আমার ওইটুকু মেয়ের বিয়ে নিয়ে এখনই চিন্তা করছ তুমি?
ওইটুকু কই? ক্লাস এইটে পড়ছে। দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাবে। আগে এই বয়সী মেয়েদেরই বিয়ে হয়ে যেত। আমার দাদীর হয়েছিল দশবছর বয়সে।
তার মায়ের বিয়ে হয়েছিল নিশ্চয় আটবছর বয়সে। তার মায়ের তিনচার, আর তার মায়ের মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়ই, তাই না।
শিলা হাসল। সব সময় ফাজলামো করো না।
ফাজলামো করছি না। আগের দিনে অল্প বয়সেই বিয়ে হতো মেয়েদের। এখন হয় না। শোন, তোমাকে একটু জ্ঞান দিই। ফ্যামিলি ট্রেডিসান জিনিসটা হচ্ছে বড়গুলো একধাপ গেলে ছোটগুলো যায় দুই ধাপ। অর্থাৎ…।
বুঝেছি।
পুরোটা মনে হয় বোঝনি। অর্থ হচ্ছে বোনের চে মেয়ের বিয়ে আরও ভাল পাত্রে হবে। যেমন আমার চে স্বপনের বিয়ে আরও ভাল পাত্রিতে হয়েছে, আরও ভাল ফ্যামিলিতে হয়েছে।
একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চেহারা বদলে গেল শিলার। শিলা আর শিলা রইল না। মা কালীর রূপ ধারণ করল। কী, আমার চে রেখা ভাল? আমাদের চে রেখাদের ফ্যামিলি ভাল? এতবড় অপমান তুমি আমাকে করলে?
হাতের গ্লাস ঠাস করে দেয়ালে ছুঁড়ে মারল শিলা। পানি এবং কাঁচের টুকরোয় বেডরুমের মেঝে ছেয়ে গেল। কিছুই খেয়াল করল না সে, দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
ততোক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছে মামুন। কপালে হাত দিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে বিছানায় বসে পড়ল। নিজেকে নিজে কোনও রকমে শুধু বলল, সর্বনাশ করে ফেলেছি। একদম সর্বনাশ করে ফেলেছি।
.
সুন্দর একটা পাঞ্জাবি পরেছে স্বপন।
ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে এসে বলল, কেমন লাগছে আমাকে?
রেখা মুগ্ধ চোখে স্বামীর দিকে তাকাল। কিন্তু সে কথা বলার আগেই টুপলু নির্বিকার। গলায় বলল, পচা।
টুপলু যে রুমের এককোণে বসে পুতুল খেলছে খেয়ালই করেনি স্বপন। পচা শব্দটা শুনে করল। কপট রাগের গলায় বলল, এই তোকে জিজ্ঞেস করেছি? তুই যা এখান থেকে।
বাপকে মোটেই পাত্তা দিল না মেয়ে। বলল, না যাব না। দেখছ না খেলছি!
টুপলুর দিকে আর তাকাল না স্বপন। রেখাকে বলল, বোনের বিয়ে উপলক্ষে নতুন পাঞ্জাবিটা পরলাম। হাসানরা আজ আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবে। এজন্য খুব মুডে আছি।
রেখা বলল, এখনও বিয়ের কিছুই হয়নি, এখনই এত মুডের কী হল?
আজ সব ফাইনাল হবে।
তারপর বেশ স্বস্তির গলায় বলল, সেতুর বিয়েটা হয়ে গেলে আপাতত আমাদের আর কোনও প্রেসার থাকে না। বাবলু, মুন্নি ওদের বিয়ের বহু দেরি।
এই প্রথম ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল টুপলুর। পুতুল ফেলে লাফিয়ে উঠল সে। মা বাবার মাঝখানে এসে দাঁড়াল। উত্তেজিত গলায় বলল, ফুপির বিয়ে? কবে?
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েকে ধমক দিল রেখা। চুপ কর। সব কথায় নাক গলানো!
ব্যাপারটা পছন্দ করল না স্বপন। মেয়েকে কাছে টেনে রেখাকে বলল, এটা ঠিক হল না। খানিক আগে দমক দিয়েছি আমি, এখন দিলে তুমি। দুজনেই যদি এমন করি মেয়েটি তাহলে কার কাছে যাবে?
টুপলু গাল ফুলাল। আমি ফুপির কাছে চলে যাব।
রেখা আগের মতোই রাগি গলায় বলল, যা এক্ষুনি যা।
টুপলুকে কোলের কাছে টেনে চেয়ারে বসল স্বপন। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলল, শোন মা, ফুপির বিয়ের কথা এখন কাউকে বলো না, কেমন! বড়দের কথা ছোটদের কখনও বলতে হয় না।
খুবই সুবোধ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল টুপলু। আচ্ছা।
তারপর অতি নিরীহ ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল।
স্বপনও উঠল। কিন্তু দরজার দিকে যাওয়ার আগেই রেখা তাকে ডাকল। এই যে ভদ্রলোক, শুনুন।
স্বপন থমকে দাঁড়াল। ডাকের ভঙ্গিটা মারাত্মক। নিশ্চয় ভয়ংকর কোনও কথা আছে। বুকটা ছ্যাত করে উঠল স্বপনের। স্ত্রীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলল, জ্বী বলুন।
বোনের বিয়ে উপলক্ষে মাঝারি ধরনের একট প্রেসার আছে আপনার।
তা আমি কিছুটা বুঝেছি।
যেটুকু বুঝেছেন বলুন, শুনে কৃতার্থ হই।
বোধহয় গোটা তিন চারেক শাড়ি কিনে দিতে হবে আপনাকে।
তাতে দিতে হবেই। কিন্তু শাড়ি আমি ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনি।
তাহলে?
কিঞ্চিত গহনাও দিতে হবে।
স্বপন একটা ঢোক গিলল। কী পরিমাণ?
খুব বেশি না। মাত্র একসেট।
সেটের সাইজ? মানে ওজন?
এক্ষেত্রে একটু সমস্যা আছে। সামান্য ওজনদার।
ভরির হিসেবে কতটা হতে পারে?
আপনি আরেকটু বসুন, বলছি।
কপট ভয়ের ভঙ্গি করে স্বপন বলল, বসতে হবে কেন?
শুনে অকস্মাৎ ভিড়মি খেতে পারেন। ভিড়মি খেয়ে পপাতধরণীতল হলে ব্রেন হেমারেজ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। স্বামীর ব্রেন হেমারেজ ঘটাতে মন চাইছে না।
অতটা বোধহয় হব না। আপনি নিঃসংকোচে বলুন। কত ভরি?
এই ধরুন বিশ বাইশ ভরি। মজুরিসহ লাখ দেড়েক টাকার ব্যাপার।
ভুরু কুঁচকে রেখার দিকে তাকাল স্বপন। গলার স্বর এবং ভাষা দুটোই স্বাভাবিক করল। চান্সটা একটু বেশি নিয়ে ফেললে না?
রেখা হাসল। কোনও কোনও সময় বেশি করেই চান্স নিতে হয়। ঝোঁপ বুঝেই তো কোপ মারে লোকে। আমাদের একটা মাত্র ননদ আর তোমরা এত বড়লোক। আর কিছু কি বলবার দরকার আছে?
না দরকার নেই। গ্রানটেড। কাটায় কাটায় বাইশ ভরি পেয়ে যাবে।
খুবই উজ্জ্বল ভঙ্গিতে বেরিয়ে গেল স্বপন।
৩. কোনও কোনও টেলিফোনের শব্দে
কোনও কোনও টেলিফোনের শব্দে শুভর মনে হয় এই ফোনটা আমার।
যখন এরকম মনে হয়, বাড়ির যেখানেই থাক ডাইনিংস্পেসের দিকে ছুটে আসে শুভ। কারণ ফোনটা ডাইনিংস্পেস এবং ড্রয়িংরুমের মাঝামাঝি একটা জায়গায় থাকে। এরকম টেলিফোনের সময় কাছে পিঠে কেউ থাকলেও শুভ খেয়াল করে না।
