একথায় আবার বিরক্ত হল শিলা। তুমি এবং সেতু একরকম। কথায় কথায় যুক্তি দাও। আমিও যুক্তি দিচ্ছি। মুন্নির ক্ষেত্রে এরকম হলে আমি কখনও হাল ছেড়ে দেব না। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে মেয়েকে ফিরিয়ে আনব। কারণ সে আমার মেয়ে আর সেতু হচ্ছে ননদ। মেয়ে আর ননদ এক নয়।
শিলার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে তার কাঁধে হাত দিল মামুন। অনুরোধের গলায় বলল, আমার জন্য, শুধু আমার জন্য মুন্নি এবং সেতুকে তুমি এক ভাব। সেতুকে তুমি ফেরাও। আমি বেঁচে থাকতে ওর জীবনটা যেন নষ্ট না হয়।
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলল মামুন। স্বামীর চোখের জল দেখে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল শিলার।
৭. বারান্দায় মামুনকে দেখে
বারান্দায় মামুনকে দেখে এগিয়ে এল স্বপন। ভাইয়া, তুমি কি লইয়ারের সঙ্গে কথা বলেছ? পেপারস রেডি করেছ?
মামুন গম্ভীর গলায় বললেন, না।
কেন?
লজ্জা করছে।
লজ্জা করছে মানে? কীসের লজ্জা?
ড্রয়িংরুমে চল। বলছি।
ড্রয়িংরুমে এসে মুখোমুখি বসল দুভাই।
মামুন বলল, ল ইয়ারও তো পরিচিত মানুষ!
কথাটা বুঝতে পারল না স্বপন। বলল, তাতে কী হয়েছে?
আমাদের ফ্যামিলির এমন একটা কেলেঙ্কারির কথা সে জেনে যাবে।
শুনে বিরক্ত হল স্বপন। খুবই ছেলেমানুষি কথা বললে ভাইয়া।
কী রকম?
সমস্যাটা এমন, এটা মিটাতে হলে কাউকে না কাউকে ব্যাপারটা বলতেই হবে। কিছু কিছু মানুষ এটা জানবেই।
তা ঠিক।
তাছাড়া এই ধরনের কাণ্ড অনেক ফ্যামিলিতেই হয়। সেতুর বয়স কম। সে একটা ভুল করে ফেলেছে। এটা খুব বড় কোনও লজ্জার ব্যাপার নয়। লজ্জার ব্যাপার হবে যদি ব্যাপারটা আমরা মেনে নিই। সেই ছোকরার কাছে যদি সেতুকে….
কিন্তু সেতুকে ম্যানেজ করবি কী করে? সে তো কোনও কথা শুনছে না।
যেমন করেই হোক, ওকে বাধ্য করতে হবে। রেখা এবং ভাবী কথা বলেছে। এখন আমি বলব।
স্বপন সেতুর সঙ্গে কথা বলবে শুনে মামুন কেমন ভয় পেয়ে গেল। না না, তোর বলার দরকার নেই।
কেন?
তুই রগচটা ধরনের। মেজাজ খারাপ হয়ে গেলে ওর গায়ে হাত টাত তুলে ফেলতে পারিস।
স্বপন হাসল। না, তা তুলব না। যত রাগই হোক, নিজেকে কন্ট্রোল করব।
সেতুর রুমে এসে সত্যি সত্যি নিজেকে খুবই সংযত রাখল স্বপন। সে এসে সেতুর মুখোমুখি দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে সেতু বলল, তুমি কেন এসেছ?
তুই জানিস কেন এসেছি।
কিন্তু যা বলার ভাবীদেরকে আমি বলে দিয়েছি।
কী বলেছিস?
ওসব নিয়ে তোমার সঙ্গে আমি আর কথা বলতে চাই না।
সেতুর চোখের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় স্বপন বলল, তুই এমন হয়ে গেলি কী করে? আমরা দুটো ভাই কত কষ্টে, কত আগলে আগলে তোকে বড় করেছি। জীবনে কখনও তোর সঙ্গে ঝগড়া করিনি, তোকে একটা ধমক দিইনি। তুই হচ্ছিস আমাদের জান, নয়নের মণি। সেই তুই কোথাকার কার জন্য আমাদের সবাইকে এভাবে সাফার করাচ্ছিস। এই ফ্যামিলির জন্য, আমাদের কারও জন্য কি তোর একটুও টান নেই? একটুও মায়া নেই আমাদের কারও জন্য?
এবার সেতুও তাকাল স্বপনের চোখের দিকে। কথাটা যদি উল্টো করে আমি তোমাদেরকে বলি?
বল শুনি।
আমি তোমাদের একমাত্র বোন। আমার পছন্দে আমি আমার জীবনের সবচে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েছি। যার সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়েছি, তোমাদের বিবেচনায় সে যেমনই। হোক, আমার বিবেচনায় সে ই আমার জন্য প্রকৃত মানুষ। আমার কথা ভেবে, আমার সুখ শান্তির কথা ভেবে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে তোমরা মেনে নিলেই পার! তা করছ না কেন?
করছি না তোর কথা ভেবেই। তোকে সন্তানের চে’ বেশি ভালবাসি বলে।
তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না।
তোর বয়স কম। এই বয়সে আবেগতাড়িত হয়ে চলে মানুষ। কিন্তু জীবন অনেক বড়। কাঁচা আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। যাকে নিয়ে সমগ্র জীবন কাটাতে চাস তুই, আমরা মনে করি জীবনটা তার সঙ্গে সুখে আনন্দে কাটাতে তুই পারবি না।
কেন? তার অসুবিধা কী?
তুই জানিস অসুবিধাগুলো কী?
টাকা, স্ট্যাটাস এসব বোঝাতে চাইছ তো?
হ্যাঁ।
কিন্তু আমার কাছে এসব একেবারেই মূল্যহীন।
কেন?
একজন মানুষকে সুখে আনন্দে জীবন কাটাতে হলে দরকার তার জীবনসঙ্গীর একটি সুন্দর মন আর গভীর ভালবাসা। আমাদের দুজনেরই তা আছে। আমাদের আর কিছু লাগবে না।
লাগবে, অবশ্যই আরও অনেক কিছু লাগবে। বোঝালেও এখন তুই তা বুঝতে চাইবি না।
সেতু কাতর গলায় বলল, ভাইয়া, সবকিছু বুঝেই কাজটা আমি করেছি। এভাবে বিয়ে হোক শুভ চায়নি। সে আমাকে অনেক বুঝিয়েছে। আমি বুঝতে চাইনি। কারণ আমি জানতাম এভাবে না হলে ওকে আমি কোনওদিন পাব না।
তারপর কেমন ভেঙে পড়ল সেতু। ওর কাছ থেকে আমাকে সরাবার একটিই পথ আছে ভাইয়া। আমাকে তোমরা মেরে ফেল।
সেতুর ভেঙে পড়া একদমই পাত্তা দিল না স্বপন। নিঃশব্দে উঠে ড্রয়িংরুমে চলে এল। এভাবে হবে না ভাইয়া।
সোফায় বসা মামুন নড়েচড়ে উঠল। তাহলে কীভাবে হবে?
অন্য কোনও একটা পথ বের করতে হবে।
কী পথ?
সেতুকে আমরা কেউ কিছুই আর বলব না। বাড়িতে যেভাবে সে আছে সেভাবেই থাকবে। তবে চোখ রাখতে হবে কিছুতেই যেন বাড়ি থেকে বেরুতে না পারে।
বুঝলাম কিন্তু আসল কাজটা হবে কীভাবে?
ছোকরাটাকে প্রেসারে ফেলতে হবে। বা তার চেয়েও বেশি কিছু।
মানে?
শীতল, গম্ভীর গলায় স্বপন বলল, ওকে মেরে ফেলতে চাই।
মামুন একেবারে আঁতকে উঠলেন। কী বলছিস তুই?
