বললেন এখন।
ডাইনিং টেবিলে অনেকগুলো প্লেট গ্লাস, কাপ পিরিচ পেয়ালা জগ। মালা নিজ হাতে গরম পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়েছে। এখন মা মেয়ে দুজনে মিলে সেগুলো গুছিয়ে রাখছে। কাজটা করতে করতে থমথমে গলায় মা বললেন, তোর শ্বশুর বাড়ির লোকজনের এভাবে আসার দরকারটা কী?
শ্বশুরবাড়ি শব্দটা শুনলেই লাজুক একটা ভঙ্গি করে মালা। সেই ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বলল, আমাকে নাকি অনেকদিন দেখে না। বলল, দেখতে আসবে।
শুনে মা বেশ রাগলেন। এতই যখন আল্লাদ, তোকে তাদের বাড়িতে নিয়ে রাখে না কেন? ছেলে বিদেশে আছে তো কী হয়েছে?
মালা গাল ফুলাল। সব সময় এমন করে বলো না মা, ভাল লাগে না।
উচিত কথা কারওই ভাল লাগে না। এতগুলো মানুষ আসবে তাদের পেছনে একটা খরচা আছে না! টাকাটা আসে কোত্থেকে?
যত খরচ হয়, হিসেব করে টাকাটা আমার কাছ থেকে নিয়ে নিও।
চুপ কর, বড় কথা বলবি না।
এ সময় শুভ এসে বাড়ি ঢুকল। কোথায় ছিল কে জানে। মুখটা বিষণ্ণ হয়ে আছে, চোখে উদাসীনতা। কোনওদিকে না তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়িয়েছে, মা শুভর দিকে তাকালেন। আজ আর বাড়ি থেকে বেরুবি না। গেস্ট আসবে।
চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল শুভ। কোনও কথা বলল না, নিজের রুমের দিকে চলে গেল। শুভর এই আচরণে মা যেন খুবই বিরক্ত হলেন। নিজেকে নিজে বলার মতো করে বললেন, পাগলা গারদের মধ্যে আছি। একেকটা হয়েছে একেক রকম।
.
অফিস থেকে সরাসরি বাড়ির কিচেনে আজকের আগে কখনও আসেনি শাহিন।
সুরমা ব্যস্ত রান্নাবান্না নিয়ে। গরমে ঘামে একসা অবস্থা তার। বোধহয় এই কারণেই স্বামীর এভাবে রান্নাঘরে আসাটা খুব একটা গুরুত্ব দিল না সে।
কিন্তু স্ত্রীর কাহিল অবস্থাটা গুরুত্ব দিল শাহিন। চিন্তিত গলায় বলল, রান্নাবান্না করতে পারে এমন একটা কাজের বুয়া রাখা দরকার।
কথাটা শুনে সুরমা যেন অবাক হল। কেন, বুয়া তো আছেই।
শাহিনও অবাক হল। কোথায় বুয়া?
এই যে!
নিজেকে দেখাল সুরমা।
শাহিন লজ্জা পেল। এভাবে বলল না। আমাকে কষ্ট দিয়ে কী লাভ? সংসারে একেকজন মানুষ একেকরকম হয়। আমার মা একটু অন্যরকম, একটু মেজাজি…!
শাহিনের কথা শেষ হওয়ার আগেই হাসল সুরমা। এত কাতর হওয়ার কিছু নেই। আমি এভাবেই বলেছি। তুমি এখান থেকে যাও। মা দেখলে বিপদ হবে।
কীসের বিপদ?
বলবেন, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এসে, কিচেনে দাঁড়িয়ে বউর সঙ্গে গল্প করছে।
কিন্তু আমি তো এসেছি মালার শ্বশুরবাড়ি থেকে গেস্ট আসবে বলে! রান্নাবান্না কী হচ্ছে সেসবের খোঁজখবর নিচ্ছি। ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি।
কিচেন থেকে বেরিয়ে শুভর রুমে এল শাহিন। কী করছিস?
সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুয়েছিল শুভ। শাহিনকে দেখে ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে বসল। ভাইয়া, তুমি আমার রুমে?
শাহিন হাসল। এমনভাবে বললি, যেন জীবনে কোনওদিন তোর রুমে আসিনি?
তবে এসে খুব ভাল করেছ। তোমার সঙ্গে জরুরী আলাপ আছে।
শুভর পড়ার চেয়ারটায় বসল শাহিন। আমাকে দেখে আলাপের কথা মনে হল?
আরে না! অনেকদিন ধরেই ভাবছি আলাপটা করব।
করিসনি কেন?
সময় পাইনি।
শাহিন ঠাট্টার সুরে বলল, হ্যাঁ তুই তো খুবই ব্যস্ত। আপন বড়ভাই জ্বরে বেহুশ হয়ে থাকে, এক বাড়িতে থেকেও তুই তাকে দেখতে যাওয়ার সময় পাস না।
শুভ লজ্জা পেল। এটা সত্যি আমার খুব অন্যায় হয়েছে।
তারপর বিছানায় বসেই ডানদিককার কান শাহিনের দিকে এগিয়ে দিল। তুমি আমার কানটা মুচড়ে দাও ভাইয়া।
শুভর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিল শাহিন। আরে যাহ পাগলা!
তারপর বলল, কিন্তু কী নিয়ে ব্যস্ত তুই?
ব্যস্ত মানে নানা রকমের ঝামেলা যাচ্ছে আর কী! যেটা তোমার সঙ্গে আলাপ করতে চাইলাম ভাইয়া, আমাকে একটা চাকরি বাকরির ব্যবস্থা করে দাও। চাকরির খুব দরকার।
তীক্ষ্ণচোখে শুভর মুখের দিকে তাকাল শাহিন। তোর তো এখনও রেজাল্ট বেরয়নি, এখুনি কীসের চাকরি!
একপলক শাহিনের দিকে তাকিয়ে কথা ঘোরাল শুভ। বেকার ছেলে মা একদম দেখতে পারে না। প্রায়ই কথা শোনায়। তাছাড়া নিজের একটা হাত খরচের ব্যাপার। আছে। তোমাদের কাছ থেকে কত নেব?
শাহিন উদাস গলায় বলল, ঠিক আছে, দেখি।
এই বিষয়টা রাতেরবেলা সুরমাকে বলল শাহিন।
মালার শ্বশুরবাড়ির লোকজন চলে যাওয়ার পর, সবকিছু গোছগাছ করে, রাত এগারোটার দিকে নিজের রুমের ড্রেসিংটেবিলে বসেছে সুরমা। ঘুমোবার আগে অনেকক্ষণ ধরে মাথা আঁচড়াবার অভ্যেস তার। এখন সেই কাজটা করছে। বিছানায়। আধশোয়া হয়েছিল শাহিন। শুভর কথা মাত্র বলতে যাবে তার আগেই সুরমা বলল, মালার শ্বশুরবাড়ির লোকজনগুলো যেন কেমন?
শুনে শুভর প্রসঙ্গ ভুলে গেল শাহিন। মানে?
আমাদের বাড়িতে এসে মালাকে নিয়ে আদিখ্যেতার সীমা পরিসীমা নেই, কিন্তু একবারও বলল না তুমি গিয়ে আমাদের বাড়িতে কদিন থেকে এসো। ছেলে বিদেশে থাকলে ছেলের বউকে বাড়িতে নিয়ে রাখে না লোকে, নাকি সবসময় বাপের বাড়িতেই ফেলে রাখে!
এসব নিয়ে ভেব না। মালার শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের ব্যাপারে আমার তেমন কোনও আগ্রহ নেই। ওর বরটা ভাল তাতেই আমি খুশি।
তারপর শুভর কথা মনে পড়ল শাহিনের। বিছানায় উঠে বসল সে। শোন, অন্য একটা বিষয়ে কথা বলি। শুভর ব্যাপারটা কী?
সুরমা চমকাল। কেন, কী হয়েছে?
খুবই চিন্তিত মনে হল। চাকরি বাকরি করতে চাইছে।
