স্বপন আবার বলল, সেতুর বিয়ে।
মানে?
বিয়ের আবার মানে কী? বিয়ে। তেরো বছর আগে তোমার আমার যা হয়েছে। ফলাফল হচ্ছে একটি কন্যা সন্তান। ডাকনাম টুপলু। ভাল নাম…
বাজে কথা না বলে আসল কথাটা বল। কোথায় বিয়ে, কী বৃত্তান্ত?
অসাধারণ একটা পাত্র পাওয়া গেছে। ডালাসের কোন এক ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেছে। আমাদের কাছাকাছিই বাড়ি। বনানীতে। তিন ভাইয়ের মধ্যে এই ছেলে ছোট। বোন নেই। বাবা এবং বড় দুভাই বিজনেস করে। মতিঝিলে একটা অফিস আরেকটা চিটাগাংয়ে।
কীসের বিজনেস?
এক্সপোর্ট ইমপোর্টের বিশাল বিজনেস।
এবার মুখটা উজ্জ্বল হল রেখার। বল কী, এ তো দারুণ ব্যাপার।
স্বপন যেন আনন্দে একেবারে ফেটে পড়ল। সত্যি দারুণ ব্যাপার। ছেলেটির নাম আনিস। খুবই হ্যাঁন্ডসাম ছেলে। বোম্বের সারদ কাপুর না কী যেন একটা নায়ক আছে। অনেকটা ওরকম দেখতে।
যাহ।
সত্যি। বোনের বিয়ে নিয়ে আমি কি মিথ্যে বলব! তাছাড়া তোমরা তো সবাই দেখবেই। সেতুকে কোথায় যেন সে দেখেছে। ইউনিভার্সিটির ওদিকেই হবে। সেতুর ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি ওদের বাড়ি।
তাহলে ওদিকেই দেখেছে।
দেখেই খোঁজখবর নিয়েছে। জেনেছে আমার বোন।
প্রস্তাবটা আনল কে?
হাসান, আমার বন্ধু। সাংবাদিক। হাসানের সঙ্গে ছেলের বড়ভাইর বন্ধুত্ব। এসব ক্ষেত্রে যা হয় আর কি! যোগাযোগের ডালপালা বেরিয়ে যায়।
রেখা মুগ্ধ গলায় বলল, সত্যি দারুণ ব্যাপার। মাত্র কদিন আগে ভাবী আর আমি সেতুর বিয়ে নিয়ে কথা বলছিলাম।
কী কথা?
মানে সেতুর বিয়ে হলে বাড়িতে একটা উৎসব আনন্দ হয়, এই আর কি! ভাবি অবশ্য বলছিলেন এত আদরের বোনকে এক্ষুনি বিয়ে দিতে রাজি হবেন না ভাইয়া। আচ্ছা শোন, তুমি কি ভাইয়াকে বলেছ?
না এখন গিয়ে বলব।
আগে তাঁকে বল। তিনি রাজি না হলে…!
রাজি না হওয়ার কোনও কারণ নেই।
কিন্তু সব শুনে মামুন কী রকম গম্ভীর হয়ে গেল। থমথমে গলায় বলল, বিয়ের পর সেতুকে কি আমেরিকায় নিয়ে যাবে?
স্বপন উৎসাহি গলায় বলল, না। ছেলে আমেরিকায় সেটেল করবে না, বাংলাদেশেই করবে। নিজেদের বিজনেস দেখবে। বিজনেস দেখার জন্যই আমেরিকা থেকে এমবিএ করে এসেছে সে?
ফলস এমবিএ না তো?
মানে?
আমেরিকায় ডিসওয়াসের কাজ করেও কিন্তু দেশে ফিরে অনেকে বলে অমুক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি, তমুক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি।
পাগল হয়েছ! আমার সঙ্গে অমন কেউ করবে! হাসান আমার নেচার জানে না?
তবু মুখ উজ্জ্বল হল না মামুনের। আগের মতোই থমথমে গলায় বলল, আমাদের একমাত্র বোন, তাকে আমি বিদেশে থাকতে দেব না।
এসব ওরা জানে ভাইয়া।
কে বলেছে?
হাসান।
তোর সঙ্গে কথা বলার পর বলেছে?
না আগেই। কারণ ও এসব জানে।
এবার মুখে হাসি ফুটল মামুনের। তাহলে তো খুব ভাল কথা। এরচে’ ভাল পাত্র হয় না।
তুমি কী বল? কথাবার্তা বলব?
বলবি মানে? অবশ্যই বলবি। কালই বলবি।
ভেবে দেখ।
র কী ভাবব? আমার ভাবনা ফাইনাল।
কিন্তু সেতুর পড়াশুনো এখনও শেষ হয়নি।
তাতে কী হয়েছে। বিয়ের পরও পড়বে। আজকাল অনেকেই তা করছে। তুই কোনও গড়িমসি করিস না। ভাল করে খোঁজ খবর নিয়ে কথা ফাইনাল করে ফেল।
.
শুভর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে সেতুর মনে হল, আচ্ছা ওর নাকের ডগায় যদি মোটা একখানা গোঁফ থাকত তাহলে কেমন হতো!
গোঁফঅলা শুভকে দেখার জন্য তারপর মনটা ছটফট করে উঠল সেতুর। ছবিটা হাতে নিয়ে পড়ার টেবিলে এল সে। বলপয়েন্টে অতিযত্নে অতি নিখুঁত করে ছবির নাকের তলায় বেশ মোটা একখানা গোঁফ এঁকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চেহারা একেবারেই অন্যরকম হয়ে গেল শুভর। এই শুভকে দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল সেতু। আঁকা গোঁফে আঙুলের ডগা ছুঁইয়ে বলল, গুন্ডা।
সেতু যখন শুভর গোঁফ নিয়ে ব্যস্ত সে সময় পানির গ্লাস হাতে তাদের বেডরুমে স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিলা। আসলেই মামুনের চে সে একটু বেশি লম্বা। এই বয়সেও ফিগার অত্যন্ত চমৎকার তার। গায়ের রং দুধের সরের মতো। সাজগোজের প্রতি খুবই ঝোঁক। বাড়িতেও বেশির ভাগ সময় সুন্দর শাড়ি পরে থাকে। বেশ কিছু গহনা পরে থাকে। সনু ওয়ালিয়ার মতো সামান্য লক্ষ্মীট্যারা সে। কাছ থেকে খেয়াল না করলে ব্যাপারটা একেবারেই ধরা যায় না। তবে শিলার সবচে বড় খুঁত তার পা। পা দুটো ময়ূরের পায়ের মতো।
শিলা যতটা ফিগার সচেতন মামুন ততোটাই উদাস। বয়স এখনও পঞ্চাশ হয়নি। তবু তার মধ্যে একটা বুড়োটে ভাব। মাথার চুল বেশ পেকেছে, শরীরটা মোটার দিকে। চোখে বহুদিন ধরে চশমা। কিন্তু মনের দিক দিয়ে সে বেশ সজীব। অন্তত শিলার কাছে। আর পোশাক পরে ভাল। দামী ব্র্যান্ডের শার্ট প্যান্ট, টাই জুতো। মাঝে মাঝে সুন্দর সানগ্লাস পরে। ভাল পারফিউম ইউজ করে, ভাল আফটারশেভ ইউজ করে।
আজ করেছে আজেরো।
আজেরোর গন্ধটা খুব প্রিয় শিলার। এজন্য স্বামী তারচে বেটে জেনেও তার পাশে সে এখন দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু পানিটা আজ খেল না মামুন। বলল, এখন থেকে কিছুদিন তোমার হাতের পানি না খেলেও চলবে।
শিলা অবাক হল। কেন?
বোনের বিয়ে। মন মাথা দুটোই ঠান্ডা হয়ে গেছে।
কিন্তু আমি খুব চিন্তায় পড়ে গেছি।
তোমার কীসের চিন্তা? বিয়ে তো তোমার না!
বাজে কথা বলো না।
ঠিক আছে চিন্তাটা কী, বল।
এত ভাল পাত্রের সঙ্গে বোনের বিয়ে দিচ্ছ, আমার চিন্তা হচ্ছে নিজের মেয়ের জন্য এরকম পাত্র পাব কি না!
