মিত্র সাহেব বললেন, “কে?”
সুশোভন মুখ দেখালেন।
মিত্র সাহেব বললেন, “একটু পরে আসতে পারবে? কাজ ছিল এখন।”
সুশোভন বললেন, “দু মিনিট নেব স্যার। চলে যাব তারপর।”
মিত্র বললেন, “ওকে। এসো।”
সুশোভন চেম্বারে ঢুকলেন।
মিত্রসাহেব বললেন, “আমি জানি তুমি কী নিয়ে বলতে এসেছ। শকিং অর্ডার। কিন্তু কিছু করার নেই। উপরওয়ালার নির্দেশ এলে আমি অপারগ। তুমিও জানো কিছুদিন আগেই ডিএ নিয়ে আন্দোলন করতে গেছিল বলে পার্মানেন্ট পোস্টেড কয়েকজনকে এভাবেই ট্রান্সফার করা হয়েছিল।”
সুশোভন বললেন, “আমি সবটাই বুঝেছি স্যার। এবং এই নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই।”
মিত্রসাহেব অবাক হয়ে বললেন, “তবে?”
সুশোভন বললেন, “আমি বলতে চাইছি আপনার সঙ্গে কাজ করে ভালো লাগল। নতুন টেরিটরিতে যাব। এরা আমাকে ট্রান্সফার করে ভালোই করেছে। আশা করছি খুব বেশিদিন আমাকে সন্দেশখালিতে রাখতে হবে না। ওখানেও তো একটা কমিউনাল টেনশন চলছে শুনছিলাম কদিন ধরে। গভর্নমেন্টের ভূমিকা ওখানেও সন্তোষজনক নয়।”
মিত্র সভয়ে সুশোভনের পেছনে কেউ আছে নাকি দেখে নিয়ে বললেন, “তুমি এসব কথা বলতে যেয়ো না এখন। একেবারেই বলতে যেয়ো না। তুমি রেগে আছ আমি জানি, কিন্তু আমাদের চাকরিতে অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট একটা আর্ট। দরকার হলে সাত-আট দিন ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরে এসো, এসে অর্ডারটা অ্যাক্সেপ্ট কোরো।”
সুশোভন হাসলেন, “না স্যার, অর্ডার নিয়ে ভয় পাবার তো কিছু নেই, সন্দেশখালিই পাঠান আর সুন্দরবন, মাস গেলে মাইনে পেলেই হবে। তবে একটা কথা ঠিক, ইজাজ মল্লিকরা কিন্তু স্যার সংখ্যায় বাড়ছে। আজ আমার বন্ধুর বাড়িতে হয়েছে, কাল আপনার বাড়িতেও হতে পারে। আপনারও মেয়ে আছে শুনেছি। একইভাবে একই ট্র্যাপ যদি আপনার বাড়িতে ওরা ফেলত এই হাস্যকর একটা ধর্মীয় কারণে, আপনি কী করতেন?”
মিত্র মাথা নাড়িয়ে বললেন, “ওহ, তুমি এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ সুশোভন। গ্রো আপ!”
সুশোভন বললেন, “আমি মাথা ঘামাচ্ছি না স্যার। একেবারেই না। কিন্তু আপনি পুরো ঘটনাটা আমার থেকে শুনেছেন। জামান সাহেব জানেন। কতগুলো সড়কছাপ ক্রিমিনাল একজন ভদ্রলোকের বাড়িতে হামলা করেছে বলে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। শুধু এই অপরাধে আমার বদলি হয়ে যাবে?”
মিত্র বললেন, “চা খাবে? দাঁড়াও চা বলছি।”
সুশোভন চুপ করে বসে রইলেন।
চা বলে মিত্র বললেন, “শোনো, আমিও জানি, তুমিও জানো, ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আমাদের চাকরি করতে হয়। আমাদের বেসিক্যালি কিছু করার থাকে না। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় অর্ডার বের করতে হয়েছে। বুঝতেই পারছ… তুমি বুদ্ধিমান…”
সুশোভন বললেন, “মেয়েটা স্ট্যাটাস দিয়েছে স্যার। এবার তো ডিপার্টমেন্ট কিছু স্টেপ নেবে!”
মিত্র অস্বস্তিমাখা মুখে বললেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কাছে ব্যাপারটা নিয়ে শুধু পরিস্থিতি দেখার নির্দেশ আছে। এবং এও বলা আছে মেয়েটিকে পেলে যেন কাস্টডিতে নেওয়া হয়।”
সুশোভন এবার উত্তেজিত হলেন। বললেন, “মেয়েটাকে কাস্টডিতে কেন নিতে হবে? কেন ছেলেটাকে ইমিডিয়েটলি অ্যারেস্ট করা হবে না? সবার আগে তো ফ্যাক্ট লুকিয়ে বিয়ে করার জন্য ফোর টুয়েন্টি চার্জ দেওয়া উচিত। তারপর কিডন্যাপিং, রেপ, সমস্ত চার্জ দেওয়া যায়!”
মিত্র বললেন, “রেপ চার্জ দেবে, প্রমাণ করতে হবে তো! তার জন্য মেয়েটার মেডিক্যাল চেক আপ করতে হবে। তুমি মেয়েটিকে জনসমক্ষে আনার ব্যবস্থা করো, মেডিকেল করাও, শুধুমাত্র অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে তো অ্যারেস্ট করা যায় না!”
সুশোভন বললেন, “আর কতগুলো লুম্পেন শহরে দাপিয়ে বেড়াবে, ডিপার্টমেন্ট থেকে তাদের কিচ্ছু করা হবে না, এটা কোথায় লেখা আছে স্যার?”
চা এল। মিত্র সুশোভনকে বললেন, “চা নাও। তুমি এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছ। পারসোনালি নিয়ে নিচ্ছ কেন? আমি আছি তো এখানে। আমি দেখব মেয়েটি যেন জাস্টিস পায়। তোমাকে কথা দিচ্ছি। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।”
সুশোভন গুম হয়ে বসে রইলেন।
৩২
ঝুমকিকে ঘরের ভেতরেই রেখে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিল আদিত্য। ঝুমকিকে বলে দিয়েছে বারান্দায় না যেতে। বাইরের কেউ যদি ঘুণাক্ষরেও বুঝে যায় ঘরের ভেতরে কেউ আছে, তাহলে আর-এক সমস্যা হতে পারে।
গ্যারেজ থেকে গাড়িটা বের করে রাস্তায় নামাতে আদিত্য দেখল একটা টাটা সুমোতে কয়েকটা ছেলে তাকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছে। আদিত্য চারপাশে দেখল। দিনের আলো। পাড়ায় যথেষ্ট লোকজনও আছে।
সে নিজের গাড়িটা স্টার্ট করে খানিকটা এগোতে বুঝতে পারল সুমোটা তাকে ফলো করা শুরু করেছে।
সে সবে গাড়ি চালানো শুরু করেছে। অনেকটাই অ্যালার্ট হয়ে চালাতে হয়।
এই ছেলেগুলো রিন্টুদের বাড়িতে ছিল সম্ভবত। চোয়াড়ে মার্কা। রুবির জ্যামে গাড়ি দাঁড়ালে লুকিং গ্লাসে দেখল গাড়িটা একটা গাড়ি পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। আদিত্য ফোনটা বের করে সুশোভনকে ফোন করল। একটা রিং হতেই সুশোভন ফোন ধরলেন, “বল।”
আদিত্য বলল, “একটা সুমো ফলো করছে।”
সুশোভন বললেন, “একটা কাজ কর, তিলজলা থানায় গাড়ি ভিড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়া। সুমো কেটে যাবে।”
আদিত্য বলল, “যদি তারপরেও না কাটে?”
সুশোভন বললেন, “ফোন করিস আমায়।”
