স্ত্রীকে কাঁদতে দেখে খুবই মায়া হল মামুনের, আবার ভালও লাগল। যাক বাড়িতে যেহেতু আছে ম্যানেজ করা যাবেই। দরকার হলে দুহাতে যে-কোনও একটা পা চেপে ধরবে। ছাদে তো আর কেউ নেই। কেউ তো দেখছে না। আড়ালে আপন স্ত্রীর পা ধরতে অসুবিধা কী?
পা ধরার প্রস্তুতি নিয়েই শিলার সামনে এসে দাঁড়াল মামুন। প্রথমেই সাস্টাঙ্গে প্রণাম করার মতো করে স্ত্রীর পায়ে কি পড়া যায়! যায় না, ক্ষেত্র তৈরি করতে হয়। সেই ক্ষেত্র তৈরির জন্য আচমকা বলল, তুমি দেখি আজকাল ঠাট্টাও বোঝ না। আমি তোমার সঙ্গে ঠাট্টা করেছি, ঠাট্টা। পিওর ফান। আরে তোমাদের ফ্যামিলির কোনও তুলনা হয় নাকি! কতবড় ফ্যামিলি, কত নামডাক! টাকা পয়সার কোনও অভাব নেই। তোমাদের ফ্যামিলির সামনে রেখাদের ফ্যামিলি কোনও ফ্যামিলিই না। এমন কি আমাদের ফ্যামিলিও কোনও ফ্যামিলি না। তোমার বাবা যে তোমাকে আমার কাছে বিয়ে দিয়েছেন এ আমাদের চৌদ্দগোষ্ঠীর ভাগ্য আর আমার সৌভাগ্য।
চোখের চে নাকের জল বেশি ঝরছিল শিলার। ফোঁস করে নাক টানল সে। ভাঙাচোরা তেজাল গলায় বলল, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো না। একদম কথা বলো না।
শুধুমাত্র এইটুকু কথায় মামুন বুঝে গেল পাটা শিলার ধরতে হবে না। সে এসে সামনে দাঁড়াবার পরই বরফ গলতে শুরু করেছে।
হে হে করে কোন একখানা হাসি হাসল মামুন। যাহ্, তা হয় নাকি, বল! তোমার সঙ্গে কথা না বলে আমি পারি? আপন বউর প্রশংসা আমি না করে পারি না। তুমি কত ভাল, কত সুন্দর। কোথায় তুমি আর কোথায় রেখা! একুশ বছর হল তোমার বিয়ে হয়েছে, ছেলে আইএ পড়ে, বোঝাই যায় না। এখনও আনমেরেড মনে হয় তোমাকে। ইচ্ছে করলে আনমেরেড মানে আগে একটাও বিয়ে করেনি এমন ছেলের কাছে ইজিলি তোমাকে বিয়ে দেয়া যায়।
চোখ পাকিয়ে স্বামীর দিকে তাকাল শিলা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, চুপ করলে!
কিন্তু চুপ মামুন করল না। আগের মতোই হে হে করা ভঙ্গিতে বলল, তোমার সামনে চুপ করে থাকতে আমি পারি না। গলার ভেতরটা চুলকায়, হিন্দিতে যাকে বলে খুজলি, খুজলি হতে থাকে, কথা না বললে খুজলিটা কমে না। বাংলায় কিন্তু খুজলি বলতে খোসপাঁচড়াও বোঝায়। সেই জিনিসটার সঙ্গেও চুলকানোর খুব মিল। ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে অর্থটা একই। এবং বিক্রমপুরের ভাষার সঙ্গে হিন্দিভাষার খুব মিল। বিক্রমপুরে কাককে বলে কাউয়া, হিন্দিতেও কাককে বলে কাউয়া। স্যাটেলাইটে ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলো দেখে শিখেছি। ঝুট বলে কাউয়া কাটে’ নামে একটা সিনেমাও হয়েছে। কাহিনীটা লিখেছেন বিমল কর। এই লেখকের কয়েকটা বই আমি এক সময় পড়েছি। একটা বইয়ের নাম ছিল ‘বালিকা বধূ’। নায়িকার নাম চিনি। খুবই সুইট মেয়ে। একদম। তোমার মতো। তুমি হচ্ছো আমার চিনি। এখনও বালিকা বধূ। কথায় কথায় অভিমান, কথায় কথায় কান্না।
তারপরই থাবা দিয়ে শিলার একটা হাত ধরল মামুন। চল, ওঠো। তোমাকে ম্যানেজ না করে বাড়ি থেকে বেরুতে পারছি না। ম্যানেজ করার জন্য যা মুখে আসে বলে গেলাম। কাউয়া থেকে চিনি পর্যন্ত। প্রসঙ্গের সঙ্গে মিলল কি মিলল না বুঝতে পারলাম না।
এত আবোল তাবোল বকে যাওয়ার পরও কিন্তু ঝটকা মেরে মামুনের হাতটা ছাড়িয়ে দিল না শিলা। নাক চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। আদুরে অভিমানি শিশুর গলায় বলল, ছোটভাইর বউর কাছে নিজের বউকে কেউ ছোট করে?
মামুন সঙ্গে সঙ্গে বলল, না না করে না, করে না। যে করে সে একটা মূর্খ, মূর্তিমান অশিক্ষা। লক্ষ্মীসোনা, এসব তুমি মনে রেখ না। বল মনে রাখবে না! বল।
আচ্ছা মনে রাখব না। তবে একটা শর্ত আছে।
কী শর্ত?
এই অবস্থায়ও অতি রোমান্টিক চোখে স্বামীর চোখের দিকে তাকাল শিলা। আধো আধো বোল সখা টাইপের গলায় বলল, তুমি বোঝনি?
শুনে ভেতরে ভেতরে খবর হয়ে গেল মামুনের। তবু মুখের হাসিটা বজায় রাখল সে। হে হে বুঝেছি, বুঝেছি। এতদিনকার স্ত্রীর এসব ইঙ্গিত কেউ না বোঝে নাকি! আরে ওটা কোনও ব্যাপারই না।
তাহলে আজই গিয়ে অর্ডার দিয়ে আসি।
নিশ্চয়, নিশ্চয়।
কিন্তু এবার আর মুখে হাসি ফুটল না মামুনের। হাসতে চেষ্টা করল, পারল না। কোনও রকমে বলল, কত ভরি?
শিলা অতি উৎসাহে বলল, দাঁড়াও হিসাব দিচ্ছি। বারোটা চুড়ি বারো ভরি, একটা সীতা হাড় পাঁচভরি, দুল তিন ভরি…
দুলটা একটু কমাও। না না টাকার জন্য না। দেড়ভরি ওজনের দুল তোমার কান বইতে পারবে না। কান ছিঁড়ে যাবে। তোমার কানের লতি অনেক নরম। আমি বহুদিন টিপে দেখেছি।
ঠিক আছে তাহলে দুটো দুল দুই ভরিতে করব। একটা টিকলি করব একটু বেশি সোনার। আর দুটো আংটি। সব মিলে পঁচিশ ভরির বেশি না।
মামুন গোপনে একটা ঢোক গিলল।
স্বামীর সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক বলেই কিনা কে জানে ঢোকের শব্দটা যেন টের পেল শিলা। আড়চোখে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, বেশি হয়ে গেলে থাক।
শিলার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই তারপর অন্য মানুষ হয়ে গেল মামুন। স্বাভাবিক মানুষ। বলল, তোমাকে স্বাভাবিক করার জন্য অনেক ফাজলামো করলাম। এখন আমি সিরিয়াস। আমার একমাত্র বোনের বিয়ে। না চাইলেও তোমাকে একসেট গহনা আমি দেব। শাড়ি, কসমেটিকস যা লাগে কিনবে। এগুলো কোনও ব্যাপারই না। চল নীচে চল।
যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে মামুনের পিছু পিছু নিচে চলে এল শিলা।
