সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় উৎকণ্ঠা, বিষণ্ণতা কেটে গেল সেতুর। গভীর আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখ। বুকের অনেক ভেতর থেকে সে বলল, আমিও তোমাকে খুব ভালবাসি।
তারপর একটু থেমে বলল, কিন্তু খুব টেনশানে আছি। ভাবীরা জেনেছে, আজ রাতের মধ্যেই ভাইয়ারা জেনে যাবে।
শুনে শুভ যেন ভয় পেল। তোমার কথা শুনে আমারও বুক কাঁপতে শুরু করেছে। ইস্ কী যে হবে!
সেতুর মন একটু খারাপ হল। কিছু একটা বলতে যাবে সে তার আগেই শুভ বলল, আমি তোমার সঙ্গে ফান করলাম। শোন, একদম নার্ভাস হবে না তুমি, একটুও ভয় পাবে না। আমি আছি।
ভয় আমি পাচ্ছি না। যদি কেউ কোনও বাড়াবাড়ি করে, সোজা তোমার কাছে চলে আসব।
ঠিক এ সময় সেতুর রুমের সামনে এসে দাঁড়াল মামুন। অফিসের পোশাক ছেড়ে বাড়ির পোশাক পরেছে সে। সেতুর টেলিফোনে কথা বলাটা খেয়াল করল না। বলল, সেতু, কী করছিস?
তারপর রুমে ঢুকল। সেতু থতমত খেয়ে ফোন অফ করল। দেখে মামুন বলল, রাখার দরকার নেই, কথা শেষ কর, আমি নাহয় পরে আসব।
বুকটা কাঁপছে সেতুর, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কোনও রকমে সে বলল, না, ঠিক আছে।
তখন আবার ফোন বাজল। হাত বাড়িয়ে ফোনটা ধরল মামুন। সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেল লাইন। মামুন বিরক্ত হল। আমি ধরলাম আর ফোনটা ছেড়ে দিল। কে ফোন করেছিল?
সেতুর গলাটা শুকিয়ে গিয়েছিল, সে একটা ঢোক গিলল। তুমি যখন ধরলে তখন কে করল জানি না, আগে করল দোলন।
আমি যখন ধরলাম তখন দোলন করেনি, দোলন হলে আমার সঙ্গে কথা বলতো!
তারপরই প্রসঙ্গটা ভুলে গেল সে। উচ্ছল গলায় বলল, শোন, তোর কিছু চাওয়ার থাকলে আমার কাছে চেয়ে ফেল। খুব মুডে আছি, যা চাইবি, পেয়ে যাবি।
সেতু একটু উদাস হল। এজন্যই আমার রুমে এসেছ?
হ্যাঁ। আসলে মনটা খারাপ। তোর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তুই যে বাড়িতে থাকবি না সেই বাড়িতে আমি কেমন করে থাকব!
কথা বলার ফাঁকে জলে চোখ ভরে এল মামুনের। সেতুর মুখের দিকে সে আর তাকাতে পারল না।
সেতু ভাবল এই সুযোগটা নেবে কি না। কোনও না কোনওভাবে শুভর সঙ্গে তার বিয়ের কথাটা বলে দেবে কি না?
কিন্তু বড়ভাইকে নিজের বিয়ের কথা কেমন করে বলা যায়?
ভেতরে ভেতরে লজ্জা পেল সেতু। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
মামুন বলল, ঠিক আছে, আমি তোর সঙ্গে পরে কথা বলব। এখন মন খুব খারাপ হয়ে গেছে।
চোখ মুছতে মুছতে সেতুর রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।
.
স্বপন বলল, সেতুর বিয়ের ব্যাপারে ভাইয়ার সঙ্গে আমার মতের খুব মিল হচ্ছে।
কথাটা যেন শুনতে পেল না রেখা। আনমনা হয়ে আছে সে। চিন্তিত হয়ে আছে।
ব্যাপারটা খেয়াল করল স্বপন। বিরক্ত হল। তুমি আমার কথা শুনছ না?
স্বপনের চোখের দিকে তাকিয়ে রেখা বলল, শুনতে চাচ্ছি না।
কেন?
বিয়ের ব্যাপারটা…
কথা শেষ না করে মাথা নিচু করল রেখা।
স্বপন গম্ভীর গলায় বলল, কথা শেষ কর।
এবার রেখাও একটু বিরক্ত হল। তোমার সঙ্গে কথা বলাই মুশকিল। শুরুর আগেই রেগে যাও।
কথার ধরনে মনে হচ্ছে তুমি খুব খারাপ কিছু বলবে।
স্বপনের একটা হাত ধরল রেখা। আগেই রেগে যেও না, কথাটা আগে শোন।
স্বপন ভুরু কোঁচকাল। তুমিই বা এত ভনিতা করছ কেন? কী হয়েছে পরিস্কার বললেই পার।
সেতুর বিয়ের চিন্তাভাবনা আপাতত বাদ দিতে হবে!
কী?
পাত্রপক্ষকে মানা করে দাও।
অপলক চোখে রেখার মুখের দিকে তাকাল স্বপন। শীতল গলায় বলল, তুমি বুঝতে পারছ তুমি কী বলছ? পরশু এনগেজম্যান্ট। সব রেডি। এই সময়ে কোনও রকমের ঠাট্টা মশকরা করার চেষ্টা করো না।
তা আমি করছিও না। এনগেজম্যান্ট হবে না। যেমন করেই হোক ওটা বন্ধ করতে হবে কারণ শুভ নামের একটি ছেলের সঙ্গে সেতুর বিয়ে হয়ে গেছে।
সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাছে নিজে একেবারেই অচেনা হয়ে গেল স্বপন। কখন উঠে দাঁড়াল বুঝতে পারল না, কখন ঠাস করে রেখার গালে চড় মারল বুঝতে পারল না।
.
জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেতু।
টের পায়নি কখন কাঁদতে শুরু করেছে, কখন চোখের জলে গাল ভাসতে শুরু করেছে। বাড়িতে কী হচ্ছে কিছুই এখনও বুঝতে পারছে না সে। বড়ভাই যে এখনও শোনেনি বুঝতে পেরেছে, ছোটভাই শুনেছে কী না বুঝতে পারছে না। কাউকে জিজ্ঞেস করারও উপায় নেই।
এ সময় টুপলু এসে ঢুকল সেতুর রুমে। ফুপি, ফুপি, আম্মু বলেছে তোমার বিয়েতে আমাকে খুব সুন্দর একটা ড্রেস কিনে দেবে। দুধের মতো সাদা। পরলে আমাকে একদম। পরির মতো দেখাবে।
সেতু কথা বলল না, চোখও মুছল না। অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
ফুপিকে কথা বলতে না দেখে টুপলু তার হাত ধরল। কী হল ফুপি, তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?
এবার ওড়না দিয়ে চোখ মুছল সেতু। টুপলুর দিকে তাকাল।
টুপলু অবাক। তুমি কাঁদছ? কেন, কাঁদছ কেন? তোমাকে কেউ বকেছে ফুপি?
টুপলুকে কোলের কাছে টেনে সেতু বলল, না মা, কেউ বকেনি।
তাহলে কাঁদছ কেন?
এমনি।
তারপর নিজেকে সামলাল সেতু। চটপটে গলায় বলল, আম্মু তোমাকে সাদা ড্রেসের কথা কবে বলেছে?
দুতিনদিন আগে।
সেতু মনে মনে বলল, তাই তো! সব জানার পর তো বলার কথা নয়।
মুখে বলল, শোন, যদি আম্মু তোমাকে সাদা ড্রেস কিনে না দেয় তাহলে আমি তোমাকে কিনে দেব। পরলে সবাই তোমাকে বলবে ছোট্টপরি টুপলু। এখন যাও, মা।
আচ্ছা।
টুপলু প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল।
.
মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভেবেছিলাম সেতু কিছু চাইবে। ডায়মন্ডের গহনা বা এই ধরনের কিছু। খুব মুড নিয়ে কথা শুরু করলাম, কিন্তু সব কথা বলতে পারলাম না, মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওকে যে আমি কী ভালবাসি, কী রকম টান যে ওর জন্য আমার, আমি কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। একটা কথা আজ বলি। তুমি মন খারাপ করো না, রেগে যেও না। নিজের মেয়ের চেয়েও সেতুকে আমি অনেক বেশি ভালবাসি।
