এখনও করল না।
টেলিফোনের শব্দ শুনে যখন মনে হয়েছে ফোনটা আমার, নিজের রুম থেকে। পাগলের মতো ছুটে এসেছে সে। প্রায় হামলে পড়ে ফোনটা ধরেছে। হ্যালো।
ওপাশ থেকে দোলন বলল, আমি সেতু।
সেতু নামটা শুনে হৃদয়ের শব্দ বদলে যাচ্ছিল শুভর। মুহূর্তের জন্যে মাত্র। তারপরই দোলনের চালাকিটা সে ধরে ফেলল। হাসিমুখে বলল, তাই নাকি?
কেন বুঝতে পারছ না?
পারছি। বলো দোলন।
দোলন খিলখিল করে হেসে উঠল। যাহ ধরা পড়ে গেলাম!
তারপর সেতুর সঙ্গে কী প্রোগ্রাম হয়েছে ঝটপট বলে ফেলল সে। শুনে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে গেল শুভর মুখ। ঠিক আছে, কোনও অসুবিধা নেই। আমি আসছি।
সেতুর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা শুনলে মুহূর্তেই সেতুর পাশে নিজেকে দেখতে শুরু করে শুভ। বিভিন্ন এঙ্গেলে দেখতে শুরু করে এবং শুভর বেশ একটা ঘোর লেগে যায়।
এখনও লাগল। ঘোরের মধ্যে টেলিফোন নামিয়ে রাখল সে। রেখেই চমকে উঠল। মা দাঁড়িয়ে আছেন শুভর একেবারে পাশেই। মাকে দেখে অকারণে হে হে করে একটু হাসল শুভ। সেই হাসি একেবারেই পাত্তা দিলেন না মা। স্বভাবসুলভ কঠিন স্বরে বললেন, কোথায় যেতে হবে এখন?
শুভ সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যে বলতে শুরু করল। এই তো, আমার এক বন্ধুর ওখানে।
বন্ধুর নাম কী?
দোদুল।
কী? আমি যে শুনলাম দোলন।
হ্যাঁ হ্যাঁ দোলন। তবে দোদুল নামেও আমার এক বন্ধু আছে।
দোলন কি কোনও ছেলের নাম হয়?
হবে না কেন? মাহাবুবুল হক দোলন নামে একজন ছাত্রনেতা ছিলেন না? তুমি তার নাম শোননি?
না। আমি জানি দোলন শুধু মেয়েদেরই নাম হয়।
না। অনেক ছেলের নাম দোলন। যে ছেলেরা ছোটবেলায় খুব দোলনা চড়তো তাদের অনেকেরই নাম দোলন। শব্দটা এসেছে দোলনা থেকে।
বাজে কথা বলিস না। তারপর গলা আরও কঠিন করলেন মা। কী কাজে যাচ্ছিস?
না তেমন কোনও কাজ নেই। পরীক্ষা টরিক্ষা শেষ হয়ে গেছে, লেখাপড়া নেই, বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দেব।
আড্ডা শব্দটা বলেই ভুলটা করল শুভ। মা একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। কি, আড্ডা দিবি? তোর মতো ছেলে আড্ডা দেয় কী করে? যাদের সংসার ঠিক মতো চলে না তাদের আবার আজ্ঞা কীসের? বড়ভাই ছোট একটা চাকরি করে এতবড়
সংসারটা চালায়…।
এবার শুভও একটু কঠিন হল। কেমন একটা তর্ক করার মনোভাব হল তার। ভাই একা চালাবে কেন? বাড়ি ভাড়ার টাকা আছে না?
কথাটা পাত্তাই দিলেন না মা। তা আর কটাকা? সাত হাজার টাকা কোনও টাকা হল? বোনটা এখনও তোদের ঘাড়ের ওপর। হাজারবার বললাম বিদেশে থাকা ছেলের কাছে বিয়ে দেয়ার দরকার নেই। তখন আমার কথা কেউ শুনলি না। না শাহিন শুনল
তুই। চারবছর হয়ে গেল মেয়েটা এখনও স্বামীর কাছে যেতে পারল না।
এক কথা থেকে আরেক কথায় যাওয়ার স্বভাব মা’র। কথা বলার ভঙ্গিটা রাগি ধরনের। মুখে হাসি বলতে গেলে দেখাই যায় না। গার্লসস্কুলের অংকের টিচারদের মতো।
মাকে মোটামুটি পছন্দই করে শুভ। তবে যখন এককথা থেকে চট করে আরেক কথায় চলে যান তখন শুভ যায় রেগে।
এখনও রাগল। খেকুড়ে গলায় বলল, আপা এখনও যেতে পারেনি তো কী হয়েছে? পারবে।
কবে পারবে?
দুলাভাই চেষ্টা করছেন।
চারবছর ধরেই শুনছি চেষ্টা করছে। এই হল বলে। হতে তো দেখি না।
না হলেই বা কী? আপা তো তোমাদেরটা খাচ্ছে না। মাঝে মাঝে খরচের টাকা। পাঠাচ্ছেন দুলাভাই। সেই টাকা সংসারেই দিচ্ছে আপা। রেজাল্ট বেরুবার পর আমিও বসে থাকব না। চাকরি নিয়ে নেব। তুমি এত অস্থির হয়ে গেছ কেন?
বেকার ছেলেমেয়ে আমি দেখতে পারি না। এখুনি কিছু একটা করা উচিত তোর।
ঠিক আছে করব। এখন দয়া করে লেকচারটা বন্ধ কর। মাফ করে দাও আমাকে।
মা তবু থামলেন না। আগের মতোই রাগি গলায় বললেন, কাজের কথা বললেই লেকচার, না?
নিজের রুম থেকে দেবর এবং শাশুড়ির কথা শুনতে পাচ্ছিল সুরমা। এগারো বছর বিয়ে হয়েছে কিন্তু ছেলেপুলে হয়নি তার। শরীর বেশ ভারির দিকে। ফলে হাঁটাচলায় ইদানিং বেশ ধীর সে। শুভর জন্য টানটা একটু বেশি। এজন্যই এখন রুম থেকে বেরুল। আস্তেধীরে মা এবং ছেলের অদূরে এসে দাঁড়াল। শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে নিরীহ গলায় বলল, ওকে বকছেন কেন?
শুনে গরম তেলে নতুন করে যেন বেগুন পড়ল। শুভকে ছেড়ে সুরমাকে নিয়ে পড়লেন মা। বকতে আর পারি কোথায়? তোমার জন্য তো ওর সঙ্গে কথাই বলতে পারি না। কথা শুরু করলেই ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়। মায়ের চে মাসির দরদ বেশি।
সুরমা তার স্বভাব সুলভ নিরীহ গলায় বলল, কথাটা আপনি ঠিক বললেন না। বড়ভাবী মায়ের মতোই। নিজের ছেলে থাকলে তাকে আমি শুভর চে বেশি আদর করতাম না।
আদর করা আর লাই দেয়া এক না।
সুরমার আগে এবার কথা বলল শুভ। ভাবী আমাকে কোনও লাই দেয়নি। ভাবীর জন্য এখনও এই বাড়িতে থাকতে পারছি আমি। নয়তো তোমার কারণে অনেক আগেই বাড়ি ছাড়তে হতো।
সুরমাকে ছেড়ে আবার শুভকে ধরতে যাবেন মা, তার আগেই শুভকে ছোটখাট একটা ধমক দিল সুরমা। এত কথা বলিস না। যা এখান থেকে।
শুভ আর কথা বলল না। মাথা নিচু করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
.
চান্স পেলেই সেতুকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মুন্নি।
সেতু যখন সাজতে বসে, কোথাও বেরুবে, মুহূর্তে কেমন করে যেন সেই খবর পৌঁছে যায় মুন্নির কাছে। যেখানেই থাক ছুটে এসে সেতুর রুমে ঢোকে মুন্নি কিংবা দরজার সামনে দাঁড়ায়।
