তাই নাকি! হঠাৎ এমন সুমতি?
সুমতি না অন্যকিছু সেটাই ভাবছি।
অন্যকিছু মানে?
এই মানেটাই বের করতে চাইছি। আচ্ছা, শুভর কি কোনও মেয়ের সঙ্গে ভাবটাব আছে? ব্যাপারটা এমন নয়তো যে সেই মেয়েটি বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে, কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করতে হবে এজন্য চাকরি বাকরি দরকার।
ভেতরে ভেতরে ব্ৰিত হল সুরমা কিন্তু শাহিনকে বুঝতে দিল না কিছুই। মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে নির্বিকার গলায় বলল, আমি কী করে বলব?
তোমার কাছে সে কিছু লুকায় না।
কিন্তু এসব কখনও বলেনি।
জানার একটু চেষ্টা করো তো?
পরদিন সকালেই জানার চেষ্টাটা করল সুরমা।
এককাপ চা হাতে শুভর রুমে এসে ঢুকল সে। শুভ বেরুচ্ছিল সেতুর সঙ্গে দেখা করতে। সুরমাকে দেখে নয়, তার হাতে চায়ের কাপ দেখে উৎফুল্ল হল। কাপটা নিয়ে ফুরুক করে চুমুক দিয়ে বলল, তোমার নামের মধ্যে ‘মা’ শব্দটা আছে, সুরমা, তোমাকে আমার মা বলেই ডাকা উচিত। তুমি আমার জন্য যা কর, যেভাবে ফিল কর আমাকে, মা ছাড়া এভাবে কেউ কাউকে ফিল করে না।
মুখের সুন্দর একটা ভঙ্গি করে সুরমা বলল, হঠাৎ এমন আল্লাদের কারণ কী? মানে এত আল্লাদী কথা কেন বলছিস?
এই যে তুমি আমার জন্য চা নিয়ে এলে এজন্য। তুমি ছাড়া কারোরই বোঝার কথা নয় যে এই মুহূর্তে আমার এককাপ চায়ের দরকার।
সেতুর বোঝার কথা।
শুভ একটু থতমত খেল। হ্যাঁ সেও হয়তো বুঝবে।
তারপর উদাস হল।
ব্যাপারটা খেয়াল করে সুরমা বলল, সেতুর কথা বলতেই যেন চিন্তিত হয়ে গেলি?
নিজেকে সামলাল শুভ। না মানে, ভাবী, আমি আসলে ভেতরে ভেতরে খুবই অস্থির হয়ে আছি। এমন একটা ব্যাপার, কাউকে কিছু বলতেও পারছি না। কিন্তু ব্যাপারটা। কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত।
কী হয়েছে?
তোমাকে আগেই বলা উচিত ছিল। কেন যে বলা হয়নি!
এত ভনিতা করছিস কেন? বলতে হলে এখনও বলা যায়।
চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলের ওপর রাখল শুভ। মাথা নিচু করে বলল, সেতুর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল সুরমা। কী?
আমাদের কোনও উপায় ছিল না।
দুহাতে সুরমার একটা হাত ধরল শুভ। তোমাকে না বললে অন্যায় হতো। ভাবী, আপাতত তুমি ছাড়া কথাটা যেন আর কেউ না জানে!
শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় সুরমা বলল, এটা কি ঠিক হল?
আমি এভাবে চাইনি। সেতুর কারণে বাধ্য হয়েছি।
কিন্তু সামলাবি কীভাবে?
জানি না। তবে তিনটি ভরসা আছে আমার। তুমি নাহিদ আর সেতু।
.
সব শুনে সেতু বলল, তুমি অন্তত একজনকে বলে ফেলেছ, আমি তো পারছি না।
অবাক হয়ে সেতুর মুখের দিকে তাকাল শুভ। এখনও কাউকে বলনি?
না। ভয় করছে, খুব ভয় করছে। বলার সঙ্গে সঙ্গে যে কী হবে বাড়িতে কিছুই বুঝতে পারছি না। ভাই ভাবীরা কে কীভাবে রিয়্যাক্ট করবে, তাদের রিয়্যাকসানে আমি কী করব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।
কিন্তু জানানো দরকার। এনগেজম্যান্টের ডেট এসে গেল, এখনও যদি না জানাও পরে কিন্তু অন্য ধরনের কেলেংকারি হয়ে যাবে।
আর একটা ব্যাপারেও খুব ভয় পাচ্ছি।
কী?
জানাজানি হওয়ার পর যদি বাড়ি থেকে বেরুনো বন্ধ হয়ে যায়, মানে বাড়ি থেকে যদি আমাকে আর বেরুতে না দেয়, তোমার সঙ্গে যদি দেখা করতে না পারি!
হ্যাঁ, এমনও হতে পারে। তবে এখন যে কোনও পরিস্থিতি ফেস করার জন্য রেডি থাকতে হবে।
কিন্তু আমার খুব ভয় করছে।
সেতুকে বুকের কাছে টেনে আনল শুভ। ভয় পাবে না, একদম ভয় পাবে না। আমি আছি। এখন তুমি আমার বউ, বিয়ে করা বউ। আমি বেঁচে থাকতে আমার কাছ থেকে কেউ তোমাকে সরিয়ে রাখতে পারবে না। তোমার জন্য পৃথিবীর যে কোনও দেয়াল আমি ভেঙে ফেলব।
শুভর গলার কাছে আদুরে ভঙ্গিতে মুখ ঘষে সেতু বলল, তুমি এভাবে বললে খুব ভাল লাগে আমার, খুব সাহস পাই আমি।
শুভ কোনও কথা বলল না। আনমনা হয়ে গেল।
শুভর বুক থেকে মুখ তুলে সেতু বলল, কী হয়েছে? আমার সামনে বসে কার কথা ভাবছ তুমি?
শুভ ম্লান হাসল। তোমার কথা।
আমার কথা ভাববে যখন আমি তোমার সামনে না থাকব তখন, যখন সামনে থাকব তখন তুমি শুধু আমাকে দেখবে, আমার সঙ্গে কথা বলবে আর আমাকে আদর করবে।
সেতুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল শুভ। আসলে আমার মনটা খারাপ।
কেন গো?
তোমার জন্য।
কী করেছি আমি?
আমাকে বিয়ে করে খুব বড় ভুল করেছ। আমি এক হতদরিদ্র যুবক, সুখ শান্তি প্রাচুর্য কিছুই তোমাকে আমি দিতে পারব না।
শুভর একগালে হাত বুলিয়ে দিল সেতু আর একগালে চুমু খেল। কীসে আমার সুখ, কীসে আমার শান্তি তা তুমি জান না। কোনও প্রাচুর্য তোমার কাছে আমি চাই না, আমি শুধু একটা জিনিস চাই তোমার কাছে, বল, সারাজীবন ধরে সেই জিনিসটা আমাকে তুমি দেবে?
সাধ্য থাকলে অবশ্যই দেব।
সাধ্য তোমার আছে।
তাহলে বল, বল কী চাও তুমি?
ভালবাসা চাই, সারাজীবন ধরে আমি শুধু তোমার ভালবাসা চাই।
সেতুকে আরও নিবিড় করে আঁকড়ে ধরল শুভ। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ভালবাসা ছাড়া তোমাকে দেয়ার মতো আর কিছু নেই আমার। সারাজীবন ধরে আমার সবটুকু ভালবাসা আমি শুধু তোমাকেই দেব।
তারপর একটু থেমে বলল, এই, তুমি আমার সঙ্গে একটা জায়গায় যাবে?
সেতু ঘোরলাগা গলায় বলল, তোমার সঙ্গে যে কোনও জায়গায় যেতে রাজি আমি, এমনকি দোযখেও।
দোযখে তোমাকে আমি নেব কেন?
তাহলে কোথায় নেবে?
