বর্ষার কথা বলার ভঙ্গিতে মন খারাপ হলো শুভর। অবস্থাটা বদলাবার জন্য বলল, বাদলের কথা নয়, তুমি তোমার কথা বল।
অপলক চোখে শুভর দিকে তাকাল বর্ষা। আমার কী কথা? আমার তো কোনও কথা। নেই। আমি আর বাদল, আমরা দুজন এক সঙ্গে পৃথিবীতে এসেছিলাম। এক সঙ্গে বড় হয়েছিলাম, এক সঙ্গে এসে, এক সঙ্গে থেকে একজন কী করে আরেকজনের আগে চলে। যায়? বাদলকে ছেড়ে আমি কেমন করে থাকি বলুন তো, একটু থামল বর্ষা। তারপর বলল, বাদল আমাকে বলত, আমার মনে মনে বলা কথাও সে শুনতে পায়। এই যে এখন আমি ওর কথা বলছি, ও কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছে? বলুন না, শুনতে পাচ্ছে?
শুভ বলল, না মৃত্যুর পর আর কিছুই থাকে না।
কেন থাকে না? মৃত্যু এমন কেন? বলুন না মৃত্যু এমন কেন? বাদল কেন মরে গেল?
বর্ষা হুহু করে কাঁদতে লাগল।
.
নিজের রুমে বসে সেতু যখন কাঁদছে, ড্রয়িংরুমে বসে সেতুর দুভাই তখন তাকে নিয়ে নানা রকমের চিন্তাভাবনা করছে। ভেতরে ভেতরে রাগে গজরাচ্ছিল স্বপন। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ওকে যখন কাঁদতে দেখি, আমার ইচ্ছে করে ওর গলা টিপে ধরি।
মামুন বললেন, রিল্যাক্স। যতোই কান্নাকাটি করুক কোনও লাভ হবে না। শোন তোকে নিয়ে আমি একটু ঐ ছোকরার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
কোন ছোকরা?
আরে ঐ যে, শুভ না কী যেন নাম!
শুনে চোখ কপালে উঠে গেল স্বপনের। বল কী তুমি? ওর সঙ্গে আমরা কেন দেখা। করব?
মামুন গম্ভীর গলায় বললেন, কারণ আছে।
কী কারণ?
যাওয়ার আগে সব বলব। তুই কি ওদের বাড়ি চিনিস?
চিনি।
তাহলে এখুনি চল।
তারপরই গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে দুভাই। শুভদের বাড়ি এসেছে। কলিংবেল বাজাবার পর শুভই দরজা খুলে দিয়েছে। খুলে হতভম্ব হয়ে গেছে। আপনারা? আসুন, আসুন।
শুভর পিছু পিছু ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকেছে মামুন এবং স্বপন।
বসুন।
স্বপন বলল, তুমি কি আমাদেরকে চিনেছ?
জ্বি। একটু বসুন, ভাবীকে ডেকে আনি।
দরকার নেই।
চা, চা খাবেন তো?
এবার কথা বললেন মামুন। আমরা চা খেতে আসিনি, অন্য কারও সঙ্গে দেখা করতেও আসিনি। বরং অন্য কারও না থাকাই ভাল, আমরা তোমার সঙ্গে দুএকটা কথা বলব।
শুভ একটা সোফায় বসল।
সেতুর দুভাইকে দেখার পর থেকেই বুকটা ধুকধুক করছিল। গলাটা শুকিয়ে আসছিল। খুবই নার্ভাস লাগছিল তার। কোন ফাঁকে যেন সেই ভাবটা কেটে গেছে।
সোফায় বসে খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মামুন এবং স্বপনের দিকে তাকাল শুভ। ধীর শান্ত গলায় বলল, জ্বি বলুন। স্বপন বলল, ব্যাপারটা আমরা জেনেছি।
সঙ্গে সঙ্গে আরও বললেন, খুবই দুঃখ এবং লজ্জাজনক ব্যাপার, বিশেষ করে আমাদের জন্য। আমার বোন এরকম একটা কাজ করবে এ আমরা কল্পনাও করিনি।
স্বপন বলল, এবং এমন সময় ব্যাপারটা আমরা জেনেছি…। হাত তুলে স্বপনকে থামালেন মামুন। আমি বলছি। তারপর শুভর দিকে তাকালেন তিনি। যা হোক, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। যা করতে হবে তাই নিয়ে ভাবা উচিত। একটু থামলেন তিনি। তারপর বললেন, আমরা চাই ব্যাপারটা তোমার দিক থেকে শেষ হয়ে যাক।
শুভ চমকালো। মানে?
স্বপন বলল, মানে জানতে চাওয়ার দরকার নেই। মানেটা খুব পরিষ্কার। যা লাগে আমরা দিয়ে দেবো। কাজটা যেভাবে করেছ সেভাবেই গোপনে শেষ করে দেবে।
মামুন বললেন, অত কিছুর দরকার নেই। আমাদের ল ইয়ার পেপারস রেডি করে নিয়ে আসবে, তুমি শুধু সই করে দেবে।
ফ্যালফ্যাল করে মামুন এবং স্বপনের মুখের দিকে তাকাল শুভ। আপনাদের কথা আমি বুঝতে পারছি না। কীসের পেপারস? কীসের সই?
স্বপন বলল, ডিভোর্সের।
জ্বি?
হ্যাঁ, সেতুকে তোমার ডিভোর্স করতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল শুভ। দৃঢ় গলায় বলল, একথা বলার জন্য আমাদের বাড়িতে আসা আপনাদের ঠিক হয়নি। মরে গেলেও সেতুকে আমি কখনও ডিভোর্স করব না।
.
মা বললেন, কারা এসেছিল তোর কাছে?
শুভ একটু থতমত খেল। তুমি চিনবে না।
চিনিনি বলেই তো জিজ্ঞেস করছি। কারা?
আমার পরিচিত।
কেমন পরিচিত?
বিশেষ পরিচিত।
মা ভুরু কুঁচকালেন, বিশেষ পরিচিত?
হ্যাঁ।
কিন্তু তাদেরকে তো চা খাওয়াতে দেখলাম না।
শুভ কথা বলল না।
মা তীক্ষ্ণ চোখে শুভর দিকে তাকালেন। কেন এসেছিল?
ওই একটা কাজ আর কি! তুমি বুঝবে না।
তোর মতো মানুষের কাছে কী এমন কাজে গাড়ি নিয়ে সুট-টাই পরা লোকজনরা আসবে যা আমি বুঝব না?
শুভ একটু বিরক্ত হল। তুমি আমাকে যা ভাব আমি তা নই মা। আমি বড় হয়েছি, আমার একটা সার্কেল তৈরি হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে দেখবে ভাল একটা চাকরিও পেয়ে গেছি। তখন আর যখন তখন আমাকে গালাগাল করতে পারবে না।
মা কথা বললেন না। কী রকম সন্দেহের চোখে শুভর দিকে একবার তাকিয়ে শাহিন-সুরমার বেডরুমে এসে ঢুকলেন।
সুরমা রুমেই ছিল। শাশুড়িকে দেখে চোখ তুলে তাকাল।
মা বললেন, বউমা, তুমি আমাকে সত্য একটা কথা বলবে?
সুরমা মৃদু হাসল। আমি আপনার সঙ্গে কখনও মিথ্যে বলি না।
মা যেন একটু বিরক্ত হলেন। সব কথায় প্যাঁচ ধরো না। শুভর কাছে যারা এসেছিল তাদেরকে তুমি চেন?
না। কারা এসেছিল?
সে কথাই তো জিজ্ঞেস করছি। আমি মা, কিন্তু শুভ আমাকে সব কথা বলে না। তোমাকে বলে। কারা এসেছিল তোমাকে বলেনি?
না। আমি কিছু জানিই না। বাড়িতে যে কেউ এসেছিল একথা এইমাত্র আপনার মুখে শুনলাম।
আমার কী রকম যেন সন্দেহ হচ্ছে।
কীসের সন্দেহ?
