শুভ খুবই বিব্রত হল। আপনাদেরকে সান্ত্বনা দেয়ার উপযুক্ত আমি নই, তবু দুএকটি কথা বলি। বর্ষার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ওর যা অবস্থা, আপনারা দয়া করে ওকে নিয়ে ভাবুন। যে চলে গেছে তার কথা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
মিনু বললেন, ভুলে যেতে চাই বাবা, সত্যি ভুলে যেতে চাই। পারি না। কিছুতেই পারি না।
তবু পারতে হবে। মন শক্ত করতে হবে। ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
উঠে দাঁড়াল শুভ। আমার একটু কাজ আছে। আপনারা তো আরও তিন চারদিন। আছেন, এর মধ্যে আমি আবার আসব।
.
নাহিদ বলল, আমি ভেবেছিলাম শুভর সাথে তুই অনেক কথা বলবি। তুই কিছুই বললি না। কেন বললি না? ও কী ভাবল বল তো?
এসব কথা যেন শুনতেই পেল না বর্ষা। জানালার সামনে উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ করেই বলল, ভাইজান, বাদল কি এতদিনে কঙ্কাল হয়ে গেছে? কবরের অন্ধকারে একা একা কেমন করে আছে সে? অন্ধকারে বাদল খুব ভয় পেত। এখন ওর ভয় করে না?
হাত ধরে বর্ষাকে চেয়ারে বসাল নাহিদ। এসব বললে আমি খুব কষ্ট পাই। তুই কি ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিচ্ছিস?
নাহিদের কথা কিছুই শুনল না বর্ষা। বলল, মৃত্যুর পরও নাকি মানুষের মাথার চুল, নখ বড় হয়! ভাইজান, বাদলের চুলগুলো কি অনেক বড় হয়ে গেছে? ঘাড় ছাড়িয়ে নেমেছে? আর নখগুলো কি ওর বড় হয়ে গেছে? ওতো নিজ হাতে নখ কাটতে পারত না। আমি কেটে দিতাম। ভাইজান, কবরে ওর নখ কেটে দেবে কে?
নাহিদ অসহায় গলায় বলল, তোকে আমি কতবার বলব এসব বলিস না। চল, ঐ রুমে যাই। সবাই মিলে চা খাই।
বর্ষা নড়ল না। আগের মতো করেই বলল, বাদল কি এখন বিকেলের চা খায়? কে করে দেয় ওর চা?
দুহাতে বর্ষার দুটো হাত ধরল নাহিদ। আমি তোকে কিছু কথা বলি…
নাহিদের কথা শেষ হওয়ার আগেই বর্ষা বলল, বাদলের কথা বল ভাইজান, শুধু বাদলের কথা বল। অন্য কারও কথা শুনতে আমার ভাল লাগে না।
এবার আশ্চর্য রকমের এক অভিমান হল নাহিদের।
কেন শুধু বাদলের কথা বলব? বাদল ছাড়া আর কেউ নেই তোর? আমি নেই? আমি তোর ভাই নই? তুই যখন শুধুই বাদলের কথা বলিস আমার খুব কষ্ট হয়। বাদল নেই সেই কষ্ট কিন্তু নয়। অন্য রকমের কষ্ট। মনে হয় আমি তোর ভাই নই, শুধু বাদলই তোর ভাই। আমি মরে গেলেও তুই কোনও কষ্ট পাবি না।
শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল বর্ষা। না না, না। মৃত্যুর কথা বল না, তুমি আর মৃত্যুর কথা বল না ভাইজান। আমি সহ্য করতে পারি না। আমার বুক ফেটে যায়। মৃত্যুর সময় যে রকম কষ্ট পেয়েছে বাদল ঠিক সেরকম কষ্ট পেতে থাকি আমি। মনে হয় আমি নিজেই যেন মরে যাচ্ছি।
একটা কথা তোর বোঝা উচিত, বাদলের জন্য যে রকম কষ্ট পাচ্ছিস তুই, তারচে অনেক বেশি কষ্ট পাচ্ছি মা, বাবা আর আমি, আমরা তিনজন। আমাদের কষ্টটা শুধু বাদলকে নিয়ে নয়, তোকে নিয়েও। বাদল চলে গিয়ে যে কষ্ট আমাদেরকে দিয়েছে, বেঁচে থেকে তুই তারচে কম কষ্ট আমাদেরকে দিচ্ছিস না। আমরা কেউ বুঝতে পারছি না, কী করলে তুই ভাল থাকবি।
কিছু করতে হবে না, কিছু করতে হবে না আমার জন্য। বাদলকে এনে দাও, তোমরা শুধু বাদলকে আমার কাছে এনে দাও। আমি আর কিছু চাই না।
বর্ষা হুহু করে কাঁদতে লাগল। বাদল কেন মরে গেল? কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল?
.
জীবনে এত অপমান আমি কখনও হইনি। এতটা অপমান কেউ আমাকে কখনও করেনি।
রাগে ক্রোধে থমথম করছিল দোলনের গলা। বিরক্তিতে বিশ্রী দেখা যাচ্ছে সুন্দর মুখ। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মরে যাচ্ছিল শুভ। তার জন্য, শুধু তার জন্য এমন হয়েছে। কেন সে সেতুদের বাড়িতে দোলনকে শুভ পাঠিয়েছিল?
কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই। যে অপমান দোলনকে করা হয়েছে, কীভাবে, কোন পদ্ধতিতে তা মুছে দেওয়া যায় তার মন থেকে!
শুভ কাতর গলায় বলল, পরিস্থিতিটা এরকম হবে আমি কল্পনাই করিনি। তাহলে কিছুতেই তোমাকে পাঠাতাম না।
দোলন রুক্ষ গলায় বলল, আপনি পাঠাতেন কি, এরকম অপমান হতে হবে জানলে আমি নিজেই যেতাম না।
একটু থেমে তীব্র ঘৃণায় মুখ বিকৃত করল দোলন। ছি ছি ছি! ছোট বোনের বান্ধবীর সাথে কেউ এরকম ব্যবহার করে? তাও ওরকম সফিসটিকেটেড ফ্যামিলির ছেলে!
ছোট বোনের লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলাটা মেনে নিতে পারছে না।
কেন পারবে না? একটি সৎ চরিত্রের মেয়ে তার পছন্দে বিয়ে করে ফেলেছে তাতে কী হয়েছে?
আমার ইচ্ছে করছে এক্ষুণি সেতুদের বাড়ি যাই। গিয়ে ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করি, দোলনের সাথে এই ব্যবহারটা আপনি কেন করেছেন? কিছু বলার থাকলে আমাকে। বলুন।
তাতে লাভ কী? আমার অপমানটা তো আর কেটে যাবে না।
দোলনের কথা বলার ভঙ্গিতে শুভ নিজেও খুব অপমানবোধ করছিল। যদিও বুঝতে পারছিল এটাই স্বাভাবিক। যার জন্য অপমান হয়েছে তাকে তো মনের ঝাল কিছুটা ঝাড়বেই দোলন। তবু মনটা শুভর খারাপ হচ্ছিল। সে উঠে দাঁড়াল। আমি খুব দুঃখিত।
দোলন সঙ্গে সঙ্গে বলল, আপনি দুঃখিত হয়ে কী করবেন? আপনার কি কিছু করার আছে?
না মানে আমার জন্য এরকম অপমান হলে তুমি!
এই অপমানের শোধ আপনি নিতে পারবেন না।
তা হয়ত পারব না, তবে অন্য একটা কাজ করতে পারব। চেষ্টা করব এসবের মধ্যে যেন তোমাকে আর না জড়াতে হয়।
দরজার দিকে পা বাড়াল শুভ।
দোলন বলল, শুনুন।
শুভ ঘুরে দাঁড়াল।
