ছোটবোনের বিয়ের সময় এমনই লাগে। বিশেষ করে মা বাবা না থাকলে। আমার বিয়ের দিন দেখনি ভাইয়ারা কী রকম কান্নাকাটি করল!
বোন যখন বাড়ি থেকে চলে যায় তখন কান্না পাবেই। আমার তো এখনই পাচ্ছে।
রেখা আচমকা বলল, একটু কাঁদ না!
স্বপন অবাক হল। কী?
তোমাকে আমি কখনও কাঁদতে দেখিনি। নিজের স্বামীকে কাঁদতে দেখলে কেমন লাগে, এই অভিজ্ঞতাটা থাকা দরকার।
স্বপন হাসল। ফাজলামো করো না।
রেখাও হাসল। তোমার মন ভাল করার জন্য করলাম।
তা আমি বুঝেছি।
তবে অভিজ্ঞতাটা আমার সত্যি থাকা দরকার।
সেতুর বিয়ের দিন হয়ে যাবে।
স্বপন এবং রেখা যখন এসব কথা বলছে তখন বাবলুর রুমে এসে ঢুকেছে মুন্নি। সোফায় শুয়ে সকালবেলার কাগজ রাতেরবেলা পড়ছে বাবলু আর তার রুমের মেঝেতে বসে পাঁচ সাতটা পুতুল নিয়ে মগ্ন হয়ে খেলছে টুপলু।
বিন্দুমাত্র ভনিতা না করে মুন্নি বলল, গেটধরা বোঝ, ভাইয়া?
খবরের কাগজের আড়াল থেকে মুখ বের করল বাবলু। না তো! গেটরা কী?
বিয়ের দিন যখন বর আসে তখন বাড়ির ছেলেমেয়েরা গেট আগলে দাঁড়ায়। বরপক্ষ টাকা না দিলে ঢুকতে দেয়া হয় না, এটাকে বলে গেটধরা।
বুঝেছি, এখন যা, আমি খেলার খবর পড়ছি।
পুতুলকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে টুপলু বলল, আমিও ব্যস্ত। খেলছি।
কিন্তু মুন্নি দমল না। বলল, একেকজন দশহাজার টাকা করে পাব।
বাবলু উৎসাহি হল। কীভাবে?
ফুপির বিয়ের দিন আমরা তিনজনে মিলে গেট ধরব। পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইব। যা চাইব তাতো আর দেবে না, কমাবার চেষ্টা করবে। তবে তিরিশ হাজারের কমে কিছুতেই আমরা ছাড়ব না। ওই তিরিশ হাজার তিনজনে ভাগ করব। একেকজনের ভাগে দশহাজার করে।
ভেরিগুড। আমি আছি তোর সঙ্গে। গেট ধরব।
টুপলু বলল, আমিও ধরব কিন্তু টাকা নেব না। টাকা নিলে আম্মু আমাকে বকবে। আমার ভাগের টাকাটাও তোমরা দুজনে নিয়ে নিও।
মুন্নি খুশি হয়ে বলল, তাহলে আমাদের ভাগে পনের হাজার করে পড়বে।
.
তুই কি ঢাকায় নাকি?
নাহিদ বিষণ্ণ গলায় বলল, ছিলাম না, বর্ষাকে নিয়ে কাল এসেছি। বাবা মাও এসেছেন। আজ ওকে একজন ডাক্তার দেখাব তারপর কাল সবাই মিলে আবার ফিরে যাব।
কোথায় উঠেছিস তোরা?
মাঝারি ধরনের একটা হোটেলে।
শুভ অবাক হল। হোটেলে উঠেছিস কেন?
নাহিদ আবার বিষণ্ণ হল। তাহলে কোথায় উঠব! তুই তো জানিসই ঢাকায় আমাদের কোনও আত্মীয়স্বজন নেই।
আত্মীয়স্বজন না থাক, আমি তো আছি, আমাকে জানালি না কেন?
জানালে কী হত?
আমাদের বাড়িতে ওঠার ব্যবস্থা করতাম।
এতগুলো মানুষ নিয়ে একটা বাড়িতে এসে ওঠা যায় না।
বুক পকেট থেকে ছবির খাম বের করল নাহিদ। তোদের বিয়ের ছবিগুলো।
ছবির কথা শুনে যতটা আগ্রহি হওয়ার কথা শুভর তার কিছুই হল না। খামটা সে খুললও না। বিছানার ওপর ফেলে রেখে বলল, কোন হোটেলে উঠেছিস বল, আমি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা করে আসব।
দরকার নেই। আমরা কখন কোথায় থাকব বলতে পারছি না। তবে কিছুদিনের মধ্যেই আমি আবার ঢাকায় আসব। এসে তোর সঙ্গে দেখা করব।
নাহিদ চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে ছবিগুলো দেখল শুভ। প্রত্যেকটি ছবির দুটো করে প্রিন্ট। বেশ বুদ্ধি করেই দুসেট ছবি করিয়েছে নাহিদ। একটা সেট শুভর কাছে থাকবে আরেকটা সেতুর কাছে।
সেতুর সেটটা তো তাহলে আজই পৌঁছে দিতে হয়। এক্ষুণি যেতে হয় দোলনদের বাড়ি।
এই ভেবে তক্ষুনি বাড়ি থেকে বেরুল শুভ। দোলনদের বাড়ি পৌঁছবার আগে টকটকে লাল, তরতাজা কতগুলো গোলাপ কিনল। ফুলগুলো ব্যান্ড দিয়ে সুন্দর করে বেঁধে দিল দোকানের একজন কর্মচারি। ছবির সঙ্গে এই ফুল পেলে মুগ্ধ হয়ে যাবে সেতু। সেতুর মুগ্ধতার চে মূল্যবান আর কিছুই নেই শুভর কাছে।
কিন্তু ফুল দেখে দোলন একটু ভুল বুঝল। আমার জন্য ফুল এনেছেন?
শুভ হাসল। না।
তাই তো বলি, আপনার তো এত উদার হওয়ার কথা না।
বউর বান্ধবীর সঙ্গে উদার হওয়ার কোনও দরকার আমার নেই। আমি এলাম তোমাকে একটু জ্বালাতে।
ওসব বলে আর লাভ কী! দুজনে মিলে তো অনেকদিন ধরেই জ্বালাচ্ছেন।
এভাবে বললে সারাজীবন জ্বালাব।
না বললেও যে জ্বালাবেন, জানি। অসুবিধা নেই, কী করতে হবে বলুন।
এই খামে আমাদের বিয়ের ছবিগুলো আছে, ছবির সঙ্গে এই ফুল, এসব ওকে একটু পৌঁছে দেবে।
ছবির খাম এবং ফুল হাতে নিল দোলন। ঠিক আছে, এক্ষুনি যাচ্ছি। আর কিছু বলতে হবে?
হ্যাঁ।
কী?
বলবে, আমি ওকে খুব ভালবাসি।
দোলন মিষ্টি করে হাসল। আপনি খুব রোমান্টিক।
কিন্তু দোলনের হাতে ফুল দেখে সেতু খুব অবাক। চোখ ছানাবড়া করে বলল, তুই হঠাৎ ফুল নিয়ে!
দোলন উজ্জ্বল গলায় বলল, বান্ধবীর এনগেজম্যান্ট হচ্ছে, খালি হাতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসি কী করে?
সেতু গম্ভীর হল। আমি টেনশানে মরছি আর তুই ফাজলামো করছিস?
টেনশান করে লাভ নেই। আমি চলে যাওয়ার পর পরই বাড়িতে আজ জানিয়ে দিবি।
ফুলগুলো সেতুর হাতে দিয়ে ব্যাগ থেকে ছবির খামটা বের করল দোলন, সেতুর হাতে দিল। তোদের বিয়ের ছবি। কেউ যদি তোর কথা বিশ্বেস না করে তাহলে ছবি দেখিয়ে দিবি। ছবির সঙ্গে ফুলগুলোও তোর বর পাঠিয়েছে, বলেছে, সে তোকে খুব। ভালবাসে।
ভালবাসা শব্দটা শুনে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল সেতুর।
তারপরও ভাবীদের কাউকে বিয়ের কথাটা জানাতে পারল না সেতু। সারাটা দুপুর ছটফট করল। বিয়ের ছবিগুলো দেখতে দেখতে নানারকমভাবে ভাবল কেমন করে কথাটা ভাবীদেরকে বলা যায়। কোন ভাবিকে বলবে, শিলা না রেখাকে!
