রেখা একটু নরম ধরনের। রেখাকে বলতে সুবিধে হবে ভেবে বিকেলের মুখে মুখে রেখার বেডরুমের সামনে এসে দাঁড়াল সেতু। যেমন করেই হোক আজকেই জানাতে হবে। এনগেজমেন্টের চারদিন বাকি। আজ না জানালে অন্য ধরনের সমস্যা হবে। পাত্রপক্ষকে মানা করার ব্যাপার আছে। একেবারেই শেষ সময়ে জানালে কিংবা এনগেজম্যান্টের দিন জানালে সিনেমার মতো ব্যাপার হবে। স্বাভাবিক অবস্থার চে বেশি বিব্রত হবে ভাইয়ারা, স্বাভাবিক অবস্থার চে বেশি রাগবে সেতুর ওপর।
কিন্তু রেখার বেডরুমের কাছে এসেও ভেতরে ঢুকতে পারল না সেতু, নিজের অজান্তেই যেন বসে পড়ল রেখার রুমের সঙ্গের বারান্দায় ফেলে রাখা বেতের চেয়ারগুলোর একটায়। বসে আনমনা হয়ে রইল। বিয়ের তিন চারটে ছবি হাতে ধরা, মূল খাম রেখে অন্য একটা খামে ভরে ছবি কটি নিয়ে এসেছে। একবার ভেবেছিল সবগুলো ছবিই, মানে পুরো খামটা দোলন যেভাবে দিয়ে গেছে ঠিক সেভাবেই দিয়ে আসবে ভাবীদের একজনকে। তারপর ভেবেছে, যদি ছবিগুলো আর ফেরত না পায়! যদি ছিঁড়েটিরে ফেলে দেয় ভাইয়ারা! তারপর যদি শুভর সঙ্গে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে একা ঘরে হাজার ইচ্ছে হলেও তো বিয়ের ছবিগুলো দেখতে পাবে না সে!
তুমি এভাবে এখানে বসে আছ?
সেতু চমকে তাকাল। কখন রেখা এসে দাঁড়িয়েছে তার সামনে! সেতুকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বেশ অবাক হল। সেতু তার দিকে তাকাতে মুখে দুঃশ্চিন্তার ছায়াটাও দেখতে পেল। বলল, কী হয়েছে?
সেতু বিষণ্ণ গলায় বলল, কিছু না।
তোমাকে কী রকম যেন দেখাচ্ছে! শরীর খারাপ, নাকি কিছু ভাবছ?
এই সুযোগটা ইচ্ছে করলেই নিতে পারে সেতু! রেখার কথার রেশ ধরে গড়গড় করে বলে যেতে পারে সব কথা। হাতের খামটা এগিয়ে দিতে পারে রেখার দিকে।
কিন্তু এসবের কিছুই করল না সে। আগের মতোই বিষণ্ণ গলায় বলল, শরীরও খারাপ না, কিছু ভাবছিও না, এমনিতেই বসে আছি।
সঙ্গে সঙ্গে সেতুর মুখোমুখি চেয়ারে বসল রেখা। চা খাবে?
একথায় বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেতু খুব বিরক্ত হল। রুক্ষ্ম গলায় বলল, এ সময় চা খাব কেন? তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি বাইরের লোক, তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি!
রেখা থতমত খেল। ফ্যাল ফ্যাল করে সেতুর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বলল, আমি আবারও বলছি, কী হয়েছে তোমার?
গলা আগের চেয়েও রুক্ষ্ম হল সেতুর। আমিও আবার বলছি, কিছুই হয়নি আমার।
কদিন পর এত ভালপাত্রের সঙ্গে যে মেয়ের এনগেজম্যান্ট তার মনমেজাজ এ সময় এত তিরিক্ষি হওয়ার কথা নয়।
তাহলে কেমন হওয়ার কথা?
এ সময় সে থাকবে গভীর আনন্দে। মজা করবে, হাসবে।
নাচবে না? ভারতনাট্যম কিংবা কথক?
উঠে হন হন করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল সেতু।
রেখা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সেতুর এই ধরনের আচরণ কখনও দেখেনি সে।
.
মামুন অফিসে চলে যাওয়ার পর সুন্দর একটা শাড়ি পরল শিলা।
ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে সাজগোজ করতে লাগল। এক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরুবে সে। গহনা আনতে যাবে। এক লাখ বাহাত্তোর হাজার টাকার চেক দিয়ে গেছে মামুন।
জুয়েলারিওয়ালারা এডভান্স ছাড়া অর্ডার নেয় না, শুধু এই বাড়িরটা নেয়। ক্যাটালগ দেখে অর্ডার দিয়ে এলেই হয়। গহনা আনার দিন পুরো পেমেন্ট।
কাল বিকেলে টেলিফোনে খবর নিয়েছে শিলা। গহনা রেডি। আজ আনতে যাবে, এজন্য বেশ আনন্দে আছে সে। গুনগুন করে গানও গাইছিল। সেতুকে দেখে থামল।
হাতের খামটা নাড়তে নাড়তে সেতু বলল, তুমি কি বেরুচ্ছ ভাবি?
শিলা হাসল। হ্যাঁ।
কোথায় যাচ্ছ?
মার্কেটে। ননদের বিয়ে, কত কেনাকাটা করতে হয়! এখন যাচ্ছি গয়না আনতে।
তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
বল।
ভাইয়াদেরকে জানিয়ে দাও, বিয়েটা হবে না।
কথাটা যেন বুঝতে পারল না শিলা। থতমত খেয়ে ড্রেসিংটেবিলের আয়না থেকে মুখ ফেরাল। কী?
গলা একটুও কাঁপল না সেতুর, একটুও নার্ভাস হল না সে, একেবারেই নির্বিকার গলায় বলল, আমার বিয়ে হয়ে গেছে। শুভ নামের একজনের সঙ্গে বহুদিনের এফেয়ার আমার। তাকে আমি বিয়ে করেছি। এই খামে আমাদের বিয়ের ছবি আছে।
খামটা শিলার হাতে দিয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে নিজের রুমের দিকে চলে গেল সেতু।
এদিকে শিলার তখন সেন্সলেস হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। খামটা ধরে মৃতের মতো দাঁড়িয়ে রইল সে। মার্কেটে যাওয়ার কথা ভুলে গেল, গহনার কথা ভুলে গেল। তারপর একসময় পাগলের মতো ছুটে এল রেখার রুমে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, শুনেছ, শুনেছ কী কাণ্ড হয়েছে?
সব শুনে ধপ করে নিজের বিছানায় বসে পড়ল রেখা। বল কী! সর্বনাশ হয়ে গেছে তো!
আমি কল্পনাই করতে পারিনি। ছবি না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। এই যে ছবি, তুমিও দেখ।
ছবি দেখতে দেখতে চোখ প্রায় ঠিকরে বেরুল রেখার। ও যে ভেতরে ভেতরে এমন, মুখ দেখে একদম বোঝা যায় না। কাল বিকেলে এই খামটা ওর হাতে আমি দেখেছি। বোধহয় তখন থেকেই এসব বলার প্রিপারেশান নিচ্ছিল। আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহারও করেছে।
রেখার কথা যেন শুনতেই পেল না শিলা। বলল, আমার যখন বিয়ে হয় তখন ওর দুআড়াই বছর বয়স। দুই ভাইয়ের সঙ্গেই বয়সের বিরাট ব্যবধান। যে বয়সে সন্তান হওয়ার কথা কল্পনা করে না লোকে সেই বয়সে কেমন করে যেন কনসিপ করেছিলেন। আমার শাশুড়ি। এই বাড়িতে এসে আমি যখন ওকে কোলে নিতাম কিংবা মামুন যখন কোলে নিত মনে হতো ও আমাদেরই সন্তান। কোথাও বেড়াতে গেলে ওকে আমরা সঙ্গে নিতাম না, কারণ কেউ বিশ্বাস করত না যে ও আমার ননদ। তারপর আমার চোখের সামনে বড় হল। প্রথমে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল ওকে। তিন বছর পড়ার পর শ্বশুর বললেন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লে যখন সেভেন এইটে উঠবে তখনই বখে যাবে মেয়ে। স্কুল বদলাও। আমি এবং মামুন অনেক বোঝালাম। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লে ছেলেমেয়েরা বখে যায় এসব কথা কে বলেছে! যারা বখার তারা যে কোনও পরিস্থিতিতেই বখতে পারে। তিনি কোনও কথাই শুনলেন না। স্কুল বদলে বাংলা মিডিয়ামে ভর্তি করা হল ওকে। দুটো বছর নষ্ট হল। বয়স অনুযায়ী ওর তো এখন অনার্স কমপ্লিট হওয়ার কথা।
