প্ল্যান শুনে দোলন বলেছিল, বাসররাতটা দিনের বেলাতেই আমাদের বাড়িতে করে ফেলতে পারিস তোরা। বুয়াদের ম্যানেজ করে আমার রুম তোদেরকে ছেড়ে দেব।
শুনে লজ্জায় মরে গিয়েছিল সেতু। যাহ।
কেন, অসুবিধা কী?
ওসব এখন না। সব ঠিকঠাক হওয়ার পর আবার যখন আমাদের বিয়ে হবে, মানে আয়োজন করে যখন বিয়ে হবে তখন।
তাহলে আজ আর আমাদের বাড়িতে আসার দরকার কী?
তোদের বাড়িতে এসে, সাজগোজ বদলে স্বাভাবিক হয়ে তারপর বাড়ি ফিরব যাতে ঘুণাক্ষরেও কেউ টের না পায়।
বুঝলাম, এ কাজের জন্য শুভ ভাইকে সঙ্গে আনার দরকার কী?
বাহ বিয়ের পর ওকে একটু একা পেতে ইচ্ছে করবে না আমার! ওর সঙ্গে কথা, বলতে ইচ্ছে করবে না!
সবই যখন ইচ্ছে করবে তখন আর ওইটুকু বাদ রাখছিস কেন?
না বাবা, প্রথম দিনেই যদি কনসিপ করি।
তাহলে তো আরও সুবিধা। ঝামেলা লাগলে বাড়িতে বলবি, আমি প্রগন্যান্ট। দেখবি সঙ্গে সঙ্গে সবাই মেনে নিয়েছে।
ব্যাগ গুছিয়ে রুম থেকে বেরুবার সময় এসব কথা মনে পড়ল সেতুর। আজ যদি সত্যি সত্যি ওসব হয়? সত্যি যদি সে কনসিপ করে!
শরীরের ভেতর তারপর আশ্চর্য এক অনুভূতি হল সেতুর। শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। একেবারেই নতুন ধরনের এক লজ্জায় রাঙা হল মুখ।
এই আবেশের মধ্যে ছিল বলেই বোধহয় শিলাকে দেখতে পায়নি সেতু। বেরুতে গিয়ে আচমকা দেখতে পেল তার রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে শিলা।
সেতু একটু থতমত খেল। ভাবী, তুমি এ সময় আমার রুমে?
শিলা সরল গলায় বলল, খুবই অবাক হলে মনে হয়?
না মানে আমি বেরুচ্ছি তো?
তাতে কী হয়েছে? বেরুবার সময় তোমার রুমে আমি আসতে পারি না?
তা পারবে না কেন?
তাহলে অমন থতমত খেলে কেন?
শিলা একটু থামল। সেতুর হাতের ব্যাগ দেখে কী রকম সন্দেহ হল তার। কোথায় যাচ্ছ?
সেতু একটু ভড়কাল, কিন্তু শিলাকে তা বুঝতে দিল না। চটপটে গলায় বলল, ইয়ে মানে দোলনদের বাড়ি। দোলন ফোন করেছিল।
ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছ কেন? ব্যাগে কী?
তেমন কিছু না। দুএকটা ড্রেস নিয়ে যাচ্ছি। সারাদিন থাকব তো? এক ড্রেসে থাকতে ভাল লাগবে না। আমাদের আরও দুতিনজন বান্ধবী আসবে। সবাই মিলে হৈ চৈ করব, আড্ডা দেব। পিকনিক মতো হবে, ছবি তোলা হবে।
এখন এসব করা ঠিক না।
কেন? অসুবিধা কী?
তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। কদিন পর এনগেজমেন্ট। মেয়েরা এ সময় ঘরে থাকে। সৌন্দর্যচর্চা করে। হৈ চৈ চিৎকার চেঁচামেচি এ সময় করা ঠিক না। ওসব করলে শরীর চেহারা নষ্ট হয়।
শুনে গম্ভীর হলো সেতু। তার মানে এখন থেকেই আমার ভাললাগা ব্যাপারগুলো তোমরা শেষ করে দিচ্ছ! স্বাধীনতা বলতে কিছুই আমার থাকছে না।
সেতুর কথায় শিলা যেন একটু বিরক্ত হল। এভাবে বলো না। কোনও ব্যাপারেই তোমাকে আমরা কখনও বাধা দিইনি। তুমি যখন যা চেয়েছ, যেভাবে চেয়েছ সেভাবেই সব হয়েছে। তোমার মতো স্বাধীনতা খুব কম মেয়ের ভাগ্যেই জোটে। বিয়ে ঠিক না হলে আজকের এই কথাগুলো তোমাকে বলার কোনও দরকার আমার হতো না।
শিলা যেন ক্ষুণ্ণ হয়েই চলে গেল।
৪. সুন্দর একটা পাঞ্জাবি
সুন্দর একটা পাঞ্জাবি পরেছে শুভ।
ঘি রংয়ের চমৎকার কাজ করা। সকালবেলা সেভ করে, গোসল করেছে, চুলে শ্যাম্পু করেছে। ফ্যানের হাওয়ায় সেই চুল এখন ফুরফুর করে উড়ছে। বেশ পুরুষালি একটা পারফিউমের গন্ধ আসছে শরীর থেকে। সব মিলিয়ে বেশ ভাল লাগছে শুভকে। কিন্তু চোখেমুখে গোপন একটা উৎকণ্ঠা যেন ছায়া ফেলেছে।
নাহিদ আছে সঙ্গে। ক্যামেরায় রিল ভরছিল। শুভ হঠাৎ করে বলল, কত টাকা লাগতে পারে?
বন্ধুর দিকে তাকাল না নাহিদ। নিজের কাজ করতে করতে বলল, কোন ব্যাপারে কত টাকা লাগার কথা বলছিস?
গলা নিচু করে শুভ বলল, তুই বুঝতে পারিসনি? বিয়ে করতে কত টাকা লাগবে?
রিল ভরা শেষ করে শুভর দিকে তাকাল নাহিদ। কী করে বলব? এই ধরনের বিয়েতে আমি কখনও এটেন্ড করিনি।
আমিও তো করিনি।
কিন্তু খোঁজখবর নেয়া উচিত ছিল।
তা কিছুটা নিয়েছি। বেশি টাকার কাবিন হলে নাকি ফি বেড়ে যায়। ভাবছি খুব কম টাকার কাবিন করব। আজকাল নাকি মাত্র এক টাকার কাবিন করে কেউ কেউ।
যার যা ইচ্ছে করুক। তুই এখন এসব নিয়ে ভাবছিস কেন? বুঝতে পারিসনি কেন ভাবছি?
না।
টাকা পয়সা তেমন নেই আমার কাছে। তিনচার জায়গা থেকে অতিকষ্টে হাজার পাঁচেক টাকা জোগাড় করেছি। পুরোটাই ধার। এতে না হলে মার্ডার হয়ে যাব। সেতুর সামনে প্রেস্টিজ থাকবে না।
নাহিদ যেন একটু বিরক্ত হল। ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে বলল, এভাবে টাকা পয়সা ধার করতে যাওয়া ঠিক হয়নি।
শুভ অসহায় গলায় বলল, তাহলে কীভাবে করব? সেতুকে বলব বিয়ের টাকা নিয়ে এস, আমার কাছে টাকা নেই।
না তা আমি বলিনি। তুই আসলে ভুলে গেছিস যে আমি তোর সঙ্গে আছি।
শুভর কাঁধে হাত দিল নাহিদ। আমি সঙ্গে থাকলে কোনও ব্যাপারেই তুই কখনও ভাববি না। আমার কাছে টাকা আছে, টাকা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
এ কথায় গভীর আবেগে বুক ভরে গেল শুভর। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। তুই যখন এভাবে কথা বলিস, ক্রাইসিসের সময় আমার পাশে দাঁড়াস, ভরসা দিস, আমি ঠিক বুঝতে পারি না তখন আমার কী করা উচিত! কী বলা উচিত তোকে!
নাহিদ মৃদু হাসল। কিছু বলার দরকার নেই।
আসলে আমি কিছু বলতে পারি না। আমার শুধু কান্না পায়।
