ঝগড়া করিনি, তুই করে বলেছি।
কেন?
সব সময় চিঠিপত্র নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানি ভাল লাগে না।
মুখ সামলে কথা বল। কীসের ঘ্যানঘ্যানানি? বড় বোনের কথাকে কেউ ঘ্যানঘ্যানানি বলে?
আমার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে মা। যত কথা বলবে মেজাজ তত খারাপ হবে। তারচে’ তুমি এখন যাও। যা বলার পরে বল।
এ কথায় খুবই রেগে গেলেন মা। কী, আমাকেও চলে যেতে বলছিস? এত বড় সাহস তোর? এই, কোন লাটবাহাদুর হয়ে গেছিস তুই? যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! এক থাপ্পড় মারব।
এবার আস্তেধীরে বিছানা থেকে নামল শুভ। আলনা থেকে শার্ট নিয়ে পরল। ঠিক আছে, তুমি থাক, আমিই বরং বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই।
দরজার দিকে এগিয়ে গেল শুভ।
মা বললেন, পারলে চিরতরে চলে যা। তোর মুখ যেন আমার আর দেখতে না হয়। শুভ আর কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
৬. উদাস চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে
উদাস চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে বর্ষা।
মিনু এসে তার রুমে ঢুকলেন বর্ষা খেয়ালই করল না, যেমন তাকিয়ে ছিল তেমনি তাকিয়ে রইল।
কয়েক পলক তাকিয়ে বর্ষাকে দেখলেন মিনু, তারপর তার পাশে বসলেন। এ সময় শুয়ে আছিস কেন?
বর্ষা কথা বলল না, ফিরেও তাকাল না।
মিনু বললেন, ওঠ। ঐ রুমে চল। বিকেলের নাস্তা দিয়েছে। তোর বাবা বসে আছেন, তুই গেলে নাস্তা খাবেন।
এবারও মায়ের দিকে তাকাল না বর্ষা। ধীর গলায় বলল, আমি খাব না।
কেন?
খেতে ইচ্ছে করে না আমার।
ইচ্ছে না করলেও খেতে হয় মা। না খেলে শরীর খারাপ হয়।
হোক।
বর্ষার মাথায় হাত দিলেন মা, এমন করে না। চল সামান্য কিছু হলেও মুখে দে।
বর্ষা এবার মায়ের দিকে তাকাল, অসহায় গলায় বলল, খেতে আমার ভাল লাগে। না। শুধু বাদলের কথা মনে হয়। তারপর কেমন যেন দুঃখি হয়ে গেল বর্ষা। মা, তোমার মনে আছে শেষ দিকে খিদে খুব বেড়ে গিয়েছিল বাদলের। বারবার শুধু খেতে চাইত।
বর্ষার কথা শুনে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল মিনুর। তবু নিজেকে সংযত করলেন তিনি। শান্ত গলায় বললেন, ডায়াবেটিক রোগীদের এমন হয়।
আগের মতো করেই বর্ষা বলল, তুমি বাবা ভাইজান, তোমরা সবাই ওর ওপর খুব রেগে যেতে। তোমরা রেগে গেলে মুখটা এমন অসহায় দেখাত ওর, আমার যে তখন কী কষ্ট হতো! কিছুতেই কিছু খেতে পারতাম না আমি। আমার খুব কান্না পেত, মনে হতো ইচ্ছে করে বাদলকে তোমরা খেতে দিচ্ছ না।
মিনু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। না, এটা তোর ভুল ধারণা। সন্তানকে ইচ্ছে করে না খাইয়ে রাখতে পারে না কোনও মা বাবা।
তোমরা তো রাখতে।
ইচ্ছা করে রাখতাম না মা। ওর ভালর জন্য খাবারটা কন্ট্রোল করতাম।
তারপর একটু থেমে বললেন, আমি, তোর বাবা, আমরা কি কম ভালবাসতাম বাদলকে? বল।
এই কথাটা যেন শুনতেই পেল না বর্ষা। বলল, আমি কিন্তু চুপি চুপি খেতে দিয়ে আসতাম বাদলকে।
সত্যি?
হ্যাঁ, তোমরা কেউ যাতে দেখতে না পাও, পা টিপে টিপে খুব সাবধানে ওর ঘরে গিয়ে খাবার দিয়ে আসতাম। যেসব খাবার নিষিদ্ধ ছিল সেসব খাবারের দুএকটি পেলে মুখটা যে কী উজ্জ্বল হতো ওর!
বর্ষার কথা শুনতে শুনতে জলে চোখ ভরে এল মায়ের। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তিনি বললেন, এভাবে বলিস না মা, এভাবে বলিস না। আমি সহ্য করতে পারি না। আমার বুক ফেটে যায়।
কিন্তু মায়ের কথা যেন শুনতেই পেল না বর্ষা। উদাস গলায় বলল, আমাদের ছেড়ে কোথায় চলে গেল বাদল? কেন চলে গেল?
.
বাড়ি থেকে বেরিয়েই শুভর মনে পড়েছিল নাহিদের কথা। নাহিদ কি এখন হোটেলে আছে? তাহলে নাহিদের ওখানে যাওয়াই ভাল। নাহিদের মা, বাবা, বর্ষা, সবাই মিলে অন্যরকম একটা পরিবেশ। ওদের কাছে ভালই লাগবে শুভর। যদিও বর্ষা একটু অন্য রকম, তাকে নিয়ে নানা রকমের জটিলতায় আছে তিনজন মানুষ, তবু তাদের কাছে। যেতে ভাল লাগে শুভর।
কিন্তু হোটেলের লনে এসেই ভাল রকমের একটা হোঁচট খেল শুভ।
রিকশা বিদায় করে রিসিপশানের দিকে যাচ্ছে শুভ, বর্ষা বেরিয়ে এল। এসে শুভর পাশ দিয়ে অচেনা মানুষের ভঙ্গিতে হেঁটে লনের দিকে চলে গেল। শুভকে সে চিনতেই পারল না।
শুভ বেশ অবাক হল। তারপর বর্ষার পিছু কয়েক পা এসে ডাকল। শোন।
বর্ষা থমকে দাঁড়াল। অচেনা মানুষের ভঙ্গিতে তাকাল শুভর মুখের দিকে। খানিক তাকিয়ে তাকে চেনার চেষ্টা করল, আপনি যেন কে?
শুভ মৃদু হাসল, আমি বুঝেছিলাম।
কী বুঝেছিলেন?
তুমি আমাকে চিনতে পারনি।
হ্যাঁ।
আমি শুভ।
ও।
নাহিদ আছে?
না।
আগের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল বর্ষা।
শুভ বলল, কোথায় যাচ্ছ?
বর্ষা আবার দাঁড়াল। কাল সকালে বাড়ি চলে যাব।
শুভ হাসল। কাল সকালের কথা বলছি না। এখন কোথায় যাচ্ছ?
কোথাও না।
রিসিপশানের সোফা দেখাল শুভ। তাহলে চল ওখানে বসি।
কেন?
কথা বলি তোমার সঙ্গে। গল্প করি।
সঙ্গে সঙ্গে মুখ উজ্জ্বল হল বর্ষার। বাদলের গল্প! চলুন। দ্রুত হেঁটে সোফার সামনে এল বর্ষা। নিজে একটি সোফায় বসে মুখোমুখি সোফাটি দেখাল শুভকে। বসুন।
শুভ বসল।
বর্ষা দূরাগত গলায় বলল, স্পাইনাল কর্ডে যখন টিবি হল, চার মাস ধরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বাদল। অত শুয়ে থাকলে কি ঘুম আসে মানুষের? বাদলেরও ঘুম আসত না। আমি থাকতাম পাশের রুমে। গভীর রাতে আস্তে আস্তে বাদল আমাকে ডাকত। বর্ষা বর্ষা। জোরে ডাকত না, জানেন! একটুও জোরে ডাকত না। জোরে ডাকলে যদি অন্যদের ঘুম ভেঙে যায়! জানেন, একবার ডাকলেই আমি টের পেতাম। মাত্র একবার ডাকলেই। আসলে বাদলের জন্য আমি যেন সারারাতই জেগে আছি।
