কিছুক্ষণ বসে তপন বললেন, “আমি গৃহদেবতার কাছে গেলাম। তোমরা বসো। ওঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসি।”
তপন উঠলেন। তাঁর স্ত্রীও তাঁর সঙ্গে ঠাকুরঘরে রওনা দিলেন। রুমকি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে আদিত্যকে বলল, “তুমি আমাকে কেন বলোনি কিছু?”
আদিত্য বুঝল ঈশান কোণে মেঘ করেছে। সে বলল, “তোমাকে শুরুতেই বলেছিলাম ফিরতে। তুমি বলেছিলে বাড়িতে বাবা মাকে সামলাবে।”
রুমকি বলল, “একবার বলতে পারতে ও আমাদের ওখানে আছে। তাহলে আমি চলে যেতাম ঠিক। তোমরা একসঙ্গে আছ বাড়িতে?”
আদিত্য বিরক্ত চোখে রুমকির দিকে তাকিয়ে বলল, “তো কী করব? তুমি কি অন্য কিছু ইঙ্গিত করতে চাইছ? ভেবে নিয়ো আমি না থাকলে তোমার বোনের ঠিক কী হতে পারত।”
রুমকি বলল, “আমি তো সেরকম কিছু বলিনি! তোমার এই কথাটাই মনে হল কেন আমি কিছু ইঙ্গিত করছি? কী হয়েছে?”
আদিত্য বলল, “কিছু হয়নি। কী হতে পারে? মেয়েটা ভয়াবহ রকমের ভয় পেয়ে আছে। তোমাদের কাউকে ওর দরকার।”
রুমকি চুপ করল। কয়েক সেকেন্ড পরে আবার একই কথা বলল, “তোমার আমাকে বলা উচিত ছিল।”
আদিত্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
৩৬
“বোন কোন ঘরে শুচ্ছে?” রুমকি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর অন্য দিকে তাকিয়ে আদিত্যকে জিজ্ঞেস করল।
আদিত্য রুমকির দিকে সরাসরি তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “মানে? তোমার ধারণা ঝুমকি আমার সঙ্গে ঘুমায়?”
রুমকি রাগি গলায় বলল, “আমি কি তোমাকে একবারও সেটা বলেছি? এইজন্যই মনে হয় বলে চোরের মন বোঁচকার দিকে।”
আদিত্য বলল, “বোঁচকার কিছু নেই। অফিস বন্ধ করে, সব বন্ধ করে তোমার ফ্যামিলির লোকের জন্য লেবার দিয়ে যাচ্ছি, আর তুমি যদি এখন এসব বলো তাহলে তো আর কিছু বলার নেই, তাই না?”
রুমকি এবার আদিত্যর দিকে তাকাল, “আমাকে প্রথমেই কথাটা বলা উচিত ছিল।”
আদিত্য বলল, “এ বাড়ির যা পরিস্থিতি ছিল, বলা কি সম্ভব ছিল? তোমাকে আমি বারবার আকারে ইঙ্গিতে বলেছি বাড়ি ফিরতে, তুমি বলেছ বাবা-মার সঙ্গে থাকবে। এখন তুমি আমার ঘাড়ে সমস্ত দোষ চাপাচ্ছ। তোমার বোন যে ছেলেটার সঙ্গে পালিয়েছিল, সে আমাকে থ্রেট করছে, তোমার বাড়িতে একটা গোটা মহল্লা এসে থ্রেট দিয়ে গেছে। এত সব কিছুর পরে তুমি আমাকে সন্দেহ করছ। এত যদি সন্দেহ থাকে নিজের বোনকেই জিজ্ঞেস করতে পারো।”
রুমকি গুম হয়ে বসে রইল। আদিত্য বলল, “শোনো, আমার এত কৈফিয়ত দেওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তোমার যদি মনে হয়, বাড়ি যাবে, চলো। যদি মনে হয় থাকবে, থাকো। আমি আমার যেটা ভালো মনে হয় সেটা করেছি, করবও। মেয়েটা আমারও বোনেরই মতো। ওভাবে এসে আশ্রয় চেয়েছিল, আমি যদি তখন ওকে গার্ড না দিতাম, তাহলে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যেত। তোমাদের বাড়ির সম্মানের কথা ভেবে যা করার করেছি। সুশোভনকে বলেছি, প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করেছি। এত সব কিছুর পরে তোমার মনে প্রশ্ন এল ঝুমকি কোন ঘরে শুয়েছে। মানে সিরিয়াসলি? কী করে পারো বলো তো?”
রুমকি গলা নিচু করে রাগি গলায় বলল, “চ্যাঁচাবে না। কোনওরকম সিন ক্রিয়েট করবে না। বাবা কিংবা মা শুনলে দুজনেই খারাপ ভাববে।”
আদিত্য বলল, “ভাবাই উচিত। তোমার মতো মেয়ে জন্ম দিলে খারাপ না ভাবার কিছু নেই।”
রুমকি বলল, “মানে? আমার মতো মেয়ে জন্ম দিল মানে? এখন আর আমাকে ভালো লাগছে না, তাই না?”
আদিত্য বলল, “আমি কি সেটা বলেছি? ভালো লাগা, না লাগার কারণগুলো তো তুমিই মাটি খুঁড়ে বের করছ। শোনো, তুমি রেডি হয়ে নাও। বাড়ি গিয়ে বোনকে সামলাও।”
রুমকি শক্ত হয়ে বসে বলল, “আমি কোথাও যাব না। নিজে সামলাচ্ছ যখন তুমিই সামলাও।”
আদিত্য এবার রাগল, বলল, “এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশান তো?”
রুমকি বলল, “হ্যাঁ। এটাই ফাইনাল ডিসিশান।”
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে উঠে বলল, “ঠিক আছে। আমিও তাহলে একটা কাজ করছি। ছেলেটাকে ফোন করে বলছি, তোমার বউকে নিয়ে যাও বাপু, এর জন্য আমার সংসারে অশান্তি লাগছে। তুমি ওকে নিয়ে গিয়ে কনভার্ট করো, নিকাহ করো, রেপ করো, তিন তালাক দাও, চার তালাক দাও, তাতে আমার কোনও কিছু যায় আসে না। নিয়ে গিয়ে যা খুশি করো। প্রয়োজন হলে মেরে পুঁতে দাও, আমার কোনও কিছু যায় আসে না।”
রুমকি আদিত্যর কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে রইল।
আদিত্য রাগের মাথায় ঘর থেকে বেরিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। রুমকি বেরোল না। খানিকটা যাওয়ার পর দেখল ফোন বাজছে। শ্বশুরমশাই ফোন করছেন। আদিত্যর রাগটা মাথা চাড়া দিল। গাড়ি রাস্তার বাঁদিকে পার্ক করে ফোন ধরল, “হ্যালো।”
তপন উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “তুমি বেরিয়ে গেলে কেন আদিত্য? আমরা তো কী করব কিছুই ঠিক হল না!”
আদিত্য ঠান্ডা গলায় বলল, “আপনার মেয়েকে জিজ্ঞেস করুন কী করবেন। আমাকে এর মধ্যে জড়াবেন না।”
ফোন রেখে আদিত্য গাড়ি স্টার্ট দিল।
৩৭
কাবুল থেকে তোতাপাখি পাঠানো হয়েছে বাদশাহকে। হুমায়ুন মুগ্ধ চোখে সকাল থেকে তাদেরকেই দেখে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝেই বলছেন, “মারহাবা।”
বাদশাহকে যাঁরা চেনেন তাঁরা কেউই বিশেষ আশ্চর্য হচ্ছেন না। প্রায়শই এমন দিন আসে যেদিন বাদশাহ নিজের কক্ষে এরকম কোনও কিছু নিয়ে বসে থাকেন সারাক্ষণ।
