানা। তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে আছেন দবিরের হাতের দিকে। মাপে কম দিচ্ছে কিনা গাছি, খেয়াল করতাছেন। মুখে বিড়বিড়ান একটা ভাব তার। অর্থাৎ কয়সের হল রস গনছেন তিনি।

ঠিক একই ভঙ্গিতে দবিরও গনছিল। ফলে অন্য কোনওদিকেই খেয়াল ছিল না। তার। চারটা ঠিলা খালি করে হাসিমুখে মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল সে। এক মোণ চাইস্বের (চারসের) অইছে হুজুর।

শুনে মান্নান মাওলানা যেন চমকালেন। কচ কী? এক মোণ চাইস্বের?

হ।

একটু থেমে অবাক গলায় দবির বলল, ক্যা আপনে গনেন নাই?

না।

কন কী! আপনে সামনে খাড়ইয়া রইছেন, আমি তো মনে করছি গনতাছেন!

না গনি নাই।

মুখটা চুন হয়ে গেল দবিরের। হতাশ গলায় বলল, তাইলে?

মান্নান মাওলানা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, তাইলে আর কী!

আবার মাইপ্পা দিমু?

আবার মাপনের তো ঝামেলা অনেক।

আপনে কইলে মাপি। আমার ইট্টু কষ্ট অইবো, অউক।

মান্নান মাওলানা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, কাম নাই আর মাপনের। তয় আমার মনে অইতাছে মাপে গরবর অইছে তর। ছয় পাড়ির (বিক্রমপুর অঞ্চলে পাঁচ সেরকে ‘একপাড়ি’ বলা হয়। তবে কথাটা খুব বেশি প্রচলিত নয়) বেশি রস এহেনে অওনের কথা না।

শুনে দবির আকাশ থেকে পড়ল। কন কী হুজুর! তিনডা বালতি পুরা ভরছে। পাতিলাডাও ভরা ভরা। বালতিডি তো বারোসেরির কম না!

আরে না বেডা, আষ্টসেরি বালতি। পাতিলডাও ওই মাপের।

তাইলে হুজুর আমি আরেকবার মাপি। আপনে গনেন।

না থাউক।

থাকবো ক্যা?

আমি তর কথা বিশ্বাস করলাম।

মনের মইদ্যে সন্দ রাইক্কা আমারে আপনের বিশ্বাস করনের কাম নাই।

না সন্দ আর কী! মাপে কম দিলে আল্লার কাছে ঠেকা থাকবি।

এইডা খাডি কথা কইছেন হুজুর। হ, এক মোণ চাইস্বের থিকা একফোডা রস যুদি আপনেরে কম দিয়া থাকি তয় আল্লার কাছে ঠেকা থাকুম। হাসরের দিন এই রসের বিচার অইবো।

দবির উঠে দাঁড়াল। আমরা হুজুর গরিব গরবা মানুষ, অভাবী মানুষ, তয় নিঐত (নিয়ত) খারাপ না। কেরে ঠকাইয়া দুইডা পয়সা খাইতে চাই না। হারাম খাওনের আগে আল্লায় য্যান এই দুইন্নাই থিকা উডাইয়া নেয়।

রস ভর্তি বালতি একটা একটা করে রান্ধনঘরে নিয়ে রাখছে রহিমা। কোন ফাঁকে পানজাবির পকেট থেকে কাঁকুই বের করেছেন মান্নান মাওলানা। এখন আনমনা ভঙিতে দাঁড়ি আচড়াচ্ছেন।

এক পলক তার দিকে তাকিয়ে দবির হাসিমুখে বলল, এত রস দিয়া কী করবেন হুজুরঃ কুড়ুম আইবোনি?

হ মাইয়ারা আইবো, জামাইরা আইবো। নাতি নাতকুররা আইবো। আতাহারের মায় পোনরো সের চাউল ভিজাইছে। কাইল বিয়ালে কাহাইল ছিয়া দিয়া গুঁড়ি (চাউলের গুড়ো) কুইট্টা রাকছে। আইজ হারাদিন পিডা বানাইবো।

কী পিডা? সেঐ কুলঐ? (সেঐ কথাটির মানে সেমাই। চাউলের গুড়ো আটার মতো দলে পিঁড়ি কিংবা পাটায় রেখে হাতের ঘষায় ঘষায় তৈরি করতে হয়। কড়ে আঙুলের সমান লম্বা এবং সামান্য মোটা। পরে রসে ফেলে জ্বাল দিতে হয়। রসের পরিবর্তে গুড় চিনি দিয়েও তৈরি করা যায়। কুলঐ পিঠা হচ্ছে অর্ধচন্দ্রাকারের, ভেতরে নারকেল দিয়ে। মুখ বন্ধ করে রসে ছাড়তে হয়। কুল পিঠাও গুড় চিনি দিয়ে তৈরি করা যায়)

হ। সেঐ কুলঐ তো আছে, চিতও মনে অয় বানাইবো। চাইর পাঁচখান খাজ বাইর করতাছে দেকলাম। খাঁজের পিডাও বানাইবো। (মাটির তৈরি সাচ। চাউলের গুড়ো পানিতে গুলে যেভাবে চিতইপিঠা তৈরি করা হয় ঠিক সেভাবেই সাচে ফেলতে হয়। এ আসলে এক ধরনের চিতইপিঠা।)

ভাল। পিড়া তো মাইনষে শীতের দিনেঐ খায়।

পুবের ঘরের চালা ডিঙিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে উঠানে। কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। যেটুকু আছে সেটুকু উঠে গেছে গাছপালার মাথায়। খানিকপর। উধাও হবে। রোদের ছোঁয়ায় কুয়াশার মতো শীতটাও কাটছে।

মান্নান মাওলানা কয়েক পা হেঁটে রোদে এসে দাঁড়ালেন। দেখে দবির মনে মনে বলল, এত কিছু গায় দিয়াও শীত করে মাইনষের! আর আমি যে খালি গায়!

তারপরই কাশেমের কথা মনে পড়ল। ওইরকম শীতে খালি গায়ে ছিল কাশেম। আশ্চর্য ব্যাপার!

গোয়ালঘরে লুঙ্গি কাছা মেরে কাজ করতাছে একটা লোক। আনমনে সেদিক তাকাল দবির। লোকটাকে চিনতে পারল না। চালাকি করে বলল, কাইশ্যা কো? আথালে দিহি অন্যমানুষ!

হ। কাইশ্যারে খেদাইয়া দিছি। অন্য গোমস্তা রাকছি। চউরা।

নাম কী?

হাফিজদ্দি।

তারপরই হাত কচলাতে কচলাতে আসল কথাটা বলল দবির। দেন হুজুর।

কথাটা যেন বুঝতে পারলেন না মান্নান মাওলানা। বললেন, কী দিমু?

দবির হাসল। রসের দাম দিবেন না?

হ দিমু না? কত দাম অইছে?

দুই টেকা সের। এক মোণ চাইষের। আষ্টাশি টেকা অইছে।

কচ কী! দুই টেকা সের রস আছেনি? একটেকা দেটটেকার বেশি রসের সের অইতে পারে না!

না। আড়াই তিনটেকা সেরও বেচি। আপনের লগে দামাদামি করি না। দুইটেকা সেরঐ দেওন লাগবো।

পাগল অইছস! কয় সের অইছে না অইছে আমি বুজি না, দুইটেকা না দেটটেকা হেইডাও বুজি না, বেবাক মিল্লা পনচাস টেকা পাবি। চাইর পাঁচদিন বাদে আইয়া টেকা লইয়া যাইচ।

শুনে দাবির হাঁ করে থাকে। কথা বলতে পারে না। তারপর হা হা করে ওঠে। কন কী হুজুর! না না, এইডা অইবো না। আষ্টাশির জাগায় আপনে নাইলে আষ্টটেকা কম দেন। এত কম দিলে মইরা যামু আমি।

পনচাস টেকা কম টেকা না। যা বাইত্তে যা, পরে আইয়া লইয়া যাইচ।

না হুজুর পনচাস টেকা আমি নিমু না। এত ঠকান আমারে আপনে ঠকায়েন না।

একথায় মান্নান মাওলানা রেগে গেলেন। ঘেটি ত্যাড়া করে দবির গাছির দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, কী, আমি তরে ঠকাইছি! মান্নান মাওলানা মানুষ ঠকায়! আমার মুখের সামনে খাড়ইয়া এতবড় কথা কইলি! ঐ শুয়োরের বাচ্চা, তর রস তুই লইয়া যা। এই রস আমি রাখুম না। এইরসে আমি মুতি।

দবির কল্পনাও করেনি এইভাবে কথা বলবেন মান্নান মাওলানা। সে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। কাঁচুমাচু গলায় বলল, আমি আপনেরে এইকথা কই নাই হুজুর। আপনে উল্টা বোজছেন।

চুপ কর শালার পো শালা আমি উল্টা বুজছি! উল্টা ভাবদি (সোজা) আমারে বুজাও। তুমি চুতমারানীর পো বহুত খারাপ মানুষ। নিজে যেমুন মাইয়াডাও অমুন বানাইছস। ডাঙ্গর মাইয়া, দিন নাই রাইত নাই যেহেনে ইচ্ছা ওহেনে যায়, যার লগে ইচ্ছা তার লগে রঙ্গরস করে। আমারে কয় রাজাকার। হেইদিনের ছেমড়ি ও রাজাকারের বোজে কী! হ আমি রাজাকার আছিলাম, কী অইছে? আমি অহনও রাজাকার, কী অইছে? আমার একখান পশমও তো কেঐ ছিঁড়তে পারে নাই। কোনওদিন পারবোও না। রাজাকারগো জোরের তরা দেকছস কী! জোর আছে দেইখাই পেসিডেন (প্রেসিডেন্ট) জিয়া রাজাকারগ কিছু করতে পারে নাই, এরশাদ কিছু করতে পারে নাই। উল্টা রাজাকারগো মন্ত্রি মিনিষ্টার বানাইছে।

মান্নান মাওলানার চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম চোখে উঠানে এসেছে আতাহার, বাড়ির বউঝিরা যে যার দুয়ারে দাঁড়িয়েছে, পোলাপান কেউ কেউ এসে জড়ো হয়েছে উঠানে। মান্নান মাওলানা কোনওদিকে তাকালেন না, কোনও কিছু তোয়াক্কা করলেন না। আগের মতোই চিৎকার করে বললেন, পনচাস টেকা দিতে চাইছিলাম অহন এক পয়সাও দিমু না। পারলে তুই আমার কাছ থিকা টেকা আদায় করিচ। যা বাইর অ, বাইর অ আমার বাইত থন।

দবির মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, মাথা তুলে কিছু একটা বলতে চাইল, মান্নান মাওলানা তেড়ে এলেন। ঘেটে ধরে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিলেন দবিরকে। অহনতরি খাড়াইয়া রইছস?

ধাক্কা খেয়ে খানিকদূর ছিটকে গেল দবির কিন্তু হুমড়ি খেয়ে পড়ল না, নিজেকে সামলাল। এত অপমান কোনওদিন হয় নাই সে। এতটা দুঃখ কোনওদিন পায় নাই। দুঃখে অপমানে বুক ফেটে গেল দবির গাছির, চোখ ফেটে কান্না এল। অতি কষ্টে কান্নাটা আটকাল সে। মাথা নিচু করে খালি ঠিলা চারটা ভারে বসাল তারপর কোনও দিকে না তাকিয়ে ভারটা কাঁধে নিল।

মান্নান মাওলানার বাড়ি থেকে যখন নেমে যাচ্ছে দবির পিছনে তখনও সমানে চিল্লাচ্ছেন মান্নান মাওলানা। বাপ বেডি দুইডাঐ শয়তান। বাপে কয় আমি মানুষ ঠকাই মাইয়ায় কয় রাজাকার। রাজাকার যহন কইছে রাজাকারের কাম আমি কইরা ছাড়ুম। ল্যাংটা কইরা ঐ ছেমড়ির হোগায় (পাছায়) আমি বেতামু। হোগার চামড়া উড়াইয়া হালামু।

দবির গাছির চোখ দিয়ে তখন টপ টপ করে পানি পড়ছে।

.

১.৪৪

চাপা ক্রোধের গলায় নূরজাহান বলল, আপনে কেমুন পুরুষপোলা! আপনেরে যে এমনে মারলো আপনে কিছু কইতে পারলেন না?

নূরজাহানদের উঠানের রোদে বসে আছে কাশেম। সকালেবলার রোদ বেশ চড়েছে এতক্ষণে। কুয়াশা সরে ঝকঝক তকতক করতাছে চারদিক। গাছগাছালির ডালপালায় ঝোপঝাড় এবং ঘরবাড়ির আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা কুয়াশা শীত উধাও হতে শুরু করেছে। গিরস্তবাড়ির লগের ডোবানালা আর পুকুরের পানিতে জমিয়ে বসেছিল যে কুয়াশা রোদের তাপে হালকা ধুমার মতো উড়তে শুরু করেছে তা। গিরস্তবাড়ির বউঝিরা ঘাটলায় বসে মরার মতো ঠাণ্ডা পানিতেই শুরু করেছে দিনের কাজ।

হামিদাও গেছে ঘাটপারে। যাওয়ার আগে পাতলা একখান কথা গায়ে জড়িয়ে উঠানের কোণে রোদ পোহাতে বসা নূরজাহানকে দিয়ে গেছে পোয়াখানেক মুড়ি ধরে এমন ডালার একডালা মুড়ি আর মাঝারি মুচির (ডেলা) খাজুরা গুড়ের অর্ধেকটা। একমুঠ মুড়ি আর এক কামড় গুড় মাত্র মুখে দিয়েছে নূরজাহান তখনই বাড়িতে এসে উঠল কাশেম। হামিদা তখনও ঘাটপার যায়নি। দুইহাতে কায়দা করে ধরা বাসি থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই, মাত্র পা বাড়িয়েছে, উঠানে এসে দাঁড়াল কাশেম। বিগলিত গলায় বলল, গাছি দাদার লগে দেহা অইলো তো, কইলো বাইত যা, তর ভাবীছাবরে কইচ মুড়ি মিডাই দিতে, খাইতে থাক আমি আইতাছি।

হামিদা আর নূরজাহান দুইজনেই তখন সব ভুলে কাশেমকে দেখছে। হামিদা কথা বলবার আগেই নূরজাহান জিজ্ঞাসা করেছে, কী অইছে আপনের চেহারা এমুন ক্যা?

মান্নান মাওলানার হাতে মার খাওয়ার পর থেকে ঘটনাটা অনেককেই বলতে হয়েছে কাশেমের। প্রতিবার বলার সময়ই কেঁদে ফেলেছে সে। নূরজাহানকে বলার সময়ও কাঁদল। সেই কান্না দেখে ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রেগে গেল নূরজাহান, গম্ভীর হয়ে গেল। মুড়ি খাওয়া ভুলে কাশেমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

নূরজাহানের মতো হামিদাও তাকিয়ে রইল তারপর হাতে ধরা থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই উঠানে নামিয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ঘরে গিয়ে ঢুকল। টিনের খাবদা (বেশি খাবার ধরে। বড় অর্থে) একখান থালার গলা তরি ভর্তি মুড়ি আর নূরজাহানকে যতটা দিয়েছে ততটা গুড় এনে কাশেমের হাত দিল। বহেন, বইয়া খান। আমি ঘাটপার থিকা আহি। তারবাদে হুনুমনে সব।

হামিদা চলে যাওয়ার পরই কথাটা বলল নূরজাহান। শুনে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল কাশেম। কথা বলল না। অতিকষ্টে হাঁ করে একমুঠ মুড়ি মুখে দিল, এক কামড় গুড় নিল। তারপর আনমনা ভঙ্গিতে চাবাতে লাগল।

মুড়ি চাবাতে যে খুব কষ্ট হচ্ছে কাশেমের, কেটে ঝুলে পড়া ঠোঁটে যে ব্যথা হচ্ছে মুখ দেখে যে কেউ তা বুঝতে পারবে। নূরজাহানও পারছিল। ফলে ভিতরের রাগ আরও বেড়ে যাচ্ছিল তার। গুড়মুড়ি খাওয়ার কথা ভুলে বলল, শইল্লে জোরবল নাই আপনের মারলো আর মাইর খাইলেন?

নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে কাশেম বলল, কী করুম মা?

আপনেরে মারলো আপনেও তারে মারতেন!

কও কী, তাইলে তো সব্বনাশ অইয়া যাইতো। হুজুরের পোলা আছে না, আতাহার, ডাকাইত। আমি হুজুরের লগে বেদ্দপি করছি হোনলে জব কইরা হালাইতো আমারে। জব কইরা কচুরি বইন্না (বন অর্থে) পুকুরে ডুবাইয়া রাকতো। দুইন্নাইর কেঐ উদিস পাইতো না। আমার তো কেঐ নাই, কে সমবাত লইতো! তাও অনেকদিন আমারে না দেইকা কেঐ যদি জিগাইতো, কাইশ্যা কো, কইতো কই জানি পলাইয়া গেছে গা, সমবাত নাই।

কাশেমের কথা শুনে নিজেরও একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল নূরজাহানের। একমুঠ মুড়ি মুখে দিল সে। দুইটা কাক আর বাড়ির তিন চারটা কুকরা চড়ছিল উঠানে। দুইটি মানুষকে উঠানে বসে মুড়ি খেতে দেখে ঘুরঘুর করছিল তারা। ডালা থেকে একমুঠ মুড়ি নিয়ে দূরে ছুঁড়ে দিল নূরজাহান। কাক দুইটা লগে লগে উড়ে গেল সেখানে, কুকরাগুলি ছুটে গেল। একবার সেদিকে তাকিয়ে নূরজাহান বলল, না মারতে পারছিলেন মাইর ঠেকাইতেন। খাড়াইয়া খাড়াইয়া মাইর খাইলেন ক্যা?

কাশেম বলল, মাইর ঠেকানোরও উপায় আছিলো না মা। খাড়াইয়া খাড়াইয়া মাইর খাইয়া উপায় আছিলো না। মাইর ঠেকাইলেও বেপি অইতো, দৌড় দিলেও বেদ্দপি অইতো।

কীয়ের বেদ্দপি?

হুজুরে যা করবো হেইডা বাদা দিলেঐ বেদ্দপি।

এইডা কোনও কথা অইলোনি! একজন মানুষরে মাইরা হালাইবো আর বাদা দিলে অইবো বেদ্দপি! অইলে অইবো। অমুন বেদ্দপি করণ খারাপ না।

তয় আমার দুক্কু এইডা না মা। আমার দুক্কু গরুডি।

গরুডি আবার কী করছে?

ঐ বাইত্তে আমি যাইতে পারি না, গরুডিরে দেকতে পারি না, আমার দুক্কু খালি এইডাঐ। মারছেলো নাইলে আরও মারতো তাও যুদি বাইত্তে থাকতে দিতো, গরুডির লগে থাকতে দিতো!

মান্নান মাওলানার বাড়িতে কাল রাতে গরুদের লগে থাকার ঘটনাটা বলল কাশেম। শুনে নূরজাহান স্তব্ধ হয়ে গেল।

গরুদের লেইগা এতো টান! এইটা কেমুন মানুষ!

খুব হাসি পেল নূরজাহানের। কিন্তু হাসল না। চেপে রেখে বলল, আপনে যে রাইত দোফরে ঐ বাইত্তে গিয়া উঠলেন যুদি কেঐ দেইক্কা হালাইতো?

দেকলে বিপদ আছিলো কপালে। আবার মাইর খাওন লাগতো।

এই হগল জাইন্নাও গেলেন?

হ মা গেলাম। গরুডিরে না দেইক্কা অনেকদিন থাকছি আর থাকতে পারতাছিলাম। মাইর খাইলে কিছু অয় না। গরুডিরে না দেকলে মনডা কান্দে। কাইল রাইতে ঘুটঘুইট্টা আন্দারের মইদ্যে যহন গোয়াইল ঘরে গিয়া হানছি (হান্দাইছি, ঢোকা অর্থে), কী কমু মা তোমারে, অমুন আন্দারেও গরুডি আমারে ঠিক চিনলো।

নূরজাহান অবাক হয়ে বলল, কেমনে চিনলো?

কাটা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল কাশেম। শইল্লের গন্দে চিনলো। এহেকজন মাইনষের শইল্লে তো এহেক রকম গন্দ থাকে! চিননের পর গরুডি যে কেমুন করলো আমার লেইগা, কী কমু তোমারে! কোনডায় শইল চাইভা দেয়, কোনডায় শইল্লে মাথা ঘইষ্যা দেয়। ছোড বাছুরডা হারারাইত আমার কুলে হুইয়া ঘুমাইলো। আমার শইল্লে তো কিছু আছিল না, উদলা গাও, গরুডির লগে হারারাইত গোয়াইল ঘরে রইলাম, ইট্টুও শীত করলো না আমার। তয় শীত করতাছে বিয়ানে, গোয়াইল ঘর থিকা বাইর অওনের পর। গাছি দাদায় সুয়াটার না দিলে শীতে মনে অয় আইজ মইরা যাইতাম।

কাশেম আরেক মুঠ মুড়ি দিল মুখে, এক কামড় গুড় নিল।

নূরজাহান বলল, তয় আপনে অহনে কী করবেন? কই থাকবেন, কই খাইবেন?

কাশেম বলল, থাকনের কোনও অসুবিদা নাই। থাকনের জাগা আমার আছে।

কই?

হোনলে তুমি হাসবা।

না হাসুম না, কন।

হুজুরের বাড়ির গোয়াইল ঘরে।

কেমতে থাকবেন? ঐবাইত্তে আপনেরে যাইতে দিবো?

না হেইডা দিবো না। আমি থাকুম অন্য কায়দায়।

কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। মুখে মুড়ি ছিল, চাবাতে ভুলে গেল। কাশেমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আবার হাসল কাশেম। কায়দা কী হোনবা মা? বেবাকতে ঘুমাইয়া যাওনের পর রাইত দুইফরে গিয়া উডুম হুজুরের বাইত্তে। চুপ্পে চুপ্পে গিয়া ঢুকুম গোয়াইল ঘরে। হারারাইত গৰুডির লগে থাইক্কা বিয়াইন্না রাইত্রে, হুজুরে উইট্টা আয়জান দেওনের আগে আগে বাইর অইয়া আমু। হারাদিন অন্য জাগায় কাম করুম রাইত্রে গিয়া থাকুম গরুডির লগে।

গরুর লগে এমতে থাকতে পারেনি মাইনষে গোয়াইল ঘরে থাকতে পারে? গরুর শইল্লের গন্দ, গোবর চনা এই হগলের গন্দ। গরুতে আইম (শ্বাস ফেলা অর্থে) দেয় ঐ আইমের গন্দ, এই হগলের মইদ্যে থাকবেন কেমতে?

আমি থাকতে পারি। মাইনষের থিকা গরুর লগে থাকতে আমার বেশি আরাম। মানুষ শয়তান বদমাইস অয়, ইতর বদজাইত অয়, গরুরা অয় না। গরুরা মাইনষের থিকা ভাল। হোনো মা, আমি যহন গরুডির লগে থাকি, আমার মনে অয় আমি আছি আমার মা বাপের লগে, আমার ভাই বইনের লগে, বউ পোলাপানের লগে। আমার মা বাপের কথা আমার মনে নাই, ভাই বইন আত্মীয় স্বজন কেঐরে আমি দেহি নাই, বউ পোলাপান এই জীবনে আমার অইবো না, তয় অমুন একখান সংসারের কথা চিন্তা করতে আমার বহুত আমদ লাগে। এমুন সংসার অনেক থাকে না মাইনষের, মা বাপ ভাই বইন বউ পোলাপান লইয়া একখান ছোট্ট ঘরের মইদ্যে থাকে বেকতে, গরুডির লগে গোয়াইল ঘরে থাকলে আমার এমুন মনে অয়। কোনও কোনও গরুরে মনে অয় আমার মা বাপ কোনও কোনওডারে মনে হয় ভাই বইন, বাছুড়ডিরে মনে অয় পোলাপান।

মানুষের এই ধরনের কথা কখনও শোনেনি নূরজাহান। গরুর লগে এমন সম্পর্ক হতে পারে মানুষের, জানা ছিল না। খুবই হাসি পাচ্ছিল তার। হাসির চোটে বুক ফেটে যাচ্ছিল। হাসি চাপবার জন্য অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইল।

কাশেম বলল, আর যে গোবর চনার গন্দের কথা কইলা, গরুর শইল্লের গন্দ, আইমের গন্দ, এইডি আমার কাছে গন্দ মনে হয় না। একখান ঘরের মইদ্যে অনেকটি মানুষ থাকলে হেই ঘরের মইদ্যে অনেক পদের গন্দ থাকে না! পোলাপানের ও মুতের গন্দ, মাইনষের উয়াস নিয়াসের (শ্বাস প্রশ্বাসের) গন্দ, গোয়াইল ঘরে থাকলে আমার অমন মনে অয়।

নূরজাহান ঠোঁট টিপে হাসল। মা বাপ মনে অয় গরুডিরে, ভাই বইন, পোলাপান মনে অয়, পোলাপানের মা মনে অয় না কেরে? বউ মনে অয় না?

কথাটা শুনে কী রকম লাজুক হয়ে গেল কাশেম। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, শরমের কথা, কী কমু মা তোমারে! মনে অয়, আমার পোলাপানের মাও মনে অয় একটা গরুরে। বউ মনে অয়।

একথা শুনে হাসি আর ধরে রাখতে পারল না নূরজাহান। খিলখিল করে হেসে উঠল। কোনওদিকে না তাকিয়ে পাগলের মতো দুলে দুলে হাসতে লাগল।

তখনই শূন্যতার কাঁধে মৃতের মতো বাড়িতে এসে উঠল দবির। ঘরের ছেমায় ভারটা নামিয়ে রাখল।

প্রথমে বাবার মুখ খেয়াল করেনি নূরজাহান। হাসির তালে ছিল। হাসতে হাসতে বাবার দিকে মুখ ফিরিয়েছে, কাশেমের মুখে শোনা কথা মজা করে বলতে যাবে, বাবার মুখ দেখে থতমত খেল। হাসি বন্ধ হল নূরজাহানের, মুড়ির ডালা ফেলে দবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। কী অইছে বাবা? মুখহান এমুন দেহা যাইতাছে ক্যান তোমার?

লগে লগে ঠাস করে নূরজাহানের গালে একটা থাবড় (চড়) মারল দবির।

বাপের হাতে এমন একখান থাবড় খেয়ে নূরজাহান যে কী রকম থতমত খেল! খানিকক্ষণ বুঝতেই পারল না বাবা তাকে থাবড় মেরেছে, খুব জোরে, ডান গালে। গাল জ্বলে যাচ্ছে, মাথা টলমল করতাছে। চোখের দৃষ্টি একটুখানি ঝাপসা হয়েছে।

তবু এই দৃষ্টি নিয়েই ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।

মা বাবা যে কেউ মারলেই যে ব্যথা পাওয়া যায়, সেই ব্যথায় যে কাঁদতে হয় নূরজাহানের একবারও তা মনে হল না। এতটা অবাক তের চৌদ্দবছর বয়সের জীবনে সে আর কখনও হয়নি। বাবা তাকে থাবড় মেরেছে এরচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা আজকের আগে নূরজাহানের জীবনে কখনও ঘটেনি।

ছেলেবেলা থেকেই পাড়া বেডানোর স্বভাব নূরজাহানের, সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেডানোর স্বভাব। এই স্বভাবের জন্য মায়ের চড়চাপড় কিলগুতা বহুবার খেতে হয়েছে। আর ঠোকনা তো উঠতে বসতেই খেতে হতো। এখনও হয়। মা যখন তার মাথার উকুন মারতে বসে তখন ঠোকনা নূরজানের কপালে বান্ধা। নূরজাহানের স্বভাব হচ্ছে বেশিক্ষণ স্থির হয়ে কোথাও বসতে পারেন না। শালিক পাখির মতো ছটফট করে লাফিয়ে ওঠে, হঠাৎ দৌড় দিতে চায়। উকুন মারার সময় স্থির হয়ে না বসলে কী করে হবে। এজন্য ওইসব সময় ছটফট করে ওঠা লাফিয়ে ওঠা আর আচমকা দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করলেই গাল থুতনিতে ঠোকনাটা তাকে দিবেই মা।

তবে বাবা কখনও মেরেছে এমন স্মৃতি নাই নূরজাহানের। উল্টা মা যখন মেরেছে বাবা তাকে বুক দিয়ে আগলেছে, নূরজাহানকে মারার দায়ে দবির গাছির হাতের কিল থাবড় তরি খেতে হয়েছে হামিদাকে। জন্মের পর থেকে, বোধবুদ্ধি হওয়ার পর থেকে বাবার মুখে একটা কথাই শুনে এসেছে নূরজাহান, মাইয়ারা অইলো ঘরের লক্ষ্মী, বাড়ির লক্ষ্মী। লক্ষ্মীগো শইল্লে কোনওদিন হাত তুলতে অয় না। তাইলে অলক্ষ্মী লাইগ্যা যায় সংসারে। সেই বাবাই আজ হাত তুলল নূরজাহানের গায়ে! কেন, কী করেছে সে?

এসময় ঘাটপার থেকে উঠে আসছিল হামিদা। দুইহাত ভর্তি পাল বাসন হাঁড়ি কড়াই। সেই অবস্থায়ই দেখতে পেয়েছিল স্বামী তার মেয়েকে জোরে থাবড় মেরেছে। দেখে সেও নূরজাহানের চেয়ে কম অবাক হয়নি। এটা কী করে সম্ভব! দবির গাছি থাবড় মেরেছে নূরজাহানকে এরচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা আর কী হতে পারে সংসারে! নূরজাহানের মতো হামিদাও যেন বোবা হয়ে গেল, পাথর হয়ে গেল। থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই হাতে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, দাঁড়িয়ে রইল।

তবে মুড়ির ডালা ফেলে লাফিয়ে উঠল মাকুন্দা কাশেম। হা হা করে উঠল। মারলা ক্যা মাইয়াডারে, মারলা ক্যা গাছি দাদা? কী করছে ও?

দবির কোনও কথা বলল না। থমথমা মুখে ঘরের ওটায় (উঁচু ভিতের ঘরে ওঠার জন্য দরজার সামনে সিঁড়ির মতো যে দুতিনটে থাক থাকে) বসল। না আকাশের দিকে তাকাল, না গাছপালা ঘর দুয়ারের দিকে, না কারও মুখের দিকে। মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু মাটি দেখতে পেল না।

কোনও কোনও সময় এমন হয় মানুষের, যেদিকে তাকায় সেদিককার কোনও কিছুই দেখতে পায় না। তাকিয়ে থাকে ঠিকই, দেখে না।

দবির গাছির অবস্থা এখন তেমন।

মাকুন্দা কশেম এসবের কিছুই বুঝল না। কাটা ঠোঁট সরু করে চুকচুক করে শব্দ করল। মাইয়াডা কী করতাছে কিছু বোজলাম না গাছি দাদা? ক্যান অরে এত জোরে একখান থাবড় মারলা?

দবির এবারও কথা বলল না। আগের মতোই মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

নূরজাহান তখনও স্তব্ধ হয়ে আছে, তাকিয়ে আছে বাপের মুখের দিকে। চোখে পলক পড়ে না তার।

কিন্তু হামিদার স্তব্ধতা ভেঙেছে তখন। হাতের থাল বাসন হাঁড়ি কড়াই নিয়ে নরম পায়ে রান্নাচালার সামনে এল সে। যেটা যেখানে রাখার নামিয়ে রাখল। তারপর দবিরের সামনে এসে দাঁড়াল। খানিক আগে সম্পূর্ণ নতুন এক ঘটনা ঘটেছে এই সংসারে, যেন সেই ঘটনার কিছুই জানে না হামিদা, যেন সে কিছুই দেখেনি, কিছুই শোনেনি, রস বেচে বাড়ি ফিরে আসার পর স্বামীকে প্রথমে যে কথাটা সে বলে আজও তাই বলল। মুড়ি মিডাই দেই, খাইয়া লও।

মাটির দিক থেকে চোখ তুলল না দবির। অদ্ভুত এক অসহায় গলায় বলল, না।

ক্যা, খাইবা না? খিদা লাগে নাই?

না।

তারপরই ধীরে শান্ত গলায় ঘটনাটা জানতে চাইল হামিদা। কী অইছে তোমার?

হামিদার লগে কাশেমও গলা মিলাল। হ, কী অইছে গাছি দাদা?

দবির চোখ তুলে কাশেমের দিকে তাকাল। উদাস গলায় বলল, হুইন্না আর কী করবি! মুড়ি খা।

হামিদা বলল, মাইয়াডারে যে মারলা?

উদাস এবং নরম দুঃখি ভাব কেটে গেল দবিরের। নূরজাহানের দিকে এক পলক তাকিয়ে রাগী গলায় বলল, অর লেইগা এত শরম পাইতে অইবো ক্যা মাইনষের কাছে? এত কথা হোনতে অইবো ক্যা?

কীয়ের শরম? কী কথা হোনছো?

ও বলে মাওলানা সাবরে রাজাকার কইছে। এর লেইগা যা মুখে আহে তাই আমারে হুনাইয়া দিল মাওলানা সাবে। রসের দাম যা অয় তার অরদেকে নামাইয়া আনলো, তাও টেকা দিল না। বেবাক অর লেইগা।

শুনে হামিদা তাকাল নূরজাহানের দিকে। কীরে সত্যঐ তুই মাওলানা সাবরে রাজাকার কইছস?

এই প্রথম চোখে পলক পড়ল নূরজাহানের। শরীর নড়ল না তার শুধু মুখটা নড়ল। নরম ভঙ্গিতে অন্যদিকে মুখ ফিরাল সে। অদূরে পড়ে আছে তার মুড়ির ডালা। এখনও অর্ধেকের বেশি মুড়ি রয়ে গেছে ডালায়, গুড় রয়ে গেছে বেশির ভাগই। সাহসী ডেকি (মাত্র যুবতী হয়েছে, এই অর্থে) কুকরাটা পায়ে পায়ে এগুচ্ছে নূরজাহানের মুড়ির ডালার দিকে। এখনই ঠোকরে ঠোকরে সাবাড় করবে ডালার মুড়ি। নূরজাহান কেন, উঠানে দাঁড়িয়ে বসে থাকা অন্য মানুষগুলির কেউই তা খেয়াল করল না।

হামিদা বলল, কথা কচ না ক্যা?

দবির বলল, কী কইবো! আর মোক দেহো না! মোক দেকলে বুজা যায় মাওলানা সাবরে রাজাকার ও কইছে। মাওলানা সাবে মিছাকথা কয় নাই।

কাশেম বলল, আমার মনে অয় মিছাকথাই কইছে মাওলানা সাবে। মাওলানা অইলে কী অইবো, বহুত মিছাকথা কয় হেয়। মিছাকথা কইয়া উল্টাসিদা তোমারে বুজাইয়া দিছে যাতে রসের দামডা না দিতে অয়। বহুত বদ মানুষ হেয়। নিজের ভালর লেইগা যা মনে অয় হেইডা করতে পারে। বকাবাজ্জি তো আছেঐ মাইর ধইরও দিতে পারে মাইনষেরে।

মান্নান মাওলানার ঘেটি ধাক্কার কথাটা মনে পড়ল দবিরের। এতটা অপমান জীবনে সে কখনও হয়েছে বলে মনে পড়ে না। চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরেছে। এখন আর কান্না পাচ্ছে না। কী রকম এক ক্রোধে বুক জ্বলে যাচ্ছে। এই ক্রোধই কি নূরজাহানের ওপর ঝাড়ল সে!

কাশেমের কথা শুনে মনে হচ্ছে নূরজাহান তাকে রাজাকার বলেছে কথাটা ঠিক বলেনি মান্নান মাওলানা। মেয়েটার ওপর দোষ চাপিয়ে রসের দাম না দেওয়ার অজুহাত তৈরি করেছে। এতকাল ধরে মান্নান মাওলানার বাড়ির গোমস্তা কাশেম, কাশেমের চেয়ে মান্নান মাওলানাকে আর বেশি কে চিনে! তবু ব্যাপারটা দবিরের জানতে হবে। কথাটা নূরজাহান বলেছে কিনা জানতে হবে। বলে থাকলে নূরজাহান তা স্বীকার করবে। মিথ্যা বলবে না।

হামিদার দিকে তাকিয়ে দবির বলল, জিগাও তোমার মাইয়ারে, মাওলানা সাবরে রাজাকার ও কইছে কিনা। মিছাকথা য্যান আমার লগে না কয়। সত্যকথা কইলে কিছু কমু না। মিছাকথা কইলে আবার মারুম।

নূরজাহানের দিকে এগিয়ে গেল হামিদা। কী রে, কইছস?

নূরজাহান কোনও কথা বলল না। কোনওদিকে তাকাল না। পাথরের মতো মুখ তার। চোখ স্থির। সেই চোখে রাগ অভিমান নাকি কান্না কোনটা যে আছে কেউ বুঝতে পারল না। আস্তে ধীরে বারবাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।

হামিদা দিশাহারা গলায় বলল, কই যাচ, ও নূরজাহান!

নূরজাহান কথা বলল না, ফিরে তাকাল না। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির নামার দিকে চলে গেল।

হামিদা ব্যস্ত চোখে স্বামীর দিকে তাকাল। যাও, ধরো মাইয়াডারে।

দবির গম্ভীর গলায় বলল, কাম নাই ধরনের। যেই মিহি ইচ্ছা যাইক গা।

একথায় হামিদা না, হা হা করে উঠল কাশেম। না না এইডা তুমি ঠিক কইলা না গাছি দাদা। রাগ কইরা যদি কোনও মিহি যায়গা মাইয়াডা? আমি দেকতাছি কই যায়! আমি অরে ফিরাইয়া আনি।

পায়ের কাছে পড়ে রইল কাশেমের মুড়ির ডালা, কাশেম সেদিকে ফিরেও তাকাল না, নূরজাহানের পিছু পিছু ছুটতে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা খাস ফেলল দবির। কেন যেন এই দীর্ঘশ্বাসটা একেবারে বুকে এসে লাগল হামিদার। পায়ে পায়ে স্বামীর কাছে এসে দাঁড়াল সে। একটা হাত রাখল স্বামীর কাঁধে। সত্য কইরা কও তো আমারে কী অইছে। কী কইছে মাওলানা সাবে? জিন্দেগিতে কোনওদিন মাইয়ার শইল্লে তুমি হাত উডাও নাই, আইজ উডাইলা! রস বেচা টেকা পাও নাই দেইক্কা নাকি আর কিছু অইছে? কও, আমার কাছে তো দুইন্নাইর কোনও কথা না কও না তুমি! এইডাও কও। মাওলানা সাবে কী তোমারে মারছে?

লগে লগে দুইহাতে হামিদার মাজার কাছটা জড়িয়ে ধরল দবির। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, মারে নাই, মাইরের থিকা বেশি করতাছে। গরদানডার মইদ্যে ঠেলা দিয়া বাইত থিকা নামায় হালায় দিছে। নূরজাহানের মা গো, জীবনে এমুন অপমান কোনওদিন অইনাই।

ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল দবির।

নিজের অজান্তেই দবিরের মাথাটা কখন জড়িয়ে ধরেছে হামিদা। ধরে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে অশুরের মতো মাওলানা প্রচণ্ড জোরে ঘেটি ধাক্কা দিয়ে বাড়ির নামায় ফেলে দিচ্ছে তার স্বামীকে। কী যে অসহায় ভঙ্গিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে মানুষটা, কী যে করুণ ভঙ্গিতে পড়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য সইতে পারে কোনও নারী! হামিদাও পারল না। অসহায় এক দুঃখ বেদনায় বুক ফেটে গেল তার, চোখ ফেটে গেল। গভীর মায়া মমতায় স্বামীর মাথা বুকে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগল সে।

.

১.৪৫

বাড়ি থেকে বের হলেই নূরজাহানের মনে হয় স্বাধীনতা। চারদিকে অবারিত শস্যের চকমাঠ, গাছপালা, গ্রাম গিরস্তর ঘরবাড়ি, পুকুর ডোবা মাথার ওপরকার আকাশ, রোদ ছায়া, শীত পরালি কোনও কিছুই চোখে পড়ে না তার, কোনও কিছুই মনে থাকে না। নিজেকে নূরজাহানের মনে হয় দূর আকাশের পাখি আর নয়তো জোয়াইরা পানির উদ্দাম মাছ। যেদিকে ইচ্ছা উড়ে যাবে সে, জল কেটে ছুটে যাবে যেদিকে দুইচোখ যায়। এজন্য বাড়ি থেকে বের হবার পর নূরজাহান কখনও হাঁটে না। নিজের অজান্তেই মানুষ স্বভাব পাখি হয়ে যায়, মাছ হয়ে যায়। নূরজাহান উড়তে থাকে, ছুটতে থাকে।

বাড়ি থেকে চকে নামবার পর প্রথমে একটু দাঁড়ায় নূরজাহান। মুখ তুলে খোলা আকাশের দিকে চায়। আবহমান হাওয়া থেকে বুক ভরে টানে মুক্ত হাওয়া। তারপর আচমকা ছুট। অবস্থাটা এমন যেন বা নূরজাহান ছিল এক খাঁচাবন্দি পাখি। এইমাত্র খাঁচার দুয়ার খুলে দিয়েছে কোনও দয়ালু মানুষ। বাইরের দুনিয়াতে বের হয়েই কিছুক্ষণের জন্য স্বাধীনতার স্বাদ নিচ্ছে সে। তারপর মন চলো, যে দিকে দুইচোখ যায়।

কিন্তু আজ বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্য অবস্থা হল নূরজাহানের। একবারও আকাশের দিকে তাকাল না সে, একবারও বুক ভরে টানল না মুক্ত হাওয়া। নির্বিকার ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগল। যেন দুনিয়ার কোনও কিছুই তার জানা নাই, কোনও বিষয়েই নাই কোনও আগ্রহ। যেন সে এক মৃত মানুষ। হাঁটছে কিন্তু প্রাণ নাই। কোনদিকে যাবে, কার কাছে যাবে কিছুই জানে না।

আর মাকুন্দা কাশেমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছে উল্টা। চকে নেমে সে কখনও দৌড়ায় না। বাড়ি থেকে তাকে বের হতে হয় গরু নিয়ে। গরুরা হেলেদুলে আয়েশি ভঙ্গিতে চলে। কাশেমও চলে গরুগতিতে। আস্তে ধীরে, উদাস আয়েশি ভঙ্গিতে। হাঁটে তো হাঁটে না, চলে তো চলে না।

দুই মানুষের দুই স্বভাব আজ উল্টাপাল্টা হয়ে গেল। দবির গাছির বাড়ি থেকে বের হয়েই নূরজাহানের পিছু পিছু ছুটতে লাগল কাশেম শরীরে মান্নান মাওলানার মারের ব্যথা, ছুটতে গেলে মচমচ করে উঠে মাজার হাড় এর্সবের কোনও কিছুই এখন মনে নাই কাশেমের, উদিসও পাচ্ছে না। চিৎকার করে নূরজাহানকে ডাকতে লাগল সে। নূরজাহান, ও নূরজাহান, খাড়ও মা খাড়ও আমার কথা হোনো।

নূরজাহান নির্বিকার। একবারও পিছন ফিরে তাকাচ্ছে না, একবারও শুনছে না কাশেমের ডাক। হাঁটছে তো হাঁটছে।

ছুটতে ছুটতে এসে নূরজাহানকে ধরল কাশেম। পিছন থেকে নূরজাহানের ডান হাতটা টেনে ধরে বলল, খাড়ও মা। যাইয়ো না।

নূরজাহান উদাস নির্বিকার ভঙ্গিতে কাশেমের দিকে মুখ ফিরাল। এমন চোখে কাশেমের দিকে তাকিয়ে রইল যেন এই মুখ আজকের আগে কখনও দেখেনি। কাশেম নামে কাউকে চিনে না। লোকমুখে কাশেম যে মাকুন্দা কাশেম জীবনেও যেন সে কথা শোনেনি নূরজাহান।

কাশেম এসব খেয়াল করল না। ছুটতে ছুটতে এসে নূরজাহানকে সে ধরতে পেরেছে এটাই যেন তার জীবনের এক বড়কাজ। কাজটা করতে পেরে সে দারুণ খুশি। যেন দবির গাছির ঋণ খানিকটা হলেও শোধ করতে পারছে। এরকম শীত সকালে দবির তাকে নিজের গায়ের সোয়েটার খুলে দিয়েছে। নিজে খালি গা হয়ে সোয়েটার পরিয়ে কাশেমকে পাঠিয়েছে বাড়িতে। গাছির বউ গুড়মুড়ি খেতে দিয়েছে। এরকম মানুষের মেয়ে বাপের হাতে থাবড় খেয়ে রাগ করে বের হয়ে যাচ্ছে বাড়ি থেকে, তাকে ফিরিয়ে আনা কাশেমের কর্তব্য। পোলাপান মানুষ রাগ করে কী না কী করে ফেলবে!

হাঁপাতে হাঁপাতে কাশেম বলল, কই যাও মা?

শীতল নির্বিকার গলায় নূরজাহান বলল, কইতে পারি না।

নূরজাহানের কথা বলার ভঙ্গি এমন, ভিতরে ভিতরে কাশেম কী রকম একটু থমকাল। এই কি সেই মেয়েটি, গাছি বাড়ি ফিরবার আগে কাশেমের মুখে তার মার খাওয়ার কথা শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিল যে! এই কি সেই মেয়েটি, গরুদের লগে কাশেমের সম্পর্কের কথা শুনে পানির ওপর পানি পড়ার