বাদশাহর এক উজির এসে মাঝে মাঝেই উঁকিঝুঁকি মারছেন। হুমায়ুন বিরক্ত হলেন দেখে। নিশ্চয়ই কোনও কাজের কথা বলবে, নইলে আবার কোনও না কোনও সমস্যার কথা তুলবে। তিনি অনেকক্ষণ দেখার পরে একসময় রেগেমেগে নিরাপত্তারক্ষীকে হাঁক পেড়ে উজিরকে নিয়ে আসতে বললেন।
উজির নূর আলম শাহ সংকুচিত ভাবে এসে দাঁড়ালেন বাদশাহের কাছে। বাদশাহ বললেন, “কী ব্যাপার বলো তো? একটা দিনও কি তুমি আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না? কী হল আবার?”
নূর আলম বললেন, “জাহাঁপনা, একটা ব্যাপার আমাকে কয়েক দিন ধরে বেশ চিন্তায় ফেলেছে, আমি কাকে বলব বুঝতেও পারছি না। বিশ্বাস করার মতো মানুষ তো খুব বেশি নেই এখানে।”
হুমায়ুন তাঁর উজিরের দিকে সস্নেহে তাকালেন। এই মানুষটির আনুগত্য প্রশ্নাতীত। নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে যার জন্য নূর আলম এত চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
বাদশাহ বললেন, “তোমার যখন কোনও কিছু মনে হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই এর পিছনে কারণ আছেই। বলো নির্দ্বিধায়। আমি রেগে যাব না। বিরক্ত হয়েছিলাম বটে, কিন্তু পরে মনে হচ্ছে তুমি কিছু বলতে চাইছ। বলো।”
নূর আলম চারদিকে সন্তর্পণে তাকিয়ে বললেন, “হুজুর, আমার কাছে খবর আছে শাহি হারেমের মেহজাবিনের সঙ্গে আপনার ভাই কামরান মির্জার গোপন যোগাযোগ আছে। আমার সন্দেহ, উনি আপনাকে হত্যা করার কোনও পরিকল্পনা করছেন।”
বাদশাহ হো হো করে হেসে উঠে বললেন, “সে তো স্বাভাবিক ঘটনা। এতে এত উতলা হবার কী আছে? ভাই যদি ভাইকে ষড়যন্ত্র করে মেরে আনন্দ পায়, তাহলে পাবে। মরব নাহয়। কী আর এল গেল তাতে? এত চিন্তা কোরো না। তুমি বরং এই পাখিদের দেখো। হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটির থেকে কত দূরে, কত নিশ্চিন্তে ওরা আছে। আমাদের মতো এত চিন্তা ওদের করতে হয় না। নিজের মাশুকার সঙ্গে সংসর্গে লিপ্ত অবস্থায় নিহত হবার কথাও এদের ভাবতে হয় না। এরা কত ভালো আছে না আলম?”
নূর আলম হাসার চেষ্টা করলেন, “বাদশাহ আমার কথাকে মনে হয় হালকাভাবে নিলেন। আপনার দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা করি জাহাঁপনা। আমাকে আসতে আজ্ঞা দিন।”
হুমায়ুন আবার হেসে বললেন, “এসো, বসো। পারস্যের সুলতান দমীহ পাঠিয়েছেন। পান করো। এসো।”
নূর আলম বসলেন। হুমায়ুন নিজের হাতে নূর আলমকে পান পাত্রে দমীহ ঢেলে দিয়ে পানপাত্রটি নূর আলমের হাতে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “নাও।”
নূর আলম সসম্মানে বাদশাহের হাত থেকে পানপাত্রটি নিলেন।
বাদশাহ গলা তুললেন, “কে আছিস?”
একজন নিরাপত্তারক্ষী এগিয়ে এল।
বাদশাহ বললেন, “শাহি হারেম থেকে মেহজাবিন বিবিকে ডেকে নিয়ে এসো। এখনই।”
নিরাপত্তারক্ষী চলে গেল।
বাদশাহ বললেন, “তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে তা আমার জানার প্রয়োজন নেই আলম, তোমার মুখের কথাই আমার জন্য সব। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।”
নূর আলম মাথা নুইয়ে বললেন, “আপনার মেহেরবানি জাহাঁপনা।”
বাদশাহ বললেন, “এই তোতাপাখিরা নাকি কথা বলতে পারে। তুমি এদের কথা বলা শেখাতে পারবে নূর?”
নূর আলম বললেন, “কোশিশ করতে পারি জাহাঁপনা। যদি পারি তবে খুদার অসীম মেহেরবানি হবে।”
বাদশাহ বললেন, “তোমার হাতে আমি এদের দায়িত্ব দিলাম আজ থেকে। এদের কথা বলা শেখাবে। কী কথা শেখাবে?”
নূর আলম বলতে যাচ্ছিলেন কিছু, এমন সময় নিরাপত্তারক্ষী মেহজাবিনকে নিয়ে প্রবেশ করল।
বাদশাহ নূর আলমকে ঠান্ডা গলায় বললেন, “ওর চোখ দুটো উপড়ে নাও নূর আলম। আমার সামনেই।”
মেহজাবিন আতঙ্কিত চোখে হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার কী গুনাহ হুজুর?”
হুমায়ুন বললেন, “কোনও গুনাহ নেই মেহজাবিন। আল্লাহর ইচ্ছা হয়েছে তোমার চোখ দুখানি রাখবেন না। আমি তো নিমিত্ত মাত্র।”
নূর আলম এক চুমুকে দমীহের পাত্র শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন।
৩৮
আদিত্যর মাথা বেশ গরম হয়ে ছিল।
সে খানিকক্ষণ গাড়ি চালিয়ে রাস্তার পাশের একটা ধাবায় গিয়ে বসল।
এতক্ষণ বুঝতে পারেনি, লোকজনকে খেতে দেখে তার খিদে পেয়ে গেল।
খাবার অর্ডার করতে গিয়ে মনে পড়ল ঝুমকি খায়নি এখনও। কয়েক সেকেন্ড থমকে থেকে “ধুত্তোর” বলে অর্ডার করে দিল। ঠিক করল ঝুমকির জন্য পার্সেল করে নিয়ে যাবে।
ফোন বাজছিল তার। দেখল সুশোভন ফোন করছে।
ধরল, “বল।”
“খবর কী ওদিকে?”
আদিত্য বলল, “খবর? খবর মজার। বউকে যেই বললাম ঝুমকি আমার কাছে আছে, ওমনি সন্দেহ করতে শুরু করে দিল।”
সুশোভন অবাক গলায় বললেন, “বলতে গেলি কেন? তোকে তো বারণ করেছিলাম।”
আদিত্য বলল, “কী করব? একটা পরিবারের লোকজনকে চোখের সামনে ভেঙে পড়তে দেখলে কি খুব ভালো লাগে? আমার মনে হয়েছিল, বলে ফেললে ওরা খানিকটা চাপমুক্ত হবে। ব্যাপারটা ব্যাকফায়ার করবে কী করে জানব? অবশ্য রুমকি বরাবরই এরকম। ছোটোখাটো ব্যাপারে পর্যন্ত সন্দেহ করবে।”
সুশোভন হেসে ফেললেন, “এইজন্যই বিয়ে করতে নেই। বিয়ে শব্দটার মধ্যেই ব আছে আর ব থেকে বরবাদিও শুরু হয়, বুঝলি?”
আদিত্য বলল, “ব থেকে ব-কারান্ত অসংখ্য গালাগালও শুরু হয়।”
সুশোভন হো হো করে হেসে উঠে বললেন, “একজ্যাক্টলি। আচ্ছা শোন, এই বিপ্লবী রিন্টুর সম্পর্কে বেশ খানিকটা ইনফরমেশন বের করতে পেরেছি। ইজাজ মল্লিকের চামচা এগুলো সব। তবে শিক্ষিত চামচা।”
আদিত্য বলল, “আর ভাই, এরা যত শিক্ষিতই হোক আসলে সব এক।”
