স্বপন থতমত খেয়ে মাথা নিচু করল, সরি ভাইয়া।
মামুন এবার নরম হল। মাথা গরম করে সব কাজ করা যায় না। নোংরা যত ঘাটবি ততো দুর্গন্ধ বেরুবে। কাজ করতে হবে অন্যভাবে। বোস, কী করতে হবে বলছি।
.
সকালবেলার আকাশের দিকে তাকিয়ে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেতু। ছোট্ট টেবিলে নাস্তা পড়ে আছে। সেতু ছুঁয়েও দেখেনি।
সেতুর রুমে ঢুকে এই দৃশ্য দেখে অবাক হল রেখা। বলল, নাস্তা খাওনি কেন?
সেতু কথা বলল না। যেমন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, তাকিয়ে রইল।
রেখা বলল, কাল রাতে ভাতও খাওনি শুনলাম। এভাবে চললে তো অসুখ হয়ে যাবে।
গভীর অভিমানের গলায় সেতু বলল, আমি চাই আমার অসুখ হোক। আমি চাই আমি মরে যাই।
এসব ছেলেমানুষির কোনও মানে নেই। এমনিতেই এমন ছেলেমানুষি করেছ, এত সুন্দর ফ্যামিলিটাকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছ। নতুন করে আর কোনও ঝামেলা করো না।
কথা বলতে বলতে সেতুর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে রেখা। ব্যাপারটা পাত্তা দিল না সেতু। বলল, যা বলতে এসেছ তাই বল। অন্য কথা বলে কোনও লাভ নেই।
রেখা একটু বিরক্ত হল। কোনও কথা বলতেই তোমার কাছে আমি আসতে চাইনি। তোমার ভাই আমাকে পাঠিয়েছেন।
কেন?
যা করে ফেলেছ তার একটা সমাধান তোমার ভাইরা করতে চান।
একথায় মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল সেতুর। শুভকে তারা মেনে নেবে?
না।
উজ্জ্বল মুখ আগের মতো ম্লান হল সেতুর। তাহলে?
শুভকে তোমার ছেড়ে দিতে হবে।
মানে?
ডিভোর্স করতে হবে তাকে।
শ্লেষের হাসি হাসল সেতু। তাই নাকি! কিন্তু ভাইয়াদের ভাবনাটা ঠিক হয়নি। ডিভোর্স করার জন্য শুভকে আমি বিয়ে করিনি। ভালবেসে যাকে বিয়ে করেছি মৃত্যু ছাড়া তার কাছ থেকে আমাকে কেউ সরাতে পারবে না। কথাটা ভাইয়াদেরকে তুমি বলে দিও।
অফিসে যাওয়ার আগে শিলার মুখে কথাগুলো শুনল মামুন। শুনে অবাক হল। তাই নাকি? একথা বলেছে?
শিলা বলল, রেখা তো তাই বলল!
রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে থাপড়ে ওর দাঁতগুলো ফেলে দিই।
নিজের বোনটিকে যত সহজ তুমি মনে কর তত সহজ সে নয়।
আমার ধারণা ছিল, সামান্য অ্যাফেয়ার ট্যাফেয়ার হওয়ার পর সেতু ফসকে যেতে পারে ভেবে ছোকরাটা ওকে পটিয়ে পাটিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। ছোকরাটার সঙ্গে কথা বলে আমার তাই মনে হয়েছে।
ঠিক না।
মানে?
আমার ধারণা দুজনেই তখন সিরিয়াস ছিল। সেতু যে ধরনের মেয়ে, তাকে পটিয়ে বিয়ে করে ফেলা সম্ভব নয়। সবদিক ভেবেই কাণ্ডটা সে করেছে।
মামুন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, কিন্তু ডিভোর্স ওই ছোকরাকে সেতুর করতেই হবে। ওর কাছে সেতুকে আমরা কিছুতেই দেব না। রেখা কথা বলেছে, এখন বলবে তুমি। দেখা যাক কতদিন সে আমাদের কথা না শুনে পারে।
কিন্তু শিলাকে দেখেই গম্ভীর হয়ে গেল সেতু। বলল, আমি জানি তুমি কী বলতে এসেছ।
শিলা বলল, তুমি অনেক কিছুই জানো। আমার ধারণার চে’ তুমি অনেক বেশি চালাক। তোমার সঙ্গে কোনও কিছুতেই আমি কিংবা রেখা পারব না।
পারবে না তো আস কেন?
আসতে চাই না। তোমার ভাইরা আমাদেরকে বাধ্য করেন।
উষ্ণ সুরে কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই নরম হল শিলা। সেতুর কাঁধে হাত দিল। আমরা কেউ তোমার খারাপ চাই না। রাজকন্যার মতো মানুষ হয়েছ তুমি। আমরা চাই সারাজীবন রাজকন্যা হয়েই থাক তুমি। জীবনটা সুখে আনন্দে কাটাও।
যদি তাই চাও তাহলে শুভকে তোমরা মেনে নাও।
তা আমরা নেব না। কারণ ওরা হতদরিদ্র।
পৃথিবীর সবাই কি বড়লোক হয়ে জন্মাবে?
না তা জন্মাবে না।
তাহলে?
ওদের সঙ্গে আমাদের স্ট্যাটাসেও মিলবে না।
টাকা ছাড়া তোমাদের আবার স্ট্যাটাস কী?
একথায় রেগে গেল শিলা। তর্ক করো না। ধরে নাও টাকাই আমাদের স্ট্যাটাস। আজকালকার দিনে টাকা ছাড়া কিছু হয় না। সামান্য চাকরি বাকরি করে ওই ছেলে তোমাকে নিয়ে চলতে পারবে না। এসব ছেলেমানুষি ছেড়ে দাও। সংসারে অভাব দেখা দিলে ভালবাসা থাকে না।
সেতু মৃদু হাসল। এখন যদি আমাদের সংসারে অভাব দেখা দেয়, তুমি কি আমার ভাইয়াকে ছেড়ে চলে যাবে? তোমার ভালবাসা কি নষ্ট হয়ে যাবে?
আমাদের সঙ্গে ওকে তুমি জড়াচ্ছ কেন?
জড়াচ্ছি এজন্য, তুমি তোমার স্বামীকে যেমন ভালবাস, আমিও আমার স্বামীকে তেমন ভালবাসি। কোনও অবস্থাতেই ওকে আমি ছাড়ব না। বেঁচে থাকব ওর হাত ধরে, মরে যাব ওর হাত ধরে।
সেতুর এসব কথা শুনে খুবই বিরক্ত হয়ে নিজের রুমে ফিরল শিলা। মামুন তখনও বেরুয়নি। শিলাকে দেখে বলল, কী হল?
শিলা ঝাঁঝাল গলায় বলল, তোমার বোনের কাছে আমাকে আর কখনও পাঠাবে না।
কেন? সেতু কি তোমার সঙ্গে কোনও দুর্ব্যবহার করেছে?
দুর্ব্যবহার না। যুক্তি দিয়ে চটাং চটাং কথা বলেছে। ওসব কথার জবাব দেয়া মুশকিল। যার সঙ্গে কথায় পারব না তার কাছে আমি যেতে চাই না।
সংসারে কোনও জটিলতা দেখা দিলে বড়দেরকেই সামলাতে হয়। তুমি বাড়ির বড় বউ, কিছু ঝক্কি ঝামেলা তোমাকে সামলাতেই হবে।
এটা বোধহয় সামলানো যাবে না।
কেন?
সেতু খুব সিরিয়াস। কিছুতেই তোমাদের কথা সে শুনবে না।
বল কী? তাহলে?
শিলা গম্ভীর গলায় বলল, একটাই পথ আছে।
কী?
সে পথে চললে সমস্যাটা সহজেই মিটিয়ে ফেলা যায়।
মামুন অধৈর্যের গলায় বলল, কিন্তু পথটা কী?
শুভকে মেনে নাও।
মামুন থতমত খেল। শিলার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কথা শুনে খুবই রেগে যাওয়া উচিত আমার। কিন্তু আমি এখন রাগব না। শোন সেতুর জায়গায় যদি তোমার মুন্নি হতো তাহলে কি এত সহজে হাল ছেড়ে দিতে তুমি?
