কক্সবাজার।
হঠাৎ কক্সবাজার কেন?
হানিমুনে। আমরা নবদম্পতি, হানিমুনে যাব না?
ওরকম হানিমুন কি আমাদের কখনও হবে?
কেন হবে না?
যেভাবে বিয়ে হল, আমার ভাইরা এ বিয়ে মেনে নেবে কি না…
সেতুকে থামিয়ে দিল শুভ। থাক, এসব এখন আর বলো না, মন খারাপ হয়ে যাবে। তারচে’ অন্যকথা বল।
শুভর বুকে আঙুল বোলাতে বোলাতে সেতু বলল, আমার এক সময় স্বপ্ন ছিল আমি হানিমুনে যাব কাশ্মিরে। শ্রীনগরের ডাললেকে সিকারায় থাকব অনেকগুলো দিন।
সিকারা মানে?
এক ধরনের নৌকো। নবদম্পতি কিংবা প্রেমিক প্রেমিকারা থাকে।
শুভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাধ্য থাকলে এক্ষুণি তোমাকে আমি সেখানে নিয়ে যেতাম।
তারপর একেবারেই অন্যমানুষ হয়ে গেল শুভ। চটপটে গলায় বলল, চল, শ্রীনগরে নিয়ে যাই তোমাকে, এক্ষুণি নিয়ে যাই। ডাললেকের সিকারায় বসে একজন ধরে রাখি আরেকজনের হাত, একজন তাকিয়ে থাকি আরেকজনের চোখে মুখে কোনও কথা থাকবে না আমাদের, সব কথা হবে চুমোয় চুমোয়, নিঃশব্দে।
সেতু হাসল। কিন্তু তুমি আমাকে নেবে কীভাবে?
শুভ একমুহূর্তও দেরি করল না। বলল, কল্পনায়, কল্পনায় নিয়ে যাব। আমার বুকে মুখ রেখে চোখ বুজে তুমি কল্পনা কর, দেখবে দোলনদের ড্রয়িংরুমটাই ডালকের ভাসমান সিকারা হয়ে গেছে। ভালবাসা থাকলে সব হয়।
.
মামুন বাড়ি ফিরল সন্ধের পর।
অফিস থেকে ফিরে সে সাধারণত ড্রেসিংরুমে ঢোকে। বাইরের পোশাক বদলে বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে তারপর আসে বেডরুমে।
আজ ড্রেসিংরুমে ঢুকল না। বেডরুমে শিলা আছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে টাই আলগা করতে করতে বলল, এনগেজম্যান্টের অনুষ্ঠান শেরাটনে করব। স্বপনকে। পাঠিয়েছি বুকড করতে।
শিলা বলল, এটা কিন্তু একটা বাড়তি খরচ। এসব না করে একবারে বিয়ে দিলেই পারতে। সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠান করতে আর নয়ত সেনাকুঞ্জে।
খরচ নিয়ে তুমি ভাবছ কেন? আমাদের একমাত্র বোন।
একমাত্র বোন বলে অকারণে সব করতে হবে নাকি?
কোন ফাঁকে দক্ষিণের দেয়ালের সঙ্গে লাগানো সুন্দর এবং অতি আরামদায়ক চেয়ারটায় বসে পড়েছে মামুন। শিলার কথা শুনে একটু নড়েচড়ে উঠল। আক্রমণের গন্ধ পাচ্ছি। তুমি কি কোনও কারণে রেগে আছ? ঝগড়া লাগাবে নাকি?
শিলা কঠিন গলায় বলল, যদি লাগাই?
না না, লাগিয়ো না। আমি আগেই সারেন্ডার করছি। আমি তোমাকে খুবই ভয় পাই। সেদিনের পর থেকে মারাত্মক রকমের সাবধানতা অবলম্বন করে আছি, যাতে কোনওভাবেই বিগড়ে যাওয়ার চান্স না পাও তুমি। ইয়ে, গহনা বানাবে বলেছিলে, কালই যাও, অর্ডার দিয়ে এস।
অর্ডার দেয়া হয়ে গেছে। দুএকদিনের মধ্যেই নিয়ে আসব। টাকাটা দিয়ে দিও।
কত, কত টাকা? ক্যাশ না চেক?
বিলটা আমার কাছে আছে। একলাখ বাহাত্তোর হাজার। তবে ক্যাশ টাকা নিয়ে আমি মুভ করব না। চারদিকে যা ছিনতাই ফিনতাই হচ্ছে!
খুবই সরল মুখ করে মামুন বলল, ফিনতাইটা কী?
মামুনের মুখভঙ্গি দেখে হেসে ফেলল শিলা। ফাজলামো করো না।
মামুন বিগলিত হল। করার আর দরকার হবে না। এই যে তুমি একবার হাসলে, মামার কাজ শেষ। শোন, আমাদের প্রপার্টির এক অংশ সেতুরও। সব মিলে দুআড়াই কোটি টাকা সে পাবে। দরকার হলে ওর টাকা থেকে ওর বিয়ের খরচা করব।
গ্রীবা বাঁকিয়ে মামুনের দিকে তাকাল শিলা। কথাটা কি তুমি আমাকে খুশি করার জন্য বললে?
মামুন বিব্রত হল। না, তা কেন বলব!
ভাবতে পার, আমি তোমার স্ত্রী, বোনের বিয়েতে তোমার টাকা থেকে বিশাল একটা এমাউন্ট খরচা হয়ে যাবে ভেবে রেগে আছি আমি কিংবা রেগে যেতে পারি এজন্য আমাকে ম্যানেজ করছ এ ধরনের কথা বলে! যদি এরকম ভেবে থাক, ভাবনাটা তোমার ঠিক না। এভারেজ বাঙালি বউদের মতো লোভি মহিলা আমি নই। যা বললে তা কক্ষনো করবে না। তোমাদের কি কোনও অভাব আছে নাকি যে সেতুর প্রাপ্য থেকে ওর বিয়ের খরচা করবে? তোমাদের দুভাইয়ের দায়িত্ব হচ্ছে ছোটবোনকে ভাল পাত্রে বিয়ে দেয়া। বাপ না থাকলে বড়ভাই বাবার মতো। মেয়ে বিয়ে দিয়ে বাবা কখনও বলে না যে তোর প্রাপ্য থেকে তোকে বিয়ে দিলাম।
শিলার কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল মামুন। চেয়ার ছেড়ে উঠে এল সে, শিলার সামনে দাঁড়াল। খুব ভাল লাগল তোমার কথা শুনে। তুমি যাতে এই কথাগুলোই বল, শোনার জন্য চালাকি করে সেতুর প্রাপ্য টাকার প্রসঙ্গটা তুলোম। সত্যিকার অর্থে কখনও আমি তা করব না। স্বপনকেও করতে দেব না। আমাদের টাকায়ই বিয়ে দেব সেতুকে। তারপর ও যখন ওর প্রাপ্য চাইবে হিসেব করে পাই টু পাই ওরটা ওকে দিয়ে দেব।
তারপর স্ত্রীর কাঁধে হাত দিল মামুন। তুমি একটু নিচু হও।
শিলা অবাক হল। কেন?
দেখছ না সঙ্গে জলচৌকিটা নেই।
স্বামীর হাত সরিয়ে ছিটকে গেল শিলা। এই, খবরদার! ফাজলামো করো না।
মামুন হো হো করে হাসতে লাগল।
.
রেখা টিভি দেখছে।
বেডরুমে ঢুকে রেখার দিকে না তাকিয়ে টিভির দিকে তাকাল স্বপন। টিভিটা অফ
রিমোট টিপে টিভি অফ করল রেখা। ভাইয়া কী বললেন?
খুশি হলেন। চট করে শেরাটন ম্যানেজ করে ফেলব, ভাবেননি।
মন খারাপ করা ভঙ্গিতে বিছানায় শুয়ে পড়ল স্বপন।
ব্যাপারটা খেয়াল করে রেখা বলল, তোমাকে কী রকম যেন দেখাচ্ছে। মন খারাপ?
স্বপন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেতুর এনগেজম্যান্টের দিন ঘনিয়ে আসছে আর মন খারাপ হচ্ছে আমার।
