শিলা জবাব দেয়ার আগে রেখা বলল, না মানে ওর মতামত!
মামুন গম্ভীর গলায় বলল, ওর আবার মতামত কী? আমরা সবাই যেখানে রাজি সেখানে ওর অমত হবে কেন?
শিলা বলল, আমার মনে হয় অমত ওর নেই। লেখাপড়া শেষ হয়নি এসব নিয়ে একটু গাইগুই করছিল।
বাড়ির অন্যান্যদের সামনে মামুন অত্যন্ত গম্ভীর এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। একান্তে স্ত্রীর সঙ্গে যে তার ওরকম মজার সম্পর্ক এই মামুনকে দেখে কেউ তা কল্পনাও করতে পারবে না।
এখন শিলার কথা শুনে সে বলল, বিয়ের কথা শুনলে সব মেয়েই অমন করে। ওসব ভেবে লাভ নেই। স্বপন, দিনদশেকের মধ্যে এনগেজমেন্টের ডেট কর। এনগেজমেন্টের দিন বিয়ের ডেট হবে। তবে মাসখানেকের মধ্যেই বিয়ে।
স্বপন গভীর উৎসাহে বলল, ঠিক আছে।
.
মানুষ যদি সত্যি সত্যি কখনও হাতে চাঁদ পায় যে রকম খুশি হবে নাহিদকে দেখে ঠিক সেরকম খুশি হল শুভ।
কপালে হাত দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে শুয়েছিল সে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। একদম টাইমলি এসে পড়েছিস দোস্ত। তোকে এমন ফিল করছিলাম। তোর মতো বন্ধু তো আর কেউ নেই, কার সঙ্গে পরামর্শ করে ডিসিসান নেব বুঝতে পারছিলাম না।
নাহিদ কোনও কথা বলল না। নির্জীব ভঙ্গিতে বিছানার এককোণে বসল। বসে উদাস হয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল।
নাহিদ অত্যন্ত প্রিয়দর্শন যুবক। খুব বেশি লম্বা কিংবা স্বাস্থ্যবান নয়। মাঝারি ধরনের হাইট। শরীরটা রোগার দিকে। গায়ের রং শবরি কলার মতো। গোঁফ দাড়ি ওঠার পর কখনও সেভ করেনি। ফলে মুখময় ঘন কালো দাড়ি গোঁফ। খাড়া নাকের ওপর গোল কাঁচের ছোট্ট ধরনের চশমা। চশমার ভেতর উজ্জ্বল দুটো চোখ সারাক্ষণ যেন হাসছে। মুখের দাড়ি গোঁফের মতো মাথার চুলও খুব ঘন নাহিদের। স্টাইলটা অনিল কাপুরের মতো। মুখে মিষ্টি একখানা হাসি সব সময় লেগে থাকে।
এই ধরনের মানুষকে কেউ পছন্দ না করে পারে না। এই ধরনের মানুষের কোনও শত্রু থাকে না।
পোশাক আশাকে নাহিদ একেবারেই কেয়ারলেস টাইপের। সব সময় জিনস পরে। জিনসের প্যান্ট, শার্ট। কখনও কখনও টিশার্ট। পায়ে বুট। কিন্তু একই পোশাকে নাহিদ হয়তো বেশ কয়েকদিন থাকে। এসব নাহিদকে খুব মানায়। অন্যদের চে আলাদা করে রাখে। এবং নাহিদ অত্যন্ত নিম্নকণ্ঠের মানুষ। ধীর শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলে। কথা বলার সময় হাসিটা ঠোঁটে লেগেই থাকে। উচ্চারণ চমৎকার। আশ্চর্য রকমের এক রোমান্টিক ভঙ্গি আছে কথা বলার।
কিন্তু কী হয়েছে নাহিদের? এতদিন পর প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে এমন উদাস হয়ে আছে কেন? কথা বলছে না কেন?
এগিয়ে এসে নাহিদের কাঁধে হাত দিল শুভ। নাহিদ, কী হয়েছে?
তারপরই নাহিদের কান্নাটা দেখতে পেল। নিঃশব্দে কাঁদছে সে। চশমার ফাঁক দিয়ে নেমেছে অশ্রুধারা।
শুভ একেবারেই দিশেহারা হয়ে গেল। তুই কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে? বাদলের শরীর কেমন?
একহাতে চোখ মুছল নাহিদ। বাদল মারা গেছে।
কী?
চব্বিশ তারিখে। বিকেল চারটা দশ।
কী বলছিস তুই?
নাহিদ মাথা নাড়ল। বাদল মারা গেছে এখন বর্ষাও মরতে বসেছে। যমজ ভাই বোনের একজন মারা গেল আরেকজন একেবারেই শেষ হয়ে যায়। সবমিলে আমাদের খুব দুঃসময় যাচ্ছে। এসব কারণেই তোকে কিছু জানাতে পারিনি।
বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস পড়ল শুভর। ভাঙাচোরা গলায় বলল, তোকে দেখে এত ভাল লাগল, মনে হচ্ছিল গভীর অন্ধকারে ডুবে আছি, তুই এসে আলোটা জ্বেলে দিলি। কিন্তু…।
শুভ মাথা নিচু করল। এই ধরনের খবর শোনার পর কেমন করে তোকে আমি আমার সমস্যার কথা বলি! কিন্তু তোকে না বলেও আমার উপায় নেই।
চশমা খুলে ভাল করে চোখ মুছল নাহিদ।
শুভ বলল, বাদলের অসুখের কথা জানতাম। ওর মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে বুক ফেটে যাবে আমার। সবকথা বলতে তোরও খুব কষ্ট হবে। ওসব এখন আমি জানতে চাইব না। খুবই স্বার্থপরের মতো আমার কথাগুলো তোকে বলব।
শার্টের খুটে চশমা মুছে পরল নাহিদ। শুভর দিকে তাকাল। সেতুকে নিয়ে কোনও সমস্যা হয়েছে?
হ্যাঁ। বড় রকমের সমস্যা।
কী হয়েছে আমাকে বল।
শুভ আবার মাথা নিচু করল। দুএকদিনের মধ্যে বিয়ে করতে হবে।
একথা শুনে যতটা চমকাবার কথা নাহিদের ততটা চমকাল না সে। অবশ্য তার। স্বভাবই এমন, উত্তেজিত হয় কম। হলেও এমনভাবে চেপে রাখে, কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
তবে শুভর কথা শুনে অপলক চোখে কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল নাহিদ। তারপর কিছুই জানতে না চেয়ে বলল, কর। আমি আছি।
এই অবস্থায়ও বন্ধুর পাশে এভাবে দাঁড়াতে পারে মানুষ!
নাহিদের কথা ভেবে আশ্চর্য রকমের এক অনুভূতি হল শুভর। বুকটা তোলপাড় করতে লাগল। দুহাতে নাহিদের একটা হাত ধরল সে। মাথা নিচু করে বলল, আমার খুব কান্না পাচ্ছে দোস্ত, খুব কান্না পাচ্ছে।
কথা বলতে বলতে গলা জড়িয়ে এল শুভর। নিজের অজান্তে চোখ ভেসে গেল।
.
সেতুর বিছানার ওপর মাঝারি সাইজের সুন্দর একটা ব্যাগ।
সেই ব্যাগে বেগুনি রংয়ের একটা কাতান শাড়ি নিয়েছে সেতু, ছায়া ব্লাউজ নিয়েছে। সামান্য কিছু কসমেটিক, সামান্য কিছু গহনা নিয়েছে। শুভর খুব পছন্দ এমন। একটা পারফিউম নিয়েছে। এসব নিয়ে এখন দোলনদের বাড়ি যাবে সে। সেখান থেকে বউ সেজে যাবে শাহিনবাগ কাজি অফিসে। শুভ আর তার বন্ধু নাহিদ আগে থেকেই
অপেক্ষা করবে। সেতু এবং দোলন গিয়ে পৌঁছুবার পর বিয়ে। শুভর পক্ষ থেকে স্বাক্ষী। হবে নাহিদ, সেতুর পক্ষ থেকে দোলন। বিয়ে শেষ হওয়ার পর আবার দোলনদের বাড়ি যাবে সেতু। এবার সঙ্গে থাকবে শুভ।
