তোমাকে চাই, আমি তোমাকে চাই
রাত ভোর হলে আমি তোমাকে চাই
সুমন চট্টোপাধ্যায়ের এইগান শোনার সময় এতটাই মগ্ন থাকে সেতু, এতটাই ডুবে থাকে শুভর চিন্তায়, চোখ খোলা রেখেও কোনও কিছুই দেখতে পায় না।
টুপলুকেও দেখতে পেল না।
টুপলু এসে যে তার রুমে ঢুকেছে, বিছানার অদূরে দাঁড়িয়ে আছে, দেখেও দেখতে পেল না সেতু।
ব্যাপারটা টুপলু বুঝল কিনা কে জানে, খানিক অপেক্ষা করে নিজেই মিউজিক সিস্টেমটা অফ করে দিল।
এবার সেতু একেবারে ছটফট করে উঠল। যেন হঠাৎ করে বিষপিঁপড়ে কামড় দিয়েছে। চোখ পাকিয়ে টুপলুর দিকে তাকাল সে। অফ করলি কেন?
টুপলু নির্বিকার গলায় বলল, তোমাকে একটা কথা বলব।
সব কিছুতে পাকামো।
না পাকামো না তো। শোন, খুব মজার কথা।
না আমি শুনব না। আমি কিছুতেই তোর কথা শুনব না।
রাগ করছ কেন?
তুই যা এখান থেকে।
তবু দমল না টুপলু। বলল, বাবা বলেছে কথাটা যেন আমি কাউকে না বলি।
এবার আরও রাগল সেতু। মানা করে থাকলে সে কথা বলতে এসেছিস কেন?
বারে, তোমার বিয়ের কথা তোমাকে বলব না!
শুনে বুকটা ধ্বক করে উঠল সেতুর। মুহূর্তের জন্য দমটা যেন বন্ধ হয়ে গেল। মুখটা গেল ফ্যাকাশে হয়ে। সে একটা ঢোক গিলল। কী, আমার বিয়ে?
হ্যাঁ, তোমার বিয়ে।
কার সঙ্গে? কবে?
ওসব আমি জানি না। মা জানে।
দিশেহারা ভঙ্গিতে বিছানা থেকে নামল সেতু। সাদার ওপর নীল বুটিদার সালোয়ার কামিজ পরা। ওড়নাটা এলোমেলো হয়েছিল। ওড়না ঠিক করার কথা মনেই হল না, সোজা ছুটে এল রেখার রুমে।
বিছানার চাঁদর, বালিশের ওয়্যার সব নামিয়ে মেঝেতে রাখছিল রেখা, সেতুকে দেখে হাসল। সেতু কথা বলবার আগেই বলল, নিশ্চয় আমাদের কূটনিটা তোমাকে সব বলেছে।
সেতু উত্তেজিত গলায় বলল, যেই বলুক, কথাটা ঠিক কিনা।
একদম ঠিক। আজ এনগেজমেন্টের ডেট হবে।
কী বলছ?
হ্যাঁ। আমরা ডিসাইড করেছিলাম সব ঠিক হওয়ার পর তোমাকে জানাব। তোমাকে সারপ্রাইজ দেব। কিন্তু কূটনিটার জন্য পারা গেল না। তোমার ভাই খুব একসাইটেড ছিলেন, এজন্য ওর সামনে বলে ফেলেছে। আমি তখনই বুঝেছিলাম সারপ্রাইজটা মাঠে মারা গেল। তবে তোমার ভাগ্য বলতে হবে, পাত্র সত্যি সত্যি রাজপুত্র।
ফ্যাল ফ্যাল করে রেখার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল সেতু। তারপর কোনও কথা না বলে শিলার রুমে এসে ঢুকল।
বিছানায় শুয়ে মাত্র টিভি অন করবে শিলা, সেতুকে দেখে করল না। বিছানায় উঠে বসল। স্বামীর সঙ্গে মধুর ঝগড়ার পর বিপুল পরিমাণে গহনার প্রতিশ্রুতি, মনটা খুবই প্রফুল্ল হয়ে আছে তার। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে আছে মুখ। সেই উজ্জ্বল মুখে বলল, কিছু বলবে?
সেতু কোনও ভনিতা করল না। থমথমে গলায় বলল, বলা কি উচিত নয়?
শিলা একটু অবাক হল। মানে?
আমাকে জিজ্ঞেস না করেই আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছ?
স্বামীর সঙ্গের শিলা আর এখনকার শিলা মুহূর্তে দুজন হয়ে গেল। বেশ রাশভারি এবং ব্যক্তিত্বের ভঙ্গিতে প্রথমে সে সেতুর চোখের দিকে তাকাল। তারপর বলল, আমাদের দেশের গার্জিয়ানরা মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, মতামত নিয়ে তার বিয়ে ঠিক করে না। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর মেয়েরা জেনে যায়।
এসব পুরনো দিনের নিয়ম, এসব আজকাল চলে না। আজকাল আগেই মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে হয়।
তোমার কথার অর্থ আমি বুঝেছি। তোমাকে কি জিজ্ঞেস করতে হবে?
শিলার কথা বলার ভঙ্গিতে নিজের কথার খেই হারিয়ে ফেলল সেতু। নার্ভাস হয়ে গেল। না মানে…
শিলা তার ব্যক্তিত্ব বজায় রাখল। জিজ্ঞেস করতে হলে বল তোমার ভাইদেরকে বলি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে। আর নয়তো তাদের পক্ষ হয়ে আমি এবং রেখা তোমাকে জিজ্ঞেস করি।
সেতু খুবই অসহায় বোধ করল। কাতর গলায় বলল, আমার এখনও পড়াশুনো শেষ হয়নি আর তোমরা আমার বিয়ে নিয়ে পাগল হয়ে গেলে?
একথায় শিলা কেমন হাঁপ ছাড়ল। ওই এই কথা! আমি ভেবেছিলাম কী না কী!
তারপর একটু থেমে বলল, ইচ্ছে থাকলে বিয়ের পরও পড়াশুনা শেষ করা যায়। অনেক মেয়েই করে। আমার বড়বোন তো দুটো বাচ্চা হয়ে যাওয়ার পর শেষ করল। এখন একটা কলেজের টিচার। তুমি কোনও চিন্তা করো না। আনিসকে আমরা বলব, সে তোমার পড়াশুনোর ব্যবস্থা করবে।
আনিস নামটা যেন শুনতেই পেল না সেতু। মনে মনে শুভকে ডাকতে লাগল সে। শুভ শুভ শুভ। আমি এখন কী করব তুমি বলে দাও।
.
পাঁচদিনের জ্বরে শাহিন বেশ কাবু হয়েছে।
চেহারা একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে গেছে তার। শেভ না করার ফলে মুখময় গজিয়ে উঠেছে দাড়ি গোফ। দাড়ি গোঁফ যে ফাঁকে ফাঁকে এত পেকেছে সুরমা কিংবা অন্য কেউ। তো দূরের কথা শাহিন নিজেও তা জানত না। এবারের জ্বরে জানতে পারল।
।কিন্তু স্বামীর এই মুখের দিকে কিছুতেই তাকাতে পারছে না সুরমা। তাকালেই মনে হচ্ছে এই মুখটা তার স্বামীর নয়। অন্য কারও।
এই যে এখন পেয়ালায় করে স্বামীকে সে মুরগির স্যুপ খাওয়াচ্ছে, খাওয়াচ্ছে মুখের দিকে তাকিয়েই তবুও যেন মুখটা সে দেখছে না।
শাহিন এসব খেয়াল করছিল না। জ্বরে মুখের ভেতরটা একেবারে সেদ্ধ হয়ে আছে। কিছুই খেতে ভাল লাগে না। কোনও রকমে স্যুপ কিছুটা খেয়েছে কিন্তু শেষ করতে পারছে না।
এক সময় সুরমার হাত ঠেলে দিয়ে বলল, আর খেতে পারছি না। ভাল লাগছে না।
সুরমা বলল, জ্বরের মুখে খেতে ভাল লাগে না। জোর করে খেতে হয়।
