আজকালকার এই বয়েসি ছেলেরা নানারকমভাবে বখে যায়। শুভর ব্যাপারটা কি তুমি একটু জানার চেষ্টা করবে?
অবশ্যই করব। শুভর সঙ্গে কথা বলে আপনাকে জানাব।
ঠিক আছে।
মা বেরিয়ে গেলেন।
সামান্য সময় কী ভাবল সুরমা তারপর শুভর রুমে এসে ঢুকল। কপালে আড়াআড়ি করে ডান হাত ফেলে শুয়ে আছে শুভ। সুরমার সাড়া পেয়ে কপাল থেকে হাত সরাল তারপর বিছানায় উঠে বসল। আমি জানি তুমি কেন এসেছ?
শুভর খাটে বসল সুরমা। কেন বলতো?
মা গিয়েছিলেন তোমার কাছে?
হ্যাঁ। কারা এসেছিল তোর কাছে?
সেতুর দুভাই।
সুরমা চমকাল, কী?
হ্যাঁ।
হঠাৎ?
আমি কল্পনাই করিনি ওঁরা এভাবে আমাদের বাড়িতে আসবেন।
কিন্তু এসেছিলেন কেন?
আশ্চর্য এক আবদার নিয়ে। আমি যেন সেতুকে ডিভোর্স করি।
কী?
হ্যাঁ।
সুরমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুভর দিকে।
শুভ বলল, এভাবে এসে ওঁরা যে আমাকে ডিভোর্সের জন্য চাপ দেবেন আমি ভাবতেই পারিনি ভাবী।
সুরমা একটু নড়েচড়ে উঠল। কিন্তু ওদের পলিসিটা আমি একদম বুঝতে পারছি। এসব ক্ষেত্রে নিজেদের মেয়েটিকেই সাধারণত প্রেসার দেয় সবাই। তা না করে, ওঁরা তোর কাছে এলেন কেন?
সেতুকে যে প্রেসার দেয়নি তাই বা কী করে বলছ? হয়ত তাকে ম্যানেজ করতে পেরেই আমার কাছে এসেছে।
হতে পারে। সেতুর ব্যাপারে তুই কতটা সিরিয়াস তা হয়ত ওঁরা দেখতে চাইলেন।
শুভ কথা বলল না।
সুরমা বলল, কিন্তু এদিকে কী করবি?
চোখ তুলে সুরমার দিকে তাকাল শুভ। এদিকে মানে?
সেতুর ভাইদেরকে দেখার পর থেকে মা কী রকম যেন সন্দেহ করছেন। তাঁকে ম্যানেজ করবি কী করে?
কথাটা আমিও ভেবেছি। ভাবী, বিয়ের ব্যাপারটা কি আমাদের বাড়িতে জানিয়ে দেবে? দুদিন আগে পরে জানাতে তো হবেই।
সুরমা কাতর গলায় বলল, আমার খুব ভয় করছে। মা যে রকম মেজাজি মানুষ! তুলকালাম করে ফেলবেন।
শুভ শান্ত গলায় বলল, সেই ভয়ে কি বসে থাকা যাবে? তুমি একটা কাজ কর, ভাইয়াকে বল। ভাইয়া বলবে মাকে।
তারপরই সুরমার একটা হাত ধরল শুভ। ভাবী, তুমি ছাড়া আমার পাশে এখন। কেউ নেই। জানি তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল যাবে। তবু তোমাকে সব সামলাতে হবে।
সুরমা চিন্তিত চোখে শুভর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিছানায় আধশোয়া হয়ে টিভি দেখছে শাহিন।
সুরমা এসে ঢুকল কিন্তু শাহিন তার দিকে ফিরেও তাকাল না। কয়েক পলক স্বামীকে দেখে রিমোট টিপে টিভি অফ করল সুরমা। এতে শাহিন তেমন বিরক্ত হল না। হাসিমুখে স্ত্রীর দিকে তাকাল। অফ করলে কেন?
সুরমা সঙ্গে সঙ্গে বলল, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
কী এমন কথা যে জন্য টিভি অফ করতে হবে?
তারপরই তীক্ষ্ণ চোখে সুরমার মুখের দিকে তাকাল শাহিন। এ
ত গম্ভীর হয়ে আছ কেন? মা কিছু বলেছেন?
না।
তাহলে?
একেবারেই অন্যরকম ব্যাপার।
বলে ফেল।
কথাটা তুমি কীভাবে নেবে বুঝতে পারছি না।
আমাকে কিছু বলতে এত দ্বিধা করার মানে নেই। সরাসরি বলে ফেল।
শুভ চাকরি বাকরির কথা বলায় তুমি সেদিন যেমন চিন্তিত হয়েছিলে, আজ আমি বুঝেছি কেন সে ওসব কথা বলেছিল।
কেন?
আগে আমাকে তোমার একটা কথা দিতে হবে। উত্তেজিত হবে না, রেগে যাবে না।
শাহিন গম্ভীর গলায় বলল, কী হয়েছে?
আগে কথা দাও।
এত ভণিতা করো না। ভাল লাগছে না। কী হয়েছে বল।
সুরমা পরিষ্কার গলায় বলল, সেতু নামের খুব বড়লোক বাড়ির একটি মেয়ের সঙ্গে শুভর অ্যাফেয়ার।
শাহিন বেশ একটা ধাক্কা খেল। তাই নাকি?
হ্যাঁ।
কই, তুমি তো আমাকে কখনও বলনি?
ছোটভাই একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে সে কথা বড়ভাইকে বলার কী আছে?
তাহলে এখন বলছ কেন?
বলতে চাইনি। বাধ্য হচ্ছি।
কীসের বাধ্য?
সেতুর সঙ্গে শুভর বিয়ে হয়ে গেছে।
কথাটি যেন বুঝতে পারল না শাহিন। কী বলছ তুমি?
সুরমা গম্ভীর গলায় বলল, হ্যাঁ।
কবে? কোথায়? কীভাবে হল?
ব্যাপারটা খুলে বলল সুরমা।
শুনে শাহিন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল।
সুরমা বলল, এখন আসল কাজটা তোমাকে করতে হবে।
আসল কাজ কোনটা?
মাকে ম্যানেজ করতে হবে।
মানে?
ব্যাপারটা মাকে বলে তাঁকে তুমি ম্যানেজ করবে।
কিন্তু কাজটা কি শুভ ভাল করেছে?
এছাড়া ওদের কোনও উপায় ছিল না।
তা বুঝলাম কিন্তু মাকে ম্যানেজ করা খুব কঠিন হবে। শুনেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করবে, রাগারাগি শুরু করবে।
তাকে তুমি বোঝাবে সেতু খুব বড়ঘরের মেয়ে। শিক্ষিতা, সুন্দরী।
যত যাই হোক, আমাদের দেশের মা বাবারা এই ধরনের খবর শুনলেই রেগে যান। ছেলেমেয়েদেরকে এই ধরনের স্বাধীনতা তাঁরা দিতেই চান না। তার ওপর মা যদি শোনে। সেতুর ভাইরা এসে ডিভোর্সের জন্য প্রেসার দিয়ে গেছে তাহলে একেবারে কেলেঙ্কারি করে ফেলবে।
এই কথাটা মাকে বল না।
কিন্তু আমি অন্য রকমের একটা ভয় পাচ্ছি।
সেতুর ভাইয়েরা কোনও ঝামেলা করে কি না?
হ্যাঁ।
আমিও সেই ভয়টা পাচ্ছি। এত টাকা পয়সা ওদের। টাকা দিয়ে সব হয় আজকাল।
তা ঠিক।
একটু চুপ করে থেকে শাহিন বলল, এমনিতেই শুভর ওপর সবসময় রেগে আছে। মা, এসব শোনার পর যে কী হবে ভাবতেই পারছি না।
স্বামীর কাঁধে হাত দিল সুরমা। মা তোমাকে খুব ভালবাসেন। আমার বিশ্বাস, তুমি তাঁকে ম্যানেজ করতে পারবে। যেমন করে হোক শুভকে তুমি সেভ কর।
শাহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তাতো করতেই হবে। তবে আপাতত মাকে কিছুই জানাবার দরকার নেই।
মানে?
আর কিছুদিন যাক, এরপর জানাব।
