এসব ইমোশনাল কথা বলে লাভ নেই। এখন কী করবে, কীভাবে এটা সামাল দেবে তাই বল।
এখন কিছুই করতে চাইছি না।
মানে?
তোর চেয়ে রাগ আমারও খুব কম নয়। কিন্তু রাগের মাথায় আমি কিছু করব না। তাহলে ভুল হবে। কয়েকটা দিন যাক, রাগটা একটু কমে আসুক। তারপর যা করার করব।
তার মানে এখন হাত পা গুটিয়ে বসে থাকব?
এছাড়া কিছু করার নেই।
একটু থেমে মামুন বললেন, কিছু করার নেই কথাটা ঠিক নয়। আছে।
কী আছে বল।
আমি তোর ভাবীকে বলে দেব, তুইও রেখাকে বলবি সেতুর দিকে খেয়াল রাখতে, আরও কিছু কী করতে হবে, তোর ভাবী সেসব করবে।
ঘণ্টাখানেক পর শিলা এসে ঢুকলেন সেতুর রুমে।
সেতু শুয়েছিল। শিলাকে দেখে উঠে বসল।
শিলা কোনও ভণিতা করলেন না। রুক্ষ গলায় বললেন, তোমাকে কিছু বলতে এসেছি। কথাগুলো আমার নয়, তোমার ভাইদের। মন দিয়ে শুনবে। নাম্বার ওয়ান, এখন থেকে বাড়ির বাইরে তুমি যেতে পারবে না। নিষেধ। টু, টেলিফোন ধরতে পারবে না। নিষেধ। থ্রি, কোনও রকমের চালাকি কিংবা অন্য কিছু করলে আমাদের সাথে তোমার কোনও সম্পর্ক থাকবে না। ফিরে এলেও আমরা তোমাকে আর চিনব না।
সিনেমার রাগী মহিলাদের ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেলেন শিলা। সেতু অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো জলে ভরে গেছে তার।
.
ভাই-ভাবীর বেডরুমের সামনে দাঁড়িয়ে শুভ বলল, ভাবী, আসব?
রুমে সুরমা একা! শুভর গলা শুনে বলল, আয়।
শুভ ভেতরে ঢুকল।
এক পলক দেবরের দিকে তাকিয়ে সুরমা বলল, বস!
শুভ বসল না। চিন্তিত গলায় বলল, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।
তীক্ষ্ণ চোখে শুভর মুখের দিকে তাকাল সুরমা। কী হয়েছে? তোকে এমন দেখাচ্ছে। কেন? সেতুকে নিয়ে কোনও ঝামেলা হয়েছে?
শুভ মাথা নাড়ল।
সুরমা উতলা গলায় বলল, কী হয়েছে?
ওকে বাড়ি থেকে বেরুতে দিচ্ছে না, ফোন ধরতে দিচ্ছে না।
আর?
দোলনকেও ঐ বাড়িতে যেতে মানা করা হয়েছে।
এবার উল্কণ্ঠা যেন একটু কমলো সুরমার। বলল, প্রথম প্রথম এরকমই হয়। ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু আমার খুব নার্ভাস লাগছে।
নার্ভাস লাগার কিছু নেই।
সেতুর ছোট ভাইটা খুব রাগী।
তাতে কী? সেতু নিজে যদি ঠিক থাকে তাহলে কেউ কিছু করতে পারবে না।
কিন্তু এভাবে কতদিন?
কিছুদিন তো যাবেই।
সেতুর সাথে দেখা হবে না, কথা হবে না।
আপাতত না হোক।
কিন্তু কতদিন ওর সাথে কথা না বলে থাকব আমি, কতদিন দেখা না করে থাকব?
মনে হয় না বেশিদিন।
ভাবী, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।
সুরমা সুন্দর করে হাসল। ভালবাসার জন্য এই কষ্ট করতেই হবে। হাত ধরে নিজের পাশে শুভকে বসাল সুরমা। শোন, তুই চাকরি বাকরির কথা বলেছিস, শুনে তোর ভাই কিন্তু চিন্তিত হয়ে গেছেন। তুই একটু সাবধানে থাকিস।
শুভ অবাক হল। সাবধানে থাকব কেন?
যে রকম মন খারাপ করে ঘুরছিস, যে কেউ দেখে তোকে নিয়ে চিন্তিত হবে।
শুভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ব্যাপারটা ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত মন আমার ভাল হবে না।
.
মালা ছুটে এসে বলল, তিনটি চিঠির জবাব আসেনি, জানিস, দুসপ্তাহ ধরে ফোনও করে না।
শুভ কোনও কথা বলল না। নিজের বিছানায় যেমন শুয়েছিল শুয়ে রইল।
মালা বলল, একটা ফ্যাক্স নাম্বারও আছে, এই ফুলস্কেপের পৃষ্ঠা আমেরিকায় ফ্যাক্স করতে কতো লাগে রে?
শুভ নির্বিকার গলায় বলল, জানি না, তুই এখন যা।
‘তুই’ শব্দটা শুনে আঁতকে উঠল মালা। চোখ কপালে তুলল মালা, তুই আমাকে তুই করে বলছিস কেন?
এবার বিরক্ত হল শুভ। আমার ইচ্ছে হয়েছে বলেছি। যা ভাগ!
সাথে সাথে ঠোঁট উল্টাল মালা। ইস্ ঢং! দাঁড়া এক্ষুণি গিয়ে মাকে বলছি।
যা বল গিয়ে। যা।
কিন্তু মায়ের কাছে আসার আগে চোখটা একটু ভিজিয়ে নিলো মালা। কাঁদতে কাঁদতে এল।
ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পেয়ালা প্লেট গোছাচ্ছিলেন মা। মালাকে দেখে। অবাক হলেন। কাঁদছিস না কি? কী হয়েছে?
মালা নাকের জলে চোখের জলে একাকার হয়ে বলল, তোমার ছোট ছেলে…
কথা শেষ হওয়ার আগেই গম্ভীর গলায় মা বললেন, কথা ঠিক মতো বল। আমার ছোট ছেলে মানে? আমার ছোট ছেলে তোর কী হয়?
আঁচলে চোখ মুছল মালা। হয়ত ভাইই, ছোট ভাই কিন্তু ব্যবহার করে পরের মতো।
ভণিতার দরকার নেই। কী হয়েছে তাই বল।
একটা কথা বলতে গেছি, তুই তোকারি শুরু করল। বড় বোনের সাথে কেউ এমন করে?
তুই বা যখন তখন ওর কাছে যাস কেন? কথায় কথায় যখন এত কান্না পায় তখন…
একথা শুনে কান্না ভুলে মালা একেবারে তেড়িয়া হয়ে উঠল। তুমি কেমন মা? তোমার কাছে এলাম বিচার দিতে আর তুমি উল্টো আমাকেই বকছ? আমি আজই আমেরিকায় ফোন করব। এই বাড়িতে আমি আর থাকব না।
শুনে মাও রাগলেন। না থাকলে তো বেঁচেই যাই। তুই যে রুমটা দখল করে আছিস ওটা ভাড়া দিলে কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা পাব।
মালা ঠোঁট উল্টাল। ইস, দেড় হাজার টাকা।
তারপর নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
মা বললেন, শোন।
মালা দাঁড়াল।
আমেরিকায় ফোন করতে হলে কার্ডফোন থেকে করবি। খবরদার এই বাড়ি থেকে ফোন করবি না।
মালা মুখ ঝাঁপটে বলল, কার্ডফোন থেকেই করব। তোমাদের ফোন থেকে করব না।
মালা চলে যাওয়ার পর হাতের কাজ ফেলে রেখেই শুভর রুমে এসে ঢুকলেন মা। কী, ব্যাপার কী?
শুভ যেন কিছুই জানে না এমন ভঙ্গিতে বলল, কী?
মালার সঙ্গে ঝগড়া করেছিস কেন?
কে বলল ঝগড়া করেছি?
যেই বলুক, কেন করেছিস?
