ছোট ভাইর আচরণে আমি বুঝেছি, ব্যাপারটা কিছুতেই ওরা মেনে নেবে না। যতো রকমের ঝামেলা করতে হয় করবে।
শুভ শান্ত গলায় বলল, তা আমিও বুঝেছি। দেখা যাক।
.
দাঁতে দাঁত চেপে স্বপন বলল, না তুমি কিছু বোঝনি! এখন থেকে আমি আর কারও কথা শুনব না। নিজে যা ভাল বুঝব তাই করব।
স্বামীকে শান্ত করার জন্য রেখা বলল, তুমি আমার কথা শোন।
কী কথা শুনব তোমার?
এসব ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে কোনও লাভ হয় না।
লাভ লোকসানের কথা আমি ভাবছি না।
ভাবতে হবে। এটা তোমাদের ফ্যামিলির প্রেস্ট্রিজ। এজন্য ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে কাজ করতে হবে।
চিন্তা আমি করতে পারছি না। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
এবার স্বপনের একটা হাত ধরল রেখা। তুমি একটু স্থির হও, স্থির হয়ে বস। আমি তোমার মাথা মেসেজ করে দিই।
ঝটকা মেরে রেখার হাত ছাড়িয়ে দিল স্বপন। রাখ তোমার মাথা মেসেজ! যত্তসব ফালতু চিন্তা। জান, কী অপমানটা আমি হয়েছি। পাত্রপক্ষের সঙ্গে কথা বলছিলাম আমি।
তা তো আমি জানিই।
কিন্তু অপমানটা বোধহয় তুমি ফিল করতে পারছ না। এই মুখে একবার যা হা করেছি, তাই আমাকে আবার না করতে হয়েছে। এনগেজম্যান্টের যাবতীয় ব্যবস্থা। করেছিলাম, সেসব ভেঙে দিতে হয়েছে। লোকে এখন নানা রকমের কথা বলছে, এই অপমানটা শুধু আমার। আর কারও না।
রেখা সরল গলায় বলল, সেতুর ভুলটা হল এসব সে আমাদেরকে আগেই জানিয়ে দিলে পারত। সব ঠিকঠাক হওয়ার পর…!
রেখার কথা শেষ হওয়ার আগেই বেশ জোরে তাকে ধমক দিল স্বপন। চুপ কর।
তারপর গটগট করে বেরিয়ে সেতুর রুমে এসে ঢুকল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বিছানায়। বসে আছে সেতু। মায়ের চোখের সামনে দাঁড়াবার পরও চোখ তুলে তাকাল না।
ক্রোধে ফেটে পড়া গলায় স্বপন বলল, ইচ্ছে করছে এখন মারি তোকে, মেরে দাঁতগুলো ভেঙে ফেলি তোর, হাড়গুলো ভেঙে ফেলি। হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে পা দুটো ভেঙে দিই তোর, যাতে কোনদিন বাড়ি থেকে বেরুতে না পারিস। হাত দুটো ভেঙে দিই, যাতে কোনদিন টেলিফোন ধরতে না পারিস। তোর জিভটাও কেটে দেয়া উচিত যাতে মানুষের সঙ্গে আর কথা বলতে না পারিস।
সেতু একটিও কথা বলল না। চোখের জলে ভাসতে লাগল।
.
সন্ধ্যারাতে নিজের বেডরুমে মন খারাপ করে শুয়ে আছেন মামুন।
শিলা গিয়েছিলেন মুন্নির রুমে। ফিরে এসে স্বামীকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে যা বোঝার বুঝে গেলেন। অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে স্বামীর পা মোছালেন তিনি। তার বাহুর কাছটায় হাত রাখলেন। তুমি একটু বেশি ভেঙে পড়েছ।
মামুন হতাশ গলায় বললেন, বেশি মানে কী? আমার মনে হচ্ছে আমি একেবারেই শেষ হয়ে গেছি।
এভাবে বল না।
সত্যি। বাবা মার মৃত্যুতেও এতো কষ্ট আমি পাইনি।
তা আসলে ঠিক নয়। মানুষ যখন সে দুঃখটা পায় সেটাকেই বড় করে দেখে।
এরকম কাজ সেতু কেমন করে পারল?
শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলেই এরকম কাজ মানুষ করতে পারে। একবারও আমাদের কথা ওর মনে হল না?
মনে হলে কী আর এরকম কাজ করে? মানুষের নিয়মই এই, যে সংসারে বড় হয়, যাদের আদরে ভালবাসায় বড় হয়, একদিন তাদের দিকেই আর ফিরে তাকায় না। নিজের স্বার্থটাকেই বড় করে দেখে।
এটা কেমন স্বার্থ দেখা?
নিজের পছন্দে বিয়ে করা মানেই তো নিজের স্বার্থ দেখা।
কিন্তু ওই ছোকরাটার খবর আমি নিয়েছি। অতি বাজে পরিবার, হতদরিদ্র। ওইটুকু একটা বাড়ি ছাড়া কিছু নেই। কেরানিগিরি করে জীবন চালাতে হবে। আমার বোন হবে কেরানির বউ।
এ কথায় স্বামীর মন খারাপের কথা ভুলে গেলেন শিলা। স্বামীর ঠাট্টা প্রবণতার কথা মনে পড়ল। ফলে নিজের অজান্তেই যেন গলায় এসে তার ভর করল ঠাট্টার সুর। হবে না, হয়ে গেছে।
স্ত্রীর এই ভঙ্গিটা পছন্দ করলেন না মামুন। বিরক্ত হলেন। কথাটা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন শিলা। মাথা নিচু করে বললেন, সরি।
মামুন বললেন, নিজের স্বার্থটাও সেতু বোঝেনি। বুঝলে এরকম জায়গায় নিজেকে জড়াত না। মানুষ সব সময় নিজের ভাল চায়। সেতু কী চাইল?
কেউ কাউকে ভালবাসলে এত নিজের করে বাসে না।
মামুন খর চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। চুপ কর। ভালবাসা শব্দটার ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে।
বাইরে থেকে রানী এক সময় বলল, ছোট সাহেব ড্রয়িংরুমে বসে আছে।
মামুন উঠলেন। শিলাকে কিছু না বলে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকলেন।
স্বপন গম্ভীর মুখে বসে আছে।
মামুন তার মুখোমুখি বসলেন। কী হয়েছে?
স্বপন থমথমে গলায় বলল, প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আমার। ওকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
রাগারাগি করে লাভ নেই।
তাহলে কী করব? হুজুর হুজুর করব ওকে?
মামুন কথা বললেন না।
স্বপন বলল, ভাইয়া, আজ তোমাকে কিছু কথা আমি না বলে পারছি না। তোমার অতিরিক্ত আদরে এতোটা বখে যাওয়ার সাহস পেয়েছে সেতু। বোনকে আদরেরও একটা সীমা থাকে, যেই সীমাটা তোমার ছিল না। তীক্ষ্ণ চোখে স্বপনের দিকে তাকালেন মামুন, তোর ছিল? তুই কি সেতুকে কম আদর করেছিস?
তোমার মতো করিনি।
সেতুর কথা একা বলছিস কেন? তোকেই কি কম আদর করেছি আমি! বড় ভাই পিতার মতো। তোদের দুজনকে পিতার স্নেহে বড় করেছি আমি।
তা অস্বীকার করছি না।
তাহলে আমার অপরাধটা কোথায়? আমার দায়িত্ব ছিল তোদেরকে ভালবেসে বড় করা। আমি তা করেছি। বড় হয়ে তুই যদি আমার বুকে ছুরি মেরে দিস তাহলে আমার কী করার থাকে!
