“ফোন অফ রেখেছিলেন কেন?”
সুশোভন হাসলেন, “আর কী বলব, ফোনের জ্বালায় তো ঘুম মাথায় উঠেছিল। কেন, কী হয়েছে?”
“আপনার ট্রান্সফার অর্ডার এসেছে। সন্দেশখালিতে। ইমিডিয়েট পোস্টিং।”
সুশোভন চুপ করে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
৩০
সকাল আটটা। আদিত্যর শেষরাতের (সুশোভন ভোরে ফোন করেছে) দিকে ঘুম এসেছিল। ঘুম ভাঙল রুমকির ফোনে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে রুমকির উত্তেজিত গলা ভেসে এল, “এই, উঠেছ?”
আদিত্য ঘুম জড়ানো গলায় বলল, “না, কী হয়েছে?”
রুমকি বলল, “আরে বোন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমি তো ভাবতেই পারছি না ও এরকম একটা চক্রে জড়িয়ে পড়েছিল।”
রুমকি কেঁদে ফেলল।
আদিত্য বলল, “ওহ। ভাবতে পারোনি? তোমার বাবাকে দেখিয়েছ?”
রুমকি কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “বাবা বোনকে নিয়ে কোনও কথা শুনতেই চাইছে না। তুমি একবার এসো না।”
আদিত্য শুয়ে ছিল। এবার বিরক্ত হয়ে খাটে উঠে বসে বলল, “কী ব্যাপার বলো তো? আমি কি অফিস ছেড়েই দেব? রোজ রোজ এভাবে অফিস কামাই করলে তো চাকরিটাই চলে যাবে। কী চাইছ?”
রুমকি রেগে গেল, “তা তো বলবেই। তোমার নিজের বোন হলে কী করতে? আমার বোন, আমার বাড়ির ব্যাপারে তো তোমার বিরক্তি আসবেই! থাক। তোমাকে কিচ্ছু করতে হবে না। আমার বোনটা মরুক বাঁচুক, আমাদের সংসারটা ভেসে যাক, তুমি অফিস করো, যাও। অফিসে গিয়ে বসে থাকো।”
ফোনটা কেটে দিল রুমকি।
আদিত্য কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে ফেসবুক খুলল। ঝুমকি কাল তার ফোন থেকে লগ আউট করেনি। একগাদা কমেন্ট পড়েছে ঝুমকির স্ট্যাটাসে। দু ধর্মের মধ্যে লাঠালাঠি লেগে গেছে প্রায়। হিন্দুরা বলছে তারা জানত মুসলিম মানেই এরকম, আর মুসলিমরা ঝুমকির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তুলকালাম কাণ্ড চলছে। কয়েক সেকেন্ড কমেন্টগুলো দেখে আদিত্যর কান মাথা গরম হয়ে গেল। সে খাট থেকে নেমে বাথরুম সেরে ড্রয়িং রুমে গিয়ে টিভি ছাড়ল। ঝুমকির ব্যাপারটা খবরে দেখাচ্ছে। ঝুমকির স্ট্যাটাসটা আসার আগে অবধি ব্যাপারটা একরকম ছিল, রিন্টুর দিকে সহানুভূতির ঝড় বইছিল, এখন ব্যাপারটা খানিকটা দুভাগে ভাগ হয়েছে। রিন্টুদের বাড়ি থেকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে ঝুমকির বাড়ির লোকই ঝুমকিকে গুম করে এখন জোর করে তাকে দিয়ে বয়ান লেখাচ্ছে।
আদিত্য কয়েক মিনিট টিভি দেখে চ্যানেল চেঞ্জ করে কার্টুন চালাল। দেখা যাচ্ছে না। সত্যি, খবরকে কীভাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নাটকীয় করে তিল থেকে তাল করতে হয় তা এই চ্যানেলগুলোর থেকে শেখার আছে।
ঝুমকি মনে হয় সারারাত ঘুমোয়নি। শেষরাতে ঘুমিয়েছে। আদিত্য প্রথমে তৈরি হয়ে নিয়ে পরে গেস্ট রুমে গিয়ে নক করতে যাচ্ছিল, ফোনটা আবার বেজে উঠল।
আদিত্য নাম্বার না দেখেই ধরল। ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল, “দাদা, ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে তো।”
রিন্টুর গলা।
আদিত্য সোফায় বসল। ঠান্ডা গলায় বলল, “কী যাচ্ছে হাতের বাইরে?”
রিন্টু হাসল, “বুঝতেই পারছেন দাদা কী বলতে চাইছি। আমার বিয়ে করা বউকে আপনারা লুকিয়ে রেখে ঠিক করছেন? এরপর তো বাড়িতে বোম পড়তে পারে, আমার আর কিছু হাত থাকবে না।”
আদিত্য বলল, “ফ্যালো না বোম, কে বারণ করেছে। তোমরা বোম ফেললেই বরং তোমাদের চরিত্র, উদ্দেশ্য সবই পরিষ্কার হয়ে যাবে। যে জিনিসটা তোমরা করতে চাইছ, যদি ভেবে থাকো করে পার পেয়ে যাবে, তাহলে ভুল ভাববে।”
রিন্টু বলল, “কী করতে চাইছি দাদা? গরিব মানুষ আর অন্য ধর্ম বলে আমি আমার ভালোবাসাকে পেতে পারি না?”
আদিত্য বলল, “একশোবার পেতে পারো, ধর্মের জন্য কোনও দিন কিছু আটকাবে না, কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ যে শাস্তির আওতায় পড়ে তা বোধহয় তুমি জানো না। তুমি শিক্ষিত তো, না একেবারেই গণ্ডমূর্খ?”
রিন্টু এবার রেগে বলল, “একদম মুখ সামলে কথা বলবি। নিজের বউয়ের সঙ্গে সেক্স করলে কবে থেকে সেটা রেপের আওতায় আসে রে মাদারচোদ? ভেবেছিস কী তোরা? যে জাহান্নামেই লুকিয়ে রাখিস ওকে, খুঁজে বের করে আমার ঘরে নিয়ে আসবই। চ্যালেঞ্জ দিলাম তোকে।”
আদিত্য বলল, “এ কি সিনেমা পেয়েছ ভাই? বিয়ে করা বউ? ধর্ম লুকিয়ে বিয়ে করা কোথাকার বিয়ে করা বরের কাজ হে? একটা কথা মনে রেখো, দেশে এখনও আইন আদালত আছে, তোমাদের কপালে অশেষ দুঃখ আছে, সমঝে যাও। নইলে…”
রিন্টু ফোন কেটে দিল।
আদিত্য উঠল। গেস্ট রুমের দরজায় নক করল।
ঝুমকি ঘুমচোখে দরজা খুলে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “বেরোবে?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ, যথারীতি তুই আবার আগুন লাগিয়ে দিয়েছিস চারদিকে।”
ঝুমকি আঁতকে উঠে বলল, “মানে? আমাদের বাড়ি ঠিক আছে তো?”
আদিত্য আশ্বস্ত করল “হ্যাঁ, সে ঠিক আছে। তবে তোর স্ট্যাটাসটা পড়ে তোর দিদির মন নরম হয়েছে। এবার মনে হয় তোর ব্যাপারটা বলা যাবে। তোর বাবাকে ম্যানেজ করতে পারলে আর কোনও চিন্তা নেই। ফ্রিজে কিছু খাবার আছে। ওগুলো খেয়ে সকালের খিদে মেটা। দুপুরে ভাত এনে দেব।”
ঝুমকি বলল, “অফিসে যাবে না আজকেও?”
আদিত্য বলল, “হ্যাঁ, চাকরিটা ছেড়েই দিতে হবে যা বুঝছি। তোর রোমিও ফোন করেছিল। খুব তড়পাচ্ছে।”
ঝুমকির মুখটা কঠিন হয়ে গেল। বলল, “ওকে কেউ মেরে ফেললে আমি সবথেকে বেশি খুশি হতাম। জানোয়ার একটা।”
৩১
মিত্র সাহেব চেম্বারে ছিলেন। সুশোভন নক করলেন।
