কিন্তু শিলা বলল, আমার রুমে আসা তোমার ঠিক হয়নি, যা বলার আমি তোমাকে বলে দিয়েছি।
শিলার সঙ্গে সেতুর সম্পর্কটা মা মেয়ের মতো। রেখার কথা তেমন গায়ে লাগে না তার, কিন্তু শিলা রাগ করে কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে কান্না পায়।
এখনও পেল। কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, তুমি যে আমার সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করবে এ আমি কখনও ভাবীনি।
শিলা শুয়েছিল, উঠে বসল। তুমি নিজে যা করেছ তারচে খারাপ আর কিছু হতে পারে! আমার খারাপ ব্যবহারটা দেখছ, নিজেরটা দেখছ না?
ভাঙাচোরা, কাতর গলায় সেতু বলল, আগের কথাটাই তোমাকে আবার বলি, ভাইয়াকে তুমি ম্যানেজ কর। তোমার কথা ভাইয়া ফেলবে না। আমাকে তুমি বাঁচাও ভাবী, প্লিজ, আমাকে তুমি বাঁচাও।
শিলা কঠিন গলায় বলল, এককথা আমি দুবার বলি না। এতবড় কাজটাই যখন করে ফেলতে পেরেছ, তখন ভাইদের সামনেও দাঁড়াতে পারবে। তুমি নিজেই তাদের সামনে দাঁড়াও, তাদেরকে ম্যানেজ কর। আমি পারব না।
বিছানা থেকে নেমে দ্রুত হেঁটে রুম থেকে বেরিয়ে গেল শিলা। তারপরও সেতু খানিক দাঁড়িয়ে রইল। চোখের জলে দুগাল ভাসছিল তার।
৫. নিজের রুম থেকে বেরিয়ে
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে শিলা চলে এল ড্রয়িংরুমে।
দূর থেকে রেখা তাকে দেখতে পেয়েছিল। সেও এল। এসে কোনও ভনিতা ছাড়া বলল, সেতুর ওপর যত রাগই আমাদের হোক, সে যে ভুল করেছে সেই ভুল কিন্তু আমাদের করা ঠিক হবে না।
শিলা ভ্রু কোঁচকাল। তোমার কথা আমি বুঝতে পারিনি।
বলছিলাম কী, আমরা যেহেতু ব্যাপারটা জেনেছি, আমাদের উচিত আজই সেতুর ভাইদেরকে জানিয়ে দেয়া।
ঠিকই বলেছ, তা না হলে তারা আমাদেরকে দোষারোপ করবে। বলবে জেনেও আমরা কেন তাদেরকে জানাইনি।
অন্য ঝামেলাও আছে। এক্ষুনি এনগেজম্যান্ট না ভাঙলে কেলেংকারি হয়ে যাবে।
রানি খুবই ব্যস্ত ভঙ্গিতে ড্রয়িংরুমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, দোতলার ড্রয়িংরুমটি একটু খোলামেলা ধরনের, দুইজাকে নিভৃতে কথা বলতে দেখে ফেলল সে। সকাল থেকেই বাড়ির দুইবউ এবং সেতুর আচরণে কী রকম যেন অস্বাভাবিকতার গন্ধ পেয়েছে সে। কী যেন একটা হয়েছে বাড়িতে। ব্যাপারটা কী জানার জন্য ড্রয়িংরুমের বাইরে এমন একটা জায়গায় দাঁড়াল রানি, যেখান থেকে রুমের ভেতরকার কেউ তাকে দেখতে পাবে না কিন্তু সে শুনতে পাবে তাদের সব কথা।
রানির একা একা কথা বলার স্বভাব আছে। শিলা এবং রেখার কথা শুনতে দাঁড়িয়ে সে ফিসফিস করে বলল, বাড়িতে হইছে কী? এত গুজুর গুজুর, ফুসুর ফুসুর কীসের?
রানিকে এই অবস্থায় দেখে ফেলল টুপলু। সে যাচ্ছিল মুন্নির রুমের দিকে। রানিকে দেখে কিছু একটা সন্দেহ হল, পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এসে রানির পেছনে দাঁড়াল সে। আচমকা বলল, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ?
টুপলুর যেহেতু জোরে কথা বলার অভ্যেস, রানি একেবারে আঁতকে উঠল। ও মাগো, ডরাইয়া গেছি।
তারপর থুথু করে নিজের বুকে থুতু দিল।
টুপলু আবার বলল, কথা বলছ না কেন? এখানে দাঁড়িয়ে কী করছ?
সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যে বলতে শুরু করল রানি। না, দাঁড়াই নাই তো! আমি তো যাইতাছিলাম।
মিথ্যে কথা বলো না। আমি আম্মুকে বলে দেব।
কী, কী বলবা?
তা তোমাকে বলব না।
মুন্নির রুমের দিকে চলে গেল টুপলু। রানি ভাবল নিশ্চয় তাদের কথা শিলা এবং রেখা শুনতে পেয়েছে, এখুনি ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে ধরবে তাকে, ভয়ে সেই প্রায় দৌড়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।
.
আম্মু, তুমি আর চাচি যখন কথা বলছিলে…
সন্ধের পর রেখাকে মাত্র কথাটা বলতে শুরু করেছে টুপলু, স্বপন এসে ঢুকল। স্বপনকে দেখে সব ভুলে লাফিয়ে উঠল টুপলু। এই তো বাবা এসে পড়েছে।
তারপর ছুটে এসে স্বপনের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিল। কোলে নাও।
রেখা কর্কশ গলায় বলল, এখন কোলে উঠতে হবে না, যাও।
কিন্তু মেয়েকে কোলে নিল স্বপন। উঠুক না, তোমার অসুবিধা কী!
রেখা কথা বলল না। চিন্তিত চোখে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েকে আদর করতে লাগল স্বপন, রেখার চিন্তিত হওয়া চোখেই পড়ল না তার।
কিন্তু নিজের রুমে ঢুকেই শিলার থমথমে মুখ দেখতে পেল মামুন। মুন্নির মাথা আঁচড়ে দিচ্ছে শিলা, মামুন যে অফিস থেকে ফিরল, মা মেয়ের একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল শিলা যেন তা দেখতেই পেল না।
ব্যাপার কী? নিজের অজান্তে কি আবার কোনও ভুল করে ফেলেছে মামুন!
অনেক ভেবেও ভুলটা বের করতে পারল না মামুন। ড্রেসিংরুমে না ঢুকে বলল, ব্যাপার কী, সারাদিন পর বাড়ি ফিরলাম আর তুমি একবারও আমার দিকে তাকাচ্ছ না!
শিলা কথা বলল না।
মুন্নি বলল, আম্মু বোধহয় রেগে আছে।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে ধমক দিল শিলা। চুপ কর, তোকে বলেছি, রেগে আছি!
মেয়েকে ধমকাচ্ছ কেন? মুন্নি, যা তো মা, রানিকে বল চা দিতে।
আচ্ছা।
বারান্দায় রাখা টেলিফোনটা বাজল এ সময়। পাশাপাশি দুটো সেট। একটা কডলেস। বাবলু আসছিল মা বাবার বেডরুমের দিকে, শব্দ পেয়ে কডলেস ফোনটা ধরল। হ্যালো।
ওপাশ থেকে অত্যন্ত বিনয়ি গলায় কে একজন বলল, সেতুকে দেয়া যাবে?
সিওর। একটু ধরুন।
ফোন নিয়ে সেতুর রুমে এল বাবলু। ফুপি, তোমার ফোন।
টেলিফোন সেট হাতে নিল সেতু। কে করেছে?
এক ভদ্রলোক, আমি নাম জিজ্ঞেস করিনি।
বাবলু চলে গেল।
সেতু বলল, হ্যালো।
ওপাশ থেকে অত্যন্ত রোমান্টিক গলায় ভেসে এল, আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।
