শাহিন থামল। হাসিমুখে সুরমার দিকে তাকাল। সেতুর একটা ছবি আমাকে দেখিও তো। দেখব মেয়েটা কেমন।
সুরমা মুগ্ধ গলায় বলল, খুব সুন্দর মেয়ে।
.
টেলিফোন সেটটা খুবই যত্নে মুচছে মালা।
এই একটি ব্যাপারে অপরিসীম যত্নবান সে। আর কাজটি করার সময় অন্যদিকে মনোযোগ প্রায় দেয়ই না।
কিন্তু এখন একটু দিল।
শুভ এসে অদূরে দাঁড়িয়েছে আড়চোখে তা দেখল মালা। দেখেই মুখটা গম্ভীর, শক্ত ধরনের করে ফেলল।
অপরাধী ভঙ্গিতে শুভ এসে দাঁড়াল মালার পাশে। নরম গলায় বলল, আপা।
অভিমানে গলা ভারি হল মালার, আমাকে আপা বলার দরকার কী?
তাহলে কী বলব?
নাম ধরে বল, তুই করে বল।
শুভ মাথা নিচু করল, আমার মনটা সেদিন ভাল ছিল না।
কেন?
খুব টেনশন যাচ্ছে।
মালা অবাক হল। কীসের টেনশন? কী হয়েছে তোর?
এমন একটা ব্যাপার, কাউকে বলতেও পারছি না।
শুভর কথা বলার ধরনে বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল মালার, টেলিফোন রেখে শুভর মুখোমুখি দাঁড়াল। তোর কথা শুনে আমার ভয় লাগছে। কোথাও কোনও বিপদ হয়নি তো? মা বলল, কারা নাকি এসেছিল তোর কাছে?
শুভ বলল, ভয় পাওয়ার মতো কিছু না। একেবারেই অন্যরকম একটা ব্যাপার।
সঙ্গে সঙ্গে সেদিনের কথা ভুলে গেল মালা। যাবতীয় অভিমান ভুলে গেল। গভীর মমতায় ছোটভাইর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, কী হয়েছে আমাকে বল।
বলতে পারি, কিন্তু প্রমিজ কর এখুনি কাউকে বলবে না।
অন্য হাত শুভর গালে চুঁইয়ে মালা বলল, প্রমিজ করলাম।
তাহলে আমার রুমে এস, বলছি।
শুভর পিছু পিছু তার রুমে এসে ঢুকল মালা। অনেকক্ষণ ধরে সেতুর ব্যাপারটা মালাকে বলল শুভ। শেষ পর্যন্ত সেতুর একটা ছবি বের করে দিল মালার হাতে।
সেতুর ছবি দেখে মালা একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল। ওমা, কী সুন্দর মেয়ে! জীবনে এত সুন্দর মেয়ে আমি দেখিনি।
তারপরই শুভর দিকে তাকাল মালা। এই গাধা, তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন?
শুভ ম্লান গলায় বলল, তোমাদের কাউকে ভয় পাচ্ছি না। ভয় পাচ্ছি শুধু মাকে।
সেতুকে দেখে আমার চেয়েও বেশি মুগ্ধ হবে মা।
কিন্তু আমাকে তো মা দেখতে পারে না।
তোকে দেখতে পারে না ঠিকই কিন্তু সেতুকে খুব আদর করবে দেখিস।
ওসব তো বাড়ির বউ হয়ে আসার পর। আগে সব ঠিকঠাক করতে হবে না?
আমাদের বাড়ি নিয়ে তুই ভাবিস না। ভাইয়া দেখবি ঠিকই মাকে ম্যানেজ করে ফেলেছে। দরকার হলে ভাইয়ার সঙ্গে আমিও থাকব।
তুই কিছু বলতে গেলে মা আরও রেগে যাবে।
মালা ঠোঁট উল্টাল। ইস রেগে যাবে! আমরা তিনভাইবোন আর ভাবী যদি একদিকে থাকি, আমাদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করতে পারবে না মা।
শুভ কথা বলল না।
.
কোনও কোনও রাতে দুধভাত খাওয়ার খুব শখ হয় টুপলুর। সন্ধেবেলাই মাকে বলে, আম্মু আমি আজ দুধভাত খাব।
আজও বলেছে।
তারপরই প্লেটে দুধভাত নিয়ে চামচে করে মেয়েকে খাওয়াতে বসেছে রেখা। প্রথম প্রথম আস্তেধীরেই খাওয়াচ্ছিল। এখন খাওয়াবার গতি একটু দ্রুত হয়েছে। ব্যাপারটা খেয়াল করে টুপলু বলল, এত তাড়াতাড়ি খাওয়াচ্ছ কেন আম্মু?
রেখা বলল, এমনি।
আমি এত তাড়াতাড়ি খেতে পারি না।
খাওয়া দাওয়ার জন্য বেশি সময় নষ্ট করতে হয় না।
কেন?
খেতে বসে বেশি সময় নষ্ট করলে পড়বে কখন?
এখন আমার পড়া নেই। টিচার চলে গেছে।
আমি এখনকার কথা বলিনি।
তাহলে কখনকার কথা বলেছ?
রেখা একটু রাগল। চুপ কর। তুমি খুব বেশি কথা বল।
ঠিক তখুনি রুমে এসে ঢুকল স্বপন। কী যেন কী কারণে মেজাজ খিঁচড়ে আছে তার। রেখা টুপলুকে খাওয়াচ্ছে এই দৃশ্য দেখে খিচড়ানো মেজাজ আরও খিঁচড়ে গেল। খেকুড়ে গলায় টুপলুকে বলল, তুমি এখানে বসে খাচ্ছ কেন? এটা কি খাওয়ার জায়গা? যাও ডাইনিং টেবিলে যাও।
বাবার এরকম আচরণে টুপলু নার্ভাস হয়ে গেল। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল তার। ব্যাপারটা খেয়াল করে স্বামীর দিকে তাকাল রেখা। বাড়ি এসেই মেয়েটাকে ধমকাচ্ছ কেন?
আগের ভঙ্গিতেই স্বপন বলল, এখানে বসে খাচ্ছে কেন?
খেতে চায়নি, আমি নিয়ে এসেছি।
এক চামচ দুধভাত টুপলুর মুখে দেয়ার চেষ্টা করল রেখা। টুপলু মুখ সরিয়ে নিল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আমি আর খাব না আম্মু।
সঙ্গে সঙ্গে প্লেট সরিয়ে নিল রেখা। তুমি তাহলে মুন্নি আপুর রুমে যাও। টিভি দেখ গিয়ে।
আচ্ছা।
টুপলু বেরিয়ে গেল।
তারপর স্বামীর দিকে তাকাল রেখা। গম্ভীর গলায় বলল, তোমার আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
আগের মতই রাগী ভঙ্গিতে স্বপন বলল, কী রকম?
ভেবে দেখ। বউ বাচ্চার সঙ্গে এই ধরনের আচরণ কোন ভদ্রলোক করে না।
বিছানার এক পাশে বসল স্বপন। সেতুর ব্যাপারে আমার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
তাতে আমাদের কী?
মানে?
যার জন্য মেজাজ খারাপ, রাগটা গিয়ে তাকে দেখাও। আমাদেরকে দেখাবে না। তোমার জন্য আমার মেয়েটি এখন খেতে পারল না। তোমার আল্লাদি বোনের জন্য আমাকে তুমি চড় মেরেছ। অন্যায়টা তো আমরা করিনি। করেছে তোমার বোন। তার জন্য আমরা কেন সাফার করব?
একটু থামল রেখা। তারপর বলল, আর একদিন যদি দেখি তুমি আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছ, তাহলে টুপলুকে নিয়ে আমি আমাদের বাড়িতে চলে যাব। গিয়ে সবাইকে বলব তোমার বোন এই এই করেছে, তার রাগ তুমি আমাদের ওপর ঝাড়ছ, পায়ে ধরলেও এই বাড়িতে আমি আর ফিরব না।
টুপলুর আধখাওয়া দুধভাতের প্লেট হাতে রাগী ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল রেখা। স্বপনের এখন খুবই অসহায় লাগছে। কাতর মুখে নিজের বিছানায় বসে রইল সে।
