একটু থামল শিলা। তবে বখে সেতু কখনও যায়নি। আমার চোখের সামনে বড় হল। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হল, খারাপ কিছু ওর মধ্যে কখনও আমি দেখিনি। সেই মেয়ে গোপনে গোপনে এমন কাজ করল! কথা নেই বার্তা নেই আচমকা পুরো ফ্যামিলির মাথায় বাড়ি মেরে বসল!
রেখা অধৈর্যের গলায় বলল, কিন্তু এখন কী হবে? তিনদিন পর এনগেজম্যান্ট, সব রেডি!
আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না, কিছু ভাবতে পারছি না আমি।
একথা শোনার পর সেতুর ভাইদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। টুপলুর বাবা এমনিতে খুব ভাল, কিন্তু ভীষণ বদরাগি, কী যেন কী করে বসে!
মামুন সাহেবও কম রাগি নয়। দেখে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব রাগি। এসব শোনার পর তার মাথার ঠিক থাকবে না। সেতু তার জান, তারপরও কিছুতেই এসব সে মেনে নেবে না।
আমার কথা হচ্ছে এতবড় একটা ব্যাপার এতদিন ও কীভাবে চেপে রাখল?
উত্তেজনায় রেখার গলা আরও রুক্ষ্ম এবং কর্কশ হয়ে গেছ। শিলার লক্ষ্মীট্যারা চোখটা গেছে ভাল রকমের ট্যারা হয়ে। সেই চোখ ঘুরিয়ে সে বলল, তুমি না বলেছিলে প্রেম এবং ক্যান্সার চেপে রাখা যায় না, সেতু তো ঠিকই চেপে রেখেছিল!
কোথায় আর চেপে রাখল! বলে তো দিলই! কথা হচ্ছে, প্রেম এবং ক্যান্সার কোনও না কোনও সময় বেরিয়ে আসবেই। বহুদিন চেপে রাখার পর সেতুরটা যেমন বেরিয়ে এল। সব বলে দিল সে।
এই বলাটা আরও কিছুদিন আগে বললে আমাদের খুব উপকার হতো।
কিন্তু এখন কী হবে?
শিলা রেগে গেল। তীক্ষ্ম গলায় বলল, বার বার এক কথা বলো না। কী হবে তার আমি কী জানি?
শিলার একটা হাত ধরল রেখা। কাতর গলায় বলল, রাগ করো না ভাবী। আমার খুব ভয় করছে।
শিলা নরম হল। ভয় আমারও করছে। সংসারে বিরাট ঝামেলা লেগে যাবে। চল, ওর সঙ্গে কথা বলে দেখি।
রেখা উঠল। চল।
ওরা দুজন তারপর সেতুর রুমে এসে ঢুকল।
চিন্তিত মুখে হাতপা গুটিয়ে নিজের বিছানায় বসে আছে সেতু। শিলা এবং রেখাকে দেখে চোখ তুলে তাকাল। তারপর ওরা কিছু বলার আগে নিজেই বেশ অপরাধী গলায় বলল, আমার আর কিছু বলার নেই। যদি কাবিননামা দেখতে চাও, দেখাব।
চাপা ক্রোধের গলায় শিলা বলল, কিন্তু এটা তুমি কেন করলে? তোমার যদি কারও সঙ্গে এফেয়ার থাকে প্রথমে আমাদের দুজনকে তুমি তা বলবে, আমরা তোমার। ভাইদেরকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করব। না পারলে তুমি তোমার ডিসিসান নেবে। এরকমই নিয়ম। তুমি কোনও নিয়মের ধার ধারলে না? আগেই বিয়ে করে ফেললে? তাও এমন সময় যখন অন্য জায়গায় তোমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এ তুমি কি করলে? এসব জানার পর তোমার ভাইরা কী দুঃখটা পাবে, তুমি ভেবেছ? যে ভাইয়েরা এত ভালবাসে তোমাকে, তুমি যাদের জান, তাদেরকে একরম দুঃখ দেয়ার আগে তুমি একটু ভাবলে না?
রেখা বলল, আমি মনে করি দুঃখের চে’ অপমানটা তাঁদের বেশি। যেখানে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে সেই লোকগুলোকে তারা এখন কী বলবে? কীভাবে মুখ দেখাবে তাদেরকে! কীভাবে সব ম্যানেজ করবে! সবকিছু জানাজানি হলে লোকে আমাদেরকে বলবে কী?
দাঁতে দাঁত চেপে শিলা বলল, আমার নিজের মেয়ে হলে থাপড়ে তোমার দাঁতগুলো আমি ভেঙে ফেলতাম। তারপর,তারপর ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিতাম। তোমার মতো মেয়ের মুখ আমি জীবনে দেখতাম না।
রাগি ভঙ্গিতে চলে যাওয়ার জন্য পা বড়িয়েছে শিলা, থাবা দিয়ে তার একটা হাত ধরল সেতু। চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে তার। কাঁদতে কাঁদতে বলল, অন্যায় আমি করে ফেলেছি, নিশ্চয় অনেক বড় অন্যায় আমি করে ফেলেছি। আমার ওপর যদি খুব রাগ হয় তোমার, আমাকে তুমি গালাগাল করো, যত ইচ্ছা গালাগাল করো, দরকার হলে মারো, তারপরও ভাইয়াকে তুমি ম্যানেজ করো।
ঝটকা মেরে সেতুর হাত ছাড়িয়ে দিল শিলা। আমি পারব না। ম্যানেজ করা তো দূরের কথা, তোমাকে নিয়ে তার সঙ্গে আমি কোনও কথাই বলব না। তুমি একটা বাজে মেয়ে।
প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল শিলা। তার পিছু পিছু গেল রেখা।
চোখের জলে ভাসতে ভাসতে সেতু তখন ভাবছে এখন সে কি করবে! কেমন করে ম্যানেজ করবে ভাবীদেরকে।
যে কোনও অসহায় মুহূর্তে সেতুর যা হয়, শেষ পর্যন্ত শুভকে ডাকতে লাগল সে। মনে মনে কথা বলতে লাগল শুভর সঙ্গে। শুভ, তুমি বলে দাও আমি এখন কী করব।
আশ্চর্য ব্যাপার, শুভই যেন পথটা তাকে বাতলে দিল। কিছুক্ষণ পর নিজের অজান্তেই যেন রেখার রুমে এসে ঢুকল সে।
চিন্তিত ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছে রেখা। সেতুকে দেখে মোটেই অবাক হল না, বিরক্ত হল। কপালে কুঁচকে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
অপমানটা গায়ে মাখল না সেতু। বলল, তোমরা দুজনেই যদি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমি কার কাছে যাব? তোমরা ছাড়া আমার আর আছে কে?
নরম করে বলতে চাওয়ার পরও গলাটা রেখার নরম হল না। কর্কশ গলায় বলল, আমাদের জায়গায় তুমি হলে কী করতে?
তোমাদের কোনও প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না। তবে সবদিক ভেবেই কাজটা আমি করেছি। এছাড়া আমার কোনও উপায় ছিল না। আমি চাই তোমরা দুজন আমার পাশে দাঁড়াও, আমাকে হেলপ কর।
একথায় রেখা কেমন ব্ৰিত হল। আমি কীভাবে তোমাকে হেলপ করব? না না আমার কিছু করার নেই।
আছে। তুমি ছোটভাইকে বোঝাও।
সে আমার কথা শুনবে না। প্রচন্ড রেগে যাবে, তার রাগ সামলাবার ক্ষমতা আমার নেই। তারচে’ তুমি বরং ভাবির কাছে যাও। ভাইয়া যদি সব মেনে নেন তাহলে কারও কিছু বলার থাকবে না।
