নাহিদ বলল, বর্ষা, দেখ কে এসেছে?
আলতো করে মুখ ফেরালো বর্ষা। নির্বিকার গলায় বলল, কোথায় কে এসেছে?
শুভকে দেখাল নাহিদ, এই যে।
উদাস চোখে শুভর মুখের দিকে তাকাল বর্ষা, তারপর তাকাল নাহিদের দিকে। কে?
চিনতে পারছিস না?
শুভ হাসিমুখে বলল, কী করে চিনবে! বর্ষা তো আমাকে কখনও দেখেনি!
কিন্তু আমার মুখে তোর কথা অনেক শুনেছে।
তারপর বর্ষার দিকে তাকাল নাহিদ। ভেবে দেখ তো কার কথা আমার মুখে সবচে’ বেশি শুনেছিস তুই?
বর্ষা আগের মতোই উদাস গলায় বলল, আমার কিছু মনে পড়ে না।
বর্ষার গলায় গভীর অসহায়ত্ব। শুভর মনটা অন্যরকম হলো। নাহিদকে বলল, অযথা ওর মনের ওপর প্রেসার দেয়ার দরকার নেই। তারচে’ আমিই আমার পরিচয় দিয়ে ফেলি।
হাসি হাসি মুখ করে বর্ষার দিকে তাকাল শুভ। বর্ষা, আমি শুভ।
বর্ষা তবু চিনতে পারল না।
শুভ বলল, নাম বলার পরও বোধহয় আমাকে তুমি চিনতে পারনি। আমি নাহিদের বন্ধু।
এবার সামান্য চঞ্চল হলো বর্ষা, ও। জানেন বাদল, বাদল মারা গেছে।
তারপর আর কোনওদিকে তাকাল না, একটিও কথা বলল না, আস্তেধীরে হেঁটে হোটেল বিল্ডিংয়ের দিকে চলে গেল।
বর্ষা চলে যাওয়ার পর শুভ আর নাহিদ এলো রিসিপসানে।
রিসিপসানের অদূরে গেস্টদের বসার জন্য সুন্দর কয়েকটি সোফা রাখা আছে। দুটো সোফায় মুখোমুখি বসল ওরা। বর্ষার সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই বেশ চিন্তিত শুভ। এখন নাহিদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, বর্ষাকে দেখে, বর্ষার কথা শুনে মনে হলো সে কিছুটা এবনরমাল হয়ে গেছে।
নাহিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুটা না, অনেকটা।
যমজ ভাই বোনদের ব্যাপারটা আমি জানি। আমার সঙ্গে স্কুলে দুটো যমজ ভাই পড়ত। একজন টিচার ছিলেন, ইসলাম স্যার, কথায় কথায় বেত দিয়ে মারতেন আমাদেরকে। যমজ ভাই দুটোর নাম ছিলো কিসলু আর খসরু। তাদের একজনকে মারলে অন্যজনও কেঁদে ফেলতো।
বাদল-বর্ষার ক্ষেত্রে এটা কোনও ব্যাপারই ছিল না। ওদের একজনের জ্বর হলে প্রায় সাথে সাথে আরেকজনের হতো। বড় হওয়ার পর এসব একটু একটু করে কমতে শুরু করেছিল।
এই অবস্থায় একজন আরেকজনকে ছেড়ে গেলে সেই শোক সামলানো প্রায় অসম্ভব। বর্ষাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে।
কিন্তু আমি মন খারাপ করতে পারছি না। আমাকে ভাবতে হচ্ছে তিনজন মানুষের কথা। মা বাবা বর্ষা। বাদল মারা গেল, আমার ভাই, অসুখের সময় দিনরাত আগলে রাখার চেষ্টা করেছি তাকে…
কথা শেষ করতে পারল না নাহিদ। কেঁদে ফেলল। চোখ মুছতে মুছতে ধরা গলায় বলল, ওর কথা ভাববার এখন সময়ও নেই আমার।
শুভ উঠে এসে নাহিদের পাশে বসল। তার কাঁধে হাত দিল। তুই এমন করিস না নাহিদ। আমার খুব অসহায় লাগছে। কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। আমি বরং যাই।
চোখ মুছে নাহিদ বলল, মা বাবার সঙ্গে দেখা করে যা।
দেখা করে কী হবে? তাঁদের মুখ দেখে, কষ্টের কথা শুনে মন আরও খারাপ হবে। ওদিকে সেতুদের বাড়িতে কী হচ্ছে কিছুই জানি না। আমার ভাল লাগছে না।
জীবন এরকমই। সব দুঃখ কষ্টকেই সামাল দিতে হবে। আয় আমার সঙ্গে।
ওরা দুজন উঠল।
.
সোফায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন হাদি সাহেব।
চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে তাঁর। মিনু দাঁড়িয়ে আছেন স্বামীর সামনে। স্বামীকে এভাবে কাঁদতে দেখে খুবই অসহায়বোধ করলেন তিনি। তবু তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেন। তুমিও যদি এমন ভেঙে পড়, আমার ওইটুকু ছেলে কী করে এতগুলো লোককে সামলাবে?
দুহাতে চোখ মুছলেন হাদি। ভাঙাচোরা গলায় বললেন, তিনটি ছেলে মেয়ের একটি নেই, এ আমি ভাবতেই পারি না। আমার বুক ফেটে যায়।
এবার স্বামীর কাঁধে হাত দিলেন মিনু। তুমি এমন করলে আরেকটিকেও হারাতে হবে। একটু শক্ত হও। যে গেছে তার কথা না ভেবে যারা আছে তাদের কথা ভাব।
কথা বলতে বলতে নিজেও কেঁদে ফেললেন তিনি। আমাকে দেখছ না তুমি! আমি কী রকম পাষাণ হয়ে গেছি, দেখছ না!
টুক টুক করে দরজায় শব্দ হলো এসময়।
সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুছলেন হাদি। এই শব্দটা তিনি চেনেন। নাহিদের। দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, আয়।
দরজা ঠেলে নাহিদ এবং শুভ ঢুকল।
হাদির দিকে তাকিয়ে নাহিদ বলল, বাবা, এই হচ্ছে শুভ।
তারপর মিনুর দিকে তাকাল সে। মা, শুভর কথা তো তুমি জানই।
বলেই মা এবং বাবার ভেজাচোখ দেখে ফেলল নাহিদ। একটু যেন বিরক্ত হল। নিশ্চয় তোমরা আবার কান্নাকাটি করেছ! আচ্ছা তোমরা এরকম করলে আমি কী করি বল তো?
তারপর যেন চমকাল নাহিদ, বর্ষা কই?
মিনু বললেন, ওই রুমে।
ওকে একা রেখে তোমরা দুজন এই রুমে বসে আছ কেন?
তোর বাবা কাঁদছিলেন, এজন্য আমি..
মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই শুভর দিকে তাকিয়ে নাহিদ বলল, তুই এখানে বস। আমি বর্ষার রুমে আছি।
শুভ কিছু বলার আগেই বেরিয়ে গেল নাহিদ।
সঙ্গে সঙ্গে শুভর দিকে তাকালেন হাদি। কাতর গলায় বললেন, আমাদের ফ্যামিলির কারও কখনও ডায়াবেটিস ছিল না। এত কম বয়সে বাদলের যে কেমন করে হল?
স্বামীর পাশে বসে মিনু বললেন, ছোটবেলা থেকেই ও একটু রোগা ছিল। হজমে গণ্ডগোল হতো, ঘনঘন জ্বর হতো। দুবার জন্ডিস হল। বছরখানেক আগে স্পাইনাল কর্ডে টিবি হল। একটানা মাস চার চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে হল ছেলেটার।
তারপরই বললেন, সারাজীবন শুয়ে থেকেও যদি বেঁচে থাকত…!
কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি। কেঁদে ফেললেন।
