রিন্টু চুপ করে রইল।
ইজাজ বলল, “মিডিয়া পর্যন্ত এখন ভাগ হয়ে গেছে। হিন্দুদের দল নড়েচড়ে বসেছে। ওরা ইস্যু করবে এবার এটাকে নিয়ে। আমি একা কত করব?”
রিন্টু বলল, “ওকে খুঁজে পেলে আপনার কাজ হবে তো?”
ইজাজের চোয়াল শক্ত হল, “হ্যাঁ। কোথায় যেতে পারে?”
রিন্টু বলল, “দিল্লি যেতে পারে। উত্তরপ্রদেশের কোনও শহরে গিয়ে লুকোতে পারে। কলকাতাতেও আসতে পারে। আবার ধানবাদেও লুকিয়ে থাকতে পারে।”
ইজাজ বললেন, “যেখানেই গিয়ে থাকুক, ওকে বের কর। যে গর্তে লুকিয়ে থাকুক। ওর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা মানেই বিপদ। আমি একটা চ্যানেলকে বলে দিয়েছি, মেয়েটা যে বাড়ির চাপে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে সেটা প্রচার করার জন্য। কিন্তু তাতে বালির বাঁধ দেওয়া হবে। ও আবার কিছু লিখলে সেটা ঢাকা পড়ে যাবার চান্স প্রবল।”
রিন্টু চিন্তিত মুখে বসে রইল।
ইজাজ মল্লিক বললেন, “এভাবে বসে থাকবি না। ছেলেদের বল মেয়েটার বাড়ির লোককে চমকে রাখতে। সেটা করছিস?”
রিন্টু বলল, “প্রতিরোধ আসছে। পাড়ার লোক একজোট হয়েছে। আমাদের ছেলেরা একবার মার খেয়ে গেলে ঝামেলা হয়ে যেতে পারে। বড়ো ফোর্স চাই যারা এলাকায় গিয়ে বোমবাজি করে আসতে পারবে। আজ মাঝরাতে হলে ভালো। সেটা হলে ওরা ঘরে ঢুকে যাবে। তখন ওদের ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করা সহজ হবে।”
ইজাজ কয়েক সেকেন্ড রিন্টুর দিকে তাকিয়ে ফোন বের করে একটা নাম্বারে ফোন করলেন। রিং হতেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হল। ইজাজ বললেন, “আলম? এই ঘরে আয়।”
মিনিটখানেক পরে একজন লম্বাচওড়া লোক ঢুকল ঘরে। ইজাজ বললেন, “নর্থে, একটা পাড়ায় আজ রাতে বেশ কিছু বোম ফেলে আসতে হবে। পুলিশ আমি ম্যানেজ করে নেব। পারবি?”
আলম বলল, “ঠিকানা দিন। এখনই করে আসি।”
ইজাজ ধমকালেন, “আমি এখন বলেছি? যখন বলেছি তখন করবি। রাত একটা থেকে দুটোর সময় যাবি। সারা পাড়া যখন ঘুমোবে তখন। পাড়া চমকাতে হবে শুধু। বাকিটা আমি বুঝে নেব।”
আলম মাথা নাড়ল।
রিন্টু বলল, “মেয়েটার দুলাভাই লোকটা টাইট আছে। ওকেও চমকানো দরকার। ওরই তো বন্ধু ওই পুলিশটা, যাকে ট্রান্সফার করা হল।”
ইজাজ মুখে তাচ্ছিল্যের শব্দ করে বললেন, “দুলাভাইকে দিয়ে কী করবি? তোদের এই হল সমস্যা। সব জায়গায় মাথা গরম করে কাজ হবে? বাপ মা বুড়ো বুড়ি। দুজন তো লোক। এক রাত বোমবাজি হলে ভয়ে পেচ্ছাপ করে দেবে।”
রিন্টু বলল, “তবু আপনি জায়গামতো বলে রাখুন, মেয়েটা আমার নামে রেপ চার্জ এনেছে ফেসবুকে। দেখার পর থেকে আমার মাথা কাজ করছে না।”
ইজাজ বলল, “আবেগঘন ভাষায় তুই একটা পোস্ট লেখ। কীভাবে ওর বাড়ি থেকে ওর ওপর চাপ দিয়ে তোদের পবিত্র প্রেমকে নষ্ট করতে চাইছে এই নিয়ে বড়ো করে কিছু লেখ।”
রিন্টু গম্ভীর হয়ে নখ খুঁটতে থাকল।
৩৪
“দেশভাগের ক্ষত ভারতবর্ষে সবথেকে বেশি হয়েছিল বাংলা আর পাঞ্জাবে। পাঞ্জাব যতটা সে জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াতে পেরেছিল, পশ্চিমবঙ্গ সে জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। ক্ষতটা থেকেই গেছে। যতই কমিউনিজম পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করুক অনেক বছর ধরে, মানুষের ভেতর থেকে সে ক্ষতকে সরানো যায়নি। অবচেতন মনে সযত্নে লালিত পালিত হয়ে আছে আমরা ওরা, হিন্দু মুসলমান। নজরুল যতই বলে থাকুন মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু মুসলমান, আদতে তা নয়। এই ক্ষত ছাইচাপা আগুনের মতো এ রাজ্যে বরাবরই ছিল। ধর্মনিরপেক্ষ দেশের শাসককে ধর্ম উদাসীন হতে হবে। ভোটের রাজনীতি আপনি করতেই পারেন। আপনি মাথায় কাপড় বেঁধে নামাজ পড়ে আসতেই পারেন ইফতারের সময়। কিন্তু তাতে মুসলমানদের প্রকৃত উপকার হবে না। মুসলমানদের দয়া কিংবা ঘৃণার চোখে দেখলে হবে না। তাঁরা ভিক্ষার দান চান না। তাঁদের জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষার পরিকাঠামো। এ রাজ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কি কোনও কালেই ছিল না? শাসক যদি তাঁর মনোমতো ধর্মকে ব্যবহার করেন, ধর্মকে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করেন, তার ফল মারাত্মক। সংখ্যালঘুকে ভুলভাবে তোষণ করে যাওয়া সংখ্যাগুরুকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। একইসঙ্গে সংখ্যালঘুরাও যে খুব বেশি নিরাপদ বোধ করেন, সেটা ভাবলে বোকামি হবে। আবারও বলছি, তাঁরা কিন্তু দয়ার দান চান না। আপনি মুসলমান ক্রিমিনালদের ব্যবহার করবেন, আর সোশাল মিডিয়ায় কিছু ইন্টেলেকচুয়ালকে দিয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করাবেন, এতে মুসলমানদের ভালো হচ্ছে না।
আমাদের সমস্যা আমাদের কোনও রাজা রামমোহন রায় নেই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নেই। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে যে ধর্মের তত্ত্বের পরিবর্তন হয়, তা আমরা স্বীকার করি না। এর জন্য দায়ী অপর কেউ নয়। আমরাই দায়ী। ধর্মীয় গোঁড়ামি মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে সে ধর্ম মানুষের ভালোর জন্য আর থাকে না। হিংসা কিংবা দ্বেষ ছড়ানোর লক্ষ্যে কেউ ধর্মের গোড়াপত্তন করেন না। কয়েকশো বছর আগে আরব দেশে যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ধর্মগ্রন্থ লেখা হয়েছিল, তার সঙ্গে এই ২০১৯-এ পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির কোনও মিল নেই। মানুষকে একটা সময় বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়েছিল। যুগে যুগে যুদ্ধ হয়েছে। মানুষ মানুষকে মেরেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ কমেছে। সভ্যতা মানেই তো তাই? অস্ত্র, যুদ্ধ ইত্যাদিকে দূরে সরিয়ে রেখে মানুষ যত পৃথিবীটাকে সুন্দর করে রাখবে, সভ্য সে তখন হবে। উন্নততম প্রযুক্তির পরমাণু বোমা যদি মানুষ মারার জন্যই তৈরি হয়ে থাকে, তা সভ্যতার কলঙ্ক।
