অন্যদিকে মুখ ঘোরাল শুভ। এখনও পাচ্ছে।
আবার শুভর কাঁধে হাত দিল নাহিদ। এত ইমোশনাল হওয়ার কিছু নেই। চল।
মাকে ভাবীকে একটু সালাম করে আসব? এতবড় একটা কাজ করতে যাচ্ছি!
না যাওয়াই ভাল। ঝামেলা হতে পারে। পাঞ্জাবি টাঞ্জাবি পরে হঠাৎ করে মুরব্বিদেরকে সালাম করছিস, খালাম্মা নানা রকমের প্রশ্ন করতে পারেন।
ঠিকই বলেছিস। চল।
.
শুভর বুকে, গলার কাছে হাত বুলাতে বুলাতে সেতু বলল, কাজি অফিসে নাহিদ ভাই যখন তোমার আমার ছবি তুলছিল, আমার যে কী ভাল লাগছিল!
শুভ কথা বলল না।
বিয়ে শেষ করে খানিক আগে দোলনদের বাড়িতে ফিরেছে ওরা। কাজি অফিস থেকে বেরিয়েই চলে গিয়েছিল নাহিদ। উত্তরায় কী যেন কাজ আছে। নতুন বউ নিয়ে তারপর স্কুটারে চড়ে দোলনদের বাড়ি এসেছে শুভ। সঙ্গে অবশ্য দোলনও ছিল। বাড়ি এসেই দোলন চলে গেছে তার রুমে। সেতু শুভকে রেখে গেছে ড্রয়িংরুমে। সেই রুমের লম্বা সোফায় সেতুর কোলে মাথা দিয়ে এখন শুয়ে আছে শুভ।
কিন্তু আনমনা হয়ে আছে কেন? সেতু কথা বলল সে কোনও সাড়াই দিল না।
সেতু বলল, কী ভাবছ তুমি?
শুভ বলল, কিছু না।
তাহলে আনমনা হয়ে আছ কেন?
এভাবে বিয়ে করে ফেললাম, কেমন যেন লাগছে।
কথাটা শুনে মন খারাপ হলো সেতুর। তুমি শুধু তোমার দিকটা ভাবছ!
না শুধু আমার দিকটা ভাবব কেন? তোমার দিকটাও ভাবছি।
কথা বলতে বলতে উঠে বসল শুভ। আমি জানি আমার চে তোমার সমস্যা হবে অনেক বেশি, অনেক কিছু ফেস করতে হবে তোমাকে।
তারপরও সামলানো যে কী কঠিন হবে, আমি ছাড়া কেউ তা বুঝতে পারবে না।
তোমার ভাইরা খুব দুঃখ পাবেন। আমার মা ভাই এবং বোনটিও দুঃখ পাবে। খুশি হবেন শুধু ভাবী।
সেতুর একটা হাত ধরল শুভ। আমাদের ফ্যামিলির দুঃখ পাওয়ার কারণ কিন্তু তুমি না। তোমাকে সবাই খুব পছন্দ করবে, গোপনে বিয়ে করাটা পছন্দ করবে না।
সেতু ম্লান হাসল। তা কেউ করেও না। ছেলেমেয়ে কিংবা ভাইবোনের সুন্দর, স্বাভাবিক বিয়েই পছন্দ করে সবাই।
এজন্য প্রেম করাটাই ঠিক না। আর করলেও দুপক্ষ যাতে মেনে নেয় সেভাবে করা উচিত।
একথায় বিরক্ত হল সেতু। তোমার এই ধরনের কথা শুনলে আমার খুব রাগ হয়। এতকিছু ভেবে প্রেম করতে পারে কেউ? নাকি সব বুঝে শুনে অংক কষে প্রেম করে লোকে!
তারপর উদাস এবং দুঃখি হল। জানি সামনে অনেক সমস্যা, এই সুন্দর সময়টা সেই সমস্যার কথা ভেবে নষ্ট করছি আমরা। অথচ বিয়ের দিনটা সবচে আনন্দের দিন প্রেমিক প্রেমিকার।
কথা বলতে বলতে গলা ধরে এল সেতুর। চোখ ভরে এল জলে। মনে হয় তোমার জন্য অনেক কাঁদতে হবে আমাকে।
সঙ্গে সঙ্গে শুভ কী রকম বদলে গেল। গভীর মমতায় দুহাতে তুলে ধরল সেতুর মুখখানি। এভাবে বলো না। আমি তোমাকে কখনও কাঁদতে দেব না, কখনও দুঃখ দেব না। তুমি যা বলবে তাই শুনব। তোমার জন্য দরকার হলে জীবন দিয়ে দেব।
চোখ মুছে সেতু বলল, না তা তুমি করবে না। যাকে পাওয়ার জন্য সমগ্র পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি আমি, বেঁচে থাকতে তাকে আমি কখনও হারাব না।
সেতুর কথা শুনে এত ভাল লাগল শুভর, পাগলের মতো কাছে টানল সেতুকে, দুহাতে চেপে ধরল বুকে।
শুভর বুকে মুখ রেখে খানিক স্থির হয়ে রইল সেতু। তারপর মুখ তুলে শুভর গলার কাছে চুমু খেতে খেতে বলল, আদর কর, আমাকে তুমি খুব আদর কর। যত পার আদর আমাকে তুমি কর।
.
আজ সকাল থেকে মালা খুব ব্যস্ত।
সে একটু আয়েশি ধরনের মেয়ে। স্বামীকে চিঠি লেখা এবং স্বামীর ফোন পেলে পাগলের মতো ছুটে গিয়ে ফোন ধরা ছাড়া অন্য যে কোনও কাজে অপরিসীম আলস্য তার।
আজ সেই আলস্য একদমই দেখা যাচ্ছে না।
সাড়ে আটটা নটার আগে মালা কখনও ঘুম থেকে ওঠে না। আজ উঠেছে পৌনে সাতটার দিকে। উঠেই ছুটোছুটি শুরু করেছে।
এই বাড়িতে সবার আগে ঘুম ভাঙে মায়ের। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে। ঘুম ভাঙার পর এক মিনিটও বিছানায় থাকেন না তিনি। উঠে অজু করে নামাজ পড়েন। তারপর সংসারের কাজ শুরু করেন। শরীরে আলস্য বলে কিছুই যেন নেই তাঁর। তাঁকে কেউ কখনও বসে থাকতে দেখে না। সারাক্ষণই এটা করছেন, ওটা করছেন। মায়ের জন্য বাধা কাজের বুয়া রাখা যায় না বাড়িতে। একজন ছুটা বুয়া আছে। সকালবেলা এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে সে। তারপর চলে যায়। মধ্যবয়সী বুয়াটির কাজ হচ্ছে সব রকমের ধোয়া মোছা এবং মশলা বাটা। মেশিনে গুঁড়ো করা মশলা একেবারেই পছন্দ করেন না মা। গুড়ো মশলায় রান্না করা তরকারি মুখে দিতে পারেন না।
আর বুয়াদের হাতের রান্না?
প্রশ্নই ওঠে না। মরে গেলেও ওসব রান্না মুখে দেবেন না তিনি।
সারাক্ষণ কাজের মধ্যে আছেন বলেই বোধহয় এখনও ভাল আছেন তিনি। শরীরে মেদ জমেনি, অসুখ বিসুখে ধরেনি। বয়স হল চৌষট্টি, পয়ষট্টি। এগারো বছর আগে বিধবা হয়েছেন, তবু যেন কোনও রকমের মালিন্য স্পর্শ করেনি তাঁকে। গায়ের রং টকটকে ফর্সা, তীক্ষ্ণ নাক, বয়সের তুলনায় সামান্যই পেকেছে চুল, চোখে চশমা আছে কিন্তু বয়সের তুলনায় পাওয়ার তেমন নয় চশমার। মুখটা রাগি ধরনের, এই রাগি মুখ নিয়ে এখনও বেশ সুন্দর তিনি। কম বয়সে তিনি যে বেশ রূপবতি ছিলেন বোঝা যায়।
আজ অত সকালে মালাকে উঠতে দেখে, ব্যস্ত হতে দেখে যা বোঝার বুঝে গেছেন তিনি কিন্তু ওই নিয়ে কোনও কথা বলেননি।
