পিঠের কাছে দুটো বালিশ দিয়ে বিছানায় বসে আছে শিলা। মুখটা থমথম করছে। মামুনের কথা শুনে গম্ভীর গলায় বলল, ঠিক হয়নি।
কথাটা বুঝতে পারল না মামুন। কী ঠিক হয়নি?
এত ভালবাসা।
তাই বল।
অতিরিক্ত আল্লাদ ভাল না। কিছু মানুষ থাকে বানরের মতো। বানরকে লাই দিলে মাথায় ওঠে।
আমার বোনকে তুমি বানর বলছ?
পারলে বানরের চেয়েও খারাপ কিছু বলতাম।
মামুন টের পেল কোথায় যেন একটা প্যাঁচ লাগতে যাচ্ছে। সেদিনের পর থেকে শিলার ব্যাপারে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করে আছে সে। শিলার সঙ্গে খোঁচাখোচি লাগতে পারে এমন প্রসঙ্গ যত্নে এড়িয়ে চলছে। শিলা বাঁকা করে কথা বলতে চাইলেই নিজে হয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত সরল।
এখনও হল। হাসিমুখে, আদুরে গলায় বলল, এই, কী হয়েছে তোমার?
কিছুই হয়নি।
তাহলে এমন করছ কেন?
কী করছি?
আমি অবশ্য বুঝেছি।
কী বুঝেছ, বল!
বোনের ব্যাপারে মন খারাপ করে আছি দেখে ঠাট্টা করে আমার মন ভাল করার। চেষ্টা করছ।
শিলা চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাল।
মামুন বলল, দরকার নেই। তুমি সামনে থাকলে আমার মন এমনিতেই ভাল থাকে।
শিলা গম্ভীর গলায় বলল, তোমার মন নিয়ে আমি ভাবছি না, আমি তোমার সঙ্গে ঠাট্টা মশকরাও করছি না। স্বপনকে বল আজ রাতেই পাত্রপক্ষকে ফোন করতে।
কেন?
এনগেজম্যান্ট হবে না।
কথাটা একদম পাত্তা দিল না মামুন। ধুৎ, ঠাট্টা করো না।
আগের চেয়েও গম্ভীর গলায় শিলা বলল, একবার বলেছি, আমি তোমার সঙ্গে ঠাট্টা করছি না। তোমার বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।
কী?
এই যে বিয়ের ছবি।
বলেই পিঠের দিককার বালিশের তলা থেকে সেতুর দেয়া ছবির খামটা বের করল শিলা। মামুনের হাতে দিল।
মামুন ততোক্ষণে পাথর হয়ে গেছে।
.
গেট খুলেই খিলখিল করে হাসতে লাগল দোলন।
শুভ অবাক হল। কী হল, হাসছ কেন?
এ কথায় দোলনের হাসি আরও বাড়ল। হাসতে হাসতে বাঁকা হয়ে যাচ্ছিল সে।
শুভ কিছুই বুঝতে পারল না। বলল, আরে! কী হয়েছে?
দোলন হাসতে হাসতে বলল, এ সময় ভিক্ষুকরা এসে কলিংবেল বাজায়।
বুঝলাম, তাতে হাসার কী আছে?
আমি আপনাকে তাই ভেবেছি।
মানে ভিক্ষুক?
হ্যাঁ।
এবার শুভও হাসল। খারাপ ভাবনি। আমার অবস্থা ভিক্ষুকের মতোই।
দোলন হাসি থামাল। যাহ্, বাজে কথা বলবেন না। ভেতরে আসুন।
না, এখানেই বলি।
অবশ্য মা বাবা এসে পড়েছেন। তবু ভেতরে আপনি আসতে পারেন। অসুবিধা হবে না।
দরকার নেই ঝামেলার। শোন, কথাটা সেতু ওদের বাড়িতে বলে দিয়েছে। কী ধরনের রিয়্যাকশান হয়েছে, জানি না। অনেকবার ফোন করেছি, সেতু ফোন ধরছে না। আর আগে কখনও যা হয়নি আজ তাই হচ্ছে, সেতুকে চাইলেই নামধাম সব জিজ্ঞেস করছে বাড়ি থেকে। মিথ্যে বলতে বাঁধো বাধো লাগছে বলে ফোন ছেড়ে দিচ্ছি আমি।
ভাল করেছেন। তাছাড়া প্যারালাল লাইনে আপনাদের কথা শুনেও ফেলতে পারে কেউ।
হ্যাঁ। এসব কারণে আমার খুব নার্ভাস লাগছে।
বুঝেছি। আমি কী করতে পারি বলুন?
তুমি একটু ওদের বাড়িতে যাও। অবস্থাটা বুঝে এস। আমি বিকেলে এসে খবর নেব।
ঠিক আছে।
তারপর মাথা নিচু করে শুভ বলল, যখন তখন এসে তোমাকে খবু বিরক্ত করি, আমাদের জন্য অনেক করছ তুমি, তোমার কাছে খুব ঋণী হয়ে গেলাম।
সব ঠিক হয়ে গেলে ঋণ শোধ করে দেবেন।
শুভ হেসে বলল, বিল করে রেখ।
কিন্তু সেতুদের বাড়ি ঢুকেই স্বপনের মুখোমুখি পড়ে গেল দোলন।
মামুন এবং স্বপন কেউ আজ অফিসে যায়নি। কপালে হাত দিয়ে নিজের রুমে শুয়ে আছে মামুন আর বাড়ির সামনের দিককার বারান্দায় বেতের চেয়ারে রাগি মুখ করে বসে আছে স্বপন। হাতে হাসানের পত্রিকা। হাসিঠাট্টা বিষয়ক পাতাটা বেরিয়েছে আজ। সকাল থেকে বহু চেষ্টা করে একটি লাইনও পড়তে পারেনি স্বপন।
এ সময় দোলন এসে ঢুকল।
দোলনের স্বভাব হচ্ছে অতি দ্রুত হাঁটার। স্বপনকে দেখেও দ্রুত হেঁটে দোতলার সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল সে। স্বপন তাকে ডাকল। দোলন, শোন।
দোলন এসে তার সামনে দাঁড়াল। জ্বী?
তুমি কেন এসেছ আমি জানি।
কী করে জানলেন?
তা তোমাকে বলব না। এও জেনেছি যে ব্যাপারটার সঙ্গে তুমি জড়িত।
দোলন বুঝে গেল কেলেংকারি যা হওয়ারা এই বাড়িতে হয়ে গেছে। ব্যাপারটির সঙ্গে তাকেও জড়ানো হয়েছে। হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। সে যা করেছে জেনে বুঝেই করেছে। সেতু তার বন্ধু, বন্ধুর জন্য বন্ধু করবে না!
কিন্তু স্বপনের কথা বলার ধরনটা বিশ্রি। এই ভঙ্গিতে কথা বলা একদমই সহ্য করতে পারে না দোলন। গা একেবারে জ্বলে গেল তার। তবু নিজেকে সংযত রাখল সে। যেন কিছুই জানে না এমন গলায় বলল, কোন ব্যাপারটার সঙ্গে আমি জড়িত?
দাঁতে দাঁত চেপে স্বপন বলল, আমাকে দিয়ে বেশি কথা বলিও না।
এবার দোলনও গম্ভীর হল। আপনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করছেন?
আরও বাজে ব্যবহার তোমার সঙ্গে আমার করা উচিত।
কেন?
বলতে চাই না, আমার মেজাজ আরও খারাপ হবে। সেতুর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। তুমি এসো।
স্বপনের চোখের দিকে তাকিয়ে দোলন বলল, নিজেদের বাড়িতে এতটা অপমান আমাকে না করলেও পারতেন। অপমানটা একদিন আপনার কাছে ফিরে আসতে পারে।
যে গতিতে হেঁটে সেতুদের বাড়ি ঢুকেছিল দোলন তারচেও দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
স্বপনের এই আচরণের কথা সেতুকে জানাল মুন্নি। কী কাজে নিচে এসেছিল সে, স্বপন এবং দোলনের শেষদিককার কথাগুলো শুনতে পেয়েছিল। দোলন বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল সেতুর রুমে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তুমি কিছু শুনেছ, ফুপি?
