আমি জোর করে খেতে পারি না। বমি আসে।
কাত হয়ে শুয়ে পড়ল শাহিন। জ্বরটা ছেড়ে গেছে, কিন্তু শরীর খুব দুর্বল।
সুরমা বলল, দুচার দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে।
যত তাড়াতাড়ি ঠিক হয় ততো ভাল। বাড়ি বসে থাকতে বোর লাগছে। মনে হচ্ছে। বহুদিন অফিস করি না।
এ সময় টেলিফোন বাজল। শাহিন বলল, যাও টেলিফোন ধর।
স্যুপের পেয়ালা চামচ হাতে বেরিয়ে গেল সুরমা।
কিন্তু সুরমার আগেই মা এসে ফোন ধরলেন। হ্যালো, হ্যালো। কে?
ওপাশ থেকে কেউ কথা বলল না। খুট করে লাইন কেটে দিল। বিরক্ত হয়ে ফোন নামিয়ে রাখলেন মা। সুরমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভুতুড়ে টেলিফোন। কথা বলে না। নাকি আমার গলা শুনেই রেখে দেয় কে জানে!
এ কথায় মুখ নিচু করে হাসল সুরমা। হাসিটা মা দেখে ফেললেন। রুক্ষ্ম গলায় বললেন, হাসছ কেন?
সুরমা বিব্রত হল। না হাসছি নাতো!
তারপর ম্যানেজ করার চেষ্টা করল। এরকম টেলিফোন অনেক সময় আসে। আমি ধরলেও কথা বলে না।
এ সময় আবার বাজল টেলিফোন।
মা ভ্রু কুঁচকে বললেন, তুমি ধর। দেখ কথা বলে কিনা।
সুরমা ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে ভীতু ভীতু গলায় সেতু বলল, হ্যালো! কে ভাবী?
ব্যাপারটা বুঝে গেল সুরমা। আড়চোখে একবার মায়ের দিকে তাকাল সে। তারপর চটপটে গলায় বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ বল। চিনেছি, চিনেছি।
কিছুক্ষণ আগে আমিই ফোন করেছিরাম। ভয়ে ছেড়ে দিয়েছি। ভাবী, ওকে একটু দেয়া যাবে?
বাড়ি নেই তো!
এলে যেন দোলনদের বাড়িতে একটু ফোন করে। খুব জরুরি।
আচ্ছা।
টেলিফোন নামিয়ে রাখল সুরমা।
মা তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়েছিলেন সুরমার দিকে। সন্দেহের গলায় বললেন, কে ফোন করল?
নির্জলা মিথ্যে বলল সুরমা। ইয়ে, শুভর এক বন্ধু।
কী নাম?
নাহিদ, নাহিদ।
ওকি আমাকে চেনে না? আমার সঙ্গে কথা বলতে কী অসুবিধা ছিল?
না না অসুবিধা ছিল না। বলল লাইনটা কেটে গিয়েছিল। গ্রাম থেকে ফোন করেছে।
মায়ের সামনে থাকলে আরও মিথ্যে বলতে হবে, কোন কথা বলতে গিয়ে ধরা পড়ে যাবে, এসব ভেবে যতদূর সম্ভব দ্রুত কিচেনের দিকে চলে গেল সুরমা।
.
শিলা বলল, সেতু যে ভঙ্গিতে এসে আমার সামনে দাঁড়াল, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
রেখা হাসল। আমাকে গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করল, আমিও ভয় পেয়েছিলাম।
ওরা দুজন কথা বলছিল রেখার রুমের সামনের বারান্দায় বসে। এখানটায় তিনটে সুন্দর বেতের চেয়ার রাখা আছে। ছোট্ট একটা টেবিল রাখা আছে। বিকেল কিংবা গভীর রাতে রেখা এবং স্বপন কখনও কখনও এখানটায় বসে টুকটাক গল্প করে। সকালবেলা এখানে বসে কখনও কখনও খবরের কাগজও পড়ে স্বপন।
এখন বসে আছে শিলা এবং রেখা। সেতুকে নিয়ে কথা বলছে তারা।
শিলা বলল, সেতুর কথা শুনে তোমার সন্দেহ হয়নি? আমার কিন্তু হয়েছে।
রেখা চোখ তুলে তাকাল। কী সন্দেহ?
ওর বোধহয় কোথাও প্রেম ট্রেম আছে। এত বড় ঘরের, এত সুন্দর মেয়ে, এরকম মেয়ের প্রেম থাকতেই পারে।
এরকম কেন, প্রেম যে কোনও মেয়েরই থাকতে পারে।
তবে সুন্দরি মেয়েগুলোর বেশি থাকে।
তা থাকে। প্রথমে আমিও ভেবেছিলাম যে সেতুর ওসব আছে। পরে আর ভাবিনি।
কেন?
প্রেম থাকলে আমরা নিশ্চয়ই টের পেতাম।
ও না বললে কী করে পেতাম?
মুখের দিকে তাকালেই ধরা যায়। কোথায় যেন পড়েছিলাম, প্রেম এবং ক্যান্সার নাকি চেপে রাখা যায় না।
কিছুদিন হয়তো যায়। শেষ পর্যন্ত সব একদিন বেরিয়ে পড়ে। গর্তে লুকানো সাপের মতো। সাপের গর্তে গরম পানি ঢেলে দিলে সাপটা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসে।
রেখা আর কোনও কথা বলল না। সাপের কথা শুনে গাটা কেমন কাঁটা দিল।
.
সুরমা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল।
পৌনে বারোটা। এতরাত হল এখনও ফিরছে না কেন শুভ? কোথায় গেল? সে না আসা পর্যন্ত ঘুমোতে যেতে পারছে না সুরমা। কিন্তু খুব ঘুম পাচ্ছে তার। আঠার মতো জড়িয়ে আসছে চোখ। ডাইনিংটেবিলে বসে প্রায়ই ঢলে পড়ছে।
একবার ইচ্ছে হল যখন ইচ্ছে ফিরুক শুভ, তার কী! সে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।
তারপরই মনে হলো, না তাহলে খুবই বিপদে পড়বে শুভ। চোরের মতো এসে দরজায় টুকটুক করবে, ঘুমিয়ে পড়া মানুষজন অতকম শব্দ শুনতে পাবে না। তখন বাধ্য হয়ে কলিংবেল বাজাবে। সেই শব্দে নিশ্চয় জেগে উঠবেন মা। তারপর ধুন্দমার কাণ্ড বেঁধে যাবে। খেতে তো শুভ পাবেই না, গালাগাল খেয়ে মরে যাবে। সুরমা থাকতে ওরকম বিপদে শুভ কী করে পড়ে! তাছাড়া সেতুর টেলিফোনের কথাও তো বলতে হবে!
এসব ভেবে ডাইনিংটেবিল ছাড়ল না সুরমা। বসে ঢুলতে লাগল।
বারোটা বিশে টুকটুক করে শব্দ হলো দরজায়। ধরফর করে উঠল সুরমা। প্রথমে সাবধানী চোখে চারদিক তাকাল তারপর প্রায় নিঃশব্দে দরজা খুলল। ভুবন ভোলানো হাসিমুখে, পা টিপে টিপে শুভ ঢুকল। মা নিশ্চয় গভীর ঘুমে! এজন্য কলিংবেল বাজাইনি। জানি তুমি জেগে আছ।
শুভকে দেখেই কেমন যেন রেগে গেল সুরমা। থমথমে গলায় বলল, কটা বাজে?
হাসিমুখে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল শুভ। বারোটা তেইশ।
তা আমিও জানি। ছিলি কোথায়?
বেড়াতে গিয়েছিলাম।
কোথায়?
বিক্রমপুরের মাওয়াঘাটে। ভাবি, কী বলব তোমাকে, পদ্মার তীরটা একদম সীবিচের মতো। একদম কক্সবাজার। গেলে প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। আসতেই ইচ্ছে করে না।
তাহলে এলি কেন?
শুধু তোমার টানে। আর…!
আমার জন্যে কতটা টান তা আমি বুঝি। আর একজন যার কথা বলতে চাইলি সে আজ ফোন করেছিল।
