এখন এসে আর রুমে ঢোকেনি। দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে।
নীল রংয়ের সুন্দর শাড়ি পরেছে সেতু। গায়ের রং সামান্য হলদে হয়ে আসা মাখনের মতো বলে যে কোনও রংয়েই তাকে খুব মানায়। নীল শাড়িতেও মানিয়েছে। সাজগোজ শেষ করে এখন ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে নিজেকে দেখেছেন। এই অবস্থায় আয়নার ভেতর মুন্নিকে দেখতে পেল সে। কিন্তু পেছন ফিরে তাকাল না। বলল, কী?
মুন্নি হাসল। কিছু না।
কিছু না মানে?
.
ডাইনিংস্পেসের সামনে রানিকে পেল মামুন।
একগাদা জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে যাচ্ছে। উৎকণ্ঠিত মুখে তার সামনে এসে দাঁড়াল সে। কিন্তু বাড়ির এতদিনকার পুরনো ঝিয়ের নামটা কিছুতেই মনে করতে পারল না। এবং মেয়েটি তাকে কী বলে ডাকে, তাও না।
তবে রানির নামটা মামুন জিজ্ঞেস করল না, করল অন্যকথা। এই, তুই যেন আমাকে কী বলে ডাকিস?
আচমকা এরকম প্রশ্নে রানি প্রথমে একটু ভড়কাল তারপর ফিক করে হাসল। খালু, খালু বলে ডাকি। কখনও কখনও খালুজানও বলি।
অত আল্লাদের দরকার নেই। তোর খালা কোথায় দেখেছিস?
না।
কেন দেখিসনি? ছিলি কোথায়?
মামুনের চড়া গলা শুনে ভড়কাল রানি। নির্দ্বিধায় একটা মিথ্যে কথা বলল। আমি বাথরুমে ছিলাম।
বাথরুম শব্দটা শুনে মামুন একেবারে খেঁকিয়ে উঠল। এত বাথরুম কীসের? সারাক্ষণ কী করিস বাথরুমে?
তারপর হন হন করে মুন্নির রুমের দিকে চলে গেল। সেদিকে তাকিয়ে যেন বেয়াইয়ের সঙ্গে মসকরা করছে এমন ভঙ্গিতে রানি বলল, বাথরুমে আর কী করুম? ঘুমাই, খালুজান।
মামুন ততোক্ষণে মুন্নির রুমে গিয়ে ঢুকেছে।
মেঝেতে বসে ছবি আঁকছে মুন্নি। চারদিকে রং তুলি কাগজ ইত্যাদি ছড়ানো। মামুন এসব ভ্রুক্ষেপ করল না। বলল, মুন্নি, তোর মাকে দেখেছিস?
বাবার দিকে তাকাল না মুন্নি। নদীতে পালতোলা নৌকো এঁকেছে সে। মাঝি হাল ধরে বসে আছে। মাঝির মাথায় মাথলা। মাথলাটা পুরো আঁকা হয়নি। সামান্য বাকি আছে। সেটুকু আঁকতে আঁকতে বলল, না।
শুনে তেড়িয়া হয়ে উঠল মামুন। কেন দেখিসনি?
বাবার এরকম গলা আশাই করেনি মুন্নি। মাঝির মাথার মাথলা আঁকতে ভুলে গেল। চিন্তিত চোখে বাবার দিকে তাকাল। তুমি কি আম্মুর সঙ্গে ঝগড়া করেছ?
সঙ্গে সঙ্গে বাজখাই গলায় মেয়েকে ধমক দিল মামুন। চোপ।
তারপর এসে ঢুকল বাবলুর রুমে।
স্বামীর সঙ্গে রাগ করে ছেলের রুমে এসে বসে নেই তো শিলা! থাকতে পারে। তার পক্ষে এখন সবই সম্ভব।
কিন্তু না, এই রুমে সে নেই। বাবলু আপন মনে কম্পিউটার গেম খেলছে।
একবার কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে খুবই খেচড়া মেজাজে মামুন বলল, শিলার সঙ্গে, মানে তোর মা’র সঙ্গে তোর কখন দেখা হয়েছে?
বিরক্ত হয়ে বাবার দিকে তাকাল বাবলু। কী? মানে লাস্ট কখন দেখা হয়েছে? তোমার কথার কিছুই আমি বুঝতে পারছি না।
একথায় যাচ্ছেতাই রকমের রাগ হল মামুনের। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, কী করে বুঝবি? সারাক্ষণ তো আছিস কম্পিউটার নিয়ে। ঘোড়ার ডিমের কম্পিউটার। দেব একদিন আছাড় মেরে ভেঙে!
ছেলের রুমে আর দাঁড়াল না মামুন। ডাইনিংস্পেসের দিকে চলে এল।
কিন্তু বাবার আচরণে খুবই চিন্তিত হয়ে গেল বাবলু। নিজের কাছে বলার মতো করে বলল, বাবা একটু ক্রাক হয়ে গেছে।
এদিকে ডাইনিংস্পেসে এসে হতাশ ভঙ্গিতে একটা চেয়ারে বসেছে মামুন। যে কেলেংকারি শিলার সঙ্গে হয়ে গেছে এখুনি সেটা মিটাতে না পারলে সমূহ বিপদ। এই অবস্থায় অফিসে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। বাড়ি ছেড়ে নিশ্চয় বড়বোনের বাসায় চলে যাবে শিলা। পরে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। এদিকে সেতুর বিয়ের কথা আজ পাকা করবে স্বপন। সবমিলে শিলাকে এখুনি ম্যানেজ রকতে না পারলে সেতুর বিয়ে ফিয়ে সবই হসফস হয়ে যাবে। ইস কেন যে ওরকম বেফাঁস কথাটা বলতে গেল সে? নিজের মাথার চুল নিজেরই এখন ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে মামুনের।
কিন্তু বাড়িতে থেকেই বা কোথায় উধাও হয়ে গেল শিলা?
নাকি বেডরুম থেকে বেরিয়েই সোজা চলে গেছে বাড়ির বাইরে। রিকশা কিংবা স্কুটার ডেকে ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে বোনের বাসায়।
ওখানে কি একটা ফোন করে দেখবে?
এসময় নিজেরচে বড় একটা সাদা ভল্লুক কোলে নিয়ে মামুনের সামনে এসে দাঁড়াল টুপলু। বড়চাচা, বড়চাচা।
নিজের ছেলেমেয়ের তুলনায় ভাইয়ের ওইটুকু মেয়ের ওপর বেশি রাগল মামুন। প্রসঙ্গ ভুলে সম্পূর্ণ অন্য একটা কথা তুলল। এই, তুই আমাকে বড়চাচা বলিস কেন? এ্যা? আমি তোর একমাত্র চাচা। শুধু চাচা বললেই হয়।
আশ্চর্য ব্যাপার মামুনের রাগটা পাত্তাই দিল না টুপলু। কোলের ভল্লুক আদর করতে করতে বলল, আচ্ছা বলব।
তারপর আগের ভুলটাই করল। তুমি কি চাচীকে খুঁজছ বড়চাচা?
শুনে লটারি পাওয়ার মতো অবস্থা হল মামুনের। টুপলু যে আবার বড়চাচা বলেছে তাকে সে কথা যেন শুনতেই পেল না। উফুল্ল গলায় বলল, হ্যাঁ মা। তুমি দেখেছ?
দেখেছি।
কোথায়?
ছাদে চলে গেছে।
সত্যি?
সত্যি। তুমি গিয়ে দেখ।
আর কোনওদিকে তাকাল না মামুন। যতদূর সম্ভব স্পিডে ছাদের সিঁড়ির দিকে দৌড়াল।
সত্যি সত্যি ছাদে চলে এসেছে শিলা। পানির ট্যাংকের ছায়ায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। বসে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদছে আর শাড়ির আঁচলে চোখ মুচেছে।
