.
ঠিক স্বপনের মতো করেই নিজের বেডরুমে নিজের বিছানায় বসে আছে মামুন। তার সামনে দাঁড়িয়ে শিলা বলল, আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম শুভর কাছে গিয়ে কোনও লাভ হবে না। যে ছেলে এভাবে বিয়ে করতে পারে তার বুকের পাটা বেশ চওড়া। তোমাদের কথায় বউ সে ছেড়ে দেবে না।
মামুন বলল, এটা যে আমিও না বুঝেছি তা নয়। তবু গেলাম। চেষ্টা একটু করে দেখলাম। ছোকরাটিকে আমার একটু বোঝার দরকার ছিল, বুঝলাম।
কী বুঝলে?
লোভে পড়ে কাজটা করেছে।
তা আমারও মনে হয়েছে।
লোভ হচ্ছে তিনটি। প্রথমত, সেতু আমাদের একমাত্র বোন। এত বড় ফ্যামিলির একমাত্র মেয়ে, তাকে যে বিয়ে করবে প্রচুর জায়গা সম্পত্তির মালিক হবে সে।
সেতু দেখতে খুব সুন্দর এটাও একটা কারণ।
এটা হচ্ছে তৃতীয় কারণ।
দ্বিতীয় কারণটা কী?
দ্বিতীয় কারণটি হল, ছোকরাটি খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সেতুকে পাওয়া মানে, জাতে উঠে গেল সে।
শিলা ঠোঁট উল্টে বলল, আমার মনে হয় না এতকিছু ভেবে কাজটা সে করেছে।
মামুন বলল, আমার মনে হয় ভেবেই করেছে।
কিন্তু এখন কী করবে?
দেখি কী করা যায়!
.
বিষণ্ণ মুখে শুয়ে আছে সেতু।
খুবই নরম ভঙ্গিতে তার রুমে এসে ঢুকল মুন্নি। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেতুকে কয়েক পলক দেখল। তারপর তার পাশে এসে বসল। ফুপি, তোমার কি শরীর খারাপ?
সেতু শান্ত গলায় বলল, না।
তাহলে সারাক্ষণ শুয়ে থাক কেন? রুম থেকে বেরও না, কারও সঙ্গে কথা বল না। কী হয়েছে?
কিছু না।
তুমি কি কারও ওপর রাগ করেছ?
না মা।
হাত বাড়িয়ে মুন্নির একটা হাত ধরল সেতু। তুই এখন যা। কথা বলতে আমার ভাল লাগছে না।
মুন্নি দেখতে পেল কথা বলতে বলতে জলে চোখ ভরে আসছে সেতুর। হয়ত চোখের জল লুকোবার জন্যই পাশ ফিরল সে।
মুন্নি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মন খারাপ করে সেতুর রুম থেকে বেরিয়ে এল।
.
বাবলু বলল, পঞ্চাশটা টাকা দাও মা।
আনমনা ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছে শিলা। ছেলের কথা শুনে তার দিকে তাকাল। কেন?
কম্পিউটার ডিস্ক কিনব।
এখন হবে না। পরে।
বাবলু অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
শিলা বিরক্ত হল। বললাম তো পরে দেব। তারপরও দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
বাবলু চিন্তিত গলায় বলল, তোমাদের কী হয়েছে?
কী হবে?
সবাই কী রকম চেঞ্জ হয়ে গেছ। আমি টাকা চেয়েছি আর তুমি দাওনি এমন কখনও হয়নি।
হয়নি, আজ হল। এসব নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। যা এখান থেকে।
বাবলু এবার একটু রাগল। এত বাজে বিহেভ করছ কেন? তুমি না বললেও যাব।
চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল বাবলু।
শিলা বলল, শোন।
বাবলু ঘুরে দাঁড়াল। বল।
টাকা নিয়ে যা।
শিলা উঠল।
বাবলু বলল, লাগবে না।
.
রাতেরবেলা খেতে বসে টুপলু বলল, ফুপি এখন আমাদের সাথে খেতে বসে না কেন?
এ বাড়ির নিয়ম হচ্ছে রাতেরবেলা সবাই এক সঙ্গে খেতে বসে। ডাইনিং রুমের বিশাল টেবিলে মামুন, শিলা, স্বপন, রেখা, সেতু এবং বাবলু মুন্নি টুপলু। কদিন ধরে সবাই থাকে শুধু সেতু থাকে না। তার চেয়ারটা খালি।
আজ সেই চেয়ারের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল টুপলু।
শুনে মেয়ের দিকে তাকাল রেখা। চুপ কর।
সঙ্গে সঙ্গে টুপলুর পক্ষ নিল মুন্নি। কেন চুপ করবে? ঠিকই তো বলেছে। ফুপিকে তোমরা ডাকো না কেন?
ব্যাপারটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করল শিলা। সেতুর শরীর খারাপ। ডাকলেও সে আমাদের সঙ্গে খেতে আসে না। এজন্য ওর খাবার ওর রুমেই পাঠিয়ে দিই।
বাবলু বলল, মিথ্যে কথা বলছ কেন? কে বলছে ফুপির শরীর খারাপ?
বাবলুর কথা বলার ভঙ্গিতে রেগে গেল স্বপন। চোপ। মায়ের মুখে মুখে তর্ক করছ। তোর মা যা বলেছেন তাই ঠিক। কোনও কথা বলবি না। চুপচাপ খেয়ে নে।
সেতুর কথা ওঠার পর থেকেই অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন মামুন। খাবার নাড়াচাড়া করছিলেন কিন্তু মুখে দিচ্ছিলেন না। এখন ব্যাপারটা খেয়াল করল শিলা। বলল, কী হল।
মামুন মন খারাপ করা গলায় বলল, কী?
খাচ্ছ না কেন?
খেতে ইচ্ছে করছে না।
প্লেট সরিয়ে উঠে দাঁড়াল মামুন। ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকল।
খানিক পর এই রুমে এসে ঢুকল স্বপন। মামুনের মুখোমুখি বসল। সঙ্গে সঙ্গে মাঝখান থেকে কথা বলতে শুরু করল মামুন। ওর মুখ দেখতে আমার ইচ্ছে করে না। এজন্য ওর সামনে আমি যাই না।
স্বপন বলল, কিন্তু আমরা যেমন চুপচাপ বসে আছি, এভাবে বসে থাকলে সেতু ভাববে ব্যাপারটা আমরা মেনে নিচ্ছি।
তা ভাববার কোনও কারণ নেই। মাথায় যদি ঘিলু থাকে তাহলে বুঝবে, বাড়িতে ওকে এক রকম বন্দি করে রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছাড়া কাজটা আমরা করিনি।
সবকিছু মিলিয়ে আমার যে কী রাগ লাগছে ভাইয়া! বোন না হয়ে ও যদি আমার ছোট ভাই হত, ওকে এমন মারতাম আমি!
একটু থামল স্বপন। মামুনের মুখের দিকে তাকাল। ভাইয়া, ওই বদমাশটাকে একটা মার দিয়ে দিই।
মামুন গম্ভীর গলায় বলল, না না, মারামারি করা ঠিক হবে না।
কেন ঠিক হবে না?
এককান দুকান করে কথাটা ছড়িয়ে যাবে। আমি চাই না কিছুতেই এসব কথা বাইরের কেউ শুনুক। বাইরের কাউকে জানাতে চাইলে তোকে নিয়ে নিজেই ওদের বাড়িতে যেতাম না। অন্য কাউকে পাঠাতাম।
স্বপন তার স্বভাব মতো রাগল। এখন তাহলে কী করব? হাত পা গুটিয়ে বসে থাকব?
সঙ্গে সঙ্গে স্বপনকে ধমক দিল মামুন। চোপ। কোনও বাড়াবাড়ি করবি না। আমি যা বলব তাই হবে।
