যাই হোক, আমি খানিকটা প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। আমার মূল বক্তব্যে ফিরে এসে বলি, রাজ্যে যদি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার দায় আমরা কেউ এড়াতে পারব না। আমি আবারও বলি, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য, যেখানে অনুপ্রবেশ এখনও একটা সমস্যা, যেখানে দেশভাগের ক্ষত এখনও ছাইচাপা আগুনের মতো মানুষের অবচেতনে হানা দেয়, সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আগুন নিয়ে খেলার সমান। আমাদের দুর্ভাগ্য, ধর্মনিরপেক্ষ দেশে ধর্ম নিয়ে রাজনীতিটাই হয় সবথেকে বেশি। উঁচু নিচু জাতি থেকে শুরু করে হিন্দু মুসলমান, এই সমস্ত ভেদাভেদ যতদিন না আমাদের দেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে দূর হচ্ছে, ততদিন আমরা প্রকৃত সভ্য হতে পারব না।”
জামান সাহেব থামলেন। হলঘর ফেটে পড়ল হাততালিতে। বক্তব্যের বিষয় ছিল “সংখ্যালঘু এবং পশ্চিমবঙ্গ।” সুশোভন অপেক্ষা করছিলেন। সভা শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করলেন। অনুষ্ঠান শেষ হলে জামান সাহেবের কাছে গিয়ে সুশোভন বললেন, “পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে জামান সাহেব। আমাকে ট্রান্সফার করে দেওয়া হল, ওদের বাড়ি থেকে সিকিউরিটিও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
জামান সাহেব সুশোভনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্বাভাবিক। লুম্পেনরা যখন প্রশাসনকে ব্যবহার করতে শুরু করবে, তখন এরকমই হবে।”
সুশোভন বললেন, “সন্দেশখালি জয়েন করতে যাব কাল। এর পরে কী করা যাবে?”
জামান বললেন, “আমি দেখছি। তুমি জয়েন করো। সব কিছু এত সহজে শেষ হতে দেওয়া যাবে না। মেয়েটির বাড়ির নিরাপত্তা যাতে থাকে সেটা আমি দেখে নেব। পুলিশের গাড়ি যাতে টহল দেয়, সেটা নিশ্চিত করা যাক। সেটা আমি লোকাল থানায় কথা বলে দেখে নেব। তোমার বন্ধুর নাম্বারটা আমায় দাও। আমি কথা বলি ওর সঙ্গে। একটা কংক্রিট স্টেপ নেওয়া দরকার। বেশি সময় নেই হাতে।”
সুশোভন আদিত্যর ফোন নাম্বার দিল।
জামান সাহেব মোবাইলে আদিত্যর নাম্বার সেভ করতে করতে বললেন, “লাভ জিহাদের নামে যে নোংরামি হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ না করা গেলে এ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছ? সবাই বুঝতে পারছে, সমস্যা হল যাদের বোঝার কথা তারা বুঝতে পারছে না।”
সুশোভন কিছু বললেন না। গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
৩৫
তপন খানিকটা ভেঙেছেন, দেখে বুঝতে পারল আদিত্য। ঘরের মধ্যে অস্থির হয়ে পায়চারি করছিলেন। তাকে দেখে বললেন, “কোনও খবর পেলে বাবা?”
আদিত্য রুমকির দিকে তাকাল। রুমকির চেহারা ভাঙছে। কষ্ট হল হঠাৎ করে। মেয়েটার ওপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছে। বাবা মা দুজনকেই সামলাচ্ছে।
রুমকি আদিত্যকে বলল, “বাবা ঝুমকিকে ক্ষমা করে দিয়েছে। পোস্টটা দেখেছে।”
আদিত্য সোফায় বসে রুমকিকে বলল, “জল দেবে একটু?”
রুমকি একটা জলের বোতল এনে আদিত্যকে দিল।
তপন পায়চারি থামিয়ে আদিত্যর সামনে বসলেন। বললেন, “নিজের ওপর ঘেন্না হচ্ছে। মেয়েটাকে কী না কী ভেবে নিয়েছি। আমার জন্যই, এত কড়া মনোভাবের জন্যই মেয়েটা বাড়ি থেকে পালাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বুঝতে পারছি। কী করা যায় বলো তো? মেয়েটা কোথায় থাকতে পারে? এইটুকু মেয়ে, এত কষ্ট সহ্য করেছে। ওরা বেচে-টেচে দেবে না তো?”
আদিত্য শ্বশুরের দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, এই মনোভাবটা প্রথম থেকে থাকলে এত সমস্যা হত না। সুশোভনের কথা মাথায় এল তার। সে মাথা নাড়িয়ে বলল, “বলতে পারছি না। তবে মনে হচ্ছে ঝুমকি কোনও বন্ধুর কাছেই আছে।”
রুমকি বলল, “ওর সব বন্ধুকে ফোন করেছি। এমনকি কলেজের বন্ধুদের নাম্বার জোগাড় করেও ফোন করেছি। কোনও খবর পাচ্ছি না।”
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড তপনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ঝুমকি আমাদের বাড়িতে আছে।”
রুমকি চমকে আদিত্যর দিকে তাকাল।
তপন বড়ো বড়ো চোখে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আগে বলোনি কেন?”
আদিত্য বলল, “আপনারা সবাই এত রেগে ছিলেন তাই বলিনি। এখন রেগে নেই, তাই বললাম।”
রুমকি মাথায় হাত দিয়ে কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে বলল, “এত ইম্পরট্যান্ট ব্যাপারটা তুমি আমাকে বললে না?”
আদিত্য বলল, “সুশোভন বারণ করেছিল। তোমরা যদি বেশি উত্তেজিত হয়ে কিছু করে ফ্যালো, তাই। কিন্তু এখন মনে হল বাবা মা যেভাবে ভেঙে পড়ছেন, তাতে ব্যাপারটা আর চেপে রাখার কোনও মানে হয় না।”
তপন আদিত্যর হাত ধরে প্রায় কেঁদে ফেললেন, “তুমি বেশ করেছ। ঠিক করেছ তুমি। আমার রাগের ওপরে আমার নিজেরই ভরসা নেই। সুস্থ আছে তো আমার মেয়েটা?”
আদিত্য বলল, “একদম।”
রুমকি দৌড়োতে দৌড়োতে ঘরের ভিতরে গিয়ে মাকে নিয়ে এল। মা কথাটা শুনে কেঁদে ফেললেন।
তপন এবার একটু উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, “কিন্তু বাবা, ওই লুম্পেনগুলো যদি জানতে পারে ঝুমকি তোমার কাছে আছে, তাহলে তোমার নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।”
আদিত্য বলল, “এখন অন্য কিছু ভাবলে চলবে না। আমাদের সবাইকে মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কী করব। ব্যাপারটা নিয়ে এগোব, না ওকে বাইরের কোনও স্টেটে পাঠিয়ে ওখানে কারও সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব।”
তপন মাথা নিচু করে কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললেন, “মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। অবশ্য এখন সেটা অসম্ভব। ওরা কোনওরকম ক্লু পেলে…” শিউরে উঠলেন তপন।
